Home বিষাদ ও বসন্ত বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৭

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৭

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৭
অলকানন্দা ঐন্দ্রি

হিমেলের বলা কথাগুলো মিথির সহ্য হলো না৷ এই মুহুর্তে দাঁড়িয়ে মিথির মনে হলো ওকে নিয়ে উপহাস করল হিমেল ভাই। শুধু শুধু ওকে স্ত্রী পরিচয় কেন দেওয়া হলো? ওর অবস্থা নিয়ে মজা করল? মিথি বুঝে উঠল না। তবে নিজের প্রতি ঘৃণা হচ্ছে তার। নিজেকে স্বস্তা লাগছে খুব এই মুহুর্তে। এই যে সমাজে ওর ডিভোর্সী পরিচয়? এই পরিচয়টা নিয়েই কতজনের কত আহাজারি, কত দুঃখ, কত দয়া, কত সহানুভূতি। কিন্তু কেন? এই স্বস্তা সহানুভূতি তো ও চায়নি। এই যে হিমেলের ভাবী, চাচী ওকে না বলেই এমন একটা বিশ্রী প্রসঙ্গ আনল? মিথি কি এতই স্বস্তা? এতোটাই? যে কেউ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলেই মিথি হুড়মুড় করে বিয়ে করে নিবে? মিথিকে কি ভেবেছে তারা? মিথি ভেবে পায় না। তবে হিমেল তার একটু পরই আবার ভদ্রমহিলাকে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল,
“ আপনার কি মনে হচ্ছে মিথ্যে বলছি আন্টি? একদমই নয়৷ আমার বন্ধুও ছিল। আমি এবং মিথি সত্যিই বিবাহিত। ”
মিথি তাকাল। কি আত্মবিশ্বাসের সহিত মিথ্যে বলছে হিমেল ভাই। চোখমুখ দেখে মনেই হচ্ছে না সে মিথ্যে বলছে, বা মিথ্যে বলতে পারে। মিথি বলার চেষ্টা করল,

“ কি বলে যাচ্ছে…”
বাকিটুকু বলা হলো না মিথির। হিমেলই ওর পাশে এসে বসল। একদম আপন আপন ভাব দেখিয়ে ভ্রু বাঁকিয়ে বলে উঠল,
“ মিষ্টিকে রেখে এসেছিস কেন? বলেছিলাম না বাসা দেখার ঝামেলা আমি দেখে নিব? ”
মিথির আরেক দফা বিস্মিত হলো। আশ্চর্য! মিথি যে এখানে ছিল হিমেল ভাই কিভাবে জানল? কিভাবেই বা এল? আর এসবই বা বকে যাচ্ছে কেন? এসব প্রশ্ন মাথায় ঘুরিয়ে সে মুখ টানটান করে চাইল। হিমেল তখন ভদ্রমহিলার ভাই এর ছেলের দিকে চাইল। ফের ভদ্রমহিলার দিকে চেয়ে বলল,
“ ভাবী এখনও জানে না আমরা বিবাহিত। তাই আপনাকে জানায়নি আন্টি। ”
ভদ্রমহিলার চোখমুখ নিরাশ। স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে সে বিশ্বাস করতে চাইছেন না এই সত্যটুকু। বললেন,
“ কিন্তু আমার সত্যিই ওকে পছন্দ হয়েছিল খুব। আমাদের শাফুর সাথে খুব মানাত। আমি তো ওর ভাই ভাবীর সাথেও কথা বলেছিলাম। শুধু ওর মতটুকু ফেলেই বিয়েটা সেরে নিতাম। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে তোমার কথা কেন জানি বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে না। ”
মহিলার আপসোস স্পষ্টই টের পাওয়া গেল। হিমেল হাসল৷ বিনিময়ে বুঝাল তারা সত্যিই বিয়ে করেছে।সে সত্যি সত্যিই সত্য বলছে।

হিমেলের ভেতরে ভেতরে একটা চিড়চিড়ে রাগ কাজ করছিল কেন জানি না। ঠিক যেমনটা মিথি মুহিবকে পছন্দ করে শুনে হয়েছিল। আজও হচ্ছে। অথচ প্রকাশই করল না। যখন ভদ্রমহিলার বাসা থেকে মিথি, আয়মান এবং সে তিনজনই বেরয়ে এল তখনও হিমেল গম্ভীরই থাকল। মিথি কেন সে এখানে আসার আগ অব্দি এতোটা সময় বসে থাকল ওখানে? ভদ্রমহিলার প্রস্তাব শুনে ওর উচিত ছিল না উঠে চলে আসা? কোনভাবে কি মিথি চাইছিল প্রস্তাবটা কিছুটা এগিয়ে যাক। হিমেল বুঝল না। অন্যদিকে মিথির কপাল কুঁচকে রাখা। মুখেচোখে স্পষ্টই রাগ রাগ ভাব টের পাওয়া গেল।হিমেল যেভাবে রিল্যাক্স মুডে, মুখচোখ গম্ভীর রেখে হেঁটে যাচ্ছে মিথি তা পারল না। বরং হিমেল ভাই এর এই গা ছাড়া ভাবটাও এই মুহুর্তে বিরক্ত লাগছে। সে হিমেলের দিকে চেয়েই ও প্রশ্ন ছুড়ল,
“ এই তুখোড় মিথ্যেটা কেন বললেন হিমেল ভাই? কেন আমাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিলেন হুহ? কোন কারণে? ”
হিমেল ভ্রু বাঁকাল। পা চালাতে চালাতে হুট করেই পা থামিয়ে ও ঘাড় বাঁকাল। মিথির দিকে চেয়েই ভ্রু বাঁকিয়ে শুধাল সঙ্গে সঙ্গে,

“ তো ঐ ছেলেকে বিয়ে করার ইচ্ছা হয়েছে তোর? ঐ আন্টির কথামতো পিচ্চি মিথিফুলের বাবা বানাতে চাস তুই ঐ ছেলেকে মিথি? খুব মন চাইছে ঐ ছেলের সাথে সংসার সাজাতে রাইট? ”
মিথির চাহনি আগের মতোই রইল। আবার ও প্রশ্ন ছুড়ল,
“ শুধু বিয়ের প্রসঙ্গটা বাদ দিতেই এই মিথ্যেটা বলেছেন? নাকি অন্য কোন কারণে হিমেল ভাই? ”
হিমেল এবার সরাসরিই নজর ফেলল মিথির দিকে। ওর চোখমুখ কেন জানিনা টানটান ঠেকল। যেন স্পষ্টই বুঝা গেল সে রেগে আছে। মিথি বুঝলও। অতঃপর হিমেল সরাসরিই ত মিথির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
“ মিথি?আমি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলতে পারি না।তোকে সরাসরিই একটা প্রস্তাব দেই? ”
মিথি বোধহয় টের পেল কি প্রস্তাব হতে পারে।অস্বস্তি হলো তার৷ প্রশ্ন ছুড়ল,
“ কি প্রস্তাব? ”
“ যে মিথ্যেটা আমি একটু আগে বলেছি। সে মিথ্যেটা আমি সত্যিই সত্য করতে চাই৷তোকে এবং ছোট্ট মিথিফুলকে নিজের কাছে রাখার লোভ করতে চাই।”
মিথি মুহুর্তেই চোখমুখ কুুঁচকে তাকাল৷ একটু আগের বিরক্তিকর ঘটনাটা, মহিলার সেই প্রস্তাবটা স্পষ্ট মনে পড়ল। মুহুর্তেই বলে উঠল মিথি,

“ কখনো না। কিসব বলছেন হিমেল ভাই? মাথা ঠিক আছে আপনার? ”
হিমেল একইভাবেই তাকিয়ে রইল। গলার স্বরে দাম্ভিকতা টেনে স্পষ্ট উত্তর করল,
“ পুরোপুরিই ঠিক আছে। ”
“ না, ঠিক নেই। এসব কখনোই সম্ভব নয়। ”
এইটুকু বলেই মিথি পা চালানোর চেষ্টা করল। এড়িয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আর এক সেকেন্ডও এখানে দাঁড়িয়ে থাকার ইচ্ছে নেই৷ কিন্তু হিমেল তা মানল না। মুহুর্তেই গিয়ে মিথির সামনে দাঁড়াল। মিথির দিকে চেয়ে ডান ভ্রু উঁচু করল। তীর্যক দৃষ্টি ফেলে জিজ্ঞেস করল,
“ কেন? যোগ্য নই আমি তোর? কি যোগ্যতা অর্জন করতে হবে তোদের পেতে? নিজের কাছে রাখতে? ”
মিথি চাইল। মুহুর্তের মধ্যেই নিজের প্রতি সে ঘৃণাটা কাজ করছে তার সাথে সাথে হিমেলের প্রতিও একরাশ রাগ, ঘৃণা জমল। হিমেল ভাই কি বুঝাল? সে খুব স্বস্তা? তাকে নিজের কাছে রাখা জাস্ট এক সেকেন্ডের খেলা এটা বুঝাল? মিথির ঘৃণা নিয়েই তাকাল। উত্তর করল,
“ আপনি উপহাস করছেন নাকি দয়া করছেন হিমেল ভাই? ডিভোর্সী নারীরা খুব স্বস্তা এটা বুঝাতে চাইছেন? যে যে কেউ বলল আর তারা রাজি হয়ে যাবে বিয়ের জন্য? এতোটাই স্বস্তা তাই না? আপনি সমাজের বাকি মানুষের মতোই হিমেল ভাই। ব্যাতিক্রম নন। ”

মিথি অপেক্ষা করল না আর। দ্বিতীয়বারের মতো উপেক্ষা করে চলে গেল নিজের মতো। অথচ হিমেল ঠিক একইভাবেই মুখ গম্ভীর করে স্পষ্ট চাহনিতে তাকিয়ে থাকল তার যাওয়ার পানে। এখনো মিথির কথাগুলোই মস্তিষ্কে ঘুরছে। অতঃপর আয়মানের দিকে চেয়ে ভ্রু কুঁচকে শুধাল,
“ও আমায় কি বলল? আমি সমাজের বাকি মানুষের মতো? আমি ব্যাতিক্রম নই? ”
আয়মান বোধহয় বুঝল বন্ধুর আক্ষেপটা। আবার একইভাবে মিথির দিকটাও বুঝল। একটা মেয়ে প্রতি পদে পদে লড়তে লড়তে তার এইটুকু ধারণা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। হিমেল যেখান থেকে ভালোবেসে হাত বাড়িয়েছে ঠিক ওখানে দাঁড়িয়েই মিথির কাছে তা স্বস্তা সহানুভূতি, উপহাস এসব মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়৷ আয়মান বলল,
“রাগ করিস না।”
অথচ হিমেলের ভেতরে সত্যিই চিড়চিড়ে এক রাগ অনুভব হলো৷ মুখ টানটান রেখে শুধাল ও,
“ ও কখনো বুঝার চেষ্টাই করল না আমাকে। আমার ব্যাতিক্রম হওয়া টের পেয়েছে কখনো? অথচ আমার দিকে ও ঘৃণার নজরে চেয়ে কথা বলল আয়মান। ঘৃণার নজরে চেয়ে উত্তর দিল। ”
“ ওর সিচ্যুয়েশনটা বুঝ হিমেল। ওর কাছে এই পরিস্থিতিতে এমনই মনে হবে। স্বাভাবিক। কিন্তু তুই যে এই মিথ্যেটা বললি? এরজন্য ওর পরিস্থিতিটা আরো কঠিন হবে না তো? তোর ভাই ভাবী এটা শুনলে কি করবে ধারণা আছে? ”

আদ্র দিনের পর দিন মায়ের অসহায়ত্ব, মায়ের প্রতি বাবার অবহেলা এসব দেখে অভ্যস্ত এখন। সে খুব ভালো করেই জানে মা বাবার সম্পর্কের বর্তমান সমীকরণ কি। অথচ তবুও, বাবাকে সরাসরি বলার মতো সেই ক্ষোভ আদ্রর আর নেই। আদ্র নিজেও তো একই অপরাধে অপরাধী। নিজেও তো একই অন্যায় করেছে। একটা বোকা গ্রামের মেয়েকে সহজ সরল পেয়ে কতশত অন্যায় করল। দিনের পর দিন এভাবেই তো সেও মিথিকে অবহেলা করেছিল। ঠিক এভাবেই!আদ্র নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজে পায় না। নিজের পরিবারের ভাঙ্গন স্পষ্ট টের পেয়েও বাবা মা কাউকেই কিছু প্রশ্ন না করতে পারার অনুভূতি আরো অসহনীয়। যেন গলা চেপে রেখেছে কেউ সর্বক্ষণ। আদ্র আজ মাকে নিয়ে গিয়েছিল এক আত্মীয়ের বাড়িতে। তারই এক চাচাতো ভাই এর ছেলে হয়েছে তিনদিন হলো। একদম ফুটফুটে আদুরে একটা বাচ্চা। সেখানেই বাচ্চাকে দেখতে গিয়েছিল তার মা। একা হওয়াতে আদ্রকেও বলেছিল। আদ্র না করেনি।মায়ের সাথে গিয়েছে। অথচ যাওয়ার পরপরই সবাই কোলে তুলে নিতে নিতে শেষ অব্দি ছোট্ট আদুরে বাচ্চাটাকে কোলে দিয়ে গেল আদ্রর। আদ্র ভ্যাবাছ্যাঁকা খেল। কোনকালে কোন বাচ্চাকে কোলে না নেওয়া আদ্র এই ছোট্ট এইটুকু শরীর নিজের বাহুডোরে সামলে নিতে পারল না যেন৷ যেন এক্ষুনিই হাত গলিয়ে পড়ে যাবে। আদ্রী অসহায়ের মতো নিজের মায়ের দিকেই চাইল। বলল,

“ আম্মু? পড়ে যাবে না তো ও? ”
আদ্র আম্মু হেসে ফেলল।ওখানকার আদ্রন এক দাদী সেখানে ছিলেন তখন। নাতির এই অবস্থা দেখে হেসে বলল,
“ বউ এর ঐ ভাই এর চরিত্রহীন মাইয়ারে বিয়া না করলে তো তুমি ও এতদিনে এক বাচ্চার বাপ হইতা দাদুভাই। কোলে নেওয়ার অভ্যাসও হইয়া যাইত তখন। ”
আদ্র মুখ চুপসে এল এবার কেমন। চরিত্রহীন? আসলে তো সে মেয়েটা চরিত্রহীন ছিল না। আদ্রই এই অপবাদটা দিয়েছিল। আদ্রই এই অপবাদ দিয়ে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিল যে মিথি চরিত্রহীন। অথচ কথাটা তো সত্য নয়। আদ্র নিজেই জানে, মিথির গর্ভের বাচ্চাটা আদ্ররই। আর কারো নয়৷ আদ্র ছোটশ্বাস ফেলে। সে দাদী আবারও বলল,
“ ঐ মাইয়ার ঐ বাচ্চাটা যদি অন্য পোলার না হয়ে তোমার হইত তবে তো এমন আরেকখান বাচ্চার মুখ দেখতাম আমরা। এমন একখান ছেলের বাপ হইতা তুমিও। কিন্তু ভাগ্য বইলা একটা জিনিস আছে না? তোমার ভাগ্যটা আসলেই খারাপ দাদুভাই। ”
আদ্রর মা শুনল। এগিয়ে বলল,

“ ঠিক বলেছেন চাচী, আমার ছেলেটার ভাগ্য সত্যিই খারাপ৷ তবে আপনি যে বিষয়ে বললেন সে কারণে নয়। কোন কারণে ভাগ্য খারাপ তা ও নিজেই টের পাবে কোন এক সময়। ”
কোন এক সময় নয়। আদ্র এখনই টের পায়। আদ্র এখনই মিথির প্রতি এক অদৃশ্য মায়া অনুভব করে। মিথির প্রতি করা অন্যায়ের জন্য অনুশোচনায় দগ্ধ হতে হতে, মিথিকে ভাবতে ভাবতে আজকাল মিথির জন্য মায়া হয়। বুকের ভেতর দুঃখ জমে। বিষাদরা জমে জমে মিথির নাম উচ্চারণ করে। ঠিক একইভাবেই অতীতে সৃষ্টকর্তার দেওয়া এক চমৎকার উপহারকে অস্বীকার করার দুঃখ জাগে। আদ্র কিছুক্ষন নিজের কোলে থাকা ছোট্ট বাচ্চাটার দিকে তাকিয়েই থাকল। সত্যিই তো। তারও একটা বাচ্চা থাকতে পারত। তার কোলেও এমন একটা ফুটফুটে সন্তান থাকতে পারত। কিন্তু? কিন্তু তার পাশবিক অত্যাচারের কারণেই তো সে দুনিয়াতে আসল না। এমন একটা আদুরে মুখ, আদুরে শরীর সে ছুঁতে পারল না তো তারই অপকর্মের কারণে। সেই তো মে’রে ফেলতে চেয়েছিল। সেই তো শেষ করে দিতে চেয়েছিল। আদ্রর বুক ছিড়ে যেন দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল এক মুহুর্তেই।
আদ্ররা বাসায় এল রাত আটটায়৷ এরপর কিছুটা সময় এক চাপা অস্থিরতা নিয়ে বসে থেকেই মায়ের কাছে গিয়ে দেখল মা তার ছোটবেলার এক ছবিতে তাকিয়ে আছে। আদ্রকে দেখেই হেসে বলল,
“ আদ্র? তোমার ছোটবেলার ছবিগুলো কি সুন্দর। তুমি জানো? ঠিক এই দিনটায় তুমি আধো আধো বুলিতে আমায় মা ডেকেছিলে আদ্র। তোমার ছোটবেলায় আমি আর তোমার আব্বু এই দিনটাও সেলিব্রেট করতাম আদ্র। ”
আদ্র শুনল। অস্ফুট স্বরে ডাকল,

“আম্মু?”
“ হু। ”
আদ্র কিয়ৎক্ষন চুপ থাকে৷ তারপর হুট করেই বলে উঠল
“ আমরা চলে যেতে পারি না? ”
আদ্রর আম্মু ভ্রু কুঁচকায়। জিজ্ঞেস করে,
“ কোথায়?”
“ অন্য কোথাও। ”
উনার বুঝতে অসুবিধা হলো না ছেলে কেন এই কথা বলল৷ তবুও হেসে বলল,
“ কেন যাব আদ্র? এটা তো আমার সংসার। আমার বাড়ি। আমার এতবছরের গড়ে তোলা সংসার রেখে আমি চলে যাব আদ্র? এই কথা তুমি কিভাবে বললে? ”
“ এমনিই। আব্বুর সাথে কথা হয়েছে তোমার? কখন ফিরবে আম্মু? ”
“ ফিরবে হয়তো শীঘ্রই। তোমার কি আর কিছু বলার আছে আদ্র? ”
আদ্র আর কিছু বলতে পারল না। উত্তর করল,

“ না। ”
আদ্রর মা ছেলের চুপচাপ থাকা দেখে। অতঃপর ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ আদ্র?”
আদ্র উত্তর করল না। শুধু তাকাল। উনি ফের বললেন,
“ আমার সংসারটা ছন্নছাড়া হয়ে গেল কেমন তাই না? তুমি তাই তো বুঝালে অন্য কোথাও চলে যেতে বলে। অথচ, অথচ আমি কল্পনা করেছিলাম কত সুন্দর একটা সংসার আদ্র৷ স্বামী,ছেলে, ছেলের বউ, নাতি নাতনি সবাইকে নিয়ে কত সুন্দর একটা সংসার হতো আমার আদ্র। আজ যদি মিথি থাকত, ঐ ফুটফুটে প্রাণটা আজ যদি আমার বাড়িতে থাকত? আমি এত কিছুর মাঝেও হাসতাম আদ্র। সে ছোট্ট পুচকেটাকে কোলে কোলে রাখতাম সর্বক্ষন।”
আদ্র এবারেও অস্ফুট গলায় বলল,

“ হু? ”
“ জানো আদ্র? আমার না তোমার জন্য মাঝেমাঝে কষ্ট হয়। যদি কখনো আমি চলে যাই ? যদি কখনো আমি আর পৃথিবীতে না থাকি? তোমার তো কিছুই থাকবে না আদ্র। আমি মাঝেমাঝে কষ্ট পাই এই ভেবেই যে, আমার ছেলেই বোধহয় পৃথিবীর এমন এক হতভাগা বাবা যে নিজের সন্তানের জম্ম হয়েছে কিনা এইটুকুই জানে না৷ খোঁজও নেয়নি। ভাবো, তোমার মা নেই, বাবা নেই, স্ত্রী নেই, পৃথিবীতে থাকা তোমার একমাত্র অংশ তোমার সন্তানটিও তোমার কাছে নেই৷ নিঃস্ব লাগবে না আদ্র? আমার নিজেরই তো ছেলের এমন দুর্দশা ভেবে কষ্ট হয়। দীর্ঘশ্বাসে দীর্ঘশ্বাসে চাপা পড়ে যায় কত রাত! তবুও আমি চাই না যে তুমি সে ছোট্টো ছোট্টো হাত দুটো ছুঁয়ে দেখো, সে ছোট্ট মিষ্টি মুখটা দেখতে পাও। চাই না। ”
আদ্রকে অসহায় দেখাল। রোধ হওয়া স্বরে সে বলতে চাইল,

“ আম্মু… ”
“ আজ তোমার আর মিথির সংসারটা থাকলে আমিই সবচাইতে বেশি খুশি হতাম আদ্র। সবচাইতে বেশি সুখী হতাম। সেই ছোট্ট সুখটাও আমার বাড়ির আনাচে কানাচে হামাগুড়ি দিত এতদিনে আদ্র। অথচ সে এখন আমার বাড়ি তো দূর, আমার কাছেও কখনো আসবে কিনা কিজানি…।”
আদ্র চুপই থাকল। তারপরই হুট করে বোধ হলো আম্মু বারবার তার সন্তানের কথা এমনভাবে বলছে যেন সে আছে। সত্যিই কি সে আছে? মিথি নিশ্চয় তার মতো নির্দয় নয়। মিথি নিশ্চয় তার মতো খারাপ মায়ের রোল প্লে করেনি। রোধ হয়ে আসা স্বরে বলল,
“ আম্মু? তুমি কি তাকে দেখেছো? সে আছে তাই না? তুমি নয়তো বলতে না..”
আদ্রর মা উত্তর করল না। শুধু স্মিত হাসল। অন্যদিকে আদ্রর সে রাতটা ঘুমই হলো না। আজকাল প্রায়সই তার ঘুম হয় না। এক চাপা অস্থিরতা, অনুশোচনা, অপরাধবোধ নিয়েই তার সকাল হয়। আদ্র এই অপরাধবোধ নিয়েই প্রতিবারের মতো বিড়বিড় করল আজ ও,

“ মিথি? আমার কেন তখন তোর প্রতি মায়া হলো না? কেন তোর প্রতি আমার একটু সহানুভূতি ও জাগল না মিথি? আজ এইভাবে অন্ধকার রাত্রিকে ছটফট করতে করতে আপসোস করব বলে? আমি, আমি তো নিজেই তোকে জীবন থেকে মুঁছে দিলাম মিথি৷ আমার বাচ্চাটাকেও আ…”
এইটুকু বলেই আর বলা হলো না। গলা আটকে আসল ওর। ঠিক পরমুহুর্তেই আবার বহুকষ্টে শুধাল,

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৬

“ সে কি আছে মিথি? আম্মু কেন বুঝাল, আশা দিল যে সে আছে? সে সত্যিই আছে তো? নাকি নেই মিথি?
আচ্ছা, সে কেমন দেখতে হয়েছে মিথি? আমার মতো? নাকি তোর মতো? মিথি? সে কি ভাইয়ার বাবুর মতোই হাত গলিয়ে পড়ে যাবে এমন? সে কি কখনো জানবে তার বাবা এই অধম আদ্র? ”

বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৩৮