Home শেহেজাদার আদর শেহেজাদার আদর পর্ব ১৩

শেহেজাদার আদর পর্ব ১৩

শেহেজাদার আদর পর্ব ১৩
সুমাইয়া ইসলাম নূর

বাইরে এখন ও ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে
আকাশটা যেন হঠাৎ করেই ভেঙে পড়েছে আজ
গাড়ির কাঁচে টুপটাপ করে বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ছে—
একটার উপর আরেকটা গড়িয়ে নামছে পানির ফোটা
ওয়াইপার ধীরে ধীরে সামনে থেকে পানি সরাচ্ছে…
কিন্তু তবুও রাস্তা ঝাপসা দেখাচ্ছে
চারপাশে কুয়াশার মতো ভেজা ভাব।
হেডলাইটের আলো ভেদ করে সামনে এগোচ্ছে গাড়ি…
ভেতরে—

অদ্ভুত এক নীরবতা…
ইউভি ড্রাইভ করছে…
পিয়াসা আর তুবা চুপচাপ বসে আছে…
আর ইনায়া—
জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে…
একবারের জন্যও ইউভির দিকে তাকাচ্ছে না…
কিন্তু ইউভি—
সে যেন সুযোগ পেলেই রিয়ার ভিউ মিররে তাকাচ্ছে…
এক সেকেন্ডের জন্যও ইনায়াকে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করছে না…
ইনায়ার চোখদুটো কান্নায় ফুলে গেছে…
লালচে হয়ে আছে…
চোখের কোণায় এখনো ভেজা পানি জমে আছে…
নাকটা টুকটুকে লাল হয়ে
গাল দুটো নরম ফোলা ফোলা লাগছে।
কান্নার পর যেমন একটা মেয়ের মুখে ভাঙা সৌন্দর্য ফুটে ওঠে—
ঠিক তেমনই লাগছে তাকে…
চুলগুলো একটু এলোমেলো
কিছু ভেজা চুল কপালে লেগে আছে
কোনো মেকআপ নেই
তবুও—
এমন একটা সৌন্দর্য, যেটা চোখ সরাতে দেয় নাই
উভির হাত স্টিয়ারিংয়ে
কিন্তু মন পুরোটা ইনায়ার দিকে।
মনে মনে সে বলে উঠল—

“Why am I like this…?”
তুই চোখ ফিরিয়ে রাখলে কেন এত খারাপ লাগে আদর?
ইনায়া নিজের ভেতরেই যুদ্ধ করছে
মনে মনে বলছে—
বালের কপাল আমার।
এরপর—
তুবাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে ইউভি ইনায়া আর পিয়াসাকে নিয়ে চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল ইউভি।
যাওয়ার পথে—
ইনায়া বারবার হাঁচি দিচ্ছে…
মনে হচ্ছে ঠান্ডা লেগে গেছে…
সিটে বসে কাঁপছে হালকা করে…
ইউভি অনেকক্ষণ ধরেই বিষয়টা খেয়াল করছে।
এরপর নিজের গায়ের কোটটা খুলে ইনায়ার দিকে বাড়িয়ে দিল।
ইনায়া বলল—
“লাগবে না… বাড়ি তো চলে আসছি… আর মাত্র পাঁচ মিনিট লাগবে যেতে
ইউভি হঠাৎ রেগে চিৎকার করে বলল—
“আমি তোর কাছে জানতে চাইনি ইনায় নিতে বলছি!”
ইনায়া আর কথা বাড়াল না…
চুপচাপ ইউভির দেওয়া কোটটা গায়ে দিয়ে নিল।
ইউভি এবার পিয়াসাকে জিজ্ঞেস করল—
তুই ঠিক আছিস বোনু?
পিয়াসা মাথা নাড়ল বোঝালো সে ঠিক আছে।
ইউভি বিশ মিনিটের রাস্তা দশ মিনিটেই শেষ করে
ফেলল।
কারণ—

তার আদর কষ্ট পাচ্ছে আর এক মূহুর্ত ও দেরি করা যাবে না
এখনই ভেজা কাপড় চেঞ্জ করতে হবে।
বাড়িতে পৌঁছানোর সাথে সাথেই—
ইউভি চিৎকার করে বলল—
দ্রুত চেঞ্জ কর দুজনে।
আর কিছু খেয়ে ওষুধ খেয়ে নে বুঝলি? কানে গেছে কথা? আমি কি বলছি?”
ইউভির চিৎকার শুনে—
বাড়ির সবাই এক এক করে হাজির হয়ে গেল।
বাড়ির তিন কর্তা এখনো ফেরেনি…
এমনকি রেদোয়ানও না।
রিমঝিম এসে বলল—
একি তোরা এইভাবে ভিজেছিস কী করে?
যা আগে চেঞ্জ করে আয় তারপর বাকি কথা শুনবো।
পিয়াসা যাওয়ার আগে বলল—
তুমি চিন্তা করো না ভাইয়া আমি ওষুধ খেয়ে নেবো।
ইনায়া সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে মনে মনে বলল—
“খাবো না ওষুধ… দেখি বালের শেহেজাদা কি করতে পারে… হুম।
এইদিকে নিচে—

রিমঝিম চৌধুরী ইউভিকে বলল—
সকালে আসছিস দেশে, আর এখন বাড়ি ফিরছিস বাহ।
ইউভি হালকা মুচকি হেসে বলল—
পি মনি আমার পৃথিবী তো বাড়ির বাহিরে আমি কী করে বাড়ি এসে থাকি বলো?”
রিমঝিম বলল—
আগে চেঞ্জ করে আয় তারপর কথা বলবো।
রেশমা চৌধুরী আর নুসরাত চৌধুরী নাস্তা রেডি করছিল।
রান্নাঘর থেকে বলল—
তুই চেঞ্জ কর বাবা, আমি তোর কফি পাঠিয়ে দিচ্ছি।
আর পারলে নিচে আয়, তোর সাথে কথা আছে।
ইউভি বলল—
ওকে মা কফি পাঠাতে হবে না আমি নিচে আসছি।
আর তিয়াও আসবে একটু পর, ওর জন্যও খাবার রেডি করো।
তিয়া আসবে

এই কথাটা যেন ইনায়ার মনে ব্যথা আরও দশ গুণ বাড়িয়ে দিল।
ইনায়া রাগে, জেদে ওয়াশরুমে ঢুকে শাওয়ার চালু করে দিল।
ঠান্ডা পানি পুরো শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে…
প্রচণ্ড মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেল…
তবুও সে থামছে না…
একটানা বিশ মিনিট শাওয়ারের নিচে বসে রইল…
হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে…
হঠাৎ পিয়াসার চিৎকার শোনে
“ইনায়া!!”
তারপর ইনায়া কোনো রকমে ড্রেস চেঞ্জ করে বাইরে বের হলো।
পিয়াসা বলল—
“কি রে! সেই কখন থেকে ডাকছি, শুনিস না কেন?
নিচে চল… সবাই ডাকছে বিকালের নাস্তা খাওয়ার জন্য।
আর ওষুধ খাইছিস?
আমি তো একদম ঠিক আছি… তোকে এমন লাগছে কেন বেবি?
চল নিচে চল
ইনায়া বলল—
আমি যাবো না পিহু তুই যা ভালো লাগছে না।
পিয়াসা আবার বলল—
চল না তিয়া আপুও আসছে
বাবা-চাচুরা, রেদোয়ান ভাইয়া— সবাই চলে আসছে তুইও চল।
ইনায়া বলল—
তিয়া আপু আসছে?
পিয়াসা বলল—
হুম
হাসছিস কেন বল তো?
ইনায়া বলল—
না এমনিই তুই যা আমার ভালো লাগছে না।
পিয়াসা আর কিছু বলল না…
নিচে চলে গেল।
সবাই জিজ্ঞেস করল—

নুর মা কই?
পিয়াসা বলল—
ওর ভালো লাগছে না আসবে না
কথাটা শুনে—
একজন যেন বেশ খুশি হলো…
এইদিকে—
কথাটা শুনে ইউভি চিৎকার করে বলল—
কেন বোনু? কী হয়েছে ওর?
শরীর ঠিক আছে তো? জ্বর আছে নাকি?
তুই গায়ে হাত দিয়ে দেখছিস?”
রেশমা চৌধুরী বলল—
আমি দেখে আসছি তুই চিন্তা করিস না।
বৃষ্টিতে ভিজছে তো একটু সমস্যা হতেই পারে। তুই এত চিন্তা করিস না তোর আদরের কিছু হলে আমরা সেবা করে ঠিক করে দিবো, খুশি বাবা?”
রিমঝিম বলল—
দাঁড়াও বড় ভাবি… আমি যাচ্ছি মেয়েটার কাছে। আমার কিছু কথা আছে।
এই বলে রিমঝিম সিঁড়ি দিয়ে ইনায়ার রুমে গেল।
নিচে—
তিয়া মনে মনে বলল—
এই কথা বাড়ির সবাইও জানে বাহ, ভালো তো যত সব ঢং।
ইউভি শুধু আমার…
শুধু আমার, বেবিস।
এইদিকে—

রিমঝিম গিয়ে দেখল, ইনায়া কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে।
রিমঝিম গায়ে হাত দিয়ে বলল—
কি হয়েছে তোর নূর
তার হাতটা যেন গরম কিছুর উপর পড়ল…
সে হালকা চিৎকার করে বলল—
এই নুর তোর শরীরে এত জ্বর
একি কাণ্ড মেয়ের দেখতো
ইনায়া বলল—
ফুপিমনি আমাকে একা থাকতে দাও আমার কিছু ভালো লাগছে না
হঠাৎ ইনায়ার এমন কথায় রিমঝিম চমকে উঠল—
কি হলো মেয়েটার?
শুধু কি শরীর খারাপ, নাকি অন্য কিছু?
রিমঝিম ধীরে বলল—
নুর কি হয়েছে তোর?
তুই কি তোর ফুপিমনিকে বলবি না?
ইনায়া হঠাৎ রিমঝিমকে জড়িয়ে ধরে বলল—
আল্লাহ তায়ালা যদি নিজেই জীবনসঙ্গী নির্ধারণ
করে রাখেন। তাহলে তিনি কেন ভুল মানুষের প্রতি মায়া জরিয়ে দেন যাকে কোনোদিন পাবো না।
বলো না ফুপিমনি।

এই বলে ফুপিয়ে কেদে ওঠে ইনায়া। কথা বেধে বেধে আসছে।
রিমঝিম বলে তুই এখনো রুদ্র কে ভুলতে পারিস নি নূর?
ইনায়া বললো তুমি ও ফুপি তুমি ও আমাকে চিনতে ভুল করলে।
থাক তোমার কিছু বোঝা লাগবে না
কি জন্য এসেছো নাস্তা আমি পরে খাবো এখোন ভালো লাগছে না ফুপি।
আমাকে একা থাকতে দাও সামনে তোমার বিয়ে আমার এখোন অনেক কাজ ফুপি।2
রিমঝিম বলল—
যাবো তো তবে তোকে আগে ওষুধ খাওয়াতে হবে
এই বলে সে নিজ হাতে ইনায়াকে ওষুধ খাইয়ে দিল।
তারপর কাঁথাটা গায়ে দিয়ে আলতো করে শুইয়ে দিল—
মাথায় হাত বুলিয়ে দিল মায়াভরা স্পর্শে
তুই চোখ বন্ধ কর একটু ঘুমা আমি আসছি
ইনায়া কিছু না বলে চোখ বন্ধ করল
কিন্তু চোখের কোণা ভেজাই রইল

নিচে নেমেই রিমঝিমের সামনে পড়ল রাতিব চৌধুরী।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন—
কি হয়েছে নুর মার?
রিমঝিম বলল—
কিছু না ভাইয়া জ্বরটা একটু বেশি ছিল ওষুধ দিয়ে আসছি কমে যাবে ইনশাআল্লাহ।
হঠাৎ—
ইউভি চিৎকার করে উঠল—
এখন ওষুধ দিছো মানে?
আমি কি বলিনিবাড়িতে এসেই ওষুধ খেতে?
বোনু!
পিয়াসা একটু ভয়ে ভয়ে বলল—

আমি তো খাইছি ভাইয়া ইনায়া খায় নাই হয়তো।
এই কথাটা শুনে ইউভির রাগ যেন চরমে উঠল
মনে হচ্ছে পুরো শরীর জ্বলে যাচ্ছে।
সে হঠাৎ রাতিব চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলল—
চাচ্চু তোমার মেয়েকে আমি খুন করে ফেলবো।
ও আমাকে শেষ করে দিচ্ছে চাচ্চু।
ঘরে এক মুহূর্তে নীরবতা নেমে এলো
রাতিব চৌধুরী অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন…
এই ইউভিকে তিনি যেন চিনতেই পারছেন না…
নিজের মনে বললেন—
আমার মেয়ের সামান্য জ্বরের জন্য কেউ এমন পাগল হতে পারে?
তার বুকের ভেতর হালকা শান্তি নেমে এলো—
এই ছেলের হাতে যদি মেয়েকে দেই… তাহলে কোনো চিন্তা থাকবে না…
এইদিকে—

রেদোয়ান চুপচাপ ইউভির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল—
আমার বোনটা সত্যিই অনেক ভাগ্যবতী ভাইয়া
রাতিব চৌধুরী বললেন—
আমি আমাদের পারিবারিক ডাক্তারের সাথে কথা বলছি তুমি শান্ত হও
রবিউল চৌধুরী বললেন—
দাঁড়াও ভাইয়া আমি কল দিচ্ছি
এইদিকে—
তিয়া চুপচাপ সব দেখছে
তার চোখে অবাক ভাব—
সে জানতো ইউভি তার কাজিন ইনায়াকে ভালোবাসে
কিন্তু এতটা গভীর তা সে কল্পনাও করেনি…
ইউভি আবার রিমঝিমের দিকে তাকিয়ে বলল—
শোনো পি… তোমরা যেভাবেই হোক… আমার আদরকে তোমার মেহেন্দির আগেই সুস্থ করে দিবা
নুসরাত চৌধুরী মৃদু হেসে বললেন
আমরা সুস্থ করবো কীভাবে বাবা আল্লাহ না চাইলে নুর সুস্থ হবে না।
ইউভি নিচু গলায় বলল—
তোমরা শুধু একটু সেবা করো বাকিটা আমার আল্লাহ করবে
এইদিকে—
তিয়ার ঠোঁটে এক ফোঁটা অদ্ভুত হাসি ফুটল মনে মনে বলল যা করার এই ইনায়াকে দিয়েই করতে হবে
আগে একে সরাই তারপর ইউভি আমার
তার চোখে এক শয়তানি ভাব

রাত নেমে এসেছে…
বাইরে এখনো হালকা বৃষ্টি পড়ছে…
ঠান্ডা হাওয়ায় বাড়িটা আরও নিরব, শান্ত হয়ে গেছে…
ডাইনিং টেবিলে সবাই একে একে বসেছে—
শুধু ইনায়া ছাড়া…
আজ বৃষ্টির দিনের বিশেষ রান্না—
ভুনা খিচুড়ি
বেগুন ভাজি
ডিম ভাজি
ইলিশ মাছ ভাজা
ইলিশের লেজ ভর্তা
আরও অনেক কিছু
সবাই খাওয়া শুরু করেছে শুধু ইউভি চুপচাপ বসে আছে রেশমা চৌধুরী বললেন তুই খাচ্ছিস না কেন বাবা? রান্না ভালো হয়নি?”
ইউভি ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি এনে বলল—
মা… তোমাদের রান্না কোনোদিন খারাপ হয়?
রেশমা বললেন—
তাহলে খাচ্ছিস না কেন?
ইউভি ধীরে ধীরে বলল—
মা আদরকে কেউ খাইয়ে দিয়ে আসো।
নুসরাত চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—
আমি যাচ্ছি তোমরা খাও
আবার সবাই খাওয়ায় মন দিল…
এইদিকে—

রাতিব চৌধুরী লিখন চৌধুরীর কানে কানে বললেন—
ভাইয়া আমি তো ভাগ্যবান বাবা
আমার মেয়ে আমার বাড়িতেই থাকবে… চোখের সামনে…
আর আমার জামাইও আমার মেয়ের জন্য পাগল।
লিখন চৌধুরী মুচকি হেসে বললেন—
তাই নাকি?
তারপর একটু থেমে বললেন—
তোমার জন্য খারাপ লাগে ভাইয়া
তোমার মেয়েটা তোমাদের থেকে দূরে থাকবে কেমন করে থাকবা?
তার চোখে অন্যরকম একটা দুষ্ট ভাব নিয়ে বললো
দেখে নিস
যদি তোর মেয়ে তোর সামনে থাকে…
তাহলে আমার মেয়েও আমার সামনে থাকবে। কথাটি শুনে হঠাৎ রাতিব চৌধুরী কাশতে শুরু করলেন
সবাই বলল—
“পানি! পানি দাও!”
কি হয়েছে তোমার?
তিনি হাত তুলে বললেন—
“কিছু না আমি ঠিক আছি তোমরা খাও…”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি ভাবলেন—
ছেলেটা একদম বাপের ফটোকপি হয়েছেরাত
তখন এক টা বাজে

চৌধুরী বাড়ির প্রতিটা ঘর গভীর ঘুমে ডুবে গেছে।
শুধু এক ঘর জেগে আছে ইউভির ঘর।
ঘরের ভেতর হালকা ডিম লাইট জ্বলছে।
বাইরের নিস্তব্ধতা ভেঙে শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছে।
ইউভি বিছানায় বসে আছে…
গায়ে একটা সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি আর ঢিলেঢালা কালো টাওজার পরা
চোখে ঘুম নেই।
বারবার শুধু ইনায়ার কথা মাথায় ঘুরছে।
মনে মনে সে বলছে—
“ঘুম আসছে না কেন… এই মেয়েটা এমন কেন আমার মাথা দখল করে রেখেছে…
কিছু তেই অন্য চিন্তা মাথাই আসছে না।

হঠাৎ ইউভির মনে খটকা লাগল।
সে ধীরে উঠে দাঁড়াল…
কিছু না ভেবেই ইনায়ার রুমের দিকে হাঁটা দিল।
পা ফেলছে একদম নিঃশব্দে…
যেন পুরো বাড়িটাকে না জাগিয়ে শুধু নিজের অস্থিরতাকে নিয়ে যাচ্ছে।

ইনায়ার রুমে গিয়ে দরজা আস্তে করে খুলল সে…
ভেতরে অন্ধকার… শুধু জানালা দিয়ে আসা হালকা আলো ঘর টাকে আলোকিত করে রাখছে।
বিছানার দিকে তাকাতেই ইউভি থেমে গেল…
ইনায়া কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে কাছে গিয়ে ইনায়ার হাত টা ধরে দেখে অস্বাভাবিক গরম লাগছে।

ইউভি দ্রুত এগিয়ে গেল।
ইনায়ার কপালে হাত রাখল—
গরম লাগছে
গাল ছুঁয়ে দেখল—
আরও গরম লাগছে
গলায় হাত দিল—
শরীর কাঁপছে জ্বরে।
ইউভির মুখ শক্ত হয়ে গেল এক মুহূর্তে।
নিচু গলায় বলল—
“এত জ্বর… আর কেউ আজ আদর এর সাথে থাকলো না
সে আর দেরি করল না।
দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে একটা তোয়ালে ভিজিয়ে আনল।
ফিরে এসে ইনায়ার কপালে রাখল।
আস্তে আস্তে মুখ, হাত, গলা—সব জায়গা মুছিয়ে দিল…
যেন জ্বরটা একটু হলেও কমে।
ইনায়া ঘুমের ভেতর একটু নড়ে উঠল…

কিন্তু চোখ খুলল না।
ইউভি এবার ধীরে ধীরে বলল—
ইডিয়ট এত অবহেলা করিস কেন নিজেকে
তার গলা ভারী হয়ে এলো…
সে আবার তোয়ালেটা ভিজিয়ে আনল…
বারবার মাথায় পানি দিচ্ছে… কপাল ঠান্ডা করার চেষ্টা করছে।
ইনায়ার চুলগুলো পুরো এলোমেলো হয়ে গেছে…
লম্বা চুল মুখে এসে পড়ছে।
ইউভি থেমে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ…
তারপর নিজের ফোন খুলে ইউটিউবে সার্চ দিল
“how to braid hair”

একটু হাস্যকরভাবে মনোযোগ দিয়ে ভিডিও দেখল সে…
তারপর খুব সাবধানে ইনায়ার চুল হাত দিয়ে ঠিক করতে লাগল…
আস্তে আস্তে একটা বিনুনি করে দিল…
হাত বারবার থেমে যাচ্ছে…
কখনো ঠিক হচ্ছে না…
তবুও সে ছাড়ছে না।
সব শেষ করে ইউভি বিছানার পাশে মেঝেতে বসে পড়ল…
এক হাত বিছানার ওপর, মাথা সেই হাতের ওপর ভর দিয়ে…
আর চোখ একদম ইনায়ার মুখে স্থির।
ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত শান্ত নীরবতা…
শুধু ইউভির নিচু গলায় একটা গান ভেসে এলো…
“কত দিন ভেবেছি শুধু দেখবো যে তোমায়……..
ক্লান্তিহীন তুমি ছিলে আমার কল্পনায়
তার চোখে তখন কোনো রাগ নেই
ইনায়া আধোঘুমে আবার কেঁপে উঠল
ঠোঁট শুকিয়ে গিয়ে খুব আস্তে বলল—

“পা…নি…”
তার গলাটা এত দুর্বল যে শব্দটা বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছিল।
ইউভি সঙ্গে সঙ্গে পাশের টেবিলের দিকে তাকাল।
ওখানে রাখা ছিল এক গ্লাস পানি।
সে দ্রুত উঠে গিয়ে গ্লাসটা তুলে আনল…
হাতে নিতে নিতে একবার ইনায়ার দিকে তাকাল।
ইনায়া তখন পাশ ফিরিয়ে শুয়ে আছে…
চোখ খোলা নেই… জ্বরের ঘোরে কাঁপছে শুধু।
ইউভি ধীরে এসে বিছানার পাশে বসল…
ইনায়াকে কে ডাকল না ইউভি
শুধু আলতো করে গ্লাসটা এগিয়ে দিল ঠোঁটের কাছে।
ইনায়া ধীরে ধীরে পানি খেল…
কিছুটা গিলতেই আবার দুর্বল হয়ে শুয়ে পড়ল।
তার চোখ এখনো বন্ধ…
সে বুঝতেই পারল না কে তাকে পানি খাওয়াল।
ইউভি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল
তার চোখ ইনায়ার মুখে স্থির হয়ে আছে
এই চেহারাটা দেখে তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে যাচ্ছে।

মনে মনে সে বলল। তুই আমার সবটা দখল করে আছিস আদর এই শেহেজাদ ইউভি চৌধুরী কে পাগোল করেই ছারলি তুই জানিস কাল কতো বড় একটা মিটিং আছে আমার কিন্তু আমার মন ই বসছে না কাজে।
কিচ্ছু ভালো লাগছে না আমার। মোন চাচ্ছে তোকে এই রুম থেকে আমার রুমে নিয়ে যাই শুধু তোকে দেখতে মন চাচ্ছে আমার।
ইনায়ার মুখটা জ্বরে আরও সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে…
গাল দুটো হালকা লাল হয়ে গেছে নাকটা একটু টুকটুকে লাল লাগছে
ছৌট চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে লেগে আছে…
শ্বাসটা ধীরে ধীরে উঠানামা করছে…
একটা ভঙ্গুর কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর শান্তি তার মুখে।
ইউভি আর কিছু না বলে আস্তে করে কাঁথাটা ঠিক করে দিল…
তারপর খুব নিচু গলায় বলল—
“ঘুমা… আমি আছি…”
এই কথাটা বলেই সে চুপ করে বসে রইল…

ইনায়ার দিকে তাকিয়ে, একদম নীরবে…ইনায়া পানি খাওয়ার পর আবার ধীরে ধীরে ঘুমের ঘোরে ঢলে পড়ল…
তার শ্বাসটা একটু ভারী, শরীরটা এখনো জ্বরে কাঁপছে হালকা করে।
ইউভি কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল…
তার চোখে এখন আর কোনো অস্থিরতা নেই শুধু গভীর এক মায়া।
সে খুব আস্তে বিছানার পাশে বসে ইনায়ার কপালে হাত রাখল…
জ্বরটা এখনো আছে, কিন্তু একটু আগের চেয়ে কম তীব্র লাগছে।
ইউভি ধীরে ধীরে আঙুল চালিয়ে ইনায়ার কপাল থেকে চুল সরিয়ে দিল…
তারপর খুব আলতো করে মাথায় হাত বুলাতে শুরু করল।
যেন তার স্পর্শে জ্বরটা একটু হলেও কমে যায়।
ইনায়ার মুখটা এখন আরও শান্ত লাগছে…
কপালের ভাঁজটা একটু খুলে গেছে…
চোখ বন্ধ অবস্থাতেই তার মুখে একটা ভাঙা নিরীহতা
যেটা ইউভিকে থামিয়ে রাখে বারবার।
ইউভি নিচু গলায় বলল—

শেহেজাদার আদর পর্ব ১২

“এমন করে ভেঙে পড়িস না আদর তোকে অনেক শক্ত হতে হবে আমাকে সোজ্জ করার মতো খমোতা তোকে অর্জন করতে হবে। আমাকে সামলাতে হবে,পারবি তো?
না পারলে ও সমস্যা নাই একটু একটু করে শিখিয়ে নিবো।
শেহেজাদ ইউভি চৌধুরী নিরামিষ নয় আমিষে ভরপুর।
তারপর আবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল…
একদম ধীরে, যত্ন নিয়ে
ঘরের ভেতর শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছে
আর ইউভির নিঃশব্দ ভালোবাসার ছোঁয়া…
যা ইনায়ার ঘুমের ভেতরেও এক অদ্ভুত শান্তি এনে দিচ্ছে

শেহেজাদার আদর পর্ব ১৪