বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৩
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
মিথি সে তখন থেকে কাজ করছে। নিজের আনা মাছ, মাংস কাঁটা, ধোয়ার পর রান্নাঘরের এই সেই কাজ করতে করতেই দেখা মিলল হিমেলের। মিষ্টিকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দরজার এককোণে হেলান দিয়ে।দৃষ্টি মিথির দিকেই নিবদ্ধ। এতোটা সময় খালা থাকার কারণে আসেনি। এইমাত্র খালা চলে যেতেই দরজা বন্ধ করেই প্রথম রান্না ঘরে এসেছে সে। চোখাচোখি হতেই হিমেল পা এগোল। দৃষ্টি না সরিয়েই একেবারে মিথির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে চাইল মিথির ক্লান্ত, ঘামে ভেজা মুখটার দিকে। তারপর একটু ঝুঁকেই তর্জনী আঙ্গুল ছুঁইয়ে দিয়ে কপালে ঘামে লেপ্টে থাকা চুল কানের কাছে গুঁজে দিয়ে বলল,
“ মিথিফুল, তুই না বললেও আমরা সংসার করছি। বেশ গুঁছিয়েই সংসার করছি। ”
মিথিফুল? এই শব্দটা মিথি বহুবার শুনেছে। বহুবার। তবে আজ প্রথমবার এই সম্বোধন পেয়েছে সে সরাসরি হিমেলের থেকে। মিথি না চাইতেও শরীর যেন এক অদ্ভুত অনুভূতিতে স্পন্দিত হলো। টের পেল না অনুভূতিটা লজ্জা, অস্বস্তি নাকি ধরে পড়ে যাওয়ায় ভয়। নজর সরাল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। হিমেল তাকাল। মনে মনেই বিড়বিড় করে বলল,
“ অথচ এই সংসারটা আরো বেটার হতে পারত। পৃথিবীর বুকে ভালোবাসা না পাওয়ার এক যুবকের যন্ত্রনা প্রাপ্তিতে মিটে যেতে পারত। বুকের মধ্যে অদ্ভুত লক শান্তি নিয়ে সেও ভাবতে পারত তার ভালোবাসার মানুষটাও তাকে ভালোবাসে। তবুও, যা পেয়েছি, যেটুকু পেয়েছি সেটুকু ও তো আমার কাছে অনেক। এই যে সে আছে আমার সাথে এইটুকুই তো বহু।”
এইটুকু ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মিথির দিকে চেয়ে বলল,
“ রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। অনেক কাজ করে ফেলেছিস। এখন ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে ঘুম দে। ”
মিথি ঘুরল এবারে। ছোটশ্বাস ফেলে বলল,
“ আপনি চাইলে আজ সাবিহা আপুকে বলতে পারেন হিমেল ভাই। হিয়া, আয়মান ভাই, ফিজা আপু সবাই আসছে। সাবিহা আপুর ও তো আপনার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো। বলুন
আসতে। ”
হিমেল চাইল। মিথির চোখমুখ কেমন যেন দেখাল। বোধহয় ভেবে বসে আছে সাবিহার সাথে হিমেলের সম্পর্কটা খুব খুবই ভালো। হিমেল চাইল। জানাল,
“ সাবিহাকে বলা আছে। ”
বলা আছে? অথচ মিথি জানে না? বলেও নি অবশ্য হিমেল। বোধহয় আজকাল গুরুত্বের খাতায় মিথির পাল্লাটা হালকা হচ্ছে। এইটুকু ভেবেই উত্তরের বিপরীতে মিথি হাসল ঠিক তবে হাসিটা প্রাণবন্ত নয়।জোর করে দেওয়া হাসি৷ মুখে বলল,
“ খুব ভালো করেছেন। আমি বলব বলব করে ভুলে গিয়েছিলাম। ”
হিমেল ওভাবেই দাঁড়িয়ে ছিল মিষ্টিকে নিয়ে। মিথির মুখের ভাব বুঝতে দেরি হয়নি তার।হুট করেই বলল,
“ সাবিহার সাথে আমায় মানতে কষ্ট হয় তোর, তাই না? ভালো টালো বেসে ফেলছিস কি? ”
মিথি হকচকাল। দ্রুতই বলার চেষ্টা করল,
“ না, নাহ। মানতে কষ্ট হবে কেন? তবে শুনুন…
এইটুকু বলেই থামল মিথি। হিমেল ভ্রু কুঁচকাল শুধু তাকিয়ে। মিথি ওভাবে তাকিয়েই বলল,
“ সাবিহা আপুর সাথে আপনার কিছু থেকে থাকলে আমি অখুশি হবো না। বরং খুশিই হবো। খুবব! আপনি জিতবেন অবশ্যই। এবং আপনার আর সাবিহা আপুর মাঝখানে যদি আমি বাঁধা হয়ে দাঁড়াই শুধু একবার বলবেন। আমি এক সেকেন্ডেই সরে দাঁড়াব। আপনি যেমন চান আমি সুখী থাকি, আমিও চাই আপনি সুখী থাকুন। যে কোন মূল্যেই। ”
হিমেল সবগুলো কথাই শুনল চুপ। মিথির চোখজোড়ার দৃষ্টিতে কিছু একটা অবশ্যই দেখাচ্ছে। চেহারার মলিনতা, মিথ্যে হাসি এবং চোখজোড়ার নিষ্প্রভ চাহনি কি প্রমাণ করছে? মিথিফুলের খারাপ লাগে তাকে সাবিহার সাথে দেখলে? অথচ প্রকাশ করল উল্টোটাই। অবশ্য, মিথি যে ধরণের মেয়ে প্রকাশ যে করবে না তা হিমেলের থেকে ভালো জানবে। হিমেল চোখ বুঝল। মুখচোখ গম্ভীর রেখেই শুধু এইটুকুই বলল,
“ সাবিহার সাথে আজ থেকে কথা বলব না। আমি চরিত্রহীন নই মিথি। আর নাহ তো নিজের বিয়ে করা স্ত্রীকে কষ্ট দিতে চাওয়া পুরুষমানুষ।শুন, সাবিহাকে বিয়ে করলে তো কত আগেই করতে পারতাম মিথি। করিনি। কারণ চেয়েছিলাম তো জীবনে তোকেই।”
এইটুকু বলেই থামল হিমেল। কিছুটা ঝুঁকে চোখের দৃষ্টি রাখল একদম মিথির দৃষ্টিতেই। খুব অল্প দূরত্বই। নাক ছুঁইছুঁই যেন। হিমেল সে দৃষ্টিতে দৃষ্টি ফেলেই বলল,
“ আমাকে নিয়ে ইনসিকিউরড ফিল করার প্রয়োজন নেই মিথি। হিমেল পুরোটাই তোর। জীবনের শুরু থেকে শেষ অব্দি তোরই থাকবে। যদি তুই এই হিমেলকে গ্রহণ করে নিস তো, তাহলে এই হিমেল তোর জন্য ভালো স্বামীর পাশাপাশি ভালো প্রেমিকও হয়ে যাবে।”
এইটুকু বলেই পিছু ঘুরল হিমেল। মিষ্টি ততক্ষনে ফ্যালফ্যাল করে তাকানো। অন্যদিকে মিথির চোখজোড়া টলমলে। কি আশ্চর্য! কান্না পাচ্ছে তার? কেন পাচ্ছে? সে কি সত্যিই হিমেল ভাই এর সাথে সাবিহা আপুকে মানতে পারছে না? আসলেই তো পারছে না। আসলেই তো কেমন যেন এক বোবা কষ্ট অনুভব হচ্ছে, দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসছে। মিথি নিজের টলমলে চোখ লুকানোর খুব চেষ্টা করেই ঘুরে দাঁড়াল। হিমেল শুধু তখন গম্ভীর স্বরে বলল,
“ মিথি, তুই আমার জীবনে হুট করে এক দমকা হাওয়ার মতো আসা রঙিন বসন্ত নয়। বহুদিন, বহুকাল, বহু অপেক্ষার পরের এক টুকুরো বসন্তের প্রহর। দীর্ঘদিন অনুভূতি বয়ে গিয়ে আমার কাছে সে অনুভূতিটা ধরা দিল বিষাদ হিসেবে। একটা শান্ত,সিক্ত গভীর অনুভূতি বসন্ত থেকে তীব্র বিষাদে পরিণত হয়ে গেল এক মুহুর্তেই। আমি কিছুই করতে পারলাম না। শুধু বিষাদটুকু বুকের গহীনে বয়ে গিয়ে নিশ্চুপে জেনেছি, ভালোবাসলে কতোটা যন্ত্রনা পোহাতে হয়। উপরওয়ালা বোধহয় আমার সে যন্ত্রনা দেখে একটু হলেও মায়া করেছেন। তাই তো দুই দুটো মিথিফুলকে হুট করেই দিয়ে দিলেন। যে না পাওয়ার যন্ত্রনা এতদিন বইলাম, সে না পাওয়া সুখটুকু পেয়েও হারিয়ে ফেলার মতো বোকামো আমি কখনোই করব না। কাজেই এটা মাথা থেকে বের করে দে যে, আমি সত্যিই কখনো তোর থেকে আলাদা হতে চাইব।”
মিথি শুনল।কথা গুলো শুনেই মাথা ঘুরিয়ে তাকাল হিমেলের দিকে। হিমেলও তখন মাথা ঘুরিয়ে চাইল। শান্ত স্বরে বলে গেল,
“ সব মিলিয়ে আমার জীবনে বিষাদ ও বসন্ত হয়ে আসার জন্য ধন্যবাদ ঘাড়ত্যাড়া মিথিয়া। আপনি আমার জীবনে যেমন বসন্ত ঠিক তেমনই বিষাদও। আমি দুটোকেই খুব যত্ন করে লালন করতর পারি। ”
এইটুকু বলেই মিষ্টির দিকে চাইল হিমেল। বলল,
“ মিষ্টি, আপনার আম্মুকে বলে দিন রেস্ট নিতে। বহু কাজকর্ম করে ফেলেছে। ”
তখন সন্ধ্যা। কিছুটা সময় আগে একবার আয়মান এসেছিল। এইসেই বলে হিমেল সহ বেরিয়েছে। মিথি একাই রান্নার বিষয়টা সামলাচ্ছিল। মিষ্টিকে পাশেই খেলতে দিয়েছে। এর মধ্যেই কলিং বেল এর আওয়াজ হলো। দরজা খুলতেই দেখা গেল হিমেলকে শুধু। মিথি পিছনে তাকাল আয়মান এসেছে ভেবে। বলল,
” আয়মান ভাই আসেনি? ”
“ না। ”
মিথি আর উত্তর করেনি। হিমেল বাসায় ডুকতেই দরজা অফ করে ফের রান্নাঘরর এল। তারপর এইসেই কাজ করতে করতেই হিমেল এল
পেছন থেকে শুধাল,
” তুই একা পারবি রান্না করতে?কি হেল্প করব? ”
“ পারব একা করতে। ”
হিমেল কপাল কুঁচকায়। বলল,
তুই যে সব পারিস এটা নতুন কথা নয়। এখন বল কি করব? ”
“ তেমন কিছু নেই। আপনারা সাজানোর দায়িত্বটাই নেন। রান্নাটা তো বেশি মানুষের জন্য নয়। পেরে যাব। হিয়াও এসে যাবে একটু পর। ”
হিমেল তবুও সরল না যতক্ষন আয়মান আর হিয়া এসেছে। যখন ওরা এল তখনই সরল মিষ্টিকে নিয়ে। রান্নাঘরে হিয়া আর মিথিই সামলাচ্ছে। এর মাঝে হিমেল দুইবার এসেছে এটা ওটা জিজ্ঞেস করতে। হিয়া দেখে শুধু হাসল। হিমেল চলে যেতেই মিথিকে জড়িয়ে ধরে উচ্ছাসিত স্বরে বলল,
“ দোস্ত, আমি ঠিক তোর এমন একটা সংসারই চেয়েছিলাম। একদম এমননন! হিমেল ভাই পার্ফেক্ট তোর জন্য। মেনে নে বেচারাকে। ”
মিথি ছোটশ্বাস ফেলে। উত্তর দিল,
“ নিলাম। ”
“ সত্যি? ”
মিথি এড়িয়ে গেল এবারে। বলল,
“ জানা নেই, তোর কি অবস্থা বল? ভালো আছিস? ”
“ না। আমি বোধহয় ভালো নেই দোস্ত। আজকাল মনের মধ্যে প্রেম প্রেম অনুভূতি ভেসে বেড়াচ্ছে।কি মুশকিল বল তো। ”
হিয়া বেশ বুদ্ধিমতী মেয়ে। যথেষ্ট সুন্দর ব্যাক্তিত্বও তার আছের।অথচ এই মেয়েটাই প্রেমে পড়ে এখন চঞ্চল গলায় শোনাচ্ছে যে প্রেম অনুভূতি কাজ করছে। মিথি হাসল। বলল,
“ আগে থেকেই ছিল, শুধু ভাসেনি।”
“ কিভাবে জানিস? ”
“ জানি। ”
হিয়া ফের উচ্ছাস নিয়ে বলল,
“দীপ্র এক সপ্তাহ পরে ফিরবে মিথি। আমি অনেকদিন যাবৎ ই অনুভূতি নিয়ে বসে আছি। প্রকাশ করার সাহস পাচ্ছি না। ”
“ প্রকাশ কর, দীপ্র খুশি হবে। ”
হিয়া চকচকে চোখে চেয়ে বলল,
“ দীপ্র আমায় ভালোবাসে এটা তুই শিওর কি মিথি?যদি পরে আমায় রিজেক্ট করে? ”
“ করবে না, ভালোবাসে তোকে। ”
“ কিন্তু..”
মিথি এবার আশ্বস্ত করে বলল,
“ দীপ্র তোকেই ভালোবাসে হিয়া। ও দেশে থাকাকালীন যতদিন দেখেছি আমার এটাই মনে হয়েছে। মিথ্যে হবে না অবশ্যই। ”
“জানি না। কিন্তু যদি দেখি ওটা শুধুই বন্ধুত্ব ছিল? ভালোবাসা না? তখন তো কষ্ট পাব মিথি। আমি রিজেক্ট হইনি কখনো কিছুতে। ”
মিথি আবারও বলল,
“হবি না। এবারও হবি না। তোদের জুটিটা খুব সুন্দর হবে, দেখে নিস। ”
ফিজার জন্মদিনের আয়োজন সত্যিই খুব সুন্দর হলো। হিয়া, আয়মান, ফিজা আর সাবিহা এসেছে। সঙ্গে এসেছে হিমেল আর আয়মানের ভার্সিটির ফ্রেন্ড নওশাদও। যে সাবিহার হবু বর। এবং ওদের ইনভাইট ও আয়মান নিজেই করেছিল যেহেতু মাবিহার সাথেও ওর ভালো যোগাযোগ ছিল। হিমেলকে জানিয়েছিল অবশ্য। আয়মান শুধু ফিজাকেই দেখে বারবার চোখ ঘুরিয়ে। মেয়েটাকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে লাল টকটকে শাড়িতে। শাড়িটা আয়মানই দিয়েছে
বলেছে পরে আসতে। এবংঅবশেষে মেয়েটা যখন শাড়ি পরে এল তখন আর নজর সরাতেই পারল না আয়মান। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে।
জন্মদিনের উইশ, কেক কাঁটার পর্যায় শেষ হতেই ফিজা ভাবল এখানেই শেষ বুঝি। অথচ আয়মান তার দিকে পা বাড়াল ধীরক্রমেই তখনো। একদম সামনে এসে দাঁড়িয়েই থেমে গেল। আয়মান বহুকাল যাবৎ ভালোবাসে ফিজাকে। দুইজনের প্রেমের সম্পর্ক অল্প কয়েকদিনের নয়। তবুও প্রিয়তমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিবে ভাবতেই তার আনন্দ হচ্ছে। খুশি লাগছে। চোখমুখ চকচক করে উঠছে। আয়মান বার কয়েক শ্বাস ফেলল। তারপর পা বাড়িয়েই ফিজার সামনে গিয়ে ঝুঁকল। নজর ফেলল ফিজার অন্যমনস্ক মুখটায়। তখনও মিথির দিকে চেয়ে কি যেন বলছিল ফিজা। আয়মান ঠিক তখনই কানের কাছে শান্ত, গম্ভীর স্বরে বলল,
“ উইল ইয়্যু ম্যারি মি ম্যাম? ”
আকস্মিক কন্ঠ এবং কথায় ফিজা হকচকাল। আয়মান যে এতোটা কাছে এসেছে তাও বুঝে উঠেনি। বিস্ময় নিয়ে চাইতেই আয়মান ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“ ইয়েস অর নো? ”
ফিজার বোধহয় খুশিতে চোখ টলমল করল। নিজের মানুষকে নিজের করে পাওয়ার জন্য কতগুলো দিন অপেক্ষা করেছে সে। অবশেষে! ফিজা চোখ বুঝেে।টলমল করা চোখজোড়া না দেখাতেই বোধহয়চোখ বুঝেছিল কিন্তু তা হলো না। অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। শুধু বিড়বিড় করে বলে গেল,
” ইয়েস ইয়েস ইয়েস! ”
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫২
কিছুটা দূরেই সে দৃশ্য সাবিহা বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখে যাচ্ছিল। এই পৃৃথিবীতে সত্যিই সে মানুষগুলো ভাগ্যবান যারা নিজেদের ভালোবাসার মানুষগুলোকে নিজের করে পায়। কয়জনেরই বা ভাগ্য এতোটা ভালো? ইশশ!সাবিহার নিজের ভাগ্যটাও যদি এমন হতো? কি ক্ষতি হতো? বিধাতা কেন ভুলমানুষের প্রতি তার অনুভূতি তৈরি করে দিল? কেন? যাকে পাবেই না তার প্রতি অনুভূতি না জন্মালেই কি হতো না?
