বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৪
অলকানন্দা ঐন্দ্রি
হিয়া সকাল থেকেই বেশ অস্থিরতা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। আজ দীপ্র দেশে ফিরবে। এক দৃঢ় ব্যাক্তিত্বের অধিকারী মেয়েটিও একটা ছেলের জন্য অস্থির হয়ে অপেক্ষা করছে। খুশিতে কিছুক্ষন পরপরই উচ্ছ্বাসিত হচ্ছিল চোখমুখ। হিয়া বেশ সেজেছে আজ। চোখে কাজল, কানে ফুল, এমনকি চুল গুলোও খোলা রেখেছে। পড়নে একটা নীল রাঙা শাড়ি। অথচ এই সাজ কেন সেজেছে হিয়া নিজেই জানে না। আগে থেকে সাজার প্ল্যানও ছিল না, আবার অবচেতন মন কোথাও না কোথাও বোধহয় চাইছিল যে দীপ্র নামক পুরুষটি তার প্রতি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকুক। মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকুক। তাইতো সেজেছে সময় নিয়ে। হিয়া আয়নায় দেখছিল নিজেকে। সুন্দর দেখাচ্ছে। দীপ্রর চোখে মুগ্ধতা ছড়ানোর মতো তো অবশ্যই। মনে মনে বেশ খুশিও হলো। অথচ সে খুশি বেশিটা সময় টিকল না যখন ঘন্টা কয়েক পর সে দীপ্রর সামনে হাজির হলো। দীপ্রদের বাসার দরজায় উঁকিঝুকি দিয়ে ভেতরে পৌঁছাতেই দীপ্রর সাথে দেখা গেল আরো এক সুন্দরী তরুণীকেও। পরণে লং শার্ট, ব্ল্যাক জিন্স। দেখেই বুঝা যাচ্ছিল ফরেইনার। হিয়া তাকিয়ে দেখল। একইভাবে দেখল দীপ্রকেও। আগের থেকে বহুগুণে সুদর্শন হয়েছে ছেলেটা। স্বাস্থ্য কমেছে, শরীর শক্ত করেছে পেশাদার নায়কদের মতো। লম্বায় তার থেকেও অনেকটা লম্বা। হিয়া ছোটশ্বাস ফেলল। এগিয়ে নিজ থেকেই কথা বলল,
“ দীপ্রর বাচ্চা, তুই তো শুকিয়ে শুটকি হয়ে গেলি। ”
দীপ্র মুহুর্তেই ঘাড় ফেরাল। কন্ঠস্বরটা সে চেনে বলেই জানে মেয়েটা কে হতে পারে। পরক্ষণে তাকিয়েই বলল,
“ তুই? বিনা দাওয়াতে হাজির? ”
হিয়া এগোল। বলল,
“ কি আশ্চর্য! বিনা দাওয়াতে কেন হবে? খালা বলেছেনই আমায় আসতে। ”
“ তাই বলে চলে আসবি এভাবে? এমনভাবে সেজে এসেছিস যেন আমার বিয়ে। ”
হিয়ার মুখটা এবার গম্ভীর হলো। ও ভেবেছিল দীপ্র আগের মতোই আছে। আগে যেভাবে তাকাত এখনও বোধহয় তাকাবে। অথচ দীপ্রর তো হিয়ার এই সাধারণ সাজটা বিরক্তিকরই লাগল বোধহয়। ছোটশ্বাস ফেলল সে। বলল,
“ তুই না চাইলে, চলে যাচ্ছি দীপ্র। আমায় দেখে খুশি হসনি বুঝতেই পারলাম।”
দীপ্র হাসল মৃদু। হিয়ার দিকে চেয়ে হুট করেই হেসেই একটা ফু দিল হিয়ার মুখের উপরে। বলল,
“ শুটকি হয়ে আমায় সুন্দর দেখাচ্ছে কি? মেয়েদের পছন্দমতো হয়েছি না এবার? ”
হিয়া ভ্রু কুঁচকাল। বলল,
“ না, এমন ছেলেরা হাজারটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক রাখে। বিশ্বাস করা যায় না। ”
“ বিশ্বাস অর্জন নতুন করে করতে হবে না। সে আমায় বিশ্বাস করে এমনিতেই।”
হিয়ার অবচেতন মন কোথাও না কোথাও ধরে নিল বোধহয় তার কথাই বলেছে দীপ্র। তাই তো ভ্রু কুঁচকে সঙ্গে সঙ্গেই জানতে চাইল,
” কে সে রমণী? ”
দীপ্র হাসল মৃদু। বলল,
“ আছে কেউ একজন। আমাদের বাসাতেই আছে এখন। ”
বোকা হিয়া এবারও ভাবল বোধহয় তার কথাই। সে ও দীপ্রদের বাসাতেই আছে। কপাল কুঁচকে রেখে জানাল,
“ যে পুরুষ সরাসরি তার ভালোবাসার কথা বলতে তাকে কি বলে জানিস দীপ্র? ভেড়া। তুই হলি সে ভেড়া জাতির পুরুষ। ”
এইটুকু মুখ ভেঙ্গিয়ে বলেই পা বাড়াল হিয়া। সবার সাথে কথা বলে দীপ্রর মায়ের সাথে কথা বলল। কথা বলতে বলতে এক পর্যায়ে সেই লং শার্ট পড়া মেয়েটি কে জিজ্ঞেস করতেই উনি বললেন,
“ মেয়েটি দীপ্রর কাজিন হয় হিয়া। ওরা ছোট থেকেই ওখানে। তুমি জানো না? দীপ্র বলেনি? ”
“ নাহ তো। বলেনি তো আন্টি। ”
দীপ্ররর মা খুব অবাক হয়ে বলল,
“ কি আশ্চর্য! নিজের ফিয়ন্সের কথা নিজের কাছের বন্ধুকেই বলেনি? ”
“ হু? ফিয়ন্সে মানে? ”
“ দীপ্রর সাথে তো ওর বিয়ের কথাবার্তা ঠিক হয়েছে মাসখানেক হলো। তোমায় বোধহয় জানাতে ভুলে গিয়েছে। ”
হিয়ার যেন শুনতে ভুল হলো। আবার দীপ্রর মা মিথ্যে বলার বা মজা করার মানুষ ও নন। হিয়া দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাল। তারপরই শুকনো ঢোক গিলল।কেন জানি এইটা সত্য ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে কেমন। দ্বিগুণ অস্থিরতা কাজ করছে। তবুও উপরে উপরে হেসে বলল,
“ সত্যিই? বাহ! আমাকে তো বলেনি তোমার ছেলে। শুনে খুশি হলাম খুব।তোমার ছেলেকে জিজ্ঞেস করে আসি বরং। ”
এইটুকু বলেই বের হলো হিয়া। কান্না পাচ্ছে কেমন মেয়েটার। কতোটা আশা, স্বপ্ন বুনেছিল এতদিন। প্রকাশ করবে বলে উচ্ছ্বাসও ছিল আকাশছোঁয়া। কিন্তু কি হলো? হিয়া সত্যিই কেঁদে ফেলল একাকী দীপ্রদের বাসার একটা রুমে। কাঁদতে কাঁদতে শুধু নিরবে এইটুকুই ভাবছিল যে দীপ্রর এই বন্ধুত্বটাকে সে ভালোবাসা হিসেবে না দেখলেও পারত। কেন দেখেছিল? কেন?
হিয়া চোখের পানি মুঁছে নিল। তবুও চোখ কিছুটা ভেজা দেখাল যেন। হিয়া আরো ভালোভাবে চোখ মুঁছে যখন পা বের করল তখনই কেউ বলল,
“ কি আশ্চর্য! তুই কাঁদছিলি? ”
হিয়া হকচকাল। দীপ্রই প্রশ্ন করেছে। কিন্তু কিভাবে জানল? বলল,
” হু? নাহ তো। কাঁদব কেন আমি? ”
“ চোখের কাজল একটু আগেও পরিপাটি ছিল। এখন লেপ্টে আছে। ”
“ ঘেমে গিয়েছি রান্নাঘরে গিয়ে তাই। দীপ্র? তুই বিয়ে করছিস জানালি না কেন আমায়? আমি বেশি খেয়ে ফেলব তোর বিয়েতে এসে? ”
দীপ্র ভ্রু কুঁচকায়। বলল,
“ তোর ঐটুকু পেটে আর কতটুকুই বা খাবার যাবে। ”
হিয়া কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
“তাহলে বললি না কেন? ”
“বললে কি খুব খুশি হতি? ”
“ অবশ্যই হতাম। তুই আমার খুব কাছের বন্ধু। খুশি হতাম না কেন হুহ? তুই কিন্তু এখনো তোর বউ এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিলি না দীপ্র। ”
দীপ্র হাসে মৃদু। বলে,
“ দিব, দিব। আমারই তো বউ হবে। চলে তো যাচ্ছে না কোথাও। তাছাড়াও তোকে আমার বিশ্বাস নেই হিয়া। কি না কি বলে বিয়ে ভেঙ্গে দিবি আমার। ”
হিয়া মুখ ভেঙ্গাল। বলল,
“আমি এতোটাও খারাপ না দীপ্র। ”
হিয়া দীপ্র বা দীপ্রর পরিবারের সামনে এতক্ষন হাসিখুশি ভাব বজায় রেখে গেলেও যে মাত্র ওদের বাসা ছেড়ে বের হলো তখনই সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে সে এসব ভেবে কেঁদে ফেলল। কেমন ছটফট ছটফট লাগছে যেন মেয়েটার।হৃদয় ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে গেল যেন। ইচ্ছে হচ্ছে অনেক কাঁদুক। অনেক! যতোটা কাঁদলে হৃদয় হালকা হয়। অসহায় হিয়া রিক্সার জন্য অনেকটা সময় দাঁড়াতে দাঁড়াতেই কেঁদেকেটে মুখ ভাসাল।দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে পরমুহুর্তে কল দিল মিথিকে। ওপাশ থেকেই কল তুলতেই কান্নারত স্বরে নিজের দুঃখটা উগড়ে দিল সঙ্গে সঙ্গেই,
” মিথি? মিথি? দীপ্র আমাকে ভালোবাসে না মিথি। আমাকে নয়। ওসব ভুল ছিল মিথি। আমি, আমি মরিচীকায় ডুবে ভালোবেসে ফেললাম ওকে মিথি। বন্ধুত্বকে ভালোবাসা ভেবে ফেলেছি। কি বোকামো করে ফেলেছি মিথি। কি বোকামো করে ফেললাম। ”
ওপাশ থেকে উত্তর এল,
“ শান্ত হো হিয়া। কাঁদছিস কেন? কি হয়েছে বল? আমায় বল না। ”
হিয়া বন্ধুর আহ্লাদী এই স্বর পেয়ে আরো কেঁদে উঠল। কাঁদতে কাঁদতেই অসহায়ের মতো বলল,
“ দীপ্র অন্য কাউকে ভালোবাসে মিথি। মেয়েটার সাথে ওর বিয়ে ফাইনাল। ওর কাজিন হয়। ও ও খুব খুশি মেয়েটার সাথে। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মিথি। বুকের ভেতর যন্ত্রনা হচ্ছে আমার। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে মিথি। ”
আয়মান আর ফিজার বিয়েটা পারিবারিক ভাবে কথা হয়েছে। আজ আয়মানের বিয়ের শপিং করতেই বের হয়েছিল। সাথে অবশ্য হিমেল আর মিথিকেও নিয়ে গেল। দীর্ঘ সাড়ে তিন ঘন্টা যাবৎ এই মার্কেট থেকে ঐ মার্কেট, এই দোকান থেকে ঐ দোকান ঘুরে ঘুরে শপিং করেছে অনেককিছুই। তবুও অনেক বাকি। এদিকে মিথি এতোটা সময় হেঁটে হাঁটতে পারছিল না। নতুন জুতা কিনেছিল দুদিন আগেই। জুতা গুলো পরেই এসেছিল আজ। অথচ এগুলা পরার কারণেই বোধহয় পায়ে ফোসকা পড়ে গিয়েছে৷ হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে যেন। আর এই বিষয়টা হিমেল খেয়াল করেছিল। অবশেষে না পেরে আযমানকে বলেউ ফেলল,
“ উফফ আয়মান, আর কত শপিং করবি? কালও করতে পারবি। আমি দরকার হলে ছুটি নিব যা। ”
“আর অল্প দোস্ত। এই একঘন্টা লাগবে হয়তো। ”
হিমেল কপাল কুঁচকে বলল,
“ একঘন্টা কম? আমি আর হাঁটতে পারছি না। তোরা কর তোদের বিয়ের কেনাকাঁটা? ”
মিথি শুনল। পিছন থেকে শুধাল,
“ হিমেল ভাই, এমন করছেন কেন? একটা সুন্দর কাপল তাদের বিয়ের শপিং তাদের মনমতো করবে না?”
একেই বোধহয় যার জন্য করে চুরি সে বলে চোর। হিমেল তাকিয়ে বলল,
“ করবে। কিন্তু তুই বাসায় চলে যা। পায়ে ব্যাথা নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা হাঁটতে হবে না। ”
আয়মান শোনামাত্রই বলল
“ সেকি, কি হয়েছে মিথি? পায়ে সত্যিই ব্যাথা? তাহলে বরং থাক আজ শপিং। ”
“না, না। শেষ করুন শপিং ভাইয়া। আমার পায়ে ব্যাথা না৷ ”
হিমেল দাঁতে দঁাত চাপল। বিড়বিগ করে মিথির কানের কাছে বলল,
“ আমি দেখতে পারছি তা, তুই এখানে বসে থাক মিথি। আমরা কেনাকাঁটা শেষ করে তোকে নিয়ে যাব। ”
“আমি হাঁটতে পারব হিমেল ভাই। আপনি শুধুশুধু বকবক করছেন। ”
“ আমি শুধুশুধু বকবক করলেও তোকে এখন হাঁটতে দিব না মিথি। হয় সোজা বাসায় যাবি, নয়তো এখানে বসে থাকবি৷ আর যদি একান্তই ওদের সাথে ঘুরর ঘুরর শপিং এ সাহায্য করতে মন চায় তো কোলে করে নিয়ে যেতে পারি। রাজি? ”
মিথি মুহুর্তেই বলল,
না।
“ তাহলে এভাবেই থাক। ”
“ এইটুকু কোন সমস্যাই নয় হিমেল ভাই।এটা নিয়ে এমন করার আছে? ’
“ অনেককিছু আছে। বসতে বলেছি বসে থাকবি। ”
এইটুকু বলেই হিমেল, ফিজা আর আয়মান চলে গেল মিথিকে বসিয়ে। ঠিক একটু পরই হিমেল ছুটে এল। মিথির সামনেই হাঁটু গেড়ে বসে গিয়ে হাত দিতে লাগল মিথির পায়ে। মিথি সঙ্গে সঙ্গেই পা সরিয়ে নিয়ে বলল,
”একি! পায়ে হাত দিচ্ছেন কেন হিমেল ভাই?”
“ মন চাইছে তাই। ”
বিষাদ ও বসন্ত পর্ব ৫৩
“ পাব্লিক প্লেসে এভাবে পায়ে হাত দেওয়াটা আমার কাছে অদ্ভুত লাগছে হিমেল ভাই। ”
হিমেল শুনল। অতঃপর মিথির পাটা টেনে ধরে দেখল কোথাও আঘাত।পকেট থেকে একটা ওয়ানটাইম ব্যান্ডেজ নিয়ে তা সযত্নে লাগাল ওভাবেই। তারপরই উঠে দাঁড়াল। মিথির দিকে ঝুঁকে বলল,
“ পাব্লিক প্লেসে অদ্ভুত লাগার মতো কিছুই করিনি আমি। না তো জড়িয়ে ধরেছি, না তো চুম্বন। ”
