Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৬

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৬

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৬
ইশরাত জাহান জেরিন

রোজার মাঝামাঝি সময়। নিরুর পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র অনেক আগেই প্রস্তুত ছিল, তবুও ইতালিতে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কারণ তখনও এখানকার পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
ফারাজ বহুবার লতামণিকে অনুরোধ করেছিল,
“এলাহী বাড়িটা তো ফাঁকাই পড়ে আছে, আপনি সেখানে গিয়ে থাকুন না।” কিন্তু লতামণি রাজি হননি। তার জীবনে আর তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। এই ক’টা দিন পরই তো খোদার ডাকে সাড়া দিতে হবে। যতদিন বেঁচে আছেন, এখানেই থাকতে চান তিনি। নিজের সন্তানরাও তাকে অনেক আগেই ছেড়ে গেছে। জীবনের প্রতিকূল সময়ে ফারাজের মায়ের আশ্রমেই তিনি আশ্রয় পেয়েছিলেন, তাই এই জায়গাটিকেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের জন্য বেছে নিয়েছেন। এরই মধ্যে এলাহী বাড়ির কিছু কাজ, নতুন কর্মী নিয়োগ এবং পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায় ফারাজের। আগে মাছের ব্যবসার হিসাব-নিকাশ দেখাশোনা করত রাজন ও রোশানরা। তাদের চলে যাওয়ার পর ব্যবসাটা কার্যত বন্ধই হয়ে ছিল। সেদিন বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চিত্রা ফারাজকে বলেছিল,
“মার্জিয়া মামির সংসারটা ঠিকমতো চলে না। সোহাগ যখনই কোথাও কাজ পায়, ছুটে যায়। মাহাদী ভাই এত ঋণ করে গেছেন যে সেগুলো শোধ করতেই তাদের অবস্থা নাজেহাল। আপনি যদি সোহাগকে একটা ভালো কাজ জোগাড় করে দিতেন…”

ফারাজ তখন শুধু বলেছিল, “দেখা যাবে।” কিন্তু সেই মুহূর্ত থেকেই সে ভেবে রেখেছিল মাছের ব্যবসার দায়িত্ব যদি সোহাগকে দেওয়া যায়, তাহলে মন্দ হবে না। হিসাব-নিকাশে সে দক্ষ, আগে নিজের বাবার ব্যবসাও সামলিয়েছে। মেধাবী, ভদ্র এবং দায়িত্বশীল ছেলেটা। যদিও প্রথমদিকে ফারাজকে কম বিরক্ত করেনি।
এই ক’দিন নিজের ব্যস্ততার মাঝেও ফারাজ সবচেয়ে বেশি সময় দিয়েছে চিত্রাঙ্গনাকেই। তার চিত্রাকে। কতকাল রোজ এসেছে ইতালি থেকে। এখন ঝামেলা নেই। ফারাজ নিজের সকল খারাপ কাজ লিগ্যাল ভাবেই ছেড়ে দিয়েছে। ফারাজের পাপ করার জন্য বৈধ লাইসেন্স আছে। তবে বউ সবার আগে। সংসার সবার আগে। যেই হাত দিয়ে মানুষ খুন করে আসবে সেই হাত দিয়ে নিজের সন্তানকে স্পর্শ করবে কেমন করে? ভালোর জন্য হাতে পিস্তল তুলে নেওয়া আর খারাপের জন্য কারো কপালে সেই পিস্তল ঠেকানোর মধ্যে ভালোই তফাৎ আছে।

আজ আবার চিত্রার বান্ধবী মরিয়ম এসেছিল। তারা আবার নিজেদের বাড়িতে ফিরে এসেছে। রাজন, সোহান, জোহানদের ভয়ে তাদের ফারাজই আড়াল করে রেখেছিল। মরিয়মের জন্য নয়, বরং চিত্রার জন্যই সে এই দায়িত্ব নিয়েছিল । কারণ চিত্রা তখন একের পর এক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল তখন কোনোভাবেই সে চায়নি, বন্ধু হারানোর মতো নতুন কোনো কষ্ট তার জীবনে যোগ হোক। মরিয়ম সারাদিন থেকে কিছুক্ষণ আগেই চলে গেছে। ফারাজ ড্রাইভারকে বলে দিয়েছে, তাকে যেন নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। কাল সে ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। সব কাজ গুছিয়ে এখন যেন একটু স্বস্তি অনুভব করছে সে। চিত্রা তখন পুরোনো কিছু বই ব্যাগে ঢুকাচ্ছে। এসব মোহনার বই। মেয়েটা বইয়ের ভক্ত ছিল। তার থেকেই ওই একটু একটু করে বই পড়া শিখেছে চিত্রা। ফারাজ ফোনে তখন ফ্রি ফায়ার খেলতে ব্যস্ত। হঠাৎ রুমের দরজায় নক হলো।দরজায় নকটা দ্বিতীয়বার পড়ার আগেই চিত্রা বলে, “আসো।” দরজা ধীরে খুলে ভেতরে ঢুকল নদী। তার হাত শক্ত করে ধরা ছোট্ট নুড়ির আঙুল।
চিত্রা বই গুছানো থামিয়ে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে দেখে নিয়ে নরম স্বরে বলল, “তাহলে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন? এখানে থাকলে হয় না?”

নদী একটু এগিয়ে এলো। নুড়িকে পাশে বসিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর ধীরে ভাবে বলল, “রাজন বেঁচে থাকতে বাপের বাড়ি একটা মুহূর্তের জন্য যাইনি। কতগুলো বছর হয়েছে। পরিবারের কণ্ঠ শুনিনি, দেখিনি। এবার… বাকিটা জীবন নিজের মতো করে মেয়েকে নিয়ে বাঁচতে চাই।”
“নিজের মতো করে বাঁচতে চান? এতদিন পরে মনে হলো?” নদী তাকাল তার দিকে। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একরেখা হাসি ফুটল। “কিছু কিছু সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগে, চিত্রা। দেরি হলেও… এবার ঠিকটাই নিতে চাই।”
এই সময় পর্যন্ত চুপচাপ ফোনে গেম খেলতে থাকা ফারাজ বিরক্ত মুখে ফোনটা পাশে রেখে উঠে বসল। চোখ তুলে নদীর দিকে তাকিয়ে ঠোঁটকাটা ভঙ্গিতে বলল, “ঠিকটাই? নাকি সহজটা? এখানে থাকতে হলে দায় নিতে হবে, সম্পর্কের নামে আশ্রয় পাওয়া যাবে এসব ভাবছেন না তো?”
চিত্রা তৎক্ষণাৎ চোখ রাঙালো। “ এই বাড়ি তো এমনিতেই মৃত। আপনিও যদি চলে যান। তার ওপর এত কাঁচা সত্য দেখিয়ে?”

ফারাজ কাঁধ ঝাঁকাল, “সত্য কাঁচা না, মানুষই হজম করতে পারে না।”
চিত্রা এবার নদীর দিকে তাকাল, “আপনি গেলে… কষ্ট হবে, জানেন তো? তবে…” একটু থেমে মৃদু হাসল, “সবাই তো নিজের জায়গা খুঁজে নিতে চায়।” নদী নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। “এই জায়গাটা আমার কাছে আশ্রয় ছিল, চিত্রা। কিন্তু… ঘর না।”
নুড়ি এদিকে চুপচাপ চিত্রার দিকে তাকিয়ে ছিল। চিত্রা তার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে নরম গলায় বলল,
“আমাকে ভুলে যাবে না তো?”
নুড়ি মাথা নেড়ে বলল, “না।”
ফারাজ আবার কথা বলল, “যান, যদি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। কিন্তু একটা কথা মনে রাখবেন ফিরে আসার দরজা বন্ধ থাকবে না। এটা আপনার বাড়ি, নূড়ির বাড়ি। তবে আপনার মনের উপরে কিছু নয়৷ এতদিন অনেক কষ্টে জীবন কাটিয়েছেন। আপনি এখন খোলা আকাশের মত মুক্ত পাখি। তবে আপনি আমার কাছে বোনের মতো ছিলেন আর থাকবেনও। আর নুড়ি তো আমাদেরই রক্ত। যোগাযোগ রাখবেন, আর কি কি প্রয়োজন হয় আমাকে জানাবেন। ভুলে যাবেন না এই বাড়িতেও কিছু মানুষ আছে যারা আপনার নিজের লোক। ইতালি চলে যাব এর মানে এই নয় মন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি।”

নদীর চোখ ছলছল করে উঠল। বারান্দার বাইরের আলোটা তখন নরম হয়ে এসেছে। রোদের শেষ সোনালি রেখাগুলো যেন দেয়ালের গায়ে গা ঘেঁষে বিদায় নিচ্ছে। “চিত্রা… তুমি রাগ করেছো?”
চিত্রা মাথা নাড়ল ধীরে। তার চোখে একরাশ ক্লান্ত মায়া। “রাগ না… অভিমানও না। শুধু… অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম।”
নদী মৃদু হেসে ফেলল, “মানুষ তো অভ্যাসেই বেঁচে থাকে, তাই না? আমি এতদিন ভুল অভ্যাসে বেঁচেছি। এবার একটু নিজের মতো করে চেষ্টা করব।”
চিত্রা এগিয়ে এলো। হাত বাড়িয়ে নদীর আঙুল ছুঁয়ে বল, “নিজের মতো করে বাঁচতে চান এইটা শুনতেও ভালো লাগছে। কিন্তু ভয়ও লাগে…এই দুনিয়ায় একা বাঁচা সম্ভব নয়। যদি আবার কেউ আপনার সেই ‘নিজের মতো’টাকে কেড়ে নেয়?”
নদী এবার চোখ তুলে সরাসরি তাকাল তার দিকে। “এবার আর কেউ পারবে না। কারণ এবার আমি কারো জন্য বাঁচবো না… শুধু নিজের আর ওর জন্য।”
সে নুড়ির মাথায় হাত রাখল। “ছোটবেলায় কাপড় কাটতাম, জানো? বাবার দোকানে বসে বসে নতুন ডিজাইন বানাতাম। মনে হতো… একদিন আমার নিজের একটা দোকান হবে। মেয়েরা আসবে, আমি তাদের শিখাবো… নিজের পায়ে দাঁড়াতে।”

চিত্রা মন দিয়ে শুনছে। “আপনি পারবেন ভাবী। আপনার মনে যে শক্তি আছে… সেটার কথা আপনি নিজেও পুরোটা জানেন না।”
ফারাজ এসময় ধীরে উঠে দাঁড়াল। সে এগিয়ে এসে নুড়ির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। “এই যে, ছোট্ট মানুষ… আমাকে মনে থাকবে?”
নুড়ি একটু লজ্জা পেয়ে চিত্রার দিকে তাকাল, তারপর মাথা নেড়ে বলল, “থাকবে।” এখন নুড়িটা বেশ ভালোই কথা বলতে শিখেছে। ফারাজ হেসে তাকে কোলে তুলে নিল। “তুমি বড় হয়ে কী হবে মা?”
নুড়ি একটু ভেবে বলল, “মা’র মতো…”
ফারাজের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অন্যরকম একটা আলো জ্বলে উঠল, ভালো। তবে নিজের জন্য বাঁচবে, বুঝেছো? কারো ছায়া হয়ে না… নিজের আলো হয়ে। আর মায়ের খেয়াল রাখবে। মায়ের ঋণ শোধ করা যায় না।” চিত্রা চুপচাপ তাকিয়ে দেখছে।
নদী ধীরে বলল, “চিত্রা, যদি কোনোদিন… খুব কষ্টে পড়ি….”
চিত্রা তার কথা শেষ করতে দিল না। এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল তাকে। “তখন ফোন করবেন। না পারলে… চলে আসবেন। এই বাড়ির দরজা কখনো বন্ধ হবে না আপনার জন্য।”
ফারাজ পাশে দাঁড়িয়ে বলল, “শুধু দরজা না, মানুষও থাকবে।”
নদী কিছু বলতে পারল না। চোখের কোণ ভিজে উঠেছে। সে দ্রুত মুখ ঘুরিয়ে নিল। নুড়িকে ফারাজের কোলে থেকে নামিয়ে নিল সে। ছোট্ট হাতটা শক্ত করে ধরল। “চল মা… আমাদের এবার যেতে হবে।”
“বাকিদের সাথে দেখা করেছেন?”
“হ্যাঁ।”
নুড়ি একবার চিত্রার দিকে তাকাল, তারপর ছোট্ট করে হাত নাড়ল, “আসি।”
চিত্রা জোর করে হাসল,“আসো… ভালো থাকবে।”

আঙিনাটা হঠাৎ করেই ফাঁকা হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে মানুষের কোলাহল, কান্নার শব্দ, বিদায়ের ভারে ভারী হয়ে থাকা বাতাস ছিল সেখানে। অথচ এখন শুধু স্তব্ধতা। গাড়িটার শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতেই মনে হলো, বাড়ির একটা অংশও সঙ্গে করে নিয়ে গেল নদী। রুমানা আঁচল দিয়ে চোখ মুছছিল বারবার। “মানুষটা কত কষ্ট পেয়ে গেল রে… আল্লাহ ভালো রাখুক ওরে।” নিরুও চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু চোখের কোণে জমে থাকা জল আর লুকানো যাচ্ছিল না। “এই বাড়িটা আর কোনোদিন আগের মতো হবে না।।” চিত্রা কিছু বলল না। শুধু শেষবারের মতো ফটকের দিকে তাকিয়ে ছিল। যেদিক দিয়ে নদী আর নুড়ি চলে গেল। রুমে ঢুকেই বিছানার কোণায় চুপচাপ বসে পড়ল সে। চারপাশে সবকিছু একই আছে তবুও সবকিছু কেমন বদলে গেছে। বুকের ভেতরটা হালকা টান দিচ্ছে, অদ্ভুত এক শূন্যতা জাগছে। ফারাজ দরজা বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তারপর ধীরে এগিয়ে এসে পাশে বসে পড়ল। “এভাবে বসে থাকলে হবে?”
চিত্রা মাথা তুলল না। “খারাপ লাগছে…”
ফারাজ নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর একটু নরম গলায় বলল, “খারাপ লাগবে, এটাই স্বাভাবিক। যার যাওয়ার… তাকে তো যেতেই হয়, চিত্রা।”
চিত্রা এবার তাকাল তার দিকে। “সবাই চলে যায় কেন?”
ফারাজ এক মুহূর্ত থামল। প্রশ্নটা যেন খুব গভীরে গিয়ে লাগল। তারপর ধীরে বলল, “সবাই যায় না… কেউ কেউ শুধু নিজের জায়গায় ফিরে যায়।”
চিত্রা কিছু বলল না। ফারাজ এবার তার হাতটা নিজের হাতে নিল। “নদী ভাবীর কোনো অসুবিধা হবে না। আমি সব ব্যবস্থা করে দিয়েছি। জায়গা, কাজ… লোকজন সব ঠিক আছে। সে একা না।” একটু থেমে আবার বলল, “আর তোমার সাথে তো রোজ কথা বলবে। ফোন আছে, মানুষ আছে… সম্পর্ক তো এখানেই শেষ না।” চিত্রার চোখ আবার ভিজে উঠল। ফারাজ হালকা ঝুঁকে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। “তুমি এমন করে ভেঙে পড়লে… আমার ভালো লাগে না।”

চিত্রা ফিসফিস করে বলল, “আমি শক্ত থাকার চেষ্টা করছি…”
ফারাজ একটু হেসে ফেলল। “চেষ্টা না, তোমাকে থাকতে হবে। কারণ…” সে আলতো করে তার পেটের উপর হাত রাখল। “তুমি এখন একা না।”
চিত্রা থমকে গেল। ফারাজ তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি মা হতে চলেছো… এই সময় মন খারাপ করে বসে থাকা বুঝি মানায়?”
চিত্রার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“আমি… পারব তো?”
ফারাজ একটুও দেরি করল না, “তুমি পারবে না এটা কোনো অপশনই না। কারণ তুমি চিত্রাঙ্গনা। তুমি যতটা ভাবো… তার চেয়েও অনেক বেশি শক্ত।”
চিত্রা ধীরে তার কাঁধে মাথা রাখল। দু’জনের মধ্যে আর কোনো কথা হলো না।

আজকের সকালটা শুরু হলো এক অদ্ভুত ভার নিয়ে।
সূর্যের আলো উঠেছে ঠিকই, কিন্তু সেই আলোয় কোনো উষ্ণতা নেই। এলাহী বাড়ির বিশাল আঙিনা আজ আরও বড়, আরও নির্জন মনে হচ্ছে। রুমানা বারান্দায় বসে চুপচাপ তসবিহ ঘুরাচ্ছিলেন, কিন্তু ঠোঁট নড়ছিল না। জমেলা রান্নাঘরে গিয়েও ঠিকমতো কাজ ধরতে পারছিল না। বারবার হাত থেমে যাচ্ছিল। নিরু স্যুটকেস গুছাতে গুছাতে হঠাৎ থেমে যাচ্ছে যেন প্রতিটা কাপড় ভাঁজ করার সাথে সাথে স্মৃতিও ভাঁজ করে রাখতে হচ্ছে। “এত বড় বাড়িটা… একদম ফাঁকা হয়ে যাবে,” নিরু নিচু গলায় বলল। আয়েশা তখন তার পাশেই ছিল।
“বাড়ি কখনো ফাঁকা হয় না, মানুষের স্মৃতি থাকলে দেয়ালও কথা বলে।” কথাটা বললেও তার নিজের চোখের কোণ ভিজে উঠল। ড্রয়িংরুমের এক কোণে বসে ছিলেন জুনায়েদ এলাহী। সামনে তাকিয়ে আছেন, কিন্তু দৃষ্টি যেন অনেক দূরে কোথাও আটকে আছে। রুমানা রুম থেকে বেড়িয়ে তার পাশে এসে বসলেন। নিরু শেষবার কাপড় গুলোতে হাত বুলিয়ে নিচে নেমে তাদের সাথে এসে বসল। বলল, “চলুন না আমাদের সাথে…এই বাড়িতে একা থাকবেন কিভাবে? এত কিছু… এত স্মৃতি…” জুনায়েদ ধীরে মাথা নাড়লেন। “এই স্মৃতিগুলো থেকেই তো পালিয়ে বেড়াচ্ছি এতদিন। এবার… এখানেই থাকতে চাই। পালিয়ে নয়… মুখোমুখি হয়ে।”
রুমানা চুপ করে ছিল। তারপর আস্তে বল, “আমরা যদি না থাকি… এই বাড়িটা একেবারে মরে যাবে।”
নিরু আর কিছু বলতে পারেনি। সকাল গড়াতেই ফটকের সামনে একটা অটো রিকশা এসে থামল। মার্জিয়া আর সোহাগ নেমে এলো। চিত্রা তখন অন্দরমহলেই ছিল। তাকে দেখতে পেয়ে সে এগিয়ে যেতেই মার্জিয়া চিত্রাকে বুকে টেনে নিলো। “না এসে পারলাম না,” সে ধীরে বলল।
সোহাগ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। “আপনি না এলে… খারাপ লাগত।”
মার্জিয়া মৃদু হেসে বললেন, “তোমরা চলে যাবে… না দেখা করে থাকি কেমন করে?”
ফারাজ তখন সোফায় বসে আছে। সে উঠে দাঁড়াল। সোহাগের দিকে তাকিয়ে একটু এগিয়ে এলো। “এসেছো, ভালো করেছো।”

সোহাগ মাথা তুলে তাকাল। চিত্রা একপাশে দাঁড়িয়ে সবার দিকে তাকাচ্ছে। এই মানুষগুলো, কারো সাথে রক্তের সম্পর্ক নেই। তবুও এরা সবাই তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। সে ধীরে ফারাজের পাশে এসে দাঁড়াল। “সবকিছু এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে… না?”
ফারাজ একপলক তাকাল তার দিকে। “বদলানোই স্বাভাবিক।”
চিত্রা মৃদু হেসে বলল, “কিন্তু অভ্যস্ত হওয়াটা কঠিন।”
ফারাজ তার দিকে একটু ঝুঁকে নরম স্বরে বলল, “তুমি অভ্যস্ত হয়ে যাবে। কারণ তোমার সামনে এখন শুধু অতীত না… ভবিষ্যৎও আছে।” চিত্রা কিছু বলল না। শুধু তার হাতটা চেপে ধরল।

সূর্য এখন মাথার ওপর, অথচ এলাহী বাড়ির আঙিনায় শীতল নিস্তব্ধতা জমে আছে। বড় বড় স্যুটকেসগুলো গাড়ির পাশে সাজানো। ড্রাইভার বারবার ঘড়ি দেখছে, তবুও কেউ যেন “চলো” শব্দটা উচ্চারণ করতে পারছে না। সবাই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। রোজ দাঁড়িয়ে অভ্রের সাথে কথা বলছে কি নিয়ে। চয়ন কায়সার আর জমেলা আয়েশার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। নিরু ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে রুমানা বেগমকে জড়িয়ে ধরলেন। কণ্ঠ কেঁপে উঠল, “নিজের খেয়াল রাখবা বড়আম্মা…”
রুমানা হাসার চেষ্টা করলেন, কিন্তু সেটা ভেঙে গেল চোখের জলে, “তুমিও ভালো থেকো মা… আল্লাহ ভরসা।”
জুনায়েদ এলাহী একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ফারাজ এগিয়ে এসে তার সামনে থামল। দু’জনের চোখে চোখ পড়ল। নিঃশব্দে অনেক কথা আদান-প্রদান হয়ে গেল।
“চাচা…” ফারাজ নরম স্বরে বলল।
জুনায়েদ তার কাঁধে হাত রাখলেন। “যা করেছো… ঠিক করেছো। এবার নিজের মতো করে বাঁচো।”
ফারাজ হালকা মাথা নাড়ল, “আপনাদের রেখে যাচ্ছি… খেয়াল রাখবেন।”
“আমরা থাকবো। এই বাড়ির যতটা ভয়ানক অতীত আছে… ততটাই আমাদের দায়িত্বও আছে।” ওপাশে মার্জিয়া আর চিত্রা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে।
মার্জিয়ার কান্না থামছেই না। “তুই গেলে… কার কাছে আসবো রে?”
চিত্রার চোখেও জল, কিন্তু সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করছে, “আমি তো হারিয়ে যাচ্ছি না, মামি… ফোন আছে, কথা হবে…”
“ফোনে কি মানুষ পাওয়া যায়?” মার্জিয়ার কণ্ঠ ভেঙে গেল। চিত্রা এবার শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরল। “যখন খুব দরকার হবে… চলে আসবো। কথা দিচ্ছি।”
মার্জিয়া মাথা নাড়তে পারল না, শুধু কাঁদতে লাগল।
সোহাগ একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। মুখ শক্ত করে রেখেছে, যেন কিছুই অনুভব করছে না। ফারাজ তার কাছে এগিয়ে এলো। “সব ঠিক আছে?”
সোহাগ হালকা হাসল, “জি, সব ঠিক।”
“দায়িত্ব নিতে পারবে তো?”

“পারবো। আপনি চিন্তা করবেন না।” চিত্রা সোহাগের সাথে কথা বলেছিল। যাওয়ার আগে শেষবারের মতো একটা অনুরোধ করে বলেছিল এখন যেহেতু এইবাড়ি, ব্যবসার দায়িত্ব তোমাকে দেওয়া হয়েছে তুমি এখানে মামিকে দিয়ে এলেই তো পারো। প্লিজ না করবে না।” সোহাগ বেশ কিছুক্ষণ তা নিয়ে ভেবে শেষে রাজি হলো। তার চিত্রা তার কাছে কিছু চেয়েছে। সে না করবে কি করে মুখের ওপর? চিত্রাকে নিজের করার ক্ষমতা তো নেই, অন্তত এইটুকু ইচ্ছে তো পূরণ করাই যায়।
ফারাজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে। বুঝতে পারল, এই ‘ঠিক আছি’ কথাটার ভেতরে কতটা চেপে রাখা কষ্ট আছে। “কোনো সমস্যা হলে… একা সামলাতে যেও না।”
সোহাগ মাথা নাড়ল। “জানি।” তার চোখ একবার চিত্রার দিকে গেল। তারপর আবার সরিয়ে নিল। কিছু অনুভূতি আছে, যেগুলো প্রকাশ না করাই ভালো। নিরু এসে রুমানাকে আবার জড়িয়ে ধরল। “শেষবারের মতো বলছি… আমাদের সাথে চলো।”
রুমানা মৃদু হেসে মাথা নাড়লেন, “আমার জায়গা এখানেই।”
সবশেষে চিত্রা এগিয়ে এলো। তারপর ধীরে রুমানার হাত ধরল। “আমাকে ভুলে যাবেন না তো?”
রুমানা তার মাথায় হাত রাখলেন, “তোমায় ভোলা যায় নাকি? অনেক ক্ষতি করছি তোমার৷ পারলে আমারে মাফ কইরা দিও।”

চিত্রা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। “এভাবে বলবেন না।”
ফারাজ পাশে এসে দাঁড়াল। “সময় হয়ে গেছে।” এক এক করে সবাই গাড়িতে উঠতে শুরু করল। মার্জিয়া আবার কেঁদে উঠল, “আল্লাহ তোমাগো ভালো রাখুক… সুখে রাখুক…” সোহাগ তার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ নিচু, ঠোঁট শক্ত করে চেপে রাখা। কিন্তু বুকের ভেতরের টানটা স্পষ্ট। গাড়ির দরজা বন্ধ হলো। ইঞ্জিন স্টার্ট নিল।
চিত্রা জানালার পাশে বসেছে। চোখে জল, তবুও তাকিয়ে আছে। রুমানা আর জুনায়েদ দাঁড়িয়ে আছেন ফটকের সামনে। মার্জিয়া কাঁদতে কাঁদতে হাত নাড়ছে।
সোহাগ শুধু দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল। এলাহী বাড়িটা পেছনে পড়ে রইল।
একটা অধ্যায় শেষ হলো……. আরেকটা শুরু। মানুষের জীবনটাই এমন। একটা শুরু করতে গেলে অন্যটাকে শেষ করতে হয়। জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না। কারো মৃত্যু তাদের কর্মফল, কারো বা বেঁচে থাকা। এইযে রোশান, মোহনা তারা তো নিজেকে পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিল, নিজেদের আরেকবার সুযোগ দিলেও খোদা তাদের সুযোগ দেয়নি। কিংবা খোদা হয়তো চায়নি তার বান্দা আর কোনো খারাপে লিপ্ত হোক, তাই খারাপ কিছু হওয়ার আগেই নিজের কাছে নিয়ে গেছেন। সোহাগ তো এই একতরফা ভালোবাসাকেই নিজের সঙ্গী করে নিয়েছে, নদী নিজের জীবনকে আরেকটা সুযোগ দিয়েছে। আর সোহান? সে তো নিজের পাপে নিজেই ধ্বংস হয়ে গেছে। পাপ কাউকেই ছাড়ে না। কোনো না কোনোভাবে সে ভয়ানক শাস্তি হয়ে ফিরে আসেই………

সিসিলির পালের্মোর আভিজাত্যে মোড়া প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে ফারাজ এলাহীর রাজকীয় এই আবাসটি। যার নাম ইনফার্নো। ইতালির সাত শহরে ফারাজের বাড়ি থাকলেও কেন জানি তার এই সিসিলিতে অবস্থিত বাড়িটার প্রতি বিশেষ মায়া কাজ করে। চিত্রাকে তিন আগে, সেই সাল ২০২৩ এ যখন ফারাজ ইতালি এনেছিল সঙ্গে করে। তখন ৭ টা বাড়িই ঘুরে দেখিয়েছিল সে তাকে। রোমের বাড়িটা দেখালো, মিলানের বাড়িটা দেখলো আরও কতগুলো। রোমিও জুলিয়েটের শহরে তো ফারাজ তার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে চিত্রার জন্য মার্বেল পাথরের একখানা বাড়িও তৈরি করেছে। বাড়ির নাম চিত্ররাজ। তবে চিত্রার মন ঘুরে ফিরে সিসিলিকেই বেছে নিলো। কারণ সিসিলি ভূমধ্যসাগরের বুকে ভেসে থাকা এক নীল-সবুজ স্বপ্ন। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, সমুদ্রের বুক চিরে উঠে আসা এক প্রাচীন কোনো কবিতার পাতা, যেখানে আলো আর ছায়া যুগপৎভাবে লিখে চলেছে তাদের প্রণয় উপাখ্যান।
ফারাজের মাস্টারবেডরুমের বারান্দায় দাঁড়ালে সমুদ্র দেখা যায়। ওই নীল সবুজ বিস্তর জলরাশী। আজকের দিনের এই ফারাজ এলাহী একসময় ইতালির আন্ডারওয়ার্ল্ডে নিজের নাম প্রতিষ্ঠা করেছিল ভয়ানক একজন স্মাগলার হিসেবে। তার সেই ছায়া আজও বাড়ির প্রতিটি ইটে, প্রতিটি করিডরে লেগে আছে। প্রবেশদ্বার থেকেই শুরু হয় তার এই বাড়ির কঠোরতা। বিশাল ইলেকট্রনিক গেট দুই স্তরের এই বাড়িতে। বাইরের গেট পেরোলেও ভেতরে আরেকটি সিকিউরিটি চেকপয়েন্ট আছে। প্রতিটি গাড়ি স্ক্যান হয়, প্রতিটি আগন্তুকের পরিচয় যাচাই করা হয় বহু ধাপে।

বুলেটপ্রুফ কাচের গার্ড বুথ, ইনফ্রারেড সেন্সর, রাতের অন্ধকারে মোশন ডিটেক্টর কি নেই এখানে? ভিতরে ঢুকলেই ড্রাইভওয়ে। মসৃণ পাথরের তৈরি, গাঢ় ধূসর রঙের দেখতে। দু’পাশে নিখুঁতভাবে ছাঁটা লন, বিরল প্রজাতির গাছ, আর শিল্পকর্মের মতো সাজানো সব ভাস্কর্য। মাঝখানে বহুস্তর একটা ফোয়ারা। দিনে ঝকঝক করে আর রাত হলে আলোকসজ্জায় যেন অন্য এক জগৎ হয়ে যায়। মূল ভবনে প্রবেশ করলেই গ্র্যান্ড ফোয়ার। সাদা-কালো মার্বেলের ফ্লোর, ওপরে বিশাল ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি, যার আলো পড়ে চকচক করে পুরো হলজুড়ে। দেয়ালে দামি সব পেইন্টিং। ইউরোপীয় শিল্পীদের কাজ সব, আর কিছু অজানা আছে অর্থবহ চিত্র, যেগুলো ফারাজ নিজে বেছে এনেছিল। ডানদিকে বিশাল লিভিং এরিয়া। নরম লেদারের সোফা। একেবারে বিলাসবহুল। এই বাড়িতে ফারাজের একটা পার্সোনাল সিনেমা হল আছে। হলে গিয়ে ভীড় ঠেলে সিনেমা দেখার অভ্যাস নেই তার। তাই নিজের বাড়িতেই নিজের জন্য পার্সোনাল হল তৈরি করেছে সে। বাড়ির হলটি একেবারে ভেতরের দিকে। ওটার সাউন্ডপ্রুফ দেয়াল, নরম রিক্লাইনিং সিট, দেয়ালজুড়ে ডার্ক অ্যাকোস্টিক প্যানেলে সাজানো। বড় স্ক্রিন, প্রজেক্টর। বাইরে থেকে কোনো শব্দ ঢোকে না, ভেতরের কোনো শব্দ বের হয় না। তাছাড়া একটা বিরাট লাইব্রেরিও আছে।

পুরো একটি ফ্লোর জুড়ে। উঁচু বুকশেলফ ছাদ ছুঁয়েছে। এখানে শুধু বই নয়। ফাইল, নথি সহ যাবতীয় জিনিস আছে। এক কোণে ভারী একটা ডেস্ক। ফারাজের ব্যক্তিগত কাজের জিনিস আছে। লাইব্রেরিতে আসলে সেখানেই বসে ফারাজ। তাছাড়া এই বাড়ির মধ্যে লিফট আছে। মানুষ উঠার জন্য আলাদা আর গাড়ির জন্য আলাদা। ফারাজ গাড়ির কালেকশনের দিক থেকে বেশ শৌখিন। ফারাজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস গোসল করা। বাড়িতে সুইমিং পুল দুইটি আছে। একটি বাড়ির ভেতরে। যেটা ইন্ডোর পুল। কাচে ঘেরা, চারপাশে সাদা মার্বেল। শীতেও ব্যবহারযোগ্য। আরেকটি ছাদে। রুফটপ ইনফিনিটি পুল। শহরের আকাশরেখা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, পানি আর আকাশ একসাথে মিশে যায় সেখানে। রুফটপে লাউঞ্জ এরিয়াও আর বার কাউন্টার। রাতে এখানেই সবচেয়ে বেশি সময় কাটাতে পছন্দ করে ফারাজ। একসময় তো শহরের বড় বড় মাফিয়ার সাথে এখানে রাত জেগে আড্ডা দেওয়া হতো। এই বাড়িতে চিত্রার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা হচ্ছে কিচেন। একেবারে প্রফেশনাল গ্রেড। আলাদা আলাদা সেকশন। মেইন কুকিং, বেকিং, স্টোরেজ সবই ভাগ করা। প্রতিটি জিনিস লেবেল করা সিস্টেমেটিক ভাবে। যদিও ফারাজের জ্বালায় চিত্রা সেখানে গিয়ে একা কিছু করতে পারে না। ওখানে মেইড ও স্টাফ সব আছে।প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা মানুষ। এ-ই বাড়িতে তো ফিজাকে দেখার জন্যও সেই জন্ম থেকে একজনকে রাখা হয়েছে।

মেয়েটার নাম ন্যানি। এই বাড়িতে কাজের মানুষদের মধ্যে আরো কয়েকজন মানুষ আছে যাদের সাথে চিত্রার ভালো সম্পর্ক। ওইযে একজন হাউসকিপিং সুপারভাইজার। বৃদ্ধি লোকটা চিত্রাকে মেয়ের মতো ভালোবাসে। আবার এই বাড়িতে যেই কয়েকজন ক্লিনিং স্টাফ আছে ওরাও খারাপ না। এই বাড়ির চিকেন পরিচালনা করে মেইন শেফ এবং সহকারী শেফ। তাদের রান্নার জবাব নেই। কিছুদিন আগে পুরোনো লন্ড্রি ইনচার্জের একটা ভুলের কারণে ফারাজ রাগারাগি করে তাকে বের করে দেয় কাজ থেকে। এখন যিনি আছে সেও ভালো। সবাই নির্দিষ্ট নিয়মে চলে। সময়ের এক সেকেন্ডও এদিক-ওদিক হয় না। ফারাজের পার্সোনাল উইং বাড়ির অন্য অংশ থেকে কিছুটা আলাদা। সেখানে সিকিউরিটি আরও কঠোর। বেডরুমটা পুরো ফ্লোরের সমান বড়। ডার্ক টোনের পুরোটা। এক পাশে প্রাইভেট অফিস আছে। ফারাজ নোংরামি একেবারে অপছন্দ করে। তবে সেটা যদি তার মেয়ে ফিজা করে তাহলে অন্য হিসাব। ফিজার মাত্র তিন বছর। তবে তার রুম আলাদা। ফিজা সারাদিন বাড়িতে খেলে বেড়ায়। আর ন্যানি তার পেছন পেছন ছুটে। তার খেলনা কখনো লিভিং রুমে, কখনো করিডরে। তাতে কিন্তু ফারাজের আনন্দই লাগে। মেয়ে আর স্ত্রী তার দুনিয়া।
আজ অক্টোবরের ১০ তারিখ। এই দিনেই ফিজা দুনিয়ায় এসেছিল।

সেই ঝড়ের রাত, ডেলিভারির কথাগুলো ভাবলে গা শিউরে উঠে ফারাজের। আবার আনন্দও হয়। শত হলেও মেয়েটা এসেছে। ফিজা এলাহীর এটা তৃতীয় জন্মদিন। বাড়ির গেট থেকেই শুরু হয়েছে জাঁকজমক। উঁচু লোহার গেট আজ ফুল আর আলোয় মোড়া। প্রবেশপথে লাল কার্পেট বিছানো, তার দুই পাশে সাদা-সোনালি ফুলের আর্চ। ড্রাইভওয়েতে একের পর এক লাক্সারি গাড়ি এসে থামছে। নামি-দামি ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, কর্পোরেট আইকন সবাই আজ এক ছাদের নিচে, ফারাজ এলাহীর আমন্ত্রণে। ভেতরে প্রবেশ করলেই গ্র্যান্ড হল। সাদা মার্বেলের ফ্লোরে আলো ঝলমল করছে, ঝাড়বাতির ক্রিস্টাল টুকরোগুলো হাজার রঙে ভেঙে পড়ছে। এক পাশে বিশাল বার্থডে স্টেজ। কালো আর গোল্ডেন থিমে সাজানো, মাঝখানে বড় করে লেখা, “FIZA ELAAHI – 3rd Birthday”। এক পাশে লম্বা বুফে কাউন্টার। ইন্টারন্যাশনাল কুইজিন, ইতালিয়ান, ফ্রেঞ্চ, আরবিয়ান, ডেজার্টে ভরপুর। শেফরা নিখুঁতভাবে কাজ করছে বলতে হবে। অতিথিদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে এখুনি,“এটা কোনো সাধারণ ব্যবসায়ীর বাড়ি না…” “সিকিউরিটি দেখেছো?” “আর এই আর্কিটেকচার এটা পুরো ইউরোপিয়ান স্টাইল… এসব হওয়ারই কথা। ফারাজ এলাহী বলে কথা। তবে ভয়ানক ফারাজ এলাহীর এমন পরিবর্তন অবাক করার মতো।

একটা মেয়ে, তাও সে নাকি আইনের লোক। চোর-পুলিশের প্রেমে পড়ে নিজের অতীত মুছতে পারে? অবাক করা কান্ড।” একটু আগেই অতিথিদের মাঝে ফারাজ, চিত্রা আর ফিজা এসে উপস্থিত হয়েছে। ফারাজের পরনে ডার্ক টেইলর্ড স্যুট। তার পাশে চিত্রা, আর কোলে ছোট্ট ফিজা। কালো ফ্রক, মাথায় ছোট্ট ব্যান্ড, চোখে অবাক পৃথিবী দেখার কৌতূহল। কেক আনা হয় স্টেজে। আজ এখানে সবাই উপস্থিত। বজ্র আর নিরুর ঘরে একটা ছেলে হয়েছে। দেখতে দেখতে বর্ণিল এক বছরের হয়ে গেছে। অভ্রের ছেলে আর্দ্রের তো আড়াই মাস বয়স। ফিজার ৬ মাস পড়ে সে দুনিয়ায় এসেছিল। চয়ন কায়সার আর চৈতন্য কায়সার এক সপ্তাহ আগেই চলে এসেছেন। জমেলা বুড়ি তো সকাল থেকেই ফিটফাট। ফারাজের নান-নানি এখনো বেঁচে আছে। বেশিদিন হয়নি চিত্রা আর ফারাজ ডেনমার্ক গিয়ে তাদের সাথে দেখা করে এসেছে। আজকের অনুষ্ঠানে তারাও আছে। অভ্র পরশু নিজে গিয়ে ডেনমার্ক থেকে তাদের এনেছে। বুড়ো মানুষ কোথাও যেতে চায় না। জোর করে আনা হয়েছে।

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৯৫

ফারাজ তো ভেবে রেখেছে এবার আর যেতে দিবে না। আজ-কাল চিত্রাও তো ব্যস্ত থাকে। শত হলেও সে ফিনিক্সের সিইউ। ফিজার জন্মের ১ বছর পর থেকে আবার সে কাজ শুরু করেছে। কাজ করার ইচ্ছা ছিল তার। তবে ফারাজ যদি অনুমতি না দিত তাহলে করত না। তবে লোকটা এত সাপোর্ট করে। কতগুলো ক্রিমিনাল ধরতে যে সাহায্য করল। চিত্রা এখন ভালো মতোই বুঝতে পারলে, এসব ক্রিমিনালদের বিষয়ে তার যতটুকু না জ্ঞান আছে ফারাজের তার থেকেও বেশি। আর ওইযে মহাশয়ের একটা মেয়ে আছে। ওটাও বাবার মতো বুদ্ধিমান। ওনার পুতুল ভালো লাগে না। খেলনা পিস্তল দিয়ে খেলতে ভালোবাসে। বাপরে কি ডেঞ্জারাস। আবার রেসার কারের প্রতি কি নেশা। ওই টুকু মেয়ে কত কি বুঝে। চিত্রা অবাক হয়। এই মেয়ের কি বড় হয়ে গাড়িতে চড়ে গুলি করার শখ জাগবে নাকি এই নিয়ে চিন্তার শেষ আছে বুঝি?

চিত্রাঙ্গনা শেষ পর্ব