Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ২৭

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ২৭

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ২৭
লিজা মনি

তীব্র ক্লান্তি এখন তার হাড়ের ভেতরে বিষ ঢালছে। শ্বাস ছিঁড়ে যাচ্ছে প্রতিটি গাছের ডালির ফাঁকে। কখনো থেমে যেতে ইচ্ছে করছে। কখনো নিজের কান্নায় ডুবে মরতে চায়।কিন্তু এনির চোখে এখনো জ্বলছে শেষ স্বাধীনতার এক বিন্দু স্পর্ধা।
এনির ভেতরে আর কিছু বাকি নেই।
সব শক্তি ফুরিয়ে গেছে। পাগলের মতো, প্রাণীদের মতো, নীরব চিৎকারের মতো সেই জঙ্গলের ভেতরে হেটে বেড়াচ্ছে। এক সময় নিস্তেজ শরীরটা নিয়ে গাছের সাথে এলিয়ে দেয়।চারপাশে হিংস্র পশুদের ডাক। বর্তমানে পশুদের আহার হতে সে শতবার রাজি। কিন্তু নিকের সেই বন্ধ রুমে যেতে সামান্য রাজি নয় সে। মরে যাবে এরপর ও যাবে না। লোকটা তাকে ছুঁয়েছে। তার সব থেকে বড় সম্পদ সতিত্ব কেড়ে নিয়েছে। রাত এখন কয়টা বাজে এনির জানা নেই। সাপের ফনার শব্দ শুনে শুকনো ঢোক গিলে। পুরো শরীর ছিঁড়ে গিয়েছে। মাথাটা আর রাখতে পারছে না। চোখ দুইটা বন্ধ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। কারোর পায়ের শব্দ কানে আসতেই আৎকে উঠে। কে আসছে এগিয়ে? নিক নাকি নাবিদ? এনি দুটানায় পড়ে যায়। পালাবে নাকি একই জায়গায় বসে থাকবে। ধীরে ধীরে শব্দ তীব্র হয়ে উঠে। ছায়া অবয়বটি এনির সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। কালো হুডিতে আবৃত তার শরীর। এনি চোখ গুলো দেখার চেষ্টা করে। শ্বাস টানতেও কষ্ট অনুভব হচ্ছে তার। শুধু নিভু নিভু চোখে অস্ফুর্ত আওয়াজে বলে,

” ক.. কে তুমি?
হুডিতে ঢাকা মানবটা ধীর পায়ে এগিয়ে আসে। এমন ভাবে এগিয়ে আসছে যেন তার শরীরে কোনো শক্তি নেই। এনির ভিতরে ভয়ে কাঁপছে। নিক হলে এতক্ষনে হিংস্রতার স্বীকার হয়ে যেত। তার শরীরের উপর এক তান্ডব শুরু হয়ে যেত। তাহলে কি নাবিদ ভাই! যদি উনি না হয়ে অন্য কেউ হয়। এনি আতঙ্কে জমে যায়। শরীরের প্রতিটা লোমকূপ দাঁড়িয়ে গিয়েছে ভয়ে। এই মহূর্তে তৃষ্ণায় গলা ফেটে যাচ্ছে। রাতের ঘন জঙ্গলে চারপাশে হিংস্র পশু – পাখির ডাক। রাতে নিস্তব্দতায় গা ছমছমে পরিবেশ। সব মিলিয়ে এতক্ষন এনির এতটা ভয় লাগে নি। সে সব ভয়কে উপেক্ষা করে শুধু একটা ভয় ছিলো নিক যাতে ওকে খুঁজে না পায়। প্রচুর ভয় পায় সে তাকে। এতদিন যতটা সাহস দেখিয়ে সে থেকেছে সবটাই বাহ্যিক রুপ।

অভ্যন্তরীনভাবে এনি নিককে একটা জানোয়ারের থেকেও বেশি ভয় পায়। লোকটা রেগে গেলে ঠিক কতটা হিংস্র হয়ে যায় সেটা মনে হতেই গা হীম হয়ে উঠে। তাকে জ্বলন্ত কয়লার উপর দিয়ে হাটিয়েছ, ছুঁরি দিয়ে বার বার রক্তাক্ত করেছে, বাথপটপে শ্বাসরোধ করে রেখেছে, ভাঙ্গা কাউচ দিয়ে রক্তাক্ত করেছে, চাবুক দিয়ে ক্ষত- বিক্ষত করেছে। অন্ধকার একটা আলো- বতাসহীন রুমে তিনটা বাস বন্ধী করে রেখেছে। এই তিনটা মাস দুনিয়া কেমন হয় সে ভুলে বসেছিলো। এইসব ভাবতেই শরীর কাটা দিয়ে উঠে। সে আর যেতে চায় না এমন নরকে।গলা ফেটে কান্না বেরিয়ে আসছে। শরীরে সামান্য শক্তিটুকু ও নেই যে মানবটার থেকে সে পালিয়ে যাবে। পুরো শরীরে নিকের দেওয়া অজস্র ক্ষত। তার উপর আজ পালাতে গিয়ে আঘাত পেয়ে পুরো শরীরে রক্তাক্ত হয়ে আছে। পা দুইটা ব্যাথায় টনটন করছে। পায়ের নিচ থেকে এখনও হয়ত রক্ত পড়ছে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। শুধু দেখতে পাচ্ছে ছায়া মানবটা তার সামনে হাটু ভেঙ্গে শব্দ করে বসে পড়ে। এনি চমকে উঠে। লোকটা কাঁপা- কাঁপা হাতে এনির ময়লা রক্তাক্ত হাতটায় স্পর্শ করে। সাথে সাথে দুই ফোটা চোখের জল এনির হাতের উপর গিয়ে পড়ে। এনি খুশিতে আত্নহারা হয়ে যায়। বেঁচে থাকার শেষ আলোকে দেখতে পেয়ে ফুঁপিয়ে উঠে।। অস্ফুর্ত আওয়াজে বলে,

” নাবিদ ভাই!
লোকটা ভাঙ্গা গলায় বলে,
” পাখি! আমার পাখি।
এনি আচমকা হাউমাউ করে কেঁদে উঠে।একটা বাচ্চা অনেক্ষন ভয় চেপে রাখলে ঠিক যেমন ব্যবহার করে এনিও ঠিক তেমন হয়ে উঠেছে। এত দিন পর নিজের আপন মানুষকে দেখে যেন শান্তি ফিরে এসেছে। মরুভূমির ন্যায় তৃষ্ণার্ত বুকে বর্ষণ হয়েছে। ভয়ে নাবিদকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠে,
” নাবিদ ভাই তুমি এসেছো। তুমি আজ এই জঙ্গলে আসতে আমি ভয়কে উপেক্ষা করে এসেছি।জানো এতক্ষন মনে হচ্ছিলো আমার কলিজাটা কেউ কুড়াল দিয়ে কু**পাচ্ছে। চারপাশে হিংস্র বনপশুর ডাক। তার থেকে ও বড় ভয় ছিলো নিক নামক পশুটার। চতুষ্পদী জানোয়াররা হয়ত আমাকে একবার গিলে খেয়ে ফেলবে। কিন্তু এই নিক নামক অমানুষটা আমাকে তিলে তিলে গিলে খাচ্ছে। খুব ভয় করছিলো।

নাবিদ এনিকে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে। তবুও যেন এক অদৃশ্য বাঁধা কাজ করছে। তার ছোট পাখিটা একজনের স্ত্রী। তাকে বুকে আগলে নেওয়াটা কি উচিত! নাভিদ নিজের চিন্তাভাবনাকে নিজেই ধিক্কার জানায়। এইটা বিয়ে ছিলো না। বিয়ে নামক শব্দ প্রয়োগ করে আটকে রেখেছিলো। শারিরীক মানসিক টর্চার করেছিলো। এইটা বিয়ে হতেই পারে না। তাছাড়া এনি নিককে ঘৃনা করে। দুই চোখে সহ্য করতে পারে না নিক জেভরান নামক ব্যক্তিটাকে। তাহলে জড়িয়ে ধরতে বাঁধা আসবে কেনো? আনাস্তাসিয়া এনি আমার ভালোবাসা। মাত্র সাত বছর বয়স থেকে আমি ওকে আগলে রেখেছি। পর্যাপ্ত সময়ের অপেক্ষা করেছি। আমার জীবনের সব থেকে বড় কালো অধ্যায়কে পিছনে ফেলে এসেছি। তাকে ভালোবেসে অমানুষ নামক নরখাদক থেকে মানুষ হয়েছি। ধর্মহীন পিশাচ থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছে। সব সেক্রিফাইস তো ছিলো এই ছোট্ট মেয়েটার জন্য। তাকে আগলে রাখার জন্য সব কিছু বিসর্জন দিয়েছে সে। তাহলে আজ কেনো সে অন্যের হবে? কেনো সে অন্যের বউ হয়েছে? আর হলে’ই বা কি? এই বিয়েটা তো অর্থহীন। নাভিদ এনিকে দুই হাত দিয়ে আগলে নিয়ে মিষ্টি সুরে বলে,

” আমি পাশে আছি পাখি। এখন কারোর শক্তি হবে না তোমাকে আমার কাছ থেকে নিয়ে যাওয়ার। নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার আগে পর্যন্ত আমি তোমাকে আগলে রাখব। একবার ভুল করেছিলাম তাই নিক তোমাকে নিয়ে পালাতে পেরেছিলো। আর সেই ভুল করব না।
এনি কান্না করতে করতে শান্ত হয়ে আসে। নাভিদের বুকে মাথা রেখে আছে ভাবতেই ঠোঁট ভিজায়। শব্দহীনভাবে সরে আসে সে জায়গা থেকে। অজানা এক দেয়াল বাঁধা দিচ্ছ। এই বুকটাকে আপন মনে হচ্ছে না। এনি বিরক্ত হয়ে উঠে হঠাৎ এমন অনুভুতির কারনে। নাভিদ এনির চোখের পানি মুছে দেয়। এনি নাক টেনে নাভিদের দিকে তাকিয়ে বলে,
” নাভিদ ভাই।
— হুম পাখি।
এনি চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস টেনে বলে,
” একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করব?
— হাজারটা জজ্ঞাসা করো।
— সঠিক উত্তর দিবে তুমি?
— মিথ্যা বলেছি কখনো?
— তুমি আমার দেখা সব থেকে শুদ্ধ পুরুষ নাভিদ ভাই। যার জীবনে কোনো কলঙ্কের ছাপ নেই। তবুও অনুমতি চাচ্ছি। সঠিক উত্তর দিবে তো?
নাভিদ এনির অস্বাভাবিক কথায় কিছুটা চুপ থাকে। পুনরায় শ্বাস নিয়ে বলে,
” সঠিক উত্তর দিব।

— প্রমিস করো।
— প্রমিস করলাম।
এনি নাভিদের চোখে চোখ রেখে বলে,
” নিক জেভরানের সাথে তোমার কিসের সম্পর্ক? প্রথম দিন যেদিন তুমি আমাকে নিতে মেনশনে গিয়েছিলে। তখন তোমাদের কথোপকথন শুনে মনে হচ্ছিলো তোমরা অনেক আগের পূর্ব পরিচিত। কি সম্পর্ক তোমাদের? কিভাবে চিনো তুমি উনাকে?
এনির এমন অপ্রাত্যাশিত প্রশ্নে নাভিদ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। এনির তীর্যক চাহনি ভেতরটা নাড়িয়ে তুলছে। নিচের ঠোঁট কামড়ে এদিক – সেদিক তাকায়। ছোট করে নিম্ন আওয়াজে বহু কষ্টে উত্তর দেয়,
” কিছু না। কোনো সম্পর্ক নেই ওর সাথে আমার।
— উনি তোমার ক্ষতি করে নি কেনো এখনও?
নাভিদ হুট করে তাকায় এনির দিকে।।এনির দৃষ্টি এখনও নাভিদের দিকে। নাভিদ এই দৃষ্টি উপেক্ষা করতে পারছে না। চোখে চোখ রেখে ভাবতে পারছে না কিছু। নাভিদ এনির মুখটার দিকে তাকিয়ে বলে,
” তুমি অসুস্থ পাখি। আগে বাড়িতে গিয়ে ফ্রেশ হও।এইসব প্রশ্ন পড়ে করো।
এনি দুর্বল কন্ঠে বলে,

” কিন্তু আমার যে এখন উত্তর জানতে ইচ্ছে করছে। শান্তি পাচ্ছি না কিছুতেই। বলো না উনি তোমার কোনো ক্ষতি কেনো করে নি? তুমি জানো নাভিদ ভাই, গার্ডরা আমার দিকে সামান্য তাকিয়েছিলো বলে তাদের কলিজা টেনে নিয়ে এসেছে। মাথাটা কেটে ফেলা হয়েছিলো তাদের। যেমনটা দেড় বছর ধরে আমার সাথে হচ্ছে। তুমি আমাকে ভালোবাসো জানা সত্তেও তোমার কেনো ক্ষতি করে নি। আমি প্রতি সেকেন্ডে সব থেকে বেশি ভয় পেয়েছি তোমাকে নিয়ে। এই লোকটা তোমার ক্ষতি করে দিলে আমি আরও একজন আপন জনকে হারাব। তোমার ক্ষতি কেনো করে নি?
নাভিদের খুব ইচ্ছে করছিলো তার পখির কপালে চুমু দিতে।।কিন্তু এই ইচ্ছেটা এখন প্রয়োগ করা উচিত নয়। নাভিদ শান্ত কন্ঠে বলে,

” নিক গ্যাংস্টার হলেও বাহিরে সেও একজন ব্যবসায়ী। আর ব্যবসা ক্ষেত্রে দুই একবার কথা হয়েছিলো সেটাই। তাছাড়া নিককে পার্সোনালভাবে চিনি না। বাট গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানকে পুরো ওয়ার্ল্ড চিনে। সবাই যা জানে আমিও ঠিক ততটুকু জানি। এখন আমাকে কেনো মারে নি কি করে বলব। হয়ত ব্যবসায়ীক লাভে আমার উপর হামলা করে নি। তবে হামলা করলেও প্রতিঘাত করার ক্ষমতা একটু হলেও আছে পাখি।
এনি ভাবুক হয়ে কিছুক্ষন পর বলে,
” দেড় বছর ধরে আমার কাছে যে সব কাটা মাথা আর কলিজা আসত সব কিছু কি নিক জেভরান পাঠাত ভাইয়া? উনার মারের স্টাইল ঠিক তেমন, যেমনভাবে এইগুলো ছিলো। কোনোভাবে উনি নয় তো?
নাভিদ ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,

” হতে পারে।
— হতে পারে মানে? উনার সাথে আমার সম্পর্ক তিন থেকে চার মাস। দেড় বছর ধরে এই বর্বতা চলছে আমার সাথে।যতজন পুরুষ আমার দিকে তাকিয়েছে ঠিক ততজন ব্যক্তির কাটা মাথা আর কলিজা আমার কাছে এসেছে। আরও অনেকের এসেছে যাদের আমি চিনি নি। এই পর্যন্ত প্রায় দুইশত এর ও বেশি কাটা মাথা আর কলিজা এসেছে। এই ঘটনা কিন্তু আমি আর তুমি ছাড়া কেউ জানে না। আপা কেও জানায় নি। এইটা নিক জেভরান কিভাবে হবে নাভিদ ভাই? দেড় বছর ধরে এই কাহিনী চলছে। অথচ তার সাথে সম্পর্ক আমার তিন থেকে চারমাস হবে।
এনি অতিরিক্ত শ্বাসের জন্য কথা বলতে পারছে না। তবুও বহু কষ্টে বাক্যগুলো উচ্চারন করে। নাভিদ পর পর প্রশ্নে থতমত খেয়ে উঠে।এনির কপালে হাত দিয়ে বলে,
” এখন একটা প্রশ্নের উত্তও আমি দিব না। আগে বাড়িতে গিয়ে মেডিসিন নিতে হবে। সুস্থ হবে এরপর সব প্রশ্ন করো। উত্তর জানা থাকলে দিয়ে দিব।
— আমার কথাটা এড়িয়ে যাচ্ছো? আমি জানতে চাই এখন? অনেক দিনের এই প্রশ্ন আমার। নিককে জিজ্ঞাসা করার সাহস হয় নি। কিন্তু তোমার কাছে তো ছোট থেকে সব আবদার করেছি। তোমাকে হাজারটা প্রশ্ন করলেও ভয় কাজ করবে না। উত্তরটা দিয়ে দাও নাভিদ ভাই।

— জেদ কেনো করছো পাখি।
— উত্তর জানা নেই আমার।
— সত্যি বলছো?
— তোমার সাথে আমি মিথ্যে বলি না। নিক যেকোনো সময় চলে আসতে পারে। বাহিরে প্রাইভেট জেট অপেক্ষা করছে। আমাদের আজ এই ইরান ফিরত যেতে হবে।
— আমি ইরান যাব না নাভিদ ভাই।
নাভিদ অবাক হয়ে বলে,
” কেনো যাবে না পাখি? এখানে থাকলে আমরা ধরা পড়ে যাব।
এনি নাভিদের দিকে তাকিয়ে বলে,

” এখন যদি আমরা ইরান চলে যায় তাহলে আরও দ্রুত ধরা পড়ে যাব। নিক খুব ভালো করে জানে আমি পালিয়ে গেলে ঠিক কোথায় যেতে পারি। আমার আপন বলতে তুমি আর আপা ছাড়া কেউ নেই। নিঃশ্বন্দেহে তোমাদের কাছে যাব আমি। সেই সূত্র ধরে উনি আমাদের খুজবে। আমাদের বাড়ি যেহেতু ইরান তাই উনি সর্বপ্রথম ইরানে যাবে। আর খুব সহজেই আমাদের ধরে ফেলবে। তার থেকে বরং তুমি এখন যেমন আছো তেমন থাকো। এমনভাবে অধৈর্য হয়ে থেকো যেমনটা এতদিন ছিলে, আমাকে খুঁজে না পেয়ে। আমি একটা জায়গায় লুকায়িত থাকব যেন নিক কখনো সেখানে পৌঁছাতে না পারে। তোমাকে জিজ্ঞাসা করতে আসলে তুমি বলবে জানি না। নিককে দোষ দিবে। আজ ওর কারনে আমি হারিয়ে গিয়েছি। নিক ও তোমার অভিনয় বিশ্বাস করে ফেলব।কারন আমি যদি তোমার কাছে আসতাম তাহলে তো এখনও আফ্রিকায় থাকতাম না। ইরান চলে যেতাম আমাদের বাড়িতে। কিছুদিন এই নাটক চলতে থাকলে জানোয়ারটা এমনিতেই আমাকে ভুলে যাবে।
এনি কথাগুলো বলে থামে। নাভিদ মুচকি হাসে এনির কথায়,

” অনেকটা বড় হয়ে গিয়েছো তুমি পাখি।
এনি মলিন হেসে বলে।,
” পরিস্থিতি অনেক কিছুই করতে বাধ্য করে নাভিদ ভাই। দেখো না, যে এনি সামান্য ক্ষত পেলে তোমাকে আর আপাকে নাচিয়ে ফেলত সেই এনির শরীরে এখন অজস্র ক্ষতের দাগ। যেই এনির সামান্য জ্বর আসলে আমার আপা সেবা যত্ন করে সুস্থ করে তুলতো। তোমাদের সবাইকে আবোল- তাবোল বলে নাজেহাল করে তুলতো, সেই এনি দিনের পর দিন তীব্র জ্বরে পুরো রাত যন্ত্রনা ভোগ করেছে। পরিস্থিতি অনেক বদলে দিয়েছে নাভিদ ভাই। সাহস আমার বরাবর ছিলো। সাহস না থাকলে কি আর নিজের রক্তকে খুন করতে পারতাম।
নাভিদ এনির মুখে হালকা স্পর্স করে বলে,

” তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে পাখি?
— সুখ দিবে বলে তো বন্ধ রুমে আটকে রাখে নি।
নাভিদের চোখ থেকে টিপ- টিপ করে পানি পড়ছে। এনি অধৈর্য হয়ে চোখের জল মুছে দিয়ে বলে,
” তুমি কাঁদছো কেনো?
— আমি তোমাকে আগলে রাখতে পারি নি পাখি। তোমার বাবা – কে দেওয়া কথা রাখতে পারি নি। আমাকে কখনো ক্ষমা করো না। আমি প্রচুর খারাপ।
এনি মুচকি হেসে বলে,
” তুমি না থাকলে আমার অস্তিত্ব সেদিন এই বিলীন হয়ে যেত। তাই নিজেকে কোনোদিন দোষ দিবে না। আচ্ছা নাভিদ ভাই আপা কোথায়?
নাভিদ এনির বাহু ধরে উঠে দাড়া করায়,
” বাড়িতে গিয়ে সব বলছি।
এনি আর প্রশ্ন করে নি। মুলত কথা বলার মত শক্তি তার মধ্যে নেই। নাভিদ আচমকা এনিকে পাজা কোলে তোলে নেয়। এনি ভয়ে কাঁপা গলায় বলে,

” ক.. কি করছেন নাভিদ ভাই। আমি হেটে যেতে পারব।
নাভিদ সামনে এগিয়ে গিয়ে বলে,
” তোমার সাথে আমার কিসের সম্পর্ক সেটা ভুলে যাও। কিন্তু এখন আমি একজন আহত ব্যক্তিকে সাহায্য করছি। তাই ভুলেও এর মধ্যে ডুকো না
এনি নিশ্চুপ হয়ে যায়। মেনশনের কথা ভাবতেই গা হীম হয়ে আসে। নিক এতক্ষনে নিশ্চই ফিরে এসেছে। সে রুমে নেই এতক্ষনে মনে হয় জেনে গিয়েছে। এখন কি করবে গ্যাংস্টার বস। প্রতিটা গার্ডকে কি মেরে ফেলবে? আর চিত্রা মাসির কি হবে? উনার কোনো ক্ষতি করবে না তো? নিক জেভরানের এই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অন্য কেউ কতটুকু দেখেছে জানা নেই। কিন্তু সে যমের মত ভয় পায় সেই দৃষ্টিকে। কেমন দাড়ালো হিংস্র প্রকৃতির। যেন কোনো সিংহ তার শিকারীর দিকে তাকিয়েছে। ওদিকের চিন্তায় এনির মাথাটা ফেটে যাচ্ছে।

প্রভাতের নিসর্গ যেন এক অতল শান্তির প্রতিমূর্তি। রাত্রির অবসানবেলায় যখন সূর্যকিরণের প্রথম আভা ধীরে ধীরে দিগন্তচূড়া ভেদ করে তখন সমগ্র প্রকৃতি নবজীবনের পরশে জেগে ওঠে। শিশিরে ভেজা ঘাসে পদচিহ্ন রাখলে মনে হয় যেন পৃথিবী নিজের সমস্ত ক্লান্তি ঝেড়ে পুনর্জন্ম নিয়েছে। পাখিদের কূজন ও মৃদু বায়ুর মর্মরধ্বনি। আর দূর আকাশে ছায়াপাত করা রক্তিম সূর্য।সেই নির্মল পরিবেশে মানুষের অন্তর আত্মস্থ হয় মন তখন জেগে উঠে বিশুদ্ধতায়।আর জীবন যেন নতুন আশার বীজ বপন করে। সকাল কেবল দিনের সূচনা নয় এ এক শুচি মুহূর্ত।যেখানে প্রকৃতি ও প্রাণ একত্রে উচ্চারণ করে নবজাগরণের মন্ত্র। বিশাল খাটের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান। নিক জ্ঞান হারিয়েছে হাস্যকর হলেও সত্যি। নাক দিয়ে অতিরিক্ত ব্লিডিং।হওয়াতে যে কোনো সময় ক্ষতি হয়ে যেতে পারত। আরিশ নিরুপায় হয়ে হাতের মধ্যে ড্রাগস পুশ করে দিয়েছিলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই নিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আরিশ আর অধিরাজ মিলে পুনরায় মেনশনে নিয়ে আসে। রাস্তার আনাগোণা থেকে শুরু করে প্রতিটা জায়গায় এনির খুঁজ চলছে। এখনও পর্যন্ত কোনো সূত্র কেউ জোগার করতে পারে নি। নিককে ড্রাগস দেওয়ার কারনে এক হিংস্র থাবার সম্মুখীন হয়ে হবে সেটা আরিশের অজানা নয়। দুই একটা ঘুষি খেলে তার কিছু এসে যাবে না । কিন্তু ওই মুহূর্তে নিককে আটকানো প্রয়োজন ছিলো। আরিশ ডিভান থেকে উঠে নিকের কাছে যেতে নিবে এমন সময় আরিশের আগমন ঘটে। আরিশ সেদিকে কপাল কুচকে তাকায়। অধিরাজ অধৈর্য হয়ে বলে,

” স্যার মেহের এসেছে?
আরিশ আচমকা চেঁচিয়ে উঠে,
” হুয়াট!
আরিশের চেঁচানোতে অধিরাজ হতভম্ভ হয়ে যায়। অধিরাজকে কিছু বলতে না দিয়ে আরিশ আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বলে,
” দ্রুত এইটাকে এখান থেকে আটকা। নিকের এই অবস্থা দেখলে মেয়েটা কান্না করবে। বাজেভাবে ভেঙ্গে পড়বে।বিভিন্ন প্রশ্ন করবে। ফলে আবার ও মস্তিষ্কে চাপ খাবে। দ্রুত আসা থেকে আটকা। যাতে ভুলেও জানতে না পারে নিক আর এনির বিয়ের কথা।
আরিশ নিশ্বাসের কারনে কথা বলতে পারছে না।।অধিরাজ শান্তনা দিয়ে বলে,
” শান্ত হন স্যার। মেহের মেনশনে আসে নি।
আরিশ কপালের ভাঁজ প্রখঢ় করে বলে,

” ম…মানে? কোথায় গিয়েছে তাহলে?
— বাগান বাড়িতে গিয়েছে।
আরিশ বিরক্তিতে মুখ বিকৃত করে ফেলে,
” শিট! কার সাথে এসেছে? কখন এসেছে?
অধিরাজ সাবলীলভাবে বলে,
” একটু আগে এসেছে। বডিগার্ড দের সাথে এসেছে। পাগলামি করছিলো তাই দাদামশাই পাঠিয়েছে। আপনার নিয়ে আসার কথা ছিলো কিন্তু আপনি যান নি।
আরিশ আর এক মুহূর্ত ও দাঁড়ায় নি। অধিরাজকে আদেশ দিয়ে বলে,
” নিকের কাছে থাকবে। এক ঘন্টার ভিতরে আমি ফিরে আসছি।
— জি স্যার।

আরিশ দ্রুত পায়ে মেনশন ত্যাগ করে। চিন্তায় মাথার রগ ছিঁড়ে যাচ্ছে। নাজলী যদি সব কিছু বলে দেয় তাহলে আমার বোনটার কি হবে? আবার ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরন দেখা দিলে বাঁচানো মুশকিল হয়ে যাবে। এত বছর টিকিয়ে রাখার জন্য যুদ্ধ করে কি লাভ যদি সমাপ্তি এমন হয়ে যায়। আরিশ আর কিছু ভাবতে পারছে না। মেয়েটা তার রক্তের কেউ নয়। কিন্তু আত্নার সম্পর্ক অনেক মজবুত। প্রায় চল্লিশ মিনিট পর আরিশ বাগান বাড়িতে পৌঁছায়। ফিঙ্গার টাচ করে করিডর পেরিয়ে লিভিং রুমে প্রবেশ করতেই শান্ত হয়ে আসে। সাথে সাথে কপাল কুচকে ফেলে সামনের এমন দৃশ্য দেখে। নাজলী কিছু একটা বলছে আর মেহের খিলখিল করে হেসে উঠছে। দুইজনের হাতে ক্যান্ডেল। অজান্তেই আরিশ মুচকি হাসে। মুহূর্তে নিজের অবস্থান বুঝতে পেরে গম্ভীর হয়ে পড়ে। কিছুটা রাগ নিয়ে এগিয়ে যায়। নাজলী আরিশকে দেখে হাসি থামিয়ে দেয়। মেহের চোরা চোখে তাকায় ভাইয়ের দিকে। আরিশ রাগ দেখিয়ে ধমক দিয়ে বলে,

” তুই এখানে কেনো এসেছিস?
মেহের ধমককে উপেক্ষা করে সহজ ভাষায় বলে,
” ইচ্ছে হয়েছে তাই এসেছি। আমি আমার ভাইয়ের বউ দেখতে এসেছি। তুমি কেনো রেগে যাচ্ছো ভাইয়া? তোমাকে তো আমি দেখতে আসে নি।
আরিশ চোয়াল শক্ত করে বলে,
” যাস্ট সেট আপ মেহের। ভাইয়ের বউ কে তর? লিসেন, তর ভাই কাউকে বউ হিসেবে নিয়ে আসে নি। প্রয়োজনে এনেছে, ব্যাস। প্রয়োজন শেষ হলেই টিস্যুর মত ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হবে। তাই আগ বাড়িয়ে সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা ভুলেও করিস না।
মেহের নাজলীর দিকে তাকায়। মেহেরের তাকানো দেখে নাজলী মুচকি হাসে। মেহেরের প্রচুর খারাপ লাগলো আরিশের কথায়। কিন্তু সে তার ভাইকে প্রতিটা রক্ত বিন্দুতে চিনে। এক মাত্র তাকে আর নিককে ছাড়া হয়ত কাউকে ভালোবাসে না। জীবনে কখনো বাসবে কি – না সেটা নিয়েও সন্দেহ। জানা নেই কেনো বিয়ে করেছে। এই রহস্য উম্মুক্ত করার ক্ষমতাও তার নেই। কিন্তু তবুও কেনো জানি ভাইয়ের বউ হিসেবে নাজলীকে প্রচন্ড আপন মনে হচ্ছে। তানভী- আপুর পড়ে এই প্রথম কারোর সাথে সে ফ্রেন্ডলি কথা বলতে পারছে। মেহের কিছুটা শক্ত হয়ে বলে,

” যে কারনেই করো না কেনো ভাইয়া। কিন্তু বর্তমানে নাজলী আপু তোমার স্ত্রী। সেটা তো আর অস্বীকার করতে পারবে না। যায় হোক, এইসব ঘাটাঘাটি করা আমার কাজ নয়। কখনো ডুকিনি এইসবে তাই আজও ডুকব না। তবে আমার ইন্দ্রিয় শক্তি বলছে আরিশ একদিন নাজলীর প্রেমে মারাত্নকভাবে পিছলে পড়বে। এমনভাবে পড়বে যাকে মরনব্যাধী ক্যান্সার নামক আসক্তি বলে। কান্না করবে, ছটফট করবে কাছে পাওয়ার জন্য। মিলিয়ে নিও ভবিষ্যতে তোমার বোনের কথা।
আরিশ কপাল কুচকে রাগ দেখিয়ে বলে,
” থাপ্পর খেতে ইচ্ছে করছে?
মেহের চোখের পাতা ঝাপ্টায়। বোকা হাসি দিয়ে বলে,
” মজা করছিলাম ভাইয়া। আর কখনো বলব না। তোমার থাপ্পর খেয়ে একজনকে অজ্ঞান হতে দেখেছি চোখের সামনে। এই থাপ্পর খেলে আমি টিকব না। আর আমি জানি তুমি আমাকে কখনো থাপ্পর দিবেও না।
আরিশ শান্ত গলায় বলে,
” প্রয়োজন হলে অবশ্যই দিব। শাষনের প্রয়োজন হলে করতে তো হবেই।
মেহের গাল ফুলিয়ে বলে,

” যখন ছোট ছিলাম তখন শাষনের প্রয়োজন পড়ে নি। আর বড় হয়ে গিয়েছি এখন শাষনের প্রয়োজন পড়বে?
— গাল ফুলাচ্ছিস কেনো? কিছু করেছি আমি? শাষন করার কথা বলেছি। শাষন তো আর করি নি। আমি জানি আমার বোন কোনোদিন সেই ভুল করবে না যাতে আমার শাষনের প্রয়াজন পড়বে।
— ভুল করব কিভাবে? বাড়ি থেকে বের হতে পারলে তো ভুল করব। কলেজে গেলেও চারপাশে মন্ত্রী সেনারা থাকে। মনমত খেতেও পারি না এদের তাকানোর জন্য।
আরিশ বোনের বাচ্চামো দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো।
নাজলী প্রচুর অবাক হলো এদের দেখে। তারা নিজের আপন জনদের সাথে ঠিক কতটা ভালো। আর অন্যদের সাথে ঠিক ততটা নিষ্ঠুর। কথাটা ভাবতেই মুখ বাঁকায়। আরিশ এতক্ষনে নাজলীকে খেয়াল করে। মুখের গম্ভীরতা টেনে বলে,

” এক কাপ কফি নিয়ে আসবে।
নাজলী কপাল কুচকায়। দুই কাপ বলতে মেহের আর আরিশ দুইজনের জন্য বুঝতে বাকি নেয়। এখন যদি আরিশের জন্য বলা হত কফি দেওয়ার কথা।।তাহলে হয়ত নাজলী মুখের উপর না করে দিত। কিন্তু মেহেরকে খুব ভালো লেগেছে তার। কত সুন্দর পুতুলের মত মিষ্টা একটা মেয়ে। এই মেয়ে নাকি এই নেকড়ের বোন ভাবতেও অবাক লাগে। ডিএন এর এত চেইঞ্জ কেনো?।চেহারা, ব্যবহার সব কিছু ভিন্ন।
নাজলী একটা বাক্য ও উচ্চারন করে নি। বিনা বাক্যে কিচেনের দিকে চলে যায়।নাজলীর শান্ত ব্যবহারে আরিশ খুব অবাক হয়। মেহেরকে ইশারা দিয়ে বলে,
” তুই উপরে যা আমি আসছি। আর আমার রুমে যাবি, অন্য কোথাও নয়।
মেহের সম্মতি জানিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপড়ে উঠতে উঠতে বললো,
” নাজলী আপুকে নিয়ে এসো ভাইয়া।
আরিশ কথাটা শুনেও উপেক্ষা করে। মেহের চলে যেতেই আরিশ কিচেনের দিকে যায়। নাজলী পাতিলে পানি নিয়ে বসাবে এমন সময় আরিশের শক্ত হাতের থাবার সম্মুখীন হয়। এক প্রকার ক্ষুব্দতা নিয়ে নাজলীকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে। আকস্মিক দেয়ালের সাথে আঘাত পাওয়াতে মনে হচ্ছিলো হাড়- সব ভেঙ্গে যাবে। ব্যাথায় মুখ খিঁচে ফেলে।।আরিশ দুই বাহু চেপে ধরে দাঁত পিষে বলে,

” এত ভালো ব্যবহার কেনো করছো আমার বোনের সাথে? শত্রুর বোনকে এত কেয়ার। কি চলছে মাথার মধ্যে? কি করতে চাইছো?
নাজলী প্রচুর বিরক্তি হয় এমন কথায়। রাগে শরীরটা কেঁপে উঠে। ছোট থেকেই সে রাগ কন্ট্রোল করতে পারে না। তার উপর এমন অহেতুক আক্রমনে ইচ্ছে করছিলো আরিশের গলাটা আলাদা করে ফেলতে। নাজলী শক্ত গলায় বলে,
” মাথার মধ্যে খুব সুন্দর একটা চিন্তা চলছে। ভাবছিলাম কফিতে বিষ মিশ্রণ করে দিব।
আরিশের মস্তিষ্ক জ্বলে উঠে। শক্ত করে নাজলীর চিবুক চেপে ধরে গর্জে উঠে,
” কুত্তার বাচ্চা কলিজা টেনে নিয়ে আসব।আমার বোনের কিছু হলে।
নাজলী আরিশের হাত ছাড়িয়ে বলে,

” অমানুষ কখনো মানুষের মর্যাদা বুঝে না। কিন্তু মানুষ ঠিক এই মানুষের মর্যাদা বুঝে। আপনার হয়ত কারোর জন্য ভালোবাসা থাকতে না পারে কিন্তু আমার যে থাকবে না তার কি মানে হয়। মেহেরকে দেখে যে কেউ ভালোবেসে ফেলবে। আর আমার কেয়ার করাটা কি খুব বেশি অপরাধ। শান্তিতে, নিশ্চিন্তে থাকুন নিক জেভরানের ডান ক্রিমিনাল লিডার আরিশ। আর যায় করি আপনার বোনের ক্ষতি করব না। আপনার সাথে আমার শত্রুতা ওর সাথে নয়। বিষ আপনাকে খাওয়াতে ইচ্ছে করে হাজার বার বাট ওকে নয়।

আরিশ কপাল কুচকে তাকায়। নাজলী রাগটাকে কন্ট্রোল করতে পারে না। এইভাবে চেপে ধরার কোনো মানে হয়? নেকড়ের মত এসে আক্রমন শুরু করে দেয়। যেন হাড়গুলো ভেঙ্গে যাবে। নাজলী রাগটাকে নিয়ন্ত্রন করে নি। আচমকা চোখ যায় পাশে থাকা চিলি সসের দিকে। আরিশের দিকে এক পলক তাকিয়ে ডান হাতে চুপি- চুপি বোতলতা হাতে নেয়। সামান্য আঙ্গুলের উপর নেয়। আরিশ নাজলীর হাতের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মুখের ভতরে ডুকিয়ে দেয়। আরিশ কিছু অনুমান করার আগেই চোখ বন্ধ করে ফেলে।ঝালে পুরো মুখ জ্বলসে যাচ্ছে। অতিমাত্রায় ঝালে আরিশের মুখমণ্ডলে দহনরেখা ফুটে উঠেছে এমন ভাব। কপালে ঘামবিন্দুগুলি অগ্নিকণার ন্যায় টলমল করছে। চোখের পাতা কাঁপছে জ্বলন্ত লাল মরিচের পরশে। জিহ্বায় আগুনের উত্তাপ এক প্রকার।গলায় যেন অগ্নিপিণ্ড গলে নামছে। বুকের ভেতর থেকে এক অদ্ভুত অস্থিরতা তার স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়েছে। সামান্য ঝাল ও সে খেতে পারে না।।দেখানে চিলি সস তো সপ্নেও ভাবতে পারে না। নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হয়ে কাঁপছে অনিয়ন্ত্রিত তাপে।

নাজলীর মুখের দুষ্টু হাসি দেখে আরিশের ক্রোধ আরও প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠে। আরিশ ঠোঁট কামড়ে ধরে তাকালো নাজলীর দিকে।
ঝালমিশ্রিত দহন এখন আরিশেত রক্তে বেগবান স্রোতের মতো ছুটছে। দৃষ্টিতে অগ্নিচূর্ণের মতো দীপ্তি। নাজলীর মুখের দিকে তাকাতেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।চোখের গভীরে জ্বলে উঠল অনলরেখা।
অবদমিত আবেগের বিস্ফোরণে সে এক ঝটকায় নাজলীর কব্জি চেপে ধরল। নাজলীর শরীরে থাকা ওড়নাটা এক ঝটকায় টেনে নিয়ে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। শক্ত হাতে কোমরটা চেপে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট মিলিয়ে দেয়। তার ঠোঁটের ওপর নিজের জ্বলন্ত ক্রোধ নিবিষ্ট করল। সেই স্পর্শে প্রেম ছিলো না। এই স্পর্শে ছিলো প্রতিহিংসার দহন আর আধিপত্যের দাবানল। ঠোঁট দুটি যেন যুদ্ধক্ষেত্র।একদিকে পুরুষের উগ্রতা অন্যদিকে নারীর আতঙ্কিত নিরবতা। নাজলী তীব্র ব্যাথায় ছটফট শুরু করে। আরিশ আরও শক্তভাবে চেপে ধরে। আরিশ কোনো শব্দ উচ্চারণ করে না কিন্তু তার নিঃশ্বাসের উত্তাপই ছিল হুমকির সমান। নাজলীর চোখে এখন বিস্ময় ও ভয় মিশ্রিত তীব্র স্পন্দন। বর্তমানে তার নিঃশ্বাস কাঁপছে প্রচন্ডভাবে। ঠোঁট রক্তিম উঠেছে। কেটে রক্ত বের হচ্ছে অনেক জায়গা থেকে। হৃদস্পন্দন দ্রুততর ভাবে চলছে। আরিশ এখনও স্থির নয়। তার ক্রোধ এখনো শরীরের প্রতিটি পেশীতে টান ধরিয়ে রেখেছে। আরিশ অধৈর্যভাবে নাজলীর ঠোঁটে চুমু খেতে থাকে। আরিশের সাথে পেরে না উঠে নাজলী দেয়ালকে আকড়ে ধরে। আরিশ ঠোঁট ছেড়ে দিয়ে গলায় শক্ত করে কামড় খায়। নাজলী শব্দ করে আর্তনাদ করে উঠে। আরিশ ঘন শ্বাস নিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে নাজীর দিকে তাকিয়ে বলে,

“আমার আগুনে খেলতে এসেছ? এখন জেনে নাও সেই আগুনে কেমন দাহ হয়।”
নাজলী কথা বলার মত অবস্থাতে নেই। ঠোঁটের এমন অজস্র ব্যাথায় চোখ – মুখ খিচে ফেলে। উপর থকে মধুর বয়াম বের করে যতটকু সম্ভব খেয়ে নেয়। ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে হাটু ভেঙ্গে বসে পড়ে। ঠোঁটে স্পর্শ করে কান্না করে উঠে। ব্যাথায় ঠোঁট নাড়াতে পারছে না। এতক্ষন মনে হচ্ছিলো কেউ এসে ঠোঁট দুইটাকে কাটা- ছিড়া করছিলো। এতটা উন্মাদ একটা মানুষ কিভাবে হয়? নাজলী রেগে শক্ত গলায় বলে,
” আমাকে কি শেয়াল ভেবে নিয়েছিলেন? রাক্ষসের মত এমন অদ্ভুত আচরন কেনো করলেন? সাইকো!
আরিশের পুরো মুখ লাল হয়ে আছে। অধরে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলে,
” সামান্য চুমুতেই এই হাল। বেশি তেরিং- বেরিং করলে সোজা বেডে ট্রান্সফার করব। বেডে গেলে মরে – টরেও যেতে পারো।
নাজলী অবাক হয় এমন কথায়। তীব্র ক্ষোভে উঠে দাঁড়ায়। এরপর হালকা হেসে বলে,

” এইবার ভাবেন চাঁদ মামায় ঠিক কত ভোল্টের কারেন্ট আছে। ঠিক কত ভোল্টের কারেন্ট আছে বলোন তো? আমাকে কিছু দিয়ে সাহায্য করুন। দেখি বাজারে বিক্রি করতে পারি কি না। আমি কিন্তু একজন সাইন্টিস্ট। এখনও হয়নি তবে পড়াশুনা চলছে। তার আগেই চেপে ধরে বন্ধী করে ফেললেন। অনেক সময় হসপিটালে দেখতাম দম্পত্তিরা এসে কান্না- কাটি করত।আমাকে কিছু মেডিসিন দিন স্যার আমার চাঁদ মামায় কারেন্ট নেই। ফলে স্ত্রী আমাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যাচ্ছে। আপনি আমাকে কিছু দিয়ে সাহায্য করুন আমি ওদেরকে দিয়ে সাহায্য করব।
আরিশ হতভম্ভ হয়ে যায় নাজলীর কথায়। কপালে ভাঁজ ফেলে চোখ ছোট ছোট করে ফেলে। কপাট রাগ দেখিয়ে বলে,

” ফা**ক….
আর বলতে পারে নি। নাজলী কথাটা সম্পূর্ন করতে না দিয়ে বলে,
” কিছু কারেন্ট ভিক্ষে দিলে দেন। নাহলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবুও সুশীল ইংলিশ গালি দিয়েন না। বুঝতে কষ্ট হয়।
আরিশ চোখ বন্ধ করে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে । তীব্র ক্ষোভে কিচেন রুম থেকে প্রস্থান করে। আরিশের নাজেহাল অবস্থা দেখে নাজলী উচ্চস্বরে বলে উঠে,
” মন – দেওয়া সমাজ মানা। চেংরা বন্ধু কেন বুঝে না। শুধু ধরে পিরিতের বায়না।
আরিশ হয়ত গানটা শুনে নি। নাহলে এমন অদ্ভুত গানের জন্য আবার ও নাজলীকে হেনস্তার স্বীকার হতে হত। নাজলী গম্ভীর হয়ে উঠে। এনির কথা আজ ভীষন পড়ছে। কতদিন হলো বোনটাকে চোখ দিয়ে দেখে না। হাত দিয়ে আদর করে দিতে পারে না। প্রতিটা নরপশুর বিচার হোক। নাজলী ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করেই চোখ খিঁচে ফেলে। বিরবির করে উঠে,

” খেয়ে’ই তো নিয়েছিস। এতটুকু করে আর বাকি রেখেছিস কেনো? সবটা ঠোঁট -ই খেয়ে নিতি। শালা সাইকো! পারদে পারদে উত্তেজনা।
আরিশ রাগ কমানোর জন্য আধা ঘন্টা ব্যয় করে লম্বা শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসে। রুমে ডুক বিছানার উপর চোখ যায়। মেহের এক হাতে কফি অন্য হাতে মোবাইল টিপছে। কফি দেখে বুঝতে পারে নাজলী দিয়ে গিয়েছে। একবার ভেবেছে কফিটা ফেলে দিবে। আবার কিছু একটা ভেবে ডান হাতের সাহায্য নিজের কাপটা তুলে নেয়। আরিশ মেহেরের কাছে গিয়ে বসে বলে,
” পড়াশুনার কি অবস্থা তর? তানভী- ভালোভাবে পড়াচ্ছে?
মেহের হাসি দিয়ে বলে,

” পড়াশুনা তো অনেক ভালো ভাইয়া। কিন্তু তুমি আর নিক কি একটা ঘটনা জানো?
— কি ঘটনা?
— ঘটনা তো একটা ঘটে গিয়েছে ভাইয়া।
–কি ঘটেছে সেটা তো বলবি।
মেহেরর চোখ চিকচিক কর উঠে,
” অধিরাজ ভাইয়া তানভী আপুকে এক্সেপ্ট করেছে। দুইদিন ধরে তারা প্রেম করছে।
আরিশের কপাল কুচকে ফেলে,
” অধিরাজকে পড়ে দেখে নিব। তুই কিভাবে জানলি?
— তানভী আপু বলেছে।
— আচ্ছা।
মেহের মন খারাপ করে বলে,

” সবার ভালোবাসা পূর্নতা পাচ্ছে। আমার ভালোবাসা কবে পূর্নতা পাবে সেটা উপর ওয়ালা জানে। নিক কবে আমার হবে।
আরিশ গম্ভীর হয়ে বলে,
” তর মত নিষ্পাপ ফুল তিমিরে ঢাকা মানবকে ভালোবাসতে কেনো গেলি? নিক অনেক ভয়ানক মেহের।। ভুলে যা ওকে।
নিককে ভুলে যাবে কথাটা ভাবতে গেলেও যেন শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে কেউ কলিজায় ক্ষত – বিক্ষত করে দিচ্ছে। কান্না মিশ্রিত গলায় বলে,
” আবার ও বলছি, কাফনের কাপড়ের ব্যবস্থা করে রেখো। খাটয়া বহন করার মত শক্তি ধরে রেখো ভাইয়া। হয় তাকে আপন করব নচেৎ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করব। তাকে ভালোবেসে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ট কলঙ্কিত নারী হতেও আমি মেহরিমা মেহের রাজি আছি।
আরিশ দুই হাত দিয়ে বোনকে আগলে নেয়। বক্ষের
মধ্যে চেপে ধরে বলে,

” মৃত্যুকে আলিঙ্গন করলে আমাকে ভাই ডেকেছিস কেনো?
— আমাকে অশুভ কথা বলো না ভাইয়া। আমি নিককে প্রচন্ড ভালোবাসি। আপরাধ করি নি। সামান্য ভালোবেসেছি। পূর্নতা কেনো পাব না আমি?
আরিশ সব কথাকে উপেক্ষা করে বলে,
” শরীরের অবস্থা কেমন এখন? মাথা ব্যাথা করে এখনও?
মেহের বিরক্তি নিয়ে বলে,
” প্রতি সপ্তাহে ড. আঙ্কেল ট্রিট – মেন্ট করে যায়। আর এতগুলো মেডিসন দিয়ে যায়। মেডিসিন খেতে আর ভালো লাগে না।

— সুস্থ হয়ে গেলেই আর খেতে হবে না। একা কোথাও যাস না। আমি এখন নিকের কাছে যাব। রাতে এসে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসব।
মেহের উল্লাস কন্ঠে বলে,
” আমিও নিককে দেখতে যাব ভাইয়া। অনেক দিন হলো দেখি না।
আরিশ ঠোঁট ভিজিয়ে আমতা আমতা করে বলে,
” বাহিরে যাব। অন্যদিন যাস।
মেহের মন খারাপ করে সম্মতি জানায়। আরিশ বেরিয়ে যায় রুম থেকে।

সেডেটিভ হ্যাবিচুয়াল ড্রাগ বেশি মাত্রায় দেওয়ার ফলে নিকের জ্ঞান ফিরে প্রায় বারো ঘন্টা পর। এর আগেও অনেক বার ড্রাগ গ্রহন করেছে সে। এখনও করে।।তাই এতটা প্রভাব ফেলতে পারে নি। চোখ খুলে নিজেকে রুমে আবিষ্কার করে কপাল কুচকে ফেলে। মাথা ব্যাথার কারনে কিছু বিশ্রি গালি প্রয়োগ করে। এনি বাড়িতে নেই, পালিয়েছে মনে হতেই শরীরে আগুন জ্বলে উঠে। চোখ বন্ধ করে ঘন ঘন নিশ্বাস টেনে চুল খামছে ধরে। পুরোটা দিন পেরিয়ে যাচ্ছে কোনো খবর পাওয়া যায় নি। বিয়াদব মেয়েটা কার সাথে শান্তির নিশ্বাস ফেলছে!
নিক তীব্র ক্ষোভে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। সব রাগ গিয়ে পড়ে ওর উপর। তখন ড্রাগস পুশ না করলে সে এতক্ষন খুঁজে মাটির নিচে পুতে ফেলত।।তর ব্যবস্থা তো আমি পড়ে করছি। আগে এই মেয়েকে প্রয়োজন আমার। নিক দরজার সামনে আসতেই অধিরাজ বাঁধা দিয়ে বলে,

” বস আপনি অনেক উইক। এখন রেস্টের প্রয়োজন। ম্যাডামকে আমরা খুঁজছি।
অসময়ে অধিরাজের এমন কথায় নিক নিজেকে সামলাতে পারে না। গলা চেপে ধরে ধ্বাক্কা দিয়ে সরিয়ে বলে,
” সর সামনে থেকে। এতক্ষন খুঁজার নামে আমার বাল ফেলেছিস। রিডিউকুলাস!
অধিরাজ চেয়েও আর আটকাতে পারে নি নিককে। গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানকে আটকানোর ক্ষমতা কারোর নেই।
নিঃশব্দ রাতের অন্তরালে নির্জন রাস্তা যেন এক অন্ধকারের সেতু হয়ে উঠেছিল। কেবল চাঁদের হালকা সোনালি আলো পথের কাঁদুনি পাথরে ছায়ার রূপ ধারন করেছে। প্রতিটি পদক্ষেপে বাতাসের ক্ষীণ সুঁকোড়া যেন ঘ্রাণস্বরূপ ভয়প্রদীপ জ্বালাচ্ছে।
রাস্তার দুইধারে গাছগুলো উঁচু চিহ্নিত অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে।তাদের পাতার ফিসফিসানি প্রতিটি কদমে মনে করিয়ে দিচ্ছে কেউ অদৃশ্য চোখ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করছে। প্রতিটি পা রাখা যেন এক অজানা বিপদের দ্বারপ্রান্ত স্পর্শ করছে।

রাত্রির নিস্তব্ধতা যেন চারপাশকে নিঃশব্দ আগ্নিকুণ্ডে পরিণত করেছে। চিত্রা মাসি ঝলমলে আলোয় নিজের পথচলা চালিয়ে যাচ্ছে। বাড়ি থেক খবর এসেছে তার পাশের বাড়ির ইন্দ্রলাল মারা গিয়েছে। সকালে তার শেষ কার্য করা হবে। প্রতিটা কদমে মনে হচ্ছিলো কেউ পিছন পিছন আসছে। প্রতিটি ধাপ যেন ভেসে যাচ্ছিল এক অদৃশ্য শূন্যের মধ্যে। পেছনের ছায়া আছে তবে দেখতে পাচ্ছে না। তার অন্তরাত্মায় ভয়ানক শঙ্কার বীজ রোপণ করছিল।
প্রতিটি কদমে মনে হচ্ছিল কেউ আছে। কেউ পর্যবেক্ষণ করছে নিঁখুতভাবে । বাতাসের ক্ষীণ সুঁকোড়া কানে ভেসে আসছে যেন চিৎকারের আভাস কিন্তু এখানে বাস্তবতা চুপচাপ। চিত্রা বারবার ঘুরে তাকায় কিন্তু অন্ধকারে কেবল কুলপুনির ছায়া ছাড়া কিছুই নেই।
এতক্ষনে তার মনে ভয় ডুকে।শরীর কাঁপছে বাজেভাবে।অস্থিরতা স্পন্দিত হচ্ছে প্রতিটি স্নায়ুতে।
মনের ভুবন চিন্তা করছে,

““এ কি কল্পনা, নাকি বাস্তবতা?”
অবচেতন মনে প্রতিটি ছায়াকে প্রাণহীনভাবে দেখতে পাচ্ছে। পায়ের আওয়াজ যেন রীতিমতো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।প্রতিটি প্রতিধ্বনি তার হৃদস্পন্দনকে আরও দ্রুততর করছে।
ছায়ার অবস্থান হঠাৎ বদলায়।একবার মাথার ওপরে। আরেকবার পায়ের কাছে।তারপর আবার দূরে দেখা যায়। চিত্রার দৃষ্টি ছায়ার প্রতি কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে।তবুও বুঝতে পারছে না এটি মানব না অমানব। নিঃশব্দ রাতের মধ্যে কেবল তার নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে। চিত্রা ভয়ে শুকনো ঢোক গিকে।পায়ের গতি দ্রুত চালাতে থাকে। হুট করে সে থেমে যায়। সামনে বিশাল দেহী একটা কালো হুডি পড়া লোক। চিত্রার চোখ – মুখ আতঙ্কে লাল হয়ে যায়। ভয়ে হিন্দ্রু স্বাস্ত্র – অনুযায়ী রাম.. রাম উচ্চারন করতে থাকে। ছায়া মানবটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে থাকে। চিত্রার কন্ঠস্বর আটকে যায়। গলা দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হচ্ছে না ভয়ে।

নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের মাঝে রাস্তাটি নিস্তব্ধ হয়ে আছে। চিত্রা সাহায্যের জন্য হাত বাড়াচ্ছে। কে এই অবয়ব? সকালে নিকের অদ্ভুত তীর্যক চাহনিটা স্মরনে আসলো। এনিকে পালাতে সাহায্য করেছে সব কিছু আবার জেনে ফেলে নি তো? চিত্রা আৎকে উঠে। মন বলছে নিক অথচ মস্তিষ্ক বলছে এইটা নিক হতেই পারে না। অচেনা ব্যক্তিটা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসল। হাতে ধরা কাচের ভাঙা টুকরা। যেটা ধাতব ছায়ার মতো ঝলমল করছে।প্রতিটি কোণে হিংস্র প্রতিফলন তৈরি করছে। চিত্রার চোখে আতঙ্কের অগ্নিকুণ্ড। শরীর কাঁপছে প্রচন্ড। নিঃশ্বাস খণ্ডিত। কাচের ধার আর হালকা বাতাসে ঝিকঝিক করে ধ্বনিত হচ্ছে। মৃত্যুর এক নিঃশব্দ সুর বাজাচ্ছে। লোকটার প্রতিটি পদক্ষেপে শীতলতা ও ভয় মিলিত হয়ে চিত্রার অন্তরাত্মাকে দমন করছে।

কাচের ধার আঘাতের জন্য প্রস্তুত। লোকটা হাত দিয়ে ঘুরায়। চিত্রা কিছু বলতে যাবে তার আগেই আঘাতের সম্মুখীন হয়।মুহূর্তে টুকরো বাতাসে ঝাপসা হয়ে ঝড়ের মতো ঘূর্ণিত হতে শুরু করে। ঘ্রাণস্বরূপ শীতলতার স্পর্শ আর আঘাতের তীব্রতা শরীরের প্রতিটি স্নায়ুকে বিদ্ধ করে উঠে। কাচের ধার চিত্রার শরীরে আঘাত হানার সঙ্গে সঙ্গে শীতলতা ও ব্যথা তীব্রতায় অন্তরাত্মার গভীরে প্রবাহিত হলো। রক্তপাতের গন্ধ বাতাসে ভেসে উঠে। প্রতিটি শ্বাস যেন লাল তরলের অম্লতার সঙ্গে মিশে যায়। শরীরটা কাঁপছিল অস্থিরতার সর্বোচ্চ মাত্রায় পায়ের মণিকোণ থেকে মাথার শীর্ষ পর্যন্ত প্রতিটি স্নায়ু বিদ্ধবেদনার স্পন্দন অনুভব করছিল।
চোখে আতঙ্কের অগ্নিকুণ্ড, মুখলিপ্তি কুঁচকে গেছে। স্বাভাবিক নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।কেবল হাহাকার ও শ্বাসরুদ্ধ অনুভূতি শরীরের অন্তরঙ্গ প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি ছোট আন্দোলনে রক্তের স্পর্শ তার অনুভূতি জাগাচ্ছে। পিন্ধিত কাঁপন ও আঘাতের শীতলতা মিলিত হয়ে মনস্তাত্ত্বিক আতঙ্কের এক অন্তহীন চক্র সৃষ্টি করছে।

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ২৬

চিত্রার হাত ও পা শিথিল হয়ে গিয়েছে।শারীরিক ও মানসিক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। অন্তরাত্মা তীব্র আতঙ্কের ভারে প্রতিদিনের বোধ থেকে বিচ্যুত করে।এখন প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যুর সীমারেখার কাছাকাছি ধাক্কা খাচ্ছে।
রক্তপাত ও আঘাতের তীব্রতার কারণে তার শরীর ধীরে ধীরে নীরবতা ও দুর্বলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। চিত্রার মুখ বিকৃত হয়ে গিয়েছে। শ্বাস নালি কিছুটা কেটে গিয়েছে। গের গের আওয়াজ বের হচ্ছে। এমন সময় হুডি পড়া লোকটার পৈশাচিক হাসি বেরিয়ে আসলো। রাতের নিস্তব্দতায় হাসিটা কেমন ভয়ানক শুনালো। চিত্রা সামান্য ঠোঁট নাড়িয়ে বলে,
” কে.. তুমি?

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ২৮