দাহশয্যা পর্ব ৯৩
Raiha Zubair Ripti
সাইরেনের শব্দ যেন হঠাৎ আরও তীব্র হয়ে উঠলো। এজওয়ান অ্যাম্বুলেন্স অ্যাম্বুলেন্স করে চিৎকার করে উঠছে, কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে তার। হাত দুটো কাঁপছে, বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে মাহিকে। রক্তে ভিজে গেছে তার শার্ট, হাত, পুরো শরীর।
কয়েকজন অফিসার ছুটে এলো। অ্যাম্বুলেন্স আসতেই স্ট্রেচার নামানো হলো। মাহিকে স্ট্রেচারে তোলা হলো। অক্সিজেন মাস্ক লাগানো হলো। এক প্যারামেডিক দ্রুত প্রেসার চেক করছে, আরেকজন গুলির জায়গা চেপে ধরেছে। এজওয়ানও উঠে বসলো অ্যাম্বুলেন্সে। মাহির হাতটা নিজের হাতে শক্ত করে চেপে ধরে বলছে-
“মাহি… শুনতে পাচ্ছো? চোখ খোলো… আমি আছি তো… আমি চলে আসছি না? আর কোনো ভয় নেই তোমার পাখি। তুমি চোখ খোলো…”
অ্যাম্বুলেন্স ছুটে চললো অন্ধকার চিরে। কিছুক্ষণের মধ্যে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ এক মুহূর্তে সরগরম হয়ে উঠলো। স্ট্রেচার ঠেলে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো মাহিকে। সেই দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো এজওয়ান।
তার বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। চোখ দুটো রক্তিম। হাত দুটো কাঁপছে। স্থির থাকতে পারছে না।
একজন ডাক্তার বের হতেই এজওয়ান ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“ মাহির কি অবস্থা ডক্টর? ও সুস্থ হয়ে যাবে তো?”
ডক্টর সরু চোখে তাকালো।
“ আমরা চেষ্টা করছি। বুলেট দুটো বুকের ভেতর অনেকটা গভীরে ঢুকে গেছে। ”
“ বুলেট ঢুকছে বুলেট বের করুন না শরীর থেকে।
“ অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। ”
হঠাৎ গর্জে উঠলো এজওয়ান।
“ ক্রিটিক্যাল মানে কি আবার? আপনি ডাক্তার না? রোগী বাঁচানো তো ফরজ আপনাদের। বাঁচান! আমার মাহিকে বাঁচান। যা লাগে করুন! টাকা? রিসোর্স? যা লাগে আমি এজওয়ান দিবো!”
ডাক্তার কিছু বলতে গেলে এজওয়ান তার কলার চেপে ধরলো।
“একটা কথা মনে রাখ ডাক্তার। ওর কিছু হলে কিন্তু আমি এই হাসপাতাল জ্বালিয়ে দিবো বলে রাখছি !”
কয়েকজন নার্স আর সিকিউরিটি ছুটে এসে তাকে ধরে সরিয়ে নিলো।
“স্যার! প্লিজ ক্যাল্ম ডাউন!”
কিন্তু এজওয়ান শুনছেই না। তার গলা আটকে গেলো। শব্দগুলো ভেঙে গেলো মাঝপথেই। হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো মেঝেতে। মাথায় হাত দিয়ে বসে শুধু বিড়বিড় করছে-
“কিছু হওয়া যাবে না… মাহির কিছু হওয়া যাবে না…”
সময় যেন থেমে গেছে। এক ঘণ্টা… দুই ঘণ্টা। অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটা এখনো জ্বলছে। এজওয়ান একটুও নড়ে নি। একই জায়গায় বসে ছিলো। চোখ ফাঁকা, অন্তরে ঝড়। ডক্টরা ছোটাছুটি করছে। এজওয়ানের নিজেকে কেমন অসহায় লাগছে। শ্লার একটা মেয়ে তাকে কি থেকে কি বানিয়ে ছাড়লো। এজওয়ান বসা থেকে উঠে হসপিটালের ছাঁদে আসলো। রাতের শেষ ভাগ এখন। এজওয়ান পকেটে হাত গুঁজে রেলিং ঘেঁষে দাঁড়ালো। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ আমি আপনাকে কখনো ডাকি নি,কখনো না। আজও ডাকবো না। আমার বিশ্বাস আপনি মাহির কিছু হতে দিবেন না। আর আমি এটা কেনো জোর গলায় বলছি আপনি সেটাও জানেন। আর জানেন বলেই মাহি কে বাঁচাবেন। আমাকে তো আপনার কাছে যেতে হবে একদিন তাই না? আপনার কাছে যাওয়ার জন্য তো একটা মাধ্যম লাগবে। আমি জানি সেই মাধ্যম মাহি। মাহি কে বাঁচাবেন, আপনিই বাঁচাবেন। পুরো কায়নাত জানে এই চিরন্তন সত্য। ”
সাথে সাথে পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো এজওয়ানের। রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে কিছু বলা হলো। এই সিচুয়েশনে দাঁড়িয়ে থেকেও কিঞ্চিৎ হাসির রেশ দেখা গেলো। ফোন কাটার আগে বলল-
“ আমার বিশ্বাস কখনো অবিশ্বাসে রূপান্তর হয় না। বলেছিলাম না? মিললো তো? ”
অপারেশন থিয়েটারের লাল আলোটা নিভে গেছে শুনেই এজওয়ান নিচে নেমে আসলো। দরজা খুলে ডাক্তার বের হলো ধীর পায়ে। এজওয়ান দৌড়ে গিয়ে দাঁড়ালো সামনে।
“ ডক্টর…? কোনো আজেবাজে নিউজ কিন্তু আমি শুনতে চাই না। মুখ দিয়ে বের হলে কিন্তু পুঁতে রেখে দিব বলে রাখছি। ”
এক সেকেন্ডের নীরবতা থেকে ডক্টর বলল-
“আমরা বুলেট বের করতে পেরেছি। কিন্তু..”
“ আবার কিন্তু বলছিস কেনো? এই জানের মায়া নেই তোর? মে’রে ফেলবো কিন্তু। ”
ডক্টররা বিরক্ত হলো।
“ আমাদের কথা শুনুন হম্বিতম্বি না করে। শক্ত করুন নিজেকে। রক্তক্ষরণ অনেক বেশি হয়েছে। এখনো বিপদ কাটে নি উনার। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
“ মানে বলতে চাইছিস ও বেঁচে আছে? শ্বাস চলছে? ”
“ মৃ’তই বা কখন বললাম আমরা? ”
এজওয়ান চোখ বন্ধ করে ফেললো এক মুহূর্তের জন্য। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বললো—
“ সেটাও ঠিক, আমি ওকে দেখতে চাই…”
“ না করলেও তো শুনবেন না। যান দেখে আসেন। কলিজা ঠান্ডা করেন। এসে থেকেই চড়াও হচ্ছেন শুধু। ”
আইসিইউ তে মাহি শুয়ে আছে। মুখ ফ্যাকাশে। ঠোঁট শুকনো। বুকের উপর ব্যান্ডেজ। এজওয়ান ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো এখনও। সেন্সলেস হয়ে আছে। শ্বাস চলছে ধীর গতিতে।
এজওয়ান খুব আস্তে করে মাহির হাতটা নিজের হাতে তুলে নিলো। রাগ হচ্ছে তার। প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। রাগী গলাতেই বলল-
“ ভণ্ডর বাচ্চা, এত শত্রু জুটিয়েছিস কিভাবে? তোর এত শত্রু থাকবে কেনো বল? কার পাকা ধানে মই দিতে গিয়েছিলি শালি? মে’রে ফেললে কি হতো তখন? আমাকে পাগল বানানোর ধান্দা তোর বান্দির বাচ্চা? যেখানে তুই আমাকে এত জ্বালানোর পরও আমি তোকে কখনো থাপ্পড় দেই নি। ব্যথা পাবি বলে খুব জোরে হাতটা অব্দি ধরি নি। সেখানে ঐ খা**কির পোলারে দু দুটো গুলি মে’রে দিলো তোর বুকে। অবশ্য গুলি টা আমার মারা উচিত ছিলো। হারামির বাচ্চা তোর ঐ বুকে তো আমি নাই। যেই বুকে আমি নাই,সেই বুক কেনো থাকবে অক্ষত বোঝা আমারে? এই শুনছিস এত গুলো কথা যে বললাম? না শোনাই ভালো। তোর জ্ঞান থাকলে জীবনেও এসব বলতাম না সামনে। জ্ঞান নেই বলেই বলছি। বিশ্রী বিশ্রী ভাষায় বকবো আমি তোরে এখন। একটা বকাও কানে নিবি না খবরদার। মরার মতো শুয়ে থাকা? ওঠ তো। তোর নটাঙ্কিপনা দেখি না কতদিন তার খবর রাখিস? জাউরা বেডি,খালি কষ্ট দিতে চায় আমারে। সত্যি সত্যি একদিন ম’রে যাবি দেখিস আমি মরার পর। ”
মেহরিন কে অলংকার পুর নিয়ে আসা হয়েছে। আফিয়া সুলতান কে ঢাকায় শিফট করা হয়েছে। মেহরিন কে বাসায় নিয়ে আসার পরও স্বাভাবিক হতে পারে নি। মেয়েটা রুম ছেড়ে বের হয় না। আলোতে ভয় পায়। অন্ধকার কে আপন করে নিয়েছে। ঠিক মতো খাবার খায় না। সারাক্ষণ কাঁদে। আল্লাহ কে ডাকে। তার অদ্ভুত এক বিশ্বাস তার স্বামী তাকে ছেড়ে যায় নি স্বার্থপরের মতো। সে এখনও আশা নিয়ে বেঁচে আছে রাত পোহালেই তার স্বামী তার আর তাদের অনাগত সন্তানের নিকট ফিরে আসবে । অথচ রাতের পর রাত কেটে ভোর হয়, কিন্তু তার স্বামী আর ফিরে আসে না।
মোতালেব ভুঁইয়া তিনবেলা খাবার নিয়ে আসে রুমে। বলে কয়ে দু লোকমার বেশি খাওয়াতেই পারে না। কাঁদতে কাঁদতে চোখের নিচ টা বসে গেছে, রাত জাগার ফলে কালো হয়ে গেছে। বাতাসি কে ইয়াসিন নিয়ে যায় নি। তাদের মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ হয়েছে। বাতাসি আলাদা রুমে থাকছে সেরিনের সাথে মেহরিন দের বাসায়। মেহরিনের রুমে থাকা হচ্ছে না। মেহরিন রুম অন্ধকার করে রাখে সবসময়। কারো সাথে কথা বলে না। ইতি বেগম ঊর্মি এসে পাশে বসে থাকো কতক্ষণ। মেহরিন হয়তো খেয়ালও করে না। ইমন আসে মহাদেবপুর। কিন্তু মেহরিন কে সে দেখতে পারে না। মেয়েটা যে রুম থেকেই বের হয় না। আর রুমে ঢুকে মেহরিন কে দেখাটাও দৃষ্টিকটু। তবে রোজ আসে মেহরিন দের বাড়ি। মোতালেব ভুঁইয়ার সাথে কথাবার্তা বলে। এরমধ্যে একদিন খবর আসলো ইব্রাহিম মেহরিন কে ডেনমার্কেে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। স্বামীর কবরটা নাকি তার দেখা উচিত। কিন্তু মেহরিন যাবে না বলে দিলো। কিসের কবর? তার স্বামী বেঁচে আছে না? তাহলে কবর দেখতে যাবে কেনো? ইব্রাহিম একটু জোরই করলো ফোনে। কিন্তু মেহরিন তো মেহরিনই। যাবে না। ইব্রাহিমের ফোন তার কাছে দিতে মানা করে দিলো তার বাবা কে। ইব্রাহিম দিনে দশ-বারোবার ফোন করতো। কিন্তু মেহরিন রাজি হয় নি। ঊর্মিও রেগে গেলো ইব্রাহিমের উপর। মেহরিন যাবে না বলছে তারপরও কেনো জোর করছে? বাশার সুলতান ও ফোন করে ধমকালো। ভাইস্তা বেঁচে নেয়,সেখানে ইব্রাহিম কি করে ডেনমার্কে নিয়ে যেতে চায় মেহরিন কে ? তাও আবার একা? ইব্রাহিম এরপর আর ফোন করে নি।
মাহির জ্ঞান ফিরেছে। হসপিটালের সব বিল এজওয়ান পেমেন্ট করে কেবিনে আসতেই দেখলো সাফওয়ান কে। মুহূর্তে চোখ মুখ রাগে ফেটে যেতে লাগলো। এই গোলামের পুত এখানে আসলো কি করে? মাহি আবার তাকিয়ে আছে সাফওয়ানের দিকে।
সাফওয়ানের চোখ মুখ শুষ্ক। মাহির এই খবরটা পেয়েই সে ছুটে এসেছে হসপিটালে। এতক্ষণ বসে ছিলো। মাহির জ্ঞান ফিরতেই সে মাহির হাতটা ধরতে চাইলে পেছন থেকে এজওয়ান হুংকার দিয়ে বলে-
“ জাস্ট টাচ হার,আই উইল কিল ইউ। ”
সাফওয়ান পেছনে তাকালো। এজওয়ান কে দেখে বসা থেকে দাঁড়াতেই এজওয়ান এগিয়ে এসে সাফওয়ান কে বা হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়ে নিজে দাঁড়ালো মাহির কাছে।
“ জাস্ট স্টে অ্যাওয়ে ফ্রম হার,অ্যান্ড হোয়াই আর ইয়্যু হিয়ার ? ”
সাফওয়ান ভ্রু কুঁচকালো এ কথা শুনে।
“ আমি এখানে মানে? অস্বাভাবিক আসাটা? মাহির এই অবস্থা আর আমি আসবো না?”
“ না আসবেন না। হু আর ইয়্যু?”
“ ইয়্যু নো দ্যাট ভেরি ওয়েল। ”
“ নো,আই ডোন্ট নো। ”
“ জানেন না যখন তাহলে শুনুন। আমি সেই ব্যক্তি যার থেকে আপনি মাহিকে জোর করে কেঁড়ে নিয়েছেন। আমি তার সেই ভালোবাসা..”
“ : জাস্ট কিপ ইয়োর মাউথ শাট। ভুল ভাবনা এটা। মাহি শুরু থেকেই আমার ছিলো। সেজন্য মাহি আমার হয়েছে। ”
“ হয়েছে? জোর করে করেছেন। ”
“ এটা ভেবেই তাহলে নিজের মন কে শান্তনা দিন। ট্রাস্ট মি সেদিন যদি জানতাম আপনাকে বাঁচাতে গেলে আমার গায়ে এসে গুলিটা লাগবে,ট্রাস্ট মি আপনাকে আমি কোনোদিনই বাঁচাতাম না। আপনি মরে গেলে একটা দুশ্চিন্তা অন্তত কমতো আমার। ঘাড়ের উপর চেপে বসে আছেন আপনি। নামার নামই নিচ্ছেন না মিয়া। এখন বের হন তো। ”
কথাটা বলে এজওয়ান মাহির দিকে তাকালো। বিরক্তিতে তার চোখ মুখ কুঁচকে আছে। এই অসুস্থ শরীর নিয়ে কার এমন ঝগড়াঝাটি ভালো লাগে?
“ উফ থ..থামুন না আপ..আপনারা। সা..সাফওয়ান আপনি আসুন এখন দয়া করে। অ্যাম ফাইন। ”
“ কিন্তু মাহি…”
“ আই স্যেইড গো। ”
সাফওয়ান চলে গেলো। তবে দেশ ছেড়ে নয়,হসপিটাল ছেড়ে।
এজওয়ান মাহির মাথার কাছটায় বসলো। মাহির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-
“ এমন ছ্যাচড়া ছেলের কি দেখে ভালোবেসেছিলে তুমি তরিকুলের বেটি? পুরাই বিরক্তিকর। ”
মাহি চোখ পাকিয়ে তাকালো। এজওয়ান নিজে কম ছ্যাচড়া নাকি? আসছে আরেকজন কে ছ্যাচড়া বলবে। বিশ্বের এক নম্বর ছ্যাচড়া লোক এজওয়ান সুলতান।
“ আ…আমার আপনাকে ক..কিছু দেখানোর আছে। ”
এজওয়ান চোখ টিপে বলল-
“ সুস্থ হও আগে,তারপর ট্রাস্ট মি তোমার সব কিছু দেখবো আমি। মানে সব কিছু। পুরো মনোযোগ সহকারে। ”
মাহি চিমটি দিলো এজওয়ানের হাতে।
“ সব সময় শুধু ফাজলামো। অ্যাম সিরিয়াস। ”
“ অ্যাম টু সিরিয়াস। ”
“ ফাজিল। বেঁচে ফিরলাম কেনো। যত্তসব নাটক দেখার জন্য? ”
“ না শুধুমাত্র আমাকে উদাম শরীরে দেখার জন্য। ইয়্যু নো হোয়াট আই মিন? ”
মাহি মুখ ফিরিয়ে নিলো। ধূর এই খবিশের সাথে অসুস্থ শরীর নিয়ে কথা বলে শরীর খারাপ করার কোনো মানে নেই। সুস্থ হলেই বলবে।
আফিয়া সুলতানকে হাসপাতাল থেকে সুস্থ অবস্থায় সুলতান নিবাসে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিছুদিন তিনি তুলনামূলক ভালোই ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই আবার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে খবর পৌঁছে যায় নওগাঁয়।
মোতালেব ভুঁইয়া সিদ্ধান্ত নেন ঢাকায় যাওয়ার।মেহরিনকে জিজ্ঞেস করলো যাবে কি না। আশ্চর্য ভাবে মেহরিন রাজি হলো যেতে।
মোতালেব ভুঁইয়া মেয়েকে নিয়েই ঢাকা গেলেন। প্রথমে আফিয়া সুলতান কে দেখতে হসপিটালে গেলেন। আফিয়া সুলতান মেহরিনের হাত চেপে ধরেছিলেন যতক্ষণ মেহরিন ছিলো ততক্ষণ। সন্ধ্যা হতেই মেহরিন কে নিয়ে নিবাসে আসেন মোতালেব ভুঁইয়া। মেহরিন নিজেদের রুমে এসে ঢুকলো তো ঢুকলোই আর বের হতে চাইলো না। রাতের খাবার ম্যেড এসে দিয়ে গেলো। মোতালেব ভুঁইয়া পেছন পেছন এসে মেয়েকে হাল্কা করে খাইয়ে দিয়ে শুয়ে পড়তে বললেন। মেয়েকে সাথে করেই ফিরবেন আবার দুদিন পর মহাদেবপুর। মোতালেব ভুঁইয়া দরজা দরজা টেনে তিনি বেরিয়ে যান।
কিন্তু দরজা বন্ধ হওয়ার পরই মেহরিন ভেঙে পড়ে। ফ্লোরে বসে বিছানায় মাথা রেখে নীরবে চোখে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগলো। এই তো তাদের রুম। অথচ রুমের মালিকটাই নেই। বেডের পাশে টেবিলটায় তার আর সোলেমানের একটা সুন্দর কাপল ছবি। মেহরিন সেটা নিলো হাতে। ছবির উপর আঙুল ছুঁইয়ে দিয়ে বলল-
“ আসেন না কেনো আপনি? আর কত দেরি হবে? দয়া করে তাড়াতাড়ি আসুন ফিরে। আমাদের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। ইব্রাহিম ভাইয়া কার না কার যেন কবর দেখাতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আমি মানা করে দিছি। অন্যের কবর দেখতে আমি যাব কেনো বলুন? যাই নি তাই। শুনুন আসার পথে সাথে করে একটা প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসবেন। আমাদের ছেড়ে আর দূরে যাবেন না কখনো। আমাদের এভাবে আর কষ্ট দিবেন না….”
এমন আরো কত-শত কথা বলতে বলতে মেহরিন এক সময় ওভাবেই ঘুমিয়ে যায়। রাত যখন তিনটে বাজে তখন হঠাৎ করে মেহরিনের মনে হলো কেউ তার সামনে বসে আছে। তার মাথায় হাত বোলাচ্ছে। কারো গরম নিশ্বাস তার চোখ মুখে এসে পড়ছে। নড়েচড়ে উঠলো মেহরিন। সাথে সাথে ভেসে আসলো পরিচিত গলায়…
“ মেহরিন..”
ঘুমের মধ্যে কেঁপে উঠলো মেয়েটা। অজানা এক অস্থিরতায় সাথে সাথে চোখ মেলে তাকালো। আর তখনই তার নজরে আসলো সাদা টি-শার্ট আর সাদা চাদর চাদর গায়ে দেওয়া সোলেমান কে। কপালে ব্যান্ডেজ তাতে শুকনো রক্ত লেগে আছে,গালে ব্যান্ডেজ। মেহরিন সাথে সাথে পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পরলো লোকটার উপর। গালে কপালে অসংখ্য চুমু খেয়ে কান্না করতে করতে বলল-
“ আপনি এসেছেন! এসেছেন আপনি! আমি জানতাম আপনি আসবেন। আমাকে ছেড়ে আপনি থাকতেই পারবেন না। আমি জানতাম সেটা। আর যাবেন না তো আমাকে ছেড়ে বলুন?”
সোলেমান দু দিকে মাথা নেড়ে না জানালো।
“ সোলেমান কি তার বউ সন্তানকে ছাড়া থাকতে পারে বলো? ”
“ না পারে না। ”
“ তাহলে তো আমার ফেরাটা অনিবার্য ছিলো। ”
“ জানেন সবাই ভুলভাল কথা বলছিল? বলছিল আপনি নাকি মা-রা গেছেন। আমি বিশ্বাস করি নি। একটুও করি নি বিশ্বাস। ”
“ বিশ্বাস করো নি বলেই কি হার্ট অ্যাটাক করেছিলে? “ কথাটা শেষ করেই সোলেমান বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো মেহরিন কে। তারপর আবার বলল- “ মেহরিন, বোকা মেয়ে, আমার মৃত্যুর খবর শুনে তুমি এভাবে কাঁদলে কেনো? মৃ’ত্যু তো এক চিরন্তন সত্য। সবাই কেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়। কেউ আগে করে তো কেউ পরে। আমি না হয় আগেই করলাম। তাই বলে তুমি এভাবে কেঁদে কেঁদে নিজের ক্ষতি করবে! ”
সাথে সাথে মেহরিন শক্ত করে চেপে ধরলো।
“ এত তাড়াতাড়ি কেনো ছেড়ে চলে যাবেন আপনি? আমাদের সংসার করা বাকি এখনও। সন্তান মানুষ করা বাকি। বৃদ্ধ বয়সে হাতে হাত রেখে হেঁটে চলা বাকি। কত কিছু বাকি। প্লিজ এসব বলবেন না। ”
“ আচ্ছা বলবো না। শুনেছি,অনেক গুলো রাত তুমি ঘুমাও নি। আজ ঘুমাবে? আমি আছি তো পাশে। ঘুমাও তো লক্ষীটি। ”
সোলেমান মেহরিন কে উঠিয়ে বিছানায় শোয়ালো। মেহরিন লক্ষ করলো সোলেমান খুঁড়িয়ে হাঁটছে। পায়ের দিকে লক্ষ্য করে বলল-
“ পায়ে কি হয়েছে আপনার?”
“ কিছু হয় নি মেয়ে। তুমি ঘুমাও। ”
মেহরিন সোলেমান কে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর চেষ্টা করলো। সোলেমান মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। একসময় মেহরিন সত্যি সত্যি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো।
বাশার সুলতানের তেষ্টা পাওয়ায় কারনে ঘুম ভেঙে যায়। বেডের পাশ থেকে জগ নিয়ে গ্লাসে পানি ঢেলে সেই গ্লাস নিয়ে জানলার কাছে দাঁড়ায়। মুখে পানি নিয়ে কুলি করে পানি খেতে নেওয়ার সময় তার চোখ যায় গেটের বাহিরে। সাদা চাদর পড়া একজন লোক কালো গাড়িতে উঠে চলে যাচ্ছে।
বাশার সুলতান সাথে সাথে সিকিউরিটি গার্ড কে ফোন করলো। জিজ্ঞেস করলো-
“ কে এত রাতে নিবাস থেকে বের হলো? ”
সিকিউরিটি গার্ড বলল-
দাহশয্যা পর্ব ৯২ (৩)
“ ইব্রাহিম পাশা। ”
বাশার সুলতান চমকালো। ইব্রাহিম! কিন্তু ও তো ডেনমার্কে! বাশার সুলতান ফোনটা কেটে ইব্রাহিম কে কল লাগালো। ইব্রাহিম রিসিভ করতেই বাশার সুলতান বলল-
“ তুই বাংলাদেশে এসেছিস? সিকিউরিটি গার্ড যে বলল। ”
“ হ্যাঁ চাচা। নিবাসেও গিয়েছিলাম একটা কাজে। এখন বাসায় যাচ্ছি। ”
“ কি কাজ ছিলো তোর নিবাসে?”
“ সোলেমানের কিছু ফাইল নিতে এসেছিলাম। সকালে দেখা হচ্ছে আপনার সাথে। ঘুমোচ্ছিলেন বলে ডাকি নি আর। ”
