Home বুনো মেঘের হাতছানি বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৯

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৯

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৯
ইসরাত জাহান দ্যুতি

কেবিনে এখন কেবল ওরা দুজন। দরজার ওপাশে মিরান, দিব্যর পায়ের শব্দ মিলিয়ে যেতেই ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে এল। জহুরি চোখে মারিশাকে আগাপাছতলা খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে আশফি হঠাৎ ওর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। ​গম্ভীর গলায় সে আচমকা প্রশ্ন করে বসল, “এই হাড়জিরজিরে দুর্বল শরীরে কতটা এনার্জি আছে, হুঁ?”
​মারিশা বিছানায় বসে পা দোলাচ্ছিল। প্রশ্নটা শুনে ওর চপলতায় যেন কিছুটা ভাটা পড়ল। তবে চেহারায় সেই রেশটুকু দীর্ঘস্থায়ী হতে দিল না সে। বড়ো বড়ো চোখে একরাশ নিষ্পাপ বিস্ময় মেখে না বোঝার ভান করে পালটা প্রশ্ন করল, “মানে? কিসের এনার্জি?”

​আশফি উত্তর দিল না। সে মারিশার একদম মুখোমুখি হয়ে নিচু হলো, যেন ওর চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো সত্যকে টেনে বের করতে চাইছে।
​“আমি ভাবছিলাম”, অত্যন্ত ধীরলয়ে, প্রতিটি শব্দ মেপে মেপে বলল সে, “যে মেয়েটা ঠিকমতো উঠে দাঁড়াতে পারে না, সে কীভাবে অন্য একজনকে টেনে তোলার মতো গায়ের জোর পায়? আর টেনে তুলতে গেলে তো মানুষের হাত সাধারণত বাহু বা কোমরে থাকে। কিন্তু তার বদলে আঙুলের ছাপ যদি গলার ওপরের পাতলা চামড়ায় গিয়ে পড়ে, সেটা কেমন অস্বাভাবিক দেখায় না?”
এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল ​মারিশার হৃদস্পন্দন। আশফি তবে দিলিশার গলার সেই লালচে দাগটা লক্ষ করেছে? এবং সেটাকে কেবল ‘মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া’ বলে মেনেও নেয়নি?
কিন্তু, ধরা পড়েও ওর ঠোঁটের কোণে সেই মায়াবী মুচকি হাসিটা অমলিন রইল। হঠাৎ ডান হাতটা বাড়িয়ে আশফির বাঁকা হয়ে থাকা শার্টের কলারটা ঠিক করে দিল। তারপর ফিসফিসিয়ে বলল, “জানিম, জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে সব সময় সতর্ক থাকাটা অভ্যাস তোমার। তাই সব কিছু নিয়ে একটু বেশি বেশিই ভেবে ফেলো আরকি। বিপদের সময় মানুষ যে কোথা থেকে জান্তব শক্তি পায়, তা কি সে জানে? যেমন ভালুকের সামনে মরতে বসেও তুমি কী জোশ নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলে আর বাঁচিয়েও নিয়েছিলে আমাকে!”

কথাগুলো বলেই এবার একটু গম্ভীর হলো মারিশা। ভারী কণ্ঠে বলল, “আমি তো শুধু চাইছিলাম ওকে হেল্প করতে। অথচ তুমি আমাকে সন্দেহ করছ!”
মুচকি হাসল আশফি। ওর গালে আঙুলের পিঠ ছুঁইয়ে আলতো করে ঘষল৷ কিন্তু চাউনিতে তার এক রহস্যময় কাঠিন্য। ফিসফিসিয়ে সেও বলল, “সন্দেহ নয়। আমি শুধু বোঝার চেষ্টা করছি আমার সেই চড়ুই পাখিটা কী করে বাজপাখি হতে শিখে গেল! একটা কথা মনে রেখো, জান। যতই বাজপাখি হও আর দুর্ধর্ষ শিকারী, আমার কাছে তুমি সেই তিড়িংবিড়িং করে বেড়ানো ছোট্ট চড়ুইটাই। এবং আজ থেকে তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাসের খবরও আমি রাখব৷ ফুড়ুৎ করে পালিয়ে যাবার সুযোগটা এবার আর পাবে না।”
কথাগুলো শুনতে খুব একটা মন্দ লাগল না ​মারিশার। আবার ভালোও লাগল না এই ভেবে, আশফি সরাসরি প্রকাশ করছে তার ওপর আজ থেকে কড়া নজরদারি রাখবে সে৷ কিন্তু এই নজরদারিটাই গত চার বছর ধরে সে প্রচণ্ড ঘৃণা করে।

গোধূলির মায়াবী আভা ফিকে হয়ে আসতেই পোখরার আকাশ জুড়ে নামল এক মায়াবী নীল সন্ধ্যা। লেকের শান্ত বুকে বিকেলের কাঁচা সোনার ঝিলিক মুছে গিয়ে এখন সেখানে জেঁকে বসেছে এক গম্ভীর অন্ধকার। ওপরের আকাশে প্রথম ফুটে ওঠা তারকারাজি সেই স্থির জলে হীরের কুচির মতো টিমটিম করে জ্বলছে। ওপাড়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ছোটো ছোটে নেপালি জনপদগুলোতে একে একে জ্বলে উঠছে ম্লান আলোকবিন্দু। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কে যেন নিকষ কালো পাহাড়ের গায়ে হাজার হাজার রূপোলি জোনাকি ছড়িয়ে দিয়েছে।
​নিঝুম ঘরের ভেতর মখমলি রেশমি চাদরের ওমে মারিশা ঘুমাচ্ছিল। তন্দ্রাটা যখন ভাঙল ওর, তখন ঘরজুড়ে এক জমাট বাঁধা অন্ধকার। ওষুধের প্রভাবেই নাকি মনের শান্তিতে কে জানে, দুপুরে সবার সাথে বসে খাওয়া-আড্ডা শেষে বিছানাতে আসতেই অবশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে।

শিয়রের কাছের ল্যাম্পশ্যাডটা নেভানো, তাই ঘরের কোণগুলো কালচে ছায়ায় ঢাকা পড়ে আছে। আড়মোড়া ভেঙে বিছানাটা ছাড়ল সে। তখনো ওর চেতনার ওপর যেন ঘুমের এক পাতলা আস্তরণ লেগে আছে। ঘরের চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে অলস পায়ে, পা টেনে টেনে সে জানালার দিকে এগিয়ে গেল। ভারী পর্দাটা সরিয়ে কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা এক টানে খুলে দিতেই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে পড়ল পাহাড়ের হাড়কাঁপানো হিমেল হাওয়া।
তারপর বারান্দায় পা রাখতেই ওর চোখের সামনে উন্মোচিত হলো এক রূপকথার মায়াজাল। ফেওয়া লেকের বুক চিরে আসা কুয়াশার পাতলা চাদর এখন রিসোর্টের রেলিং অবধি উঠে এসেছে। নিচে লেক সাইডের সরু রাস্তাটা আবছা হলুদ আলোয় ভিজে আছে, আর তার ওপারেই অতলান্ত কালো জলরাশি। মাঝে মাঝেই লেকের শান্ত বুকে কোনো মাছের লাফালাফি কিংবা দূর থেকে আসা নৌকার লগি ঠেলার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ গভীর নিস্তব্ধতাকে আরও মোহনীয় করে তুলছে।

বারান্দার রেলিংটা এখন তুষারশীতল। সেখানে হাত রাখতেই মারিশার শরীরে একটা মৃদু কাঁপুনি খেলে গেল। কিন্তু মনটা ওর বুঁদ হয়ে রইল পোখরার সৌন্দর্যে। পাহাড়ের চূড়াগুলো এখন আর দেখা যাচ্ছে না, মেঘের ঘন আস্তরণ সেগুলোকে যেন আড়াল করে রেখেছে। কেবল মাছপুছরের সেই রুপোলি আভাসটুকু মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে, যেন কোনো এক মহাজাগতিক পাহারাদার নীরবে তাকিয়ে আছে এই পৃথিবীর দিকে। বাতাসের ঝাপটায় মাঝে মাঝেই পাইন বনের চেনা সোঁদা গন্ধ আর ভিজে পাথরের ঘ্রাণটা নাকে এসে লাগছে।
পাহাড় থেকে বয়ে আসা কনকনে হিমেল হাওয়ার ঝাপটায় মারিশার পাতলা শরীরটা আরেকবার কেঁপে উঠল। কিন্তু তন্দ্রার ঘোর কাটিয়ে সে কেবল অপলক চেয়ে দেখতে লাগল ফেওয়া লেকের ওপাড়ে, পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা নেপালি গ্রামগুলোর আঁকাবাঁকা আলো আর দূর থেকে ভেসে আসা লেক সাইডের হোটেলগুলোর উজ্জ্বল আলোকসজ্জার দিকে।

পাহাড়ের বুকে এমন এক নির্জন রিসোর্টে আশফির সঙ্গে একাকী মুহূর্ত কাটানোর কত শত স্বপ্নই না সে একসময় বুনেছিল! মনে পড়ে গেল, বিয়ের পর সে একবার আশফিকে মজার ছলেই বলেছিল, ওদের বাসর রাতটা হতে হবে কোনো পাহাড়ের চূড়ায়৷ যেখানে মেঘেরা জানালার কার্নিশে এসে ভিড় করবে, বারান্দায় দাঁড়িয়ে দুজন এক সঙ্গে সূর্যদয় আর সূর্যাস্ত দেখবে, সকালের মিষ্টি রোদ গায়ে মাখবে, আর দূর পাহাড়ের বুকে জন্মানো বুনো গন্ধরাজের ঘ্রাণ টেনে নেবে সে প্রাণ ভরে।
তবে ​আশফি কিন্তু ওর সেই পাগলামি মোটেও হেসে উড়িয়ে দেয়নি। বরং ভালোবেসে সাজিয়েছিল সবটুকু। বান্দরবানের নীলগিরিতে পাহাড়ের একদম শেষ প্রান্তের এক নির্জন কটেজ বুক করেছিল। কথা তো ছিল, বিয়ের পর ওদের এক সাথে কাটানো প্রথম রাতটা সেখানেই পার করবে। কিন্তু ভাগ্যের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! সেই দিনেই দুজনের জীবনের মোড়টা ঘুরে গিয়েছিল। আশফিকে চরম ধোঁকা দিয়ে, ওর সাজানো স্বপ্নগুলোকে চুরমার করে দিয়ে মারিশা সেদিন ইস্তাম্বুলের আকাশে উড়াল দিয়েছিল।
আজ সেই পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরির সামনে থমকে দাঁড়িয়ে মারিশার বুকের ভেতরটা যন্ত্রণায় এতই ভারী হয়ে এল যে ওর মনে হলো, সামনের এই বিশাল পাহাড়টা বুঝি ওর পাঁজরের ওপর চেপে বসেছে … ওর নিঃশ্বাস নেওয়ার সবটুকু পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে। পুরনো সেই ধোঁকার বিষাক্ত স্মৃতি আর অনুশোচনার ভার বইবার ক্ষমতা যে ওর এই দুর্বল দেহমনে নেই।

আজ সে ঠিকই পাহাড়ের কোলে দাঁড়িয়ে আছে, পাশে আশফিও আছে। কিন্তু মাঝখানের সেই বিশ্বাস আর ওদের নিখাদ ভালোবাসাটুকু যেন কুয়াশার মতো ধূসর হয়ে গেছে। ভাঙা সেই সবটা পুনরায় জোড়া লাগালেও ফাটলের দাগটা যে আজীবন রয়েই যায়।
নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকা মারিশা হঠাৎ একটু থমকাল যেন৷ ওর ষষ্ঠেন্দ্রিয় জানান দিল, এই জনমানবহীন অন্ধকার বারান্দায় সে একা নয়। কেউ একজন তার খুব কাছেই বসে আছে, তাকে দেখছে। সন্তর্পণে ঘাড়টা ঘুরিয়ে বারান্দার এক কোণে রাখা ছায়াবৃত সোফাটার দিকে তাকাল সে।
নিকষ অন্ধকারের চাদর ফুঁড়ে এক দীর্ঘ অবয়ব ওখানে বসে আছে স্থিরভাবে, পাথরের মূর্তির মতো। হাতের আঙুলের ফাঁকে ধরা জ্বলন্ত সিগারেটের লালচে আভাটা অন্ধকারের বুকে একবার দপ করে জ্বলে উঠছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। সেই কড়া তামাকের ধোঁয়ার কুণ্ডলীগুলো নৈশ বাতাসের ঝাপটায় মারিশার নাকে এসে আছড়ে পড়ল। সে আর কেউ নয় — আশফি! কতক্ষণ ধরে বসে আছে মানুষটা? ও যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল, তখন থেকেই কি ওকে পাহারা দিচ্ছিল? না-কি ওর প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিকে ব্যবচ্ছেদ করছিল?

আশফির বসে থাকার ভঙ্গিটা আজ বড্ড গুমোট আর পাথুরে লাগল ওর কাছে। এক হাত সোফার হাতলে শিথিলভাবে এলিয়ে দেওয়া তার, অন্য হাতে বিষাক্ত নিকোটিনের কাঠি। কোনো কথা বলছে না, নড়ছেও না। যেন কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ নয় সে। বরং এই পাহাড়ের বিষণ্ণ কোনো ছায়া। যে কেবল অন্ধকারের আড়াল থেকে তার সেই তীক্ষ্ণ আর ভেদনকারী নজর দিয়ে ওকে বিদ্ধ করছে। কিন্তু সেই চাউনিতে আজ কোনো অভিযোগ নেই, কোনো কাঠিন্য নেই, নেই কোনো পুরনো হিসেব নিকেশের কড়াকড়ি। আছে কেবল এক বুক হাহাকার, এক অদ্ভুত নিস্পৃহতা আর না পাওয়ার তীব্র দহন।
মারিশার মনে হলো আশফি যেন এই মায়াবী অন্ধকারের চাদরে মোড়া এক বিষণ্ণ জাদুকর। যে ওর প্রতিটি নিঃশ্বাসের শব্দে নিজের হারানো স্বপ্নগুলোকে খুঁজে ফিরছে। যেন সে জেনে গেছে, সামনের মানুষটা তার হয়েও কোনোদিন তার ছিল না।

অর্ধেক শেষ করা সিগারেটটা ছাইদানিতে সজোরে পিষে দিয়ে ধীরপায়ে উঠে এল সে। মারিশার খুব কাছে এসে দাঁড়াতেই এবার কড়া নিকোটিনের ঘ্রাণ ছাপিয়ে এক বুনো ফুলের তীব্র সুবাস আছড়ে পড়ল ওর নাসিকারন্ধ্রে। ভ্রুজোড়া হালকা বাঁকা দেখাল ওর। আরে, এ তো ওরই পারফিউম! কিন্তু সেটা আশফির শরীরের তপ্ত ভাঁজ থেকে চুঁইয়ে আসছে যে? অদ্ভুত তো! লোকটা কি আজ-কাল ওর পছন্দের পারফিউমটাও নিজের করে নিয়েছে না-কি? তাই বলে লেডিস পারফিউম?
সে যখন এই সাধারণ হিসাব মেলাতে ব্যস্ত, ঠিক তখনই আশফির শান্ত কণ্ঠস্বর কানে এল। ​খুব নিচু স্বরে, জিজ্ঞেস করল সে, “কেমন লাগছে?”

মারিশার মনে হলো, আশফি যেন স্রেফ এই পাহাড় আর লেকের সৌন্দর্যের কথা বলছে না। তার ওই নিচু স্বরে করা প্রশ্নের আড়ালে ওর মনের কোনো গহীন কোণের গোপন খবরের হদিসও নিতে চাইছে সে। তার কণ্ঠস্বরে আজ এক অদ্ভুত মায়া, এক সম্মোহনী টানটাও অনুভব করল। যেটা ওকে মুহূর্তের জন্য আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতে চাইল। সে পলকহীন চোখে একবার আপাদমস্তক দেখে নিল পুরুষটিকে।
অন্ধকারের আবছায়াতেও তাকে আজ বড্ড অচেনা আর রাজকীয় লাগছে ওর কাঝে। তার পরনে নেভি ব্লু রঙের ফিটেড হাই-নেক সোয়েটারটা তার ছিপছিপে আর দীর্ঘদেহী গঠনের সাথে একদম মানিয়ে গেছে। নিচে কালো রঙের ফিটেড ট্রাউজার। সোয়েটারের হাতা দুটো কবজি পর্যন্ত গুটানো, যেখানে তার হাতের টানটান শিরাগুলো আবছা আলোয় ধরা পড়ছে৷ আর এটা কোনো কৃত্রিম জিমের ব্যায়ামে নয়, বরং যেন কোনো বরফঢাকা পাহাড়ের পাথুরে চড়াই-উতরাই ভেঙে গড়া। সোজা আর দৃঢ় কাঁধ দুটোর ওপর এক টুকরো ধূসর মাফলার জড়ানো, বাতাসের ঝাপটায় সেটা তার চওড়া বুকের ওপর এসে আছড়ে পড়ছে বারবার।
এই হিমশীতল নির্জনতায় আশফির শান্ত অবয়ব আর তার শরীর থেকে ভেসে আসা নিজের প্রিয় পারফিউমের সুবাস, সব মিলিয়ে মারিশার বুকের ভেতরটা যেন ওলটপালট হয়ে যাচ্ছিল।

“ভালো লাগছে না?” আশফি আবার জিজ্ঞেস করল। সেই সাথে তার গাঢ় চাউনি মারিশার সারা শরীরে এক অবাধ্য তৃষ্ণা নিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল।
সেই দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা অনুভব করতেই মারিশা আড়ষ্ট হয়ে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে চোখ সরিয়ে নিল নিচের অন্ধকার লেকের দিকে। কণ্ঠস্বর যতটা সম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে নিচু স্বরে পালটা প্রশ্ন করল, “কোনটা? পাহাড়, নাকি অন্য কিছু?”
আশফি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সে ধীরপায়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে এল। এতটাই কাছে যে, এই হাড়কাঁপানো শীতের মাঝেও মারিশা ওর শরীরের উত্তাপ টের পাচ্ছিল।
দু’হাত ট্রাউজারের পকেটে পুরে আশফি ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল, “স্পেসিফিকলি কোনোটার ব্যাপারে তো জিজ্ঞেস করিনি৷ সবটা মিলিয়েই জানতে চাইলাম।”

​বলেই সে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল দূরের মাছপুছরের দিকে। তখস মারিশা চুরি করে কয়েকবার তাকাল ওর ঋজু অবয়বের দিকে। দূরের ওই নিঝুম পাহাড়, লেকের বুক চিরে জেগে থাকা টিমটিমে আলো, আর এই মায়াবী সন্ধ্যার অপার্থিব সৌন্দর্যের মাঝে একদম নিরালায়, একান্তে নিজেদের এই মুহূর্তটা ঠিক কেমন হতে পারে, তা সে মুখ ফুটে বলতে পারল না। বুকের ভেতর হুটোপুটি খেতে থাকা অনুভূতিগুলোকে চেপে রেখে জড়তা জড়ানো গলায় বলল, “পাহাড়! সে তো রোজই দেখা হয়। নতুন আর কী?”
মুহূর্তেই ঘাড় বাঁকিয়ে তাকাল আশফি। ওর কণ্ঠে এবার হালকা বিস্ময় আর প্রচ্ছন্ন এক অধিকারবোধ, “নতুন কিছুই নেই?”

মারিশা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সে বুঝতে চেষ্টা করল, লোকটা কি কোনো ইশারা দিচ্ছে? এক মুহূর্তের জন্য ওর মনেও হলো, তার ওপর নিশ্চয়ই দুষ্টুমির ভূত চেপেছে। কিন্তু আশফির ভাবভঙ্গিমায় তেমন চপলতা নেই। তাই বিভ্রান্ত হলো সে। সেটা লুকিয়ে স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করে জবাব দিল, “কী আছে? আমি তো নতুন কিছু পাচ্ছি না।”
আশফি তখন এক মুহূর্ত নীরবে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকল ওর দিকে। তারপর আচমকা ঝুঁকে এসে ওর গলার নরম খাঁজে নাকটা ডুবিয়ে দিল। হৃৎপিণ্ডটা সে মুহূর্তে মারিশার পাঁজরের ভেতর তাণ্ডব শুরু করলেও সে নিজেকে পাথরের মতো স্থির করে রাখল।
নাকের ডগাটা ওর গলার খাঁজে আলতো করে ঘষতে ঘষতে লম্বা একটা নিঃশ্বাস টেনে নিল আশফি। তারপর হঠাৎ ঘন স্বরে ফিসফিসিয়ে উঠল, “তোমার এই পারফিউমের ঘ্রাণটা… এই ঘ্রাণটা কেমন যেন।”
তার তপ্ত নিঃশ্বাসের ছোঁয়ায় মারিশার স্নায়ুগুলো যেন অবশ হয়ে আসছিল। আড়ালে নিজের সাদা ফ্রকটার দু’পাশ হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে সে কেবল দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল। রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল, “কেমন?”
চিবুকটা ওর ঘাড়ের ওপর আলতো করে চেপে ধরে আশফি জবাব দিল, “কেমন যেন… মাদকের মতো!”
“মাদকের মতো?” মারিশা যেন কথাটার গভীরতা ঠিক ধরতে পারল না।

আশফি তখন আরও একটু নিবিড় হয়ে নিচু স্বরেই জবাব দিল, “অনেকটা উন্মাদনা জাগানো।”
বলেই সে আরেকবার বুক ভরে সেই সুবাসটা টেনে নিল। মারিশাকে পুরোপুরি দিশেহারা করে দিয়ে সে তারপর চূড়ান্ত আবদারটা করে বসল, “লেট মি কিস ইয়োর নেক। আজ একদম বারণ করবে না প্লিজ।”
এমন সরাসরি, তৃষ্ণার্ত আবদারে মারিশার শরীরের প্রতিটি তন্তু যেন মুহূর্তের জন্য স্থবির হয়ে গেল। ওর বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি এতই বেড়ে গেল যে, মনে হলো শব্দটা এই নিস্তব্ধ ঘরে আশফিও শুনতে পাচ্ছে বুঝি। ​সে চাইল না বলতে, চাইল তাকে সরিয়ে দিয়ে এই অসহ্য সম্মোহন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে। কিন্তু ওর ঠোঁট দুটো যেন একে অপরের সঙ্গে জুড়ে গেছে, কোনো শব্দই বের হলো না।
আশফিও ওর সম্মতির অপেক্ষা করল না৷ আদতে সে তো অনুমতি চায়ওনি। তবে মারিশার পাথর হয়ে থাকা নীরবতাটুকুই ওর কাছে সম্মতির চেয়েও বেশি কিছু হয়ে ধরা দিল। সে যেন এই মুহূর্তটার জন্যই যুগান্তর ধরে অপেক্ষা করছিল। ওর গলার মাঝে মুখ ডুবিয়ে থাকা অবস্থাতেই সে বুঝতে পারল, মেয়েটা কাঁপছে … তার প্রতিটি স্পর্শে ওর শরীরের আড়ষ্টতা একটু একটু করে ভেঙে যাচ্ছে।
আগুনের ছোঁয়ার মতো তার ঠোঁটের তপ্ত স্পর্শগুলো মারিশার শরীরে জমে থাকা পাহাড়ি শীতলতা নিমেষেই যেন উবে গেল। ধীরে ধীরে অনুভব করল, ওর শরীরের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাচ্ছে। যার ফলস্বরূপ আশফির চওড়া কাঁধটা খামচে ধরল মুহূর্তেই।

আর আশফির একটা হাত তখন পকেট থেকে বেরিয়ে এসে এক অমোঘ অধিকারবোধ থেকে ওর কোমরের একটা পাশ নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। একেকটি চুমুতে সে যেন এক একটা ছাপ ফেলে গেল ওর ধবধবে সাদা ত্বকে। চেরি ফলের মতো সেই লালচে দাগগুলোই সাক্ষ্য দিল, সে কতটা উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল।
আদরের প্রাবল্য এতটাই ছিল যে, আশফি যখন ধীরে ধীরে মুখ তুলল, মারিশার পুতুল সুন্দর মুখটাও ততক্ষণে রক্তাভ রাঙা হয়ে উঠেছে। বাতাসে কেবল ওর এলোমেলো নিঃশ্বাসের শব্দ আর ওর সেই পারফিউমের মাদকতাময় ঘ্রাণ। চোখদুটো বুজে তার বুকের ওপর নিজেকে ছেড়ে দিল সে। এই উন্মত্ত ভালোবাসার জোয়ারে ভেসে যেতে সে যেন এখন পুরোপুরি প্রস্তুত।

এক মুহূর্ত তখন অপলক চোখে মারিশাকে দেখল আশফি। তার ঠোঁট দুটো তখন সিক্ত। সেখানে ফুটে উঠল এক চিলতে রহস্যময় হাসি। মারিশা যখন চোখ মেলল, আশফি ওর সেই হাসিটুকুকে নিমিষেই আড়াল করে নিল। গলার স্বরে ফিরে এল এক রাশ গাম্ভীর্য। ও চোখে চোখ রেখে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে বলল, “এই পাহাড়, এই মেঘ, আর আমাদের এই একান্ত মুহূর্তগুলো, সবই আজ থেকে চার বছর আগে পহেলা ফাল্গুনে আসার কথা ছিল, মাহি। তাই এই সব কিছুই আজ নতুন। এমনকি আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তুমিও আজ আমার কাছে একদম নতুন। আজ রাত থেকে আমাদের সবকিছুই শুরু হবে নতুন করে।”
একরাশ উচ্ছ্বল আনন্দ আর ঘোরের মাঝে দিশেহারা হয়ে মারিশা বিস্ময়ে আশফির চোখের দিকে তাকাল। তারপর কেবল অস্ফুট সুরে এটুকুই বলতে পারল, “আজ থেকেই?” ওর নিজের কাছেই ওর কণ্ঠস্বরটা কেমন অচেনা ঠেকল যেন।

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ২৮

আশফির ঠোঁটের কোণে তখন এক চিলতে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিতে কোনো লুকোছাপা নেই, আছে এক শান্ত নিশ্চয়তা। মারিশার চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আজ থেকেই। তবে সবটা শুরু করার আগে তোমার একটা প্রিয় গেম খেলব আমরা।”

বুনো মেঘের হাতছানি পর্ব ৩০