Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৩৭

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩৭

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩৭
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

__”ঈশান রা নামাজ শেষ করে চলে এলো বলে। এখনো রান্নাই শেষ করতে পারলাম না। হাত চালা। আনাড়ি হাত নিশে সাহায্য করতে এসে আরও দেরি করিয়ে দিচ্ছিস মা তোরা।“
নিশি, নূরি,তিতির এসেছে নিচে মায়েদের রান্নার সাহা্য করতে। তাদের একদফা ধমকেধামকে রাহেলা সময় দেখলো। সবাইকে তাড়া দিলো হাতের কাজ দ্রুত শেষ করতে। উৎসবমুখর একটা সকাল । বাড়ির সকল পুরুষ বেড়িয়েছে ঈদের নামাজে । মেয়েরা সবাই মায়েদের সাথে হাতে হাতে কাজ করছে। ঈদের দিন সকাল বেলা মায়েদের সাথে রান্না করার অন্যরকম অনূভুতি। চন্দ্রা দেওয়ান সোফায় বসে আছেন। মুগ্ধ চোখে বাড়ির সকলের ব্যাস্ততা দেখেছন। রিশা, রোশনি, রাফি তিনজনই বাবা, চাচা, ভাইদের সাথে ঈদের মাঠে গিয়েছে। তিতির একে একে সব খাবার এনে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে ডাইনিং টেবিলে। নামাজ থেকে এসেই খাওয়ার জন্য হামলে পরবে একেকজন।
রাহেলা দেওয়ান কাজ করার ফাঁকে এতক্ষণ মেয়েদের দিকে নজর দেওয়ার সময় পেলো। খিচুড়ির হাড়ি নামাতে নামতে ধমকে উঠলেন মেয়েদের।

____”তোরা এখনো জামাকাপড় পড়িসনি কেনো ঈদের! এদিককার কাজ তো শেষই প্রায়। আমরা আছি কি করতে। যা ওপরে গিয়ে ঈদের ড্রেসগুলো পর। ওরা চলে এলো বলে। একসাথে খেতে বসবি।”
মাথা নেড়ে নিশি, নূরি, তিতির ওপরে যেতে উদ্ব্যত হতেই রাহেলা ডাকলেন নিশি কে। নিশি এগিয়ে আসতেই রাহেলা গলা নামিয়ে বললেন,
____”নূরি কে একটু দেখিস মা। মেয়ের মনটা ভালো নেই। সাজগোছ করার ইচ্ছে টা হবে না ওর এটা জানি। তবে তোরা জোর করে সাজিয়ে গুছিয়ে দিবি। ওর মনটা যেনো ভালো থাকে কেমন?”
নিশি মাথা নাড়লো। মাকে আশ্বাস দিলো। রাহেলা সিড়ির দিকে তাকালো আরেকবার। তিতির এর দিকে তাকিয়ে বললো,
____”তিতির কেও দেখবি। বিয়ের পর ওদের প্রথম ঈদ। আমার ছেলেটা তো এমন ব্যবহার করে যেনো রষকসহীন। তিতির টা ঘুরতে খুব পছন্দ করে। ওকে শাড়ি পরিয়ে দিবি। ঈশান কে আমি রাজি করাবো মেয়েটাকে ঘুরতে নিয়ে যেতে। তোরা ওদের একটু স্পেস দিবি কেমন? ছেলে-মেয়ে দুটো বিয়ের পর কোত্থাও ঘোরাঘুরি করেনি।”
নিশি মায়ের কথায় হাসলো। মাথা নেড়ে সায় দিলো। এটা তার আর নিয়াজ এর প্ল্যান এও আছে। সবাই একসাথে ঘুরতে বের হলেও ঈশান আর তিতির কে আলাদা করে দেবে। একটু নিজেদের মতো সময় কাটাক দুজন।

____”ঈদের একটা দিন। নামাজ পরে বাসায় এসে শান্তিতে একটু খেতেও পারলাম না। একগাদা কাগজপত্র এসে হাজির বাড়িতে। এসব আজকের দিনে বসে বসে দেখতে ইচ্ছে হবে! অসহ্যকর একটা চাকরি করি আমি।”
সাজিদ রাগে গজগজ করছে। পায়চারি করছে গোটা ঘরজুড়ে। টেবিলের ওপর সকাল থেকে রান্নাকরা খাবার গুলো ঠিকঠাক করছি অনিমা আর সাজিদের মা। আর মিটিমিটি হাসছে দুজন সাজিদের রাগ দেখে। অবশ্য রেগে যাওয়া নেহাৎ এমনিএমনি নয়।
মার্ডার কেস গুলোর প্রথম জন থেকে শেষ জন অবধি সকলের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকে শুরু করে যাবতীয় তথ্যের ফাইল এসে হাজির হয়েছে সাজিদের বাড়ি। ওপর মহল থেকে পাঠানো হয়েছে। আজ সকালেই এসে পৌছেছে। পরশুর মধ্যে সকল ফাইলপত্র চেকআউট করে প্রপার একটা রিপোর্ট জানাতে হবে সাজিদ এর।
অনিমা খাবার প্লেটে সার্ভ করতে করতে ডাকলো সাজিদ কে খেতে বসতে। সাজিদের বাবা মা তারও বসে গেছেন খাবার টেবিলে।

____”এখন আর হা হুতাশ করে লাভ কি বলো। দায়িত্বে ছিলে। তোমার নিজের এলাকায় তুমি থাকতে দু দুটো মার্ডার হয়ে গেলো। এর আগের গুলোও। সবমিলিয়ে সরকারও চাপের মধ্যে আছে। মিডিয়ার কাজকারবার দেখছো না? “
সাজিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলো। মিডিয়া পুরোটা দায় চাপিয়ে দিচ্ছে পুলিশ এর ওপর। সাজিদ ভেবে পায় না ইচ্ছে করে কেনো তারা এতো জঘন্য একটা কেস ধামাচাপা দিতে চাইবে। সাধারন মানুষ আবার সেই ফেক নিউজ গুলোকে বিশ্বাস করে হট্টগোল করছে। গত কাল তো তাদের ঢাকার মেইন অফিসের সামনে একদফা আন্দোলন করে গিয়েছে। সাতদিনের মধ্যে ক্রিমিনাল কে ধরার কড়া আল্টিমেটাম দিয়ে গিয়েছে। চাপ মাথার ওপর এসে বসে আছে।
সাজিদ বিরক্তির সাথে টেবিলে এসে বসতেই হুড়মুড়িয়ে বাড়িতে ঢুকলো একটা বাইক। এ সময় কে আসতে পারে বেশ ভালো করে জানা আছে। অনিমাও জানে। মুচকি হেসে বিনাবাক্যে সাজিদ এর পাশের ফাঁকা চেয়ার টাতে প্লেট টা এনে রাখতেই ঘরে প্রবেশ করলো নিয়াজ।

____”আসসালামু আলাইকুম। ঈদ মোবারক সবাইকে। “
সাজিদের বাবা মা একসাথে উত্তর নিলেন। নিয়াজ এসে সালাম করলো দুজনকে। বাটি থেকে একটা কাবাব তুলে মুখে নিতে নিতে বসে পরলো চেয়ারে।
মুখ ভর্তি করে কাবাব চিবুতে চিবুতে অনিমা কে তাড়া দিলো খাবার দিতে।
____”অনি খিচুড়ি আর গরুর মাংস টা আগে।দে দে জলদি দে।”
সাজিদ মহাবিরক্ত হয়ে আছে এমনিতেই। ছেলেটার ছ্যাচরামি দেখে মুখ বাকালো। ঝাঝালো গলায় বললো,
____”তোর বাড়িতে রান্না হয়নি? “
নিয়াজ ততক্ষণে নিজের প্লেটের খাবারে মন দিয়েছে। মাংসের একটা বড় পিস মুখে নিলো। হে হে করে হেসে বললো,
____”হবে না কেনো! হয়েছে। খেয়েওছি। নাঈম এর বাড়ি একটু আধটু খেয়ে আবার তোর বাড়ি এলাম। এখান থেকে দেওয়ান বাড়ি যাবো। ঈদের দিন সবার সাথে সাক্ষাৎ করা ভালো।”
হাসলো উপস্থিত সকলে। নিয়াজ কোন লেভেলের খাদক তা সকলে জানে। ওর একটু আধটু মানে যে বাকি পাচজনের খাবার এটাও জানা কথা। তবে খেতে খেতে খানিক সিরিয়াস হয়ে এলো নিয়াজ। ধীরেসুস্থে খেতে থাকা সাজিদ এর দিকে ফিরে বললো,

_____”কেস টা নিয়ে তো বেশ হাঙ্গামা হচ্ছে দেখলাম নিউজে। আমাদের এখানকার অবস্থাও সুবিধাজনক লাগছে না কিন্তু। নেহাৎ ঈশানের বাবা সবাইকে আশ্বাস দিয়েছে। তাই সম্ভবত চুপ করে আছে। তোদের কতদূর? ”
____”আমার কাছে ফাইলপত্র সব এসেছে আজ সকালে। রিপোর্ট, যাবতীয় তথ্য। এগুলো ঘাটলে অনেকটা স্পষ্ট হবে।”
_____”কাউকে সন্দেহ করে উঠতে পারিস নি?”
_____”লাস্ট সুবর্ণার মার্ডার এর ওখান থেকে একটা বাইকের চাকার ছাপ পাওয়া গেছে। ওটা গুরত্বপূর্ন অ্যালিবাই। ওটা সম্ভবত রয়েল এনফিল্ড এর। যদিও এখনো রিপোর্ট দেখিনি। আমাদের এলাকা তে রয়েল এনফিল্ড….
থেমে গেলো সাজিদ। মুখের খাবার চিবুনো বন্ধ হয়ে গেলো। নিয়াজেরও তাই। সাজিদের বাবা মা বিষয়টা ধরতে না পারলেও অনিমার হাত থেমে গেছে। সে মাংস তুলে দিচ্ছিলো নিয়াজের পাতে। তিনজন তাকালো একে অপরের দিকে। মুখে খাবার গিলে ফেললো নিয়াজ। প্লেটের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বললো,
_____”এলাকার কারোর বাইক সেটা ভাবছিস কেনো! বাইরের কারোর ও তো হতে পারে?”
সাজিদ চুপ করে রইলো খানিকক্ষণ। কথা টা আন্জাদে বলে এখন নিজে থমকে বসে আছে। আগে কিন্তু মাথায় আসেনি। নিয়াজ এর কথায় মাথা নাড়লো সে ও।
____”আমি কখন বললাম আমাদের গ্রামের কারোরই। তবে মার্ডার যে এলাকায় হয়েছে। প্রথম তদন্ত নিশ্চয় সেখান থেকেই শুরু হয়? সে কারণে কথাটা আসলো মাথায়। অতো ভেবে বলিনি।”
অনিমা শুকনো মুখে বললো,

____”ওইদিন কিন্তু বাইকে নিয়ে ওই সময়টায় বেরিয়ে…
____”এখন এসব থাক অনিমা। পরে ডিসকাস করি এসব নিয়ে। ঈদের একটা দিন। আজ থাক। তাছাড়া আমরা পাগল হয়ে এমনি একদিক বিষয়টা টেনে নিয়ে যেতে পারি না। আন্দাজ আছে তোদের কি ভেবেছি নিজেদের অবচেতন মনে! ছিহ্।”
সাজিদের কথায় নিয়াজ, অনিমা দুজনেই চুপ করলো সত্যিই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করলো নিয়াজই প্রথম।
____”দুপুরের পর ঘুরতে বের হবো। কই যাওয়া যায় বল। সবাই মিলে। নাঈম, রিতু, আমরা। ওদিকে ঈশান, ঈশানের বউ, ভাইবোন সব্বাই।”
____”তোরা ঠিক কর। ওসব আমার ঘারে চাপার না আর। ঠিক করে যেখানে বলবি বউ নিয়ে পিছু পিছু ছুটবো।”

বসার ঘরে সবার হৈ হৈ এ বাড়ি মুখরিত হয়ে আছে। চন্দ্রা দেওয়ান এর সাথে ঈশানের বন্ধু দের বেশ খাতির। একটু আগেই নিয়াজ, নাঈম, সাজিদ রা সকলে এসেছে ঈশান দের বাড়ি। চন্দ্রা দেওয়ান ঘটা করে সবাইলো সালামি দিয়েছে। রাহেলা, রিক্তা ওদের জন্য খাবার রেডি করছে। বাকিদের ভরা পেট থাকলেও নিয়াজ বেশ আয়োজন করে খাচ্ছে এখানেও। চন্দ্রা দেওয়ান এর সাথে হাসিঠাট্টায় মগ্ন সকলে।
বেলা বারোটা বাজে। এসেই ওরা তাড়া দিচ্ছে বাড়ির সবাইকে তৈরি হতে। ঘুরতে বের হবে। সবাই ছুটেছে নিজেদের ঘরে। ঈশান অবশ্য বেশ গাইগুই করছে। সে ঘুমাতো চায়। রাত্তিরে ভালো ঘুম নাকি হয়নি। এই অযুহাতে এখনো দিদার পাশে ঠেকনা দিয়ে বসে আছে।
বন্ধুদের একেকজন এর হাভাতেপনা দেখতে ব্যাস্ত একইসাথে। নিয়াজ এ দিয়ে তৃতীয় বার বিরিয়ানি নিলো পাতে। বাকিরা অল্পতে সীমাবদ্ধ থাকলেও ওকে দেখে মোটেঔ মনে হচ্ছে না আরও কয়েকবারেও থামবে।
ঈশানের ওঠা কেনো হেলদোল দেখে ভ্রু উচুলো নিয়াজ।
____”তুই রেডি হতে যাচ্ছিস না কেনো! আজ রোদ নাই দোস্ত। গরমও কম। বাইরে কি পরিমান বাতাস দেখেছিস। আল্লাহ মেহেরবানি করেছে। যা যা দ্রুত তৈরি হ। প্রায় ঘন্টাখানেক এর রাস্তা। যেতে যেতে দেরি হয়ে গেলো মজা নষ্ট। “
ঈশান উঠলো না। দিদার কাধে মাথা রেখে চোখ বুজতে বুজতে বললো,
____”রাতে ঘুম হয়নি। তোরা ঘুরে আয় ওদের নিয়ে। আমি একটু ঘুমিয়ে নেই।”
ফিচেল হাসলো বন্ধু গুলো। নাঈম বাকা গলায় বললো,
____”রাতে চুরি করতে বেরিয়েছিলি?”
নিয়াজ তালে তাল মেলালো নাঈমের। একই বাঁকা গলায় বললো,
____”ঘরে নতুন বউ রেখে ঘুমায় কে! আজব কথা তোদের। দেওয়ান সাহেব এর ঘুম না হওয়া ভীষন যুক্তিযোগ্য। আহারে বেচারা…”

ঈশান তপ্ত চোখের চাহনি দিলো। রান্নাঘরে মা, চাচি রা সকলে। সকলেই মুখে আচল চাপা দিয়েছে ছেলেগুলোর এমন কথায়। চন্দ্রা দেওয়ান তো শব্দ করেই হেসে ফেলেছেন। ঈশান বিরক্ত হলো। ঘরভর্তি সকলের সমানে উল্টাপাল্টা কথাবার্তা ছেলেগুলোর। অবশ্য ঈশানের চোখ রাঙ্গানি কেউ ভয় পেলো না কেউ। অনিমা হাতের পায়েশের বাটি টেবিলে রাখতে রাখতে বললো,
____”আমাদের বোনটা আজ ঘোরার এনার্জি পাবে তো দিদা? বলো?”
চন্দ্রা দেওয়ান নাতির চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,
____”বিয়ে করবেই না, বিয়ে করবেই না। এখন নাতির আমার রাতে ঘুমই হয় না বউ পেয়ে। “
____”দিদা তুমিও শুরু করলে ওদের সাথে! তাও এরকম একটা লেম টপিক নিয়ে।”
তীব্র প্রতিবাদ করলো সাজিদ এবারে। গোমরা মুখে বসে থাকলেও কথা বললো এতক্ষণে। রান্নাঘরে ঈশানের মা চাচিদের লক্ষ্য করে এদিকে গলা নামিয়ে বললো,
____”লেম টপিক কোনটাকে বলছিস! হু? এটা লেম টপিক? তিতির কে ট্রান্সফার করে দেই তোর রুম থেকে। দেখবো ঘুম হয় কি না?
ঈশান জবাব দেয় না। কপালে ভাজ ফেলে অন্য দিকে চোখ সরিয়ে নেয়। রিতু হাসতে হাসতে বললো,

____” তখন তো আরও ঘুম হবে না ঈশানের। বউয়ের শোকে কালি পরে যাবে চোখের নিচে।”
____”শাট আপ গাইজ। থাম এবারে।”
থামার বদলে হাসির আওয়াজ আরও দ্বিগুণ হলো একেকজনের। চন্দ্রা দেওয়ান হেসে নাতির দিকে ফিরলেন,
____”দাদাভাই, যাও তৈরি হয়ে যাও। সবাই বের হতে চাচ্ছে। একটু ঘুরে এসো।”
রাহেলা এসেছে এখানে। ছেলেমেয়ে গুলোর এটো প্লেট গুলো ট্রে তে তুলতে তুলতে নিজের ছেলেকে ধমক ও দিলেন।
____”বিয়ের পর প্রথম ঈদ। তোর সখ আহ্লাদ না থাকতে পারে। আমার মেয়েটারও কি নেই? যেকোনো অনুষ্ঠানে শাড়ি পরতে কি পরিমাণ ভালোবাসে আমার মেয়েটা। দিয়েছিস কি ওকে শাড়িটাড়ি কিছু? যা ঘুরিয়ে আন ওকে।”
সবার তাগাদায় বড্ড অনিহার সাথে উঠলো ঈশান। সত্যিই ঘুমে জর্জরিত তার চোখদুটো। এই ভরদুপুরে ঘোরাঘুরি তার আজকে পোষাবে না। তবে সবাই যে পরিমাণ তৈরি হয়ে এসেছে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে তাকে বের না করে ছাড়বে না। সবার জোরাজোরি তে নিজের রুমের দিকে হাটা ধরলো ঈশান।
তিতির এর জন্য একটা শাড়ি কিনেছিলো সে। ঢাকা থেকে আসার দিনই নিয়ে এসেছিলো। আলমারিতে রেখেছে। বোকা মেয়েটা সেটা দেখলো কি না কে জানে। ইতস্তত করে শাড়িটা নিজ হাতে দিতে পারেনি সে। দেওয়া উচিত ছিলো। কার দেওয়া শাড়ি পরবে আর তার মেজাজ টা যাবে খারাপ হয়ে।

চোখে সানগ্লাস এটে রাস্তায় উবার এর জন্য দাড়িয়ে আছে রুষা। পনেরো মিনিট আগে গাড়ি আসার কথা থাকলেও ঈদের দিন হওয়ায় এখনো এসে পৌছায়নি সম্ভবত। আজ গরমের তীব্রতা তেমন না থাকলেও খুব একটা কমও নয়। ঢাকা শহরে গ্রীষ্মের দিনে ঠান্ডা আবহাওয়া আশা করা বৃথা। কড়া পারফিউম এর ঘ্রানে ঘাড় বাকিয়ে তাকালো পাশে। একজন পুরুষ এসে দাড়িয়েছে। চোখ সরিয়ে নিলো।
ফোন হাতে গাড়ির লোকেশন দেখছে তার মধ্যে শোনা গেলো পাশের পুরুষটির কন্ঠ।
____”আপনি ফিফথ্ ফ্লোরের ব্লক এ’ তে থাকেন না?”
রুষা আড়চোখে তাকালো। মৃদু মাথা নাড়লো। ধীর গলায় উত্তর নিলো।
____”জ্বী।”
____”আমি একই ফ্লোরের ব্লক বি তে থাকি।”
____”ওহ্।”
____”আপনি একাই থাকেন বুঝি?”
রুষা এবার ভ্রু কুচকে তাকাতেই এক হাত তুলে কৈফিয়ত দেওয়ার ভঙ্গি করে বললো,
____”অ্যাম সরি সরি। সেভাবে কিন্তু বলিনি আমি। আসলে আমি আমার ফ্যামিলি সহ পাশের ফ্লাটে উঠেছি গতমাসে। আমি যদিও থাকি না এখানে। তবে মা বললো আপনি একাই থাকে বহুবছর হলো। নরমালি আরকি জিজ্ঞেস করলাম তাই। “

____”জ্বী। সবসময় থাকা হয়না। মাসে কয়েকদিন এর জন্য আসি আরকি।”
____”বাই দ্যা ওয়ে আমি তাহমিদ কায়েস। আপনার প্রতিবেশী বলতে পারেন।”
অনিহা নিয়েও সৌজন্যেতার হাসি হাসলো রুষা। ধীর গলায় বললো,
____”আমি রুষমিতা মির্জা। অ্যান্ড হ্যা আমি আপনাকে চিনি।”
তাহমিদ বোধহয় অবাকই হলো খানিকটা। কারণ সে মেয়েটাকে আজই প্রথম দেখলো। তাদের আগে কখনো দেখা হয়েছে বলে মনে পরলো না। তার চাকরির সূত্রে দূরে থাকতে হয়।
____”আমাকে চেনেন? কিভাবে!”
রুষা চোখের সানগ্লাস নামালো খানিকটা। কেমন একটা বাঁকা হাসলো। বাঁকা গলাতেই বললো,
____”আপনি ৪৯ তম বিসিএস রাইট? শিক্ষা ক্যাডার? শমশেরনগর এ একটা কলেজের বাংলার টিচার?”
হা হয়ে গেলো তাহমিদ। মেয়েটা অনেক কিছু জানে তার সম্পর্কে। বেশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
____”কি করে জানেন?”
____”সেটা বড় কথা কি? বাই দ্যা ওয়ে তিতির এর সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছিলেন শুনলাম। মেয়েটা খুব ভালো ট্রাস্ট মি। তবে সম্ভবত বিয়ের কথা চলছে ওর। হাতছাড়া করতে না চাইলে আমার সাজেশন হবে দেরি না করাই ভালো।”
তাহমিদ কিছু বলে ওঠার আগেই সামনে এসে দাড়ালো রুষার উবার। তাহমিদ এর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো। গ্লাস নামিয়ো মিষ্টি গলায় বললো,
____”উইশ ইউ আ ভেরি গুড ডে মিস্টার তাহমিদ কায়েস।”

হুট করে দরজা খুলে যেতেই চমকালো তিতির। শাড়ির পিন লাগাচ্ছিলো কুচিতে। কারোর আসার শব্দে চমকে আচল ছেড়ে দিলো। ঈশানের দৃষ্টি তখনো ফোনে। মন দিয়ে কিছু একটা দেখছে। আনমনে দরজা আটকে এগিয়ে আসতেই পায়ের চলন থেমে গেলো। সামনে কেউ একজন দাড়িয়ে। নিচের দিকে দৃষ্টি থাকায় শাড়ির কুচির অংশ চোখে পরছে। হাতে ফোনটা সরিয়ে ধীরে ধীরে নিজের নজর তুললো নিচ থেকে ওপরের দিকে। এক সেকেন্ড এর জন্য মিস হলো হার্টবিট। তিতির শাড়ি পরেছে! তার দেওয়া শাড়িটা! বোকা মেয়েটা টের পেয়েছে তাহলে। সফেদ একটা শিফনের শাড়ি। গোটা শাড়ি জুড়ে মাল্টিকালারের চেরিব্লোসম আর প্রজাপতির কাজ করা।
ঈশানের এভাবে ঘরে প্রবেশে তিতির ক্ষেপেলো বেশ। দু পা এগিয়েও এলো সাথে সাথে।
____”আপনাকে কতবার বলতে হবে একটু দরজা টা নক করে ঢুকবেন।”

ঈশান নিজের এলোমেলো দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। দ্রুত আলমারির কাছে এগিয়ে গেলো নিজের জামাকাপড় বের করতে। তিতিরের শাড়ির সাথে ম্যাচিং করে নিজেও একটা পাঞ্জাবি কিনেছিলো। একই সেট এ ছিলো অবশ্য। সেটা কি বের করবে! না মানে তিতির টের পেয়ে যাবে কি না। নিজের জামাকাপড় অযথা উল্টে পাল্টে রেখে সময় নষ্ট করছে ঈশান। তিতির ঈশানের জবাব না পেয়ে সময় নষ্ট করে না। তখন থেকে কসরত করছে শাড়িটা ঠিক করার। না কুচি ঠিক হচ্ছে আর না তো আচল। পিছনে ব্লাউজ এর ফিতে টাও এখনো বেধে উঠতে পারেনি। এমনি তে তাকে সবসময় শাড়ি পরিয়ে দেয় রাহেলা। আজকে তাকে আর বিরক্ত করেনি। সকাল থেকে খেটে খেটে মরছে। এখন আবার শাড়ি পরাতে বিরক্ত করার মানে হয়!
আয়নায় তখন থেকে ঈশানকে দেখছে একই জামাকাপড় বারবার উল্টেপাল্টে দেখতে। বিরক্ত হলো তিতির। নিচে সবাই নিশ্চয় তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
তিতির শাড়ির কুচি ধরে এগিয়ে এলো ঈশানের পাশে। মেয়েটার গায়ের কড়া বডিওয়াশ আর চুলের সেই চিরচেনা তাকে পাগল করা শ্যাম্পুর ঘ্রান। চোখ বুজে এলো ঈশানের।

_____”দেখি সরুন। জামাকাপড় সব এখানেই গুছিয়ে রাখা। পাচ্ছেন না কেনো!”
ঈশানকে ঠেলে সরিয়ে নতুন প্যাকেট বের করে হাতে গুঁজে দিলো তিতির। এটা সে কিনেছে ঈশানের জন্য। ঈশান তিতির এর শাড়ির সাথে ম্যাচিং পাঞ্জাবি টার দিকে তাকালো একবার। ওটা পারবে নাকি এটা! অবশেষে তিতির এর দেওয়া পাঞ্জাবী টাই পড়ার সিদ্ধান্ত নিলো। প্যাকেট খুলতেই অবাক হলো। এটা আরও বেশি ম্যাচিং লাগছে মেয়েটার শাড়ির সাথে। তিতির মিটিমিটি ঈশানকে দেখে।
তিতির তৈরি হচ্ছে ড্রেসিং টেবিলের সামনে। ভারি মেকওভার সে কখনো করে না। প্রয়োজনই পরে না। ঈশানের সময় লাগলো না তৈরি হতে। আয়নার সামনে এসে চুলগুলো সেট করে নিলো। পারফিউম গায়ে মেখে পাঞ্জাবীর হাত ফোল্ড করতে করতেই চোখ পরলো বারান্দা থেকে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকছে তিতির। খোলা রেশমের মতো চুলগুলো হাঁটার তালে তালে দুলছে কোমড়ের ওপর। শাড়িটা সুন্দর মতো পরেছে। তবে স্টাইল টা পছন্দ হলো না ঈশানের। শাড়ির আচল খুলে না দিয়ে কুচি দিয়ে কাধের ওপর পিন মেরে রাখা। যার দরুন মেদহীন ধবধবে উদর এর বেশ খানিকটা দৃশ্যমান। ঈশান শুকনো ঢোক গিলে চোখ সরিয়ে নিলো। এভাবেই বাইরে যাবে নাকি মেয়েটা। অসম্ভব ব্যাপার স্যাপার।
তিতির সমানের চুলগুলো দু হাতে ঠেলে পিছনে দিতে দিতে এগিয়ে এলো ঈশানের কাছে। মেয়েটার কাছে আসার অস্তিত্ব টের পেতেই কেঁপে উঠলো তার পুরুষ
সত্বা।

____”শাড়ি পরেছি। আমাকে কেমন লাগছে?”
তিতিরের আহ্লাদী কন্ঠে ফিরে তাকালো ঈশান। সে কি দেখে নি নাকি!খেয়াল করেছে সেটা আগেই। ঝলসে যাওয়া রুপে দাঁড়িয়ে তিতির। শাড়ির আচল কুচি দিয়ে তুলে দেওয়া কাধে। তার দরুন ফর্শা ধবধবে মেদহীন কোমড় উন্মুক্ত, নাভির অতল গভীর অবধি চোখে পরছে। ঈশানের আজ বুঝি মৃত্যু নিশ্চিত করতে মেয়েটা এমন সেজেছে!
তিতির এর প্রশ্নের জবাব ঈশান দিলো না। তিতির খেয়াল করলো ঈশান আড়চোখে একবার তাকিয়ে সরিয়ে নিলো চোখজোড়া। অপমানিত বোধ করলো আচমকা তিতির। ঈদের একটা দিন এত সুন্দর করে সেজেগুজে শাড়ি পরে সামনে দাড়ালো, এক দন্ড স্থির হয়ে দাড়িয়ে তাকালে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেতো! ভেংচি কেটে তেতে ওঠা গলায় বললো,

_____”কেমন লাগছে বললে মুখে ফোস্কা পরে যেতো!
শাড়ির কুচি ধরে চলে যেতে উল্টো ঘুরতেই টান পরলো কোমড়ে। জমে গেলো শরীর। তুলতুলে মেদহীন নরম লতানো কোমড়,উদর জুড়ে শক্তপোক্ত, খসখসে ঠান্ডা একটা হাতের অবাধ বিচরন। শ্বাস আটকে গেলো তিতির এর। কিছু বলে ওঠার আগেই কাধ থেকে শাড়ির আচল আলগা করে ঢেকে দিলো উন্মুক্ত পেটের অংশ, ঈশানের তপ্ত শ্বাসপ্রশ্বাস এর ছোঁয়া এসে ছুঁয়ে দিলো তার রক্তিম গাল। ঠান্ডা ওষ্ঠের স্পর্শ পেলো তার কানের লতি।
তিতির কে চূড়ান্ত অবাক করে দিয়ে ঈশান ফিসফিসিয়ে গেয়ে উঠলো,
______”Sirf keh jaaun ya
Aaasmaan pe likh doo
Teri taarifon mein
Chashme Baddoor…”.
[“তোমাকে কতটা সুন্দর লাগে
সেটা কি শুধু বলে শেষ করব,
নাকি আকাশজুড়ে লিখে দেব?
তোমার সৌন্দর্যের ওপর যেন
কোনো খারাপ নজর না লাগে…”]

তিতির স্তম্ভিত, বাকরুদ্ধ। ভেবে পেলো না এই মূহুর্তে যেটা ঘটলো তার সাথে আদতেই বাস্তবে ঘটলো কি না সেটা। নাকি কোনো অলিক কল্পনা। এরকম একটা গান ঈশান তার জন্য গাইলো! তাকে মিন করলো? ঈশান এর অবাধ্য হাতের বিচরন তার উদরের ওপর। ঘন ঘন নিশ্বাস এর তপ্ততায় পুড়ছে তিতিরের কাঁধের অংশ। ছেয়ে যাচ্ছে সেটা সমস্ত ঘাড়। কাঁপুনি দিয়ে উঠলো তিতিরের শরীর। এই এক সমস্যা খেয়াল করেছে সে বরাবরই। ঈশান কাছে আসলেই তার শরীর টা বেইমানি শুরু করে তার সাথে। মুখে না করলেও পুরোদমে বেহায়া লোকটার সাথে সাড়া দিতো শুরু করে তার শরীর। তিতির শ্বাস আটকে দাড়িয়ে রইলো। গানটা কানে বাজছে এখনো। ঈশানের নিঃশ্বাস এর শব্দ ছাড়া আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। তিতির নিজের নগ্ন পেটের ওপর রাখা ঈশানের হাতে নিজের হাত ছোয়ালো। ছুয়িয়ে কেপে উঠলো নিজেই। মিনমিন করো বললো,

____”চলুন নিচে সবাই অপেক্ষা করছে।”
ঈশানের হাতের চাপ দৃঢ় হলো তুলতুলে পেটের ওপর। নাক ঘষলো তিতিরের কাধে। হাস্কিস্বরে বললো,
____”কোন দেশের জিনিসপত্র ব্যবহার করিস বলতো? কেমন নেশা নেশা ঘ্রান সব কিছুতেই। বিরক্ত করে বড্ড আমাকে।”
____”চ..চলুন নিচে।”
ঈশান চোখ বুঝে রেখেছে। হাতের বিচরন আর একটু গাঢ় করতেই অজান্তেই আবেশে তিতিরের মাথা হেলে গেলো পেছন দিকে। ঈশানের সাথে ঠেকলো সেটা। দুজনেই বন্ধ চোখে দ্রুতবেগে চলা দুজনের শ্বাসপ্রশ্বাস অনূভব করতে ব্যাস্ত। ঈশান থেকে থেকেই জোরে জোরে টেনে নিচ্ছে তিতিরের চুলের ঘ্রান।
_____”কেমন লাগছে জানতে চাচ্ছিলি। শ্বাস নিতে পারছি না, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে, ঈশান আরশাদ এর পাষান হৃদয় এ কাঁপন ধরেছে, নেশা না করেও নিজেকে মাতাল লাগছে। বল কি করে আর বোঝাবো তোকে কেমন লাগছে। কি করলে বুঝবি!”

তিতির জবাব দিতে পারে না ঈশানের বলা একটা শব্দেরও। ঈশানের থেকে এমন অভাবনীয় রিঅ্যাকশন সে কখনো আশা করেনি। দূর্বল হয়ে আসা ছোট্ট শরীরটা মিশে আছে ঈশানের শক্তপোক্ত বুকের সাথে। ঈশানের হাতের ঠান্ডা ছোয়া অনূভব করলো নিজের কাধে। পিঠের ওপর থেকে চুল সরে যাচ্ছে টের পেতেই ধড়ফড়িয়ে উঠলো তিতির। সরে যেতে চাইলো। তার ব্লাউজ এর ফিতে টা বাধা হয়নি কি না। তবে ঈশান এর হাতের বাধন থেকে মুক্তি পাওয়া কি এতোই সোজা! ঈশান চুলগুলো সরিয়ে দৃষ্টি রাখলো মখমলের মতো মশ্রীন পিঠে। নিজেই কিনে এনেছিলো ব্লাউজটা। মাপ! চোখের আন্দাজে। একদম ফিট হয়েছে শরীরে। তবে আগে খেয়াল করা উচিত ছিলো। ব্লাউজ এর পিছনের অংশ অনেকটা বড়। মোটামুটি ফর্শা পিঠের সবটুকুই দৃশ্যমান। তবে খোলা চুলে ধরতে পারা যায়না সেটা। পিঠের বা পাশের উঁচু হয়ে থাকা বোন এর ওপরে কালো কুচকুচে একটা বিউটি স্পট। সেটায় নিজের দু আঙ্গুল ছোঁয়াতেও কেমন ইলেক্ট্রনিক শক দিলো দুজনের শরীরেই। তিতির দূর্বল গলায় বললো,

____”আ…আ…আমি বেঁধে নেবো। আপনি নিচে যেতে থাকুন।”
তিতির এর বারবার বলা একই কথায় একবারের জন্যও কান দিচ্ছে না ঈশান। এখনকার বলা কথাগুলো তো আরও কানে আসলো না। ওই তিল টায় ঠোঁট ছোঁয়াতে মরিয়া সে। সাতপাঁচ না ভেবে ছুয়িয়েও দিলো। ঠান্ডা ঠোঁটের নরম স্পর্শ পরতেই দু হাতে শাড়ির আচল খামচে ধরলো তিতির। ঈশান বেশ সময় নিয়ে আদর আকলো সেখানে। ভেজা ভেজা চুমুতে ভিজে গেলো জায়গা টা। চুমুর জায়গায় কামড়ে জর্জরিত হচ্ছে এবারে জায়গাটা। মৃদু মিষ্টি যন্ত্রণায় শরীর অবশ হয়ে আসছে তিতিরের। তার পিঠের ওই জায়গাটায় যে একটা তিল আছে তা সে জানে। ঈশানের চুমু, আর কামড়ের তীব্রতায় বেশ অবাক হচ্ছে তিতির। কি এমন আছে যার কারণে সামান্য তিল দেখে এতো উন্মাদনা!
মনে পরলো এর আগেও একরাতে এভাবে ওই তিলটার ওপরই মত্ত হয়েছিলো ঈশান। সেদিন অবশ্য অসভ্য, অভদ্র কোনো কিছু বলতে বাকি রাখেনি। কিন্তু আজ! আজ সেসব অনূভুতি মুছে গেছে। শুধু ভালোলাগা আর শিহরণ কাজ করছে। এই ছোঁয়া থেকে পালাতে মোটেই ইচ্ছে করছে না।
ঈশান আরও সময় নিয়ে মুখ তুললো সেখান থেকে। জোরে জোরে শ্বাস ফেললো। কপাল ঠেকালো তিতিরের ঘাড়ের ওপর।

_____”দিনের পর দিন নিজের চাহিদা গুলোকে খাঁচায় তুলে রাখা নেহাৎই সহজ কথা নয় তিতির। অসভ্য বলিস আর নির্লজ্জ। যাই বলিস না কেনো পুরুষ মানুষ এর কাছে তার স্ত্রী কে ছুঁতে না পারার যন্ত্রণা যে কতটা তা তোরা নারীরা বুঝবি না। সময় অসময় ব্লেম করে যাবি শুধু।”
ঈশানের কথায় বুকের বা পাশে চিনচিন করে উঠলো তিতিরের। কি একটা ভোতা অনূভুতি অনূভব হলো সেখানটায়। ঈশান মাথা তুলে দ্রুত হাতে বেধে দিলো ফিতে টা। তিতির কে সোজা করে দাড়া করালো। দু হাতে এখনো কোমড় টা চেপে রাখা।
_____”শাড়ি পছন্দ হয়েছে?”
মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে সায় দিলো তিতির। হয়েছে বোঝালো। মিহি গলায় বললো,
____”পাঞ্জাবি? “
ঈশান মৃদু হাসলো। মাথা নিচু করে রাখা তিতিরের কাছে সেটা অবশ্য অদেখাই রইলো। ঈশান জোরে শ্বাস ফেলে বললো,
____”চলে।”
তিতির মুখ তুলে চাইলো। ‘চলে!” এ আবার কেমন কথা। তিতির ঈশানকে পরখ করলো গভীর মনোযোগে। ভীষন সুন্দর লাগছে সফেদ পাঞ্জাবি তে।
তবে ঈশানের এমন উত্তরে অভিমান হলো তার। কপট গাল ফুলিয়ে বললো,

____”আমার স্কলারশিপ এর টাকায় কেনা এটা। কত খুজে খুজে কিনেছি জানেন? “
____”হুম। তো? আমি কি বলেছি খারাপ হয়েছে। চলেই তো।”
তিতির ভ্রু কুচকে ফেললো। লোকটার কাছ থেকে কিছু আশা করাই ভুল। যেটায় আশা করে না সেটায় এসে চমকে দেয়। আর যেটায় আশা নিয়ে হা করে বসে থাকে সেখানে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
তিতিরের গাল ফুলানো আজকাল বেশ ভালো লাগে ঈশানের। পুতুলের মতো মুখটায় যখন গাল ফোলায় ঘটা করে, কামড়ে ধরতে মন চায় গালটাতে। এখন যেমন ভীষন ইচ্ছে হচ্ছে। যদিও এখন শাড়িতে পুতুলের থেকেও সুন্দর লাগছে। পূর্নাঙ্গ নারী লাগছে, তার বউ বউ লাগছে। তবে মুখে বললো,
_____”চল। রেডি তো?”
তিতির হাত ছাড়িয়ে নিলো ঈশানের থেকে। বিছানার ওপর থেকে পার্স আর ফোন হাতে নিয়ে অন্য হাতে শাড়ির কুচি ধরে গটগট করে চলে গেলো রুম থেকে। এ যাত্রায় শব্দ করে হেসে ফেললো ঈশান। মেয়েটা বরাবরের মতোই একরোখা। যতক্ষণ না মুখে বলা হচ্ছে কোনো কিছু, ততক্ষণ সেটা মানতে নারাজ। মনের কথা মুখে বলা যায় এতো! বুঝে নিতে হয় না?

তিতির কে দেখে এ বারে চোখ কপালে উঠলো বাড়ির সকলের। সবাই তৈরি হয়ে বসে আছে বসার ঘরে। নিশি, নূরিও শাড়ি পরেছে। রিশা, রোশনি ঈশানের দেওয়া সুন্দর পারপেল কালার এর প্রিন্সেস গাউন পরা। রাফি পাঞ্জাবি। এটাও ঈশানের সাথে ম্যাচিং করে পরা। তবে তিতিরের পিছু পিছু ঈশান কে নেমে আসতে দেখে আরেকদফা হা হয়ে এলো সকলের মুখখানা। বাড়ির গিন্নিরা মনে মনে নজর না লাগার দোয়া পরতে ব্যাস্ত হলেন। নাতি, নাতনি কে নেমে আসতে দেখে অনিমেষ চেয়ে আছেন চন্দ্রা দেওয়ান। কি সুন্দর মানিয়েছে দুজনকে। সে কত কল্পনা করতো দুজনকে একসাথে। সম্পর্কের উন্নতি চোখে পরার মতো।
নয়ন চটজলদি সরিয়ে নিলো চোখজোড়া। আর কত পাপ বাড়াবে ভাইয়ের বউ এর দিকে চোখ তুলে। যা ফুরিয়েছে তা ফুরিয়েছেই। জীবনে অতীত আকড়ে বাঁচা নিদারুণ বোকামি। হয়তো সময় লাগবে, হয়তো সব ভোলা সম্ভব নয়। তবুও কাউকে বুঝতে দিলে চলবে না।
তিতির কয়েক কদম নামতেই হোচট খেলো। সবাই তাকিয়ে ছিলো বিধায় চমকেও উঠলো। তিতির পরে যাবে এ আশংকা সত্যি হতে দিলো না ঈশান। ঝট করে চেপে ধরলো তিতিরের বাহু। দু সিড়ি পার হয়ে এসে দাড়ালো একদম তিতিরের পাশে। নিচু হয়ে তাকালো তিতিরের পায়ের দিকে। এক হাতে শাড়ির কুচি ধরে উচু করতে করতে ব্যাস্ত গলায় বললো,

____”লাগলো কোথাও? তিতির?”
তিতির ভয় পেয়েছে নিজেও। উচু জুতো পরা ছিলো। পরলে সর্বনাশ হতো। তবে সামলে নিলো। মাথা নেড়ে বসার ঘরের দিকে চোখ পরতেই লজ্জা পেলো ভীষন। ঘরভর্তি একগাদা মানুষ এর এতো এতো চোখ তাদের দিকেই তাক করা। কেউ হাসছে, কেউ এখনো ভয়ার্ত চোখে তাকিয়েই।
ঈশান এবার হাটু ভেঙ্গে বসে পায়ে হাত দিয়ে দেখতে গেলো। তিতির ছিটকে সরে গেলো। চাপা গলায় বললো,
____”পাগল হলেন! ছিহ্। পায়ে হাত দিচ্ছেন। সবাই তাকিয়ে। উঠুন।”
____”লেগেছে কি?”
____”নাহ উঠুন তো।”
ঈশান উঠলো। তবে তিতির কে ছারলো না। বাহু ধরে নামাতে নামতে চাপা গলায় ধমকো উঠলো,
____”শাড়ি টারি পরতে না পারলে পরিস কেনো! শুধু শুধু আরেকজন এর অশান্তি বারাতে।”
____”কে বলেছে পারি না। হুট হাট এমন হতেই পারে।”
____”বলেছে তোকে।”
ঈশান তিতির কে নিয়ে সিড়ি ভেঙ্গে নিচে নামতেই হৈ হৈ করে বসা ছেড়ে উঠে এলো নিয়াজ রা। তাদের চিৎকার এ লজ্জায় এতটুকুন হলো তিতির। নিয়াজ বন্ধুর কাধে হাত দিয়ে মহা উত্তেজিত গলায় বললো,
____”দিদা তোমার নাতি বিয়ে করবে না বলেছিলো কিন্তু।”
চন্দ্রা দেওয়ান কম যায় কিসে। একগাল হেসে নাতি নাতনির দিকে তাকিয়ে বললো,
____”পুত্তুল এর মতো বউ পেলে আগের ওসব কথা মনে রাখলে চলে! যত্ন দেখলেই বোঝা যায় বিয়ে দিয়ে ভুল করিনি।”

তিতির ঈশানের থেকে সরে গিয়ে দাড়ালো নিশি, নূরির কাছে। বোনেরা নিচু গলায় তিতিরের প্রশংসা করতে ব্যাস্ত। অনিমা এসে বাচ্চাদের মতো টিপে দিলো তিতির এর গাল।
____”শাড়িটা বুঝি ঈশান এর দেওয়া!”
ধীরে মাথা ঝাকালো তিতির। ঘরময় বিষ্ময়ের চিৎকার থামছেই না। অদূরে চা খেতে ব্যাস্ত তিন কর্তা। ছেলেমেয়েদের গল্প গুজবে যোগ না দিলেও শুনছেন সবই। মিটিমিটি হাসছেন তারাও। বাড়ির সকলে ভীষন খুশি হলো ঈশান তিতিরের সম্পর্কের অগ্রগতি তে।
এত কিছুর মধ্যেও ঈশানের মুখে হাসির ছিটেফোঁটা দেখা গেলো না। বরং সবার সামনে বরাবরের মতোই অ্যাংগ্রী ইয়াং ম্যান সেজে দাড়িয়ে রইলো। যখন দেখলো বন্ধু গুলো কিছুতেই থামছে না লেগপুলিং করা থেকে এবারে ধমকে উঠলো গম্ভীর গলায়।
_____”এতক্ষণ তো তাড়া দিয়ে মাথা খাচ্ছিলি। বের হবি কি? ঘুম কামাই দিয়ে যাচ্ছি তোদের সাথে। বাড়িতেই রাত বানাবি তোরা। কেমন জ্বর জ্বর লাগছে। এই গরমে অসহ্যকর বায়না তোদের।”
সবাই উঠে দাড়ালো বের হওয়ার জন্য। তবে এরই মধ্যে রাফি ভাইয়ের সামনে এসে দু হাত কোমড়ে চেপে অভিযোগ করে বললো,

____”রাত জাগো কেনো এতো হুম? নিজে জাগোই আবার আমাদের বার্বি কেও ঘুমাতে দাও না। সারারাত না ঘুমিয়ে জেগে থাকলে দিনে তো ক্লান্তি লাগবেই তাইনা? আর অতো রাতে শাওয়ার নেয় কেউ! ঠান্ডা জ্বর আসবে না?”
বেষম খেলো ঈশান তিতির দুজনেই। রাফির কথায় ঘরময় সকলে হতবিহ্বল হলো। বাড়ির কর্তারা অপ্রস্তুত হয়ে মন দিলো নিজেদের বিভিন্ন রাজনৈতিক আলাপে। গিন্নি রা মুখে আচল চাপা দিয়ে ছুটলো রান্নাঘরের দিকে। নাঈম এসে মুখ চাপা দিলো রাফির। রাফি আরও কিছু বলতে ছটফট করছে। নাঈম মাথা নিচু করে কি সব বুঝিয়ে বাকিদের বের হওয়ার ইশারা করে নিজে আগেভাগে কেটে পরলো রাফিকে নিয়ে।
বাকিরা এতক্ষণ নিজেদের কোনোমতে সামলালেও এবার পারলো না। খ্যাকখ্যাক করে হাসলো একেকজন। চোখেমুখে স্পষ্ট ঈশানকে খোচা দেওয়ার ইঙ্গিত। তিতির এর লজ্জায় মরি মরি অবস্থা। বিচ্ছু টা তিল কে সবার সামনে তাল বানিয়ে কেটে পরলো।
তিতির ভুলেও তাকালো না ঈশানের দিকে। ঈশান নিজেও তব্দা খেয়ে দাড়িয়ে। কি থেকে কি বলে গেলো ফাজিলটা। নিয়াজ ঠোঁট ঠোঁট টিপলো।

____”বাচ্চা রা কখনো মিথ্যা কথা বলে না। তাইনা জনগন?”
____”ঠিইইইক।ঠিইইইক।”
সবাই সবিস্বরে যোগ দিলো নিয়াজের সাথে। ঈশান বিরক্ত চোখে বন্ধুদের দিকে তাকালো। সাজিদ, অনিমা,রিতু ওরাও তাল মিলিয়েছে আজ নিয়াজ টার সাথে। ওদিকে বাবা চাচা রা বসা। কতটা ইমব্যারেসিং ব্যাপার স্যাপার।
_____”শাট আপ গায়েজ। বাবা রা আছে সকলে। কি হচ্ছে এসব।”
____”তুই স্বীকার করলেই পারিস। হার মেনে নিয়েছিস বউয়ের রুপের কাছে। এতো নাটক করিস কেনো!”
ঈশান চাপা গলায় ধমকে উঠলো আরেকদফা।
____”এটা বেডরুম নিয়ে ডিসকাস করার জায়গা?”
____”তোর মতো পুরুষ মানুষ কে নিয়ে ডিসকাস করার কোনো স্পেসিফিক জায়গা হয়না রে পাগলা।”
তার মতো পুরুষ মানে! ভ্রু বাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে তাকাতেই উত্তর টা নিয়াজই দিলো।
____”যে পুরুষ উঠতে বসতে বলবে এ বিয়ে করতে চাইনা, কবুল বলার পর থেকে মুখে জোপবে ‘আমি এ বিয়ে মানি না, সম্ভব না হুট করে’, তারপর যতবার জিজ্ঞেস করবো ততবার বলবে ‘ ভালোবাসা টাসা আমার জন্য নয়’। এরকম হাজার একটা কেচ্ছা শোনাবি। অথচ ঠিকই বউ নিয়ে রাতে ঘুমাবি না, অসময়ে শাওয়ার নিয়ে ঠান্ডা জ্বর বাধিয়ে সারাদিন ক্লান্ত দেখাবি নিজেকে। “
কথাগুলো বলেই নিয়াজ তাকালো পাশেই বসা চন্দ্রা দেওয়ান এর দিকে। ফিসফিসয়ে বললে,
____”বুঝলে দিদা। এসবই তোমার নাতির বাহানা। বউ নিয়ে ঘরে থাকবে তার জন্য এমন করছে। বউ পাগল হয়ে গেছে। আহারে।”

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩৬

ঈশান এর সজোরে আঘাত পরলো নিয়াজের পেটের বা পাশে। বেচারার মুখটা কুচকে এলো। বিরবির করে বললো কিছু একটা। নিশি সমানে হেসে যাচ্ছে এ অবস্থা দেখে। নিয়াজ আড়চোখে প্রিয়তমার দিকে তাকিয়ে অসহায় দৃষ্টি দিলো। নিশি ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাসি থামাতে ব্যাস্ত। তিতির এবার তাড়া দিলো বোনদের। এখানে থাকলে এসব কথা আর থামবে না।
বড়দের থেকে বিদায় নিয়ে একেএকে বের হলো সকলে। ঈশান তিতিরের পিছন পিছন হাঁটতে ব্যাস্ত। মেয়েটা আবার মুখ থুবরে পরবে কি না কে জানে!

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩৮