প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬৩
ইনান হাওলাদার
রাতের গভীরতা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এসেছে। জানালার ফাঁক গলে প্রথম ভোরের আলো ঢুকে পড়েছে নিস্তব্ধ ঘরটার ভেতর। মৃদু সোনালি আভা বিছানার চাদর, দেয়ালের কোণে আলো ছড়াচ্ছে।বাইরে পাখিরা কিচিরমিচির শুরু করেছে, যা একটা নতুন দিনের আগমনী বার্তা জানাচ্ছে। এই স্নিগ্ধ পরিবেশে দুটো শরীর একে অপরের লেপ্টে আছে — এক বালিশে,এক কমফোর্টারে নিচে।
জানালা হয়ে এক চিলতে রোদ্দুর আড়াআড়ি ভাবে আহির দুই চোখের উপর পড়েছে।ঘুমের তোড়ে দুই চোখ খোলার কোনো উপায় নেই।তবুও একটা ভালো ঘুমের আশায় পাশ ঘুরে সূর্যের আলো থেকে বাঁচতে চাইলো মেয়েটা। শরীর নাড়াতে গিয়েই বুঝতে পারলো এক বিন্দু নড়াচড়ার জোঁ নেই। সে সামান্য ফাঁক-ফোকর হতে বহু কষ্টে নিজের একটা হাত বের করলো। দুই চোখ ডলে টিপটিপ করে চোখ খুলতেই কারো উন্মুক্ত সুঠাম বুক নজরে এলো। সাথে সাথে রাতের সকল স্মৃতি এক এক করে চোখের সামনে ভেসে উঠলো।প্রতিটি কথা,প্রতিটি ছোঁয়া আর অদম্য অনুভূতি।সবটা আয়নার মতো পরিষ্কার। মেয়েটা দ্রুত মুখ লুকালো প্রশস্ত বুকে। ঠোঁট কামড়ে ধরে মুচকি হাসি আটকানোর চেষ্টা চালাল।ইতোমধ্যে দুই গাল রক্তিম হয়ে গিয়েছে।
কিয়ৎক্ষণ পর আবার মুখ তুললো ও।সামান্য নড়েচড়ে উঠতে চাইলো।ঘুম থেকে উঠেই এই লোকের মুখমুখী সে হয়ে চায় না। তূর্যের আলগা শরীর নজরে আসতেই নিজের দিকে নজর বুলালো ও।পরনে তূর্যের গায়ে থাকা কালকের রাতের শার্ট— যার মাঝের তিনটা বোতাম লাগানো।আর উপর-নিচের বাকি বোতামগুলো উন্মুক্ত। সে দ্রুত হাতে সবগুলো বোতাম লাগালো।অতঃপর কোমর হতে পুরুষালি হাত জোড়া ছাড়িয়ে খুব সাবধানে উঠে যেতে চাইলো। সাথে সাথে ওপাশের ঘুম জোড়ানো বিরক্ত কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
” তখন থেকে নড়াচড়া করছিস। ঘুমোতে দে ”
হঠাৎ তূর্যের কন্ঠে ওর বুকের উপর ঠাস করে মাথা ফেললো আহি।চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো।বোঝাতে চাইলো সে এখনো জাগেনি — ঘুমিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পার হতেই আবারো মাথা তুললো সে।পিটপিট করে সারা রাত তাণ্ডব চালানো নিষ্ঠুর পুরুষটির মুখের দিকে চাইলো । কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ে আছে ।এখন কি সুন্দর ঘুমিয়ে আছে লোকটা। একেবারে সদ্য জন্ম নেওয়া নিষ্পাপ শিশু।তবে কপালে ভাঁজ কেন? তিনি কি কিছু নিয়ে বিরক্ত?মনে মনে প্রশ্নগুলো ভাবতে ভাবতে আবারো ওঠার চেষ্টা করলো ও।এই পর্যায়ে মুখে বিরক্তিকর শব্দ করে চোখ খুললো তূর্য।প্রেয়সীর কোমর থেকে এক হাত সরিয়ে তার মাথাটা নিজের বুকে মাথাটা চেপে ধরলো ।আর বলল,
” এত জালাচ্ছিস কেন ? ঘুমাতে দে জা’ন প্লিজ ”
এই পর্যায়ে মুখ খুলল আহি।মিনমিন করে বলল ,
” আপনি ঘুমান।আমাকে উঠতে দিন ”
হঠাৎ তাদের অবস্থানের পরিবর্তন ঘটালো তূর্য। এতক্ষণ আহি তার বুকে স্থান পেলেও চোখের পলকে সেটা বদলে গেল।মেয়েটা এখন শক্ত ,নিরেট বুক হতে তুলতুলে বিছানায় স্থান পেয়েছে। যার উপর শরীরের অর্ধেক ভর ছেড়ে আছে তূর্য। আর বাকি অর্ধেক ওর মাথার দুই পাশে রাখা হাতের উপর।হঠাৎ আক্রমণে চোখ বন্ধ করে মানবের উন্মুক্ত বুকে হাত রেখেছে সে। তূর্য ঠোঁটে বক্র হাসি ঝুলিয়ে প্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে ধারালো চাহুনি দিয়ে একবার পুরো শরীর স্কান করে নিলো। প্রথমে চোখ,তারপর নাক, ঠোঁট , গলা এরপর ….. এরপর সেখানেই চোখ আটকে গেল। খুব অত্যাচার হয়েছে বুঝতে পারলো। ওর অভারসাইজ শার্টটা ছোট খাটো মেয়েটার কাধ গলিয়ে পড়েছে। ও সেদিকে একবার তাকিয়ে মুচকি হাসলো। প্রেয়সীর শুষ্ক ঠোঁটের কোণে এক নাগাড়ে কয়েকটা চুমু খেয়ে বলল,
” তোকে ছাড়া ঘুম আসবে না ”
পরপর গলায় মুখ গুঁজে ঠোঁটের উষ্ণতা ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে বলল,
” রাতে ঘুম হয়নি জা’ন। ১২ টায় চেম্বার আছে ।একটু ঘুমাই? ”
শিউরে উঠল মেয়েটার শরীর।দুই হাতে ঠেলে তূর্যের মাথা সরাতে চাইলো। তূর্য বিরক্ত হলো।নিজের কাজ অব্যাহত রেখেই বলল,
” ঘুমোতে দে। আদারওয়াইজ রাতের থেকেও খারাপ হবো।তোর কোনো আর্জি মানবো না।মাইন্ড ইট ”
ব্যস! একটা কথাতে নড়াচড়া থামিয়ে জড় বস্তুর ন্যায় পড়ে রইলো মেয়েটা। অপেক্ষা করলো পাজি লোকটার গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার। আস্তে আস্তে শিথিল হলো তূর্যের ওষ্ঠ পুটের ছোঁয়া।নিঃশ্বাস ভারি হয়েছে।আহি বুঝলো ঘুমের দেশে পাড়ি জমিয়েছে লোকটা।সে আরো কিছুক্ষণ পাথর হয়ে পড়ে রইলো। ঘুম গাঢ় হওয়ার প্রতীক্ষায়। পরপর সুযোগ বুঝে আস্তে করে বেরিয়ে এলো বাঁধন ছেড়ে।
ফ্লোরে পড়ে থাকা তার শাড়ি তুলে নিলো দ্রুত।অতঃপর খেয়াল করলো মাথার একটা বালিশও নিচে পড়ে আছে।সেটা তুলে খুব সাবধানে তূর্যের হাতের নিচে রাখলো। এই মুহূর্তে সে বালিশটাকে ঠিক সেভাবেই আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে রেখেছে যেভাবে একটু আগে আহিকে রেখেছিল।
ড্রয়িং রুমের এক কোণে চুপচাপ বসে আছে আহি।বাড়ির তিন গিন্নি তখন সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত। প্রতিদিনের ন্যায় সে আজকেও গিয়েছিল মা-চাচিদের সাহায্য করতে।কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই আবার ফিরে এসেছে। আজকেও মারুফা বেগম লতা বেগমকে পাঠিয়েছিল ওকে শাড়ি পরাতে।কিন্তু সে দেয়নি। কালকের একটা দাগেই লজ্জায় মুখ লুকানোর জায়গা পায়নি।আর আজকে তো শাড়ি পরাতে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। সে বসে বসে হিসাব মেলাচ্ছে। এক বাড়িতে বিয়ে হওয়ায় শুধু সুবিধাই না অসুবিধাও আছে। এইযে এখন সে ভেজা চুল গুঁজে বসে আছে।কারণ,নিজের মা-চাচিদের সামনে কীভাবে চুল ছেড়ে ঘুরবে? তারা তো সব বুঝে ফেলবেন।কিন্তু বিয়েটা অন্যের বাড়ি হলে হয়তো এতটা লজ্জায় পড়তে হতো না। আপন,চেনা-জানা, পূর্ব পরিচিত মানুষদের সামনে লজ্জা বেশি। ভাবতে ভাবতে চুল ছেড়ে দিলো সে। মাথায় ভালো করে ওড়না পেঁচানো, যার দরুন বসে থাকা অবস্থায় চুল ভেজা নাকি শুকনো এসব কিছু বোঝা যাবে না। তার নানান ভাবনা চিন্তার ইতি ঘটলো শান্ত-প্রান্ত আর তাহির আগমনে।তাহির এসেই তার ভাবিপুর কোলের উপর ঝাঁপ দিয়ে পড়লো।কৌতূহল নিয়ে বলল,
” তুমি স্কুলে যাবে ভাবিপু? ”
শান্ত তাহির মাথায় গাট্টি মেরে বলল,
” স্কুল না গাঁধা , ভার্সিটি ”
” উফফ শান্ত ভাইয়া শুধু মাথায় মা’রো কিন্তু । আমার ব্রেইন খারাপ হয়ে যাবে ” মাথা ডলতে ডলতে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল মেয়েটা।
” তোর ব্রেইন এমনিতেই খারাপ ,বনু ” প্রান্তের কথায় আরো রে’গে গেল তাহি। এই বুঝি কাঁন্না করে দিবে ভাব।কিন্তু কথাটা শান্তের পক্ষে হওয়ায় দুই ভাই হাত মিলালো।আহি বুঝলো ওদের ঝ’গড়া না ঠেকলে মা’রামারি পর্যন্ত গড়িয়ে যাবে।অন্যসময় হলে নিজেও তাহির পক্ষ নিয়ে ওদের সাথে ঝ’গড়া-মা’রামারি করতো।কিন্তু এই মুহূর্তে সেই মুড ওর নেই।তাই তাহির প্রশ্নের উত্তর দিলো সে,
” না তো । ভার্সিটি যাবো না ”
” কিন্তু গোসল কেন করেছে ? ” ঠোঁট উল্টে আরেকটা প্রশ্ন করলো তাহি। আহি থতমত খেয়ে গেল।কি বলবে ভাবতে ভাবতে তাহি নিজে থেকেই বলল,
” বুঝেছি, অনেক গরম বলে তাইনা আপু? ” পরপর নিজের ঘোর বিরোধিতা করলো,
“না, না ! তাইনা ভাবিপু? শুধু গুলিয়ে যাচ্ছে ” বলে দুই হাত বুকে বেঁধে মুখ ফুলালো ও।যেন নিজের উপর খুব বিরক্ত সে।
তূর্য ঘুম থেকে উঠে আর আহিকে পায়নি। হালকা ঘুমের মাঝে যখন বিছানা হাতড়ে দেখেছে ফাঁকা তখনই মূলত চোখ খুলেছে। ঘড়িতে তখন সাড়ে দশটা। পিটপিট করে চোখ খুলে একবার দেওয়াল ঘড়ি দেখে দ্রুত উঠেছে। গোসল সেরে আর রুম থেকে বের হয়নি।সেখান থেকেই কফির বায়না দিলো। কিছুক্ষণ বাদে তাহি কফি নিয়ে আসলো।তূর্য বোনের হাত থেকে কফির গ্লাসটা নিয়ে বলল,
” তোমার আপু কি করছে? ”
” ধুর ভাইয়া! আপু না, ভাবিপু! ভাবিপুর সাথে আব্বু অনেক কথা বলছে ”
” কথা শেষ হলে আপু… স্যরি ভাবিপুকে চুপিচুপি বলবে ভাইয়া তোমাকে ডাকছে।ওকেই?”
তাহি ঘাড় কাত করে সম্মতি দিয়ে যেভাবে এসেছিল সেভাবে চলে গেল।তার বেশ অনেকক্ষণ পর আহি এলো। তূর্য তখন হাসপাতাল যাওয়ার উদ্দেশে রেইডি হচ্ছে। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় দেখতে পেলে খুব শান্তভাবে হেঁটে আসছে আহি। তূর্য একবার নিজের হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিলো।১২ টায় চেম্বার এখন সোয়া ১১ টা বাজে।হাতে সময় কম।তাঁড়া দিলো আহিকে।বলল,
” একটু ফাস্ট হেঁটে আয় আমার …. ” পরমুহূর্তেই আবার কি মনে করে বাক্যকের ইতি ঘটালো।নরম গলায় বলল,
” আচ্ছা আয়,যেভাবে আসছিলি ”
আহি নিজের গতিতেই এগিয়ে এলো।ওড়নার একপ্রান্ত খুঁটতে খুঁটতে নত মাথায় বলল,
” ডাকছিলেন তূর্য ভাই?”
তূর্য হাতের চিরুনিটা ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখলো। ওর দিকে ফিরে বলল,
” কখন উঠেছিস?”
” তখনই।আপনি ঘুমিয়ে গেলে ”
” কেন? দুই ঘন্টা ঘুমিয়ে হয়ে গেছে?”
” তো কি করতাম তূর্য ভাই? এত দেরি করে ঘুম থেকে উঠলে সবাই কি ভাবতো? আমি তো আর আপনার মতো নি’র্লজ্জ …..” উঁচু গলায় কথাগুলো বলতে বলতে থেমে গেল সে। এভাবে সরাসরি নি’র্লজ্জ তকমা দিতে বিবেকে বাঁধছে। তূর্য ওর উচ্চ কণ্ঠের কথায় মুচকি হাসলো। নরম গলায় জানতে চাইলো,
” বেশি খারাপ লাগছে? ”
আহি এবারেও তাঁকালো না তূর্যের দিকে। এখনো মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। এসে ধরে একবারও চোখে চোখ রাখেনি। ও সেভাবেই এদিক-ওদিক ‘ না ‘ বোধক মাথা নাড়লো।তূর্য ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার হতে কিছু ঔষুধ বের করলো।অতঃপর পানির গ্লাস আর ওষুধগুলো ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
” এগুলো খেয়ে নে ”
আহি ডান হাতের তর্জনী আঙুল দ্বারা টিটেবল এর দিকে দেখিয়ে বলল,
” ওখানে রাখুন। পরে খেয়ে নিবো ”
” এখনই খেয়ে নে। ” পরপর ঠোঁট কামড়ে হাসলো ও।
নিজের মাথাটাকে আরো নুইয়ে প্রেয়সীর চোখে চোখ রাখার চেষ্টা করতে করতে বললো,
” পরে কেন? বেইবি চাইছিস নাকি? ”
আহি এবার তড়িৎ বেগে তূর্যের মুখের দিকে তাঁকালো। আশ্চর্য হলো প্রচুর।পরপর আবার চোখ সরিয়ে পূর্বের অবস্থায় মাথাটাকে রেখে ‘ না ‘ বোধক মাথা নাড়লো। তূর্য ওর থুতনি ধরে মুখটা উঁচু করলো ।তারপর আদুরে কন্ঠে বলল,
” আমার দিকে তাঁকা ” তাঁকালো না আহি।
তূর্য পুনরায় বলল,
” তাঁকা আমার দিকে! ”
” বলুন ,শুনছি ” মিনমিন করে বলল মেয়েটা। তূর্য বুঝলো এভাবে নরম কথায় কাজ হবে না। ও এইবার ভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করলো,
” বাব্বাহ! এত লজ্জা তোর ? কই ? জানতাম না তো । আর কে যেন সুন্দর সুন্দর বাচ্চার লোভে আমাকে বিয়ে করতে চাইতো? আমি তো জাস্ট সেই চেষ্টাটাই করেছি। আদারওয়াইজ তার কাছে যাওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। বলতে পারিস এক প্রকার বাধ্য হয়েই গিয়েছি। নাহলে কিউট বেইবি কোথা থেকে আসবে ? বল !” এরপর একটু থামলো তূর্য। মেয়েটার ভাবগতির বোঝার চেষ্টা করলো। এদিকে আহি মাঁড়ি আটকে দাঁড়িয়ে আছে।না জানি আরো কত নি’র্লজ্জতার প্রমাণ দিবে এই লোক। যদি পারতো এখনই মুখে একটা স্কচটেপ লাগিয়ে দিতো। ওনার নাহয় লজ্জা নেই।নি’র্লজ্জ লোক একটা ! তাই বলে বাকিরাও তেমন হবে?
তূর্য এবারে একটা হতাশার নিঃশ্বাস ফেললো। গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল,
” তাছাড়া কাল রাতের কিছুই আমার মনে নেই । কিচ্ছু দেখিওনি আমি।আর যেটুকু যা করেছি ভুলে গেছি।শুধু ‘ ভাই ‘ ডাকগুলো মনে আছে।”
আহি এবার আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারলো না।চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো,
” তূর্য ভাই ! আল্লাহর দোহাই লাগে চুপ করুন । অসভ্য,নি’র্লজ্জ লোক কোথাকার ! ” মুখ ফসকে কথা দুটো বলেই ফেললো আহি। রাগে ফোঁস ফোঁস করছে মেয়েটা। তূর্য ডান ভ্রু সামান্য উঁচিয়ে তাঁকিয়ে আছে ওর দিকে। এবারে আর নজর সরালো না ও।ভাবলো কথা দুটোর জন্যে নির্ঘাত বকা শুনবে । কিন্তু তূর্য দাঁত পিষে বলল,
” কাল রাতে এতকিছু হওয়ার পরও ভাই ডাকতে তোর লজ্জা করছে না ইস্টুপিড?”
” এতকিছু হওয়ার পরেও তুই-তুকারি করতে আপনার লজ্জা করছে না? ” ঝগড়ুটে কন্ঠস্বর আহির ।
” না,করছে না।” এক রোখা উত্তর তূর্যের।
” আমারও করছে না ”
” কেন? তুই নির্লজ্জ?তোর ভাষ্যমতে আমি তো নির্লজ্জ।সেটার প্রমাণ দিয়েছি কালকে।আর ওসব তুমি-টুমির আশা ছেড়ে দে। আমার দ্বারা জীবনেও হবে না ” শেষ বাক্য দুইটি গম্ভীর গলায় বলল ও।
” কাল রাতে তো ঠিকই হাজারবার ডেকেছিলেন ” এখনো সমান তাকে ঝগড়া করে যাচ্ছে মেয়েটা। তূর্য ওকে হ্যাঁচকা টানে কাছে টেনে আনলো। দুইহাতে কোমর জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখ নিয়ে হাস্কি স্বরে বলল,
” তখন কন্ট্রোলে চলে গিয়েছিলাম ”
পরপর আবার মুখ সরিয়ে নিলো। সে এতক্ষণে খেয়াল করলো আহির ভিন্নরকম সাজ। ওড়নাটাকে গলায় সাপের মতো পেঁচিয়ে রেখেছে। সরাতে সরাতে বলল,
” এভাবে ওড়না পেঁচিয়ে ছিস কেন? গরম লাগছে না?”
ওড়না সরাতেই কতগুলো কালচে বাদামি দাগ জ্বলজ্বল করে উঠলো। বুঝতে পারলো ওভাবে ওড়না পেঁচানোর আসল কারণ। তূর্য সেদিকে চেয়ে মুচকি হাসলো।বলল,
” আইডিয়া খারাপ না ”
আহি ওকে ছাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে বলল,
” দেখি ছাড়ুন তূর্য ভাই।ওড়না দিন ”
” বাইরে যাওয়ার সময় আবার ঢেকে নিস ” বলে ওড়নাটাকে বিছানার উপর ছুঁড়ে মা’রলো তূর্য।
বিরক্ত হলো আহি,
” আশ্চর্য! এখন গায়ে জড়াতে দিবেন তো নাকি ? ”
” কেন?”
” আজব! আমি আপনার সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবো ?”
” তো? তখন দেখিনি বলেছি বলেই কি সব সত্যি হয়ে গেছে? ”
” ছাড়ুন প্লিজ তূর্য ভাই ”
এবার ওর কথা শুনল তূর্য।ছেড়ে দিলো মেয়েটাকে।মুখ থেকে দুষ্টুমি সরে হঠাৎ সিরিয়াস হলো। আহিকে ছেড়ে ওকে নিয়ে বিছানার পাশে বসলো।অতঃপর নিজেও মেঝেতে হাঁটু মুড়ে ওর মুখোমুখি বসলো।হাত বাড়িয়ে প্যান্টের পকেট হতে মোবাইল বের করলো।অনেকক্ষণ ধরে ঘেঁটে একটা ছবি বের করলো। যেখানে ওদের দাদু—আনোয়ারা বেগম , আহি আর ওর একটা ক্যানডিড ফটো। যেখানে চৌধুরী বাড়ির ড্রয়িং রুমের রাজকীয় চেয়ার খানায় বসে আছেন আনোয়ারা বেগম । মুখে তার অকৃত্রিম হাসি,চোখে বড় বড় ফ্রেমের চশমা।আর ওনার পাশে — চেয়ারের হাতলের উপর বসে আছে তূর্য ।তার ফোল্ড করা শার্টের হাতা ধরে টানছে একটা সাত-আট বছরের মেয়ে।যার দিকে গরম চোখে তাঁকিয়ে আছে সে। মেয়েটার মুখে কিছুটা ভয়ের ছাপ। তখন তূর্য বড় জোর দশম শ্রেণির ছাত্র।
তূর্য মোবাইলটাকে বেড সাইড টেবিলের উপরে থাকা কাঁচের তৈরি পানির গ্লাসের সাথে ঠেস দিয়ে রাখলো।অতঃপর ড্রয়ার হতে একটা বক্স বের করলো। সেটা খুলতেই এক জোড়া স্বর্ণের বালা বেরিয়ে আসলো। ভারী কারুকার্যের বালাটা বেশ খানিকটা মোটা।নকশা আগেকার দিনের হলেও একটা আভিজাত্য বহন করছে। বালা জোড়া চিনতে সময় লাগলো না আহির। এটা তার দাদুর বালা।যেটা তিনি তূর্য ভাইকে দিয়েছিলেন তার বউকে দিতে। তূর্য বালা জোড়া বের করে আহির হাতে পরিয়ে দিলো। অতঃপর হাত টেনে দুই হাতের পিঠে চুমু খেল। ডান হাতটা টেনে নিজের ঠোঁটের কাছে এনে তালুতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চুম্বন এঁকে ঘাড় ঘুরিয়ে ছবিটির দিকে তাকালো। মলিন হেসে বলল,
” তোমার বড় নাত বউকে নিজের হাতে পরিয়ে দিলাম দাদু।তুমি খুশি হয়েছ?হুম? ”
তূর্যের হাতের উপর থাকা নিজের হাত জোড়া এখনো নিগূঢ় দৃষ্টিতে পরখ করছে মেয়েটা। এটা তার দাদু মারা যাওয়ার এক সপ্তাহ আগে তিনি তূর্যকে দেন। বালা জোড়া দেওয়ার জন্যে সারা বাড়ির লোককে এক করেছিলেন তিনি। জরুরি তলব জানান তিন ছেলেকে।শত ব্যস্ততার মধ্যেও মায়ের কলে তিন ছেলে ছুটে চলে আসেন ।আর তারপর তিনি তূর্যের হাতে এই বালা জোড়া দিয়ে বলেন,
” আমার ফুটফুটে নাত বউয়ের মুখ দেখেই এটা তাকে দিবি দাদুভাই।আর সে পর্যন্ত বেঁচে থাকলে আমার জিনিস আমাকে ফেরত দিয়ে দিবে বলে দিলাম।আমি নিজে হাতে তাকে পরিয়ে দিবো।”
তূর্য বালাসহ দাদুর হাত ধরে চুমু খায়। হালকা হেসে বলে,
” দিও”
তখনই আহির হিংসুটে মনোভাব জেগে ওঠে।কপট অভিমান নিয়ে বলে,
” আমিও তো তোমার বড় নাতনি দাদু।আমার জামাইয়ের জন্যে কিছু দেও ”
” আলমারি খুলে দেখো তোমার দাদার একটা লুঙ্গি আছে বু। ঐটা তোমার জামাইয়ের ”
ঘরসহ সবাই হেসে দিলেও আহি সানন্দে সেটা গ্রহণ করে।তখন তূর্য দাদুকে বলে,
” এটা তোমার নাতনিকে দিয়ে দেও।আমার বউকে আমি আরেকটা বানিয়ে দিবো ।নেও পরিয়ে দেও ওকে ”
আনোয়ারা বেগম রাজি হন না।কানে কানে ফিসফিস করে কিছু একটা বলেন।সেদিন আহির দিকে তাকিয়ে তির্যক হেসেছিল তূর্য। ওর স্পষ্ট মনে আছে।কিন্তু তখন তার এখনের মতো সাহস ছিল না।তাই হাসির কারণ জিজ্ঞেস করতে পারেনি।আহি হুট করেই সেই প্রশ্ন তুলল,
” দাদু এই এই বালা দেওয়ার সময় আপনার কানে কানে কি বলেছিল তূর্য ভাই?”
তূর্য একপলক আহির মুখের দিকে তাঁকালো।পরপর আবার মোবাইলের স্ক্রিনে নজর দিলো।ছবির মরহুম বৃদ্ধার উদ্দেশ্যে বলল,
” সেদিন তোমাকে বলেছিল পরিয়ে দিতে, দিলে না।ইচ্ছা পূরণ হয়ে যেত দাদু।কিন্তু তুমি তো নাত বউ হওয়ার পরেই পরাবে বলে ঠিক করে নিলে।আমার আর কি করার বলো।”
আহির মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সবটা। তূর্যের কথার কোনো আগা গোড়া খুঁজে পাচ্ছে না সে।এদিকে তার করা প্রশ্নের উত্তরটাও দিলো না লোকটা। পুনরায় একই প্রশ্ন করলো মেয়েটা,
” দাদু কি বলেছিলেন বলুন না তূর্য ভাই ”
সে প্রশ্ন করে দম ফেলের আগেই তূর্য চট করে উত্তর দিলো।বলল,
” তখনই তোকে বিয়ে করতে বলেছিল। আর বলেছিল বা’সর রাতে এটা দিয়ে তোর কাছে যেতে ”
” কিন্তু আপনি তো বা’সর রাতে আমাকে দেননি ”
” ঘুমিয়ে গেছিলি তো কিভাবে দিবো? আর সেদিন গিয়েছিলাম তোর কাছে ? ”
” কালকেও তো দিলেন না ” লজ্জায় রাঙা হয়ে মিনমিন করে বলল আহি।
” কাল… কাল …” কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেল তূর্য।গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” এখন দিচ্ছি, এখন নে।এত কথা বলিস কেন? ”
আহি এবার আর কথা ঘাটল না । তূর্য হতে হাত ছাড়িয়ে বালা জোড়াকে খুব মনোযোগ সহকারে দেখতে লাগলো।তৎক্ষণাৎ একটা প্রশ্ন উঁকি দিলো মস্তিষ্কে। বলল,
” দাদু আপনাকে ওই কথা বলেছিলেন কেন?”
” কোন কথা?” ভ্রু কুঁচকালো তূর্য।
” ঐযে আমাকে বিয়ে করতে! ”
” দাদু জানতেন আমি তোকেই বিয়ে করবো ”
” মানে? দাদু কি ভবিষ্যৎ বলতে জানতেন নাকি ”
” দাদুর সাথে আমি সবকিছু শেয়ার করতাম।তাই জানতেন ”
” কিসব বলছেন তূর্য ভাই।আমি কিচ্ছু বুঝছি না। আপনি তো তখন আমাকে দেখলেই ব’কতেন।তাহলে ? ”
” জানি না! এত কোশ্চেন করতে তোর মুখ ব্য’থা করে না? আমার লেইট হচ্ছে। নিচে আয়,খেতে দিবি ”
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৬২
বলে বড়বড় পা ফেলে চলে গেল তূর্য।এক প্রকার পালালো ও।এদিকে হাজারটা প্রশ্ন মাথায় উঁকি দিচ্ছে মেয়েটার।এত এত প্রশ্ন অথচ একটার উত্তর তার কাছে নেই। যতই চেষ্টা করুক এই ঘাড় ত্যাঁড়া লোক কিচ্ছুটি খোলসা করবেন না।তবে আসল কাহিনী ওকে জানতে হবে।কিন্তু কীভাবে? এতক্ষণ ধরে তূর্যের কথার মানে যেটা দাঁড়ায় লোকটা আগে থেকেই ওকে ভালোবাসে।এছাড়া আগে দুইবারও ওর সন্দেহ হয়েছে। বান্দা কিছুতেই কিছু বলেননি তখন।কিন্তু এইবার সে জেনেই ছাড়বে।
