সে খলনায়ক পর্ব ২
ফারহানা সানিয়াত
মিস সেলিনা কথা মত প্রাণপ্রিয়া আম গাছের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকগুলো আম গাছ ,গাছগুলোর উচ্চতা বেশি না হলেও মোটাসোটা আর ডালপালা ছড়ানো গাছ,, প্রাণপ্রিয়া সময় নষ্ট না করে সুরসুর করে অভিজ্ঞতার সাথে গাছে উঠে পড়ে,, গাছের উঠতেই অনেকগুলো আধপাকা আম দেখতে পায়, নিজের সাথে কোনো ঝুড়ি নিয়ে না আসার কারণে হাত বাড়িয়ে আমগুলো নিয়ে মাটিতে একটার পর একটা ফেলা শুরু কর,, ছোট প্রাণপ্রিয়া এই কাজ করতে যেন ভীষণ মজা পাচ্ছে , সে আস্তে আস্তে গাছের অনেকটা উপরে ওঠে একটা ডালে বসে,,
প্রাণপ্রিয়া এত দিন জঙ্গলে এসে ঘুরেফিরলে ও গাছে উঠে এমন বসে থাকেনি কিন্তু আজ বসে আছে,, এখান থেকে ঝিলের ওই পারে রাজকীয় বাড়িটা আরো ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে,, সাদা রঙের বিশাল বড় বাড়ির সামনে গার্ডেনে নানান রঙের ফুল গাছ,, প্রাণপ্রিয়া জঙ্গলে ফুল গাছ দেখেছে তার কাছে ফুল অনেক পছন্দের তাই মনে একটা ইচ্ছা জাগে ওই সুন্দর বাড়িটা গিয়ে একদিন সামনে থেকে ফুল গুলো দেখে আসবে,, হ্যাঁ সে দেখবে, ছোট মনে রংবেরঙের ভাবনা ভাবতে থাকে প্রাণপ্রিয়া, এরপর কিছু সময় পাড় হলে আবার গাছ থেকে আম পারা শুরু করে,, তবে হঠাৎ এক বিকট শব্দে শুনে চমকে ভয়ে গাছের ডাল জাপটে ধরে ,, তার আত্মাটা যেন কেঁপে উঠলো এমন বিকট শব্দ আজ পর্যন্ত ছোট প্রাণপ্রিয়া শুনেনি,,কোথা থেকে শব্দ আসলো ভেবে আশেপাশে খুঁজতে থাকে খোঁজার মাঝে আবার সেই শব্দ এবার মেয়েটা এক চিৎকার দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছে তাকাতে ই ডাগর ডাগর চোখ দুটো দিয়ে দেখতে পায় নিচে অত্যন্ত সুদর্শন এক যুবক তার দিকে এক বিশাল বড় বন্দুক তাক করে আছে,,
ছোট প্রাণপ্রিয়া এই জঙ্গলে এমন ভয়ংকর দৃশ্য দেখবে কখনো ভাবতেও পারিনি,, মেয়েটা ভয়ে সাথে সাথে কেঁদে ওঠে,,
নিচে বন্দুক নিয়ে দাঁড়ানো ছেলেটির চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠে,ঘাড় বাঁকা করে এক পলক নিচে পড়ে থাকা আমগুলো দেখে আবার মেয়েটার দিকে আরো শক্ত ভাবে বন্দুক তাক করে বিকট শব্দ আবার গুলি ছুড়ে,, গুলি একদম প্রাণপ্রিয়ার পাশ দিয়ে একটা পাখির শরীরে গিয়ে লাগে,, এদিকে প্রাণপ্রিয়া ভয় চিৎকার দিয়ে গাছ থেকে ধপাশ করে নিচে পড়ে যায়,, গাছের উচ্চতা কম বলে এতটা ব্যাথা না পেলেও হাটু ছিলে হালকা রক্ত বের হতে থাকে, ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে ছোট প্রাণপ্রিয়া সাথে ভয় তো আছেই, তবে বন্দুক ধরা ভয়ংকর ছেলেটি এখনো বন্দুক তার দিকে তাক করে আছে। প্রাণপ্রিয় ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না করা শুরু করে…
__ দয়া করে মারবেন না ,, দয়া করে মারবেন না আমাকে আমি কোনো কিছু করিনি আমি শুধু আম পারছিলাম,আমি ওই সামনের আশ্রমটায় থাকি, আমাকে প্লিজ মারবেন না, ছোট মেয়েটার কান্নারত ভীত কন্ঠে আকুতি ,,
সামনের যুবক ছেলেটি বন্দুক নিচে নামায় তবুও দুচোখের তার তীক্ষ্ণতায় ভরপুর,,
ছোট প্রাণপ্রিয়া ছেলেটাকে বন্দুক নামাতে দেখে ঢোক গিলে, তার ভীত কান্নারত চাহনি দেখলে যে কেউ বলবে, এই মেয়ে এখনই বেহুশ হয়ে পড়বে, কিন্তু নাহ প্রাণপ্রিয়া সামনে ছেলেটি থেকে চোখ সরিয়ে চোখ এদিক ওদিক ঘুরায় মনে অল্প একটু সাহস জগায় তাকে পালাতে হবে,, না হলে হয়তো এখানেই তার জীবন শেষ,,
সামনের যুবকটি ছোট মেয়েটার ভাব প্রতিক্রিয়া দেখছে সাথে মেয়েটা পায়ে আঘাত পেয়েছে এটাও চোখে পড়ে,,
প্রাণপ্রিয়া আঘাত পাওয়া পা নিয়ে আস্তে আস্তে বসা থেকে উঠে এরপর সে এক চিৎকার দিয়ে কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা দৌড়,,
যুবক ছেলেটি পিছন দিক থেকে ছোট মেয়েটা যাওয়ার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে ঠোঁট আওড়ায় বলে ইডিয়েট,,
প্রাণপ্রিয়া নিজের জীবন নিয়ে দৌড়াচ্ছে তার মুখ দিয়ে আ শব্দের চিৎকার, তার পায়ে যে ব্যথা ভয়ে মাথা থেকে চলে ই গেছে সে দৌড়াতে দৌড়াতে আশ্রমে এসে দরজার সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে ব্যথার উপর যেন আবার ব্যথা,, মিসেস সেলিনা হন্তদন্ত হয়ে রান্নাঘর থেকে ছুটে আসে, সে প্রাণপ্রিয় চিৎকারে শব্দ শুনেছে ,
__ কি হলো! কি হলো এমন চিৎকার কেনো? কি হয়েছে? প্রাণপ্রিয়া মিসেস সেলিনার কণ্ঠস্বর শুনে আরো শব্দ করে দরজার সামনে বসে কান্না করা শুরু করে,,
আতঙ্কিত চোখে মিসেস সেলিনা প্রাণপ্রিয়ার অবস্থা দেখেন, মেয়েটার জামা কাপড়ের ধুলোবালি লেগে আছে সাথে হলুদ রঙের জামায় লাল রক্তের ফোঁটা তিনি দ্রুত প্রাণপ্রিয়ার কাছে এসে তাকে ধরে পাশের একটা সোফায় বসান,,
__ তোমার জামায় রক্ত কেনো? তুমি কি ব্যথা পেয়েছো? গাছ থেকে পড়ে গেছো, কোথায় ব্যথা পেয়েছ আমাকে দেখাও,,
প্রাণপ্রিয়ার কান্নারত কন্ঠ, আমি ব্যাথা পেয়েছি অনেক ব্যথা পেয়েছি কিন্তু আমাকে ওই জঙ্গলে একটা ভয়ংকর ছেলে বন্দুক দিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল আমি ভয় গাছ থেকে পড়ে যাই আর দৌড়ে চলে আসি,,
প্রাণপ্রিয়ার কথা শুনে সেলিনা প্রচন্ড অবাক হয়ে তার মুখের সামনে হাত চলে যায়, তার দুই ভ্র কুঁচকে গেছে, কারণ আশ্রমের লোক আর আবরার পরিবারের লোকদের ছাড়া এই জঙ্গলে বাহিরের কেউ আশা নিষেধ তাহলে কে !! তিনি জিজ্ঞেস করেন , ছেলেটি দেখতে কেমন ছিল?
প্রাণপ্রিয়া ইতিমধ্যে কান্না করতে করতে হেঁচকি উঠিয়ে ফেলেছে সে নাক টানে, ছেলেটি অনেক লম্বা অনেক সুন্দর আর আলাদা,,
প্রাণপ্রিয়ার অদ্ভুত বর্ণনা,সেলিনা একটু ভাবনায় পড়ে যায় সে জানালার বাহিরে দিকে তাকিয়ে খানিকক্ষণ ভাবে অতঃপর হঠাৎ তার মুখে খুবই স্বচ্ছ একটা হাসি চলে আসে,,
__ তুমি হাসছো কেনো আন্টি? প্রাণপ্রিয়া হেঁচকি তুলে জিজ্ঞেস করে?
সেলিনা কিছু বলে না সে বসা থেকে উঠে পাশের একটা ঘর থেকে ওষুধের বক্স নিতে চলে যায়,, প্রাণপ্রিয়া নাক টানতে টানতে সেলিনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে,,
মিনিট দুয়েক পর হাতে একটা ওষুধের বক্স নিয়ে সেলিনা আবার চলে আসে আর প্রাণপ্রিয়া পাশে এসে বসবে,,
__ তুমি চুপ হয়ে গেলে কেন আন্টি? আমাদের তো জানাতে হবে এই জঙ্গলে একটা ভয়ংকর ছেলে আছে,,
সেলিনা শব্দ করে হেসে প্রাণপ্রিয় হাঁটুর আঘাতে স্যাভলন লাগাতে লাগাতে তিনি বলেন,, ভয় পেয়েও না তোমাকে কেউ মারতে চায় নি,
প্রাণপ্রিয়ার কপাল কুঁচকে ফেলে সে ব্যথা পেয়েছে কান্না করছে আর ভয়ংকর ছেলের কথাও বলল কিন্তু আন্টি বলেছেন তাকে ভয় পেতে না এর মানে আন্টি কি তার কথা বিশ্বাস করিনি!!
__ তুমি এটা কিভাবে বলছো আন্টি? তুমি আমার কথা বিশ্বাস করো নি তাই না, প্রাণপ্রিয়ার কান্নারত রাগ মিশ্রিত কন্ঠে,
__ আমি তোমার কথা বিশ্বাস করেছি আমার ছোট্ট প্রিয়া কিন্তু তুমি জিনিসটা না বুঝে ভয় পেয়েছো, তুমি যার কথা বলছ সে তোমাকে মারতে চাইনি সে এই জঙ্গলে পাখি শিকার করতে এসেছে এর জন্য বলছি ভয় পেয়ো না ,,
মিসেস সেমিনার কথা শুনে প্রাণপ্রিয়ার সাথে সাথে হেঁচকি থেমে যায়, সেলিনা আঘাত পরিষ্কার করে সেখানে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে মেয়েটার চোখের পানি মুছে দেয় এরপর বলেন,,
__ তুমি যাকে দেখেছো সে বড় সাহেবের ছেলে দামিয়ান আবরার আমাদের ছোট সাহেব সে যখন বাংলাদেশে আসে মাঝে মাঝে এই জঙ্গলে পাখি শিকার করে আর আজও হয়তো এসেছে কিন্তু তুমি ভুল ভেবেছো আর ছোট সাহেবও হয়তো তোমাকে চিনতে পারিনি যাইহোক তুমি উপরে গিয়ে নিজের জামাটা বদলে আসো রক্তের দাগ ভরে আছে ,,
প্রাণপ্রিয়া আন্টির কথা শুনে নাক ফুলিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়ে, এর মানে ভয়ংকর ছেলেটি তাকে মারতে চাইনি পাখি মারছিল কিন্তু বিশাল বন্দুক তো তার দিকে তাক করা ছিল সে কি পাখি নাকি ?
__ তুমি পাখি হতে যাবে কেনো, সেলিনা প্রাণপ্রিয়ার গালে হাত দিয়ে বলেন,
আহ তাও ঠিক কিন্তু তাহলে তো আরো বেশি ভয়ংকর কত বড় নিষ্ঠুর মনে মানুষ এভাবে প্রকৃতির এক অংশকে মেরে ফেলতে পারে নাহ লোকটি ভালো না, ছোট মনে প্রাণপ্রিয়া একা ভেবে উঠে,, তখনই কানে আসে বাহিরে বাচ্চাদের হইচই করা শব্দ, সাথে মিস্টার রহমান কারো সাথে কথা বলছেন এটাও হালকা শোনা যাচ্ছে, মিসেস সেলিনা কে এসেছে দেখার জন্য বসা থেকে উঠে সদর দরজার কাছে চলে যান,,
প্রাণপ্রিয়া ও কৌতূহল বসত ব্যথা পা নিয়ে আস্তে আস্তে হেঁটে মিস সেলিনার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় আর দেখতে পায় উঠানে একজন মধ্যবয়স্ক পাঞ্জাবি পরা লোক চেয়ারে বসে আছেন তার পাশে কালো স্যুট পরা আরেকজন লোক দাঁড়ানো, আর তাদের দুজনের সামনে রহমান দাঁড়িয়ে খুব বিনয়ের সাথে কথা বলছেন, একপাশে বাচ্চারা হাতে ছোট ছোট গিফটের বক্স নিয়ে হইচই করছে,,
মিসেস সেলিনা শাড়ির আঁচলটা মাথায় দিয়ে হাসিমুখে সামনের মধ্য বয়স্ক লোকটিকে উদ্দেশ্য করে সালাম দেন,,চেয়ারে বসা লোকটি ও সালাম এর উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করেন ,,
__ কেমন আছো সেলিনা?
সেলিনা বিনয়ের সাথে বলে জী খুব ভালো বড় সাহেব, আপনি ভালো আছেন? মধ্যবয়স্ক লোকটি খুব সুন্দর করে হাসেন তোমাদের দোয়ায় বেশ ভালো আছি আর এখন তো বাচ্চাদের দেখে আরও বেশি ভালো হয়ে গেছি,,
প্রাণপ্রিয়া সেলিনার পাশে দাঁড়িয়ে বোকা চাহনিতে বড়দের কথা শুনে সে এতোটুক বুঝতে পারে মধ্যবয়স্ক লোকটি আর কেউ না তিনিই হুমায়ূন আবরার বড় সাহেব এখানকার মালিক যার কথা সে শুনেছে,,
হুমায়ুন সেলিনা আর রহমানের সাথে কথা বলার মাঝে সেলিনার পাশে দাঁড়ানো তেরো বছরের ছোট্ট মেয়েটা কে দেখে জিজ্ঞেস করেন,,
__ ও কি নতুন যার কথা আমি শুনেছিলাম?
__ জি বড় সাহেব, মিস্টার রহমান বলে ওঠেন, খুবই ভদ্র আর মিষ্টি একটা মেয়ে বাকি বাচ্চাদের সাথে খুব ই ভালোভাবে মিশে গেছে,,
হুমায়ুন প্রাণপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে মনোযোগ সহকারে রহমানের কথা শুনে এরপর ইশারা করে প্রাণপ্রিয়া কে ডাক দেন,,
বড় সাহেবের ইশারা দেখে প্রাণপ্রিয়া পাশের দাঁড়ানো সেলিনার দিকে মুখ তুলে তাকায়,, সেলিনা মুখে হাসি নেই মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন যাও তোমাকে ডাকছেন,,
সেলিনার কথা শুনে প্রাণপ্রিয়া মুখ ঘুরিয়ে গুটি গুটি পায়ে মাথা নিচু করে হুমায়ুনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, তার ভেতরটা ভয়ে কেমন ধুকপুক করছে সে নার্ভাস,,
হুমায়ূন মিষ্টি ছোট মেয়েটাকে দেখে কিছু বলবেন তখনই পিছে পায়ের শব্দ শুনে তিনি ঘুরে তাকান,
ওহ দামিয়ান তুমি তোমার জন্য ই অপেক্ষা করছিলাম এখানে এসো,,
ছোট প্রাণপ্রিয়া দামিয়ান নামটা একবার শুনেছিল কিন্তু তার মাথায় তখন আটেনি তাই আপাতত নার্ভাসের জন্য মাথা নিচু করে আছে,,
হুমায়ূন আবরার ছেলের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে সামনে দাঁড়ানো ছোট মেয়েটার দিকে ফের তাকান এরপর খুব নরম স্বরে জিজ্ঞেস করেন,,
সে খলনায়ক পর্ব ১
__ কি নাম তোমার মা,
__ প্রাণপ্রিয়া ঢোক গিলে তোতলানো শব্দ নিজের বলে
জিজ প্রাণপ্রিয়া,,বলেই সে চোখ তুলে উপরে তাকায় আর সাথে সাথে ভীত হয়ে এক চিৎকার দিয়ে ওঠে,,
উপস্থিত সবাই প্রাণপ্রিয়ার চিৎকার শুনে হতভম্ব,
