মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৭ (২)
মাহা আয়মাত
আরভিদের অর্তিহার কথায় বিশ্বাস হয়। হয়তো সত্যিই আদ্রিক আর অর্তিহার মধ্যে সব ঠিক হয়ে গেছে। তাই সে আদ্রিকের রুম থেকে সরে নিজের রুমে ঢুকতে যাচ্ছিল। তখনি পেছন থেকে কেউ ডাক দেয়,
— আরভিদ?
আরভিদ ঘুরে তাকিয়ে দেখে, আভীর কারদার দাঁড়িয়ে আছেন। ওনার মুখে স্পষ্ট চিন্তার ছাপ। আরভিদ আর নিজের রুমে না গিয়ে ওনার দিকে এগিয়ে গেল।
— কী হয়েছে? এমন দেখাচ্ছে কেন?
আভীর কারদার তাড়াহুড়োর সুরে বলেন,
— বড় সমস্যা হয়েছে। তাড়াতাড়ি স্টাডি রুমে আসো।
আরভিদের কপালে ভাঁজ পড়ে। কয়েক সেকেন্ড বাবার দিকে তাকিয়ে তারপর গম্ভীর গলায় বলে,
— আচ্ছা, আসছি।
আভীর মাথা নেড়ে দ্রুত চলে গেলেন। আরভিদও আর দেরি না করে চুপচাপ ওনার পেছন পেছন স্টাডি রুমে যায়। স্টাডি রুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করতেই দেখে, আভীর কারদার দাঁড়িয়ে আছেন আর আফির কারদার বসে আছেন। দুজনের মুখেই উদ্বেগ আর অস্থিরতা স্পষ্ট।
আরভিদ গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করে,
— কী সমস্যা হয়েছে?
আভীর কারদার বলেন,
— ময়লার স্তুপের সেই ক্লিয়ার সিসিটিভি ফুটেজটা লিক হয়ে গেছে! শুভ, মিজান, রিয়ান, তানভীর ওদের সবার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এখন সব জায়গায় খবর ছড়িয়ে গেছে।
আরভিদ বিস্মিত হয়ে বলে,
— কখন? ফারাবী তো একটু আগেও আমার সঙ্গে ছিল। ও তো কিছু বলেনি!
আভীর বলেন,
— খুব বেশি সময় হয়নি। মাত্র পাঁচ দশ মিনিট হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নিজে আমাকে ফোন করে জানিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় এটা ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়ে গেছে।
আরভিদ বিরক্ত ও চিন্তিত গলায় বলে,
— কে এই ফুটেজ লিক করল? বিজিপির সঙ্গে তো আমার কথা হয়েছিল! ওনি তো বলেছিল, এক সপ্তাহের মধ্যে সব চাপা পড়ে যাবে।
আফির কারদার ধীর গলায় বলেন,
— আমার মনে হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরের কেউই এটা করেছে। আমাদের শত্রু ভেতরেই আছে।
আরভিদ গভীর উদ্বেগে বলে,
— এই কেস নিয়ে তো এমনিতেই সারাদেশে আন্দোলন চলছে। এখন এই খবর ছড়িয়ে যাওয়াতে মানুষ আরও উত্তেজিত হয়ে যাবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
আভীর কারদার শান্ত থাকার চেষ্টা করে বললেন,
— সেটাই। এইজন্যই আমাদের ঠান্ডা মাথায় সব সামলাতে হবে।
আরভিদ হঠাৎ চেচিয়ে বলে উঠে,
— আমি পারব না! মরুক ওই শু**র বাচ্চারা! ওদের ধরে নিয়ে যাক। আমি নিজেই ওদের ফাঁসির ব্যবস্থা করব!
আফির কারদার শান্ত গলায় বলেন,
— এখন রাগ দেখিয়ে লাভ নেই। পরিস্থিতি সামলাতে হবে। যদি ওরা ধরা পড়ে, তাহলে আমরাও ফেঁসে যাব। আমাদের সব অবৈধ ব্যবসার তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে। এমনকি তোমার মন্ত্রীত্বও চলে যেতে পারে।
আরভিদের মাথা যেন চিন্তায় ভার হয়ে উঠে। বুক থরথর করে কাপছে। শুধু ক্ষমতা হারানোর ভয়েই বুক থরথর করে কাঁপছে না, মেহজাকে হারানোর ভয়ও তাকে গ্রাস করেছে। আর এই ভয়টাই তার কাছে সবচেয়ে বড়।মেহজাকে হারানোর চিন্তা মাথায় আসতেই সে আর স্বাভাবিকভাবে ভাবতে পারে না। মেহজার আড়ালে সে সবকিছু করতে পারে, কিন্তু যদি মেহজার সামনে সত্যিটা এসে পড়ে তাহলে সে ভেঙে পড়বে। তখন তার ভেতরে আর কোনো সাহস অবশিষ্ট থাকবে না।
আরভিদ বুঝতে পারে, এখন এখানে এক মুহূর্তও থাকা ঠিক হবে না। যদি মেহজার সামনে পড়ে যায়, কি জবাব দিবে? এতক্ষণে হয়তো মেহজা সব খবর জেনে গেছে। এখন মেহজার সামনে গেলে সবকিছু ধরা পড়ে যাবে। তাই আগে নিজেকে শান্ত করে, সব ঠিকঠাক পরিকল্পনা করে তারপর মেহজার সামনে যেতে হবে। না হলে সব হারাতে হবে। ক্ষমতা, আর মেহজাও। এই ভেবে আরভিদ দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
আরভিদের এমন আচমকা চলে যাওয়া দেখে আভীর কারদার বিস্মিত হয়ে বলেন,
— কোথায় যাচ্ছো?
আরভিদ থামে না। যেতে যেতে বলে,
— মেহু যেন না জানে আমি বাসায় এসেছিলাম।
বলেই আরভিদ দ্রুত বেরিয়ে যায়। আভীর কারদার বুঝতে পারেন, আরভিদ আসলে মেহজার কাছ থেকে পালাচ্ছে। ওনার ভ্রু জোড়া বাঁকা হয়ে যায়। কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়ে। এই মুহূর্তে ওনার মনে হলো, ছেলের পছন্দকে গুরুত্ব দিয়ে মেহজার সঙ্গে বিয়ে দেওয়াটা ওনার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। বিয়ের আগে ছেলের মধ্যে কোনো ভয় ছিল না। কিন্তু এখন সে সবসময় মেহজাকে হারানোর আতঙ্কে ভোগে। আর এই ভয়ই আরভিদকে দুর্বল করে দিচ্ছে। মানুষ যখন ভয় পায়, তখন সে দুর্বল হয়ে পড়ে। আর দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত পরাজয় ডেকে আনে। এখন ওনার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা, ছেলের এই ভয় যেন তাকে ক্ষমতা হারানোর দিকে ঠেলে না দেয়।
আরভিদের গাড়ি এসে থামে এক শান্ত, ছিমছাম গলির সামনে। এখন সন্ধ্যা নেমে গেছে। চারপাশে অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। জায়গাটা এমনিতেই নিরিবিলি তাই পরিবেশটা আরও বেশি নিস্তব্ধ আর সুনশান লাগছে। আশেপাশে ময়লাও বেশ চোখে পড়ার মতো। সামনের রাস্তাটা সরু, দুজনের বেশি তিনজন পাশাপাশি হাঁটতে গেলে কষ্ট হবে। আরভিদ গাড়ি থেকে নেমে মুখে মাস্ক পরে নেয়, যাতে কেউ চিনতে না পারে। ফারাবী এসে আরভিদের পাশে দাঁড়ায়।
ফারাবী সামনে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলে,
— স্যার, ওই সামনে যে গলিটা দেখছেন, ওদিক দিয়েই যেতে হবে।
আরভিদ সংক্ষেপে বলে,
— চলো।
দুজন পাশাপাশি এগিয়ে গেল। সরু গলিটা পেরিয়ে তারা একটা পুরনো বিল্ডিংয়ের সামনে এসে থামে। তিনতলা বিল্ডিংটা দেখে বোঝাই যায়, অনেকদিনের পুরনো। দেয়ালে শ্যাওলা জমে গেছে, চারপাশে এক ধরনের অবহেলার ছাপ।
ফারাবী বলে,
— এই বিল্ডিংয়ের চিলেকোঠাতেই ওরা আছে।
আরভিদ ভেতরে ঢুকে সরু সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। তিনতলায় উঠে চিলেকোঠার দরজার সামনে দাঁড়ায় তারা।
ফারাবী আস্তে করে দরজায় নক করে,
— দরজা খোলো। আরভিদ স্যার এসেছে।
কথাটা শোনামাত্র দরজা খুলে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে তানভীর। আরভিদকে দেখে সে দ্রুত সালাম দেয়। কিন্তু আরভিদ উত্তর দেয় না। তানভীরকে দেখেই তার ভেতরে আগুন ধরে যায়। মেজাজ চটে যায়। তবুও নিজেকে সামলে নেয়। কারণ এখন রাগ ঝাড়ার সময় না। ওদের বাঁচাতে হবে আর নিজের মাথার উপর থেকেও বিপদ সরাতে হবে। আরভিদ ভেতরে ঢুকে। রুমের ভেতরে শুভ খাটে শুয়ে ছিল আর রিয়ান, মিজান মেঝেতে বসে ছিল। আরভিদকে দেখেই ওরা সবাই উঠে দাড়ায়।
তানভীর দরজা লাগিয়ে এসে দাড়ায়। মিজান উৎকণ্ঠিত গলায় বলে,
— ভাই, কিছু একটা করেন! এখন তো সবাই আমাদের ব্যাপারে জেনে গেছে!
রিয়ান বলে,
— কোনোভাবে পালিয়ে এখানে এসে লুকিয়েছি। পরিস্থিতি ঠান্ডা হবে কখন?
আরভিদের রাগ এবার ফেটে পড়ে। দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
— তোরা যা করেছিস! ওই মেয়েটাকে ওইভাবে মারার কি দরকার ছিল? এসবও লিক হয়ে গেছে।
তানভীর এবার মিনতি করে বলে,
— ভাই এবার মাফ করে দেন। জীবনে আর এমন কাজ করবো না।
আরভিদ রাগ চেপে ভারী গলায় বলে,
— মানুষ এমনিতেই তিন চার দিন ধরে পথে নেমে বিচার চাচ্ছে, আন্দোলন করছে। তার মধ্যে আবার ঐ মেয়েকে অমানুষের মতো নির্যাতন করে খুন করেছিস তোরা এটাও লিক হয়ে গেছে! এটা জানার পর পাবলিক আরো ক্ষেপে গেছে! এত সহজে সবকিছু ঠান্ডা হবে না।
ফারাবী এবার ওদেরকে বলে,
— আপাতত কয়েকদিন লুকিয়ে থাকো। পরে পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হলে বের হবে।
আরভিদ মাথা নেড়ে বলে,
— না, এত সহজে কিছু ঠান্ডা হবে না।
তানভীর উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করে,
— তাহলে কী করব?
আরভিদ দৃঢ় গলায় বলে,
— তোরা চারজন পুরোপুরি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যা। এর বাইরে আর কোনো উপায় নেই।
তানভীর দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলে,
— কিন্তু ভাই, ওই ফুটেজটা লিক হলো কিভাবে? কে লিক করেছে? কার এতো বড় সাহস?
আরভিদের চোখ আবার রাগে জ্বলে উঠে। সে ধীর কিন্তু কঠিন গলায় বলে,
— এটা আমি খোঁজ নিচ্ছি, কোন জানোয়ার ভেতর থেকে আমার বিরুদ্ধে খাল খুঁড়ছে।
লিভিং রুমে আভীর কারদার আর আফির কারদার বসে আছেন। দুজনই আরভিদের জন্য অপেক্ষা করছে। দুইজনেরই চোখেমুখে স্পষ্ট অস্থিরতা। সময় যেন কাটতেই চাচ্ছে না আপাতত। এই অপেক্ষার মধ্যেই হঠাৎ সিঁড়ি দিয়ে কারো নামার শব্দ ভেসে আসে। দুজনই একসাথে সেদিকে তাকান। দেখে, মেহজা নিচে নামছে। বিকাল থেকেই মেহজা আরভিদের জন্য অপেক্ষা করছে। নিউজটা দেখার পর থেকেই তার মাথা যেন কাজ করছে না। যাদের সে এতদিন চিনত, যাদের সাথে হাসি ঠাট্টা করেছে, তারাই কি না এমন ভয়ংকর জঘন্য অপরাধে জড়িত! সে কখনো কল্পনাও করেনি ওরা এতটা নিচে নামতে পারে। মেহজার মনে বারবার একটা প্রশ্ন ঘুরছে, আরভিদ কি এসব জানে? জেনেও ওদের কিছু বলেনি? শাস্তি দেয়নি?
লিভিং রুমে এসে আভীর কারদারকে দেখেই মেহজা সরাসরি জিজ্ঞেস করে,
— উনি কোথায়?
আভীর কারদার কিছুটা বিরক্ত স্বরে বলেন,
— আমি কীভাবে জানব?
মেহজা গম্ভীর গলায় বলে,
— চারপাশে এত কিছু হচ্ছে, এত নিউজ বের হচ্ছে আপনাদের দলের লোকদের নিয়ে, আপনি কি কিছুই দেখেননি?
আভীর সংক্ষেপে বলেন,
— দেখেছি।
মেহজা এবার দৃঢ় গলায় বলে,
— দেখে থাকলে নিশ্চয়ই ছেলের সঙ্গে কথা বলেছেন। এত বড় ঘটনা ঘটেছে আর আপনি কথা বলেননি ওনার সাথে এটা তো হতে পারে না। আর কথা বললে, আপনি নিশ্চয়ই জানেন ওনি কোথায় আছে।
মেহজার কথায় আভীর কারদারের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। কেমন বেয়াদবের মতো কথা বলছে! শ্বশুর যে, এটুকুও কি চোখে পড়ে না? আভীর কারদার রাগ সামলাতে না পেরে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনি মেইন দরজা দিয়ে ফোনে কথা বলতে বলতে ভেতরে প্রবেশ করে আরভিদ। কন্ঠ চড়িয়ে বলছে,
— যেভাবেই হোক ওদের খুঁজে বের করো। আমি ওদের চাই! আমার দলে থেকে এমন কাজ করার সাহস ওদের হলো কীভাবে?
আরভিদের কণ্ঠে রাগের তীব্রতা এতটাই ছিল যে সবাই চমকে দরজার দিকে তাকায়। আরভিদ আবার বলে,
— পৃথিবীর যেখানেই লুকিয়ে থাকুক, দ্রুত বের করো! আমার ওদের চাই মানে চাই!
বলে আরভিদ ফোন কেটে পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে রাখে। তারপর একবার সবার দিকে তাকায়। মেহজার দিকেও তার চোখ যায়। মেহজা উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আভীর কারদার আর আফির কারদার ইতিমধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে গেছেন।
আরভিদ আভীর কারদারের দিকে তাকিয়ে শক্ত গলায় বলে,
— ওরা পালিয়ে গেছে!
আভীর কারদার সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলেন, আরভিদ মেহজার সামনে অভিনয় করছে। এখন এই অভিনয়ে ওনাকেও সঙ্গ দিতে হবে। তিনি একবার মেহজার দিকে তাকিয়ে আবার আরভিদের দিকে ফিরে অবাক হওয়ার ভান করে জিজ্ঞেস করেন,
— কখন?
আরভিদ গম্ভীরভাবে বলে,
— আমি পৌঁছানোর আগেই। তবে চিন্তার কিছু নেই, ওদের ধরবই।
আভীর মাথা নেড়ে বলেন,
— ধরতেই হবে। দলের লোক বলে কি ছাড় পাবে? অন্যায় তো অন্যায়ই।
আফির কারদারও সায় দিয়ে বলেন,
— ঠিকই বলেছো। দলের লোক বলে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। ওরা যে অপরাধ করেছে, তার শাস্তি তো পেতেই হবে।
আরভিদ আড়চোখে আবার মেহজার দিকে তাকায়। বোঝার চেষ্টা করে, তাদের এই অভিনয়টা মেহজা বিশ্বাস করেছে কি না। মেহজার মুখে আগের মতো তীব্র দুশ্চিন্তার ছাপ নেই বরং কিছুটা স্বস্তি দেখা যাচ্ছে। আরভিদ বুঝে গেল, মেহজা বিশ্বাস করে নিয়েছে।
আরভিদ এবার আভীর কারদারের দিকে তাকিয়ে বলেন,
— আমি রুমে যাচ্ছি। পরে কথা হবে।
বলেই আরভিদ সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। মেহজা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এতক্ষণ ধরে মনে জমে থাকা প্রশ্নগুলোর উত্তর সে পেয়ে গেছে। তাহলে আরভিদ কিছুই জানত না। যদিও সে কখনো আরভিদকে সন্দেহ করেনি। কারণ সে জানে, আরভিদ এমন মানুষ না। তবুও মনটা খুচখুচ করেছিলো। মনের এক কোণে একটা ভয় ছিল। এখন সেই ভয়টা কেটে গেছে। খুচখুচটাও আর নেই। অনেক দুশ্চিন্তার মাঝেও আরভিদের বিষয়টা তাকে ভেতর থেকে অনেকটাই শান্তি দেয়। মেহজাও আর দাড়িয়ে থাকে না। নিজের রুমের দিকে গেল। মেহজা রুমে এসে ঢুকতেই দেখে, আরভিদ বিছানায় বসে আছে। আরভিদের চেহারায় এখনো রাগের ছাপ স্পষ্ট।
মেহজা এগিয়ে গিয়ে আরভিদের পাশে বসে নরম গলায় বলে,
— মানুষ কত সহজে নিজের ভালো মানুষির আড়ালে জঘন্য রূপটা লুকিয়ে রাখে, তাই না? একসাথে থাকলে কিংবা কাছাকাছি থাকলেও মানুষকে চেনা যায় না।
মেহজার কথা কানে যেতেই আরভিদ চমকে মেহজার দিকে তাকায়। মেহজা আবার বলে,
— এই ঘটনাটাই দেখুন, যাদের আপনি ভাইয়ের মতো ভাবতেন, তারা যে এতটা খারাপ হতে পারে, আপনি কি কখনো ভাবতে পেরেছিলেন? বাইরে থেকে ভালো দেখালেও ভেতরে কতটা জঘন্য হতে পারে মানুষ!
আরভিদ ধীরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সে ভেবেছিল, মেহজা হয়তো তাকে ইঙ্গিত করেই এসব বলছে। কিন্তু না, সে অন্যদের কথা বলছে।
মেহজা এবার আরভিদের হাতটা শক্ত করে ধরে নরম স্বরে বলে,
— সারাদিন আপনার ওপর অনেক চাপ গেছে, তাই না? সকাল থেকে বাইরে ছিলেন, তারপর বিকেলের এত ঝামেলা। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়াও হয়নি নিশ্চয়ই।
আরভিদ ক্লান্ত গলায় বলে,
— মাথা খুব ব্যথা করছে।
মেহজা উদ্বিগ্ন হয়ে বলে,
— খালি পেটে থাকলে এমন হয়। আপনি যান, আগে হাত-মুখ ধুয়ে আসুন। আমি খাবার নিয়ে আসছি।
আরভিদ মাথা নাড়িয়ে বলে,
— না, এখন কিছু খাব না। আমি হাত-মুখ ধুয়ে আসছি, তারপর একটু মাথাটা টিপে দিস।
মেহজা আস্তে করে বলে,
— আচ্ছা।
আরভিদ উঠে ওয়াশরুমে গেল। চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে কিছুটা ফ্রেশ হয়ে বাইরে এলো। মেহজা এগিয়ে এসে আরভিদকে তোয়ালে দেয়। আরভিদ তোয়ালে নিয়ে মুখ মুছতে থাকে। মুখ মুছে তোয়ালেটা মেহজার হাতে দিয়ে আরভিদ সাইড টেবিলের কাছে যায়। জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে এক নিঃশ্বাসে খেতে লাগল। গলা শুকিয়ে গিয়েছিলো তার। তৃষ্ণা পেয়েছিলো অনেক। হঠাৎই পেছন থেকে মেহজার নরম কণ্ঠ ভেসে এলো,
— আপনি অনেক ভালো।
আরভিদ পানি খাওয়া থামিয়ে দেয়। মুখের পানিটুকু গিলে গ্লাসটা টেবিলে রেখে সে মেহজার দিকে তাকায়। মেহজা শান্ত, তৃপ্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। মেহজা আবার বলে,
— আপনি অন্যায়ের পাশে দাঁড়াননি। ন্যায়ের পাশে দাড়িয়েছেন।
আরভিদ হালকা করে উপর নিচ মাথা নাড়ে। হঠাৎই মেহজার মনে সন্দেহ আর ভয় একসাথে ভিড় করে। কন্ঠে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলে,
— আপনি ওদের খুঁজে বের করবেন তো? ওদের শাস্তি দেবেন তো? এমন তো হবে না, দুদিন হৈচৈ হওয়ার পর সব চুপ হয়ে যাবে? সবাই ভুলে যাবে, আর ওরা পার পেয়ে যাবে?
আরভিদ চুপ করে রইল। কপালের ওপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। কি উত্তর দিবে, কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না। আরভিদের এই নীরবতা মেহজার ভেতরের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিল। কণ্ঠে চাপা তীব্রতা নিয়ে মেহজা আবার বলে উঠে,
— কিছু বলছেন না কেন? ওদের শাস্তি দেবেন তো? ভয়ংকর শাস্তি? কম শাস্তি যেন না হয়। এমন শাস্তি, যাতে আর কোনো মানুষ আর কখনো এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।
এবারও আরভিদ নিশ্চুপ। তবে মেহজা এবার আরভিদের উত্তরের অপেক্ষা করল না। হুট করে আরভিদের হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলে। মেহজার চোখে ভেসে উঠে একরাশ আশা আর অনুনয়।
— এই একটা চাওয়া পূরণ করে আমার মনটা তৃপ্ত করে দিন? আমি জীবনে অনেক ধর্ষক দেখেছি কিন্তু আফসোস আজ পর্যন্ত কাউকেই শাস্তি পেতে দেখিনি! আপনি প্লিজ ওদের শাস্তির ব্যবস্থা করে দিন। মেয়েটাকে একটু ন্যায় পাইয়ে দিন?
আরভিদের বুক ধড়ফড় করে উঠল। হৃদস্পন্দন যেন কানে বাজছে। শরীর গরম হয়ে উঠেছে। সে কিভাবে মেহজাকে আশ্বাস দিবে ওদের শাস্তি দেওয়ার? যেখানে সে নিজেই ওদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে! ওদের না বাঁচালে তার নিজেরই ক্ষতি হবে। অস্থির দৃষ্টিতে সে একবার পাশের টেবিলের দিকে তাকায়। ফলের ঝুড়ির মধ্যে রাখা সিলভার রঙের ছুরিটা আলোয় ঝিলিক দিচ্ছে।
এদিকে উত্তর না পেয়ে মেহজা আবার বলতে শুরু করে,
— বলুন না প্লিজ, আপনি মেয়েটাকে….
— আহ্!
হঠাৎই আরভিদ ব্যথায় মুখ কুঁচকে ফেলে। মেহজা চমকে উঠে,
— কী হয়েছে?
বলেই মেহজার চোখ পড়ে টেবিলের দিকে। দেখে, ফলের ঝুড়িতে থাকা ছুরিটা আরভিদের হাতে বিঁধে আছে। কেটে গেছে হাত। রক্ত টলটল করে বের হচ্ছে। মেহজা দ্রুত আরভিদের হাতটা ধরে উদ্বিগ্ন গলায় বলে,
— এটা কীভাবে হলো? ছুরিতে হাত লাগল কিভাবে?
আরভিদ কষ্ট চেপে বলে,
মোহশৃঙ্খল পর্ব ২৭
— বেখেয়ালিতে লেগে গেছে।
মেহজা তাড়াতাড়ি করে বলে,
— আপনি বসুন, আমি এখনই ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি।
বলেই মেহজা দ্রুত আরভিদকে বসিয়ে ফাস্ট এইড বক্স এনে আরভিদের পাশে বসে। তারপর যত্ন করে আরভিদের কাটা জায়গাটা পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ করে দেয়।
