Home লাভ বাই দ্যা ভিলেন লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৫

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৫

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৫
লিজা মনি

চারপাশে এক গভীর ও নিশ্ছিদ্র নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। গোরস্তানের এই জনমানবহীন প্রান্তরে সময়ের কোনো হিসাব নেই। বোনের কবরের পাশে স্থির হয়ে বসে আছেন এক শোকাতুর ভাই। সূর্য কখন দিগন্তরেখায় মিলিয়ে গেছে আর কখন গোধূলির আলো ধূসর অন্ধকারে রূপ নিয়েছে, সেই বোধটুকুও যেন তাঁর লুপ্ত হয়েছে। আরিশে দৃষ্টি কবরের কাঁচা মাটিতে।
বাতাসে আর্দ্র মাটির ঘ্রাণ আর ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনি ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। আরিশ মাথা ঝুঁকে কবরে চুমু খায়। ঠিক যেমন মেহেরের কপালে খেত।
আরিশ মুচকি হেসে মাটির উপর হাত রাখে। মমতা ভরা গলায় বলে,
” আসছি আমি। নিজেকে একদম একা ফিল করবি না। যতদিন তর ভাই জীবিত আছে ততদিন সে তর ছায়া হয়ে থাকবে। তুই তো আমাকে রেখে চলে গেলি আমি কিভাবে তকে একা ছেড়ে দেয়, বল!
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর আসে নি। আসবে কিভাবে? ওপাশের রমণীটা যে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন।
দুর থেকে দাড়িয়ে পুরোটা দৃশ্য তানভী আর অধিরাজ তাকিয়ে দেখলো। তানভী আরিশের দিকে তাকিয়ে অধিরাজের উদ্দেশ্যে বলে,

” আরিশ স্যার কি প্রায় এই এখানে আসে?
অধিরাজ সামনের দিকে দৃষ্টি রেখে বলে,
” প্রায় নয় প্রতিদিন আসে। এক রাত ও মিস হয় না। যদি দুরে কোথাও থাকে তবে সেটা অন্য কথা।
তানভী মলিন হেসে বলে,
” ভাইয়া মেহেরকে খুব ভালোবাসত তাই না রাজ?
” শুধু ভালোবাসা নয়, মেহের স্যারের প্রান ছিলো। খুব যত্ন, আর ভালোবাসত। পুতুলের মত আগলে রেখেছিলো এত বছর।
তানভীর মুখ বিষন্নতায় ঢেকে যায়। নিশ্বাস ছেড়ে বলে,
” আমি মেহেরের চিঠিগুলোর কথা তোমার স্যারকে জানায় নি। তুমিও এইসব নিয়ে স্যারকে কিছু বলো না।
অধিরাজ অবাক গলায় বলে,
” জানাও নি কেনো?
মেহের মন খারাপ করে তাকায়। বাতাসে বার বার চুলগুলো মুখে এসে আছড়ে পড়ছে। বাম হাতের সাহায্যে সরিয়ে বলে,

” আরিশ স্যার এইটা জানলে কখনো মেনে নিতে পারবে না রাজ । স্যার আর তোমার বসের বন্ধূত্ব নিয়ে শুধু আমি -তুমি নয় পুরো দেশ জানে। আরিশ আর নিক একই প্রান। একজনের জন্য আরেকজন সব কিছু পুড়িয়ে দিতেও প্রস্তুত। এত সুন্দর বন্ধূত্ব আমি কিভাবে নষ্ট হতে দেয়?
অধিরাজ তানভীর কাঁধে হাত রেখে হালকা হেসে বলে,
” এদের বন্ধুত্ব ভাঙ্গার জন্য দুনিয়ায় এমন কোনো শক্তি এখনও তৈরি হয় নি।
তানভী অধিরাজের চোখে চোখ রেখে শান্ত গলায় বলে,
” সম্পর্ক নষ্ট করার জন্য বিরাট বড় রচনার প্রয়োজন হয় না। বরং এক লাইনের কথায় এই যথেষ্ট। তুমি- আমি সবাই জানি আরিশ স্যার মেহেরকে নিয়ে বেঁচেছিলো এত বছর। নিজের হাতে বড় করেছে। বুকে রেখে ঘুম পাড়িয়েছে। মেহের নিজেও ভাই বলতে পাগল ছিলো। কিন্তু পরিস্থিতি বদলালো, সময় বদলে গেলো। মেহের তোমার বসের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়লো। যাকে বলে মরনব্যাধী আসক্তি। প্রচন্ড ভালোবাসত মেয়েটা। কেউ না জানলেও আমি জানতাম সব কিছু। কত -শত পাগলামো করেছে। ওর পেইন্টিং রুমে এখনও অসামপ্ত হয়ে আছে একটা পেইন্ট। যেটা সমাপ্ত করার সময় ও পেলো না মেয়েটা। ভেবেছিলো একদিন সারপ্রাইজ দিয়ে ভালোবাসি বলে প্রপোজ করবে। কিন্তু সেই সুন্দর সময় আর আসলো না। তার আগেই সে ভালোবাসায় হেরে গেলো। জানতে পারলো যাকে নিয়ে সপ্ন দেখেছে দিনের পর দিন সে অন্যের বুকে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে, অন্যকে ছুঁয়ে দিচ্ছে। ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলো অষ্টাদশী কন্যার মন। কাউকে কিছু বললো না। কোনো অভিযোগ করে নি কারোর উপর। শুধু নিজেকে অপরাধী বলে গিয়েছে। কোনোদিন তোমার বসের সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে নি

” আমাকে ভালোবাসলে কি খুব একটা অন্যায় হয়ে যেত? কেনো ভালোবাসলেন না আমায়? কেনো অন্য নারীকে নিজের বুকে ঠাঁই দিলেন।
একবার ও কিন্তু জিজ্ঞাসা করে নি। নিকের সামনে গিয়ে ও দাঁড়ায় নি। বদ্ধ রুমে একা একা চিৎকার দিয়ে কাঁদত। আমি শুনেছি বহুবার সেই কান্না। আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদত। নিশ্বাস ফেলতে পারত না যেন দম বন্ধ করা পরিস্থিতি। নিজেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আত্নহত্যার পথ বেছে নিলো। আত্নহত্যার ও সময় পেলো না। জানোয়ারদের থাবায় পড়তে হয়েছে। তাতে কি? সেদিন বের না হলে তো আর এই থাবার সম্মুখীন হতে হত না?
আর তুমি বলছো মেহেরের বাহিরে যাওয়ার কারন আরিশ স্যারকে জানায়? ভুলে যেও না রাজ, বুক থেকে আপন জন চলে গেলে মানুষ বাস্তবতা ভুলে যায়। কেনো চলে গেলো সেই কারন খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠে। আর কারন হিসেবে মেহের বলেই গিয়েছে, ভালোবাসায় হেরে গিয়ে মৃত্যুকে গ্রহন করে নিলাম। তোমার কি মনে হয় আরিশ স্যারের মনে একবারের জন্য ও কি তোমার বসের প্রতি বাঁকা দৃষ্টি জন্মাবে না? এই বাঁকা দৃষ্টি বড় আকার ও ধারন করতে পারে। চাই না এমন কোনো দৃষ্টি সৃষ্টি হোক। সবাই তো ভালো আছে। থাকুক, এই ভালোটুকু।
অধিরান কিছুক্ষণ গম্ভীরতা নিয়ে ভাবলো বিষয়টা। তানভীর কথা খুব যৌক্তিক মনে হলো।

” চঠিগুলো পুড়িয়ে দাও।
তানভী অবাক হয়ে বলে,
” কি বলছো এইসব? পুড়িয়ে ফেলব কেনো?
” যাতে কখনো আরিশের স্যারের নজরে না পড়ে।
” ভয় পাচ্ছো?
” এতদিন পায় নি। কারন বিষয়টা কখনো ভাবি নি। কিন্ত এই বিষয়টা ভবিষ্যতে জটিল হতে পারে। তার আগেই চিঠিগুলো পুড়িয়ে দাও।
তানভী বুকে দুই হাত গুঁজে বলে,
” পুড়ানোর প্রয়োজন নেই। মেহেরের স্মৃতি এইগুলো। আমার কাছেই থাকুক। কোনোদিন তোমার স্যারের নজরে যাবে না।
অধিরাজ আতঙ্কিত গলায় বলে,
” যদি কোনোদিন যায় তবে?
তানভী কনুই দিয়ে অধিরাজের বুকে আঘাত করে বলে,

” যাবে না। এইবার চলো মেহেরের কাছে।
তানভী কথাটা বলে আর দাড়ালো না। কবরের পাশে গিয়ে হাটু ভেঙ্গে বসে। না চাইতেও চোখ দিয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়তে থাকে। মাটিতে হাত রেখে ভাঙ্গা গলায় বলে,
” রাজকে ভালোবাসি কথাটা সর্ব প্রথম তুমি জানতে মেহের। তোমার – আমার বয়সের পার্থক্য ছিলো অনেক। এরপরও তুমি বন্ধু ছিলে, বোন ছিলে আমার। যার কাছে আমার সমস্ত গোপনীয় ভালো লাগা, খারাপ লাগা শেয়ার করতাম। সেইম ভাবে তুমিও করতে। কিন্তু আজ কত মাস হয়ে গেলো। কাউকে মনের কথাগুলো সহজে বলতে পারছি না। জানো, খুব মিস করছি তোমাকে। মনে আছে, তুমি বলেছিলে, তানভী আপু তোমার বিয়েতে আমি খুব সাজব। তুমি আর আমি মিলে অনেক নাচব। সূর্যদয় হলে আমার আর অধিরাজের বিয়ের ইঙ্গেজম্যান্ট। দুই দিন পর আমাদের বিয়ে। ইঞ্জয়টা কিভাবে করবো বলোতো? তুমি নেই, নাচবে কে আমার সাথে? খুব মিস করছি তোমাকে মেহের। আই’ভ ট্রুলি বিকাম অ্যালোন আফটার লুজিং ইউ। আই মিস ইউ সো মাচ দ্যাট আই ক্যান্ট ইভেন এক্সপ্লেইন ইট।
তানভী কেঁদে উঠে। অধিরাজ তানভীকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। তানভী ভাঙ্গা গলায় বলে,
” যার জন্য নিজের জীবন দিয়েছে সেই পুরুষটা কোনোদিন তার কবরের পাশেও আসে নি। কি নিষ্ঠুর, পাষাণ তোমার বস রাজ। একটা দিন আসলে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেত?
অধিরাজ তানভীর মাথায় হাত রেখে শান্তনা দিয়ে বলে,
” বস এমন এই তানভী। বসের হৃদয় কারোর জন্য কাঁপে না, কাঁদে না। খুবই হার্টল্যাস আর শক্ত হৃদয় উনার। তাই উনার কাছ থেকে এমন কিছু আশা করো না।

মিনারের চারদিকে অবিরাম গুলাগুলির আওয়াজ ছড়িয়ে পড়েছে। অন্ধকার রাত নিজেই আতঙ্কে কেঁপে উঠেছে বারবার। এই ভয়ানক রাতে দূর থেকে ভেসে আসছে গ্যাংস্টার বসের দুই বিশ্বস্ত সহকারী—শ্যাডো ও হান্টারের গর্জন।
ব্যক্তিগত সব গার্ড নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে। প্রত্যেকের মুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ।ফ্যাকাশে চেহারায় জমে আছে আসন্ন বিপর্যয়ের পূর্বাভাস। তাদের সামনেই দৃঢ় অথচ অগ্নিগর্ভ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে গ্যাংস্টার বস, যার এক হাতে ঝকঝকে ধারালো ছুরি শক্ত করে ধরা, আর অন্য হাত দিয়ে সে কপালে ঘষছে।
গ্যাংস্টার বসের সেই শ্যেনদৃষ্টি প্রতিটি রক্ষীর অবয়ব ভেদ করে যাচ্ছিল। তিনি তাদের চামড়ার নিচে লুকিয়ে থাকা ভীতিটুকুও পাঠ করতে সচেষ্ট। নিকের চোয়াল দৃঢ়বদ্ধ হয়ে আছে। সেখানে এক অটল কাঠিন্য খোদাই করা। পরিহিত কৃষ্ণবর্ণের হুডির ছায়াতলে সেই ধূসর নেত্রযুগল তখন এক প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করেছে। মনে হচ্ছিল যেন কোনো এক অগ্নিকুণ্ড থেকে বিচ্ছুরিত লাল আভা সেই ধূসরতাকে গ্রাস করে সেখানে জমাটবদ্ধ হিংস্রতা আর রক্তের ঝিলিক। প্রতিটা গার্ডকে শিকারীর মত পরখ করছে। হুডির নিচে থাকা মাফিয়া বসের তীক্ষ্ণ, হিংস্র ধূসর চোখ দুইটা অনুভব করতেই সমস্ত গার্ড থরথর করে কাঁপতে থাকে। নিক সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে রহস্যময় হাসলো। আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে শক্ত গলায় বলে,

” এনিমি অফ দ্য গ্যাংস্টার বস? মেবি ইউ আর ফরগেটিং দ্যাট আই অ্যাম অ্যান আন্ডারগ্রাউন্ড টেররিস্ট। ইউ হ্যাভ গট দ্য গাটস টু পুল দিস ফাকিং কনস্পিরেসি এগেইনস্ট মি?”
নিকের কথায় সবাই কেঁপে উঠে।এক সাথে বহু জনকে মেরে টুকরো টুকরো করা বিশালদেহী লোকগুলো গ্যাংস্টার বসের সামনে আতঙ্কে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। ভীর থেকে একজন কাঁপা গলায় বলে,
” আপনার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত বস। সেখানে শত্রুপক্ষের সাথে হাত মিলিয়ে আপনার ক্ষতি করা আমাদের জন্য সপ্ন। ইভেন ইন ডেথ, আই উইল নেভার স্ট্যান্ড এগেইনস্ট ইউ।
নিক ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। ধীর পায়ে সেদিকে এগিয়ে যেতে থাকে। সবার অন্ত আত্না কেঁপে উঠে। ভীরে থাকা লোকটা পা ভেঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে কান্না করে উঠে। ভেবেছে এইভাবে কথা বলার জন্য তাকে নির্মম মৃত্যুর স্বীকার হতে হবে। দিশেহারা হয়ে নিকের পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ে। ক্ষমা চেয়ে বলে,
” ক্ষমা করবেন বস। এইভাবে মধ্যে কথা বলার জন্য ক্ষমা করুন। জীবন ভিক্ষে দিন।
নিক ভ্রুঁ কুচকে তাকায় নিচে। রাশভরী গলায় বলে,

” বাল, উঠে দাড়া!
লোকটা হাত জোর করা অবস্থায় উঠে দাঁড়ায়। বিশালদেহী ব্যক্তিটার চোখের কোটরে পানি। নিক চোখ দিয়ে ইশারা করতেই লোকটা নিজের স্থানে দাঁড়ায়। নিক আবার ও সামনে দৃষ্টি রাখে। ভয়ানক, শিকারীর ন্যায় দৃষ্টি। সবার ভেতর কম্পিত। কার উপর হামলা হবে কারোর ধারনা নেই। নিক সামনে গিয়ে আবার ও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় পিছনে। নিকের শান্ত আর হিংস্র চোখ জোড়া দেখে একজন কাঁপতে থাকে। পালানোর চেষ্টায় এদিক -সেদিক তাকায়। কিন্তু সে ভালো করেই জানে পালানো তার জন্য পুরোটা বিলাসিতা। নিক বাঁকা হেসে লোকটার ঘাড় খামছে ধরে দাঁত পিষে বলে,

” কাঁপছিস কেনো? কিছু করেছি আমি?
লোকটা কাঁপার জন্য ঠিকভাবে জায়গায় দাড়াতে পারছে না। কালো কুচকুচে শরীর দিয়ে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরছে অনবরত। কপাল দিয়ে রগ গুলো ফুলে উঠেছে আতঙ্কে। নিক কিছুক্ষন সেদিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো। কেমন হিংস্র আর কেমন অদ্ভুত সেই হাসি। নিকের হাত এখনও লোকটার ঘাড়ে চেপে ধরে রাখা। সবাই ভাবছে সামান্য ভাবে হয়ত ধরা। কিন্তু লোকটা পারছে না চিৎকার দিয়ে কাঁদতে। এমন মনে হচ্ছে যেন মাংস ভেদ করে আঙ্গুলগুলো ঢুকে যাচ্ছে। লোকটা সহ্য করতে না পেরে কোনোরকম উচ্চারন করে,

” ব…বস!
পর পর নিকের ঠান্ডা -শীতল গলা,
” হেনরি! আমার প্রিয় বিশ্বস্ত দেহরক্ষী। আচ্ছা হেনরি সাহস কোথা থেকে যৌতুক হিসেবে নিয়েছিস বলতো? তুই যে জায়গা থেকে নিয়েছিস আমিও সেই জায়গা থেকে নিতে চাই।
হেনরির এক পাঁশে বেঁকে যায়। হাঁউ মাউ করে কেঁদে উঠে। নিকের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। কথা গলায় আটকে আসে,
” আমাকে ক্ষমা করে দিন বস। টাকা আর ক্ষমতা পাওয়ার লোভে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে বলা হয়েছিলো এইভাবে অন্যের দেহরক্ষী হয়ে আর বাঁচতে হবে না। আমাকে মাফিয়া হিসেবে গড়ে তুলবে। এতটা লোভ দেখিয়েছে যে নিজেকে ভুলে গিয়েছিলাম আমি ক্ষমতা পাওয়ার লোভে বিশ্বস্ততা বিক্রি করে দিয়েছি। আমাকে ক্ষমা করে দিন বস।
আরিশ চোয়াল শক্ত করে তাকায়। হেনরির কথায় প্রতিটা গার্ড অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। নিক গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে হেনরির গলায় চেপে ধরে ঝুঁকে পড়ে। অন্য হাত দিয়ে চুল টেনে ধরে বলে,

” ক্ষমা! এইসব ফা*কিং মায়া গ্যাংস্টার বস নিক জেভরানের ধাঁচে নেই । আমার সামনে কেউ উচু গলায় কথা বললে ও তার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলি। জীবনে কোনোদিন, কাউকে, এক বারের জন্য ও ক্ষমা করি নি। আই উইল ফাকিং ওয়াশ মাই বডি উইথ দ্য ব্লাড অফ ইয়োর বডি।
নিকের ঠান্ডা কথায় হেনরির পুরো শরীর জমে যায়। কায়াত বলেছিলো সব কিছু থেকে রক্ষা করবে। শুধু কাজটা করে দিতে। কিন্তু শালা বাই**** বাচ্চা তাকে অর্ধেক রাস্তায় ফেলে গিয়েছে। এখন নিজের জীবন কিভাবে বাঁচাবে এইটা নিয়েই সে তরপাচ্ছে। সে খুব ভালো করেই চিনে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জানোয়ারটাকে। বিগত দশ বছর ধরে তার আন্ডারে কাজ করে যাচ্ছে। তার প্রতিটা ঠান্ডা খুন সম্পর্কে টুকটাক ধারনা আছে। শত্রুদের ধরে নৃশ্যংস মৃত্যু দেয়। একজন দেহরক্ষী হওয়ার কারনে গ্যাংস্টার বস থেকেই ট্রেনিং প্রাপ্ত সে নিজেও। শত্রুদের ধরে এনে নিজেও জঘন্য মৃত্যু দেয়। কিন্তু নিক জেভরানের মারার স্টাইল অন্যরকম। আগে শত্রুকে জঘন্যভাবে মারে এরপর সেই তাজা রক্ত দিয়ে নিজে গোসল করে। সহকারী শ্যাডো আর হান্টার কাচা মাংস শরী থেকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। কথাগুলো ভাবতেই হেনরির মাথা ঘুরে আসে। গলা শুকিয়ে আসে। তৃষ্ণার্ত হয়ে তাকায় নিকের দিকে। নিকের চোখ দিয়ে যেন আগুন বের হচ্ছে।

” আমাকে মারবেন না বস। আর কোনোদিন আপনার অবাধ্য হব না।
নিক হুট করেই জানোয়ারের মত হেসে উঠে। এত নৃশ্যংস সেই হাসির শব্দ যেন কোনো পিশাচ চিৎকার করছে। নিকের হাসিতে সমস্ত গার্ড নিজেদেরকে ভয়ে সিটিয়ে নেয়।
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে চিৎকার দিয়ে উঠে,
” শুয়রের বাচ্চা ক্ষমা চাচ্ছিস কি ভেবে? আমার টাকা খেয়ে, আমার নুন খেয়ে আমার পিঠে ছুঁড়ি মারার স্পর্ধা দেখালি কিভাবে? বোমা হামলাটা সেদিন তুই করেছিস তাই তো?কি ভেবেছিস মরে যাব? তকে কেউ কোনোদিন ধরতে পারবে না। গ্যাংস্টার বস তদের মত কিছু পা চাটা, দুই টাকার লোকের ষড়যন্ত্রে মরে যাবে ভেবেছিস? ছেহহহ! অপরাধীকে ক্ষমা করা যায় কিন্তু একজন বিশ্বাস ঘাতককে না। তারা সাপের থেকেও বিষধর হয়। যেকোনো সময় সুযোগ বুঝে ছোবল মারে। আর আমি তো সামান্য অপরাধকেও ক্ষমা করি না। সেখানে বিশ্বাসঘাতককে ক্ষমা করব কিভাবে?
নিক থেমে লোকটার চোয়াল চেপে ধরে শক্তভাবে। চোখে চোখ রেখে দাঁত পিষে বলে,

” তর কারনে আমি আমার স্ত্রী থেকে পাঁচ মাস দুরে ছিলাম। যার থেকে এক ঘন্টা দুরে থাকলে আমার ছটফটানি শুরু হয় সেখানে আমি ১৫৩ দিন মানে ৩,৬৭২ ঘণ্টা দুরে ছিলাম। হয়ত তার থেকেও বেশি। আমাকে হারিয়ে ও যতটা কেঁদেছে তার প্রতি ফোটা অশ্রুর হিসেব তকে দিতে হবে। তুই আমাকে নয় আমার দুর্বলতা, আমার কলিজায় আঘাত করেছিস। আমার অনুপস্থিতিতে বার বার মিনারের ভেতরে আক্রমন করার চেষ্টা করেছিস। কি মনে করেছিস জানতে পারব না, মরে যাব? হাহহ, ভেতরে আমার প্রানভোমরা ছিলো, আমার স্ত্রী ছিলো। কুত্তার বাচ্চা তদের সাহস কিভাবে হলো সেখানে আক্রমন করার? যদি একটা আচর ও তার শরীরে আমি দেখতে পেতাম তবে জীবন্ত তদের কাচা চিবিয়ে খেতাম।
নিকের ভয়ানক গর্জনে চারপাশ ভারী হয়ে উঠে। আরিশ ভয় পাচ্ছে নিকের রাগ নিয়ে। অতিরিক্ত উত্তেজিত হওয়া ওর জন্য ও নিষিদ্ধ। কিন্তু এখন বলতে গেলে ওকেই জবাই করে ফেলবে। রেগে গেলে নিজের মধ্যে থাকে না। আরিশ শুকনো ঢোক গিলে শ্বাস নিতে যাবে তার আগেই নিকের গর্জন কানে আসে। আরিশ নিজেই কেঁপে উঠে নিকের দিকে তাকিয়ে।

” এ গ্যারট ইন হিজ হ্যান্ড।
আরিশ টেবিলের উপরে রাখা গ্যারেটটা নিকের দিকে এগিয়ে দেয়। নিক হাতে তুলে নিতেই লোকটা পায়ে ধরে চিৎকার করতে থাকে।
” ক্ষমা, ক্ষমা করুন বস! পুরোটা জীবন আপনার গোলামি করে কাটাবা। কোনকদিন বিরুদ্ধে যাওয়ার চিন্তা মাথায় ও আনব না। এইবারের মত জীবন ভিক্ষা দিন।
নিক লাথি মারে। লোকটা ছিটকে পড়ে কিছুটা দুরে। নিক সামান্য ঝুকে প্রশ্ন করে,
” মাদার্ফাক! তর রক্ত দিয়ে গোসল না করা অব্দি আমার শান্তি মিলবে না। এখন বল তর মাষ্টার মাইন্ড কে? কার সাথে হাত মিলিয়েছিস?
লোকটা এইবার চুপ হয়ে যায়। সে এমনিতেও বাঁচবে না। তবে আসল কালপ্রিটের নাম বলে কি লাভ? সিংহের খাঁচায় একবার যখন ঢুকে পড়েছে তখন ছিন্ন -বিচ্ছন্ন হয়ে বের হবে। সেখানে বাঁচার আশা নিয়ে হাজারটা খরগোশ এনে দিলেও লাভ হবে না। হেনরে কাটা, রক্তাক্ত ঠোঁট নিয়ে হেসে বলে,
” কালপ্রিটের নাম তো আমি বলব না বস। বলে দিলে তো আসল খেলায় শেষ।
নিকের কুচকে যাওয়া ভ্রুঁ সোজা হয়ে যায়। আগ্নেয়গিরির লাভার মত জ্বলতে থাকে তার চক্ষুদ্ধয়। সবাই চোখের পলক ফেলার আগেই হিংস্র হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়ে হেনরির উপর। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘাতক ক্ষিপ্র গতিতে তারের লুপটি হেনরির গলার ওপর দিয়ে গলিয়ে দেয়। তাজা রক্ত গলগল করে পড়তে থাকে। হেনরির চোখ দুইটা যেন বেরিয়ে আসবে। নিক আরও জোরে চেপে ধরে হুংকার ছাড়ে,

” বল, আসল কালপ্রিট কে?
” বলব না।
আবার ও আক্রমনের স্বীকার হয়। গ্যাংস্টার বস বর্বরতার সাথে হেনরির মেরুদণ্ডের ওপর প্রবল চাপ দেয় যাতে নড়াচড়া করার বা ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ না পায়। দুই হাতল দুই দিকে টেনে ধরার সাথে সাথে চিকন তারটি চামড়া ভেদ করে গলার ভেতর বসে যেতে শুরু করে।
হেনরি গলা কাটা মুরগীর মত ছটফট করতে শুরু করে। আরিশ এসে পাশে দাঁড়ায়। মৃত্যুর এই খেলা থামাতে বলে,
” নিক শান্ত হ কিছুটা। হেনরি মরে গেলে কিভাবে জানব আসল ঘাতক কে ছিলো? কার কথায় ও এমন করেছে?
নিক চোয়াল শক্ত করে বলে,
” ঘাতকের ঠিকানায় আমি চব্বিশ ঘন্টার ভেতরেই পৌঁছে যাব। কিন্তু এই রাস্কেলকে দুই মিনিট ও নিশ্বাস নিতে দিব না। এর রক্ত দিয়ে গোসল না করা অব্দি শান্তি মিলবে না।
আরিশ আর কিছু বলার সাহস পায় না। মাথা নাড়িয়ে পিছনে সরে আসে। যখন বলেছে চব্বিশ ঘন্টার ভেতরে পৌঁছে যাবে তার মানে ঘাতকের হিন্টস পেয়ে গিয়েছে। আরিশ বাঁকা হেসে বসে পড়ে স্টিলের চেয়ারে। দৃষ্টি তার সামনের দিকের ভিবৎস্য মৃত্যুর অপেক্ষায়।

শিকার যখন প্রাণপণ হাত-পা ছুড়ে বাঁচার চেষ্টা করে নিক তখন তার পুরো শরীরের শক্তি দিয়ে তারটি আরও জোরে টানে। হেনরির রক্ত গিয়ে ছিটকে পড়ছে গার্ডদের শরীরে। নিকের মুখ রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। কালো শার্ট রক্তের ফলে কেমন অদ্ভুত রং ধারন করেছে। নিক শেষ বারের মত গর্জে উঠে,
” শেষ বার জিজ্ঞাসা করছি, আসল ঘাতক কে?
লোকটা নিশ্চুপ থাকলো। কোনো উত্তর দিলো না। নিক আর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। হিংস্র বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে আবার। ধারালো সুঁক্ষ্ণ মাঝারি সাইজের ছুঁড়ে দিয়ে লোকটার দুই চোখের ভেতরে ডুকিয়ে দেয়। চোখের ভারী চামড়া ভেদ করে একদম মনিতে গিয়ে ঢুকে। ছুরির শীতল ইস্পাত প্রথমে চোখের সামনের স্বচ্ছ কর্নিয়াকে ছিন্ন ভিন্ন করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। চোখের ভেতরে থাকা জলীয় পদার্থ বা অ্যাকুয়াস হিউমার তপ্ত রক্তের সাথে মিশে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসে। হেনরি গগন কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে। তা মোটেও সাধারণ কান্নার মতো নয়। সেটা অনেকটা বন্য পশুর গর্জনের মতো শোনায়। যন্ত্রণার চোটে তার চোয়াল এমনভাবে শক্ত হয়ে যায় যে দাঁতে দাঁত লেগে হাড়ের কড়কড় শব্দ হতে থাকে।

নিক চিৎকার দেওয়ার সুযোগটাও দিলো না। জিহ্বাটাকে টান মেরে অনেকটা বড় করে ফেলে। এরপর ছুঁরির আঘাত করতে থাকে একের পর এক। লম্বা জিহ্বাটা একদম টুকরো টুকরো হয়ে ঝুঁলে থাকে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে পুরো আঙ্গিনা। গার্ডরা ভয়ে কাঁপছে। কাল ও তাদের সাথে ছিলো। আর আজ একদম নরক যন্ত্রনা নিচ্ছে। নিক পাশ থেকে বিষাক্ত পোকা ঢেলে দেয় সেই রক্তাক্ত, বিক্ষত চোখের উপর। তরল, রক্তের লালসায় সব পোকা চোখের ভেতরে ডুকে যায় একদম। চোখ দিয়ে একদম নাকের ছিদ্র পর্যন্ত চলে আসে। নিক উঠে আসে হেনরির উপর থেকে। যন্ত্রনায় ছটফট করা দেহটাকে দেখে পৈশাচিক আনন্দ নিতে চায় সে। নিক উঠে আসতেই হেনরি যন্ত্রনায় গড়াগড়ি খাচ্ছে। যন্ত্রণার ঢেউ যখন মস্তিষ্ক থেকে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে তখন মানুষ বাস্তবতা ভুলে যায়। হেনিরর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে এপাশ-ওপাশ করতে থাকে যন্ত্রনায়।

তার পা দুটো মাটিতে অস্বাভাবিকভাবে আছড়াতে থাকে। মনে হচ্ছে যেন মাটি খুঁড়ে ফেলতে চায়। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে তার অক্ষিকোটরের অবস্থা। ছুরির আঘাতে পিষ্ট হয়ে যাওয়া সেই চোখ থেকে শুধু রক্ত নয় চোখের ভেতরের স্বচ্ছ জেলি বা ‘ভিট্রিয়াস হিউমার’ রক্তমাখা পিণ্ডের মতো গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। এই দৃশ্য দেখে সবাই নাক কুচকে ফেলে। প্রতিটা কঠোর হৃদয়ের মানুষেরও বমি চলে আসছে। জিহ্বা ঝুলে আছে ছিন্ন -বিচ্ছিন্ন হয়ে। লোকটার শরীরটা মেঝের ওপর আছাড় খাচ্ছিল অনেকটা কাটা পড়া সাপের মতো। তার প্রতিটি হাড়ের জয়েন্ট থেকে যেন মটমট শব্দ বের হচ্ছিল। দুই হাতে মুখ ঢাকার চেষ্টা করছিল সে। কিন্তু নখগুলো নিজের গালের চামড়া ছিঁড়ে দিচ্ছিল যন্ত্রণার তাড়নায়। বাতাসের জন্য তার বুকটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছিল
গলা দিয়ে বেরিয়ে আসছিল নরকীয় এক ঘড়ঘড় শব্দ। মেঝের ধুলো আর রক্ত মিশে কদর্য কাদা তৈরি হয়েছে তার নিচে। গার্ডগুলো যন্ত্রণার এই নগ্ন রূপ দেখে স্থির থাকতে পারল না। অনেকে চোখ সরিয়ে নেয়। আবার কেউ কেউ আতঙ্কে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে এক জ্যান্ত মানুষের মৃত্যু-যন্ত্রণার প্রদর্শনী যা দেখার পর রাতের ঘুম হারাম হতে বাধ্য।

নিক সেদিকে তাকিয়ে পৈশাচিক হাসলো। হাতে বড় একটা চাপাতি নিয়ে প্রতিটা গার্ডদের উদ্দেশ্যে বলে,
” দেখে নে , শিখে নে , অনুভব করে নে । যদি কখনো কেউ পিছনে আঘাত করার কথা সপ্নেও ভেবে থাকিস তবে এর থেকেও ভয়ানক অবস্থা করব। মনে রেখিস এইসব ঠুনকো ষড়যন্ত্রে আমার বাল ও ছিঁড়তে পারবি না। আমার খেয়ে আমার পড়ে যদি পিছনে আঘাত করতে আসিস তবে এর যন্ত্রনা দ্বিগুন দিব। প্রতারক আর বিশ্বাস ঘাতক হওয়ার জন্য নিজের জন্মদস্ত্রীকেই বাঁচতে দেয় নি। বাকিটা ভেবে নে।

প্রতিটা গার্ড মাথা নিচু করে ফেলে আবার ও। নিক চা*পাতি নিয়ে এগিয়ে যায় কাতরাতে থাকা হেনরির দিকে। হিংস্র ক্ষীপ্ত চোখে এক পলক তাকিয়ে মুখের ভেতরে ডুকিয়ে দেয়। কন্ঠনালী ছিদ্র করে কোথায় গিয়ে ডুকেছে কে জানে! গলা কাটা মুরগীর মত হাত – পা ছুটতে থাকে। নিক গলার ভেতরে থেকেই চা*পাতি ঘুরাতে থাকে।।মাংস কেটে ছিন্ন -বিচ্ছন হয়ে যায় ভেতরের। হেনরি জ্ঞান হারায় অনেক আগেই। কিন্তু থেমে থাকে না গ্যাংস্টার বস। পরের আঘাতটা করে ওর পেটের ভেতরে। গলা থেকে একদম তল পেট পর্যন্ত এক আঘাত করে যে পুরোটা চামড়া দুই ভাগ হয়ে যায়। একটুর জন্য ঝাঁকিয়ে উঠে হেনরির শরীর। ভেতরে হাড্ডি সহ সব কিছু দৃশ্যমান হয়ে উঠে। নিকের ঠোঁটে পৈশাচিক হাসি। দাঁতে তাজা রক্তের চিহ্ন। বিক্ষত পেটের ভেতরে হাত ডুকিয়ে কলিজা বের করার চেষ্টা চালায়। এক সময় কাঙ্খিত জিনিস পেয়ে এক টানে নিয়ে আসে। পর্দা থেকে ছিঁড়ে একদম নিকের হাতে চলে আসে।
নিক কলিজাটা হাতে নিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসে।।ঠোঁট আর জিহ্বা দিয়ে কেমন একটা শব্দ করে। সাথে সাথে কোথা থেকে যেন দৌড়ে আসে ভয়ানক দুইটা বন্য পশু। গ্যাংস্টার বসের সব থেকে বিশ্বস্ত সহকারী হান্টার আর শ্যাডো।
নিক দুই কদম সরে যেতেই ক্ষুধার্তদের মত ঝড়ের গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।।প্রথম কামড়টা এই দেয় বুকের এখানে। কাচা মাংস বড় বড় দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে খেতে থাকে। ফুঁস – ফুঁস শব্দে ভারী হয়ে উঠে পুরো আইল্যান্ড। নিক আঙ্গুলের সাহায্য কপালের রক্ত মুছে মুছে ছিটকে ফেলে দেয়। এমন ভাবে ফেলে দেয় যেন কোনো আবর্জনা। আরিশ এগিয়ে এসে ছিড়ে খাওয়া লাশটার দিকে তাকিয়ে বলে,

” এখন আসল কালপ্রিট কে ধরব কিভাবে?
নিক বাঁকা হেসে আরিশের হাতে একটা কার্ড ধরিয়ে দেয়।
এরপর ডুকে পড়ে গোপন কক্ষে। আরিশ বেকুবের মত তাকিয়ে থাকে কার্ডটার দিকে। কার্ডটার অপর পাশ দেখেই থমকে যায়। কায়াত প্রায় সত্তর লক্ষ টাকা দিয়েছে হেনরিকে। তার এই কার্ড এইটা। সত্তর লক্ষ টাকার বিনিময়ে নিককে মারার সুপারি নিয়েছে এই বাস্ট্রাড! কিন্ত আরিশ ভেবে পাচ্ছে না নিক কখন হেনরির পকেট থেকে এই কার্ড বের করলো। সে তো চেয়ারে বসে সবটা হিংস্রতা দেখেছে। কিন্ত কার্ড বের করার দৃশ্য তো একবার ও দেখে নি। কখন বের করলো? আরিশের মাথা হ্যাং মেরে উঠে। আরিশ ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের,
” হিটলারের বাচ্চা মারতে মারতে কখন এই কার্ড হাতিয়ে নিলো? সেজন্য এইতো বলি, আসল কালপ্রিটের নাম আদায় না করে এইভাবে মেরে ফেলছে কেনো!

রাত তখন প্রায় দশটার কাছাকাছি। নিস্তব্ধ চারপাশ। শয়নকক্ষে মৃদু লাল ও নীল রঙের ডিমলাইটের আলো চিকচিক করছে। সেই অস্পষ্ট আলোয় এনির মুখচ্ছবি উজ্জ্বল হয়ে ফুটে আছে।গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন থাকায় তার চেহারায় একপ্রকার স্বর্গীয় প্রশান্তি বিরাজ করছিল।
​কিন্তু সেই শান্তি ছিল ক্ষণস্থায়ী। হঠাৎ এক অজানা অস্বস্তিতে ঘুমের ঘোরেই পুরো শরীর রি রি করে কেঁপে ওঠে। মনে এক অদৃশ্য ঝটকায় এনির চেতনা ফিরে আসে। মুহূর্তেই চোখের পাতা মেলে তাকায় সে। কিন্তু চোখের সামনে ভেসে থাকা মায়াবী আলো দেখার সুযোগটুকুও পায় না।
পেটের ভেতর থেকে উঠে আসা এক তীব্র ও অসহনীয় ব্যথায় কুঁচকে যায় তার ললাট। একদম গভীর থেকে আচমকা এক প্রবল মোচড় দিয়ে যন্ত্রণার ঢেউ আছড়ে পড়ে।সেই অসহনীয় ব্যথার অভিঘাতে মুহূর্তেই এনির মসৃণ ললাট রেখায় রেখায় কুঁচকে যায়। যন্ত্রণার তীব্রতা এতটাই প্রখর ছিল যে, তার নাকের ডগা শ্বেতশুভ্র হয়ে ওঠে এবং সুঠাম মুখভঙ্গি এক যন্ত্রণাকাতর বিকৃতিতে রূপ নেয়।

​এনি প্রাণপণে চেষ্টা করছিল চিৎকার দমন করতে। কিন্তু ব্যথার চোটে তার পাটিজোড়া শক্ত হয়ে বসে যায়। দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করতে থাকে।কিন্তু শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আসছিল তার। এক অবাধ্য ও আদিম কাঁপুনি তার পেশিগুলোকে অবশ করে দিচ্ছিল। সেই অসহ্য যন্ত্রণার রেশ কেবল পেটে সীমাবদ্ধ রইল না বরং তা বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ল শরীরের প্রান্তীয় স্নায়ুগুলোতে। দরদর করে ঘামতে শুরু করল তার পায়ের পাতা। বিন্দু বিন্দু শীতল ঘাম জমে উঠল কপালে। রঙিন ডিমলাইটের মায়াবী আভা এখন তার কাছে বিষাক্ত মনে হচ্ছে। এনির গলা শুকিয়ে আসে। মৃত্যুটা খুব সন্নিকটে মনে হচ্ছে। নিকের মুখটা দেখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। শেষ বারের জন্য উন্মাদ পুরুষটার কন্ঠস্বর শুনার জন্য ছটফটিয়ে উঠে মন। এনি বহু কষ্টে ফোন হাতে নিয়ে নিকের নাম্বারে ফোন দিতে চাইলো। কিন্তু ফোন দিতে হাত কাঁপছে। কোনো কিছু না ভেবে এনি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে।

নিক নিজেও অস্থির হয়ে পায়চারী করছিলো। বোমা হামলায় প্রায় দেড়শত কোটি টাকার জিনিস ছিলো। আর সব কিছুই একদম পুড়ে ছাঁই হয়ে গিয়েছে। তার উপর এনির প্রেগন্যান্সি নিয়ে প্রচুর অস্থির। রাতে কোনোরকম ঘুম নেই। এনির ছোট্ট মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে শুয়ে থাকে। চোখের পাতা এক করলেই মনে হয় মেয়েটা ব্যাথায় চিৎকার দিয়ে উঠছে, কষ্ট পাচ্ছে। নিককে এমন দেওয়ানা হতে দেখে আরিশ ভ্রুঁ নাচায়,
” তুই কি এনিকে নিয়ে টেনশনে আছিস?
নিক কপালে আঙ্গুল ঘেষে বলে,
” আর কে আছে আমার, যাকে নিয়ে টেনশন করব। জীবনের প্রথম মনে হচ্ছে আমি অসহায়। যার ইশারায় আন্ডারগ্রাউন্ড কাঁপে সে ভয়ে ঠিক মত নিশ্বাস নিতে পারছে না। গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান ও ভয় পাচ্ছে। এমন ভয় যা ওর নিশ্বাস বন্ধ করে দিচ্ছে।
আরিশ নিজেও ভয় পাচ্ছে এনিকে নিয়ে। ওর শারিরীক দুর্বলতা, রক্ত শূন্যতা সব একসাথে দেখা দিয়েছে। আরিশ নিকের কাঁধে হাত রেখে অদ্ভুত গলায় বলে
” তুই ভয় পাচ্ছিস? গ্যাংস্টার বস নিক জেভরান ভয় পায়? একজন আন্ডারগ্রাউন্ড টেররিস্ট ভয় পায়?
নিক চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস ফেলে,

” নিজের জন্য নয় ওর জন্য। ওর কিছু হয়ে গেলে গ্যাংস্টার বসের অস্তিত্ব এমনিতেও শেষ। আমার সব থেকে বড় ভুল ছিলো ওর কাছে যাওয়া। যদি আমি ওকে গভীরভাবে আলিঙ্গন না করতাম তবে আজ অন্তত প্রেগন্যান্সির মত এমন রিডিউকুলাস, ফা*কিং জিনিসের সম্মুখীন হতে হত না।
আরিশের কপালে ভাঁজ পড়ে। যেভাবে বাচ্চাকে তুচ্ছ করে দেখছে জন্মের পর কোনোদিন কোলে নিবে তো?
” তারা তর সন্তান নিক।
নিক বিরক্তি নিয়ে জবাব দেয়,
” সো হোয়াট।
আরিশ খুশিমনে এসে বলে,
” জন্মের পর আমাকে দিয়ে দিস। রাত জেগে কষ্ট না করে ফ্রিতে পেলে একদম বুকের সাথে মিশিয়ে রাখব। আশা রাখত তর বাচ্চা তর মত হিটলার হবে না। একদম এনির মত কিউট হবে। আদুরে কন্ঠ দিয়ে আমাকে এসে ডাক দিবে,

” পাপা আই লাভ ইউ!
আমিও জড়িয়ে ধরে বলব,
” আই লাভ ইউ কলিজা!
আরিশ বলতে দেরী হলেও তার কলার চেপে ধরতে গ্যাংস্টার বস এক মুহূর্ত দেরী করলো না। দাঁত পিষে শাষিয়ে বলে,
” আজ বলেছিস, নেক্সট টাইম যাতে আর বলতে না দেখি।
আরিশ বেকুব বনে যায়।।বুক ফুলিয়ে বলে,
” আশ্চর্য নিক, তুই নিজেও বাচ্চাকে তাচ্ছিল্য করছিস আর আমাকে ও নিতে দিবি না। তবে করবি কি বাচ্চা নিয়ে? এই ধর তর একটা মেয়ে হলো। সে তকে এসে বলছে,
” পাপা আই লাভ ইউ। পাপা তুমি অফিস থেকে কখন ফিরবে। অনেক মিস করছি তোমায়…
আরিশ আর বলতে পারলো না। নিক তার মুখের মধ্যে ঘুষি মেরে চেঁচিয়ে উঠে,
” ফা*ক অফ বাস্ট্রাড! স্টপ, যাস্ট স্টপ!

নিক ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে। কপাল দিয়ে ক্ষুদ্র ঘামের রেখা দেখা যাচ্ছে। এসি রুমে বসেও ঘামছে। উত্তেজিত, ছন্নছাড়া নিককে দেখে আরিশ ভ্রুঁ নাচায়। নাক দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। আঙ্গুলের সাহায্যে রক্ত মুছে হেসে দেয়। নিশানা একদম ঠিক জায়গায় লেগেছে। সে ইচ্ছে করেই মেয়ের প্রসঙ্গ এনেছে। খুব করে বুঝেছে মেয়ে হলে এই হিটলার আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। তাই -তো আদুরে কথাগুলো নিতে পারে নি। কেমন ছন্নছাড়া পাগল হয়ে উঠেছে।
মেয়েরা বাবার জীবন হয়। এমনও হতে পারে একটা মেয়ে হলে নিকের ছন্মছাড়া জীবন সুন্দর করে তুলেছে। আরিশ নাকে হাত দিয়ে বলে,
” মেরেছিস ভালো কথা, একটু আস্তে মারলে কি হত ভাই। নাক দিয়ে ব্লাড বের হচ্ছে।
নিক উত্তর দিতে চাইলো। কিন্তু তার আগেই উচ্চ আওয়াজে ফোন বেজে উঠলো। নিক ভ্রুঁ কুচকে স্ক্রিনের দিকে তাকায়। ঝলঝল করছে একটা আদুরে নাম,
” আমার ব্লাডরোজ ”
নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। এক সেকেন্ড ও দেরী করলো না। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ফুঁপানোর আওয়াজ ভেসে আসে। অস্থির গ্যাংস্টার বস আরও অস্থির হয়ে উঠে। গ্রিবেদেশ চেপে ধরে জিহ্বার সাহায্যে। কথা বলতে পারছে না অতিরিক্ত নিশ্বাস ফেলার জন্য।
কোনোরকম উচ্চারন করে বলে,

” কলিজা আমার, কি হয়েছে?
এনি তাও উত্তর করলো না। শুধু বুকভাঙা কান্নার আওয়াজটা নিকের মগজে গিয়ে ধাক্কা খায়। নিক পুরোটা বেপোরোয়া হয়ে উঠে। এক ঝটকায় রুমের আসবাবপত্র লাথি মেরে সরিয়ে দিয়ে ও বুনো বাঘের মতো গর্জে উঠে,
” বান্দির বাচ্চা, কাঁদছিস কেনো?
নিকের ধমকে আরিশ নাক-মুখ কুচকে ফেলে। এনি ধমকে শিউরে উঠে খানিকটা। নাক টেনে বলে,
” অস্বস্থি লাগছে, কষ্ট অনুভব হচ্ছে। মনে হচ্ছে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছি। চোখ খুলে রাখতে পারছি না। একবারের জন্য আসবেন আমার সামনে?
মুহূর্তের মধ্যে দিশেহারা হয়ে উঠে গ্যাংস্টার বস। ধীরে ধীরে শ্বাস নেয় কিন্তু তার শ্বাস স্থির নয়। ভেতরের অদৃশ্য অস্থিরতার মতো তা কাঁপতে থাকে। হুট করেই দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য শূন্যতায় স্থির হয়ে যায়। পরক্ষণেই তীক্ষ্ণ ও অনুসন্ধানী হয়ে ওঠে। নিক সোজা হয়ে দাঁড়ায়। পুরো শরীর শক্ত ও টানটান অবস্থায় স্থির থাকলেও সেই স্থিরতার মধ্যেই স্পষ্ট অস্থিরতা অনুভূত হয়। সে এক হাতে ধীরে কপাল স্পর্শ করে নিজের ভেতরের বিশৃঙ্খল চিন্তাগুলোকে সামলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু হাত নামিয়ে নিলেও সেই কাঁপন পুরোপুরি থামে না। কোমল সুরে বলে,
” আ.সছি আমি। খবরদার চোখ বন্ধ করবে না। অপেক্ষা করো আমার জন্য। আল্লাহর কসম করে বলছি তর কিছু হলে নিজেকে জ্বালিয়ে দিব। নিশ্বাস নাও।

নিক আর কিছু শুনার পরিস্থিতিতে নেই। ফোনে ওইটা সেটা বলতে বলতে, নিজের সাথে রিভলভার না নিয়েই বেরিয়ে পড়ে কেবিন থেকে। আরিশ কিছুটা চিন্তিত হয়ে তাকালো। এমন বেপোরোয়া নিককে দেখে এইটুকু বুঝতে পেরেছে এনির কিছু একটা হয়েছে। কারন একমাত্র এনির ক্ষেত্রেই নিক এত বেপোরোয়া হয়ে উঠে। কি হয়েছে? ডেলিভারি পেইন তো না। কারন সময় এখনও আসে নি। তবে কি হলো?
আরিশ নিজেও দাড়ালো না। নিকের রিভলভারটা হাতে নিয়ে সেও পিছনে দৌঁড় দেয়।
নিক নিচে নেমে দ্রুত গাড়িতে উঠে সরাসরি ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে। অধিরাজ চিন্তিত ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। এর মধ্যে আরিশ ও নেমে আসে। অধিরাজ এবং আরিশ কিছু বলার আগেই নিক কোনো কথা না শুনে গাড়িটি দ্রুতগতিতে চালিয়ে দেয়, এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সেটি তাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে যায়।
আরিশ আতঙ্কে জমে যায়। এই মুহূর্তে নিক একদম একা। সাথে অস্ত্র দেহরক্ষী কিছুই নেই। যত ক্ষমতাবান হোক আক্রমন করলে টিকে থাকা মুশকিল। আরিশ অধিরাজকে তাড়া দিয়ে বলে,

” অধিরাজ নিকের গাড়ির পিছন পিছন চল।
অধিরাজ আরিশের দিকে তাকিয়ে কপাল কুচকে বলে,
” কি হয়েছে স্যার? বসকে এমন লাগলো কেনো?
আরিশ মাথায় হাত দিয়ে বলে,
” এনি ফোন দিয়েছিলো। হয়ত কিছু একটা হয়েছে।
অধিরাজ স্ট্রিয়ারিং ঘুরিয়ে বলে,
” আন্দাজ করেছিলাম। নয়ত সব ধ্বংস হয়ে গেলেও বস অন্তত এত বেপোরোয়া হবে না। ম্যামের এই কিছু একটা হয়েছে।
নিকের গাড়িটি দ্রুতগতিতে মিনারের সামনে এসে হঠাৎ থেমে যায়। ব্রেকের তীব্র শব্দে চারপাশের নীরবতা মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে। তার মনে সময়ের কোনো হিসাব নেই। আছে শুধু এক অজানা তাড়না যা তাকে অস্থিরভাবে সামনে ঠেলে দিচ্ছে।

গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই সে দরজা খুলে দ্রুত নেমে পড়ে এবং কোনো বিলম্ব না করে ভেতরের দিকে ছুটে যায়। নিকের চলাফেরা একেবারেই অগোছালো ও ছন্নছাড়া। নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে অনেক আগেই। দৌড়ানোর সময় শ্বাস দ্রুত হয়ে ওঠে আসে। বুক অনিয়মিতভাবে ওঠানামা করতে থাকে। দৃষ্টি স্থির থাকতে পারছে না। নিজের রুমে এসে ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। ভেতরে ডুকার সাহস হচ্ছে না। নিজের সাথে যুদ্ধ করে ভেতরে ডুকে সোজা এনির কাছে যায়। এনি হাত দুই পাশে ছড়িয়ে একদম নিদ্রায় আচ্ছন্ন। জ্ঞান হারিয়েছে নাকি অন্য কিছু বুঝা মুশকিল। নিম গলায় হাত দিয়ে নিশ্বাস টানে,
” ব্লাডরোজ।
এনির কোনো রেসপন্স নেই। নিক ঘন ঘন নিশ্বাস টেনে এনির মাথাটা বুকের সাথে নিয়ে গর্জে উঠে,
” কুত্তার বাচ্চা কথা বল! শালী ধান্দাবাজ! আ্যই চোখ খুলা রাখতে বলেছিলাম না আমি। শুয়রের বাচ্চা চোখ বন্ধ করলি কেনো?
নিকের হুংকারেও এনি চোখ খুলতে পারছে না। তীব্র ব্যাথায় সেই কখন জ্ঞান হারিয়েছে। নিক বেপোরোয়া হয়ে এনিকে পাজা কোলে তুলে নেয়। দরজার কাছে আসতেই দেখে ড, মোনালিসা দাঁড়িয়ে আছে। দেখে বুঝা যাচ্ছে মাত্র এই এসেছেন। নিককে হুট করে সামনে দেখে তিনিও অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন।
” আমাকে মি, আরিশ ফোন করে জানালেন আপনার ওয়াইফের কিছু সমস্যা হয়েছে। তাই দেরী না করে চলে আসলাম। দেখি, শুইয়ে দিন বিছানায়।

নিক ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। এনির শুকনো ঠোঁটে চুমু খেয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। এরমধ্যে আরিশ আর অধিরাজ ও চলে আসে। দুইজনের মুখেই চিন্তার ছাপ। ড. মোনালিসা এনির হাতটা ধরে আফসোসের সুরে বলে,
” উনার জন্য চন্তা হচ্ছে। প্রেগন্যান্সির টাইমে এত দুর্বলতা সত্যি আশ্চর্য জনক। তবে ভেঙ্গে পড়বেন না আপনি। আজ যেমন বেপোরোয়া এসে দেখলাম জানামতে এতটা নরম আপনি নন। তাই শক্ত হয়ে থাকুন। শক্তি দিন উনাকে। এমন সময়ে হুটহাট পেট ব্যাথা হয়। উনি সেটা সহ্য করতে না পেরে জ্ঞান হারিয়েছেন। মেডিসিন গুলো দিয়ে যাচ্ছি সময়মত সেবন করাবেন।
নিক কোনো উত্তর দিলো না। শুধু এদিক -সেদিক পায়চারী করছে। অধিরাজের চোয়াল ঝুলে আসে। এইটা কি সেই হিংস্র পুরুষটা। যে কিছু ঘন্টা আগে নিজের দেহরক্ষীকে একদম জাহান্নাম এর নমুনা দেখিয়ে এনেছে? ডাক্তার মোনালিসা এনির মুখ ঠান্ডা পানি দিয়ে মুছে দেয়। এক মাসে কিছুটা স্বাস্থ্য হয়েছে। ড. মোনালিসা হালকা হাসলেন। তবে খুব যত্নেই আছে। উনি উঠে আরিশ আর অধিরাজের দিকে তাকায়। কিছু একটা বলতে চাইছে। নিকের উদ্দেশ্যে বলে,
” উনি এত ভারী কাপড় পড়েছেন কেনো? ড্রেসটা চেঞ্জ করে দিয়ে নরমাল কিছু পড়িয়ে দিয়েন।আর মি, জেভরান আপনার উদ্দেশ্যে কিছু বলতে চাইছিলাম।

” কি বলবেন?
ড. মোনালিসা আমতা আমতা করে বলে,
” আপনাদের মধ্যে কি এখনও কোনো ফিজিক্যাল কিছু হয়?
নিকের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।দাঁত পিষে বলে,
” কমনসেন্সহীন মহিলা। হলে কি এই মেয়ে জীবিত থাকত?
ড. মোনালিসা থতমত খেয়ে যান। ভয় পেলেও চুল ঠিক করে বলে,
” আই নো মি জেভরান। সহজভাবে তো আর কাছে জান না। তাই না যাওয়ায় উত্তম। আর পাঁচ জন সাধারন দম্পত্য হলে তারা আলাদা ব্যাপার। প্রেগন্যান্সির প্রথম তিন মাস শুধু বিতারিত থাকলেই হয়। কারন ওই সময় মিসক্যারেজ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এরপর দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর জন্য এইটা নরমাল। কিন্ত আপনি তো আর ওইসব স্বামীর মত না।।তারা তো বউ অজ্ঞান করে না। তাই আপনি ডেলিভারি হওয়া আগে পর্যন্ত দুরে থাকুন।
নিকের ভ্রুঁ কুচকে আসে। এই মহিলা আকারে ইঙ্গিতে তাকে কি বুঝাতে চাইলো? আরিশ ঠোঁট চেপে নিজে হাসি নিয়ন্ত্রনে রাখে। ড. মোনালিসা আর দাড়ালেন না। দ্রুত প্রস্থান করলেন রুম থেকে। আরিশ নিজের হাসিটা থামাতে না পেরে মুখ চেপে ধরে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। আরিশ বের হয়ে যাওয়াতে অধিরাজ ও দাড়ালেন না। নিকের দিকে তাকিয়ে বোকা হেসে বের হয়ে যায়। নিক বিরক্তির নিশ্বাস নিয়ে এনির পাশে বসে। এনি পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়। চোখের সামনে নিকের গম্ভীর মুখটা দেখতে পেয়ে কপাল কুচকায়।
নিক ঠোঁট কামড়াতে থাকে নিজের। চোখ বন্ধ করে কিছু একটা বিরবির করে এনির কপালে চুমু খায়। এনির জামার দিকে নজর যায়। এমন ভারী কাপড় দেখে ক্ষুব্দ হয়ে উঠে। চোয়াল শক্ত করে এনির জামা খুলতে খুলতে ধমকায়,

” কতবার না করেঁছিলাম এইসব গর্জিয়াস কাপড় না পড়ার জন্য। নরম – কাপড় পড়লে কি সমস্যা হত? এখন কষ্ট কার হচ্ছে!
নিকের পর পর এমন প্রগাঢ় ধমকে এনি মইয়ে যায়। অভিমানে চোখ পানি চলে আসে। পেটে সামান্য ব্যাথাও করছে। কিন্তু এই মুহূর্তে ব্যাথার কথা বলা যাবে না। দেখা যাবে কোলে নিয়ে হসপিটালে দৌঁড় শুরু করে দিয়েছে। দুনিয়ার সবাইকে বিশ্বাস করলেও এই লোককে নিয়ে বিশ্বাস নেই। এনি অভিমানী গলায় বলে,
” ইচ্ছে হয়েছিলো তাই একটু পড়েঁছিলাম ?
” ইচ্ছে হলেই পড়বে হবে ? শ্বাস কষ্ট হচ্ছে কার? এখন যদি রেশ উঠে তবে?
” রেশ উঠে? কিন্তু উঠিনি তো। আপনার বিরক্ত লাগলে বাহিরে যেতে পারেন। বিরক্ত হতে হবে না আমাকে নিয়ে।
নিক গম্ভীর নিশ্বাস ছাড়লো। মেয়েটা আজকাল অতিরক্ত বাচ্চামো করে। কই আগে তো কোনোদিন এইসব বলে নি। এমনকি তার চোখে চোখ রেখেও কোনোদিন কথা বলে নি। নিক ঠোঁট কামড়ে ধরলো নিজের। আগুনে পুড়ুক আর না পুড়ুক কায়াত এক হিসেবে তার অনেক বড় উপকার করেছে। সে যদি হারিয়ে না যেত, তার শূন্যতা এই রমণী কোনো কালেই অনুভব করতে পারত না। সারাজীবন এইভাবেই ঘৃনা করে যেত। নিক এনির মুখটা শক্ত হাত দিয়ে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। কিছুটা কঠিন গলায় বলে,

” বিরক্ত হচ্ছি কখন বলেছি আমি?
” সেটা আপনার ব্যবহার দেখলেই বুঝা যায়।
এনির চোখে পানি টলমল করছে। নিকের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ধমকে বলে,
” কুত্তার বাচ্চা, কাঁদছিস কেনো? বিরক্ত হলে কি এইভাবে পাগলের মত ছুটে আসতাম।
নিকের প্রগাঢ় ক্ষুব্দ ধমকে ছোটখাটো শরীরটা কেঁপে উঠে এনির। দৃষ্টি নিকের থেকে সরিয়ে নিচু করে ফেলে। ঠোঁট কাঁপছে তিরতির করে। নিক সেই কাঁপা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট ভেজালো। এসির মধ্যে থেকেও ঘেমে একাকার অবস্থা। নিক ঘন নিশ্বাস নিয়ে এনির উদ্দেশ্যে বলে,
” এইভাবে চুপচাপ থাকার মানে কি? আমি রেগে গেলে কন্ট্রোলে আনতে পারবে? আদর- আহ্লাদ দিয়ে মাথায় তুলে ফেলেছি। আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার স্পর্ধা দেখাও কিভাবে?দুই মিনিটের মধ্যে যদি আমার দিকে না তাকাও তবে খোদার কসম কি করব নিজেও জানি না।
রাগে, জেদে এনির কান্না চলে আসে। একটু ভালো করে কথা বললে কি এই লোকের জাত চলে যায়। এ কেমন পুরুষের প্রেমে পড়লো সে? নিয়তি কেনো তার সাথে এত নিষ্ঠুর হলো। ঘৃনা করত, তীব্র ঘৃনা। যাকে দেখলে শরীর কাটা দিয়ে উঠত, ভয়ে ধুমড়ে -মুচড়ে যেত, পানি পিপাসায় তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠত সেই তীব্র ঘৃনা কিভাবে ভালোবাসায় রুপান্তরিত হলো?এনি নিশ্বাস বন্ধ করে পিটপিট করে নিকের দিকে তাকায়। চাদরের নিচ দিয়েই নিক পুরোটা জামা খুলে ফেলে। এরপরও সামান্য ফর্সা ত্বক উন্মুক্ত হয়ে উঠে তার সামনে। চোখ বন্ধ করে বিরবির করে উঠে,
” অহহ, গড এখন আবার ড্রাগস নিতে হবে।

এনি কান পেতে শুনতে চাইলো সেই কথা। কিন্তু সেটা শুনার ভাগ্য তার হলো না। এমনিতেই লজ্জায় মরে যাচ্ছে। নিকের গালি গুলোর কথা মনে হতেই আবার ও মন খারাপ করে ফেলে। এনির চোখে পানি টলমল করে উঠে। নিক সেদিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাবলো। মুহুুর্তেই এনির উন্মুক্ত শরীরটা নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে জিজ্ঞাসা করে,
” কি হয়েছে? পেট ব্যাথা করছে? খারাপ লাগছে? অস্বস্থি হচ্ছে? কি করতে হবে বলো? কি চাও তুমি। শুধু একবার বলো সব তোমার পদতলে এনে রাখব।
এনি নিকের বুকে নাক ঘেষে বলে,
” এইভাবে গালি দিয়েছেন কেনো আমাকে?
নিকের কপাল কুচকে আসে। গ্রিবাদেশ নাড়িয়ে বলে,
” আমি গালি দেয় তাই গালি দিয়েছি।
” বউকে গালি দেওয়া অভদ্র আর কাপুরুষের লক্ষণ।
নিক অদ্ভুত ভাবে তাকালো এনির দিকে,

” আমি অভদ্র, চরম অভদ্র! কাপরুষ, জানোয়ার, নরপশু, হার্টল্যাস! তবুও তুমি আমার। ইউ আর মাই অ্যাডিকশন। আ ফিয়ার্স অ্যাডিকশন। ইউ আর মাই অবসেশন— আ টেরিফাইং প্রেজেন্স।
এনি কাঁপছে নিকের দেহের উত্তাপে। এনির কাঁপা ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে সাথে সাথে উন্মাদের মত সেটা নিজের ওষ্ঠ দ্বারা চেপে ধরে। হুট করে আক্রমন হওয়াতে হকচকিয়ে উঠে এনি। ছোট হয়ে আসা চোখ দুইটা মুহূর্তেই বড় হয়ে যায়। এনি শান্তভাবে বিষয়টা সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে। এমন হুটহাট আক্রমনের স্বীকার সে প্রতিদিন এই হয়। কিন্তু সামাল দিতে চাইলেই কি এমন বেপোরোয়া পুরুষকে সামলে দেওয়া যায়? নিকের হাত চলে যায় অবাধ্যভাবে। এনি আৎকে উঠে সামান্য। শক্ত হাতটা চেপে ধরে আতঙ্কিত গলায় বলে,

” ক..কি করছেন?
নিক ধীরে ধীরে উপরে উঠে আসে। এনির গালে নাক ঘেষে ফিসফিস করে বলে,
” বলেছিনা আমার স্পর্শে সব আবার সজীব হয়ে উঠবে।
এনি লজ্জায় কম্পিত হয়ে উঠলো। চোয়াল পিষে নিককে কিছু বলতে যাবে তার আগেই গ্যাংস্টার বস ভয়ানক এক কাজ করে বসলো। এনি চোখ বন্ধ করে খামছে ধরে নিকের পিঠ। নিক এনির টি – শার্ট ঠিক করে দিয়ে কপালে চুমু খায়। এনি কাঁপা গলায় বলে,

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৪

” ভালোবাসেন আমাকে?
গ্যাংস্টার বসের চোখের মণি দু’টো সরু হয়ে আসে। ঠিক যেন শিকার ধরার আগে কোনো হিংস্র চিতার দৃষ্টি। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে, আর কপালে ফুটে উঠেছে এক সূক্ষ্ম ভাঁজ। এনির পেটের দিকে ইশারা দিয়ে বলে,
” পেটে আমার বাচ্চা নিয়ে ঘুরছো আর জিজ্ঞাসা করছো ভালোবাসি কি – না?

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬৫ (২)