রুপুর বিয়ে পর্ব ২০
Bobita Ray
“তুমি এত রাতে এখানে কী করছ অয়ন?”
রুপু অন্ধকারের বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতেই অয়ন চমকে উঠে রুপুর দিকে তাকাল। অয়নের চোখ-মুখ লাল টকটকে হয়ে আছে। পথিক পথ হারিয়ে ফেললে যেমন তাকে বিধ্বস্ত দিশেহারা দেখায়। অয়নকেও ঠিক তেমন দেখাচ্ছে। রুপু অয়নের মুখোমুখি এসে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। অয়ন দু’পা পিছিয়ে গেল। রুপু বলল,
“এতরাতে অথৈয়ের ঘরের সামনে কী করছ বললে না-তো?”
অয়ন খুব ক্লান্তবোধ করছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“কী করব। এমনিই হাঁটাহাঁটি করছিলাম।”
“তোমাদের বাড়ির ছাদ। সে তুমি ইচ্ছে করলে হাঁটাহাঁটি করতেই পারো। তাই বলে আমার বোনকে ডিস্টার্ব করার তো কোন মানে হয় না অয়ন।”
“বউদি তুমি আমাকে ভুল বুঝছ।”
“আর তোমার মা যে আমার বোনকে ভুল বুঝেছে। তার বেলায়?”
“আমি মায়ের হয়ে তোমার কাছে ক্ষমা চাইছি।”
“তোমাকে ক্ষমা চাইতে হবে না অয়ন। এত রাত জাগা ঠিক না। তুমি এখন ঘুমাতে যাও।”
“ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না।”
“ইচ্ছে না করলেও ঘুমাতে হবে। রাত জাগতে জাগতে রোগ বাঁধিয়ে ফেলবে তো। তাছাড়া আমার বোনের আগামীকাল পরীক্ষা। তুমি এভাবে ডিস্টার্ব করলে ওর পড়ায় একটুও মন বসবে না। দয়া করে ওকে একটু পড়তে দাও অয়ন।”
অয়ন কথা বাড়াল না। এলোমেলো পা ফেলে চলে গেল।
রুপু নিচু কণ্ঠে বলল,
“দরজা খুল অথৈ?”
অথৈ দরজা খুলে রুপুকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে বলল,
“এখানে তুই কীভাবে থাকিস দিদি? আমার তো মাত্র কয়েকটা দিনেই দম বন্ধ হয়ে আসছে। বাড়ি যেতে পারলে বাঁচি।”
“বাবা-মাকে বলিস না কিছু।”
“বোকার মতো কথা বলিস না দিদি। আমাদের ভালো-মন্দ বাবা মাকেই তো সবার আগে জানাতে হবে। তোর শাশুড়ী তো তোকে দুচোখ পেতে দেখতেই পারে না। সে না পারুক। কিন্তু জামাইবাবু। আজকালকার যুগে মানুষ এতটা দিনকানা হয় নাকি। ইশ, একটু যদি তোকে বুঝত।”
রুপু বিড়বিড় করে বলল,
“আমার কপালটাই খারাপ।”
মুখে বলল,
“আমাকে নিয়ে চিন্তা করিস না অথৈ। আমার ধৈর্য অপরিসীম। আমি ঠিকই এই সংসারে টিকে থাকব দেখিস।”
“এভাবে যুদ্ধ করে কতদিন? তুই যে খুঁটির উপরে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকার কথা ভাবছিস। সেই খুঁটিটাই যে বড্ড নড়বড়ে দিদি।”
“তোকে এত চিন্তা করতে হবে না। পড়ায় মনোযোগ দে। আর অয়নের কাছ থেকে দূরে দূরে থাকবি।”
অথৈ রহস্য করে বলল,
“কেন তোর দেবর আমার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে নাকি?”
রুপু অথৈয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল। অথৈয়ের মনে এইমুহূর্তে ঠিক কী চলছে। অথৈ ফিক করে হেসে ফেলল। বলল,
“তোকে দেখেই আমার বিয়ের শখ মিটে গেছে রে দিদি। কোনদিন বিয়ে না করলেও তো এইবাড়ির বউ হওয়ার কোন ইচ্ছে নেই আমার।”
“হয়েছে আর পাকামি করতে হবে না। এবার পড়ায় মনোযোগ দে।”
রুপু অথৈয়ের পাশে শুয়ে পড়ল। অথৈ রুপুর পিঠে হেলান দিয়ে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তে লাগল। অথৈয়ের পড়ার শব্দ শুনতে শুনতে রুপু গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
রুপু খুব তাড়াহুড়ো করে রান্না করছে। টাইম মতো অথৈকে নিয়ে পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে হবে। ময়নার মাও ছুটিতে যাওয়ার আর সময় পেল না। যদিও ময়নার মাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। রুপুর শাশুড়ী ইচ্ছে করে এই সময়ে ময়নার মাকে একপ্রকার জোর করেই ছুটি কাটাতে দেশের বাড়িতে পাঠিয়েছে।
বীথি রানী রান্নাঘরে এসে চেয়ার টেনে বসল। বলল,
“এত তাড়াহুড়ো করছ কেন? আস্তেধীরে রান্না করো। এমনিতেই যা রাঁধো। মুখে তোলা যায় না।”
রুপুর এখন তর্ক করতে ইচ্ছে করছে না। ও বীথি রানীর দিকে ফিরেও তাকাল না। নিজের মনে রান্না করতে লাগল। বীথি রানী রুপুর মনোযোগ ফেরাতে ঠাস করে মগ টেবিলে নামিয়ে রাখল। রুপু চমকে উঠে শুধু একবার পেছন ফিরে তাকাল। বীথি রানী বলল,
“ বিনয়ের কাপড়চোপড় খুব ময়লা হয়েছে। আমি ভিজিয়ে দিয়েছি। রান্না শেষ করে কাপড়চোপড় ধুয়ে রোদে শুকাতে দেবে। আমার কোমরের ব্যথাটা বেড়েছে। নাহলে আমিই ধুয়ে দিতাম।”
“ধুতে যখন পারবেন না। তখন আমাকে না জিজ্ঞেস করে কাপড় ভিজিয়েছেন কেন?”
“তুমি করবে স্বামী ভক্তি? হুহ্.. সামান্য কয়টা কাপড় ধুয়ে দেবার কথা শুনেই যে ভাব করছ।”
“আশ্চর্য কাপড় ধুয়ে দেবার সাথে স্বামী ভক্তির কী সম্পর্ক?”
বীথি রানী কথা ঘুরিয়ে বলল,
“আমরাও এককালে বউ ছিলাম। তোমার মতো বেয়াদব ছিলাম না। আমার শাশুড়ীকে দেখে আমি জমের মতো ভয় পেতাম। আমার শাশুড়ী কোন কাজ বলে দেওয়ার আগে সবকাজ করে বসে থাকতাম শুধুমাত্র কথা শোনার ভয়ে। তারপরও শেষ রক্ষা হতো না। সব রকম অপবাদ, অপমান সহ্য করে দিব্যি শাশুড়ী ননদ দেবরকে নিয়ে বছরের পর বছর সংসার করে গেছি। তারপরও শাশুড়ীর মুখে মুখে কখনো তর্ক করিনি।”
“তারমানে আপনার শাশুড়ী আপনাকে চাবি দেওয়া পুতুলের মতো ঘুরাত? এখন আপনিও কী কোনভাবে আপনার শাশুড়ী মতো আমাকে ট্রিট করতে চাচ্ছেন মা?”
“মুখ সামলে কথা বলো রুপু।”
“আমি তো মুখ সামলে রাখতেই চাই। আমার চুপ করে থাকা আপনারাই তো সহ্য হয় না। সারাক্ষণ আমার পেছনে আঠার মতো লেগে থাকতে চান।”
“ছিঃ ছিঃ কথার কী ছিরি… বাপ-মা তো আর ভালো শিক্ষা দেয়নি।”
“আমার বাবা-মা আমাকে কী শিক্ষা দিয়েছে না দিয়েছে সেই সাটিফিকেট তো আমি আপনার কাছ থেকে নেব না মা।”
“তারমানে তুমি বিনয়ের জামা-কাপড় ধুইবে না?”
“আপনি বললে অবশ্যই ধুয়ে দেব। তবে এখন পারব না।”
“একটা কাজও তো সময় মতো করো না তুমি।”
রুপু স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
“ময়নার মায়ের মতো আমাকেও প্রতিমাসে মাইনে দিলে অবশ্যই টাইম টু টাইম কাজ করতাম। যেহেতু মাইনে-টাইনে কিছু দেন না। তাই সময় মতো কাজ করার প্রয়োজন বোধ করি না।”
বীথি রানীর শরীর জ্বলে গেল। কোনভাবেই এই মেয়ের সাথে কথায় পারা যায় না। বাপরে চোপার জোর। এই মেয়ের চোপার উপর দিয়ে ট্রেনগাড়ি গেলেও চোপার জোর একটুও কমবে না৷
রুপু রান্না শেষ করে টেবিলে খাবার গুছিয়ে রাখতে রাখতে বলল,
“মা আমি সকালেরটার সাথে দুপুরের খাবারও রান্না করে ফেলেছি। আপনি আজ আর আমার ভরসা না করে খিদে লাগলে খেয়ে নিয়েন সাথে আপনার ছেলেদেরও খেতে দিয়েন।”
“কেন তুমি কোথায় যাবে?”
“অথৈয়ের পরীক্ষা আজ। পরীক্ষা শেষ হলে অথৈ বাড়ি চলে যাবে। ওর সাথে আমিও যাব।”
“তোমার বোন যায় যাক। তোমার এখন বাপের বাড়ি যাওয়ার দরকার নেই।”
“আমার সব ব্যাপারে দয়া করে আপনি নাক গলাবেন নাতো মা। আমার ভালো লাগে না।”
“তোমার ব্যাপারে নাক গলানোর আমার কোন ঠেকা পড়েনাই। ময়নার মা বাড়িতে আসুক। তারপর তুমি সারাজীবন তোমার বাপের বাড়ি গিয়ে পড়ে থাকতেও আমার কিছু যায় আসে না।”
“এতই যখন আমাকে ছাড়া চলবে। তখন ময়নার মাকে জোর করে পাঠালেন কেন?”
বীথি রানীর মুখের কথা মুখেই রয়ে গেল। হতবাক হয়ে রুপুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
রুপুর তো কোনভাবেই জানার কথা না। বীথি রানী একপ্রকার জোর করে ময়নার মাকে দেশের বাড়িতে পাঠিয়েছে। হায় ঈশ্বর। এই মেয়েটা কোন তন্ত্রমন্ত্র জানে নাকি?
রুপু এসে শাশুড়ী মায়ের পাশে বসল। শাশুড়ী মায়ের চোখে চোখ রেখে শীতল কণ্ঠে বলল,
“আমাকে জব্দ করার কথা মাথাও আনবেন না মা। আমি কাজ দেখে ভয় পাই না। তবে আজ আমি আপনাকে এই অবস্থায় ফেলে বাবার বাড়ি চলে গিয়ে বেশি না মাত্র একটা সপ্তাহ থাকলেই আপনার অবস্থা কেরোসিন হয়ে যাবে। সারাজীবন গাধার মতো খেঁটেছেন। আমি চাই না এই বয়সেও আপনি কাজ করে খান। এখন আপনার আরাম আয়েশ করার সময়। এই সময়ে যদি আরাম আয়েশের কথা না ভেবে সারাক্ষণ আমার পেছনে লেগে থাকেন। তাহলে যে আমিও আপনার পেছনে আঠার মতো লেগে থাকব মা। তখন কিন্তু হাসফাস করেও আর আমার কাছ থেকে মুক্তি পাবেন না। কারণ আমি ভালোর সাথে ভালো। খারাপের সাথে খারাপ। যে আমার সাথে যেমন ব্যবহার করবে। আমিও ঠিক তার সাথে তেমন ব্যবহার করব। আমার সত্যিই দেরি হয়ে যাচ্ছে। এখন যাই কেমন?”
রুপু বাকরুদ্ধ অবস্থায় বীথি রানীকে বসিয়ে রেখেই চলে গেল।
বিনয় বসে বসে জুতার ফিতে বাঁধছে। বিনয়ের পাশের সোফায় অয়ন আধশোয়া হয়ে টেলিভিশন দেখছে। যদিও অয়নের টেলিভিশন দেখায় কোন মনোযোগ নেই। শুধু একটার পর একটা চ্যানেল পাল্টাচ্ছে। বীথি রানী পানের বাটা নিয়ে ছেলেদের সামনে এসে বসল। বিনয়কে বলল,
“একটা পান বানিয়ে দেব বাবা?”
“দাও।”
রুপু অথৈয়ের হাত ধরে বসার ঘরে নিয়ে আসল।
মা ছেলে তিনজনই চমকে উঠে রুপুর দিকে তাকাল। রুপু অথৈয়ের হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে ব্যাগের সবকিছু বীথি রানীর চোখের সামনে ঢেলে দিল। রুপুর আকস্মিক কাণ্ডে বীথি রানী হকচকিয়ে গেল। রুপু বলল,
“ভালো করে দেখুন মা৷ আমার বোন আপনাদের বাড়ির একটা সুতাও নেয়নি।”
“আশ্চর্য এগুলো আমাকে দেখাচ্ছ কেন?”
“কারণ আছে দেখেই তো দেখাচ্ছি মা। আপনি নাকি আমার বোনকে বলেছেন, যাওয়ার সময় যেন আপনাকে অথৈয়ের ব্যাগপত্র দেখিয়ে যায়। ভালো করে দেখে নিন মা। পরে কিন্তু আবার আমার বোনকে চোরের অপবাদ দিতে পারবেন না। এই অয়ন তুমি একটু মাকে হেল্প করো না?”
অতিরিক্ত লজ্জায় কুঁকড়ে গেল অয়ন। নিজের মায়ের অস্বাভাবিক কাণ্ডে রাগে, দুঃখে চোখে জল এসে যাচ্ছে। কোন মুখে অথৈয়ের দিকে তাকাবে অয়ন? কতশত কথা অথৈকে বলার ছিল। কথাগুলো কীভাবেই বা বলবে!
বীথি রানী ছেলেদের সামনে কোনভাবেই বেইজ্জতি হবে না। দিশা বিশা না পেয়ে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“বিনয় তোর বউ আমাকে কী ভাবে বলতো? কতবড় মিথ্যা একটা অপবাদ দিল আমার নামে। ছিঃ ছিঃ আমার তো লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে।”
বিনয় বলল,
“রুপু তুমি শুধু শুধু মাকে দোষ দিচ্ছ কেন? তোমার হয়তো কোথাও ভুল হচ্ছে।”
“একদম মায়ের হয়ে সাফাই গাইবে না তুমি। তোমার মা তোমাদের অতিরিক্ত ভালোবাসে, চোখে হারায় দেখেই যে পরের মেয়েদেরও ভালোবাসবে এই ধারণা মন থেকে ডিলিট করে দাও। ভুলে যেও না। ওনি তোমার জন্মদাত্রী মা। আর আমার শাশুড়ী মা। এক গাছের বাকর কখনো অন্য গাছে লাগে না।”
“তুমি মাকে ভুল বুঝছ রুপু। আমার মা এতটাও খারাপ না।”
বিনয়ের এই একঘেয়েমি কথাবার্তা শুনলে রুপুর খুব হতাশ লাগে। রুপু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তোমার মা তোমার কাছে এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মা হলেও আমার কাছে নিকৃষ্ট শাশুড়ী মা। অথৈ চল..”
বীথি রানী বিনয়কে বলল,
“দেখলি তো তোর বউয়ের কথাবার্তার ছিরি? তোর বউয়ের সাথে কী এমন করেছি আমি? যে আমাকে দুচোখ পেতে দেখতেই পারে না। হায় ভগবান এমন বউ আমার শক্রকেও দিও না তুমি।”
মায়ের ঘ্যান ঘ্যানানি এখন অসহ্য লাগছে। অয়ন উঠে দাঁড়াল। বলল,
“বউদি একটু ওয়েট… আমিও যাব তোমাদের সাথে।”
“তার কোন দরকার নেই অয়ন।”
“বউদি প্লিজ…”
“বললাম তো না।”
বিনয় রুপুর পথ আগলে দাঁড়াল। বলল,
“তুমি একটু ঘরে চলো রুপু। তোমার সাথে আমার একটু কথা আছে।”
“যা বলার এখানেই বলো।”
বিনয় চাপা কণ্ঠে বলল,
“এত জেদ করো না রুপু। ঘরে চলো।”
রুপু কথা বাড়াল না। বিনয়ের পিছুপিছু ঘরে গেল। বিনয় ঘরের দরজা চাপিয়ে দিয়ে রুপুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রুপুর খুব হাসফাস লাগছে। বিনয়ের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেবার প্রাণপনে চেষ্টা করেও পারল না। রুপু মুখ গুঁজল বিনয়ের বুকে। বিনয় রুপুকে অনেকক্ষণ একভাবে জড়িয়ে ধরে রাখল। রুপুর হুঁশ ফিরতেই বলল,
“ছাড়ো।”
“উঁহু..”
“ছাড়ো তো.. আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
“হোক দেরি।”
“আমার কিন্তু অসহ্য লাগছে।”
“লাগুক অসহ্য। তুমি মায়ের সাথে এত ঝগড়া করো কেন রুপু?”
“এইসব বলার জন্য আমাকে ডেকেছ নাকি?”
“না। শুনলাম তুমি নাকি আজ অথৈয়ের সাথে ওই বাড়িতে যাবে।”
“ঠিকই শুনেছ।”
“যাও সমস্যা নেই। আজই চলে এসো কেমন।”
“আমি দুটো দিন থাকব।”
“পরে থেকো। এখন থাকার দরকার নেই।”
“এখন থাকলে কী হবে?”
“মায়ের শরীর তেমন ভালো না। ময়নার মাও বাড়িতে নেই। তুমি চলে গেলে মা খুব অসুবিধায় পড়ে যাবে।”
রুপু বিনয়ের কাছ থেকে নিজেকে জোর করে ছাড়িয়ে নিল। বলল,
“মা তোমার। মায়ের ভালোমন্দ দেখার দায়িত্বও তোমার। ভুলেও তোমার দায়িত্ব আমার ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করবে না।”
বিনয় আহত চোখে রুপুর দিকে তাকাল। বলল,
“এভাবে কথা বলছ কেন রুপু?”
“তুমি হলে দিনকানা। তোমাকে এর থেকেও কড়া কিছু কথা বলা উচিত ছিল। আফসোস মাথায় এলো না। যাইহোক আমার সত্যিই খুব দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি এখন আসি কেমন।”
রুপু অথৈকে নিয়ে চলে গেল।
অথৈয়ের পরীক্ষা যতটা খারাপ হবে ভেবেছিল। ততটা খারাপ হয়নি। বরং ভালো হয়েছে। খুব ভালো হয়েছে। সব প্রশ্ন কমন পড়ায় অথৈ অতি উত্তেজনায় প্রথম পাঁচ মিনিট লিখতেই পারল না। তারপর রকেটের গতিতে হাত চলতে থাকল।
অথৈ পরীক্ষার হল থেকে বের হয়েই দেখল, রুপু কাটা ডাব হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অথৈয়ের মুখে হাসি ফুটে উঠল। রুপু ডাবটা অথৈয়ের হাতে দিয়ে বলল,
“পরীক্ষা কেমন হয়েছে?”
“ভালো হয়েছে।”
“শিগগিরই ডাব খাওয়া শেষ কর। বাবাকে ফোন করে দিয়েছি। বাবা গাড়ি পাঠিয়েছে।”
“তোর শ্বশুরটা খুব ভালো। তাই না দিদি?”
“হুম। সত্যিই ওনার মতো মানুষ হয় না রে।”
“মেয়েদের শ্বশুরবাড়িতে শ্বশুরের থেকেও শাশুড়ীর ভালো হওয়াটা জরুরি বেশি।”
রুপু হেসে ফেলল। বলল,
“আমরা ভবিষ্যতে ভালো শাশুড়ী হবো দেখিস।”
অয়নকে গাড়িতে বসে থাকতে দেখে রুপু বেশ অবাক হলো। বলল,
“তুমি কখন এলে?”
“অনেকক্ষণ।”
“শুধু শুধু এখানে এসেছ কেন?”
অয়ন অথৈয়ের দিকে একপলক তাকাল। রুপুকে বলল,
“তোমরা বাড়িতে নেই। বাড়িটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল। আমার একটুও মন টিকছিল না। তাই চলে এসেছি।”
“তোমার মা জানতে পারলে কিন্তু তোমার খবর আছে অয়ন।”
“মাকে মিথ্যে বলে এসেছি। অযথা প্যারা নিও না। শিগগিরই গাড়িতে উঠে বসো।”
“গাড়িতে উঠে বসব মানে? তুমিও আমাদের সাথে যাচ্ছ নাকি?”
“তোমরা নিয়ে গেলে অবশ্যই যাব। তোমার বাবার বাড়িতে তুমি আমাকে না নিয়ে গেলে তো আর আমি জোর করে যেতে পারছি না।”
“কোনভাবে তোমার মা জানতে পারলে বাড়িতে আবার কিন্তু অশান্তি লাগবে অয়ন।”
“লাগুক অশান্তি। অশান্তি অশান্তিতে সবকিছু তছনছ হয়ে যাক। তোমরা গাড়িতে উঠে বসো তো বউদি।”
রুপুর মনটাই খারাপ হয়ে গেল। রুপুর খুব ইচ্ছে ছিল ফুটপাতে গাড়ি থামিয়ে বাবা-মায়ের জন্য কিছু কিনে নিয়ে যাবে। কেন যেন অয়নের সামনে কিছু দরদাম করে কিনতে ইচ্ছে করছে না। আসলে রুপুর হাতে টাকা খুবই সামান্য আছে। এত অল্প টাকায় মন চাইলেও ভালো কিছু কেনা সম্ভব না।
রুপুদের বাড়ির সামনে গাড়ি থামতেই ওরা একে একে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়াল। অয়ন ড্রাইভারকে ইশারা করতেই ড্রাইভার গাড়ি থেকে একে একে ফল, মিষ্টি, দইয়ের প্যাকেটসহ আরও কী কী যেন নামিয়ে দিল। অয়নের হাতেও ছোটখাটো একটা ব্যাগ দেখা যাচ্ছে। রুপু বেশ অবাক হলো। মনে মনে খুশিও হলো। বলল,
“এতকিছু কখন কিনলে?”
“আমি কিছুই কিনিনি। সবকিছু বাবা পাঠিয়েছে। তোমার পরিবারের জন্য সামান্য কিছু উপহারও বাবা পাঠিয়েছে। এই ব্যাগে আছে। তুমি দিয়ে দিও।”
“বাবা আবার এইসব করতে গেল কেন?”
“বাবার বড়ছেলে প্রথমবার শ্বশুরবাড়িতে না এসেই বউকে মাঝ রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে ফল মিষ্টি সঙ্গে করে নিয়ে চলে গেছে। বাবা সেই নিয়ে দাদার সাথে খুব রাগারাগি করেছে। দ্বিতীয়বার এমন ভুল যেন আর নাহয় তাই তোমার এখানে বেড়াতে আসার কথাশুনে আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছে।”
শ্বশুরের প্রতি কৃতজ্ঞতায় মাথা নুইয়ে গেল রুপুর।
রুপুর বাবা-মা রুপুকে দেখে ভীষণ খুশি। কারণ এবার রুপু আর একা আসেনি। শ্বশুরবাড়ির কাউকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। মেয়েটা সেদিন একা আসায় ওনারা যে কী ভয় পেয়েছিল। সেই ভয় আপাতত কেটে গেছে। ইশ আগে জানলে ভালোমন্দ কিছু রান্না করে রাখা যেত। রুপুর দেবরটাও দেখতে যেমন রাজপুত্রর মতো। তেমন ভালো ব্যবহার। কী আন্তরিক ভাবেই না রুপুর বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলছে। এত বড় ঘরের ছেলে বেড়াতে এসেছে। এই-তো অনেক। আবার নাকি রাতে এখানে থাকবেও। রুপুর বাবা গল্পের ফাঁকে উঠে গেল। বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হবে। এত বেলায় ভালো মাছ পাওয়া যাবে না। তারপরও বাজার ঘুরে দেখা যাক।
রুপুর মা ফল মিষ্টির ব্যাগগুলো একে একে খুলছে। একটা বড় ব্যাগে কিছু একটা নড়াচড়া করছে। রুপুর মা একটু ভয় পেল। বটি দিয়ে ব্যাগের মুখ খুলতেই একটা বিশাল সাইজের কাতলামাছ দেখে ভদ্রমহিলা অভিভূত হয়ে গেল। অতি আনন্দে চোখে জল এসে গেল। এত বড় সাইজের তারতাজা মাছ বহুদিন খাওয়া হয়নি। মাছটার ওজন দশ বারো কেজির কম হবে না।
রুপুর মা ধরে আসা গলায় রুপুর বাবাকে বলল,
“এই শুনছ? এখানে এসে দেখা যাও। মেয়ে আমার কী কাণ্ড করেছে।”
রুপুর বাবা বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে ছুটে এলো। স্ত্রীকে বিশাল বড় সাইজের কাতলামাছ জড়িয়ে ধরে বসে থাকতে দেখে ভদ্রলোক অবাক বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল৷ বিড়বিড় করে বলল,
“এত বড় মাছটা সত্যিই কী তোমার মেয়ের শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঠিয়েছে?”
“তাছাড়া আর কে পাঠাবে।”
“আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম ধৈর্য ধরো। আমার রুপু মা খুব ভাগ্য করে এমন শ্বশুরবাড়ি পেয়েছে। যেমন ভালো ঘর তার তেমন ভালো বর। কী মিলল তো আমার কথা?”
“খুব মিলেছে। ঈশ্বর তুমি আমার মেয়েটাকে সুখে রেখো।”
রুপুর বিয়ে পর্ব ১৯
“আমি একটা রিকশা ডেকে আনি। মাছটা কাটিয়ে আনতে হবে তো।”
“খবরদার না। মাছটা আমি নিজের হাত কাটব। তুমি শুধু একটা বড় বটি জোগাড় করে দাও।”
রুপুর বাবা-মা মাছ কাটা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। রুপু স্নান করতে গেছে। এই সুযোগ অথৈয়ের সাথে দেখা করার। অয়ন বাড়িটা ঘুরে দেখার বাহানায় চট করে অথৈয়ের ঘরে চলে গেল। অথৈয়ের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“কী করো বেয়াইন সাব?”
অথৈ অয়নকে দেখে ঘাবড়ে গেল। ভয় জড়ানো কণ্ঠে বলল,
“আপনি.. আপনি এইঘরে কী করতে এসেছেন?”
