সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭২
তানিয়া হুসাইন
একে একে সবাই কাউন্সিলিং রুম ছেড়ে বেরিয়ে যায়। দরজাটা বন্ধ হতেই চারপাশে নেমে আসে নীরবতা।ইশায়া তখনও ভীরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে।ইচ্ছে করেই ছাড়ছে না সে।মনের ভেতর অদ্ভুত এক ভয় কাজ করছে এখন তার,এই লোকটা যদি এখন তাকে বকে?সে তো চলে এসেছে,কিন্তু এখন? এখন সে কী করবে?
___ভীর কোনো কথাই বলে না।উল্টো, ইশায়ার হাতটা ছাড়িয়ে নেয়।তারপর কাউন্সিলিং রুমের ভেতরে থাকা আরেকটা রুমের দিকে চলে যায়।
পেছনে একটুও তাকায় না।
ইশায়া কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।কি করবে সে চলে যাবে,না থাকবে বুঝতেছে না,রুমের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে অস্থিরভাবে হাঁটে।শেষমেশ আর থাকতে না পেরে সেই রুমের দিকেই এগিয়ে যায়।
ভীর বসে আছে টেবিলের সামনে।ল্যাপটপ খোলা, চোখ দুটো স্ক্রিনে স্থির।
পুরো মনিটরিং রুমের সামনে বিশাল একটি স্ক্রিন তাদের বেডরুম, ব্যালকনি, করিডর প্রত্যেকটা অ্যাঙ্গেলের লাইভ ফুটেজ চলছে।এটা কেনো ইশায়া বুঝে না।
ইশায়া অনেকক্ষণ ধরে সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে।
পরক্ষনে আবার ভাবে তার স্বামী তাকে চোখে হারায় এজন্য-ই হয়তো।মুখে না বললেও সে তো জানে তাকে কতোটা ভালোবাসে এই লোক।
আর কতটা সুরক্ষিত সে তার চারপাশে সবটা চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
ভীর তখনও ল্যাপটপে কাজ করে যাচ্ছে।
ইশায়া ধীরে ধীরে ভীরের সামনে ঘুরঘুর করতে থাকে।
তার দিকে ভীরের নজর ঘোরানোর জন্য।একবার ডানদিকে, একবার বাঁদিকে।
যায়, অন্তত একবার সে তাকাক দেখুক সে শাড়ি পড়েছে তার পছন্দের রঙের।
কিন্তু না।ভীর একবারও চোখ তোলে না।একবারও না।ইশায়ার বুকটা ভারী হয়ে আসে।মনটা খারাপ হয়ে যায়।হয়তো সে খুব চিন্তিত আছে কোন বিষয় নিয়ে।
কিন্তু ইশায়া এসব কিছুই বোঝে না।ভীরের চোখের গভীরতা, তার রাগ, তার মাথার ভেতরে কি চলছে কিছুই না।সে ধীরে ধীরে ভীরের কাছে এসে দাঁড়ায়।
ল্যাপটপে ঠিক কী নিয়ে এত ব্যস্ত, ইশায়ার কোনো ধারণাই নেই।সে তাকায় কিন্ত কিছুই বোঝে না।
হঠাৎ করেই ইশায়া
এক মুহূর্তের মধ্যে ভীরের কোলে উঠে বসে, গলা জড়িয়ে ধরে।
ভীর দ্রুত ইশায়াকে ধরে ফেলে,সে পড়ে যাবে বুঝেই। ঠান্ডা চোখে তাকায় ভীর ইশায়ার দিকে।
ইশায়া তাকায় না।
কারণ সে জানে এই লোকটা এখন তাকে চোখ দিয়ে ভয় দেখাবে।কীভাবে তাকাবে সেটা সে খুব ভালো করেই জানে।
___ভীর কোনো কথা বলে না। ইশায়ার পা ধরে তাকে ঠিক করে বসিয়ে দেয়।
তারপর আবার কাজে মন দেয়। ভীষণ ব্যস্ত সে আজ।
তার অনেক লোক মারা পড়েছে।যতক্ষণ না ওদের শেষ করবে, ভীরের মাথা ঠান্ডা হবে না।শান্তি ও পাবেনা।ওরা তার সব বিজনেস ডিল নষ্ট করছে।
ভীরের প্রতিটা মুভ, প্রতিটা রুট সব ইনফরমেশন চলে যাচ্ছে শত্রুপক্ষের হাতে।
এখন শেষ মুহূর্তে সবকিছু চেঞ্জ করতে হবে।
এটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় ডিলগুলোর একটা।
নতুন অ*স্ত্র।সব ডিলারদের কাছে সময়মতো পৌঁছাতে হবে।এই কাজেই ডুবে আছে ভীর।ভীরকে আবার কাজে মন দিতে দেখে ইশায়া মাথা তুলে।
তাকিয়ে থাকে তার দিকে একদৃষ্টিতে।পলক পরে না ইশায়ার,খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ভীরকে।এই দেখার স্বাদ যেন তার জীবনে কোনোদিনই ফুরোবে না।ইশায়ার এমন আচরণে ভীর অভ্যস্ত।
তিন মাসে সে এমন হাজারটা দৃশ্য দেখেছে।
হঠাৎ ইশায়ার চোখ পড়ে ভীরের গলার কাছে থাকা ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজে।
সে নিজেই খুলে নেয় সেটা।
লাল হয়ে থাকা জায়গাটায় আঙুল বুলাতে থাকে ইশায়া ধীরে অদ্ভুত মায়ায়।
ভীর সব-সময় ইশায়া সারা শরীর লাল করে ফেলে কামড়ে।
ইশায়া অভিযোগ করলে ভীর শুধু বলে,
__এটা ভালোবাসা।
তাহলে সে কি কম ভালোবাসে নাকি তার বরকে?
না,সে তো আরও বেশি ভালোবাসে।তাই সে আরও জোরে দিবে কামড় একেবারে দাগ করে ছাড়বে।তার ভালোবাসাই বেশি।এই লোকতো বাইরে গেলেই তাকে ভুলে যায়।আর কাছে আসলেই মুখ বাকায় ইশায়া।
ইশায়ার বারবার এমন করার কারণে ভীরের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে।সে গম্ভীর গলায় বলে ওঠে,
___কাজ করছি আমি।
ডিস্টার্ব করো না।নাহলে এখান থেকে বের করে দেবো।
ইশায়া মুখ বাঁকায়।
থামে না।ভীর কেন এভাবে ঢেকে রেখেছে জায়গাটা সে বুঝতে পারে না।
বাইরের মানুষকে কী বোঝাতে চায়?সে কি সিঙ্গেল?
ইশায়ার রাগ লাগে ভীরের এমন কাজে।
তারপর লাল হয়ে থাকা জায়গাটায় চুমু খায়।
একবার।দুইবার। তিনবার।
ভীরের শরীর হঠাৎ কেঁপে ওঠে।ইশায়ার এমন কাণ্ডে।
কিন্তু ইশায়া থামে না।
চুমু খাওয়া জায়গাটাতেই আবার দাঁত বসিয়ে দেয়।
হালকা হয়ে যাওয়া দাগটা আবার গাঢ় হয়।আ
আর সেটা দেখে ইশায়া খুশি হয়।
অদ্ভুত এক বিজয়ের হাসি ফুটে ওঠে তার ঠোঁটে।
ভীর হঠাৎ শক্ত গলায় বলে ওঠে,
___ইশায়া।
আমাকে কাজ করতে দাও।
আমি ধরলে এখন ছাড়বো না।
মাথা এমনিতেই চড়ে আছে আমার।
তার কণ্ঠে চাপা রাগ, জমে থাকা আগুন।
সবসময় তুই আমাকে উসকাস।আর তারপর নিজেই কান্নাকাটি জুড়ে দিস।আজ আমাকে বিগড়াবি,পরে কিন্তু মরে গেলেও ছাড়বো না, মনে রাখিস।
ভীরের এই হুমকিতে ইশায়া সত্যিই দমে যায়।
এই লোকটার সবকিছুই ভয়ংকর।
হ্যাঁ, এটা ঠিক সে এই লোককে ছাড়া থাকতে পারে না।একটু দূরে গেলেই পাগল হয়ে যায়।কিন্তু তার থেকেও বড় সত্য।এই লোকটাকে সামলানোর ক্ষমতা তার নেই।ভীর ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে কতটা ডেস্পারেট হয়ে ওঠে,
ইশায়া সেটা খুব ভালো করেই জানে।সে বাধা দিতে গেলে।এই অসভ্য লোকটা উল্টো তার হাত বেঁধে দিতেও পিছপা হয় না।ভীরের হুমকিতে কাজ হয়।
ইশায়া দমে যায়।আর কোনো কথা বলে না।
কোনো দুষ্টুমি না।চুপচাপ গুটিয়ে বসে থাকে ভীরের কোলে, বুকে মাথা গুজে একটা ভীত, আজ্ঞাবহ বিড়ালের মতো।কিন্তু এই চুপচাপ থাকা ইশায়ার স্বভাবের বিরুদ্ধে।সে যতই ভয় পাক,
তার ভেতরের অস্থিরতা চুপ করে বসে থাকতে জানে না।মিনিট দশেক সে শান্ত থাকে।ভীরের বুকের সাথে মাথা ঠেকিয়ে বসে থাকে নিঃশব্দে।
তারপর ধীরে ধীরে আবার শুরু হয় ইশায়ার ছটফট।
পা নড়াচড়া।আঙুলের অকারণ নড়াচড়া।
চোখে আবার সেই কৌতূহল, সেই দুষ্টুমি।
ভীরের একটু আগের কথাতার কড়া হুমকি কিছুই আর তার মাথায় নেই।ইশায়া তো ইশায়াই।ভয় পায় কিন্তু বেশিক্ষণ না।
ভীর নিজেকে শক্ত রেখে কাজ করে যাচ্ছে এই ডিলটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ।একটা ভুল মানে অনেক কোটি টাকার লস।তবু ইশায়া এই একটা মানুষ তার সব হিসাব এলোমেলো করে দেয়।এই মেয়েটা বরাবরই তাকে দিশেহারা করে তোলে আজও তার ব্যতিক্রম নয়।
স্ক্রিনের অক্ষরগুলো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসে।
ভীর দশ মিনিট নীরব থাকে।আবারো কাজে মন দেয়,
কিন্তু পারে না শুরু হয় এই অদ্ভুত ছটফটানি।
চোয়াল শক্ত করে ভীর।নিশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে তার।
সে আর তাকায় না স্ক্রিনে।ভীর ল্যাপটপের ঢাকনা নামিয়ে দেয়।ফোনটা তুলে নেয়।
নিকের নাম্বারে কল করে,
…লোকেশন আমি চেঞ্জ করে দিয়েছি, ডিলারের সাথেও কথা হয়েছে। বাকি যা আছে দেখে নিও। আর এটা যেন বাইরে কোথাও লিক না হয়। এখন কাউকে জানানোর প্রয়োজন নেই।ভীরের কণ্ঠ ঠান্ডা,
ইশায়া ভীরের সব কথা শুনে।
ভীরের কাজ শেষ হতে দেখে সে কোল থেকে নামতে চায়।ঠিক তখনই ভীর শক্ত হাতে ইশায়ার কোমর চেপে ধরে।পালানোর সুযোগ নেই।
নিকোর সাথে কথা শেষ করে ফোন রাখে ভীর।
তারপর ঠান্ডা চোখে ইশায়ার দিকে তাকায়।
___বলেছিলাম না?
বলতে বলতেই ভীর ইশায়ার ঠোঁট জোড়া আকড়ে ধরে গভীরভাবে।তির তির করে কেঁপে ওঠে ইশায়া।
ভীরের হাতের চাপ জড়ালো হয়ে ওঠে।ইশায়া গোঙায় ভীর ছাড়ে না।দাঁত বসে যায় ইশায়ার নরম ওষ্ঠে।
এতক্ষণকার রাগ, জেদ, দমন করা অস্থিরতা সবকিছু যেন এখন বের হয়ে আসছে ইশায়ার মাঝেই।
ইশায়ার দম বন্ধ হয়ে আসে দেখে ভীর ছাড়ে।
ইশায়ার চোখে ভয়।
কিন্তু তার থেকেও বেশি আছে টান।এই লোকটার দিকে তাকিয়ে সে বরাবরই নিজের ক্ষতি ডেকে আনে সে জানে, তবু থামতে পারে না নিজেকে।ভীর হাত বাড়ায়।ইশায়ার চিবুকের নিচে আঙুল রাখে।
ইশায়ার শ্বাস কেঁপে ওঠে।
সে চোখ নামিয়ে নেয়।
এই মানুষটা কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে সে খুব ভালো করেই জানে।
ভীর ইশায়ার কপালে তার কপাল ঠেকায়।
নিশ্বাসে নিশ্বাস মিশে যায়।
কথা নেই শুধু ভারী অনুভূতির চাপ।
__আমাকে পাগল করিস,
ভীর ফিসফিস করে বলে,
আর তারপর ভয় পাস।
ইশায়া চোখ বন্ধ করে নেয়।তার হাত ভীরের শার্টের মুঠো চেপে ধরে।ভীর আর এক সেকেন্ডও নিজেকে ধরে রাখতে পারে না।এক হাতে টেবিলে থাকা সব জিনিসপত্র অস্থিরভাবে সরিয়ে ফেলে।তারপর ইশায়াকে কোলে নিয়েই উঠে দাঁড়ায়।ইশায়াকে টেবিলের ওপর বসিয়ে ভীর এগিয়ে যায় সামনে।
অফিস রুমের দরজা বন্ধ করতে করতেই ইশায়া হকচকিয়ে বলে ওঠে,
__দেখুন।
ভীর থামে না।
___ওয়েট করো দেখতেছি।
ইশায়া টেবিল থেকে নেমে যায়।
নিজের কপাল চাপড়াতে থাকে।কেনো মরতে এসেছে সে এখানে?এই লোকটার হাত থেকে এখন কোথায় পালাবে সে?
_______ইশায়া নিচু স্বরে বলে ওঠে,
এটা আমাদের রুম না।
ভীর ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে
কোট খুলে সে, কণ্ঠে সেই চেনা হেয়ালি,
___So what?
ইশায়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। অসহায় কণ্ঠে আবার ডাকে,
___ভীর…
___কি বলো?
___ এরকম করবেন না। এখানে না।
কণ্ঠটা আরও ছোট হয়ে আসে।
___কি করবো না।
ভীরের সোজা জবাব।
আগে মনে ছিলো না
কথাটা শেষ হতেই ইশায়া মুখ ছোট করে ফেলে।
তার কিছুই মনে থাকে না এই লোককে ছাড়া সে কিছুই বোঝে না।
শুধু ভীরের উপস্থিতিটাই চায় সে এটাই তাকে শান্তি দেয়।
ভীর এগিয়ে এসে ইশায়ার কোমর জড়িয়ে ধরে, আদুরর স্পর্শে।
ইশায়া অসহায় কণ্ঠে বলে,
___আর আপনাকে জ্বালাবো না… একদম ভালো হয়ে যাবো, সত্যি।
ভীর ইশায়ার কপালে চুমু খায়,তারপর নিচু গলায় বলে,
___এখানে কেন এসেছো? আর যেন দেখিনা। যেখানে আমি তোমাকে দুনিয়ার সবার থেকে আড়ালে রাখি, সেখানে তুমি অন্য পুরুষের সামনে কেন এলে?
কথার শেষে ঠোঁটের তিলে চুমু খায় ভীর।
আজকেই শেষ। এরপর যেন এরকম কিছু না দেখি।
ইশায়া মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝায়। কথা বলার শক্তি তার নেই।
ভীর বুকে জড়িয়ে নেয় তাকে। দুজনের নিশ্বাসের গভীরতা বাড়ে।
ভীর আবার ইশায়ার ঠোঁটে ঝুঁকে পড়ে,ইশায়া নিজেই ভীরের গলা জড়িয়ে ধরে, সে নিজেকে সামলাতে পারছে না।
ভীরের হাত পৌঁছায় তার উন্মুক্ত অবয়বে।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭১ (২)
ভীর ঠোঁট থেকে গলায় নেমে আসে, অস্থির হয়ে ওঠে।
ইশায়ার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে পিছিয়ে যায়।
পিছোতে পিছোতে ডিভানের কাছাকাছি এলে ইশায়াকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে সেখানে।
আর তারপর দুজন হারিয়ে যায় একে অপরের মাঝে শব্দহীন, তীব্র, দমবন্ধ করা এক আবেশে।
