সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৪
Raiha Zubair Ripti
মুনতাহার নাকের ফোলা আর ব্যথা ভাব টা অনেকাংশেই কমে গিয়েছে। দুপুরের দিকে মনোয়ারা মির্জা আসলেন তার রুমে। তখন সে পড়ার টেবিলে বসে পড়ছিলো। মনোয়ারা মির্জা এসে বিছানায় বসলেন। মুনতাহা তাকে দেখে বই বন্ধ করে তার দিকে ফিরে সালাম দিলো। মনোয়ারা মির্জা সালামের জবাব দিয়ে বলল-
“ হুনলাম সিকান্দার আজ অর্নব রে পিডাইছে।”
মুনতাহা মাথা নাড়িয়ে ছোট্ট করে বলল-
“ হুমম। ”
“ কিয়ের লাইগা পিডাইছে? ”
মুনতাহা চুপ হয়ে গেলো। এসব বলা যায় নাকি? মনোয়ারা মির্জা একটু বাহিরে হাঁটতে গেছিলো। বাড়ি ফিরেই শুনে বড় নাতি ছোট টাকে চড়িয়ে গাল ফুলিয়ে দিছে। মুনতাহার বাহু টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল-
“ এত দূরত্ব ক্যান এখনো তোমাদের মাঝে? আমার নাতি ডা তোমারে ভালোবাসে তুমি বুঝো না? নাকি তুমি ভালোই বাসো না আমার নাতিডারে? ”
মুনতাহা সাথে সাথে মাথা উঁচু করে তার দিকে তাকালো।
“ বাসি আপনার নাতি কে। ”
“ তাহলে কাছে আসতে দাও না কেনো? আর কত এমনে বের হবা রুম থেকে? দৃষ্টি কটু দেখায় না? ঐ হারামজাদা পর্যন্ত খেয়াল করছে তোমারে। ও তো ভেবেই বসে আছে তুমি আমার নাতির লগে সুখে নাই। সেজন্য তোমরা বৈবাহিক সম্পর্কের দিকে আগাচ্ছ না। ”
মুনতাহার এবার লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে। বিয়ের পরও যে এসবের সম্মুখীন হতে হবে এটা কখনোই তার ভাবনার আশেপাশেও ছিলো না। কেউ সিকান্দার কে প্রশ্ন করছে না। সবাই মুনতাহা কে চেপে ধরে শুধু। মুনতাহা এজন্য এবার বলেই বসলো-
“ দাদিজান আপনার নাতি আসতে না চাইলে আমি কি করবো? আমি কি এখন মেয়ে হয়ে তাকে এসব করতে জোর করবো? বিষয়টা আমার জন্য লজ্জার না? আপনি আমাকে না বলে আপনার নাতিকে বলুন। সে আসতে চাইলে আমি মোটেও বাঁধা দিব না। আমিও চাই আমাদের মধ্যে সুস্থ স্বাভাবিক বৈবাহিক সম্পর্ক হোক। যদিও সুস্থ স্বাভাবিকই আছে। তারপরও আপনাদের কাছে বিয়ে মানেই আগে সেসব,ভেজা চুলে বের হওয়া। তারপর বাকি সব। কিন্তু আপনার নাতির কাছে বাকি সবই আগে। তারপর ভেজা চুলের কাহিনি। ”
“ ওয় তো একটা নিরামিষ। জীবনে মাইয়া গো লগে কথা কইছে নাকি। তাড়াতাড়ি তোমাদের মধ্যেকার সব কিছু ঠিকঠাক করে সুখবর শোনাও। দরকার পরলে কোথাও ঘুরতে যাও। বেডা মানুষ কেমনে যে এতদিন বউ ছাড়া থাকে তা আমার নাতিডারে না দেখলে জানতেই পারতাম না। ওয় আসুক আজকে। ”
মনোয়ারা মির্জা একটা শপিং ব্যাগ মুনতাহার হাতে। বলল-
“ আমার নাতির সামনে পড়বা। দেখবা ব্যাডা আর নিজেরে দূরে রাখতেই পারবে না। ”
আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে চলে গেলো। মুনতাহা শুনলো। বিষয়টা ভীষণ ইমব্যারেস্ট। যদিও তাদের দিক থেকে তারাও ঠিক। আবার মুনতাহারাও তো ঠিক। তাদের আলোচনায় বসা উচিত এটা নিয়ে শীগ্রই। মুনতাহার তো সমস্যা নেই এসবে। অনেক সময় পেয়েছে সে। আর চায় না সময়। তারপর হাতে থাকা ব্যাগটা খুলতেই তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। উনি বুড়ি হলেও মনে মনে এত কিছু নিয়ে ঘুরে! শপিং ব্যাগটা নিয়ে আলমারি তে তুলে রাখলো।
ভার্সিটি তে মুনতাহা না আসায় ইলা আজ মনমরা হয়ে অনেক কষ্টে তিনটে ক্লাস করলো। তারপর আর থাকতেই পারলো না। বাবা কে ফোন করে জানালো তার ভীষণ মাথা ব্যথা করছে। বাড়ি যাবে। তার বাবা চলে যেতে বললো। ইলা ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বের হলো। কার্জন হলের গেট পেরিয়ে রাস্তা পার হয়ে ওপাশে গিয়ে হাঁটতে লাগলো। রাস্তা ঘেঁষে অনেক কুটি শিল্পের দোকান। ইলা সেগুলো দেখে হাঁটতে হাঁটতে আচমকা সামনের দিকে তাকাতেই দেখলো অনেকগুলো লোকজন মিলে দৌড়ে যাচ্ছে। ইলা ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়ার ভয়ে দোকানের ভেতরে ঢুকতে যাবে আর তখনই দোকান গুলোও বন্ধ করা শুরু করলো দোকানদার রা। ইলা জিজ্ঞেস করলো-
“ কি হয়েছে মামা? এভাবে সবাই দৌড়াচ্ছে কেনো? ”
দোকানদার তার দোকান বন্ধ করতে করতে বলল-
“ দোয়েল চত্বরে খুনাখুনি হচ্ছে আপা। ছাত্র লীগ আর ছাত্রদল। অবস্থা অনেক ভয়াবহ। রাস্তা পুরা নাকি রক্তে লাল হয়ে গেছে। আপনি এনে থাইকেন না। যান বাড়ি চলে যান। ”
ইলার ব্যাগে থাকা ফোনটা বেজে উঠলো সেই সময়। ইলা ফোন টা বের করে দেখলো তার বাবা ফোন করেছে। ফোনটা রিসিভ করতে যাবে এমন সময় সামনে আসা কয়েকজন লোকের ধাক্কায় ফোনটা হাত থেকে পরে গেলো। কোনো রকমে ফোনটা উঠিয়ে দেখলো ফোন বন্ধ হয়ে গেছে। অন করার চেষ্টা করলেও অন হচ্ছে না। তার বাবা নিশ্চয়ই এই ঝামেলার খবর শুনেই ফোন করেছিল। এখন কি হবে?
ইলা দুশ্চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাসাতে যেতে হলে তো দোয়েল চত্বরের ওদিক দিয়েই যেতে হবে। তার বাবা তো বিজনেস ফ্যাকাল্টির ওখানেই।
দোকানদার এখনো ইলাকা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বলল-
“ কি হলো আপা যান না কেন? এনে থাকলে তো মরবেন। ”
“ মামা আমার বাড়ির রাস্তা তো ওদিকে। ”
“ হায় হায়,ওদিকে তো যাওয়া যাচ্ছে না। কি করবেন তাইলে এখন? আমি বরং আসি আপা। ”
দোকানদার রা চলে যেতে লাগলো। বোকা ইলা এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো। আচমকা একটা বাইক এসে থামে তার সামনে। মাথায় হেলমেট। ভারী গলায় বলল-
“ মিস ঢিলা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুটিং দেখছেন নাকি? আমিও দেখে আসলাম। লো বাজেটে হাই লেভেলের একটা কিলিং সিন ছিলো। পর্দায় দেখার চেয়ে লাইভে দেখার ক্রিভিংসই আলাদা। আমি ১০ এ ১০ রেটিং দিয়ে আসছি। ”
হুট করে খুবই পরিচিত এক গলার স্বর শুনে ইলা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। মাথায় হেলমেট থাকায় মুখ দেখতে না পাওয়ায় চিনতে পারলো না।
“ কে আপনি ভাই? চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু চিনতে পারছি না। ”
নাদিম হেলমেটের গ্লাস টা চোখের সামনে থেকে উঠিয়ে বলল-
“ কেউ একজন আমাকে ডাকে জাউরা বেডা। ডু ইউ রেকগনাইজ দ্যিস সার নেম?”
ইলা চোখ দুটো দেখে চিনে ফেললো।
“ আপনি এখানে কেনো? ”
“ ঘুরতে আসছিলাম। আসুন বাইকে নিয়ে ঘুরি আপনাকে। ঘুরবেন? ”
“ আপনার বাইক আর আকাশে উড়া রকেট সেম। মরার ইচ্ছে নেই। ”
“ আমার বাইকে উঠে মরতে চান না। কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে থেকে মানুষের দৌড়ানি আর পায়ের নিচে চাপা পড়ে ঠিক মরতে চান। হায়রে বাঙালি। এদের ভালো করতে নেই। ”
নাদিম বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে যেতে নিলে ইলা বলে উঠে-
“ দাঁড়ান দাঁড়ান। কি আশ্চর্য আমাকে রেখে যাচ্ছেন কেনো। আমাকে বিজনেস ফ্যাকাল্টির সামনে নামিয়ে আসুন। ”
“ ওখানে কেনো?”
“ আব্বু ওখানে আছে। ”
“ উঠে বসুন তাহলে। ”
ইলা উঠে বসলো। নাদিম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাকে নিয়ে সেইফলি নিয়ে গেলো বিজনেস ফ্যাকাল্টির সামনে।
ইলার বাবা ইকরাম ফরিদ মেয়ের চিন্তায় কার্জন হলের দিকেই যেতে নিচ্ছিলেন। কিন্তু মেয়ের ডাক শুনে থেমে যান। নাদিমের বাইক থেকে নেমে ইলা বাবার কাছে যায়। মেয়েকে দেখে যেন প্রাণ ফিরে পান দেহে। ভ্রু কুঁচকে বাইকে থাকা ছেলেটাকে দেখিয়ে বলল-
“ ওটা কে?”
ইলা নাদিম কে দেখিয়ে বলল-
“ মুনতাহার বড় ভাই। বলেছিলাম না তোমাকে? ”
“ ওহ চিনতে পেরেছি। চলো এখন বাসায় চলো। তোমার মা অস্থির হয়ে গেছেন। তোমার ফোনের কি হয়েছে?”
“ হাত থেকে পরে নষ্ট হয়ে গেছে বাবা। অন হচ্ছে না আর। ”
ইকরাম ফরিদ মেয়েকে নিয়ে চলে গেলেন। নাদিম হতবিহ্বল হয়ে গেলো। কি আশ্চর্য একটা ধন্যবাদ ও দিলে না! অকৃতজ্ঞ বাপ বেটি। থাকতো পরে। কি দরকার ছিলো বাইকের তেল খরচ করে নিয়ে আসার? তেলের টাকা কে দিবে এখন? ওর মাস্টার বাপ? সে তো ফিরেও তাকালো না।
সিকান্দার সেলিম মির্জার দেশ সেরা অফিসটাকে কয়েক দিনের ভেতরই একদম পুরোপুরি বদলে ফেলেছে। মেয়েরা এখন নামাজ পড়তে যেন অসুবিধা না হয় এমন পোশাক পড়ে আসে। লাঞ্চ টাইমে নামাজ শেষে খাওয়াদাওয়া করে যেটুকু সময় থাকে সেই সময় টুকু কর্মচারী রা নামাজ ঘরে বসে কিতাব পড়ে না হয় গল্প গুজব করে সিকান্দারের সাথে। তারা সিকান্দারের থেকে ইসলামে অনেক কিছু জানতে পারে। যা এতদিনেও হয়তো তারা জেনে উঠতে পারে নি। অফিস টাইম শেষ করে ফেরার পথে নিজের অফিসে ডাকলেন সেলিম মির্জা। রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে দেশ জুড়ে। আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন পর্যন্ত হয়েছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের ও ঘোষণা আসতে পারে। সিকান্দার চেয়ার টেনে বসতেই সেলিম মির্জার ভাবনায় ফাটল ধরলো। নড়েচড়ে বসে বলল-
“ তুমি আমার ভীষণ আদরের ছেলে সিকান্দার। ”
সে কথা কানে আসতেই সিকান্দারের মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠলো।
“ তারপর? ”
“ আমি চাই না তুমি বিপথগামী হও। ”
“ আমি বিপথগামী? ”
“ হুমম। ”
“ আমি আজীবন এই বিপথগামী হয়েই থাকতে চাই তবে। ”
“ আমি বাবা হয়ে সেটা চাই না। ”
“ কখনো ডেকেছি আপনাকে? ”
“ সেজন্য আফসোস হয় আমার। আমার বড় ছেলে আমাকে আজ পর্যন্ত বাবা বলে ডাকলো না। ”
“ ডাকার মতো কোনো কাজ আপনি করেছেন আজ পর্যন্ত? কি জন্য ডেকেছেন বলুন। বাড়ি ফিরবো আমি। আমার স্ত্রী অপেক্ষায় আছে আমার। ”
“ তুমি আমার বাধ্য হয়ে যাও সিকান্দার। আমার সব সম্পত্তি টাকা পয়সা তোমার নামে করে দিব,কথা দিচ্ছি। ”
“ এসব দিয়ে সিকান্দার কে কিনতে চাইছেন? তাহলে সরি টু স্যে পারবেন না। আমি বরং উঠি। ”
সিকান্দার চলে গেলো। সেলিম মির্জা হাত শক্ত করে ফেললেন। পকেট থেকে ফোনটা বের করে তান্ত্রিক কে ফোন করে বললেন-
“ কাজ কতদূর আগালো আপনার? আর কত সময় নিবেন? ”
ওপাশ থেকে তান্ত্রিক বলল-
“ আপনার ছেলের ইমান অনেক মজবুত। প্রতিদিন সকাল রাতে রুকইয়াহ করে। ”
“ সেটা আবার কি জিনিস? ”
তান্ত্রিক বিরক্ত হলো। এটা অর্থ নাকি জানে না!
“ আপনার ছেলে প্রতিদিন নামাজ শেষে সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, সুরা ইখলাস, ফালাক, নাস পড়ে ফুঁ দিয়ে পানিতে পড়ে পান করে। বুঝেছেন? জ্বিন কে আমি পাঠাই আপনার ছেলের কাছে কিন্তু সে আপনার ছেলের ধারে কাছেও যেতে পারে না। কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলেই উল্টা জ্বিন নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রেগে যাচ্ছে। আমার অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা করছে। সরাসরি জ্বিন দিয়ে কিচ্ছু করা যাবে না। আপনার ছেলে ভুলেও এক ওয়াক্ত নামাজ মিস দেয় না। আমি মিষ্টি পড়ে দিচ্ছি। ওটা আপনার ছেলেকে খাওয়ানোর চেষ্টা করুন। দেখুন দূর্বল হয় কি না। তা না হলে আশা ছেড়ে দিন ছেলের। ছেলের বউকে দিয়ে তাহলে করতে হবে। ”
“ না না ছেলের বউকে করা যাবে না। ছেলে তাহলে বুঝে যাবে। তখন উল্টো আরো বিপাকে পড়তে হবে। জ্বিন কি সর্বদা ওর আশেপাশে থাকছে? ”
“ হ্যাঁ সিকান্দারের আশপাশেই থাকছে। একটা সুযোগ পেলেই চেপে ধরবে। ”
“ আচ্ছা বেশ মিষ্টি পাঠানোর চেষ্টা করুন। ”
সেলিম মির্জা ফোন কেটে উঠে চলে গেলেন। সিকান্দার বাড়ি ফিরে ঘরে ঢুকেই সর্বপ্রথম তার চোখ দুটো খুঁজে বেড়ায় স্ত্রী কে। আজও তার ব্যতিক্রম হয় নি। বউকে খুঁজতে গিয়ে সে আবিষ্কার করলো বউয়ের চুপসানো মুখ। বউ হাসলো না তাকে দেখে। মন খারাপ? আবার কি কিছু হয়েছে? হাতের কোট টা সোফায় ফেলে গলার টাই টা ঢিলে করতে করতে এগিয়ে এসে বউয়ের পেছনে দাঁড়ালো।
“ মন খারাপ আপনার? ”
মুনতাহা জবাব দিলো না। মুখ ফিরিয়ে নিলো। সিকান্দার হাত দিয়ে তার মুখটা নিজের দিকে ফিরিয়ে বলল-
“ বলুন না মন খারাপ?”
মুনতাহা সিকান্দারের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল-
“ আপনি খারাপ। ”
সিকান্দারের কপাল কুঁচকে আসলো।
“ সত্যি আমি খারাপ?”
মুনতাহা ঠোঁট কামড়ে চুপ করে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপর বলল-
“ উঁহু। আপনি ভালো। আমিই খারাপ। ”
“ আপনি আমার থেকেও ভালো। ”
“ মিথ্যা বলবেন না তো। আমার আজ মন ভালো নেই। ”
“ আমি মিথ্যা বলি না কিন্তু ম্যাডাম। বলুন মন ভালো নেই কেনো আপনার?”
“ আমি কিছু চাইলে আপনি দিবেন?”
“ চেয়েই দেখুন না শুধু। ”
মুনতাহা সিকান্দারের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল-
“ আ…আমার বাচ্চা চাই। ”
কথাটা শুনে শব্দ করে হেঁসে ফেললো সিকান্দার। মুনতাহা রাগী চোখে তাকালো। সিকান্দার গাল টেনে বলল-
“ আপনি নিজেই তো একটা গুলুমুলু আদুরে বাচ্চা। দাদিজান আবার আপনাকে এসব বিষয় নিয়ে কথা শুনিয়েছে? বুঝি না দাদিজান এমন করছে কেনো। ”
“ ভুল কিছু বলে নি। আমাদের এখন সম্পর্ক টাকে নিয়ে আগানো উচিত। ”
“ সম্পর্ক নিয়ে পিছিয়ে আছি আমরা?”
“ পিছিয়ে নেই? ”
সিকান্দার তাকালো মুনতাহার দিকে। ঠাণ্ডা গলায় বলল-
“ আপনি প্রস্তুত আমাকে সামলানোর জন্য? ”
“ প্রস্তুত অপ্রস্তুতের এত কিছু বুঝি না আমি। আপনার দাদি আমাকে আজ কি দিয়েছে জানেন?”
“ কি? ”
মুনতাহা এগিয়ে গিয়ে আলমারি থেকে সেই শপিং ব্যাগটা খুলে লাল রঙের একটা ড্রেস দেখিয়ে বলল-
“ এটা দিয়ে গেছে। বলছে শুয়ামির সামনে পড়বা। দেখবা শুয়ামি আর দূরে দূরে থাকবে না। আসবো পড়ে? বলুন আসবো? ”
সিকান্দার চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। তারপর এগিয়ে এসে নাইট ড্রেস টা শপিং ব্যাগে ভরে বলল-
“ প্লিজ ডোন্ট ডু দ্যিস মন। আমি আপনার পরিস্থিতি টা বুঝতে পারছি। আপনার এই পরিস্থিতির জন্য আমিই দায়ী। আমি আমার দোষ স্বীকার করছি। দাদিজান কাজটা মোটেও ঠিক করেন নি। কিন্তু আমার তো আপনার দিকটাও বুঝতে হবে। ”
“ আমি তো আপনাকে অনুমতি দিচ্ছি। আমি নিজেই চাচ্ছি এখন। আপনার উচিত এগিয়ে আসা। ”
“ আচ্ছা আমরা আগাবো। আজান দিয়েছে। ফ্রেশ হয়ে আসি? খাবেন না রাতে? ”
“ না খাব না। ”
“ নামাজ ও পড়বেন না?”
“ পড়বো। ফ্রেশ হয়ে আসুন। ”
সিকান্দার ফ্রেশ হয়ে ওজু করে আসলো। মুনতাহও ওজু করলো। দুজনেই নামাজ ঘরে গিয়ে এশার নামাজ আদায় করলো। নামাজ শেষে সিকান্দার রেণু কে খাবার টা দিয়ে যেতে বলে দাদির রুমে গেলো। তার দাদি তখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছিলো। সিকান্দারের আসা দেখেই টিভিটা বন্ধ করে দিলো। সিকান্দার গিয়ে দাদির পায়ের কাছটায় বসে খুবই ঠাণ্ডা গলায় বলল-
“ আপনি আজ আমাকে খুবই ডিসঅ্যাপয়েন্টেড করেছেন দাদিজান। আপনার থেকে এমনটা আমি কখনোই আশা করি নি। কারো পার্সোনাল বিষয় নিয়ে কথা বলাটা কতটা যৌক্তিক আপনাদের কাছে আমি জানি না। জানতেও চাই না। আপনি আমার স্ত্রী কে আর ওসব দিবেন না। কাকে দিয়ে কিনিয়েছেন ওটা? নিশ্চয়ই সিমরান কে দিয়ে। আপনি জানেন তো আমি কেমন মাইন্ডের? আমাকে সিডিউস করার জন্য আমার স্ত্রীর অশালীন পোশাক পড়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের কে আমাদের মতো থাকতে দিন। আমি একটু শান্তি চাই। আপনার ছেলে আমাকে অশান্তি দেয়। এখন যদি আপনিও এমন টা শুরু করেন তাহলে সত্যি আমাকে বাড়িটা ছাড়তে হবে। ”
মনোয়ারা মির্জা চুপ হয়ে গেলেন নাতির কথা শুনে। সিকান্দার উঠে আসার সময় ফের বলে আসলো-
“ আশা করছি আপনি আর কখনো মুনতাহাকে বা আমাকে ইমব্যারেস্ট ফিল করাবেন না। আমরা দুজনই অ্যাডাল্ট। আমরা সবই জানি আমরা সবই বুঝি। আমাদের প্রাইভেট বিষয় প্রাইভেট থাকতে দিন। ”
সিকান্দার চলে গেলো। রুমে এসে দেখলো মুনতাহা রুম অন্ধকার করে ড্রিম লাইট টা অন করে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। সিকান্দার এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। কাঁধে থুঁতনি ঠেকিয়ে বলল-
“ খাবেন না? ”
“ উঁহু খিদে নেই। ”
“ খাবার খেয়ে শক্তি না জোগালে আমাকে সামলাবেন কি করে ম্যাডাম? ”
“ মানে? ”
“ মানে….” সিকান্দার পাঁজা কোলে তুলে নিলো মুনতাহাকে। বিছানার দিকে নিয়ে যেতে যেতে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল-
“ বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শায়ত্বানা ওয়া জান্নিবিশ শায়ত্বানা মা রাযাক্বতানা। মানে বুঝেন এই দোয়ার? ”
মুনতাহা বুঝলো না। সিকান্দার তাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলল-
“ আপনি না বাচ্চা চাইলেন আমার কাছে? আপনি কিছু চেয়েছেন। আর আমি আপনাকে তা দিব না সেটা কি হয়? ”
এখন বুঝলো। বুঝলো বলেই লজ্জায় মুখ লুকালো গিয়ে সিকান্দারের বুকে। একে একে রুমের জানালা দরজা সব বন্ধ হয়ে গেলো। ড্রিম লাইট টাও নিভে গেলো। তান্ত্রিকের পাঠানো শয়তান জ্বিন তখন বাহিরে পাগলের মতো ফুঁসতে লাগলো।
সিকান্দার শাহ্ পর্ব ১৩
শয়তানরা যৌনতাকে ভালোবাসে। লজ্জাস্থান দেখতেও ভালোবাসে। কেননা শয়তান এ যৌনতায় নিজেকে জড়িয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যেই স্বামী-স্ত্রীর মিলনের সময় সেখানে উপস্থিত হয়।
যখনই কোনো মানুষ মিলনের সময় প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো এ দোয়া পড়ে, তখন সেখানে শয়তান থাকতে পারে না। ফলে স্বামী-স্ত্রীর মিলন হয় নিরাপদ ও শয়তানের প্রভাবমুক্ত। আর সেই মিলনের মাধ্যমে কোনো সন্তান জন্ম নিলে সেই সন্তানের কোনো ক্ষতি শয়তান করতে পারবে না।
