মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৭
Tahmina Akhter
ভার্সিটির পার্কিং এরিয়ায় মেঘালয় গাড়ি পার্ক করে গাড়ি থেকে বের হয়ে এলো। আলো মেঘালয়কে বের হতে দেখে অবাক হয়ে গাড়ি থেকে বের হয়ে প্রশ্ন করল,
— আপনি কি এখন ভেতরে যাবেন?
— কেন আমার কি এখানে আসতে বারণ?
কথাটি বলেই চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে চুলগুলো দুইহাত দিয়ে পেছনে ঠেলে দিয়ে আলো’র দিকে ফিরে বলল,
— নিজের ক্লাসে যাও।
আলো ব্যাগ হাতে নিয়ে সোজা হাঁটতে শুরু করল। আলো’র পেছনে পেছনে মেঘালয় হাঁটছে। আলো’র দিকে অনেকেই তাকাচ্ছে। বিদেশবিভুঁইয়ে শাড়ি পরা নারীকে দেখলে অনেকেই বারবার তাকায়। কিন্তু, আলো’র কেন জানি ভালো লাগছে না। নিজেকে নিয়ে নয়। ডাক্তার সাহেবকে নিয়ে ভালো লাগছে না। আলোর থেকে কয়েক ফুট দূরে
বিদেশিনী কয়েকজন মেঘালয়কে ঘিরে ফেলেছে।
পারছে না ডাক্তারের সাহেবের গলায় ঝুলে পরতে। তাদের দেখে মনে হচ্ছে তারা পরিচিত! রাগে দুঃখে সেখান থেকে সরে যায়। কই ভেবেছিল শাড়ি পরে ডাক্তার সাহেবকে শিক্ষা দেবে কিন্তু উল্টো ডাক্তার সাহেব তাকে শিক্ষা দিচ্ছে।
আলো পেছনে ফিরে আরও একবার ডাক্তার সাহেবকে দেখে নেয়।। ওমা কই গেল মানুষটা? আলো চারপাশে তাকিয়ে দেখল, কোথাও নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনের দিকে ফিরতেই কার সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে পরে যাচ্ছিল কিন্তু যথাসময়ে আলোকে আঁকড়ে ধরল কেউ? আলো চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায় বারবার বলছিল,
— ধন্যবাদ, ধন্যবাদ।
— ধন্যবাদ দেবার কিছুই নেই৷ আমার দেহে যতদিন প্রাণ আছে ততদিন তোমার খিদমতে থাকব, কালো ভ্রমর।
“কালো ভ্রমর” ডাক শুনে আলো চট করে বুঝতে পারল মানুষটা কে হতে পারে? চোখ খুলে মানুষটার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু, শান্ত’র পুরুষালি শক্তির সঙ্গে আলো সত্যি সত্যি পেরে উঠছিল না। আলো অসহায়ের মত আরও একবার চারপাশে তাকায় যদি একবার ডাক্তার সাহেবের দেখা মিলে… ডাক্তার সাহেব কোথাও নেই। কিন্তু, উপস্থিত অনেকেই এই বিষয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। তারা হয়ত অন্যকিছু ভেবে বসে আছে।
— আমাকে ছেড়ে দাও শান্ত। কার অনুমতি ছাড়া কাউকে এভাবে স্পর্শ করা অনুচিত।
— অথচ তোমাকে যে আমার হৃদয় এত করে চায় একবারও কি তোমার কাছ থেকে পারমিশন নিয়েছি?
— আমার অস্বস্তি হচ্ছে শান্ত…
আলো কথাটি শেষ করা মাত্রই কেউ ঝড়ের বেগে এসে শান্ত’র কলার টেনে ধরল? এই ফাঁকে শান্তর কাছ থেকে নিজেকে মুক্ত করে নেয়া আলো ।
— হ্যাল প্রফেসর?
শান্তর কথা শুনে মেঘালয়ের রাগ আরও বেড়ে যায়। শান্ত’র শার্টের কলার আরও শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
— হাউ ডেয়ার ইউ! ওকে স্পর্শ করার সাহস পেলে কোত্থেকে?
— ওকে ভালোবাসি আমি। যাকে আমি ভালোবাসি তাকে স্পর্শ করার সাহস….
আলো লজ্জায় চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল। শান্ত’র মুখ থেকে এমন ভয়ানক কথা শুনে মেঘালয় একপলক আলো’র দিকে তাকায় আলো’র ভেজা চোখ দেখে মেঘালয় আলোর অন্তরালের খবর টের পেল বুঝি! জীবনে প্রথমবার কার ওপর এত রাগ উপচে পরছে! তবুও, নিজেকে ধাতস্থ করে শান্তকে বলল,
— নোংরা জিনিসে হাত মাখালে হাত নোংরা হয়। গন্ধ বের হয়। তাই তোর মত একটা নোংরা কিটকে মেরে আমি আমার হাত ময়লা করব না। কিন্তু, তারমানে এই না যে আমি তোকে মাফ করে দিলাম। আজই প্রথম এবং শেষবারের মত ওয়ার্নিং দিচ্ছি, আমার মিসেস এর কাছ থেকে একশ ফুট দূরে থাকবি।
শান্তকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে আলোর হাত ধরে সেখান থেকে চলে যাচ্ছে মেঘালয়। আশেপাশের অনেক অনেক স্টুডেন্ট ত বুঝতেই পারছে না তাদের শান্তশিষ্ট প্রফেসর এভাবে রেগে গেছে কেন? আর ওই মেয়েটা কি প্রফেসরের স্পেশাল কেউ??? পুরো ভার্সিটিতে হাওয়ার বেগে ছড়িয়ে গেল প্রফেসরের সঙ্গে স্কল্যারশিফ পেয়ে বাংলাদেশ থেকে আসা মেয়েটার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।
আলোকে ক্লাসরুমে বসিয়ে মেঘালয় কিছুক্ষণ পায়চারি করল নিজের অস্বস্তি কমানোর জন্য। ভাগ্যিস ক্লাসরুমে অন্য স্টুডেন্টরা এখনও উপস্থিত হয়নি। এদিকে আলো লজ্জায় মাথা উঁচু করে তাকাতে পারছে না। রাগে ঘৃনায় বারবার ইচ্ছে করছিলে শরীরটাকে ধুয়েমুছে পবিত্র করতে। শান্ত যে এমন কান্ড করবে কোনোদিনও কল্পনা করেনি।
মেঘালয় আলোর সামনে এসে দাঁড়ায়। তারপর, দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে বলল,
— সব ঠিক হয়ে যাবে। কান্না করবে না প্লিজ।
মেঘালয় কথাটি শেষ করে ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে স্টুডেন্ট দিয়ে পুরো ক্লাসরুম ভরে উঠল।
আজকের সবচেয়ে ইম্পোর্টেন্ট ক্লাস নাকি একজন হ্যান্ডসাম প্রফেসার করাবে। এই প্রফেসারের জন্য নাকি প্রাণও দিতে পারবে কিছু মেয়ে স্টুডেন্ট। মানে তারা এতটাই পছন্দ করে প্রফেসারকে। ইমা’র কাছ থেকে এসব শুনে আলো নাক-মুখ কুঁচকে ফেলল বিরক্তিতে। মানে একজন পুরুষকে ভালো লাগতেই পারে তাই বলে এভাবে নিজেদের আত্মসম্মান বলি দিয়ে কেন প্রফেসারের দৃষ্টি আর্কষণ করতে হবে?
আলো যখন ইমা’র বকবকানিতে বিরক্ত ঠিক তখনি ক্লাসরুমে প্রবেশ করল কেউ। সবাই হ্যালো বলে উঠে দাঁড়ালো। আলো আশে-পাশে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর হাসিমুখে সামনের দিকে তাকাতেই আলো অবাকমিশ্রিত সুরে বলল,
— ডাক্তার সাহেব…..
মেঘালয় ক্লাসের কোনোদিকে না তাকিয়ে কেবল আলোর দিকে তাকিয়ে একপলক তাকিয়ে সবার উদ্দেশ্য বলল,
— সিট ডাউন এভরিওয়ান।
ক্লাস নেয়া শুরু হয়েছে। নতুন যারা জয়েন করেছে তাদের সঙ্গে পরিচিত পর্ব শেষ করেছে। আলো’র বেলায় এমন একটা ভান করল যেন আলো’র সঙ্গে আজই তার এই প্রথম পরিচয় হলো। আলোর ইচ্ছে করছে মেঘালয়কে কিছু একটা করতে। মানে নিজেকে নিয়ে, নিজের প্রফেশানকে নিয়ে এতটা রহস্য করার কারণ কি?
মেঘালয় এত চমৎকার করে সবকিছু বোঝাচ্ছে কিন্তু আলো’র কিছুই মাথায় ঢুকছে না। ঢুকবে কেমন করে? নিজের প্রাণের চেয়ে অধিক প্রিয় স্বামীটাকে যদি অন্যকেউ বাজে চোখে দেখে পৃথিবীর কোনো নারী সহ্য করতে পারবে? মোটেও পারবে না। আলো পারছে না।
সেদিনকার মত ক্লাস শেষ হলো। ক্লাস শেষ হবার পর সব স্টুডেন্ট বের হয়ে যায়। বাকি রইল প্রফেসার মেঘালয় আর আলো। ক্লাস ফাঁকা হবার পর মেঘালয় আলো’র সামনে গিয়ে বলল,
— বসে আছো কেন?
— আপনাকে কি বলে সম্বোধন করব? প্রফেসার নাকি ডাক্তার সাহেব হিসাবে ?
আলোর কথা শুনে মেঘালয় মুচকি হেসে রসাত্মক সুরে বলল,
— আমি কিন্তু লতায়-পাতায় তোমার স্বামী হই।
আলো চোখ পাকিয়ে তাকাতেই মেঘালয় ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলল,
— এভাবে তাকালে নিশ্চয়ই কিছু জয় করতে পারবে না। বাড়িতে চলো। দেরি হচ্ছে। রিনিদের বাড়িতেও তো যেতে হবে।
আলো একটা শব্দ করল না। মেঘালয়কে রেখে সে ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে গেল। আর মেঘালয় কপালে চাপড় দিয়ে বলল,
— মা যে আমার মত শান্তশিষ্ট ছেলের জন্য এমন রাগী আর বোকা মেয়ে কোত্থেকে জুটিয়ে আনল আল্লাহ মালুম৷ কই স্বামীকে প্রফেসার হিসেবে দেখে খুশী হবে তা না। উল্টো রাগ দেখাচ্ছে!
মেঘালয় আর আলো সরাসরি ভার্সিটি থেকে রিনিদের বাড়িতে চলে যায়। রিনি তো ওদের দেখে ভীষণ খুশি হলো। আরাফাত মেঘালয়কে নিয়ে বাড়ির বাইরে চলে যাওয়ার রিনি আলোকে বলল,
— কতটুকু এগুতে পারলে?
— ০%।
আলো’র কথা শুনে রিনি কপালে হাত দিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। কিছুসময় অতিবাহিত হওয়ার পর রিনি আলো’র হাতে ধরে বলল,
— একজনকে তো প্রথম এগিয়ে যেতেই হবে। দুজনেই যদি হাত গুটিয়ে বসে থাক কেমন করে চলবে বলো? সম্পর্ক ঠিক হবার আগে আরও বেশী নষ্ট হয়ে যাবে।
আলো চুপ করে বসে আছে। রিনির কথার জবাব দিতে ইচ্ছে করছে না। একদিকে শান্ত অন্যদিকে মেঘালয়ের জন্য করা কিছু মেয়ের পাগলামি আলোর মনকে অশান্ত করে তুলেছে।
— শুনো সন্ধ্যায় পার্টি আছে এই বাড়িতে। তোমরা কিন্তু আজ রাতে এখানে থাকবে। আর একটা কথা?
শেষ বাক্যটি শুনে আলো রিনির মুখের তাকায়। রিনি আলো’র কাঁধে হাত রেখে বলল,
— ফিওনা আসবে এই পার্টিতে। ফিওনা আমার বাবার বিজনেস পার্টনারের মেয়ে। এবং আরাফাতের বাবার কোম্পানির ইনভেস্টার ফিওনার বাবা।
— এখন আমাকে কি করতে হবে?
— কিছুই করতে হবে না। শুধু একটু ধৈর্যধারণ করলে হবে। তুমি হয়ত সেদিন খেয়াল করেছো, ফিওনা কিন্তু মেঘালয়কে চোখে হারায়।
কথাগুলো বলেই রিনি অন্য আলাপ মশগুল হয়। কিন্তু, আলো পরে আছে অন্য জগতে। যেই জগতে একটি ভয় তাকে তাড়া করছে। মেঘালয়কে হারাবার ভয়।
পার্টি শুরু হবার পর মেঘালয়কে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও আরাফাতও নিখোঁজ। রিনি আর আলো দুজনেই দুশ্চিন্তা করছে। ধীরে ধীরে মেহমানরা আসতে শুরু করেছে। আজ রিনি পরেছে মেরুন রঙা ওয়েস্টার্ন গাউন। মাথায় টোনের ক্রাউন। ঠোঁটে ম্যাট লিপস্টিক। সাদামাটা সাজে রিনিকে চমৎকার দেখতে লাগছে।
আর আলো’র পরনে আজ হলুদ রঙা গাউন। চুলগুলো ছেড়ে দেয়া। গলায় মুক্তোর মালা আর কানে একজোড়া স্টোনের টপ। হাতে স্টোনের ব্রেসলেট। ঠোঁটে লিপস্টিক দিতে গিয়েও দেয়নি আলো। কারণ, সকালে মেঘালয়কে রাগাতে গিয়ে লিপস্টিক লাগিয়ে ছিল। এখন আর মেঘালয়কে রাগাতে চায় না। এখন থেকে মানুষটা যখনই চাইবে তখনই লিপস্টিক ইউজ করবে।
— হ্যালো।
আলো পেছনে ফিরে তাকাতেই ফিওনাকে দেখে হৃদয়ে ধাক্কা খেলো প্রায়। পুরো বাঙালি নারীদের দেখাচ্ছে ওকে। লাল জামদানি শাড়ি পরেছে। সেজেছে বেশ। ফিওনাকে দেখে আলোর এত রাগ লাগছে। আলো’র অবস্থা দেখে রিনির বেশ মজা লাগছে। কারণ, আলো নিজের বিছানো জালে ফেঁসে গেছে। ফিওনা এগিয়ে এসে আলো’র সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
— মেঘালয় কোথায়?
— জানি না আমি।
— আমাকে কেমন দেখাচ্ছে?
— ভালো।
— শুধু ভালো??
ফিওনা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে। এদিকে আলো চোখ বন্ধ করে নিজেকে মনে মনে বলছে।
— রিল্যাক্স আলো। রাগ কমা। নয়তো হিতে বিপরীত হতে পারে।
— সুন্দর লাগছে আপনাকে।
আলো’র কথায় এবার বেশ খুশি হলো ফিওনা। রিনির দিকে ফিরে বলল,
— আজ আমি মেঘালয়কে প্রপোজ করব। এবার নিশ্চয়ই আমাকে ফিরিয়ে দেবে না?
রিনি আর আলো যেন আকাশ থেকে পরেছে। আলো কিছু বলতে যাবে তার আগেই রিনি আলোর হাতটা ধরে ইশারায় বোঝালো রিল্যাক্স থাকার জন্য। কিন্তু, আলো….
—- আপনি কি জানেন মেঘালয় বিবাহিত?
আলো’র কথা শুনে ফিওনা চোখ বড় বড় করে তাকালো। মানে সে বিশ্বাস করতে পারছে না যে তার এতবছরের ক্রাশ বিবাহিত।
— বিবাহিত কিন্তু নামের বিবাহিত। সে আসলে দূর্বল। মানে কোন দূর্বলের কথা বলেছি বুঝতে পারছেন? আপনি এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? আমার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না তাই না ফিওনা? কিন্তু আমার কাছে প্রমান আছে।
এতটুকু বলে আলো রিনির দিকে তাকালো। রিনি মুখে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মানে আলো কি বলছে রিনির বোধগম্য হচ্ছে না।
মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬৬
— আপনি বলুন, যদি দূর্বল না হত তাহলে আটবছর স্ত্রীর কাছ থেকে কেউ দূরে থাকতে পারে?
আলো এই কথাগুলো বলে হাসতে হাসতে ফিওনার মুখের দিকে তাকায়। কিন্তু ফিওনার থেকে সামান্য দূরে দাঁড়ানো মেঘালয়কে দেখে আলো’র মুখের হাসি ফুস হয়ে যায়। ভয়ে আলো’র হাত-পা কাঁপছে। আর রিনি’র ইচ্ছে করছে হাসতে হাসতে কারো ওপর লুটিয়ে পড়তে। কারণ, মেঘালয়ের চেহারাটা দেখার মত অবস্থায় নেই। আর আলো তো পারছে না মাটি ভাগ করে ঢুকে পরে সেখানে।
