Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪২

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪২

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪২
নওরিন কবির তিশা

“পিপি উঠো না।”
বেলা চড়েছে বেশ; সূর্যটা মধ্য গগনে। ঘড়ির কাঁটা হয়তোবা বারোটার ঘর ছুঁয়েছে। তবে আজ এখনো দিব্যি বিছানায় পড়ে আছে তৃষা। আর তাতেই ব্যাঘাত ঘটাতে বারংবার তাকে ডেকে চলেছে আরু। ওর এমন কাণ্ডে তন্দ্রাচ্ছন্নতা বহু আগেই ছুটেছে তৃষার। তবে প্রায় সারারাত নির্ঘুম থাকার দরুন চোখের পাতা আলাদা হতে নারাজ ওর।
আরিশা ফের ডাকলো,

“ও পিপি ওঠো।আর ফুপ্পা কই বলো তো? কোত্থাও দেখলাম না তোমার রুমেও নাই দেখছি।”
শেষ কথাটা কর্ণগোচর হতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো তৃষা,,
“নাই মানে? কোথায় উনি?”
চটজলদি বিছানা থেকে নামলো ও;কাল রাতের দুঃসহ স্মৃতির মিছিলে মূহূর্তেই মাথাটা ঘুরে উঠল তৃষার। আরিশা উৎসুক দৃষ্টিতে তৃষার মুখের দিকে তাকাতেই তার কচি মুখটা সংশয়ে কুঁচকে গেল। তৃষার চোখের পাতাগুলো অস্বাভাবিক স্ফীত; দীর্ঘক্ষণ একটানা ক্রন্দনের চিহ্ন স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে সেথায়। আরিশা বিস্মিত হয়ে শুধালো,
“কী হয়েছে পিপি? তোমার চোখ দুটো এমন ফোলা কেন?”
​তৃষা কোনো উত্তর দিতে পারল না। সারা শরীর এক অব্যক্ত অস্থিরতার খেলায় মত্তো ওর;এক অজানা শঙ্কা হৃদপিণ্ডটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছে—আর্য কি তবে সত্যি তাকে ছেড়ে চিরতরে চলে গেল? এই দুঃসহ ভাবনার উদয় হতেই ওর বাঁধভাঙ্গা নেত্রকার্নিশ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু টুপ করে ঝরে পড়ল। আরিশার দিকে তাকানোর মতো শক্তিও যেন অবশিষ্ট নেই ওর। টালমাটাল পায়ে তৃষা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল; পিছে পড়ে রইল বিস্ময়াবিভূত আরিশা।

সারা বাড়ি ঘুরেও আর্যর হদিস পেলোনা তৃষা। শেষমেষ সকল বাঁধা উপেক্ষা করে ও বেরিয়ে পড়ল গ্রামের পথে-প্রান্তরে।সুপ্ত দ্বিপ্রহরের তপ্ত রৌদ্রে খাঁ খাঁ করছে সুবর্ণপুরের মেঠো পথ। তৃষার আলুথালু কেশরাজি আর বিপর্যস্ত অবয়বে আজ কোনো লৌকিকতার বালাই নেই। মনের গহিন কোণে যে প্রলয়ংকরী আশঙ্কার বীজ বপিত হয়েছিল, তা যেন ডালপালা মেলে এখন ওকে পুরোপুরি গ্রাস করে নিতে চাইছে।
ও উন্মত্তের ন্যায় গ্রামের এ-মাথা থেকে ও-মাথা খুঁজে ফিরছে আর্যকে।সূর্যটা ললাট বরাবর অগ্নিবর্ষণ করছে,দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে বারবার। বুকের ভেতরটা শূন্যতার হাহাকারে ফেটে যাওয়ার উপক্রম। দীর্ঘ এক মাসের দূরত্ব ঘুচিয়ে লোকটা কেন আবার এমন এক অতল গহ্বরে ওকে ঠেলে দিয়ে গেল? তৃষা যান্ত্রিক পায়ে হাঁটছে; ওর সমস্ত সত্তাজুড়ে কেবলই আর্যর সেই বিদীর্ণ কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,,
“যেখানে নিজের ওপর বিশ্বাসটাই নেই, সেখানে থাকার কোনো মানে হয় না।”
সহসা এক বাঁকের মুখে এসে কারো সাথে সজোরে ধাক্কা খেল ‌ তৃষা। ভারসাম্য হারিয়ে ও প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, কোনোমতে পাশের একটা নিমগাছের ডাল ধরে নিজেকে রক্ষা করল। নিজের এই বেসামাল অবস্থায় বড্ড লজ্জিত বোধ করে ও নিচু স্বরে আনমনে বললো,

“দুঃখিত, আমি আসলে খেয়াল করিনি…”
বলেই ধীরলয়ে মাথা তুলে তাকাতেই বিস্ময়ে পাথর হয়ে গেল তৃষা।এক আধুনিকাতায় মোড়ানো রূপসী নারী ওর সামনে দাঁড়িয়ে; পরনে দামী স্লিভলেস টপ আর ডিস্ট্রেসড জিনস, যা এই গ্রাম্য পরিবেশে বড্ড বেমানান-দৃষ্টিকটু। নারীটি ভ্রু কুঁচকে দামী ব্ল্যাক সানগ্লাসটা নামাল। তৃষার বিস্ময়বিস্ফোরিত নেত্রপল্লবের দিকে একপলক অবজ্ঞার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে মাহেরিন শ্লেষাত্মক স্বরে শুধাল,
“ইউ্য আর তৃষা, রাইট? আর্যর সেই সো-কল্ড ইনোসেন্ট লিটল ওয়াইফ?”
তৃষা যেন নিজের কর্ণেন্দ্রিয়কেও বিশ্বাস করতে পারছে না। সুবর্ণপুরের এই ধূলিময় পথে মাহেরিনের উপস্থিতি ওর কাছে কোনো দুঃস্বপ্নের চেয়ে কম কিছু মনে হচ্ছে না। ও অস্ফুট স্বরে কেবল উচ্চারণ করতে পারল,,
“আপনি? আপনি এখানে কীভাবে?”
মাহেরিন তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি হেনে বললো, “দ্যাট’স নন অফ ইওর বিজনেস। বাই দ্যা ওয়ে আমার ডার্লিং এই গ্রামটা কিনতে চায়। আই ডোন্ট নো হোয়্যাই ও এমন চিফ ভিলেজ পছন্দ করছে? বাট কি আর করার। টাকা আছে,সো।
নিজ গ্রাম সম্বন্ধে এমন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যে তৃষার প্রতিবাদ সত্তা সবে জাগ্রত হতে উদ্যত ঠিক তখনই পিছন হতে ভেসে এলো পরিচিত পৌরষ কণ্ঠস্বর,,

“তৃষা?”
কাঙ্ক্ষিত সেই কণ্ঠস্বরে তৎক্ষণাৎ ঘুরে তাকালো তৃষা, আর ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতেই মাহেরিনের পুরো পৃথিবীর স্তব্ধ হয়ে গেল এক লহমায়।সামনে দাঁড়ানো আর্যর শুভ্র শার্টের হাতা কনুই অবধি ফোল্ড করা, যেখান দিয়ে স্পষ্ট ফুটে উঠেছে ওর সুঠাম মাংসপেশি আর ভাসমান শিরাযুক্ত পৌরুষদীপ্ত হাত। মুহূর্তেই মাহেরিনের অবজ্ঞা ঢাকা পড়ল তীব্র বিস্ময়ে। ও নিজের অজান্তেই অস্ফুট স্বরে উচ্চারণ করল,
“আর্য?”
মাহেরিনের আকস্মিক উপস্থিতিতে তীব্র ঘৃণায় মুখ কুঁচকে এল ‌আর্যর মুখশ্রী । যে নারীকে ও এককালে হৃদয়ের সিংহাসনে বসিয়েছিল, আজ তাকে এই ধূলিময় মেঠো পথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওর ভেতরে কোনো অনুরাগের সঞ্চার হলো না; বরং একরাশ কদর্য বিতৃষ্ণা ওর শিরায় শিরায় বয়ে গেল। আর্য ওর তপ্ত দৃষ্টি মাহেরিনের দিক থেকে সরিয়ে তৃষার ওপর নিবদ্ধ করল।
​তৃষার রক্তিম চোখের কোণ আর বিপর্যস্ত দশা দেখে আর্যর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। ও মাহেরিনকে আবর্জনা স্তুপের ন্যায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তৃষার দিকে এক কদম এগিয়ে আসতেই তৃষা ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,,

“কোথায় ছিলেন আপনি?”
“একটা কাজে গিয়েছিলাম। বাট তোমার চোখ মুখের এই অবস্থা কেন? আর তুমি এখানে কেন?”
“আমি ভেবেছিলাম…ভেবেছিলাম আপনি আমাকে ফেলে চলে গিয়েছেন।”
“যাওয়ার হলে বহু আগেই যেতাম,বাট ইটস নট পসিবল ফ’র ম্যি! এখন চলো এখান থেকে।”
আর্য তৃষার হাত ধরে প্রস্থান প্রস্তুতি নিতেই মাহেরিন নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। আর্যর এই চরম অবজ্ঞা ওকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। ও চিৎকার করে পিছু ডাকলো আর্যকে,
“আর্য! জাস্ট স্টপ ইট! তুমি কি সত্যিই আমাকে চিনতে পারছো না? আমি মাহেরিন! তোমার সেই মাহেরিন যার জন্য তুমি একসময় পাগল ছিলে!”
আর্যর পা দুটো যেন মাটির সাথে গেঁথে গেল। ও ধীরলয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে মাহেরিনের দিকে তাকাল। ক্রোধে র’ক্তবর্ণ ধারণ করা দৃষ্টি এতক্ষণ সংযত রাখলেও এবার নিজেকে সামলাতে পারল না ও,
“হু দ্য হেল আর ইউ্য!”
মাহেরিন শুকনো ঢোক গিলল। বরাবরই আর্য রাগী সত্তাকে ভীষণ ভয় পায় ও। তবুও বহু কষ্টে সাহসের সঞ্চয় করে বলল,,

“আর্য, তুমি কি সত্যিই আমাকে ইগনোর করছো? আই অ্যাম মাহেরিন! যার জন্য তুমি পুরো পৃথিবীকে ছেড়ে দিতে পারতে!”
​আর্যর চোয়াল শক্ত হয়ে এল। ও ধীর পায়ে মাহেরিনের কাছে এসে দাঁড়াল,,
“আই ডোন্ট ওয়েস্ট মাই টাইম রিমেম্বারিং গার্বেজ।”
​“হাউ ডেয়ার ইউ্য! তুমি এভাবে কথা বলতে পারো না আর্য। তুমি আমাকে ভালোবাসতে!”
মাহেরিন নির্লজ্জের ন্যায় আর্যর হাতটা ধরতে যেতেই​মুহূর্তের মধ্যে আর্য সজোরে মাহেরিনের গালে কষিয়ে থাপ্পড় বসিয়ে দিয়ে আঙুল উঁচিয়ে গর্জে উঠল,
“ডোন্ট ইউ্য ডেয়ার টাচ ম্যি! তোর মতো একটা দূষিত মানসিকতার নোংরা পদার্থ আমাদের পবিত্র জীবনের আশেপাশে থাকা মানেই পরিবেশটা দূষিত হওয়া। জাস্ট গেট আউট অফ মাই সাইট বিফোর আই লুজ মাই টেম্পার কমপ্লিটলি। ডোন্ট এভার ট্রাই টু শো ইয়োর আগলি ফেস এগেইন!”
ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব তৃষা।ও ভাবতেও পারেনি এমন কিছু ঘটবে। তবে আর এক মুহূর্তও নষ্ট না করে ​তৃষার হাত শক্ত করে ধরে আর্য ওখান থেকে হাঁটা দিল। মাহেরিন তখনো অপমানে-যন্ত্রণায় মাঝরাস্তায় স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে; তার দামী সানগ্লাসটা ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে।

“হ্যাভ আই হার্ট ইউ টু মাচ, ক্যাপ্টেন?”
চলতে পথে তৃষার আকস্মিক প্রশ্নে বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না আর্য। বরং পূর্বের না অটল পদক্ষেপ বজায় রেখে চলতে লাগলো। আর্যর দীর্ঘ কদমে তাল মেলাতে গিয়ে তৃষা রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠছে, কিন্তু আর্যর গ্রিপ আলগা হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। ওর মৌনতায় চঞ্চল তৃষা স্থবির হলো। একটা শ্যাওলা ধরা পুরনো কালভার্টের কাছে আসতেই তৃষা সজোরে আর্যর শার্টের হাতা টেনে ধরতেই থামলো আর্য। ওর র’ক্তিম চোখের প্রখর চাউনি তৃষার ওপর নিবদ্ধ হতেই তৃষা ভয়ে কিঞ্চিৎ কুঁকড়ে গেল।
​আর্য দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর স্বরে শুধাল,
“কী হলো? থামলে কেন? বলো, কী বলবে?”
​তৃষা অপরাধীর মতো মাথা নুইয়ে ধরা-গলায় অস্ফুট স্বরে বলল,
“আমি কি আপনাকে অনেক বেশি কষ্ট দিয়েছি, ক্যাপ্টেন? ওভাবে সন্দেহ করাটা… ওটা আসলে মাহেরিনের কথা শুনে মাথা ঠিক ছিল না।”

​আর্য এক চিলতে তেতো হাসি হেসে ওর খুব কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। ওর শরীরে লেপ্টে থাকা ঘাম আর পারফিউমের মিশেল তীব্র ঘ্রাণে মা!তা!ল হয়ে চোখ বুজল তৃষা। আর্য ওর থুতনি ধরে মুখটা উঁচিয়ে ধরে বলল,,
“কষ্ট? ইউ্য নো, ফিজিক্যাল পেইন সয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু তুমি যে আমার ওপর বিশ্বাস টুকু রাখতে পারলে না, সেটা আমাকে ছি”ন্ন”ভি”ন্ন করে দিয়েছে। মাহেরিন তো একটা বাইরের মানুষ, কিন্তু তুমি তো আমার অস্তিত্বের অংশ। সে যা খুশি বলবে আর তুমি আমাদের সুন্দর জীবনটাকে তুচ্ছ করে দিবে?”
​তৃষা আর্যর শার্টের কলারটা খামচে ধরলো,
“আমি না বড্ড বোকা, তাই হয়তো সামলাতে পারিনি। প্লিজ মাফ করে দিন না! আপনি তো জানেন, আপনাকে হারানোর ভয়েই আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম।”
আর্য এক চিলতে মলিন হাসলো। অতঃপর আর কোনো প্রত্যুত্তর না করে সোজা পা বাড়ালো সম্মুখ পানে।

উঠোনে পা রাখতেই চারজোড়া উৎসুক দৃষ্টি ওদের ওপর স্থির হলো। গ্রামের বাড়ির চিরাচরিত দৃশ্য; দাওয়ার একপাশে পাতা কাঠের চৌকিতে তৌফিক নেওয়াজ আর টুইঙ্কেল বসে লুডু খেলছিল। ওদের পাশে বসে পান সাজছিলেন শায়লা বেগম। তৃষার আলুথালু বেশ আর আর্যর থমথমে মুখ দেখে শায়লা বেগম হাতের বাটাটা পাশে রেখে তড়িৎ উঠে দাঁড়ালেন। আর্যর শক্ত মুষ্টিতে তখনো তৃষার হাত বন্দি।
​শায়লা বেগম উদ্বেগ মেশানো গলায় শুধালেন,
“তৃষা! তুই না বলে-কয়ে এভাবে হন্তদন্ত হয়ে কোথায় ছুটেছিলি? আর আর্যর সাথে দেখা হলো কোথায়?”
​তৌফিক নেওয়াজ হাতের ছক্কাটা রেখে তাকাতেই আর্য পরিস্থিতি সামাল দিতে শান্ত গলায় বলল,
“আসলে আমি একটু ইমারজেন্সিতে বাইরে দিয়েছিলাম বাট পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম বলে ওকে কল করছিলাম।”
​টুইঙ্কেল চৌকি থেকে নেমে এসে তৃষার ওড়নার আঁচল টেনে ধরে চপল কণ্ঠে বলল,

“তুমি আমাকে রেখেই ঘুরতে গেছিলে বানি?”
তৃষা আলতো ওর মাথায় স্নেহের বুলিয়ে বলল,, “আমি তো ঘুরতে যাইনি সোনা। আপনার বাইরে যা রোদ এজন্য তোমাকে নেই নি।”
​পরিবেশের গুমোট ভাব কাটাতে তৌফিক নেওয়াজ আছে শায়লা বেগমের উদ্দেশ্যে বললেন,,
“প্রশ্ন অনেক করেছ এবার ওদের দুজনকে ভিতরে যেতে দাও এমনি যে গরম পড়েছে। একটু পরে বৃষ্টি ছাড়বে বোধ হয়। তুমি বরং ওদের শরবত বানিয়ে দাও।”
স্বামীর নির্দেশে রান্নাঘরের দিকে গেল শায়লা বেগম। পরপর-ই আর্য কোনরূপ পূর্বাভাস ছাড়াই স্থান ত্যাগ করল। তৃষাও কক্ষে গেলো ফ্রেশ হওয়ার উদ্দেশ্যে।

নিশুতি রাত;​বৃষ্টির রেশ কাটেনি তখনো। জানলার কার্নিশ বেয়ে টুপটুপ জলকণার পতন আর সোঁদা মাটির মদির গন্ধে ম ম করছে চারপাশ। টুইঙ্কেলকে ঘুম পাড়িয়ে তৃষা ধীরপায়ে ঘরের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াতেই ওর হৃৎস্পন্দন থমকে গেল এক লহমায়্‌। ঘরের টিমটিমে আলোয় ও দেখল আর্য এক হাতে একটি তীক্ষ্ণ-ধারালো ছুরি ধরে আছে, যার অগ্রভাগ ঠিক ওর বাম হাতের স্পন্দিত শিরা বরাবর রাখা।
অনাগত বিপর্যয়ের সংকেতে ​তৃষার মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। এক ভয়াবহ হাহাকার বুক চিরে বেরিয়ে আসার আগেই ও উন্মত্তের ন্যায় ছুটে গিয়ে পেছন থেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল আর্যকে। ওর সর্বাঙ্গ থরথরিয়ে কাঁপছে; প্রকম্পিত কন্ঠে চিরে বেরিয়ে এলো নিদারুণ আর্তনাদ,,
​“নাআআ! ক্যাপ্টেন, কি — কি করছেন!”
​তৃষার আকস্মিক এই সজোর আলিঙ্গন আর কান্নায় আর্য একদম স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে;ওর হাতের আঙুলগুলো শিথিল হয়ে এলো। এমন এক অবাস্তব কাণ্ডে ও রীতিমতো তাজ্জব বনে গেছে; পিঠে তৃষার উত্তপ্ত অশ্রুর স্পর্শ পেতেই ও বেকুব কণ্ঠে বলল,,

“কি হয়েছে?”
পেছন থেকে আর্যর বক্ষদেশ বরাবর শার্টটা খামচে ধরে তৃষা হিক্কা তুলে কাঁদছে। ওর ফুঁপিয়ে ওঠার শব্দ ঘরের শান্ত পরিবেশটাও ভারাক্রান্ত করে তুলছে;আর্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তারপর আলতো করে তৃষাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ওর থুতনি ধরে মুখটা তুলে ধরল; ক্রন্দনরত জল থৈ থৈ চোখদুটোতে স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ পূর্বক ভ্রু কুঁচকে নরম গলায় শুধাল,
​“আরে বাবা! কী হয়েছে বলবে তো! এভাবে কাঁদছ কেন?”
​তৃষা কোনোমতে হেঁচকি সামলে, নাক টেনে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,,
​“আপনি… আপনি ওইটা দিয়ে কী করতে চাচ্ছিলেন? আমি নিজের চোখে দেখেছি আপনি শিরার ওপর ওটা ধরেছিলেন!”
​আর্য এবার সত্যিই আকাশ থেকে পড়ল। ও হাতের ছু”রিটার দিকে একবার তাকাল, তারপর তৃষার আতঙ্কিত ‌সরল মুখশ্রীতে চেয়ে পরক্ষণেই প্রসারিত হাসলো।পরিস্থিতি হালকা করতে ও কিছুটা রসিকতার সুরেই বলল,

​“সিরিয়াসলি তৃষা? তুমি আমায় এতটাই কাওয়ার্ড ভাবো যে আমি সু/ই/সা/ই/ড করতে যাব? আই ওয়াজ জাস্ট কাটিং সাম ফ্রুটস! ডাইনিংয়ে ছুরিটা পাচ্ছিলাম না বলে নিজের ট্রাভেল কিট থেকে এটা বের করেছি। আর তুমি যা দেখলে, ওটা আসলে ছুরির ধার পরীক্ষা করছিলাম মাত্র। ইট ওয়াজ জাস্ট আ মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং, মাই ইনোসেন্ট ড্রামা কুইন!”
​তৃষা বড় বড় চোখ করে চাইল। ওর বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে আর্য ফের বলল,
​“ইউ্য নো তৃষা, লাইফ ইজ নট আ মুভি। আমি একজন সোলজার, জীবন দিতে জানি, কিন্তু এভাবে কাপুরুষের মতো নয়। সো, স্টপ ক্রাইং অ্যান্ড হ্যাভ সাম অ্যাপলস। তোমার যা মেন্টাল কন্ডিশন, ইউ নিড সাম গ্লুকোজ রাইট নাউ।”
নিজের বোকামি বুঝতে পেরেই লজ্জায় আর্যর বুকের ওপর মুখ লুকালো তৃষা। আর্যও আর দেরি না করে ওকে নিজের বাহুডোরে শক্ত করে জড়িয়ে নিলো; এভাবেই অতিক্রান্ত হলে মুহূর্ত খানেক। হুট করে নিস্তব্ধতা ভেঙে আর্য বলল,,

“এজন্যই লোকে বলে, পিচ্চি মেয়ে বিয়ে করা আর বিপদ ডেকে আনা একই কথা। সবসময় মাথায় শুধু নেগেটিভ আর উল্টাপাল্টা ভাবনা। আস্ত একটা ইডিয়ট!”
আর্যর কথা শুনে তৃষার কান্নার তোড় মুহূর্তেই থমকে গেল। ও ঝট করে আর্যর বুক থেকে মুখ তুলে ওর দিকে একজোড়া অভিমানী দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। গাল ফুলিয়ে আর্যর শার্টের কলারটা আর একটু জোরে খামচে ধরে অভিমানী সুরে বলল,
“কী বললেন আপনি? আমি পিচ্চি মেয়ে? আমি ছোট বাচ্চা? হাউ ডেয়ার ইউ্য ক্যাপ্টেন!”
আর্য এক ভ্রু নাচিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“হুম, বললাম তো। ভুল কী বলেছি? যে মেয়ে ফল কাটার ছু/রি দেখে ভেবে নেয় তার হাজব্যান্ড সুইসাইড করছে, তাকে পিচ্চি ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়? ইউ্য আর জাস্ট আ সিলি লিটল গার্ল।”
তৃষা এবার ওর হাতের বাঁধন আলগা করে দিয়ে;কোমরে হাত দিয়ে জেদ নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,

“আপনি ভুলে যাচ্ছেন ক্যাপ্টেন, আ’ম ১৮ প্লাস! আমাকে আপনার কোনদিক থেকে পিচ্চি মনে হয়? আমি কি দেখতে ছোট বাচ্চাদের মতো? নাকি আমার কথাবার্তা আপনার কাছে ম্যাচিওর মনে হয় না?”
আর্য এবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তৃষাকে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে নিরীক্ষণ করে ধীরলয়ে এগিয়ে এসে তৃষার একদম কাছে গিয়ে দাঁড়াল, যার দরুন তৃষা পিছিয়ে যেতে যেতে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ালো।
“সব দিক থেকেই তো পিচ্চি মনে হয়। এই যে তোমার রাগ, তোমার এই ইনোসেন্ট ফেস, আর তোমার এই পিচ্চিদের মতো কান্নাকাটি—সবকিছুই তো তাই বলে। ইভেন তোমার এই ছোটখাটো অবয়বটাও তো আমার বাহুডোরে হারিয়ে যায়। সো, ট্যেল ম্যি, তুমি যে ১৮ প্লাস তার প্রমাণ কী? আ’ম নট কনভিন্সড পিচ্চি!”
তৃষা নিজের জেদ বজায় রাখতে আর্যর সেই প্রখর দৃষ্টির সোজাসুজি তাকাল। আর্যর বলিষ্ঠ শরীরের ছায়ায় ও এখন সম্পূর্ণরূপে বন্দি। আর্যর অধরের সেই বাঁকা হাসি আর চোখের মদির চাহনি তৃষার হৃদপিণ্ডের স্পন্দন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবুও ও দমে না গিয়ে ফের শুধাল,

​“বলুন আপনার কী প্রমাণ চাই? কী করলে আপনার মনে হবে যে আমি আর পিচ্চি নেই? আপনি যা বলবেন, আমি আজ তা-ই প্রমাণ করে দেব!”
​তৃষার এই সাহসী সাজার চেষ্টায় অবুঝ চ্যালেঞ্জ শুনে আর্যর চোখের মণি গভীর নেশায় আচ্ছন্ন হলো। ও তৃষার কানের লতির খুব কাছে মুখ নামিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলতেই ওর নিঃশ্বাসের উষ্ণতায় অজান্তেই চোখ বুঁজলো ‌তৃষা। আর্য ফিসফিসিয়ে বলল,
​“রিয়েলি তৃষা? তুমি জানো না একজন ক্যাপ্টেনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া কতটা রিস্কি? আই ক্যান বি ভেরি ডিমান্ডিং সামটাইমস!”
​তৃষা জেদের বশবর্তী হয়ে প্রত্যুত্তর দিল,
“হুম, দিতে চাই। আমি আজ প্রমাণ করেই ছাড়ব যে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা কোনো পিচ্চি নয়!”
“উহুঁ তুমি পারবে না পিচ্চি।”
“এই পারবো আমি! আর একবার পিচ্চি বললে..!”
“পারবেনা।”
“পারবো!”
“আর ইউ্য সিরিয়াস?”
“ইয়েস আই অ্যাম!”

​আর্য এবার তৃষার চিবুকটা আলতো করে ধরে মুখটা উঁচিয়ে তৃষার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
​“দেন লেট দ্য নাইট প্রুভ ইট। কজ আই ওয়ান ইউ্য ব্যাডলি! বাট ইউ্য ওয়্যার ম্যাচিউর, অ্যান্ড আই ডিডন’ট ওয়ান্ট টু ডু অ্যানিথিং অ্যাগেইনস্ট ইয়োর উইল। বাট আজ যখন তুমি নিজেই প্রমাণ দিতে চাইছ, দেন আই ওন্ট স্টপ মাইসেলফ।”
​ তীব্র শিহরণে বিদ্যুৎপৃষ্টের ন্যায় ঝাঁকিয়ে উঠলো তৃষার ক্ষীণ কায়া। আর্য প্রতিটা স্পর্শে হৃদয়ে উথালপাথাল ঢেউ বইছে ওর হৃদগহীনে। আর্য ধীর পায়ে তৃষাকে পাঁজা কোলা করে তুলে নিল। ভীত তৃষা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল আর্যর চওড়া কাঁধ। ঘরের টিমটিমে আলোয় ওদের ছায়াটা দেয়ালে একাকার হয়ে গেল।
​আর্য ‌ওকে বিছানায় সযত্নে শুইয়ে দিয়ে ওর চুলের ভাঁজে মুখ গুজল। বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ তখন জানলার ওপাশে এক অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করেছে। তৃষা অনুভব করল আর্যর বলিষ্ঠ হাতের স্পর্শ ওর কামিজের চেরা ফাঁকা গলিয়ে ক্রমশ গভীরে প্রবেশ করছে। ওর নিশ্বাস ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। আর্য ওর চোখের পাতায় চুমু খেয়ে বলল,

​“আর ইউ্য রেডি টু বি মাইন কমপ্লিটলি, তৃষা? কোনো জোর নেই, কেবল তোমার ইচ্ছাটুকু চাই।”
​তৃষা আর্যর গলার কাছে মুখ লুকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল,
“আমি তো শুরু থেকেই আপনার ছিলাম ক্যাপ্টেন।”
ধীরে ধীরে আর্যর স্পর্শ গভীর থেকে গভীরতর হতে শুরু করল। পৃথিবীর সমস্ত লাজুকতা যেন আজ গ্রাস করছে তৃষাকে; গম্ভীর মানবের এমন উন্মত্তরূপ বড্ড অচেনা ওর। আর্য টুকরো টুকরো চুমুতে ভরিয়ে দিতে থাকলো তৃষার মুখশ্রী অতঃপর ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে আনলো তৃষার গলার বিউটি বোর্নে।
নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ক্রমশ বুক হাপরের মতো উঠানামা করছে তৃষার; ধুকপুকানি তখন উন্মত্ত অশ্বারোহীর গতির ন্যায়। আর্য হঠাৎই এক তীব্র নেশায় মত্ত হয়ে এক গভীর দং;শ;ন বসিয়ে দিল সেথায়। তৃষার মুখ চিরে এক অস্ফুট আর্তনাদ বেরোবার পরমুহূর্তেই ওর হাত দুটো আর্যর পিঠের ওপর নখের আঁচড় কেটে বসল।

আর্য বাঁকা হেসে আকস্মিক কক্ষের সমস্ত আলো নিভিয়ে দিল। তৃষা ভয়ার্ত নেত্রে বিস্ফোরিত দৃষ্টি নিক্ষেপের পর মুহুর্তেই অনুভব করলো ওর ওষ্ঠাধরে কোনো গভীর তৃষ্ণার্ত পৌরুষ দখলদারিত্ব। ও বাঁ হাতে খামচে ধরল বিছানার চাদর;অপর হাতে আর্যর শার্ট। আর্যর হাতগুলো এবার তৃষার কোমরের ভাঁজে এক উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়েছে। তৃষার ক্ষীণ তনু আজ লতার মতো জড়িয়ে আছে সেই বিশাল বটবৃক্ষরূপী মানুষটার সাথে। সময়ের কাঁটা থমকে গেছে, বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর আকস্মিক শুরু হওয়া বৃষ্টির ছন্দপতনের শব্দ সব মিলিয়ে মায়াবী কুহকে পরিণত হয়েছে কক্ষটা।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪১

অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষে তখন কেবল দুটি তপ্ত হৃদয়ের দ্রুতলয় স্পন্দন। আর্যর বলিষ্ঠ আলিঙ্গনে তৃষার প্রতিটি কোষ আজ এক পরম পূর্ণতার স্বাদ পেতে মত্ত। বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে মিশে গেল তাঁদের নিবিড় অস্ফুট প্রণয়ধ্বনি। অবশেষে বহু মান-অভিমান আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে, তৃষ্ণার্ত দুটি হৃদয়ের মিলন-মাধুর্যে পূর্ণতা পেল এক শ্রাবণ-রজনীর অমর কাব্য।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৩

1 COMMENT

Comments are closed.