ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪৩
নওরিন কবির তিশা
দীর্ঘ রজনীর সমাপ্তি ঘটিয়ে নীলিমা রাঙিয়েছে ভোরের অরুনাভ। ফজরের পরবর্তী স্নিগ্ধ-পবিত্র প্রহর বিদ্যমান। মৃদু সমীরণে জানালার পর্দা গুলোও দুলছে। তৃষার অবস্থানটা এখনো আর্যর বক্ষদেশে। বেশ শক্তপোক্ত বাঁধনে ওকে বদ্ধ করে রেখেছে আর্য।
একটু নড়েচড়ে ওঠার চেষ্টা করতেই অনুভূত হলো,সমগ্র শরীরে মিষ্টি যন্ত্রণার রেশ। অবশ হয়ে আসা দেহটা যেন নিজের বশ মানতে চাইছে না। প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে এক অদ্ভুত শ্রান্তি বাসা বেধেছে। তবুও এই আবেশ ছেড়ে দূরে যাওয়ার সাধ্য কার? বহু কষ্টে ব্যথাতুর দেহটা সামান্য নাড়িয়ে ও মুখ তুলে চাইলো।
স্নিগ্ধ প্রভাতী রোদ্দুরে আর্যর মুখশ্রী এক অপার্থিব মায়ায় আচ্ছন্ন। কপালে এসে পড়েছে অবিন্যস্ত কেশ গুচ্ছ। কী অদ্ভুত প্রশান্তি লেগে আছে ওই চোখে-মুখে! শত সহস্র জনম তাকিয়ে থাকলেও মুগ্ধতা কমবে না লেশ মাত্র। তৃষা মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। মায়ার টানে অজান্তেই হাত বাড়াল ও; অত্যন্ত সন্তর্পণে আর্যর কোমল কেশরাশির ওপর আঙুল বুলাতে শুরু করল। কী ভীষণ মোলায়েম চুলগুলো, পুরুষ মানুষের চুল এতো নরম হতে আছে!
ধীরে ধীরে ওর তুলতুলে আঙুলগুলো আর্যর গলার কাছে নেমে আসতেই ও থমকালো মুহূর্তকাল। সেখানে স্পষ্ট হয়ে আছে গতরাতের উন্মাদনার নীরব সাক্ষী অসংখ্য নখরাঘাত আর খামচানির দাগ।মুহূর্তেই কাল রাতের সেই প্রগাঢ় মুহূর্তগুলো স্মৃতির পাতায় দোলা দিতেই লজ্জায় মুখ ঢাকলো ও!
তক্ষুনি হুট করে কোমরে তপ্ত এক জোড়া হাতের স্পর্শ পেল ও। আর্যর ধীরলয়ে চোখ মেলতেই তৃষা দেখল, সেখানে ঘুমের রেশ সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত;আর্যর ওষ্ঠকোণে দুষ্টু হাসির রেখা ফুটে উঠতেই তৃষা অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করে বলল,
“আপনি… আপনি জেগে ছিলেন? তার মানে এতক্ষণ ঘুমের নাটক করছিলেন?”
আর্য তৃষার কপালে লেপ্টে থাকা একগুচ্ছ কেশরাজ কানের পিছে গুঁজে দিয়ে গভীর স্বরে বলল,
“গুড মর্নিং, মিসেস এহসান। আর হ্যাঁ, নাটকটা খুব বেশি খারাপ হয় নি, তাই না?”
তৃষা অভিমানী সুরে বলে উঠল,
“ নাটকবাজ কোথাকার! ”
আর্য ওকে আরও একটু নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,
”ওয়াইফের কাছ থেকে শেখা। আমার অর্ধাঙ্গিনী যখন এত সুন্দর করে মায়ার জাল বুনতে পারে, তখন আমি একটু আধটু অভিনয় করলে ক্ষতি কী?আই ওয়াজ জাস্ট এনজয়িং দ্য মোমেন্ট’!”
তৃষার গাল দুটো মুহূর্তেই আরক্তিম বর্ণ ধারণ করল। ও আর্যর বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করে বলল,
“ছাড়ুন তো! অনেক হয়েছে। এবার উঠতে হবে। আজান দিয়ে দিয়েছে অনেকক্ষণ, নামাজ পড়তে হবে তো।”
আর্যর দুচোখে তখনো নেশাতুর আবেশ। ও তৃষাকে ছাড়ল না, বরং ওর থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বলল,
”নামাজ তো আমারও পড়তে হবে।বাট আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু লেট ইউ্য গো সো ইজিলি। এই ভোরবেলা তোমাকে আরও কিছুক্ষণ এভাবে আগলে রাখতে ইচ্ছে করছে।”
তৃষা মিনতিভরা চোখে তাকিয়ে বলল,
“ শুনুন না প্লিজ, শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে। ফ্রেশ না হলে ভালো লাগছে না। নামাজ পড়লে মনটা শান্ত হবে। আপনিও তো নামাজ মিস করেন না কোনোদিন।”
তৃষার কথায় আর্য এবার একটু নরম হলো। আলতো করে ওর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে বলল,,
“ঠিক আছে বাবা। চলো।”
তৃষা ওঠার জন্য পা বাড়াতেই সারা শরীরে সূক্ষ্ম ব্যথার লহরি বয়ে গেল। ও অবশ দেহটা নিয়ে টাল সামলাতে না পেরে পড়ে যেতে নিতেই আর্য এক মুহূর্ত দেরি না করে তৃষাকে আঁকড়ে ধরে পরমুহূর্তেই পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গিয়ে তৃষা ওর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“আরে! কী করছেন? আমি যেতে পারব।”
আর্য ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“চুপ! একদম কথা বলবে না।”
তৃষা মুখে প্রতিবাদ না করলেও মনে মনে বলল,,
“শুরু হয়ে গেছে হুমকি-ধামকি!”
আর্য এগিয়ে গেলো ওয়াশরুমের দিকে তৃষাও চুপটি করে ঘাপটি মেরে আর্য প্রশস্ত বুকের ওমে মাথা রেখে পরম তৃপ্তিতে চোখ বুজল।
নামাজ শেষে কক্ষ জুড়ে এক স্নিগ্ধ পবিত্রতা বিরাজমান । তৃষা জায়নামাজ গুছিয়ে পাশে রেখে হিজাবটা ভাঁজ করে আলনায় রাখল। তারপর জলসিক্ত চুলগুলো মেলে দিয়ে দর্পণের অভিমুখে দাঁড়িয়ে চিরুনি চালনা করতে শুরু করলো তাতে। দু-এক ফোঁটা পানি ওর কাঁধ ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়ছে। ঠিক তখনই আয়নার প্রতিবিম্বে ফুটে উঠল আর্যর অবয়ব। ও পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, দু-হাত পকেটে গুঁজে তৃষার দিকে তাকিয়ে আছে এক দৃষ্টে।
তৃষার নজর হুট করেই নিজের গলার দিকে গেল। আয়নার স্বচ্ছ কাঁচের ওপর ভেসে উঠল কাল রাতের উন্মাদনার চিহ্নগুলো। ওর গলার বিউটি বোন আর শুভ্র ত্বকের ভাঁজে ভাঁজে ফুটে আছে আর্যর দেওয়া অজস্র প্রণয়-ক্ষ’ত। কালচে লাল রঙের ক্ষ’তগুলো যেন স্পষ্ট ভাষায় কাল রাতের তৃষ্ণার কথা বলে দিচ্ছে।
মুহূর্তেই লজ্জার জায়গাটা দখল করে নিল প্রচণ্ড রাগ আর বিরক্তি। ও চিরুনিটা ধপ করে টেবিলের ওপর রেখে কটমট করে পেছনে ফিরে তাকাল।দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,
“এই যে মিস্টার! এটা কি করেছেন?”
আকস্মিক তৃষার এমন বদলে চমকে তাকালো আর্য,
“কি করেছি?”
তৃষা নিজের বিউটি বোর্নে হাত রেখে, দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,
“ কি করেছেন দেখতে পাচ্ছেন না? সবার সামনে আমি এই দাগ নিয়ে কীভাবে যাব? সবাই তো জিজ্ঞেস করবে!”
আর্য নিজের নাদান বউয়ের এমন কথায় প্রসারিত হেসে কয়েক কদম এগিয়ে এল। তৃষার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গভীর কন্ঠে বলল,,
“সিম্পল জানপাখি! জাস্ট ট্যেল দিম ইট ওয়াজ আ প্যাশনেট এক্সিডেন্ট। তা ছাড়া আমার দেওয়া চিহ্নগুলো তো তোমার সৌন্দর্যের ওপর আলাদা একটা আর্ট যোগ করেছে। লুকস লাইক ইউ আর মাইন, কমপ্লিটলি!”
তৃষার রাগ যেন এবার সপ্তমে চড়ল। ও আর্যর দিকে কর্নিষ্ঠা উঁচিয়ে বলল,
“স্টপ ইট! আপনার ফালতু রোম্যান্টিক ডায়ালগ এখন একদমই ভালো লাগছে না। এটা স্কার্ফ বা ওড়না দিয়েও সবটা ঢাকা সম্ভব না। হাউ ক্যুড ইউ বি সো কেয়ারলেস?”
আর্য এবার হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল। তবে চোখের সেই দুষ্টুমিটা গেল না। ও হুট করে তৃষার কব্জি চেপে ধরে নিজের দিকে টেনে নিল। তৃষা অপ্রস্তুত হয়ে ওর শক্ত বুকের ওপর আছড়ে পড়তেই আর্য নিজের কলারটা একটু সরিয়ে দিয়ে তৃষার চোখের সামনে মুখটা নিয়ে এল,,
“লিসেন ম্যাডাম, এবার আমার দিকে তাকাও। তোমার গলার ওই কয়েকটা দাগ নিয়ে তুমি এতো কমপ্লেইন করছো? জাস্ট লুক অ্যাট মি! আয়নায় নিজের রিফ্লেকশনটা একবার দেখো আর আমার মুখের দিকে তাকাও। তুমি আমার গালে আর গলার নিচে যে খামচানির দাগ রেখেছো, সেগুলো দেখে তো মনে হচ্ছে আমি কোনো মেছোবাঘের সাথে লড়াই করে এসেছি! এখন বলো, এই ফেস নিয়ে আমি বাইরে যাব কীভাবে? হু ইজ দ্য রিয়েল ভিকটিম হেয়ার?”
তৃষা আর্যর গলার সেই লম্বা নখরাঘাতের দাগগুলো দেখে মুহূর্তেই মিইয়ে গেল। ও বুঝতে পারল, ও নিজেও খুব একটা কম যায়নি। লজ্জায় সদ্য ফোঁটা কৃষ্ণচূড়ার ন্যায় রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে ওর ফর্সা মুখশ্রী। ও আমতা আমতা করে বলল,
“সে…সেটা তো তখন আমি… মানে আপনিই তো উস্কে দিয়েছিলেন!”
আর্য ওর কোমরে হাত রেখে আরও কাছে টেনে নিল। কপালে-কপাল ঠেকিয়ে নেশাতুর কণ্ঠে বলল,,
“ইটস ওকে বেবি। এই স্কারগুলোই আমাদের রাতের ক্রেজিনেসের সাক্ষী। ডোন্ট ট্রাই টু হাইড দেম। লেট দ্য ওয়ার্ল্ড নো দ্যাট উই আর ম্যাডলি ইন লাভ।”
তৃষা আর তর্কে পারল না। আর্যর প্রশস্ত বুকের ওমে নিজেকে সঁপে দিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল,
“আপনি একটা আস্ত পাগল!”
আর্য ওর কপালে একটা দীর্ঘ চুমু দিয়ে আলতো করে বলল, “অ্যান্ড দিস ক্রেজি ম্যান ইজ অনলি ইওরস, অলওয়েজ অ্যান্ড ফর এভার।”
ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় মেহসানার তন্দ্রা টুটল, জানলার বাইরে তখন উদীয়মান সূর্য আরক্তিম রেশ। আলস্য ঝেড়ে ও প্রাতঃকৃত্য সমাপনান্তে সবেমাত্র ঘরটিতে পা রাখল, হঠাৎই নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে সশব্দে বেজে উঠল ওর মুঠোফোনটি। আর্দ্র চুলের প্রান্ত ছুঁয়ে বিন্দু বিন্দু জলরাশি তখন চ্যুত হচ্ছে। ফোনের পর্দায় জ্বলজ্বল করছে আগে থেকে সংরক্ষণ করা নামখানি। ক্ষণিক দ্বিধাগ্রস্ত হৃদয়ে গভীর এক নিঃশ্বাস টেনে ও কম্পিত হস্তে ফোনটি তুলে নিল।
তবে ফোনের ওপ্রান্ত থেকে কোনো বাক্যস্ফূর্তির সুযোগ না দিয়েই ভেসে এল আদ্রিয়ানের চটজলদি কণ্ঠস্বর। মেহসানা অবাক হয়ে কিছু বলতে উদ্যত হয়েছিল, কিন্তু তার আগেই আদ্রিয়ান শুধাল,
“আর ইউ্য ফ্রি রাইট নাউ?”
মেহসানা বিমুঢ় হয়ে উত্তর দিল,
“হ্যাঁ, কিন্তু হঠাৎ এই ভোরে এমন প্রশ্ন কেন?”
আদ্রিয়ানের কণ্ঠস্বরে এক প্রচ্ছন্ন তাগিদ। সে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে বলল,
“ইন দ্যাট কেস, ক্যান ইউ প্লিজ কাম টু আওয়ার হাউস? অ্যাকচুয়ালি, আমি আপনার ফ্ল্যাটের নিচেই অপেক্ষা করছি।”
মেহসানার হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য যেন থমকে গেল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ও দ্রুতপদে ব্যালকনির অভিমুখে অগ্রসর হলো। শার্সি ঠেলে বাইরে তাকাতেই দেখল, ভোরের ধূসর আলোয় আদ্রিয়ানের কালো রঙের গাড়িটি নিচে দণ্ডায়মান। এমন অসময়ে আদ্রিয়ানের উপস্থিতিতে মেহসানা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ফোনের ওপ্রান্তে বিড়বিড়ালো,
“নিচে অপেক্ষা করছেন মানে? হঠাৎ কী এমন হলো যে এভাবে… আই মিন, সব ঠিক আছে তো?”
আদ্রিয়ান যেন তার মনের সংশয়টুকু আঁচ করতে পেরেই বাধা দিয়ে বলল,
“ডোন্ট পুশ মি উইথ সো মেনি কোয়েশ্চেনস, মেহসানা। জাস্ট কাম ডাউন অ্যাজ ফাস্ট অ্যাজ ইউ ক্যান। আই উইল এক্সপ্লেইন এভরিথিং ওয়ান্স ইউ্য আর হেয়ার। প্লিজ, বি কুইক!”
আদ্রিয়ানের কথায় মেহসানা আর দ্বিধা করল না। হৃদয়ের কম্পন তখনো প্রশমিত হয়নি, বরং এক অজানা কৌতূহল আর উদ্বেগের আবেশ ঘিরে ধরল ওকে। সে আর্দ্র কেশরাশি কোনোমতে সংবরণ করে দ্রুত সাজে নিজেকে গুছিয়ে নিতে লাগল। আলমারি থেকে একটি ছিমছাম পোশাক বের করে দ্রুত গায়ে জড়িয়ে দর্পণের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে একবার গভীর শ্বাস টেনে নিল অতঃপর আর সময়ক্ষেপণ না করে ক্ষিপ্রপদে কক্ষ ত্যাগ করল।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই মেহসানার দৃষ্টিগোচর হলো, আদ্রিয়ান ইতিমধ্যেই নিজ গাড়িটির দরজা খুলে আগে থেকেই দণ্ডায়মান। মেহসানাকে দেখামাত্রই তার চোখে-মুখে স্বস্তি নামলো। মেহসানা কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে ঠোঁট নাড়তেই, আদ্রিয়ান চোখের ইশারায় তাকে গাড়িতে ওঠার ইঙ্গিত দিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“নো মোর কোয়েশ্চেনস হেয়ার, মেহসানা। জাস্ট গেট ইন!”
মেহেসানাও মুখ কুঁচকে গাড়িতে উঠলো। আদ্রিয়ান গাড়ি স্টার্ট দিয়ে এগিয়ে চললো গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। তবে গাড়ি চলতে শুরু করতেই মেহসানা আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না। আদ্রিয়ানের একাগ্র ভঙ্গিতে গাড়ি চালনার দিকে তাকিয়ে ও বিস্ময়ভরা কণ্ঠে শুধালো,
“হঠাৎ এই কাকভোরে আমাকে এভাবে নিয়ে যাচ্ছেন কোথায়? আর এভরিথিং ইজ্য সো সাডেন! হুট করে এখন কোথায় যেতে হবে?”
আদ্রিয়ান স্টিয়ারিংয়ে শক্ত হাত রেখে সামনের দিকে তাকিয়েই ধীরস্থির কণ্ঠে উত্তর দিল,
“অ্যাকচুয়ালি মিস, সিচুয়েশনটা একটু হেকটিক। সাবরিনাকে আজ দেখতে আসছে। বাট দ্য প্রবলেম ইজ, আম্মু বাসায় একদম একা। ইভেন আব্বুও বেশ সিক। তৃষারাও এই মোমেন্টে এখানে নেই।”
ও এক মুহূর্ত থেমে মেহসানার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আবার বলল,
“জাহানারা আন্টি আর আম্মু দুজনেই সাজেস্ট করল আপনাকে সাথে নিয়ে যাওয়ার জন্য। মেহমানরা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে, সো উই নিড টু হারি আপ। আই হোপ ইউ্য ডোন্ট মাইন্ড!”
মেহসানা কিছুটা হকচকিয়ে গেল। পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে তার মনের সব দ্বিধা নিমেষেই উধাও হয়ে গেল। প্রাতঃকালীন সমীরণ ওর চুলে বিলি কেটে দিয়ে যাচ্ছে।জানালার বাইরে দ্রুতবেগে ধাবমান শহরটির দিকে তাকিয়ে ও শান্ত গলায় বলল,
“আপনি আগে বললে আমি হয়তো আরেকটু প্রিপারেশন নিয়ে আসতাম। অ্যানিওয়ে, আই আন্ডারস্ট্যান্ড। ফ্যামিলি ক্রাইসিসে আমাকে মনে করেছেন, দ্যাটস ইনাফ। চলুন, আশা করি সব ঠিকঠাক সামলে নিতে পারব।”
আদ্রিয়ানের ওষ্ঠকোণে এক চিলতে স্বস্তির হাসি ফুটে উঠল। মেহসানার এই সহজভাবে মেনে নেওয়াটা তার ভেতরের দুশ্চিন্তা অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। দ্রুতবেগে গাড়িটি এগিয়ে চলল গন্তব্যের দিকে,
“থ্যাংকস মিস সাউন্ড বক্স!”
আকস্মিক আদ্রিয়ানের এমন সম্বোধনের চোখ পাকিয়ে তাকালো মেহেসানা,
“আবার!”
আদ্রিয়ান দুষ্টু হেসে বলল,, “এই সম্বোধন টা যাওয়ার নয় মিস। সে আপনি যতই ক্লোজ হন না কেন!”
বেলা বাড়ার সাথে সাথে আদ্রিয়ানদের বাড়িতে মেহমানদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। ভেতরে চাপা গুঞ্জনই বলে দিচ্ছে, কাঙ্ক্ষিত অতিথিরা এসে পৌঁছেছেন। ড্রয়িংরুমে প্রবীণদের আসর জমেছে; আদ্রিয়ানের আম্মু আর মেহমানদের মুরুব্বিরা মিলে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করছেন। মিষ্টি আর নিমকির রেকাবিগুলো এক হাত থেকে অন্য হাতে ঘুরছে, এলাচ দেওয়া চায়ের সুঘ্রানে মম করছে সমগ্র ড্রয়িং রুম।
ওদিকে অন্দরে সাবরিনাকে সাজানোর গুরুদায়িত্ব পড়েছে মেহসানার কাঁধে। সাবরিনা কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে আয়নার সামনে। মেহসানা অতি নিপুণ হাতে ওর চুলে একটা জুঁই ফুলের গাজরা জড়িয়ে দিয়ে হেসে বলল,
“এত নার্ভাস হওয়ার কিছু নেই সাবরিনা। ইউ্য লুক অ্যাবসোলিউটলি গর্জিয়াস! আর রায়াদ ভাই তো তোমার নিজেরই পছন্দের মানুষ, তাই না?”
সাবরিনা লাজুক হেসে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।হঠাৎ আদ্রিয়ান দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে বলল,
“আর ইউ্য রেডি গাইজ? মেহমানরা কিন্তু ওয়েট করছে।”
মেহসানা ভ্রু কুঁচকে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,,
“একটু ধৈর্য ধরুন মিস্টার! সাবরিনাকে রেডি করতে টাইম তো লাগবেই। জাস্ট গিভ আস ফাইভ মিনিটস!”
আদ্রিয়ান মুচকি হেসে প্রস্থান করল। কিছুক্ষণ পর সাবরিনাকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করল মেহেসানা। নিচু মস্তকে সাবরিনা গুরুজনদের সালাম দিয়ে তাদের সম্মতিক্রমে সোফায় বসল, রায়াদের দৃষ্টি তখন তার ওপর নিবদ্ধ।রায়াদের মা রুম্পা বেগম, সাবরিনার থুতনি ধরে মুখটা তুলে ধরে মৃদু হেসে বললেন,
“মাশাআল্লাহ! ছবি দেখেছিলাম ঠিকই, কিন্তু সামনাসামনি মেয়েটি আমার হিরের টুকরো। রায়াদ, তোর পছন্দ তো দেখছি লাজবাব!”
রায়াদ লাজুক হাসল। পরিবেশটা সহজ করে দিতে আদ্রিয়ানের বাবা সোফায় একটু নড়েচড়ে বসে বললেন,,
“আসলে, আপনাদের মেয়ে পছন্দ হলে আমাদের ইচ্ছে ছিল অনুষ্ঠানটা খুব দ্রুত করার।”
পাশ থেকে রায়াদের মা সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে বললেন,,
“এমন আসমানী হুরকে হাতছাড়া করা যায়, ভাইসাহেব? মেয়ে আমাদের খুব পছন্দ।”
রায়াদের বাবা এবার যোগ করলেন,
“হ্যাঁ,আর বড় কথা এই মাসের ভেতরেই রায়াদের ছুটি শেষ হয়ে যাবে। তাই আমরাও চাচ্ছি এই সময়ের মধ্যেই আকদ আর ছোটখাটো একটা রিসেপশন সেরে নিতে। বিয়ের পর সাবরিনাকে মাকেও তো ইউকে নিয়ে যেতে হবে। প্রসেসিং করতে কিছু সময় লাগে, সো উই ওয়ান্ট টু স্টার্ট অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল।”
মেহসানা পাশ থেকে সাবরিনার হাতটা আলতো করে চেপে ধরল। সাবরিনার দৃষ্টিতে আনন্দ-আবেগের মিশেল।আদ্রিয়ান এবার চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বলল,
“ডিসিশন ফাইনাল তাহলে?”
রূম্পা বেগম খুশিতে সাবরিনাকে একটি সোনার আংটি পরিয়ে দিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ, সামনের শুক্রবারই বরকতময় দিন। ওই দিনই তাহলে পবিত্র কাজটা হোক না হয় !”
সাবরিনা এক ঝলক রায়াদের দিকে তাকিয়েই পরক্ষণে দৃষ্টি সরালো। হাসি-কান্না, আনন্দ আর অনাগত ভবিষ্যতের একরাশ পরিকল্পনা নিয়ে ড্রয়িংরুমের সেই আসরটি একটি সার্থক পরিণতির দিকে এগিয়ে চলল।
অস্তগামী সূর্যের ম্রিয়মাণ আভায় গ্রাম্য পথটি মায়াবী রূপ ধারণ করেছে। দুপাশে সোঁদামাটির ঘ্রাণ আর বাঁশঝাড়ের সর্সরে শব্দে সান্ধ্যকালীন এক নিস্তব্ধতা বিরাজমান। পেইনকিলারের প্রভাবে শরীর থেকে শ্রান্তি হটেছে তৃষার,ব্যাথারা প্রশমিত। পল্লীপ্রকৃতির কোলে ঘেঁষা মেঠো পথ ধরে হাঁটছিল ওরা তিনজন; আর্য-তৃষা-টুইংকেল।
টুইংকেল হঠাৎ আর্যর দিকে তাকিয়ে কৌতুহলী কণ্ঠে শুধালো,,
“পাপা, লুক! ফড়িংগুলো ওভাবে কেন উড়ছে? আর দে ড্যান্সিং?”
আর্য হেসে নিচু হয়ে টুইংকেলকে কোলে তুলে নিল। ওর নাকে নাক ঘষে বলল,
“মেবি মাম্মাম। দে আর এনজয়িং দ্য ইভিনিং জাস্ট লাইক আস। তোমার ভালো লাগছে?”
টুইংকেল তৃষার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ভীষণ! বাট বানি, তুমি কেন এত সাইলেন্ট? পাপা তোমাকে বকেছে? আর ইউ্য আপসেট?”
তৃষা অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। আর্যর দিকে তাকাতেই দেখল লোকটা এক ভ্রু নাচিয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। তৃষা টুইংকেলের গাল টিপে দিয়ে বলল,
“না সোনা, বানি একদম ঠিক আছে। আসলে গ্রামের এই শান্ত বিকেলটা বানিকে মেসমেরাইজড করে দিয়েছে।”
আর্য তৃষার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“নাকি সকালের সেই প্যাশনেট এক্সিডেন্ট এর কথা ভেবে এখনো…..?”
ওকে কথার ইতি টানতে না দিয়েই তৃষা ওর বাহুতে আলতো কিল বসিয়ে দিয়ে ফুঁসে উঠল,
“আহ! টুইংকেল আছে তো! একটু তো লজ্জা পান!”
আর্য অট্টহাসি হেসে উঠল। টুইংকেল খিলখিল করে হেসে বাবার গলা জড়িয়ে ধরল। ঠিক তখনই নদীর পাড় ঘেঁষে থাকা বিশাল শিমুল গাছটার নিচে ওদের দৃষ্টি স্থির হলো। নদীর শান্ত জলের পটভূমিতে দেখা যাচ্ছে আরিশাকে। কিন্তু ও একা নয়! ওর সামনে একটি ছেলে হাঁটু গেড়ে বসে আছে, হাতে একটা টকটকে লাল গোলাপ। তৃষা বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল,
“ও মাই গড! ওটা কি আরিশা? আর ছেলেটা কে?”
আর্যর চোখদুটোও কিঞ্চিৎ সরু হয়ে এলো। তৃষা তৎক্ষণাৎ ওদিকে এগিয়ে যেতে গেলেই আর্য ওর হাত আঁকড়ে ধরল,তৃষা অবাক হয়ে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি মিলতেই আর্য বলল,,
“এখন ওখানে যেও না। জাস্ট লিভ দেম অ্যালোং!”
“কিন্তু?”
“সব কিন্তুর উত্তর হয় না তুমি বাসায় চলো আমি বুঝিয়ে বলছি।”
রজনীর নিস্তব্ধতা চরাচরকে গ্রাস করেছে, মেহসানা আদ্রিয়ানদের বাড়ির প্রশস্ত ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দন্ডায়মান। নৈশ সমীরণে তার অবিন্যস্ত কেশরাশি দুলছে। মাথার ওপর অনন্ত নক্ষত্রবীথি আর রুপোলি চাঁদের স্নিগ্ধ জোছনায় চরাচর যেন এক মায়াবী রূপালি চাদরে আবৃত। নৈশভোজের পর হামিদা বেগম কিছুতেই মেহসানাকে যেতে দেননি; অগত্যা এই বিজন রাতে আকাশের পানে চেয়ে নির্জনতা উপভোগ করছিল সে। হঠাৎ পিছে পরিচিত পদধ্বনি কর্ণগোচর হতেই ফিরে তাকাতেই দেখল, আদ্রিয়ান ধীরলয়ে ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
“আপনি?”
“আন ইজি লাগছে?”
“না!”
“তাহলে একটু দাঁড়ানোর পারমিশন পাচ্ছি?”
“অফকোর্স!”
ক্ষণিকের নিস্তব্ধতা; আকস্মিক মেহসানা নিরবতা ভেঙে কৌতূহলী কণ্ঠে শুধাল,,
“আচ্ছা, একটা বিষয় খুব জানতে ইচ্ছে করছে। কিছু মনে না করলে বলি?”
আদ্রিয়ান ওর দিকে ভরসা সূচক দৃষ্টি মিলতেই ও বলতে শুরু করল,,
“জাহানারা আন্টিদের সাথে আপনাদের রিলেশনটা ঠিক কেমন? আই মিন, আর্য ভাইয়ারা তো খুলনার মানুষ, আর আপনারা এখানে। এই স্ট্রং বন্ডিংটা শুরু হলো কীভাবে?”
“অ্যাকচুয়ালি, আম্মু আর জাহানারা আন্টি ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড। আর্যর ভাই যখন মাহেরিনের জন্য ওর ফ্যামিলি ছেড়ে চলে আসে, তখন ও ছিল একদম একা। তখন জাহানারা আন্টিই আম্মুকে রিকোয়েস্ট করেছিলেন আর্যর খেয়াল রাখার জন্য।”
মেহসানা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল। আদ্রিয়ান আবার বলতে লাগল,,
“আম্মু তখন নিজের পরিচয় গোপন রেখে আর্য আর টুইঙ্কেলকে নিজের কাছে আশ্রয় দেন। আর্য শুরুতে জানতোই না যে আম্মু ওর মায়ের বন্ধু। হি জাস্ট নিউ আস অ্যাজ আ হেল্পফুল ফ্যামিলি। এভাবেই আমাদের মধ্যে ওই ফ্যামিলি বন্ডিংটা তৈরি হয়েছে যা এখন একটা পার্মানেন্ট রিলেশনে টার্ন করেছে।”
মেহসানা মুগ্ধ হয়ে বলল,
“ইটস সো হার্ট-টাচিং! মানুষের বিপদে এভাবে ছায়ার মতো পাশে থাকাটা সত্যিই রেয়ার। নাউ আই আন্ডারস্ট্যান্ড, হোয়াই দিস বন্ড ইজ সো স্পেশাল।”
আদ্রিয়ান মেহসানার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্বরে বলল,
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৪২
“লাইফে কিছু মানুষ ঠিক এভাবেই হুট করে আসে, আর অজান্তেই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়,লাইক ইয়্যু মিস সাউন্ড বক্স!”
শেষ কথাটা বড্ড আস্তে বলল আদ্রিয়ান যার দরুন কর্ণগোচর হলো না মেহসানার। হঠাৎ নামা বিস্তর নিস্তব্ধতা যেন আকাশের নক্ষত্রদের সাথে মিতালী তৎপর হলো।
