Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৮

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৮

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৮
তানিয়া হুসাইন

ভালোবাসার মানুষের এই রুপ সে কিভাবে মেনে নেবে।
যে ঘরটায় প্রতিটা কোনায় তার ভালোবাসার স্মৃতি, যেখানে একসময় নিশ্বাস নিলে নিরাপত্তা জড়িয়ে ধরত, আজ সেখানে বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে।
যেই হাতে সে তাকে ভালোবেসে আগলে রাখেছে,
সেই হাতেই লেগে আছে মানুষের র*ক্ত।যাকে সে ফুলের মতো করে যত্ন করে,যার চোখে সে ভালোবাসা খুঁজে পায়,সে মানুষটা কিভাবে আরেকজনকে এতটা নিষ্ঠুরভাবে মারতে পারে?
ইশায়া ভাবে,ভাবতেই থাকে।তাদের সেই সুন্দর মুহূর্তগুলো একে একে ভেসে ওঠে চোখের পাতায়।হাসি, যত্ন, ভালোবাসা, নির্ভরতার স্পর্শ, নিঃশব্দ প্রতিশ্রুতি।সেই মূহুর্ত গুলোর ওপর আছড়ে পড়ে কালকের সেই ঘটনাগুলো।র*ক্ত, চিৎকার, আর নি*র্মমতা।দুটো স্মৃতি একে অন্যকে ছিঁড়ে ফেলছে।

ইশায়া খুব করে চাইছে এই ঘটনাগুলো যেন মিথ্যা হয়।
সবকিছু যেন একটা দুঃস্বপ্ন হয়।ঘুম ভাঙলেই যেন সব ঠিক হয়ে যায়।কিন্তু ঘুম তো ভেঙেই গেছে।
কিভাবে সে ঘৃণা করবে এই লোকটাকে?যাকে সে ভালোবাসে,যার নাম ভাবলেই বুকের ভেতর কাঁপন ওঠে তাকে ঘৃণা করার শক্তিটুকু যে তার নেই। যে সবসময় তাকে ভালোবাসার চাঁদরে মুড়িয়ে রাখে তাকে কিভাবে ঘৃণা করবে সে।
ইশায়ার চোখের জলের বাঁধ ভাঙে না। অশ্রু গড়িয়ে পড়ে।শ্বাস ভেঙে ভেঙে আসে।অনবরত কান্না করতে থাকে ইশায়া।
এই সবের মাঝে স্বপ্নের ঘটনাগুলো সরে যায় ইশায়ার মাথা থেকে কালকের সব কিছু নিয়ে ভাবতে থাকে,ভীরের হিংস্র আচরন গুলো মনে করতে থাকে।

অনেকক্ষণ কাঁদার পর একসময় ইশায়া থামে।নিজেকে সামলায় এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না।ইশায়া উঠে মুখে হাত বুলিয়ে অশ্রু মুছে ফেলে, গভীর শ্বাস নেয় কয়েকবার।রুমে হঠাৎ কখন কে চলে আসে ইশায়া
ধীরে ধীরে আলমারির দিকে যায়।পেটে তার অসহ্য ব্যাথা,ফ্লোরে পা ও ফেলতে পারছেনা।দরজা খুলতেই সাজানো পোশাকগুলো চোখে পড়ে,ভীরের পছন্দ কেনা, তার জন্য বেছে রাখা।প্রতিটা কাপড়ে যেন এক অদৃশ্য অধিকার লেগে আছে।একটা ড্রেস নেয় ইশায়া।
মুখে একটু পানি ছিটায়।চেষ্টা করে নিজেকে স্বাভাবিক করতে।ইশায়া রুমে আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা নক করব কেউ।
একটা পরিচিত কণ্ঠ,

___ম্যাম…?
দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে এলিজা।তার চোখ দ্রুত ইশায়ার মুখ স্ক্যান করে নেয়।লালচে চোখ, চাপা কান্নার চিহ্ন কিছুই তার দৃষ্টি এড়ায় না।
এলিজাকে দেখে ইশায়া হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে ওঠে।
তার চোখে একরাশ প্রশ্ন, একরাশ আতঙ্ক সে কিছু বলতে যাবে,
ঠিক তখনই.এলিজা খুব সূক্ষ্মভাবে চোখের ইশারায় তাকে থামায়।সেই দৃষ্টিতে ছিল সতর্কতা।ইশায়া এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে যায়।সে বোঝে,এই ঘরে কথা বলা যাবে না।ইশায়া শান্ত হয়ে যায়।নিজেকে গুটিয়ে ফেলে আবার।
এলিজা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে খাবারগুলো গুছিয়ে রাখতে থাকে।ট্রে টেবিলে রাখে, ন্যাপকিন ঠিক করে, গ্লাসে পানি ঢালে।সবই খুব সাধারণ তবুও তার আঙুলের নড়াচড়া অস্বাভাবিকভাবে সচেতন।
খাবার গুছাতে গুছাতে এলিজা হাতের আঙুল দিয়ে খুব সূক্ষ্মভাবে কিছু একটা দেখায় ইশায়াকে।
একটা নির্দিষ্ট দিক।তার চোখ এক সেকেন্ডের জন্য ইশায়ার চোখে আটকে যায়, চোখের ইশায়ার শব্দ বিনিময় করে, সবকিছু গুছিয়ে এলিজা স্বাভাবিক গলায় বলে ওঠে,

___ম্যাম, এই দুইটা আইটেম কিন্তু খাবেন। আপনার জন্য আজ করেছি স্পেশালি। আপনার অনেক পছন্দ হবে।
এলিজার কথায় ইশায়ার কপালে ভাঁজ পড়ে।
সে খাবারের দিকে তাকায়।আবার এলিজার দিকে।
পরক্ষণেই সে বুঝতে পারে এলিজা হয়তো হেয়ালি করছে।এই সাধারণ বাক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কিছু।কিছু বোঝানোর চেষ্টা।ইশায়ার বুকের ভেতর ধকধক শুরু হয়।
এলিজা আবার বলে,

__খেয়ে নিবেন ম্যাম দ্রুত, নাহয় ঠান্ডা হয়ে যাবে।
শব্দগুলো ইচ্ছে করেই জোর দিয়ে বলা।তারপর আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না এলিজা।দরজা খুলে বেরিয়ে যায় রুম থেকে।এখানে থাকা এখন তার জন্য বিপদ।
এলিজা চলে যেতেই কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে থাকে ইশায়া।তার বুকের ভেতরটা কেমন ধুকপুক করছে।
ইশায়া এগিয়ে যায় টেবিলের দিকে, খাবারের দিকে তাকায়।ঢাকনাটা উঠাতেই ইশায়া দেখে খাবারের জায়গায় সুন্দর করে রাখা আছে একটা ঔষধের ছোট্ট সিসি,একটা চিরকুট,আর একটা ছোট্ট ছু*ড়ি।ইশায়া ভীষণ অবাক হয় এটা দেখে।কিন্তু কোনো শব্দ করে না, দ্রুত চারপাশে তাকায় পর পর এগুলো ওড়নার পেছনে লুকিয়ে নেয় আলগোছে।চলন এতটাই স্বাভাবিক যেন সে শুধু প্লেট সরাচ্ছে।
ইশায়া এক সেকেন্ড ও নষ্ট না করে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায় ইশায়া।পা কাঁপছে হালকা, কিন্তু মুখে কোনো ভাব নেই।ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে ইশায়া কয়েক মুহূর্ত।সে জানে না আর কি আসবে তার সামনে।আর কি আসতে চলেছে।
সে এতদিনে অনেক কিছুই টের পেয়েছে, কিভাবে ভীর তাকে একটার পর একটা মিথ্যা কথা বলেছে সে জানে। তার স্বপ্নে দেখা ঘটনা গুলোযে অবাস্তব না এটাও সে বুঝছে।কারন বার বার একই জিনিশ দেখে সে।সেই এক মানুষ গুলো একই কথা।
ইশায়া জানেনা আর কোন নির্মম সত্য তার সামনে আসবে এই ভেবেই ভয় পাচ্ছে সে।নিজেকে শক্ত করে ধীরে ধীরে মুঠো খোলে ইশায়া।চিরকুটটা ভাঁজ করা।

____ইশায়া ভাঁজ খুলে পড়তে শুরু করে
প্রথম লাইন পড়তেই তার কপালের ভাজ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠে।এলিজা তাকে গল্প কেনো শোনাচ্ছে এতো হেয়ালি কেনো।ইশায়া প্রথমে বিরক্ত হলেও পরেএকেকটা শব্দ, একেকটা বাক্য তার শরীরে কাঁটার মতো বিঁধতে থাকে।
আদনান রহমান, সায়মা রহমান।আদনান সাহেবের তিন ছেলে-মেয়ে।দুইটা ছেলে, একটা মেয়ে।
বড় ছেলের নাম আবির রহমান।তার স্ত্রী এর নাম জান্নাত।আদনান রহমানের ছোট ছেলে তার নাম আদ্রিয়ান রহমান।
ইশায়া যখন নাম গুলো পড়ছিলো তার ভেতরটা অজানা কারনে ছটফট করছিলো তখন।আর তার একমাত্র আদরের মেয়ে, সবার ছোট ইশায়া জারিন রহমান।
নিজের নাম পড়তেই ইশায়ার চোখ বড় হয়ে যায়।
ঢোক গিলে সে, ইশায়া থামে সামনে এমন কি আছে এই ভয় হচ্ছে তার।নিজেকে সামলে আবারো পড়তে শুরু করে।
সে ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে।হাসিখুশি পরিবার তার।ইশায়া বাবা-মা, দুই ভাইয়ের চোখের মণি।বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে।আর দুই ভাইয়ের আদরের ছোট বোন।
তার নাম মানে কি সে -ই কিন্তু ভীর তো তাকে অন্যকিছু বলেছিলো।

___একটা হাসিখুশি সুন্দর পরিবার ভাইয়ের সাথে খুনসুটি এগুলো প্রায়-ই তার মনে আসে,সে স্বপ্ন এ দেখে অনুভব করে।
ইশায়ার হঠাৎ মনে হতে লাগে চিঠির শব্দগুলো কাগজে লেখা নয় তার বুকের ভেতর খোদাই করা স্মৃতি।এগুলো তার খুব চেনা খুব পরিচিত নাম গুলো তার জানা।
সাফা আহমেদ।
নামটা পড়তেই ইশায়ার আজকের স্বপ্নের কথা মনে হয়।হ্যাঁ এই নাম ছিলো কিন্তু ইশায়া তো এলিজাকে বলেনি তাহলে সে কিভাবে জানো।
ইশায়ার শরীর অস্বাভাবিক ভাবে ঘামতে শুরু করে।

ইশায়ার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।সে সব মিলাতে থাকে,এগুলো… এগুলো কি তার তার অতীত,তার ঘর,তার মানুষ।
হঠাৎ চিঠির ভাষা বদলে যায়।ভাবছো তো ইশায়া আমি অন্যের কাহিনি তোমাকে কেন শোনাচ্ছি?
এগুলো অন্যের কাহিনি না, ইশায়া।এগুলো তোমার জীবনের কাহিনি।তুমি-ই সেই মেয়ে
আদনান রহমান আর সায়মা রহমানের একমাত্র মেয়ে ইশায়া জারিন রহমান।
ইশায়া বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠে।পরের লাইন পড়তেই ইশায়া স্তব্ধ হয়ে যায়।
রাজভীর আলভারেয হলো একজন গ্যাং*স্টার।
মাফিয়া বস রাজভীর আলভারেজ। কিং অফ শ্যাডো।
যার এক একটা ইশারায় পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ড চলে।
ইশায়ার শরীর কাঁপছে।সে একেকটা লাইন বারবার করে পড়ছে।বোঝার চেষ্টা করছে কথাগুলো।
মনে হচ্ছে শব্দগুলো বদলে যাবে, অন্য কিছু হয়ে যাবে।
কিন্তু না।ওগুলো ঠিক সেখানেই আছে।

__পৃথিবীর এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যা ভীর করে না।ও তোমাকে বলেছে এক্সিডেন্টের কারণে তোমার স্মৃতিশক্তি মুছে গেছে।আসলে ও তোমার স্মৃতিশক্তি মুছে দিয়েছে।দিন দিন ওষুধের প্রভাবে তোমাকে পাগল বানিয়ে রেখেছে।নিজের হাতের পুতুল করেছে।
যেভাবে সে চালাচ্ছে, ঠিক সেভাবেই তুমি চলছো।
ইশায়া হঠাৎ ঠান্ডা ফ্লোরে বসে পড়ে।তার মাথা কাজ করছে না।ওই মেয়েটার মুখ…গত রাতের দৃশ্য…নিকো তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল তার মানে ওগুলো তো মিথ্যা না।
ঢোক গিলে আবার পড়তে শুরু করল।ওই যে তুমি আমাকে বলো।সবচেয়ে বেশি তুমি একটা মেয়েকে দেখোহ্যাঁ, সে সাফা।
তোমার বোন।যাকে ভীর আর নিকো মেরেছে তোমার চোখের সামনে।
ইশায়ার চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।হৃদপিণ্ডের শব্দ কানে বাজছে।মনে আছে কি না তোমার জানি না।
কিন্তু কিছুদিন আগে তোমার মাকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করে নিক ভীফের র নির্দেশে। ।কিচেনে সি*লিন্ডার ব্লা*স্ট করিয়ে।

লেখাটা পড়তেই ইশায়া মনে করার চেষ্টা করে। হ্যাঁ সে দেখেছে ঝাপসা আগুন।চিৎকার ধোঁয়া।শাড়ির আঁচল জ্বলছে…ইশায়ার চোখের কোণ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। না তার স্পষ্ট মনে নেই,কিন্তু এরকম কিছু যেনো হয়েছিলো।
তোমার বড় ভাই আবিরকে তুলে নিয়ে মেরে পঙ্গু করে ছেড়ে দিয়েছে।তোমার সব মনে পড়বে একদিন, আমি জানি। কিন্ত সেদিন পর্যন্ত আমি থাকব না।তাই তোমাকে আগে থেকেই সব জানিয়ে যাচ্ছি।
তোমার বাবা আদনান রহমান আর বেঁচে নেই।
এই লাইনটা পড়তেই ইশায়ার বুক থেকে যেন শব্দ বের হলো একটা নিঃশব্দ আর্তনাদ।তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে।
এলিজা সত্যের আড়ালে মিথ্যার জাল বুনেছে।
কিন্তু এই মুহূর্তে ইশায়ার মস্তিষ্ক পার্থক্য করতে পারছে না কোনটা সত্য, কোনটা মিথ্যা।গত চার মাসে সে অনেক অস্পষ্ট স্বপ্ন দেখেছে।অনেক কিছু তার মনে হয়েছে।র*ক্ত,চিৎকার,আগুন।কিন্তু সব ছিল ঝাপসা।
এক মাস ধরে সেগুলো স্পষ্ট হচ্ছিল।আর কাল রাতের দৃশ্য।সেটা তো জলজ্যান্ত।সবকিছু যেন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে যাচ্ছে এখন।ইশায়া থামে না।চোখের পানি মুছে আবার পড়ে।
প্রতিটা শব্দ তার ভেতরের দেয়াল ভেঙে দিচ্ছে।
ওয়াশরুমের আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি।ফ্যাকাসে মুখ, কাঁপা ঠোঁট, ভয়ের গভীর ছায়া।সে কি সত্যিই একটা পুতুল।
তার ভালোবাসা কি একটা সাজানো কারাগার।
রাজভীরের চোখে যে কোমলতা সে দেখেছে।সেটা কি অভিনয়?ফ্লোরের ঠান্ডা টাইলসে বসে থাকা ইশায়া আর আগের সেই নরম, ভয় পাওয়া মেয়ে না।তার চোখে প্রথমবারের মতো জন্ম নিচ্ছে সন্দেহ।
আর সেই সন্দেহের আগুন একদিন সবকিছু পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।

___আমার কথা যদি তোমার বিশ্বাস না হয়,তুমি তোমার ডাইরি খুজে বের করো।তুমি ডাইরি লিখতে।তোমার প্রতিটি কথা তুমি ডাইরির পাতায় লিখে রাখতে।ওরা তোমার ডাইরি খুজেছিলো কিন্তু পায় নি কোথাও,তাহলে এটা তোমার রুমেই আছে,হয়তো তুমি নিজেই কোথাও লুকিয়ে রেখেছ যে জন্য তারা পায়নি। তুমি খুজে দেখো।।তোমার পড়া বইগুলোর মাঝেও অনেক কিছু থাকতে পারব তুমি দেখো তাহলে তোমার বিশ্বাস হবে।আমি মিথ্যা বলছিনা ইশায়া।
ইশায়া এতোটুকু পড়েই উঠে আসে,আজ সে সব সত্য বের করবে।ওয়াশরুমের দরজা খুলে বাইরে বেরোনোর পর ইশায়ার মনে হয় এই ঘরটা আর আগের মতো নেই। সবকিছু একই আছে, অথচ সবকিছু বদলে গেছে।
তার চোখ দুটো লাল, কিন্তু ভেতরে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা।
চিঠিটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরে সে রুমের চারপাশে তাকায়,সবকিছু তল্লাশি করেপ্রথমে ধীরে তারপর অস্থিরভাবে।ড্রয়ার খুলে,ওয়ারড্রোব সব জায়গা খুজে,

ড্রেসিং টেবিলে,বিছানার ম্যাট্রেস উল্টে ফেলে দেয়।কিন্তু কিছুই নেই।যেন কেউ আগে থেকেই সব পরিষ্কার করে রেখেছে।ভীর হয়তো সব সরিয়ে ফেলেছে।
ইশায়ার বুকের ভেতর আবার ধকধক করতে শুরু করে।কিন্তু সে থামেনা, দ্রুত পা বাড়ায় তার রুমের সাথে অ্যাটাচ আরেকটা ছোট রুমে যেটা প্রায় স্টাডি রুমের মতো।চাবি খুজে বের করে লক খুলে।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই
দেয়াল জুড়ে বড় বড় বইয়ের তাক, অ*স্ত্রের সমাহার।ফাইলের তাক।
ইশায়ার চোখ যায় বইয়ের দিকে অনেক অনেক বই,
গল্পের বই,নভেল,ফাইল।ইশায়া পাগলের মতো একটার পর একটা বই টেনে নামাতে থাকে।মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলছে,পাতা উল্টে দেখছে।
ভেতরে কিছু আছে কি না খুঁজছে।ধুলোর গন্ধে নিশ্বাস ভারী হয়ে আসছে।কিন্তু সে থামছে না।বইগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মেঝে জুড়ে পড়ে আছে।তার চুল এলোমেলো।হাত কাঁপছে।হঠাৎ একটা মোটা স্কেচবুক তাকের পেছন থেকে পড়ে যায় মেঝেতে।ইশায়া স্কেচবুকটা তুলে নেয়।মলাটটা ধুলোমাখা।আঙুল দিয়ে ঝেড়ে খুলতেই প্রথমেই একটা বাড়ি লেখা আসে রহমান ভিলা।
ইশায়ার আকা ছবিগুলো যেনো বাস্তবে ফুটে ওঠা একেকটা জীবন্ত দৃশ্য। পরিবারের সুন্দর সুন্দর মুহূর্ত আকা স্কেচে।আদনান রহমানের হাসিমাখা মুখ, চোখের কোণে স্নেহের ভাঁজ এত জীবন্ত যেন তিনি এখনই ডাকবেন, ইশু…
ইশায়া পাতা উল্টায়।তার মা সায়মা রহমান।শাড়ির আঁচল কাঁধে, ঠোঁটে হাসি।চোখে সেই অদ্ভুত শান্তি, যেটা শুধু মায়ের চোখেই থাকে।

আরেকটা পাতা।
দুই ভাই আবির আর আদ্রিয়ান।হাসছে।তার দিকে তাকিয়ে আছে।
আরেকটা পাতা।সে নিজে।হালকা ঢেউ খেলানো চুল।
চোখে একরাশ স্বপ্ন।
ইশায়ার হাত থেকে স্কেচবুকটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।এই আঁকাগুলো।এই হাতের রেখা…এই স্টাইল এগুলো তারই আঁকা।
মুহূর্তেই এলিজার কথাগুলো মাথার ভেতর প্রতিধ্বনিত হলো।এগুলো তোমার জীবনের কাহিনি।তার বুক ফেটে যাচ্ছে তার বাবা আর নেই।ইশায়া স্কেচবুকটা বুকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কান্না করতে থাকে
চোখের পানি কাগজে পড়ছে।কালি ছড়িয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু সে থামাতে পারছে না।
মাথার ভেতর এতদিনের ঝাপসা দৃশ্যগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল।বাড়ির ডাইনিং টেবিলে সবাই একসাথে খাওয়া।মায়ের হাসি।আবিরের আদর।
আদ্রিয়ানের খুনসুটি।। সাফা আপুর সাথে আড্ডা ঘুরা, গল্প। সাফার চিৎকার, র*ক্ত।সবকিছু এখন পরিষ্কার।সে পু*তুল ছিল না।সে অ*সুস্থ ছিল না।সে পা*গল না।তার স্মৃতি কেড়ে নেওয়া হয়েছে।তার জীবন কেড়ে নেওয়া হয়েছে।ভীরের চোখের সেই কোমলতা তার যত্ন তার আদর সবকিছু কি তাহলে অভিনয়?নাকি ভালোবাসার আড়ালে নির্মম বন্দিত্ব? ইশায়া ধীরে ধীরে চোখ মুছে। তার কান্না থেমে আসছে।কিন্তু চোখে এখন অন্য কিছু শোক না স্পষ্ট ঘৃণা। স্কেচবুকটা শক্ত করে ধরে ইশায়া দাঁড়ায়।হ্যাঁ তার মনে আছে ডাইরির কথা সে লুকিয়ে রেখেছিলো।আলমারির নিচের তাকের একটা বক্সে সবার আড়ালে যাতে কারোর হাতে না পড়ে।

মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা বইয়ের ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে থাকে,সে এখন এই মূহুর্তে সেই কোমল ভীতু ইশায়া না।সবকিছু স্পষ্ট হয়ে গেছে তার কাছে।এবার পালা সত্যের মুখোমুখি হওয়ার।
এই সাম্রাজ্যে সে থাকবেনা,শেষ করে ফেলবে নিজেকে নাহলে ভীরকে।
ইশায়ার পা কাঁপছে, কিন্তু গতি থামছে না।ইশায়া রুমে গিয়ে আলমারি খুলে সবার নিচ থেকে একটা বক্স বের করে,জুয়েলারির বক্স।হ্যাঁ সেখানই চামড়ার মলাট দেওয়া তার পুরোনো ডাইরি।কাঁপতে থাকা হাতে ইশায়া সেটা খুলে।পাতাগুলোতে তার নিজের হাতের লেখা তারিখ,তার কাটানো সেই বিষাক্ত দিনগুলো।এগুলো পড়তে পড়তেই ইশায়া সেই দিনগুলোতে চলে যায়।
কিছু অদ্ভুত এলোমেলো লাইন যেন কোনো ভয় তাকে তাড়া করত।সবকিছু মিলে গেছে এলিজার কথা।
স্কেচবুক।ঝাপসা স্মৃতি।
ডাইরিটা রেখে ইশায়া আবার চিঠিটার দিকে তাকায়।না এখনও শেষ হয়নি।সে আবার পড়তে শুরু করল।
জানি না এখনো তোমার বিশ্বাস হয়েছে কি না।

কিন্তু তোমার মতোই আমিও আমার বোনকে হারিয়েছি।ওই নিকো আমার বোনকে ইউজ করে…আর ভীর তাকে মেরে ফেলে।নিজের বোনের বদলা নিতেই এসেছিলাম আমি এখানে।কিন্তু আমার হাতে আর সময় নেই।তাই আমি চাই তোমার আর আমার সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ তুমি নাও।আমার তো শুধু বোন মারা গেছে।কিন্তু তোমার পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দিয়েছে ওই ভীর।
ইশায়ার চোখ ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে আসে।
ভেতরের কোমলতা স্তরে স্তরে জমাট বাঁধছে।
ইশায়া দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু তার মনে হচ্ছে সে মাটির নিচে ডুবে যাচ্ছে।
এইখানে একটা ছুড়ি আছে।এটা তোমার কাজে আসবে।শেষ করে দাও তাকে যে তোমার বোনকে মেরেছে।আদ্রিয়ানের জীবন শেষ করেছে।তোমার বাবাকে মেরেছে।তোমার মাকে সন্তান স্বামীহারা করেছে।তোমার বড় ভাই আজ হুইলচেয়ারে।তার স্ত্রী-সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছে।তাকে তুমি ছেড়ে দিও না, ইশায়া।তাকে তাকে ছেড়ে দিলে তোমার পরিবারের প্রতি অন্যায় হবে। সাফার সাথে অন্যায় হবে।
তুমি ভীরের সাথে ভালোবাসায় কিভাবে মেতে উঠলে যে তোমার ভাইয়ের পবিত্র ভালবাসা শেষ করে ফেলেছে। সাফা আদ্রিয়ানের জীবন শেষ করে দিয়েছে।
ইশায়ার নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠে আদ্রিয়ান…বাবা… মা…
আবির ভাই…প্রতিটা নাম যেন আগুন হয়ে শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে তার।

__ভীর তোমার সাথে মাইন্ড গেম খেলছে।প্রয়োজন শেষে তোমাকেও ছুড়ে ফেলবে।মাফিয়াদের ক্লাবে তোমাকে নিলামে তুলবে।এটাই ভীরের প্ল্যান।
ইশায়ার মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে আসছে।মাথার ভেতর শব্দ থেমে গেছে।শুধু হৃদস্পন্দনের শব্দ শুনা যাচ্ছে।
__তুমি হয় ভীরকে শেষ করো না হয়.ভীরের এই।অংশকে, যা তোমার মধ্যে বেড়ে উঠছে,আরেকটা শ*য়তানকে এনো না।ভীরের রক্ত ভীরের মতোই হবে কলুষিত।এইখানে এই ঔ*ষধ আছে।এগুলো খেলে নষ্ট হয়ে যাবে এই বা*চ্চা।এখন তুমি জানো কি করবে।
কিন্তু তোমার কাছে একটা অনুরোধ।আমি ন থাকলে ও,আমার হয়ে প্রতিশোধটা তুমি নিও।
শেষ লাইনটা পড়তেই ইশায়ার হাত কাঁপে।তার সামনে একটা ছুরি।এক বোতল ঔষধ।একটা ধ্বংসস্তূপ হয়ে যাওয়া অতীত।আর একটা অন্ধকার ভবিষ্যৎ।
এ কি তার সামনে আসলো?
ইশায়ার চোখে এখন আর জল নেই।ভয় নেই।শুধু জমাট বাঁধা এক তীব্র সিদ্ধান্তের ছায়া।প্রতিশোধের আগুন ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে তার ভেতর।কিন্তু সেই আগুনের পাশে একটা নরম, অব্যক্ত অনুভূতিও আছে।
কারণ সে জানে যাকে শেষ করার কথা ভাবছে,সেই তাকেই ভালোবেসেছে সে সবচেয়ে গভীরভাবে।
ইশায়ার বুকের ভেতরটা ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। বুক চাপড়ে সে শুধু একটাই শব্দ উচ্চারণ করে যাচ্ছে,

__বাবা… বাবা…
শব্দটা দেয়াল ভেদ করে বেরিয়ে যেতে চাইছে, অথচ ফিরে এসে আঘাত করছে তার নিজের বুকেই।
সাফার আর আবিরের বিষয়, কিচেনে আগুনের ঘটনাটাও তার মনে আছেকিন্তু আদনান রহমানের মৃ*ত্যু সম্পর্কে সে কিছুই সে জানে না।বাবার মৃত্যুর খবর শুনে ইশায়া পুরো ভেঙে পড়ে।এলিজার সেই মিথ্যে, বানোয়াট কথাটা। যে কথায় দোষটা ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে রাজভীর আলভারেযের উপর এই মিথ্যাটা ইশায়া মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে ফেলে। তার ভাঙা মন তখন যুক্তি মানার অবস্থায় নেই।
বাবার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো মনে করতে চায় ইশায়া।
বাবার সাথে মেলায় ঘোরা, পড়তে না পারলে বাবার ধৈর্য্য ধরে বোঝানো, পরীক্ষার আগের রাতে মাথায় হাত রেখে দোয়া করাকিন্তু এখনো সবকিছু স্পষ্ট না তার কাছে।সব কিছু মনে হচ্ছে না তার।
মনে করার চেষ্টা করলেই যেন স্মৃতিগুলো কুয়াশার আড়ালে হারিয়ে যায়।শুধু একটা জিনিস পরিষ্কার
বাবার জন্য বুক ফেটে যাচ্ছে।নিজের অসহায়ত্বে ডুকরে কেঁদে ওঠে ইশায়া। সেই কান্না আর শব্দ করে বেরোয় না, গলা ভেঙে গেছে। বুক কেঁপে ওঠে, শ্বাস আটকে আসছে।ভীরের সাথে এতদিনের সব মুহূর্তগুলো তার কাছে বিষে পরিণত হয়।যে দৃষ্টি একসময় তাকে কাঁপিয়ে দিত, যে স্পর্শে সে অদ্ভুত নিরাপত্তা খুঁজে পেত
সব আজ ঘৃণায় পরিণত হয়েছে।তার নিজের উপর রাগ উঠছে।তাকে মিথ্যে দুনিয়ায় নিয়ে এসেছে।

কেন সে বিশ্বাস করেছিল?কেন সে দুর্বল হয়েছিল?
রাগ উঠছে এই অনাগত সন্তানের উপরও।
তার হাত অনিচ্ছায় পেটে গিয়ে থামে।
এই সন্তান যে তার রক্ত, তার অস্তিত্বের অংশ আজ তার কাছে শিকল হয়ে গেছে।ইশায়ার মনে হয় আমি আমার বাবা হারিয়েছি আপনার জন্য।আমার ফুপি-ফুফা তাদের একমাত্র মেয়েকে হারিয়েছে।ছোট দাদা ভাই তার ভালোবাসা হারিয়েছে।আমার বাবা-মা আমাকে হারিয়েছে।ইশায়ার চোখ দুটো রক্তিম হয়ে ওঠে।
হারানোর যন্ত্রণা কি সেটা আপনি বুঝবেন।
যখন নিজের সন্তানকে নিজের অংশকে হারাবেন তখন বুঝবেন হারানোর যন্ত্রণাটা ঠিক কি।
আপন কাউকে হারানোর অনুভূতি তখন বুঝবেন, রাজভীর আলভারেয।
মনে মনে এই কথাগুলো আওড়াতে থাকে ইশায়া। যেন অদৃশ্য কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে শপথ নিচ্ছে।
মেক্সিকোর সেই বিলাসবহুল প্রাসাদের ভেতরে বন্দী ইশায়া রহমানের হৃদয়টুকু আজ সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে।
তার মাথায় আর কিছু আসে না।মস্তিষ্ক পুরো শূন্য হয়ে এসেছে।চোখ খোলা, অথচ দৃষ্টি ফাঁকা।কান্না থেমে গেছে, কিন্তু বুকের ভেতরে ঝড় চলছে।এক ক্রুদ্ধ মা হতে চলা নারীযার সমস্ত ভালোবাসা আজ ঘৃণায় রূপ নিয়েছে।আর সেই ঘৃণার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে একটাই নাম।রাজভীর আলভারেয।

_____এদিকে এলিজার এখন আর কিছুর ভয় নেই। ধরা পড়লেও তার কিছু যায় আসে না, কারণ একটা কাজ সে করে ফেলেছে। এমন এক কাজ, যার ফল একবার ছড়িয়ে পড়লে আর ফেরানো যাবে না।
তার বিশ্বাস, ইশায়াকে সে যা বলেছে এখন ইশায়া ক্ষ্যাপা বাঘিনীর মতো আচরন করবে।কারন একটা মেয়ের কাছে তার বাবার থেকে আপন পৃথিবীতে আর কেউ নেই। ইশায়া যদি ভীরকে মেরে ফেলতে পারে।তাহলে তো আর সব শেষ। নিজের ভালোবাসার হাতেই শেষ হবে তার গল্প।
আর যদি তা না ও হয়, তবুও সে এমন একটা ফাঁদ পেতে দিয়েছে, যেখান থেকে কারও মুক্তি নেই।
এলিজার ঠোঁটের কোণে বিকৃত হাসির রেখা। চোখে নিষ্ঠুর ঝিলিক। ওই ছোট্ট ঔষধের কৌটো যেটা সে নিখুঁতভাবে লুকিয়ে রেখেছিল তার ভেতরে মি*সক্যারেজের ঔষধ নয়, বি*ষের ট্যাবলেট। এমন বি*ষ, যা খেলে ইশায়ার চ্যাপ্টার সারা জীবনের মতো বন্ধ হয়ে যাবে। একেবারে চিরতরে।তার কল্পনায় দৃশ্যটা স্পষ্ট ইশায়া নিথর হয়ে পড়ে আছে, আর ভীর… বেঁচে থেকেও মৃ*ত। কারণ ভীর ইশায়ার জন্য কতটা উন্মাদ, সেটা এলিজা নিজের চোখে দেখেছে। সে দেখেছে ভীরের সেই হিংস্র দৃষ্টি, যা মুহূর্তে দুনিয়া জ্বালিয়ে দিতে পারে কিন্তু ইশায়ার সামনে এসে তা গলে যায়।সরাসরি ভীরকে শেষ করার চেয়ে, তিলে তিলে শেষ হবে এটাই বেশি নি*র্মম,এটাই উপযুক্ত শাস্তি হবে তার। প্রতিটা মুহূর্তে ছটফট করবে সে। শ্বাস নিতে পারবে, কিন্তু বাঁচতে পারবে না। চারপাশে থাকবে ক্ষমতা, অ*স্ত্র, সাম্রাজ্য কিন্তু যার জন্য সে সবকিছু, সেই ইশায়া থাকবে না। আর এই শূন্যতাই তাকে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলবে।
এলিজা ভীরকে এমন একটা ক্ষত দিয়ে যাবে, যা কোনোদিন শুকাবে না সেটাই প্রকৃত প্রতিশোধ। সে চায় ভীর বেঁচে থাকুক। বেঁচে থেকে প্রতিটা রাত প্রতিটা ভোর প্রতিটা সময় যন্ত্রনায় ছটফট করুক। আর বুঝুক যাকে আগলে রাখতে চেয়েছিল, তাকে সে নিজেই হারিয়েছে।এলিজার চোখে কোনো অনুতাপ নেই। শুধু প্রতিহিংসার বিকৃত তৃপ্তি। দাবার চাল সে আগেই বসিয়ে দিয়েছে এখন শুধু অপেক্ষা, কখন ঘুঁটি নড়বে আর কখন পুরো সাম্রাজ্য ধসে পড়বে।

____নিক দাতে দাঁত চেপে বলে,
ব্রো, ভেতরের কেউ ছাড়া এটা সম্ভব না। কোনভাবেই সম্ভব না। এইভাবে প্যালেসের মধ্যে ঢুকে আসা, এতো সিকিউরিটি থাকতে এটা ইনসাইড জব।
রাজভীর স্থির হয়ে বসে আছে কিন্তু তার স্থিরতা আগ্নেয়গিরির আগের নীরবতা। মুঠো করে ধরা হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। চোয়াল শক্ত। চোখে জমে থাকা আগুন ধীরে ধীরে রক্তবর্ণ হয়ে উঠছে।
সে ঠান্ডা গলায় বলে,
খোজে বের করো কে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। যে করেই হোক। রেজাল্ট চাই আমি।
ভীরের রাগে শরীর কাপছে।এখনো কিছু জানতে পারেনি। সে কিছুতেই মানতে পারছে না।তার প্যালেসে, তার সাম্রাজ্যে, তার চোখের সামনে কিভাবে এরকম কিছু হলো?এই প্রাসাদ শুধু বাড়ি নয়। এটা তার শক্তির প্রতীক। তার শাসনের সীমানা। এখানে তার অনুমতি ছাড়া একটা একটা পিপড়া ঢোকে না।আর এখন কি হচ্ছে।
ভীর হঠাৎ গর্জে উঠে

___মাতেও আর লুকার কি আপডেট?
ম্যাটিয়াস কোথায়?সে কি কাজ করছে যে এখনো ওদের আস্তানা খোজে বের করতে পারলো না?
___ম্যাটিয়াস ট্র্যাকিং টিম নিয়ে বের হয়েছে, ব্রো। লুকা আর মাতেও লোকেশন ফিড চেক করছে। কিন্তু…
কিন্তু কথাটা শেষ করতে পারল না সে। কারণ রাজভীরের চোখে যে আগুন জ্বলছে, এখানে অজুহাতের কোনো জায়গা নেই।
ভীর গম্ভীর গলায় বলে,
___আমার প্যালেসে কেউ ঢুকেছে। আমার সিকিউরিটি ভেঙেছে। মানে কেউ আমার খুব কাছের মানুষ… আমার সিস্টেমের ভেতরেই পচন ধরেছে। বাইরের কেউ এটা করতে পারবেনা।এখানে আমার বিশ্বস্ত কেউ আছে।আমি সেই বিশ্বাসঘাতককে চাই। জীবিত বা মৃ*ত তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু আমি তাকে চাই।
রাজভীরের মাথার ভেতর শুধু একটাই চিন্তা ঘুরছে।যেই হোক, যেখানেই লুকিয়ে থাকুক, সে ঠিক-ই খুজে বের করবে তাকে।
এই প্যালেসে আজ থেকে যুদ্ধ শুরু হবে।ভেতরের শত্রু বাইরের শত্রুর চেয়েও বেশি ভয়ংকর।
পুরো রুম ভীরের ক্রোধের তাপে দগ্ধ হচ্ছে।
নিক এগিয়ে আসে,

___শান্ত হও ব্রো। দেখছি আমি, ওর সাথে যোগাযোগ করবো।
রাজভীর কিছু বলে না, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ায় ভীর, নিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
__কাউকে সন্দেহ জনক মনে হলে সাথে সাথে আমাকে জানাবে। তুমি যাও, কাজ কতটুক দেখো।
নিক মাথা নেড়ে সরে যায়।
___তার মাথায় খু*ন চড়ে আছে এখন।কিন্তু এই মুহূর্তে তার প্রয়োজন অন্য কিছু।ভীর রুমের দিকে যায়
ইশায়ার উঠার সময় হয়ে গেছে।।ইশায়াকে বোঝাতে হবে সবকিছু।
হ্যাঁ, প্রথমে সে ভালোভাবেই বোঝাবে। শান্তভাবে।
সে নিজেকে সংযত রাখবে। কিন্তু এরপর কি হবে
সেটা পুরোপুরি নির্ভর করছে ইশায়ার উপর।

_______ইশায়ার মাথায় আর কিছুই আসে না।
মাথার ভেতর যেন ঝড় উঠেছে সব শব্দ থেমে গেছে, শুধু বুকের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক শব্দ।বিধ্বস্ত সে।
এলিজার দেওয়া ঔষধের কৌটাটা হাতে নেয়। ইশায়া
চোখ বন্ধ করে লম্বা একটা শ্বাস নেয়।
তারপর কৌটার সবগুলো ঔষধ ঢালে নিজের হাতার মধ্যে।
ফিসফিস করে বলে ওঠে,

___আপনার জন্য আমি বাবাকে হারিয়েছি… পরিবার হারিয়েছি… এখন আপনি বুঝবেন আপনজন হারানোর ব্যাথা।নিজের অনাগত স*ন্তান হারাবেন আপনি।আপনার স*ন্তান আমি রাখবোনা।
ইশায়ার চোখ দুটো রক্তাভ, কান্নায় ফুলে ওঠা।ইশায়া হাতের ঔষধগুলোর দিকে তাকায়।ছোট ছোট সাদা ট্যাবলেট।
ইশায়া ঔষধগুলো একত্রে মুখে নিবে ঠিক সেই সময় হঠাৎ করেই দরজা খুলে যায়।
ভেতরে ঢুকে ভীর।
ভীর রুমে ঢুকে থমকে দাঁড়ায় ইশায়াকে দেখে।

তার থেকেও বেশি অবাক হয় রুমের এই অবস্থা দেখে
ভাঙা ফুলদানী, ছড়িয়ে থাকা কুশন, উল্টে যাওয়া চেয়ার…আর ইশায়ার তাকে দেখে ঘাবড়ে যাওয়া মুখ।
ইশায়া কারোর উপস্থিতি অনুভব করতেই হাত মুঠো করে ঔষধগুলো পিছনে লুকিয়ে নেয়।
ভীর স্থির,শিকারি চোখে তাকিয়ে আছে ইশায়ার দিকে।
তার চোখে সেই ঠান্ডা, ধারালো দৃষ্টি।
ইশায়ার চোখে মুখের বিদ্ধস্ত অবস্থা স্পষ্ট।চুল এলোমেলো, ঠোঁট শুকনো, চোখের নিচে গাঢ় ছাপ।
পুরো শরীর কাঁপছে ভীর সেটা দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছে।
এদিকে ইশায়ার দম আটকে আসছে ভীরকে এই মুহূর্তে এখানে দেখে।এই সময় সে কেন?ভীরের চোখের দৃষ্টি স্থির ইশায়ার উপর।কিন্তু তার দৃষ্টি শুধু মুখে নয়
বারবার গিয়ে থামছে ইশায়ার হাতের দিকে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৭

যে হাত পিছনে লুকিয়ে রেখেছে সে ।
ইশায়া বুঝতে পারছে সে পারবে না ভীরের থেকে কিছু লুকাতে।
এই মানুষটা মানুষ নয় অন্ধকারে থাকা শিকারি প*শু।
ভীর রক্তলাল চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
তার চোখের পাতা পর্যন্ত পড়ছে না।
ইশায়া দু-পা পিছিয়ে যায়।তার মনে হচ্ছে পা দুটো ভারী হয়ে গেছে। ইশায়া পিছনে…

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৭৯