Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৯ (২)

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৯ (২)

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৯ (২)
ফাহিমা ইসলাম

রৌদ্রিক কিছু সময় পর দৃষ্টি ধীরে ধীরে নামলো তূর্ণার নিস্তেজ দেহাবশেষের উপর থেকে। সেই দৃষ্টি আর মানবিক রইলো না তা পরিণত হয়েছে ক্ষোদের প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখায়। তার শিরায় শিরায় যেন উত্তাল লাভা প্রবাহিত হচ্ছে, প্রতিটি শ্বাসে জমা হচ্ছে ঘৃণার বিষাক্ত বাষ্প। চোয়াল শক্ত হয়ে পাথরের মতো জমাট বেঁধেছে, আর দু’চোখে জ্বলে উঠছে নীরব মহাপ্রলয়ের অগ্নি। এক পলকের জন্যও শব্দ করলো না সে। অত্যন্ত যত্নে তূর্ণাকে বিছানার উপর শুইয়ে দিলো যেন ভেঙে যাওয়া কোনো অমূল্য প্রতিমা, যার প্রতিটি ভাঙন তার নিজের অস্তিত্বকে বিদীর্ণ করছে। তূর্ণার বিধ্বস্ত দেহটা কাঁপছে, অথচ সে অচেতনতার প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে নিদারুণ আতঙ্ক আর অতীতের বিকৃত স্মৃতির মিশ্রণে তার মানসপট হয়ে উঠেছে এক দুঃস্বপ্নের গোলকধাঁধা। আধখোলা নেত্রপল্লবে ভাসছে অস্পষ্ট ছায়ামূর্তি, প্রতিটি ছায়া যেন নতুন করে তাকে গ্রাস করতে উদ্যত হচ্ছে। নাকের গড়িয়ে পরা র*ক্তগুলো শুঁকিয়ে উঠেছে। তার শ্বাসপ্রশ্বাস অগোছালো, কণ্ঠনালিতে আটকে থাকা আতঙ্কিত আর্তনাদ বেরোতে পারছে না। শুধু ঠোঁট কাঁপছে নিঃশব্দ আর্তিতে।

“ছুঁইও না… আমায় ছুঁইও না…জিসান ভাই!” ‘অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করে উঠলো তূর্ণা, বাস্তব আর বিভ্রমের সীমারেখা সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে সে।’
এই একটুকু বাক্যই যথেষ্ট ছিলো। রৌদ্রিকের ভিতরে এতক্ষণ ধরে জমে থাকা সংযমের শেষ প্রাচীরটুকুও ভেঙে চুরমার হয়ে গেলো। সে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালো, রুমা সিকদারের দিকে তাকিয়ে হিমশীতল ভয়ংকর কণ্ঠস্বরে বলে-
“ চাচি ওকে কিছু সময়ের জন্য দেখে রাখ। আমি একটু পরই আসচ্ছি।”
কথাটুকু শেষ করে ধীর পায়ে বারান্দার দিকে পা বাড়ালো। প্রতিটি পদক্ষেপে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিলো আসন্ন সর্বনাশের সংকেতে। বারান্দার দিকে এগিয়ে গিয়ে থেমে গেলো সে। রাতের অন্ধকারে তেমন কিছু না দেখা গেলেও, কিছু একটা চোখে পরতেই মুঠোবদ্ধ হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। নখের আঁচড়ে তালু ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে তবুও সে ব্যথা অনুভব করছে না। রুমা সিকদার তূর্ণার নিস্তেজ হয়ে থাকা ক্ষতবিক্ষত দেহাবশেষের দিকে তাকিয়ো কেঁদে উঠলেন। কিছু সময় আগেও মেয়েটাকে সুস্থ অবস্থায় দেখলেন, আর এই একটু সময়ের মধ্যে এতকিছু বয়ে গেলো মেয়েটার উপর দিয়ে। মেয়েটা বার বার তাকে বলছি সঙ্গে আসতে, কয়েকবার তাকে রিয়ানের উদ্দেশ্য করে পঁচা লোক,পঁচা লোক করেছে অথচ সে-ই পাত্তা দেয়নি। রুমা সিকদার উঠে তূর্ণার একটা জামা বের নিলেন, রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে ভেজা গলায় বলে-

“ তুই একটু বাহিরে যা, ওর জামাটা পাল্টে দেয়ই।”
রৌদ্রিক শক্ত মুখে রুম থেকে বের হয়ে সোজা নিচে চলে যায়। সবাই তখন ড্রইংরুমেই উপস্থিত, রাগের অসম্ভব রকমে তার মুখশ্রী লালচে হয়ে আছে। ক্ষোধে তার কপালের নীল রগ গুলো ফুলে উঠেছে, রাশেদুল সিকদার রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে-
“ কি হয়েছে রৌদ্রিক? এমন রেগে আছো কেনো?”
রৌদ্রিক কোনো জবাব দিলো না, হনহনিয়ে সোজা বাহিরে বাগানের দিকে চলে গেলো। কেউই বুঝলো না রৌদ্রিকের হঠাৎ রেগে যাওয়ার কারণটা কি। রৌদ্রিক বাগানের পিছন দিকটাতে এসে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কাউকে খুঁজলো। কিছু সময় পর গেট দিয়ে ঘামতে থাকা রিয়ানকে প্রবেশ করতে দেখতে পেলো। রৌদ্রিক নৈঃশব্দের সেদিকে বড় বড় পা ফেলে রিয়ানের কাছে এগিয়ে গেলো। এদিকে রিয়ান এমনিই হাসফাস করছে, বার বার কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছে। হুট করেই রৌদ্রিক কে নিজের অতি নিকট এসে দাঁড়াতে দেখে ঘাবড়ে গেলো রিয়ান। নিজের মধ্যে থাকা ভয়টা লুকানোর চেষ্টা করে, কোনো রকম হাসার চেষ্টা করে বলে-

“ আ..আরে রৌদ্রিক ভাই। তুমি কখন এলে?”
রিয়ানের কথা শুনে রৌদ্রিক দাঁতে দাঁত খিঁচিয়ে বলে ওঠে-
“ কিছু খুঁজছিস নিশ্চয়ই?”
বলেই হাতে থাকা ভাঙা ঘড়িটা রিয়ানের সামনে তুলে ধরে। রিয়ান রৌদ্রিকের হাতে ঘড়িটা দেখতে পেয়ে শুঁকনো ঢোক গিলে নিলো। কোনো রকমের রৌদ্রিকের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলে ওঠে-
“ এ..এটা কোথায় পেয়ো ভাইয়া? এটা তো হারিয়ে গেছিলো।”
“ হারিয়ে গেছিলো? ইন্টারেস্টিং! তা তোর ঘড়ি আমার বারান্দায় হারায় কি করে? হাতে কামড় কে দিয়েছে?”
রৌদ্রিকের কণ্ঠস্বর যতটুকু না শান্ত, তার থেকেও বেশি ভয়ানক শোনাচ্ছে। রিয়ান নিজের হাতের হাতা টেনে হাতটা ঢাকার চেষ্টা করলো, তবে কিছুই হলো না। রৌদ্রিকের তীক্ষ্ণ, বিচক্ষণ দৃষ্টিগোচরে সবটা বন্দী হয়ে গেছে। রিয়ান হাত দিয়ে নিজের কপালে জমা ঘামটুকু মুছে কোনো রকমে বলে-
“ আ..আরে এটা কামোড় না। ওই এমনিই রাস্তায় আসার সময় ব্যথা পেয়েছি।”
কথাটুকু শেষ করা মাত্রই রৌদ্রিক শক্ত হাতে থাবা দিয়ে রিয়ানের আঘাতপ্রাপ্ত জায়গায়টা চেপে ধরলো। হিংস্র বাঘের ন্যায় গর্জে উঠে বলে-

“ হাউ ডেয়ার ইউ টাচ হার, ইউ বাস্টার্ড! রাস্তায় ব্যথা পেয়েছিস তাই না? চল তোকে এবার আসল ব্যথার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেই।”
বলেই নিজের পেকেটে থাকা ছোট একটা সার্জাকাল ব্লে*ড বের করলো। এইগুলো ছোট হলেও এইগুলো প্রচন্ড রকমের ধারালো। রৌদ্রিক তূর্ণার কামড়ে দেওয়া জায়গাটায়ে তীব্র ভাবে একের পর এক পোঁচ দিতে শুরু করে, মুহুর্তেই সেখানটা কে*টে গল গল করে রক্ত ঝড়তে শুরু করে। রিয়ান ব্যথায় আর্তনাদ করে ওঠে, বাড়ির দারোয়ানরা এদিকেই তাকিয়ে আছে। রৌদ্রিকের এমন হঠাৎ হিংস্রতার কারণ তারাও বুঝলো না। রিয়ান ধাক্কা দিয়ে নিজের হাত রৌদ্রিকের নিকট থেকে ছড়িয়ে নেয়। রৌদ্রিক যেনো আরও ক্ষিপ্ত বাঘ হয়ে উঠল, গর্জে উঠে বলে-
“ কু*** বাচ্চা আমার বাড়িতে দাঁড়িয়ে, আমার রুমে গিয়েই তুই আমার ওয়াইফের গায়ে হাত দিস কোন সাহসে? জানিস না আমার জিনিসে অন্যের হাত দেওয়া নিষেধ সেখানে তুই আমার ওয়াইফে কি ভাবে ধরলি?”
বলেই এলোপাতাড়ি মা*রতে থাকে। রিয়ান প্রতিরক্ষার জন্য রৌদ্রিকের সঙ্গে সমান তালে হাত চালাচ্ছে, তবুও রৌদ্রিকেট শরীরের যেনো অস্বাভাবিক শক্তি ভড় করেছে। রৌদ্রিক রিয়ানকে মারছে আর অকথ্য ভাষা গালি দিচ্ছে। বাহিরের এত হট্টগোল শুনে বাড়ির ভিতরের মানুষ বাহিরে চলে এসেছে। তূর্ণা অবস্থার কথা এখনো কেউ জানে না, রৌদ্রিকে এমন ক্ষিপ্ত ভাবে রিয়ানকে মারতে দেখে চমকে যায় সকলেই। রোহান তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে থামাতে চেয়ে বলে ওঠে-

“ কি হয়েছে ভাইয়া? রিয়ানকে মারছো কেনো?”
রৌদ্রিক কারো কথাই কানে নিচ্ছে না, এদিকে রিয়ানের নাক সহ ঠোঁট কে*টে র*ক্ত বের হচ্ছে। রৌদ্রিক সময়ের সঙ্গে আরও হিংস্র হয়ে উঠছে, কেউ কিছু বুঝতেও পারছে না। সবাই বার বার থামার জন্য আর কি হয়েছে সেটা জানতে চাচ্ছে। শেষমেশ আর না পেরে রোহান আর শ্রাবণ মিলে রৌদ্রিকের কাছ থেকে রিয়ানকে ছাড়িয়ে আনে। রৌদ্রিক নিজেকে ওদের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে সকলের দিকে রক্তচক্ষু করে তাকিয়ে গর্জে উঠে বলে-
“ তোমরা সবাই থাকতেও এই বাস্টার্ড কি করে আমার ওয়াইফের গায়ে হাত দেয়। ওর প্রতি তোমরা এই সামান্য নজরটুকু রাখতে পারোনি? কি করে এতটা কেয়ারলেস হতে পারো তোমরা?”
রৌদ্রিকের কথা শুনে সকলেই অবাক হয়ে যায়। তারা সকলেই রিয়ানের দিকে তাকালো, রিয়ান দৃষ্টি নামিয়ে রেখেছে। রিয়ান যে এমনটা করতে পারে সেটা তাদের ভাবনায়ও ছিল না, রাশেদুল সিকদার এগিয়ে এসে শক্ত হাতে ঠাস করে রিয়ানের গালে চড় বসিয়ে গর্জে উঠে বলে-

“ তোমার সাহস দেখে অবাক হচ্ছি। এত বড় কাজ কি করে করলে? তাও আমাদের বাড়িতে দাঁড়িয়ে থেকে!”
রোমানা সিকদার আর জবা সিকদার রৌদ্রিকের কথা শোনা মাত্রই বাড়ির ভিতরে চলে গেছেন রৌদ্রিকের রুমের দিকে। রৌদ্রিক আবারও হামলে পরে রিয়ানের উপর, এবার কেউ বাঁধা দিলো না। বরৌ সকলেই ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। রৌদ্রিক সেই ব্লে*ডটা নিয়ে রিয়ানের দিকে তাকিয়ে ভয়ংকর ভাবে বলে ওঠে-
“ওকে তুই স্পর্শ করেছিলি? এই হাতটাই দিয়ে? আমার জিনিসে অন্য কারোর ছোঁয়া আমি সহ্য করি না, সেখানে তুই ওকে তোর এই নোংরা হাত দিয়ে ছোঁয়ার দুঃসাহস করেছিস। এর শাস্তি তো পেতেই হবে তোকে।”
বলেই ব্লে*ডটা দিয়ে রিয়ানের হাতের তালু থেকে শুরু করে গোটা হাতটাতে একের পর এক আঘাত করতে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই সারা হাত কে*টে র*ক্তাক্ত হয়ে গেছে, রিয়ান ব্যথায় ছটপট করছে। রিয়ান সরে দাঁড়াতে চাইলে শ্রাবণ এসে চেপে ধরলো তাকে। তারও ফর্সা মুখ একই ভাবে রাগে লাল হয়ে এসেছে। রাশেদুল সিকদার এগিয়ে এলেন, বাচ্চারা এখানে আসে। রৌদ্রিকের এমন হিংস্র দেখে তারা ভয়ে ছিটিয়ে গেছে। রাশেদুল সিকদার রৌদ্রিকের পাশে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় বলে-

“ রৌদ্রিক ওকে ছাড়, বাকিটা পুলিশ দেখবে। এমনিও ওর কঠিন শাস্তি হবে, আমার বাড়ির মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়ার মত অপরাধ করেছে। এমনি এমনি ছেড়ে দিবো না।”
রৌদ্রিক রাশেদুল সিকদারের কথারটুকু শুনেও না শোনার মত থাকলো। রিয়ানের হাত একদম কে*টে রফাদফা অবস্থা, টপটপ করে র*ক্ত গড়িয়ে পরছে। হাতের অবস্থা একদম নাজেহাল অবস্থা! রৌদ্রিক শেষবারের মত সবথেকে তীব্র ভাবে ব্লে*ড দিয়ে আঘাত করে ছেড়ে দেয়। রিয়ানের আর্তনাদে চারিপাশটা ভড়ে উঠেছে, ব্যথায় ছটপট করছে সে। রৌদ্রিক আর ওর দিকে তাকালো না সোজা বাড়ির ভিতরে চলে গেলো। সবাই রৌদ্রিকে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো, রৌদ্রিক সবসময় শান্ত আর চুপচাপ স্বভাবের। তার রাগটাও খুব কম দেখেছে সবাই, রাগলে রৌদ্রিক ভয়ংকর ভাবে রেগে যায়। মিথিলা একসাইডে দাঁড়িয়ে তূর্ণার জন্য রৌদ্রিকের করা হিংস্রতা দেখছিলো সে। এই মুহুর্তে তূর্ণা ওই অবস্থার জন্য তার বিন্দুমাত্র মায়া লাগলো না, বরং মনে হলো তূর্ণা সঙ্গে যা হয়েছে বেশ হয়েছে। রৌদ্রিক যেতেই শ্রাবণ রিয়ানের কা*টা হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো। এতে যেনো রিয়ান মরণ যন্ত্রণায় কাচরাতে শুরু করলো।

রুমের সামনে আসা মাত্রই বিছানার কোণে গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকা তূর্ণা চিৎকারগুলো রৌদ্রিকের কর্ণকুহরে এসে বারি খেলো।তার মস্তিষ্ক এখনো বন্দী সেই নোংরা স্পর্শের স্মৃতিতে। সে নিজের শরীরটা দু’হাতে জড়িয়ে ধরে রয়েছে। যেন নিজের অস্তিত্বকেই লুকিয়ে ফেলতে চাইছে। তার চোখদুটো ফাঁকা, নিঃসাড় যেন সমস্ত অনুভূতি নিঃশেষ হয়ে গেছে। অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু সে কাঁদছে না। কারণ তার কান্নার ক্ষমতাটুকুও যেন কেউ কেড়ে নিয়েছে। রুমা সিকদার তূর্ণাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, কিন্তু তূর্ণা শান্ত হচ্ছে না। নাক দিয়ে আবারও র*ক্ত পরা শুরু করেছে, জবা সিকদার আর রোমানা সিকদারও চেষ্টা করছে তূর্ণাকে শান্ত করার। কিন্তু তাতেও লাভ হচ্ছে না, তূর্ণা শুধু একটা কথাই জাপছে-

“আমি… নোংরা হয়ে গেছি…।”
এটা কোনো স্বীকারোক্তি ছিলো না, ছিলো তার আত্মার বিলাপ। রৌদ্রিকে দৃষ্টি এখনো ভয়ংকর ছিল, কিন্তু তূর্ণার দিকে তাকাতেই সেই দৃষ্টিতে এক মুহূর্তের জন্য ভেঙে পড়লো কিছু অতল গহ্বরের মতো গভীর এক বেদনা। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসলো সে। কাঁপতে থাকা তূর্ণার হাতদুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে অত্যন্ত নিম্নস্বরে, অটল দৃঢ়তায় বললো-
“তোমাকে কেউ নোংরা করতে পারেনি তূর্ণা, কারণ তোমাকে ছোঁয়ার অধিকার আমি ছাড়া আর কারো নেই। কথা দিচ্ছি তোমাকে কেউ আর নোংরা ভাবে স্পর্শ করার দূরে থাক নোংরা দৃষ্টিতেও তাকানোর সাহস পাবে না।”
তূর্ণা কিছু বুঝলো না, কিছু অনুভবও করলো না। পাগলের মত নিজেকে রৌদ্রিকের নিকট থেকে ছাড়াতে চাইছে। রৌদ্রিকেও এখন জিসান আর রিয়ানের মত মনে হচ্ছে। এলোপাতাড়ি বুকে ধাক্কা দিয়ে সরে যেতে চাইছে সে। রুমা সিকদার অসহায় কাতর চোখে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে আছে। একটু আগেই জ্ঞান ফিরিয়ে পানি দিয়ে, আর জ্ঞান ফেরার পর থেকেই এমনটা শুরু করেছে। আজকের এই ঘটনা তার স্মৃতির পাতায় ভীষণ বাজে ভাবে নাড়িয়ে তুলেছে তাকে। আঁতকে ক্ষণে ক্ষণে তার দেহাবশেষ কেঁপে উঠছে।
বৌভাতে হওয়ায় ঘটনাও রৌদ্রিক জানে না। সেটা যদি জানতে পারে আরও রেগে যাবে সবার উপর, জবা সিকদারের বেশ খারাপ লাগলো। সেদিনও মেয়েটা বলেছিলো রিয়ানের ব্যাপারে, তূর্ণা মানসিক অবস্থার কারণে তারা কেউ মেয়েটার কথা কানে তোলেনি। সেদিন যদি কথাটুকু বিশ্বাস করত তাহলে আজকে এত বড় ঘটনার সম্মুখীন হতে হতো না। রৌদ্রিক সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে-

“ রোদেলাকে রুমে দিয়ে যেও। আর সবাই যে যার রুমে চলে যাও।”
কেউ আর কথা বাড়ালেন না, এই মুহুর্তে রৌদ্রিকের সঙ্গে কথা বলার মানে আরও রাগিয়ে দেওয়া। রুমা সিকদার অসহায় চোখে তূর্ণাকে একনজর দেখে রুম থেকে বের হয়ে যায়। এদিকে তূর্ণা রৌদ্রিকের নিকট থেকে নিজেকে ছাড়াতে ব্যস্ত, রৌদ্রিক শান্ত চোখে তূর্ণার দিকে তাকিয়ে বলে-
“ আমার দিকে তাকাও, এটা আমি তোমার বর। খুব বেশি কষ্ট দিয়েছে ওই বাস্টার্ডটা? আজ থেকে আর কেউ তোমাকে স্পর্শ করার সাহস করবে না। আমি আছি তো, সরি তোমাকে সঠিক সময়ে প্রটেক্ট করতে না পারার জন্য। তোমার প্রতি আমার আরও কেয়ারফুল থাকা দরকার ছিল।”

তূর্ণা শুনছে না কিছুই উম্মাদের মত আচরণ করছে আর বার বার নিজেকে নোংরা বলছে। রৌদ্রিক হুট করেই তূর্ণা মাথাটা নিজের বক্ষস্থলে টেনে নিয়ে চেপে ধরলো। শান্ত ভাবে তূর্ণার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকে, চাইলেও সে তূর্ণার স্মৃতি থেকে সেই সময়টাকে মুছে ফেলতে পারবে না। তূর্ণা অনেকটা সময় পর কান্না করতে করতে নিস্তেজ হয়ে রৌদ্রিকের বুকেই ঘুমিয়ে পরে। কান্না থেমে গেলেও দেহে বয়ে চলা কম্পন থামেনি, কিছুক্ষণ পর পরই কেঁপে উঠছে। রৌদ্রিক আস্তে করে একবার দেখে নিলে তূর্ণাকে, সাদা শার্টে র*ক্ত লেগে গেছে। রৌদ্রিক সেটা না ভেবে আস্তে করে তূর্ণাকে শুইয়ে দিলো, উঠতে নিলেই বাঁধা পরে। তূর্ণা শক্ত করে তার শার্টের একসাইড চেপে ধরে রেখেছে। রৌদ্রিক আস্তে করে ছড়িয়ে টেবিলের ওপর থাকা টিস্যু এনে মুখে লেগে থাকা র*ক্ত মুছে দিতে থাকে। গাল সহ শরীরো বিভিন্ন জায়গায় কালচে দাগ হয়ে আছে। প্রাণচঞ্চল মেয়েটা কেমন নেতিয়ে পরেছে, রৌদ্রিক উঠে বক্স থেকে মলম এনে আঘাতপ্রাপ্ত জায়গাগুলোতে লাগিয়ে দিতে থাকে। কিছু আঘাত চাইলেও মলম দিয়ে সাড়িয়ে তোলা সম্ভব নয়, তবে যতটুকু সাড়িয়ে তোলা যাবে সেটার চেষ্টা করবে রৌদ্রিক।

তূর্ণা ভয়ে চিৎকার দিয়ে চোখ মেলে তাকায়। আশেপাশে অন্ধকার দেখে আরও ভয়ে আঁতকে উঠলো, ডুকরে কেঁদে উঠলো শব্দ করে। নিজেকে শক্ত হাতের বাঁধনে পেয়েও নিজেকে ছোটানোর চেষ্টা চালালো। তবে যে হাতের মালিক, তার শক্তির কাছ০ তূর্ণার শক্তি কিছুই নয়। হুট করে বিছানার পাশের টেবিলের উপর রাখা লাইটা জ্বলে ওঠে। রৌদ্রিক আতঙ্কিত তূর্ণার দিকে তাকালো, মেয়েটা বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছে। চোখের স্পষ্ট ভয়ের ছাপ! তূর্ণার কাঁদতে কাঁদতে বলে ওঠে-
“ আমাকে ছেড়ে দাও না জিসান ভাই। আমার খুব খারাপ লাগছে, ব্যথা দিও না আমায়।”
রৌদ্রিক জিসান কে এটা বুঝলো না, তূর্ণাকে শান্ত করার জন্য আবারও শক্ত করে নিজের সঙ্গে চেপে ধরে সে তূর্ণারকে। এখন রাতের শেষ প্রহর ঘন্টাখানেক পার হলেই ভোরের আলো ফুটবে ধরণীতে। রৌদ্রিক শান্ত গলায় তূর্ণাকে শান্ত করে বলে-

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৯

“ তূর্ণা শান্ত হও, দেখ এটা আমি। কেউ তোমাকে ব্যথা দিবে না আর ধরবে।”
তূর্ণা শুনলো না গুনগুনিয়ে কান্না করছে সে। পাশেই রোদেলা গভীর নিদ্রায় মগ্ন, একবার মেয়েকে দেখে নিলো রৌদ্রিক। তূর্ণা রৌদ্রিকের হাত আঁকড়ে ধরেই সেভাবে ঘুমিয়ে পরেছিলো। তাই আর রৌদ্রিক তাকে সড়ায়নি, আজকের জন্য এই বিছানায় তিনজন অবস্থান করছে। রৌদ্রিক একহাতে তূর্ণাকে ধরে রেখেছিল,অন্যহাতে রোদেলাকে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে রেখেছিল। কিছু সময় পর তূর্ণা শান্ত হয়ে আসে, রৌদ্রিক আর আলোটা নিভায় না। সেভাবেই রেখে দেয়, রাতে তার এমনিও আর ঘুম হয়নি। ক্ষিপ্ত মেজাজ এখনো ক্ষিপ্ত হয়ে আছে রিয়ানের উপর। রিয়ানকে পুলিশে দেওয়া হয়েছে, সহজেই যাতে ছাড়া পেতে না পারে সেটার ব্যবস্থা কালকে করবে রৌদ্রিক।

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ১০