Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৫

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৫

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৫
তানিয়া হুসাইন

ইলারা আলভারেয ভীরের রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করেন।
রুমের ভেতরের ভারী, ঠান্ডা পরিবেশটা মুহূর্তেই বদলে যায়।ভীর প্রথমে খেয়ালই করেনি ইশায়ার খুব কাছাকাছি ছিল সে। কিন্তু দরজার শব্দে সেদিকে তাকায়,তার রুমে তো কারোর আসার কথা না,
দরজার দিকে তাকাতেই ভীরের চোখে স্পষ্ট বিস্ময়
গ্র‍্যানি এখানে? এই সময়ে?
নিজেকে দ্রুত সামলে নেয় ভীর। সে তার দুর্বলতা কাউকে দেখতে দিতে চায় না।
ভীর ইশায়া থেকে সরে আসে, মুখের অভিব্যক্তি আবার আগের মতো কঠিন করে নেয়।
তারপর কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ইলারা আলভারেযকে জড়িয়ে ধরে।
ইলারা-ও তাকে জড়িয়ে ধরেন।একটা গভীর মমতায় ভরা আলিঙ্গন।এই ভয়ংকর মাফিয়া বসের ভেতরেও তিনি সেই ছোট্ট ছেলেটাকেই খুঁজে পান,ছোট্ট ভীর যাকে একসময় নিজের হাতে বড় করেছিলেন।
অভিমানে ভরা গলায় তিনি বলেন,

___গ্র‍্যানিকে ভুলেই গেলে তুমি? আগে তো সিনালোয়া গেলে অন্তত দুইটা দিন থেকে যেতে আমাএ কাছে… এখন তো কাজের জন্য গেলেও প্যালেসে উঠো না।
পুরোপুরি ভুলেই গেছো এই বুড়িটাকে… হুমম?
তার কণ্ঠে অভিমান।
ভীর একটু নরম হয়ে আসে,নিচু গলায় বলে,
__এমন না গ্র‍্যানি… এখন খুব ব্যস্ত থাকি।
ইলারা তার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
তারপর হালকা হেসে বলেন,
___হুম… কিসের এতো ব্যস্ততা, তা তো আমি জানিই।
তার চোখে দুষ্টুমি,বউকে চোখে হারাও, তাই না? বউকে পেয়ে এই বুড়িটাকে একেবারে ভুলে গেছো তুমি।এতো বউ-সোহাগী হলে চলবে না দাদুভাই।কথাগুলো ঠাট্টা করেই বলেন তিনি।
কিন্তু ভীরের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।চোয়াল শক্ত, চোখ ঠান্ডা কোনো হাসি নেই, কোনো লজ্জা নেই, কিছুই না।শুধু একটা অদ্ভুত নীরবতা।
ইলারা তার পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যান ইশায়ার দিকে।
ইশায়ার কাছে যেতেই তিনি থমকে দাঁড়ান।মেয়েটার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণের জন্য ঘোড়ে চলে যান এতো নিষ্পাপ, এতো সুন্দর ঠিক যেন চাঁদের টুকরো।ইলারার চোখ আটকে যায় তার মুখে।কিন্তু সেই মুগ্ধতা এক মুহূর্তেই ভেঙে চূর্ণ হয়ে যায় যখন তার দৃষ্টি নেমে আসে ইশায়ার হাতে শি*কল দিয়ে বাধা।এক সেকেন্ডের মধ্যে তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে যায়।তিনি দ্রুত এগিয়ে এসে ইশায়ার হাতটা নিজের হাতে তুলে নেন।
ইশায়া তখনো ফুপিয়ে কাঁদছে ভীরের আচরণে ভেঙে পড়েছে পুরোপুরি।এই দৃশ্য দেখে ইলারা কঠিন হয়ে যান।
তিনি মাথা তুলে কড়া গলায় বলেন,

___এটা কি, ভীর?
তুমি ওকে এভাবে আটকে রেখেছো কেন?
ভীর একটুও বিচলিত হয় না।ঠান্ডা, অনুভূতিহীন গলায় উত্তর দেয়
___কারণ আছে।
এই ছোট্ট উত্তরটা যেন আরও আগুন ঢেলে দেয় ইলারার মধ্যে।তিনি অশান্ত হয়ে ওঠেন প্রতিবাদ করে বলেন,
বাইরে তুমি যা করো, সেটা আলাদা কথা,কিন্তু ঘরের ভেতরেও এমন?ও তোমার শত্রু না, ভীর।
ও তোমার ওয়াইফ, তোমার বাচ্চার মা হতে চলেছে!
তার গলা কেঁপে ওঠে রাগে আর কষ্টে।
এই অবস্থায় তুমি কিভাবে এমন আচরণ করতে পারো?
ভীর এবার একটু জোরে বলে,

___যা করেছি… ওর আর আমার সন্তানের ভালোর জন্যই করেছি, গ্র‍্যানি।
কিন্তু এই যুক্তি ইলারাকে একটুও নরম করতে পারে না।
তিনি সরাসরি ইশায়ার শিকলটা খুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন।তার কণ্ঠ আদেশের মতো,
___এই মুহূর্তে এটা খুলে দাও, ভীর।আমি আর কিছু শুনতে চাই না।
এই প্রথম কেউ ইশায়ার পক্ষ নিয়ে এত জোর দিয়ে দাঁড়িয়েছে।ইশায়ার বুকটা কেঁপে ওঠে।তার চোখ ভরে ওঠে।একা, অসহায় এই অন্ধকার জায়গায় এই প্রথম কেউ তাকে আপন করে ছুঁয়ে দাঁড়িয়েছে তার পাশে।
সে আর নিজেকে সামলাতে পারে না।হঠাৎ করেই ইলারা আলভারেযকে জড়িয়ে ধরে জোরে কেঁদে ওঠে।
ইলারা তাকে শক্ত করে জড়িয়ে নেন নিজের সাথে।
মমতায় ভরা হাতে তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেন যেন নিজের নাতবউ নয়, নিজের মেয়েকেই সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
ইলারা আবার ও ভীরকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠেন,

__খুলে দাও ওকে, ভীর।
ভীর কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।তারপর গম্ভীর, শক্ত গলায় বলে,
___আমি এটা পারবো না, গ্র‍্যানি।তাই এমন কিছু আমাকে বলো না।
কথাটা বলে তারপর আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না সে।গটগট করে দরজার দিকে হেঁটে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
ঠাসসস করে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা পুরো রুমটাকে কাঁপিয়ে তুলে।
ইশায়া ভেঙে পড়ে।তার কান্না আরও বেড়ে যায়
অসহায়, দমবন্ধ করা কষ্টে ভরা সেই কান্না।ইলারা আলভারেয তাকে আরও কাছে টেনে নেন।
নিজের বুকে জড়িয়ে রাখেন,একটা নিরাপদ আশ্রয়ের মতো।

___ম্যাটিয়াস প্যালেসে ফিরে,কাউন্সিলিং রুমের দরজার সামনে এসে থামে সে, বুকের ভেতর চাপা একটা অস্বস্তি ভীর কি সব জেনে গেছে এই ভয়টাই পাচ্ছে সে।কি জবাব দিবে সে যদি কেউ কিছু আচ করে ফেলে এগুলোই ভাবছে ম্যাটিয়াস বার বার।
কিছুক্ষন পর অনেক সাহস সঞ্চার করে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ে ম্যাটিয়াস।
রুমের মাঝখানে বসে আছে নিকো রামিরেজ।
ডিয়েগো সালগাদো আর এনরিকো মেন্দোজা তার পাশে দাঁড়িয়ে।তারা তাদের নেক্সট ডিল নিয়ে আলোচনা করছে।
ম্যাটিয়াস ঢুকতেই নিকোর কপালে ভাজ পড়ে।
ম্যাটিয়াস এতো ধুরন্দর এত বিশ্বস্ত হয়েও একটা সামান্য কাজ করতে পারেনি এটার কারণে রেগে আছে নিক।শত্রু তাদেরকে বারবার পেছন থেকে আক্রমণ করেই যাচ্ছে চারদিক থেকে আর তারা কিছুই করতে পারতেছে না। নিক তার দিকে এগিয়ে আসে।একেবারে ম্যাটিয়াসের একদম সামনে গিয়ে থামে নিক।
এক সেকেন্ড দুই সেকেন্ড…তারপর

___কেনো?
শব্দটা খুব আস্তে, কিন্তু ভিতরে বিষ।
ম্যাটিয়াস মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রয়।নিকো হঠাৎ গলার স্বর উঁচু করে বলে,
___কেনো তুই এত দিনের মধ্যে একটা কাজ করতে পারলি না, ম্যাটিয়াস?
রুমটা কেঁপে উঠে নিকের গলার আওয়াজে।ডিয়েগো চুপচাপ চোখ নামিয়ে রাখে, এনরিকোর চোয়াল শক্ত ।
নিক ম্যাটিয়াসের কলার শক্ত করে ধরে টেনে কাছে আনে,
__মাতেও আর লুকা কি পাতালে চলে গেছে? হ্যাঁ?
তার চোখ দুটো রক্তিম হয়ে উঠছে।যে এতদিনে তুই ওদের কোন খোঁজই পাসনি?
ম্যাটিয়াসের শ্বাস ভারী হয়ে উঠে, কিন্তু সে একটাও কথা বলে না।ভেতরে রাগে ফুসছে সে।
তার নীরবতাই আগুনে ঘি ঢালে।নিকো ঠেলে তাকে ছেড়ে দেয়।
___চুপ?… এখন চুপ হয়ে গেছে?তার ঠোঁটে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি।যখন রিপোর্ট দিতে হয়, তখন কারোর মুখে শব্দ থাকে না… কিন্তু ব্যর্থতা? সেটা তো ঠিকই নিয়ে আসে।
ম্যাটিয়াস দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু, মুঠি শক্ত… কিন্তু ঠোঁট সিল করা।
কারণ সে জানে একটা ভুল শব্দ মানেই সন্দেহ।
আর এই জায়গায় সন্দেহ মানেই মৃ*ত্যু।নিকো ঘুরে দাঁড়ায়, নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে।
তার কণ্ঠ এবার ঠান্ডা, কিন্তু আগের থেকেও ভয়ংকর
আমি এখন আর কোন ধরনের রিস্ক নিতে চাই না।
নিকো বলে,

___ভীর এখন এসব থেকে একটু দূরে আছে… তাই সবকিছু এখন আমাকেই দেখতে হবে।
নিকো এবার টেবিলের পাশে গিয়ে থামে।কাউন্সিলিং রুমে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা চলে ম্যাপ খুলে রাখা, লোকেশন, সম্ভাব্য লুকানোর জায়গা… কিন্তু ম্যাটিয়াস যেন বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সবকিছুর।সে শুধু শুনছে।
একটা শব্দও বলছে না।অবশেষে নিকো টেবিলে হাত ঠুকে বলে,
___এই মিশনের দায়িত্বে আজ থেকে ডিয়েগো থাকবে।
ডিয়েগো এক মুহূর্ত থমকাল, তারপর মাথা নুইয়ে বলে,

___Understood, boss.
নিকো আবার বলে,
এনরিকো তুই ওর সাথে থাকবি।
এনরিকো চোখ তুলে একবার ম্যাটিয়াসের দিকে তাকায় তারপর বলে,
__Got it.
ম্যাটিয়াসের বুকের ভেতর চাপা একটা আগুন জ্বলছে এখন।সে বলতে নেয়
___বসস আমি…
কিন্তু কথাটা শেষ করার আগেই নিকোর চোখ তার দিকে ফিরে।
ম্যাটিয়াস থেমে যায় সে বুঝে এখন একটা শব্দ মানেই নিজের কবর খোঁড়া।তাই সে চুপ করে যায়।একেবারে চুপ।
নিকো তার দিকে তাকিয়ে বলে,
__কিছু বলার আছে?
ম্যাটিয়াস এক সেকেন্ড তাকিয়ে তারপর মাথা নিচু করে বলে,
__না। এই না টার ভেতরে লুকানো ছিল হাজারটা কথা রাগ অপমান।
নিকো আর কিছুক্ষণ কথা বলে এ বিষয়ে।তারপর সব আলোচনা শেষে ডিয়েগো আর এনরিকো বেরিয়ে যায়।ম্যাটিয়াসও পেছন পেছন বেরিয়ে যায়।

_____ইশায়া আগে থেকে কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠছে।
শরীরের ক্ষতগুলো শুকাতে শুরু করেছে নীলচে দাগগুলো ফিকে হয়ে আসছে, ব্যথার তীব্রতা আগের মতো আর ছ্যাঁকা দেয় না।কিন্তু মনের ভেতরের ক্ষত সেটা যেন আরও গভীর হয়ে উঠছে দিনকে দিন।
ইলারা আলভারেয আসার পর থেকে একটা পরিবর্তন হয়েছে।তার সংস্পর্শে এসে ইশায়া যেন একটু হলেও স্বাভাবিক হতে পেরেছে।তার মমতা, তার ছোঁয়া, তার নরম কণ্ঠ এই নিষ্ঠুর জায়গাটার মধ্যে এক ফোঁটা আশ্রয়ের মতো ইশায়ার কাছে।কিন্তু সেই স্বস্তি খুব ক্ষণস্থায়ী।ভীর তার কাছাকাছি থাকলে ইশায়ার আগের সব কিছু মনে পড়ে যায়,ভীরের কাছে আসাটাও তার শুকনো আদর কিছুই আর তার মন গলাতে পারেনা।
কিন্তু ভীর তার সর্বোচ্চটা দেয় ইশায়াকে ভালো রাখতে।
ইশায়ার মনে পরে এলিজার বলা কথা গুলো।এলিজার কথাগুলো প্রতিটা শব্দ আগুন হয়ে গেঁথে আছে তার মস্তিষ্কে।ইশায়া চোখ বন্ধ করলেই শুনতে পায় সেই কথাগুলো।মনে হয় কেউ যেন ফিসফিস করে বলে যাচ্ছে,

___ভীর তোমার বাবাকে মে*রেছে।তোমার মাকে আগুনে পু*ড়িয়ে মা*রতে চেয়েছে।
সাফাকে মেরেছে,আবির ভাইকে তুলে নিয়ে গেছে।
ইশায়ার বুকটা ধক করে ওঠে এগুলো মনে পড়লে।
এগুলো তাকে ভেতর থেকে ছিঁড়ে ফেলছে।সে নিজের দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে।চোখে জমে ওঠে অশ্রু, কিন্তু সে কাঁদে না সবসময়,কখনো শুধু তাকিয়ে থাকে শূন্যে।নিজের বাবার খু*নিকে সে কি করে ভালোবাসবে?না… কোনোভাবেই না।সে ভালোবাসতে পারেনা এই লোককে।যাই হোক না কেন সে কখনোই পারবে না।প্রয়োজনে সে ম*রে যাবে।নিজেকে শেষ করে ফেলবে।তবুও সে এই লোকটার সাথে থাকবে না।যে তার ভাইয়ের ভালোবাসাকে শেষ করে ফেলেছে এমন লোককে সে ভালোবাসতেই পারেনা।
তার বুকের ভেতরে শুধু একটা আগুন জ্বলতে থাকে
প্রতিশোধের আগুন।সে নিজের বাবার বদলা নেবে।এই পৃথিবীতে তার বাবার আগে কেউ ছিল না, কেউ হবে না।তার চোখে তখন এক অদ্ভুত কঠোরতা ভেসে ওঠে।

দিনের পর দিন সে শুধু ভাবতেই থাকে। কি করবে,কিভাবে করবে?কিভাবে এই বন্দিদশা থেকে মুক্তি পাবে?এই বিলাসবহুল কারাগারের প্রতিটা দেয়াল তার কাছে শত্রু।প্রতিটা দরজা, প্রতিটা তালাতার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে।আর ভীর তার প্রতিটা ভালোবাসা, প্রতিটা যত্ন ইশায়ার কাছে এখন বিষের মতো লাগে।যখন ভীর তার দিকে তাকায় মায়াভরা চোখে ইশায়ার ভেতরে ঘৃণার ঢেউ উঠে।
যখন সে খেয়াল রাখে, খাওয়ায়, ছোঁয়ার চেষ্টা করে
ইশায়ার মনে হয় যেন বিষ ঢেলে দিচ্ছে কেউ তার শিরায়।এই দ্বন্দ্ব…এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি তাকে ধীরে ধীরে অন্যরকম করে দিচ্ছে।আর ঠিক এমনই এক অস্থির মুহূর্তে হঠাৎ করে তার মাথায় আসে।
এলিজার দেওয়া সেই চিঠি,চিঠির সাথে দেওয়া জিনিসগুলোছু*রি,আর ঔষধ তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে।ঔষধগুলো এখন আর তার কাছে নেই কিন্তু ছু*রিটা তো আছে।হ্যাঁ আছে,ওটাই যথেষ্ট।
ইশায়ার চোখ ধীরে ধীরে বদলে যায়।নরম, ভাঙা মেয়েটার জায়গায় একটা কঠিন, নির্মম সত্তা জায়গা নিতে শুরু করে।তার মস্তিষ্কের ভেতরে তখন চলতে থাকে এক ভয়ংকর পরিকল্পনা।ধীরে ধীরে নিখুঁতভাবে
সে ভেবে চলে প্রতিটা ধাপ।নিজের মুক্তির জন্য, নিজের বাবার বদলা নেওয়ার জন্য সাফার জন্য আদ্রিয়ানের জন্য সে সব কিছু করতে পারবে।ইশায়ার চোখে কোনো দ্বিধা নেই,শুধু অন্ধকার আর প্রতিশোধের আগুন।
বাইরে থেকে তাকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে সে প্রতিটা মুহূর্তে হিসাব কষছে,একটা সুযোগের অপেক্ষায়, তার চোখে এখন একটা অদ্ভুত স্থিরতা, যেন ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা।

___এদিকে ইশায়ার এই পরিবর্তন ভীরের নজর এড়ায় না। সে ইশায়ার সব কিছুই খেয়াল রাখে।
ইশায়াকে একটু স্বাভাবিক হতে দেখে ভীরের ভেতরে চাপা স্বস্তি কাজ করে। সে ভাবে হয়তো অবশেষে ইশায়া পরিস্থিতি মেনে নিতে শুরু করেছে। কিন্তু সে জানে না, এই নীরব স্বাভাবিকতার আড়ালেই ইশায়া তার মুক্তির পথ খুঁজছে।এভাবেই দিন কেটে যায়।
____একদিন বিকেলে বাগানে যাওয়ার আগে ইশায়া শাওয়ার বলে।
রুমের ভেতর নরম আলো ছড়িয়ে আছে, আর চারপাশে সাজানো তিনটা বড় কাবার্ড যা ভর্তি পোশাকে জুয়েলারিতে।
মারিয়া এলেনা তার জন্য একটা ড্রেস বের করে সামনে ধরতেই ইশায়া ভ্রু কুঁচকে বলে,
__আমি এটা পড়ব না।
মারিয়া কিছু না বলে আরেকটা ড্রেস বের করে দেয়।
কিন্তু ইশায়া এবারও মাথা নাড়ে,
এটাও না।
এভাবে একটার পর একটা ড্রেস সামনে আসে, আর প্রতিবারই ইশায়ার ঠোঁট থেকে একই অস্বীকৃতি ঝরে পড়ে।শেষমেশ খানিকটা অসহায় হয়ে মারিয়া এলেনা বলে ওঠে,

___ম্যাম, আপনি কোনটা পড়বেন আমাকে বলুন, আমি এনে দিচ্ছি।
ইশায়া একটু ভেবে, খুব স্বাভাবিক গলায় বলে, ___আমাকে বাসন্তি রঙের ড্রেসটা দাও।
মারিয়া এলেনা তার কথামতো সেই রঙের ড্রেস এনে দেয়।কিন্তু ড্রেসটা হাতে নিয়েই আবার ইশায়া বলে ওঠে,
___না, এটা না গোল জামাটা।
মারিয়া এবার সত্যিই বিপাকে পড়ে যায়। কারণ ইশায়ার এই বিশাল কাবার্ডগুলোতে একই রঙের অসংখ্য জামা। কোনটা যে সে বলছে তা বোঝা কঠিন।
কিছুক্ষণ পর ইশায়া নিজেই বলে,
__আমি নিজে নেই।তুমি খুজে পাবেনা।
মারিয়া আর কিছু বলে না। তার মনে হয় জামা-ই তো নেবে, আর সে তো সাথে আছেই।
মারিয়া এলেনা ইশায়াকে কাবার্ডের কাছে নিয়ে যায়।

ইশায়ার আঙুলগুলো একটার পর একটা কাপড় ছুঁয়ে যায়, কিন্তু তার চোখ খুঁজছে অন্য কিছু।নিখুঁত সময় মেপে, ইশায়া একটা জামা টেনে নেয়, আর সেই সাথে কৌশলে একটা ছোট ছু*রি তুলে কাপড়ের ভাঁজের আড়ালে লুকিয়ে ফেলে।সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে মারিয়া এলেনা কিছুই বুঝতে পারে না।
ইশায়া তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই চেঞ্জ করতে চলে যায়।শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে তার শরীর বেয়ে, কিন্তু তার মন পুরোপুরি স্থির।সে জানে তাকে কি করতে হবে।ড্রেস চেঞ্জ করার সময় ইশায়া ছু*রিটা সাবধানে নিজের জামার ভেতরে লুকিয়ে নেয়। এটা তাকে লুকোতে হবে,এমন জায়গায় রাখতে হবে যেখানে কেউ খুঁজে পাবে না,কিন্তু তার হাতের নাগালেই থাকবে।
সে জানে, তাকে প্রতিটা মুহূর্তে নজরে রাখা হয়। তাই প্রতিটা পদক্ষেপ তাকে নিতে হবে নিখুঁত হিসাব করে।
চেঞ্জ করে বাইরে বের হওয়ার পর মারিয়া এলেনা তাকে নিয়ে রাণিয়া,রোসা আর লুসিয়ার সাথে বাগানে যায়। চারপাশে সবুজের শান্ত ছায়া, হালকা বাতাস, দূরে ফোয়ারার শব্দ সবকিছুই শান্তির ছবি আঁকে।কিন্তু আজ ইশায়ার মন কোথাওই থিতু হয় না।
তার চোখ চারপাশে ঘোরে, কিন্তু সে কিছুই দেখছে না সে শুধু ভাবছে, সে কিভাবে করবে এই কাজ।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎই সে থেমে গিয়ে বলে,

___আমার ভালো লাগছে না,আমি ভেতরে যাবো।
তার গলায় অস্বস্তির হালকা ছোঁয়া, কিন্তু চোখে লুকানো তাড়না।ইশায়ার কথা মতো মারিয়া এলেনা তাকে আবার রুমে নিয়ে আসে।
রুমে ঢুকেই আগের মতোই সব নিয়ম মেনে ইশায়ার হাত আবার লক করে দেওয়া হয়।ধাতব সেই লকের ঠাণ্ডা স্পর্শ তার কব্জিতে লাগে কিন্তু তার চোখে ভয় নেই।

___ভীর ইশায়ার পাশে-ই থাকতে চেয়েছিলো এই সময়টা।কিন্তু বাস্তবটা এতটা সহজ না।সে একজন মা*ফিয়া।আন্ডারগ্রাউন্ড জগতের সবচেয়ে ভয়ংকর নামগুলোর মধ্যে একটি রাজভীর।কয়েকটা রাজ্য তার অধীনে, তার ইশারাতেই চলে সবকিছু।তার ক্ষমতা যেমন সীমাহীন,তেমনি তার দায়িত্বও ভারী।তার ব্যবসায়ের কম্পানির অভাব নেই লিগ্যাল, ই*লিগ্যাল, আড়ালের ভেতর আড়াল সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ তার হাতে।প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত তাকে ব্যস্ত রাখে।তবুও এই কয়েকদিনে একটা জিনিস বদলেছে।ভীর এখন আর অযথা বাইরে সময় কাটায় না।যত দ্রুত সম্ভব কাজ শেষ করে সে প্যালেসে ফিরে আসার চেষ্টা করে,
কারণ তার কাছে এখন একটা কারণ আছে ইশায়া।মিশনেও সে এখন যায় না, কিন্তু যে কাজ গুলো না করলেই নয় সেগুলোতে তাকে থাকতেই হয়।
সেদিন ও ছিলো এরকম একটা দিন। মেক্সিকোর সীমান্তঘেঁষা এক পরিত্যক্ত গুদামঘর বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে বহু বছর ধরে এখানে কোনো মানুষ পা রাখেনি।কিন্তু ভেতরে চলছে কোটি কোটি ডলারের ডিল।গুদামের চারপাশে ছড়িয়ে আছে ভীরের লোকজন।রোসাস,সান্তিয়াগো, এনরিকো, আর আরও অনেক গার্ড, সবাই অ*স্ত্র হাতে প্রস্তুত।ভীর ভেতরে ঢোকে।তার একপাশে নিক একপাশে ডিয়েগো।
ভীরের কালো স্যুট, ঠাণ্ডা চোখ, আর নিঃশব্দ উপস্থিতি পুরো জায়গাটাকে মুহূর্তেই ভারী করে তোলে।

___ওপর পাশে দাঁড়িয়ে আছে এক প্রতিদ্বন্দ্বী কার্টেলের লিডার।চোখে ভয় লুকানোর চেষ্টা, কিন্তু কপালে ঘাম স্পষ্ট ।
ডিলটা প্রায় শেষের দিকেই ছিল,সবকিছু ঠিকঠাক হিসাব মিলে গেছে, চারপাশে চাপা উত্তেজনা।কিন্তু ভীরের চোখ এড়িয়ে যায় না কিছুই।একটা ছোট ভুল তার চোখে পরে,সংখ্যার ভেতরে লুকানো একটা অসামঞ্জস্যরুট আর ডলারের হিসাবের মধ্যে সূক্ষ্ম হেরফের।
ভীর ধীরে কাগজটা নামায়।সে তাকায় প্রতিপক্ষের দিকে।নিঃশব্দ কয়েক সেকেন্ডসেই নীরবতা ভেঙে ভীর বলে,
___তুই আমার সাথে খেলতে এসেছিস?
তার কণ্ঠ নিচু, ঠাণ্ডা কিন্তু ভেতরে জমে থাকা আগুন স্পষ্ট।আমাকে কি মনে হয় তোর।
প্রতিপক্ষের লোকটা কিছু বলার চেষ্টা করে,
কিন্তু গলার স্বর কেঁপে যায়।
এই এক মুহূর্তেই সব পরিষ্কার হয়ে যায় এটা ভুল না বিশ্বাসঘাতকতা।রুট আর ডলারের হিসাব নিয়ে হেরফের করেছে সে,ভেবেছে ভীর বুঝবে না।
ভীর ধীর কদমে এগিয়ে আসে।তার প্রতিটা পা ফেলার শব্দ ওই লোকটার বুকের ভেতর ধাক্কা দেয়।
ভীর কাছে গিয়ে থামে।একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার চোখে।

___আমার জিনিসে হাত দিলে, আমি হাত কে*টে ফেলি না।এক সেকেন্ড থামে ভীর,আমি মানুষটাই শেষ করে দিই।পরের মূহুর্তে একটা গু*লির শব্দ।লোকটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
প্রতিপক্ষের বাকি লোকেরা একে অপরের দিকে তাকায়
তাদের চোখে ভয় স্পষ্ট, হাতের অ*স্ত্র কাঁপছে।
কিন্তু তারা বোঝে এখানে লড়াই করে লাভ নেই।তারাই পরাস্ত হবে,এক এক করে তারা অ*স্ত্র নামিয়ে দেয়।
হার মেনে নেয়।
আর ভীর র*ক্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে,নির্বিকার চোখে শুধু বলে,

___আমার সাথে ডাবল গেইম খেলার সাহস কি করে হয়।আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা মানেই মৃ*ত্যু।
___ম্যাটিয়াস বুক কাপছে ভয়ে,কপালে ঘাম জমছে,ভীর যদি সত্যটা জানে তখন তার কি হবে। না সব কিছু সামনে আসার আগেই তাকে যা করার করতে হবে।
___ভীরের লোকজন কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো জায়গাটা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।
এটাকে সরাও। রুটটা এখন আমাদের।কাজ শেষ হতে যেন বেশি সময় না লাগে।
গাড়িতে উঠার আগে ভীর একবার হাতঘড়ির দিকে তাকায়।তার চোখে বিরক্তি দেরি হয়ে গেছে আজ।
গাড়ির দরজা বন্ধ হতেই কনভয় দ্রুত গতিতে ছুটে চলে প্যালেসের দিকে।রাস্তায় আলো ঝাপসা হয়ে যায়, ভীর চুপচাপ বসে থাকে, চোখ বন্ধ করে। তার মাথায় এখন আর র*ক্ত, ডিল, বা ক্ষমতার হিসাব নেই শুধু একটা মুখ,ইশায়া। আজকাল সে বাইরে খুব একটা থাকে না।
যত দ্রুত সম্ভব কাজ শেষ করে সে ফিরে আসে তার প্যালেসে, ইশায়ার কাছে।কারণ এই ভয়ংকর মাফিয়া বসের জীবনে এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক আসক্তি হয়ে উঠেছে ইশায়া রহমান।

____ভীরের গাড়ির কনভয় ধীরে ধীরে এসে থামে বিশাল প্যালেসের সামনে। সারি সারি কালো গাড়ি, প্রতিটা ক্ষমতা আর ভয়ংকর প্রভাবের প্রতীক। ভীরের গাড়ি থামতেই একজন গার্ড দ্রুত এগিয়ে এসে দরজা খুলে দেয়।
ভারী পায়ে গাড়ি থেকে নামে ভীর, তার উপস্থিতিতেই চারপাশের পরিবেশ একেবারে শান্ত হয়ে ওঠে। কোনো দিকে না তাকিয়ে, সোজা প্যালেসের ভেতরে ঢুকে পড়ে সে। তার গন্তব্য একটাই নিজের রুম।
উপরে উঠে রুমের দরজা খুলতেই ভেতরে থাকা সবাই একে একে মাথা নিচু করে বেরিয়ে যায়।রুম আধো অন্ধকার,ভীর লাইট অন করতেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামে বিছানার ওপর।
বিছানায় ঘুমে বিভোর সে। কোমল মুখ, নিঃশ্বাসের মৃদু ওঠানামা সবকিছু এক অদ্ভুত প্রশান্তি তার কাছে।ইশায়ার গায়ে হলুদ রঙের জামা, রঙটা যেন আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে তার সৌন্দর্যকে। লম্বা চুলগুলো সাদা চাঁদরের ওপর ছড়িয়ে আছে, যেন কালো সিল্কের মতো ঝরে পড়েছে।
ভীর কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে… শুধু তাকিয়ে থাকে তার দিকে। চোখে এক অদ্ভুত মিশ্রণ অধিকার, মুগ্ধতা, আর ভয়ংকর এক আসক্তি।আজকাল যেন সে আরো সুন্দর হয়ে উঠেছে।
ভীর ভেতরে এসে আলমারির দিকে যায়। আগে শাওয়ার নিবে সে এই শরীরের সে তার প্রানকে স্পর্শ করবে না।ভীর টাওজার নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে।
একটা লম্বা শাওয়ার নিয়ে আসে, তার গায়ে ধূসর রঙের টাওজার, চুল ভেজা। এক হাতে টাওয়াল দিয়ে চুল মুছতে মুছতে বের হয়।

চুল মুছা শেষে টাওয়ালটা ছুড়ে ফেলে দেয় ডিভানে।
তারপর এগিয়ে যায় ইশায়ার দিকে। বিছানার পাশে বসে ঝুঁকে পড়ে। ঘুমে বিভোর ইশায়ার মুখের খুব কাছে এসে তার ঠোঁটে আলতো, আদুরে স্পর্শ ছুঁইয়ে দেয়।একটা দুইটা অনেকগুলো।
স্পর্শটা এতটাই নরম, তবুও এত গভীর যে ইশায়া ঘুমের মধ্যেও কেঁপে ওঠে। আধো চোখে তাকাতেই সে দেখে তার খুব কাছে ভীর।
ইশায়া চোখ খুলতেই ভীর আরো গভীরভাবে তার ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় ইশায়ার অধরে। আগের চেয়ে দীর্ঘ, গভীর এক স্পর্শ।ভীরের অবাধ ঠোঁটের স্পর্শে ইশায়া ছটফটিয়ে ওঠে। দম বন্ধ হয়ে আসছে। কিন্তু ভীর ইশায়াতে মত্ত থাকা অবস্থায়-ই তাকায় তার দিকে।
সেই দৃষ্টি তীব্র ভয়ংকর। সেই চাহনিতে ইশায়া থেমে যায়।কিছুক্ষণ পর ভীর সরে আসে। ইশায়ার ফোলা ফোলা দু’গালে ঝুঁকে শব্দ করে চুমু খায়। তারপর তার ঠান্ডা হাত আলতো করে রাখে ইশায়ার গালে।
মৃদু, ভাঙা কণ্ঠে বলে,

__হেইইই প্রিন্সেস… আর কতদিন দূরে থাকতে হবে বলো তো তোমার কাছ থেকে? পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি। তার কণ্ঠে গভীর আবেগ,
How many days has it been since I truly had you as mine? This distance has become unbearable for me. I crave you more than anything, yet I have to hold myself back for you. for us. If only you could understand how deeply it affects me to stay away from you. you are slowly becoming my obsession.
কথাগুলো বলতে বলতেই ভীর ধীরে ধীরে তার হাত নামিয়ে আনে ইশায়ার পেটের ওপর। আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয় সেখানে,স্পর্শটা কোমল, তার ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত অধিকার আর তীব্রতা।
ভীর ইশায়ার দিকে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে, জিজ্ঞেস করে,
___খেয়েছো?
ইশায়া নীরবে মাথা নাড়ায়।
___ঔষধ খেয়েছো সব?
ইশায়া নরম গলায় জবাব দেয়,
___হুম।

ইশায়া খুব একটা কথা বলে না ভীরের সাথে। তার কথার উত্তর দেওয়াটুকুই যেন তার সীমা,এর বাইরে আর কিছু নয়। ভীর কিছু জিজ্ঞেস করলে, সে শুধু উত্তর দেয়, নিজ থেকে কোনো কথা বাড়ায় না।ভীর এরপর আরও টুকটাক কিছু প্রশ্ন করে,তার শরীর কেমন আছে, কোথাও ব্যথা অনুভব করছে কি না, ঠিকমতো বিশ্রাম নিচ্ছে কি না এসব।ইশায়া প্রতিটা প্রশ্নের জবাবে শুধু “হু, হ্যাঁ” বলে মাথা নাড়ায়, তার কণ্ঠে কোনো বাড়তি আবেগ প্রকাশ পায় না।
তবুও, ভেতরে ভেতরে ইশায়ার শরীর যেন হিম হয়ে আসছে।তার প্রতিটি শ্বাসে অস্বস্তি, প্রতিটি মুহূর্তে অজানা ভয়। তার কল্পনার জগৎ, তার ভেতরের আবেগ সবকিছুই যেন এই লোকটার সামনে এসে ফিকে হয়ে যায়।এই মানুষটাকে নিয়ে সে কিছুই অনুমান করতে পারে না। কখন কী করবে, কীভাবে করবে কিছুই তার বোঝার বাইরে।
তবুও তার ভেতরে একটাই শক্তি আছে। তাকে এগোতেই হবে। থামার কোনো সুযোগ নেই।এই অন্যায় সে মেনে নিতে পারে না।

__ভীর আলমারি থেকে একটা টি-শার্ট নিয়ে শরীরে জড়িয়ে নেয়, তারপর খাবার পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজায় শব্দ হয় মারিয়া এসে খাবারের ট্রে সামনে রাখে।
ভীর ইশায়ার ব্যাপারে টুকটাক জিজ্ঞেস করতে থাকে,ডাক্তার কী বলেছে, তার অবস্থা কেমন, কোনো সমস্যা আছে কি না।
মারিয়া এলেনা মাথা নিচু করে জবাব দেয়।তারপর বাইরে চলে যায়।
ভীর খেতে বসে, ইশায়া শুয়ে আছে। তার চোখ খোলা, কিন্তু মন অন্য কোথাও, গভীর চিন্তায় ডুবে আছে সে।
ভীর তার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,

___এদিকে আসো।
ইশায়া ধীরে মাথা ঘুরিয়ে ভীরের দিকে তাকায়।
ভীর আবার ও বলে,
___কি হলো,আসতে বলেছি না?
ইশায়া শুয়ে থেকেই শান্ত গলায় বলে,
___আমি খেয়েছি… আর খাব না।
ভীর এবার গমগমে কন্ঠে বলে ওঠে,
___আমি আসতে বলেছি।
এই কথার পর ইশায়া আর কোনো কথা বলে না। সে ধীরে উঠে বসে। নিচে নামতেই তার শিকল থেকে শব্দ হয় ধাতব সেই শব্দ রুমের নীরবতাকে ছেদ করে।
শব্দটা শুনে ইশায়ার মুখ মুহূর্তেই অন্ধকার হয়ে আসে। তার ভেতরে এক ধরনের দমবন্ধ করা অনুভূতি তৈরি হয়। তবুও নিজেকে সামলে নেয়।ধীর, স্থির পায়ে এগিয়ে যায় ভীরের দিকে।
ভীর দেখে ইশায়াকে,
ইশায়া ডিভানে গিয়ে তার পাশে এসে বসে।

____ইশায়া ভীরের পাশে এসে বসতেই ভীর কোনো কথা না বলে খাওয়া শুরু করে। তার আচরণ সবসময়ের মতোই নিয়ন্ত্রিত, স্থির, অথচ ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত জোর।সে নিজে খায় আবার হাত বাড়িয়ে ইশায়ার মুখেও খাবার তুলে দেয়।
ইশায়া গরুর মাংস খেতে পছন্দ করে এই ছোট ছোট বিষয়গুলো ভীরের অজানা নয়।প্লেট থেকে বেছে বেছে নরম মাংসের টুকরো তুলে ইশায়ার মুখে।
ইশায়া ডিভানে হেলান দিয়ে বসে আছে মাথা এলিয়ে, ধীরে ধীরে খেতে থাকে।
তার শরীর যেন দিন দিন ভারী হয়ে আসছে ক্লান্ত, অবসন্ন লাগে সবসময়।মাথাটা একদিকে কাত হয়ে আছে, তবুও সে খাচ্ছে ভীর খাওয়াচ্ছে বলে।
ভীর নিজেও খাচ্ছে, আবার একই সাথে ইশায়াকে খাইয়ে দিচ্ছে।
খাওয়ার মাঝে ভীর মাংসের বদলে মাছ বেছে ইশায়ার মুখে দেয়।
মুখে অন্য স্বাদ আসতেই ইশায়া চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে, চোখ-মুখে স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে মাথা তুলে বলে

___আমি আর খাবো না।
ভীর ভ্রু কুঁচকে তাকায়, বিরক্ত সুরে বলে,
___কেনো খাবে না?
তারপর ইশায়ার মুখে হাতের খাবার টুকু তুলে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
__মাছ খেতে হবে। মাছে অনেক প্রোটিন আছে। এটা শরীরের জন্য ভালো,আর তোমাকে খেতে হবে।
ইশায়া বিরক্তিতে সেটাকে না চিবিয়েই গিলে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে পানি তুলে নেয়, কয়েক ঢোক পানি খায়।
ভীর আবার দিলে ইশায়া পানি দিয়ে গিলে নিয়ে ক্লান্ত, বিরক্ত গলায় বলে,
__আর খাবো না, আমার শরীর খারাপ লাগছে।
ভীর আর কিছু বলে না।সে খুব ভালো করেই জানে এখন জোর করলে, ইশায়া যা খেয়েছে সব বের করে ফেলবে।
তাই চুপচাপ নিজের খাওয়ায় মন দেয়।
রুম আবার ও নীরব হয়ে যায়।
ইশায়া কিছু একটা বলবে বলে উসখুস করছে, কিন্তু সাহস পাচ্ছে না,তার শুধু এটাই মনে হচ্ছে সে কিছু বললে ভীর যদি বুঝে ফেলে তার মনে কি চলছে,
ভীরের চোখের চাহনিতেই ইশায়া ভয় পেয়ে যায় সে কিভাবে করবে এগুলো,ইশায়া নিজেকে ধাতস্ত করে কিছু সময় পর, সেই নীরবতা ভেঙে ইশায়া আস্তে করে বলে ওঠে,

___আমার হাতের এটা খুলে দেন না।এটা খুব ভারী আমার হাতে ব্যাথা লাগে,আমি ঘুমোতেও পারিনা ঠিকমতো এটার জন্য।
___ভীর খাওয়া থামিয়ে তাকায় ইশায়ার দিকে।
চোখ দুটো সরু হয়ে আসে,
ভীরের ওই চাহনি তার উপর পড়তেই ইশায়া একটু ঘাবড়ে যায়।চোখ নামিয়ে নেয় নিচের দিকে। নিজের ভেতরটা শক্ত করে ফেলে কোনোভাবেই ভীরকে বুঝতে দেওয়া যাবে না তার ভয়।
নিজেকে সামলে আবার বলে,
___একটু খুলে দিন… এটা ভালো লাগে না আমার।
ভীর কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে থাকে।তারপর ঠান্ডা, নির্লিপ্ত গলায় বলে,
__ভালো লাগার জন্য দেই নি,সময় আসলে এমনিতেই খুলে দিবো।আর যতদিন না পর্যন্ত সময় আসছে ততদিন এভাবেই থাকতে হবে।
ভীরের এই কথাগুলো ইশায়ার মনে আগুন ধরিয়ে দেয়।
তার ভেতরে জমে থাকা রাগ, অপমান, অসহায়তা সব একসাথে জ্বলে ওঠে।কিন্তু বাইরে কিছুই প্রকাশ পায় না।
সে আর এক মুহূর্তও সেখানে বসে থাকে না।চুপচাপ উঠে দাঁড়ায়,বিছানার দিকে যায় তারপর গিয়ে শুয়ে পড়ে।
চোখ বন্ধ করে, মনে মনে বলে,

___এই বন্দি জীবন থেকে আমি বের হবোই এই শিকল একদিন ঠিকই খুলবে,আমি মুক্ত হবো আপনি দেখবেন, ভীর আলভারেয।
ভীর দেখে ইশায়ার চলে যাওয়া,কিন্তু এগুলোতে তার কোন ভাবান্তর নেই।সে এক ফোটা রিস্ক নিবে না ইশায়াকে নিয়ে।এমন সে বেইবির জন্য-ই এরকম করছে,ইশায়ার কিছু হলে সে কিভাবে থাকবে।
ইশায়ার ক্ষতি হতে পারে এমন সম্ভাবনা ও সে রাখবেনা।
রুমের নিঃশব্দতায় তার দুজনের এই নীরব প্রতিজ্ঞা পরিস্থিতিটাকে আরও ভারী করে তুলে।যেন ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা।
ভীর খেয়াল করে আজ ইশায়ার আচরন অন্যদিনের থেকে একটু অন্যরকম।এই যে নিজে থেকে যতটুক-ই কথা বললো,হাত ছাড়ানোর কথা বললো আবার রাগ দেখিয়ে চলে গেলো।
ভীর এসব নিয়ে এখন খুব একটা মাথা ঘামায় না।
কারণ সে খুব ভালো করেই জানে ইশায়া চাইলে ও এখন আর কিছুই করতে পারবে না। তার প্রতিটা পথ সে আগেই বন্ধ করে রেখেছে।খাওয়া শেষ করে ভীর ধীরে উঠে দাঁড়ায়।কিছুক্ষণ পর মারিয়া এলেনা এসে সবকিছু গুছিয়ে নেয় ট্রে, প্লেট, ছড়িয়ে থাকা ছোটখাটো জিনিস। তারপর নিঃশব্দে কাজ শেষ করে আবার বেরিয়ে যায়।

____ভীর ডিভানে গিয়ে বসে ল্যাপটপ খুলে। তার পেন্ডিং কাজগুলো করতে থাকে।এক হাতে সিগারেট ধরায়, ভীর ল্যাপটপে কাজ করতে থাকে, মাঝে মাঝে পাশে রাখা ফাইল খুলে দেখে, আবার কিছু টাইপ করে।
তার মনোযোগ পুরোপুরি কাজে,
কিন্তু এই নীরবতার আড়ালে অন্য এক ঝড় জমছে।
ইশায়া চুপচাপ শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ।কিন্তু তার ভেতরটা একদম অস্থির ।বালিশের নিচে, বিছানার চাদরের কাছে সে ছু*রিটা লুকিয়ে রেখেছে।
এমনভাবে রেখেছে যাতে সহজেই হাত বাড়ালেই পাওয়া যায়।কারন অন্য কোথাও রেখে নিয়ে আসা তার সম্ভব না,তার আশেপাশে সবসময় কেউ না কেউ থাকে,শুধু ভীর থাকা কালীন শুধু ভীর থাকে,কিন্তু তখন ও আনা সম্ভব না এই শিকলের কারনে, এতো বড় শিকল সে নড়লেই শব্দ হবে, এটার শব্দে ভীরের ঘুম ভাঙবেই।
শরীরে রাখার সাহস তার হয়নি।ভীর যদি টের পেয়ে যায় তাহলে সব শেষ।তার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে আসে ভয়, অজানা আতঙ্কে।কিভাবে করবে কখন করবে কিছুই পরিষ্কার না।তবুও তাকে করতে হবে।
ওপাশে ভীর নিজের কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়ায়।
ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে।তারপর রুমের লাইট একেবারে ডিম করে দেয়।আধো অন্ধকারে ঢেকে যায় চারপাশ শুধু হালকা আলোয় ছায়াগুলো নড়ে ওঠে।

____ইশায়া তখনও চুপচাপ শুয়ে আছে, চোখ বন্ধ করে।বাইরে থেকে দেখে মনে হবে সে ঘুমিয়ে পড়েছে।
কিন্তু তার মাথার ভেতর ঝড় বইছে।একটা চিন্তা বারবার এসে ধাক্কা দিচ্ছে কাল যদি রুম পরিষ্কার করার সময় কেউ এই ছুরিটা পেয়ে যায়?তাহলে তার শেষ অ*স্ত্রটাও হারিয়ে যাবে।তখন তার আর কিছুই করার থাকবে না।না কোনো পথ না কোনো সুযোগ।
না… কিছু একটা করতেই হবে।যেভাবেই হোক।
তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে কিছু মুখ,তার বাবা…
বাবার সাথে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্তগুলো হাসি, আদর, তার পরিবার…সেই নিরাপদ, উষ্ণ সময়গুলো।সাফা, আদ্রিয়ান, তার মায়ের মুখ…

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৪

সবগুলো স্মৃতি একসাথে এসে তার ভেতরটা ভেঙে দিচ্ছে।তাদের জন্য হলেও… তাকে করতে হবে।
যে মানুষটা তার পরিবারের হাসি-খুশি জীবনটাকে ধ্বংস করে দিয়েছেতার সাথে সে কখনোই সুখের সংসার গড়তে পারে না।কখনোই না।ইশায়া চোখ বন্ধ রেখেই, নিঃশব্দে নিজের ভেতরে একটা সিদ্ধান্ত নেয়
এবার আর পিছু হটার কোনো সুযোগ নেই।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৮৬