Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৬০ (২)

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৬০ (২)

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৬০ (২)
সুরভী আক্তার

সুরবালা তাজ্জব বনে চেয়ে প্রশ্ন করে….
” এগুলো কি ?
” তোমার উপহার !
” মাঝে কি এটা ?
” ওটাও উপহার । ওটাই আসল..
” স্বর্নের ‌?
” হুম , পছন্দ হয় নি ?

সুরবালা নিজের হাতের দিকে তাকায় । ওর হাতের প্যাকেট টায় অগনিত সাদা সাদা ঝিনুক । ঝিনুকের মাঝে একটা লকেট । ঝিনুক গুলো সাজানোর উপকরণ হিসেবে । চেইন সমেত সোনালি লকেট টা চিকচিক করছে সাদা সাদা ঝিনুকের গর্ভে । সুরবালা প্যাকেট টা পাশে রেখে লকেট টা হাতে নিলো । হৃদয় আকৃতির ছোট্ট সোনালি একটা লকেট । তবে খুব ছোট নয় । লকেটের ধার ঘেঁষে ফুলের সুক্ষ্ম কারুকাজ । লকেট টা খুলতেই ভেতরে পাশাপাশি দুটো অবস্থান ভেসে উঠলো । প্রথমেই নজর কাড়লো ডানপাশে সুরবালার একখানা ছোট্ট জীবন্ত অনুরূপ ছবি । ওটার দিকে তাকিয়েই ফিক করে হেসে উঠলো সুরবালা । বা দিকে তাকাতেই শূন্যতা দেখে কপাল গুটিয়ে আসলো সুরবালার । অংকুরের দিকে এক পলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে বললো….

” এদিকটা ফাঁকা কেনো ?
অংকুর এতক্ষণ পলক হীনা স্থির চোখে তাকিয়ে ছিলো মেয়েটার দিকে । সুরবালার প্রশ্নে সম্বিত ফিরলো ওর ‌। ধীরুজ স্বরে উত্তর করলো….
” তোমার আর একটা ছবি বসিয়ে নিও ।
” আমার ছবি কেনো ? একদিকে তো আমার ছবি আছে । এদিকটায় আপনার….
বলতে বলতে থেমে গেলো অংকুরের চোখের দিকে তাকাতেই । অংকুর বাম ভ্রু উঁচিয়ে বললো….
” আমার ?
” না মানে , এদিকে আপনার ছবি থাকার কথা নয় ?
” আমার ছবি রাখবে ?
” কেনো রাখবো না ?
অংকুর কিছু বললো না । সুরবালা চেইন টাকে ফের আগের জায়গায় রাখলো । হাস্যোজ্জ্বল মুখে ঝিনুক গুলো নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে বললো….

” অন্যপাশে আপনার ছবি লাগানোর পর ওটা গলায় পড়বো । তার আগে নয় । এখন থাক । আর কি কি এনেছেন দেখি ?
বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালো । অংকুরের ব্যাগটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বললো আবার…..
” মা’র জন্য কিছু আনেন নি ? কি এনেছেন আর….
ব্যাগটা হাতে নিলো সুরবালা । ভেতরে অংকুরের জামা কাপড় ব্যাতীত আর কিছু নেই । সুরবালা মুখ শুকিয়ে একে একে অংকুরের জামা কাপড় গুলো বের করতে লাগলো । সব কেমন জট পাকিয়ে এলোমেলো করে ঢুকিয়ে রেখেছে এই লোক । একটু গোছানোর ফুরসৎ টুকু ও পায় নি বোধহয় । অংকুর ঠায় দাঁড়িয়ে ঠান্ডা চোখে সুরবালা কে দেখছিলো । এর মাঝেই কিছু একটা মনে পড়তেই ধক্ করে চোখ বৃহৎ করে তেড়ে আসলো অংকুর । ব্যাগের বাকি কাপড়গুলো বের করাই আগেই সুরবালার থেকে কেড়ে নিলো ব্যাগটা । আকস্মিক ছিনিয়ে নেওয়ায় সুরবালা খানিক চমকালো । বললো অংকুর….

” কি করছো ?
” দেখছিলাম আর কি কি আছে !
” আর কিছু নেই ।
” তাহলে ব্যাগটা কেড়ে নিলেন কেনো ? আমি দেখবো আর কি আছে ।
” কিছু নেই ।
” সেটা আমি দেখে নেবো , আমায় দিন ।
অংকুরের হাত থেকে ব্যাগটা টান দিতেই দুদিক থেকে টান পড়ায় ব্যাগের চেইন খোলা থাকার দরুন ভেতরের বাকিসব উপচে পড়লো মেঝেতে । অংকুরের রংচটা সব কাপড়ের মাঝে নিল রঙ্গের কিছু একটা দৃষ্টি কাড়লো জ্বল জ্বল করে । চকিতে ভ্রু যুগল জড়ো করে তাকালো সুরবালা । অংকুর ধরা পড়ার ন্যায় অগোচরে জিভে কামড় বসায় ।

সুরবালা নিল কাপড় টা হাতে তুললো । এটা তো ওর শাড়ি । হ্যাঁ , শাড়িই তো । কিন্তু এটা অংকুরের ব্যাগে কি করে এলো । বুঝলো না মেয়েটা । শাড়িটা উল্টে পাল্টে দেখে অবাক হয়ে বললো….
” এটা তো আমার শাড়ি , এটা আপনার ব্যাগে কি করছে ?
দোনামোনা করলো অংকুর…..
” আ..আমার কাপড়ের সাথে ভুল করে ওটাও নিয়ে গেছিলাম । খেয়াল ছিলো না । ওখানে গিয়ে দেখি এটা ।
সুরবালা চোখ সরু করে তাকায় । যাওয়ার আগে যখন ও অংকুরের গোছানো কাপড় গুলো এলোমেলো করে মেঝেতে ছড়ালো , তখন তো শাড়িটা ছিলো না এসবের মাঝে ! অংকুর তো তখনই কাপড় গুছিয়ে ছিলো । তাহলে পরে শাড়িটা ব্যাগে গেলো কি করে ?
সুরবালা চাহনি তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর করলো । এক মুহুর্ত পর ফোঁস করে শ্বাস ফেললো । শাড়িটা নিয়ে আলমারির দিকে যেতে যেতে বললো….
” আমাকে নিয়ে যান নি , অথচ আমার শাড়ি নিয়ে গেছেন । এভাবে ভুল করে হলেও আমাকে নিয়ে গেলে কি হতো ?

ফজরের আজান পড়ছে । নির্ঘুম রাত্রি যাপন করেছে সংগ্রাম । চোখের পাতা এক করে নি । শ্যামা ঘুমোচ্ছে বেঘোরে । সেই রাতেই তাড়াহুড়ো করে সংগ্রাম নিয়ে আসলো ওকে । আর কিছু বলার সুযোগ টুকুও দিলো না । রাতের খাবার জমিদার বাড়িতে এসে খেয়েছে ওরা ।
আজানের ধ্বনি মনযোগ দিয়ে শুনলো সংগ্রাম । শেষ আজান । শ্যামার ঘুম ভাঙ্গবে এক্ষুনি । সংগ্রামের বুকে ঘাপটি মেরে গুটিয়ে আরামছে ঘুমোচ্ছে মেয়েটা । সংগ্রাম এখনো ধীরে ধীরে ওর চুলের ভাঁজে হাত চালাচ্ছে । আজান শেষ হতেই একটু আধটু মাথা তুলে শ্যামার ঘুমন্ত মুখ পানে তাকালো সংগ্রাম । তার বেগমের শ্যামলা আদল চিকচিক করছে । সংগ্রাম ঠোঁট বাড়িয়ে তার বেগমের কপালে একটা চুমু আঁকলো । অতঃপর দীর্ঘ শ্বাস ফেললো । সারা রাত যা ভেবেছে , সেসব আবার মাথায় আসতেই চোয়াল শক্ত হলো সংগ্রামের । ক্ষুব্ধতা স্পষ্ট হলো মুখশ্রীতে । শ্যামা নিজে থেকেই জাগনা পাওয়ার আগেই সংগ্রাম ডেকে জাগালো ওকে…..

” বেগম ,
ঘুম পাতলা হয়ে এসেছে শ্যামার । রোজ রোজ এই সময়ে উঠতে উঠতে অভ্যস্ত সে । এক ডাকেই সাঁড়া দিলো নড়েচড়ে….
” হুম ।
” ওঠো , আজান পড়েছে ।
নিভু নিভু চোখ মেলে শ্যামা । ঝাপসা চোখ স্পষ্ট হতে কিছুটা সময় লাগে । সংগ্রাম হাতের বাঁধন আলগা করতেই উঠলো শ্যামা । উঠে বসে হাই তুললো । চোখ ডলে বিছানা ছাড়তে ছাড়তে ঘুম কাতর আধো স্বরে বলল…
” উঠুন আপনিও ।
হাত মুখ ধুয়ে ওযু করে আসলো শ্যামা । সংগ্রাম কে গায়ে শাল পেঁচিয়ে তৈরি হতে দেখে কপাল কুঁচকালো । ভেজা হাত মুখ মুছতে মুছতে বললো….
” এতো সকাল সকাল তৈরি হলেন যে ? বেরোচ্ছেন কোথাও ?
” হুম ।
” এতো সকালে ? এখনো তো আলো ফোটে নি !
সংগ্রাম এগিয়ে নিজের বেগমের কপালে শব্দ করে উষ্ণ পরশ এঁকে প্রভাতের সূচনা করে নেয় আগে । অতঃপর মোলায়েম কন্ঠে বলে….

” কাজ আছে একটু । তুমি নামাজ পড়ে নাও । আমি তাড়াতাড়ি ফিরবো…
বলেই আরো একটা চুমু এঁকে মুচকি হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো সংগ্রাম । অন্দর পেরোলো । জিপে উঠে দ্রুত গতিতে জিপ দৌড়িয়ে সোজা প্রধান ফটক পেরিয়ে রওনা দিলো কোনো এক পথে ।
দিগন্ত চিরে আলো ফুটছে । দেখা দিচ্ছে রুপোলি আলো । পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঁকি দিচ্ছে সবে । গ্রামের অধিকাংশ মানুষ উঠে পড়েছে । সংগ্রাম জিপ নিয়ে সোজা করিম দের বাড়িতে উপস্থিত হয়েছে । ঘুম থেকে উঠে আঙিনা ঝাঁট দিচ্ছিলো ফুলি । জিপের আওয়াজ পেয়ে তড়িঘড়ি করে দেউড়ির দিকে ফিরলো সে । সংগ্রামের সাথে চোখাচোখি হতেই মৃদু হাসলো সংগ্রাম । নিজে থেকেই প্রশ্ন করলো….

” কেমন আছো ফুলি ?
” আমি ভালো আছি জমিদার সাহেব ,‌ আপনি কেমন আছেন ? আর শ্যামা ? শ্যামা কেমন আছে ?
” ভালো আছে । করিম কে ডেকে দাও…
সংগ্রাম কথা বাড়াতে চাইলো না বেশি । ফুলি পিছু ফিরে ঘরে ঢোকার আগেই কাঁধে ফতুয়া ঝুলিয়ে তড়তড়ে পায়ে ঘর হতে বেরিয়ে আসলো করিম । চোখে এখনো ঘুমের রেশ । জিপের আওয়াজে সহসা ঘুম ভেঙেছে ওর । নিজে ঘর থেকে বেরিয়ে রহিমের ঘরে ঢুকে ওটাকে টেনে টুনে ঘুম থেকে তুললো । অতঃপর দুটোয় চললো সংগ্রামের সাথে ।
সংগ্রামের ভাবভঙ্গি নিরেট । করিম আর রহিম ঘুমে আচ্ছন্ন আধো চোখে সংগ্রাম কে পরখ করে ঢোক গিললো । কালকের কথা মাথায় আসতেই মুখ শুকিয়ে আসলো দুই ভাইয়ের ।
ওদের জিপটা থামলো সুখের নীড়ের সামনে ।
বিশাল লোহার গেইট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলো তিনজনে । ঢুকতে ঢুকতে গা থেকে জমিদারি ঐতিহ্যের শালটা খুললো সংগ্রাম । নীড়ের অন্দরের বাইরে দিলশাদ গাজি দাঁড়িয়ে ।
সংগ্রাম সবাইকে উপেক্ষা করে অন্দরের পেছনের দিকে এগোলো চুপচাপ । সাথে রহিম করিম । অন্দরের পেছনে ভেতরে ঢোকার জন্য আরো একটা বিশাল দরজা । দরজায় ঝুলছে আদ্দিম কালের বিশাল একটা তালা । দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কড়া কন্ঠে আদেশ করলো সংগ্রাম…

” দরজা খুলে দাও ।
অমনি খুলে দেওয়া হলো দরজা । সিঁড়ি ঘর ভেতরে । এই সিঁড়ি লম্বা লম্বি সোজা তিন তলায় উঠেছে । ঘুটঘুটে অন্ধকার কালকুঠরির ন্যায় । সুখের নীড়ে বিদ্যুৎ নেই । আলো নেই , আলোর পিপাসু এই বদ্ধ কালো অন্ধকার কুঠির । মশাল জ্বালানো হলো । মশালের হলদে দাপুটে আলোয় ঘুচলো কালো অন্ধকার । দম্ভভরে পা চালিয়ে দপদপ করে সিঁড়ি ডিঙ্গিয়ে উপরে উঠতে লাগলো সংগ্রাম । তিনতলায় থামলো একেবারে । করিডোর পুরো অন্ধকার । একটা মশালে আধো অন্ধকার ঘুচেছে । স্যাঁতস্যাঁতে আশপাশ । কালো বিভৎস অন্ধকারে গা ছমছম । সারি সারি ঘর । সব মিলিয়ে একটা মশাল এতো এতো অন্ধকার ঘুচতে নস্যি মাত্র ।
ঘরগুলো সব তালা বন্ধ । সংগ্রাম নিজের পাঞ্জাবির পকেট একটা ঝনঝন করে বড় একটা চাবির গোছা বের করলো । সেটা করিমের দিকে ছুড়ে দিয়ে ক্ষুব্ধ স্বরে বলল….

” ওটাকে যে ঘরে রেখেছো , সেই ঘর খুলে দাও ।
আদেশ তামিল করলো করিম । শুরু থেকে তিনটে ঘর পেরিয়ে চার নাম্বার ঘরের শাল কাঠের দরজাটা খুলে দেওয়া হলো । শুরুতেই মশাল নিয়ে আলো দেখিয়ে ঘরে ঢুকলো রহিম । পিছু পিছু দপাদপ পা ফেলে সংগ্রাম । বিশাল একটা ঘর । ঘরে কিচ্ছুটি নেই । পুরোটাই ফাঁকা । মাঝখানে একটা লম্বালম্বি ছাদ ছোঁয়া পিলার । ঘুটঘুটে অন্ধকার কাটিয়ে আকস্মিক আলো পেয়ে একটা জীবন্ত প্রাণ ছটফটিয়ে উঠলো বাঁধা অবস্থায় । গুঙ্গিয়ে উঠলো গুমড়ে । মুখ বাঁধা হয়তো , তাই স্পষ্ট করে শোনা গেলো না । সংগ্রাম আগ পিছ দেখলো না ।

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৬০

ক্ষুব্ধতা সংবরন করতে না পেরে আন্দাজে তেড়ে গিয়ে সজোরে ঘ্যাত করে লাথি মারলো গুমড়ে ওঠা লক্ষ্য করে । অমনি কারোর ব্যাথাতুর আওয়াজে ভরে উঠলো পুরো ঘর । গুমগুম করে চার দেয়ালের মাঝে আওয়াজ বাড়ি খেয়ে ফিরে আসলো সংগ্রামের নিকট । আরো একটা আঘাত হানার আগেই ঝুঁকে চোয়াল খিচে গিজগিজিয়ে উঠলো সংগ্রাম…..
” জানোয়ারের বাচ্চা , আজ পুঁতে ফেলবো তোকে । তোর সাহস কি করে হলো আমার বেগমের দিকে হাত বাড়ানোর ?

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৬১