মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ শেষ পর্ব
Tahmina Akhter
পরদিন সকালে তৌহিদ সাহেব, রিনি আর আরাফাত রিনিদের বাড়িতে ফিরে এলো। আলো নতুন বর-কনেকে ঘরে তুলল। এসব কিছু দেখে
আলোর জন্য রিনির হৃদয়ে সফট কর্ণার তৈরি হয়। মেয়েটা যেন তারই বড় বোন। কত সুন্দর করে দায়িত্ব পালন করছে অথচ এই দায়িত্ব আলোর পালন করার কথাও না। এই জন্যই বোধহয় বড় চাচী আলোকে আদর করে মাথায় তুলে রাখতেন।
নাশতার টেবিলে এলাহি আয়োজন দেখে আরাফাত ভয়ে ভয়ে আলোকে বলল,
— ভাবি এত কিছু কেন? আমি ডায়েটে আছি।
— আপনি নতুন জামাই। আপনাকে কি দই চিড়া খাইয়ে বিদায় করতে পারি। আপতত আপনি যতদিন এই বাড়িতে আছেন ততদিন ডায়েট বন্ধ রাখুন৷
বলেই আলো আরাফাতের পাতে পিঠা তুলে দিলো। রিনি আরাফাত আর আলোর কান্ড দেখে হাসছে। তৌহিদ সাহেব আলোর মাথায় হাত রেখে বলল,
— ছেলের বাবা হবার অনূভুতি কেমন হয় আমি জানতাম না৷ মেঘালয় এখানে আসার পর টের পেলাম বাবা হবার অনূভুতি কতটা আনন্দদায়ক। মেঘালয়ের আমার প্রতি দায়িত্ব, যত্নে কোনোদিন আমি বুঝতে পারিনি আসলে মেঘালয় আমার ভাতিজা হয় কিনা? ওকে আমার নিজের ছেলে মনে হয়েছে। এবার তুমি এসে আমাকে বোঝালে ছেলের বউ কেমন করে যত্নে রাখে, দায়িত্ব পালন করে।
আলো তৌহিদ সাহেবের হাত ধরে কান্নায় ভেঙে পরে। আলোর মনে হচ্ছে তার সামনে তার বাবা আফসার সাহেব দাঁড়িয়ে আছে। বাবা তো এভাবেই কথা বলত! মেয়ের হাতের একটু যত্ন পেলেই গলে যেতেন তিনি। তৌহিদ সাহেব আলোর কান্না দেখে রিনির দিকে একবার ফিরে তাকায়। রিনিও মন খারাপ করে বসে আছে। আলো চোখের পানি মুছে তৌহিদ সাহেবকে বলল,
— আমি তো আপনার কাছে, রিনির কাছে, আমার শ্বাশুড়ির কাছে এত এত স্নেহের দেনাদার হলাম যে মাঝে মাঝে চিন্তা করি আপনাদের এত স্নেহের, ভালোবাসার প্রতিদান দেই কি করি? তারপর, ভাবি আপনারাই আমার আপনজন। আপনাদের দেনা পরিশোধ করব কেন? আপনাদের আদরের ছায়াতলে থাকাটাই হচ্ছে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় এচিভমেন্ট। দেনাপাওনার সম্পর্ক আমাদের মাঝে হতেই পারে না।
আলোর কথা শুনে তৌহিদ সাহেব আর রিনির অন্তরে শান্তি পায়। রিনি উঠে এসে আলোর হাতটা ধরে বলল,
— তুমি এসেছো বলেই, আমরা একটা পরিবার পেয়েছি। নয়তো আমি তো কোনোদিন জানতে পারতাম না পরিবার কি? পরিবারের বন্ডিং কেমন হয়?
তৌহিদ সাহেব পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে আলোর হাতে দিয়ে বলল,
— চোখের পানি মুছে নাও।
আলো চোখের পানি রুমালে মুছে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুচকি হাসে। যেন সবাইকে বোঝাল, আমি ঠিক আছি। তৌহিদ সাহেব আলোর মাথা হাত বুলিয়ে বললেন,
—আমার জীবনের ছেলে আর ছেলের বউ এর অপূর্ণ ইচ্ছের স্বাদ পূরণ করার জন্য তোমার ওপর আর মেঘালয়ের ওপর আমার দোয়া রইল। সৃষ্টিকর্তা তোমাদের সংসারে কানায় কানায় এত এত বরকত আর ভালোবাসা দিক যাতে বিগত বছরগুলোতে তোমাদের সকল দুঃখ কষ্ট মুছে যায়।
— আমাকে ছাড়া ফ্যামিলি কুটনীতি চলছে নাকি?
কথাটি বলতে বলতে মেঘালয় সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসে। সবার দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু এখন মেঘালয়। এদিকে মেঘালয় সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আলোকে চোখ মারল। মেঘালয়ের কান্ড দেখে আলো লজ্জায় মুচকি হাসে কেবল। মেঘালয় এসে তৌহিদ সাহেবের পাশে দাঁড়িয়ে আরাফাতের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময়ের পর তৌহিদ সাহেবের পাশে দাঁড়িয়ে রিনিকে বলল,
— এভাবে তাকিয়ে থাকার কারণ কি?
— কেন তোমার দিকে তাকানো মানা? আমি আসলে জানতাম না। একটা কাজ করতে পারো। একটা সতর্কীকরন পোস্টার দঁড়ি দিয়ে বেঁধে তোমার গলায় ঝুলিয়ে আটকে রাখো। তাহলে কেউ আর তোমাকে তাকিয়ে দেখবে না।
রিনির কথা শুনে সবাই হেসে ফেললেও মেঘালয় গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,
— আমি তো কাউকে বলিনি আমার দিকে তাকিয়ে থাকুক। আমাকে দেখার লোক মানে স্ত্রী আছে। তুমি তোমার আজাইরা আলাপ বাদ দাও।
তোমার মাথা ভর্তি ছাগলের গু। গরুর গু হলে পঁচে টচে জৈব সার হতো। কিন্তু আছে ছাগলের গু। পুরাই অপচয়।
মেঘালয়ের জবাব শুনে আলো লজ্জায় মাথা নীচু করে ফেলল। তৌহিদ সাহেব হাসতে হাসতে চেয়ার গিয়ে বসলেন। আরাফাত মিটমিটিয়ে হাসছে। আর রিনির ইচ্ছে করছে মেঘালয়ের মাথার চুল ধরে ইচ্ছে মত টানতে। বদ একটা। কথায় পারা যায় না এর সঙ্গে। আলো যে কেমনে এই বদের হাঁড়িটাকে সামলায়?
আজ সবাই একসাথে নাশতার পর্ব শেষ করার পর তৌহিদ সাহেব কোম্পানির উদ্দেশ্য বের হয়ে গেছেন। আরাফাত বেরিয়ে গেছে একটা জরুরি কাজে বিকেলের মধ্যে ফিরে আসবে। আলো আর রিনি সবকিছু গুছিয়ে রাখল রান্নাঘরে। মেঘালয় ড্রইংরুমে বসে কাব্য আর মাশফির সঙ্গে ভিডিওকলে কথা বলছিল। কাব্য আর মাশফি পারছে না আজই ইউকে চলে আসে। কতবছর পর তাদের পরিবারের মাঝে আনন্দ এসেছে! মেঘালয়কে আবার আগের মতই প্রাণচ্ছল দেখাচ্ছে। ইতি, সিতারা বেগম আর বর্ষা খুশি হলো। যাক পাগল দুটো এক হলো এই ভেবে তারা শতবার সৃষ্টিকর্তার শুকরিয়া জ্ঞাপন করে।
সবার সঙ্গে কথাবার্তা শেষ করার পর মেঘালয় মোবাইল ফোন তার পাশের সোফায় রেখে আলোকে গলা ছেড়ে ডাক দেয়। মেঘালয়কে এভাবে চিৎকার করে আলোকে ডাকতে দেখে রিনি আলোকে বলল,
— আরে তাড়াতাড়ি যাও। বউকে না দেখে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। পারলে এক গ্লাস পানি নিয়ে যাও।
আলো রিনির কথায় হাসতে হাসতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে মেঘালয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মেঘালয় আলোকে দেখে উঠে দাঁড়ায়। হাত বাড়িয়ে আলোর ঘামে ভেজা কপালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো আলতো হাতে সরিয়ে গালে এক হাত রেখে বলল,
— তুমি আসলেই ওয়াদা খেলাফ করতে পার। গতকাল রাতে তোমাকে আমি কি বলেছিলাম? অথচ, তুমি সকাল না হতেই ভুলে গেলে!
মেঘালয়ের কথার ভাঁজে অভিমানের ঘ্রাণ পাচ্ছে আলো। অথচ অভিমান করার কারণ বের করতে পারছে না তাই আলো বোকার মতো তাকিয়ে রইল। মেঘালয় গতকাল কি বলেছিল তার মনেও আসছে না? আলোকে চুপ থাকতে দেখে মেঘালয় আলোকে কাছে টেনে আলোর কপালে দীর্ঘ চুমু দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— রোজ সকালে তোমার মুখটা দেখে যেন আমার সকাল শুরু হয়।৷ ব্যস এতটুকুই তো আবদার করেছিলাম! তুমি তাও পূরণ করতে পারছো না? আজ প্রথমদিন তাই মাফ করলাম। পরেরবার কিন্তু মাফ করব না।
ইশশ, কেন যে ভুলে গেল ব্যাপারটা! রিনিরা আসবে বলে সকালে এত এত কাজে ব্যস্ত ছিল যে ডাক্তার সাহেবের সামান্য আবদার সে পূরন করতে পারেনি। আলোর যে কি মন খারাপ হলো। এগিয়ে গিয়ে মেঘালয়ের বুকের বা পাশে মাথা রেখে মেঘালয়ের বুকের ডানপাশে আঙুল দিয়ে আঁকিবুঁকি করতে করতে আলো বলল,
— অনেকগুলো সরি। আর কোনদিন ভুল হবে না। যদি ভুল করি তবে আপনি কিন্তু আমায় শাস্তি দিতে ভুলবেন না, বুঝলেন? আপনার আদর পেয়ে আমি দিনকে দিন বাঁদর হয়ে যাচ্ছি। কোন একদিন দেখবেন আমি আদর পেয়ে বখে যাওয়া বাঁদর হয়ে গাছের ডালে ডালে গিয়ে ঝুলব।
আলো’র কথা শুনে মেঘালয় হাসতে হাসতে শুরু করল। মেঘালয় এতটাই জোরে হাসছিল যে রিনি রান্নাঘর থেকে হাসির শব্দ শুনছে। আর আলো মুগ্ধ হয়ে তার ডাক্তার সাহেবের হাসি দেখছে। মানুষটাকে হাসলে ভালোই লাগে দেখতে। অথচ, অনেকেই আছে যাদের হাসি মোটেও সুন্দর না। অনেক কষ্ট করে মেঘালয় হাসি বন্ধ করে বলল,
— বাঁদর যেহেতু তুমি হবে তাহলে গাছ হিসেবে আমাকে ভেবে আমার গলায় ঝুলে থাকবে তুমি। তোমার বাঁদরের ব্যাপারটা আমায় কতটা থ্রিল দিচ্ছে বোঝাতে পারব না তোমাকে?
কথাগুলো শেষ করতে না করতেই মেঘালয় আবারও হেসে ফেলল। আলোর এবার ভীষণ রাগ হচ্ছে। মনে হলো মেঘালয় মনে মনে তাকে বাঁদর ভেবে বসে আছে। কেন যে বাঁদরের উদাহরণ টানতে গেল? রাগ সামলাতে না পেরে আলো চলে গেল সেখান থেকে। আর মেঘালয় আলোকে রাগ করে চলে যেতে দেখেও বলল,
— এই আমার জন্য কফি নিয়ে এসো।
আলো ফিরেও তাকায় না। মেঘালয় হাসতে হাসতে আবারও সোফায় বসে পরল।
রান্নাঘরে ঢুকে আলো কফি বানিয়ে রিনির হাতে দিয়ে বলল,
— তোমার গুণধর ভাইকে দিয়ে এসো।
— তুমি যাও। তোমাকে কফি দিতে বলেছে। আমাকে না।
রিনির উল্টো তেজ দেখে আলো বিরক্ত হয়ে বলল,
— তুমি আর তোমার ভাই একরকম। ধুরর….
হঠাৎ আলো’কে রেগে যেতে দেখে রিনি অবাক হয়ে কফির মগ নিয়ে মেঘালয়ের কাছে যায়। মেঘালয়ের হাতে কফির মগ ধরিয়ে দিয়ে বলল,
— তোমার শান্তশিষ্ট বউ মাঝে মাঝে আগ্নেয়গিরির মত ঠাসস করে ফেটে যায় কেন? বাপ রে!!
রিনির কথার পিঠে জবাব না দিয়ে মেঘালয় মূদু হেসে কফির মগে চুমুক দেয়। মেঘালয় কফি শেষ করে রিনির হাতে ধরিয়ে দেয়। রিনি কফির মগটা সেন্টার টেবিলের ওপরে রেখে বলল,
— ধরো বাই এনি চান্স তোমার বউ যদি জানতে পারে আমি তোমাকে পছন্দ করতাম ; তাহলে কি হবে?
রিনির কথা শুনে মেঘালয় আড়চোখে তাকায়। রিনি শুকনো দুটো ঢোক গিলে মেঘালয়কে ফিসফিস করে বলল,
— কিছু বলছো না কেন? আমার তো ভয় লাগছে। তোমার যেই বউ!! বাপ রে… গতকাল ফিওনাকে যা বলল!! আর যদি জানে আমি সেরকম কিছু ভেবেছিলাম কোনো একসম তাহলে আমার যে কি হাল হবে আল্লাহ জানে!!
রিনি রীতিমতো আতংকে আছে। ওর কথাগুলোতে আতংক প্রকাশ পাচ্ছে। মেঘালয় রিনির কথা আর আতংক দুটিতেই মজা পাচ্ছে।
গতকাল সন্ধ্যার পার্টিতে তার শান্তিশিষ্ট বউটার যে এমন রণচণ্ডী রুপ দেখার সৌভাগ্য হবে ; কে জানত? গতকালের ঘটনা মনে করে মেঘালয় ঠোঁট চেপে হাসি আঁটকে রাখার চেষ্টা করছে। আবার রাগও হচ্ছে আলোর ওপর। স্বামীকে ভালোবেসে স্বামীর ইজ্জত নিয়ে ছিনিমিনি খেলা একমাত্র আলোর পক্ষেই সম্ভব।
কফি শেষ করে আলোকে ডাক দেয় মেঘালয়। আলো আসে না। মেঘালয় বুঝতে পারল তার বউটা বাঁদরের ব্যাপারটা নিয়ে রেগে আছে। তাই আর আলোর রাগকে ছানা ছানি না করে মেঘালয় ভার্সিটির উদ্দেশ্য বের হয়ে যায়।
মেঘালয় চলে যাওয়ার আধঘন্টা পর আলো বের হয়ে যায়। ভার্সিটিতে পৌঁছানোর পর আলো ক্লাসরুম ঢুকতেই শান্ত’র মুখোমুখি হয়। আলো শান্তকে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল তার আগেই শান্ত আলোর পথ আঁটকে রাখে। আলো একপ্রকার বাধ্য হয়ে শান্তকে একহাতে ধাক্কা দিয়ে পথ ক্লিয়ার করে আসন গ্রহন করল। শান্ত তো নাছোড়বান্দা তাই আবারও আলোর পাশের সীটে গিয়ে বসল। আলো বিরক্ত হয়ে পুরো ক্লাসে কোথাও খালি সীট আছে কিনা দেখছিল! কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয় আর কি? সীট খালি নেই। তাই বাধ্য হয়ে শান্তর পাশে বসে থাকতে হচ্ছে আলোর।
যথাসময়ে ক্লাস শুরু হলো তাও আবার প্রফেসর মেঘালয়ের ক্লাস। মেঘালয় খুব সুন্দর করে হিউম্যান বডির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্রেইন নিয়ে আলোচনা করছিল। ক্কিন্তু, মেঘালয়ের মনে হলো পেছনের সাড়িতে বসা দুজন স্টুডেন্ট মনযোগী নয়।
— আমার দিকে তাকিয়ে না থেকে ক্লাসে মনোযোগী হও।
— ক্লাসটা তোমার স্বামী নিচ্ছে বলে ইন্টারেস্ট পাচ্ছি না। বোরিং লাগছে। তারচেয়ে বরং বসে বসে তোমাকে দেখি।
শান্ত’র কথা শুনে আলো বিরক্ত হয়ে বলল,
— তোমার নাম শান্ত না হয়ে অশান্ত হওয়া উচিত।
—তুমি বললে দুইটা রাম ছাগল কিনে জবাই দিয়ে নতুন করে আকিকা দিয়ে আমার নাম বদলে ফেলি।
শান্ত’র মজার অঙ্গভঙ্গীতে বলা কথাগুলো শুনে আলো হঠাৎই হেসে ফেলল। এবং আলোর হাসিমুখটা দেখে শান্ত হাসে। আর এই দৃশ্য মেঘালয়ের চোখে পরল।
ক্লাসরুমের ব্যাক বেঞ্চে আলো এবং শান্তকে হাসাহাসি করতে দেখে মেঘালয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর,, ক্লাস আওয়ার শেষে মেঘালয় আলোকে ভার্সিটিতে রেখে বাসায় ফিরে রিনিকে বলল,
—আমার তো ইচ্ছে করছে পুরো পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিতে।
রিনি মুখ ভেংচি কেটে বলল,
—পৃথিবী কি তোমার একার নাকি? তোমার ব্যক্তিগত সমস্যার জন্য তো তুমি পুরো পৃথিবী ধ্বংস করতে পারবে না। এই অধিকার তোমার নেই।
— তো কি করব আমি? ওই বদটাকে আলোর পাশে হা হা হি হি করতে দেব? ইচ্ছে তো করছে…..
নিজেকে যথাসম্ভব কন্ট্রোলে রেখে মেঘালয় রিনিকে সবটা খুলে বলল। এবং এটাও বলল রিনি যেন আলোকে বোঝায় ওই ছেলের কাছ থেকে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখে। সবটা শোনার পর রিনি মুখ কালো করে বলল,
— বউকে তুমি উড়তে দিচ্ছ। এখন সে যা ইচ্ছা করুক। তোমার কি? হিংসে হলে কাছে টানলে হয়!! তাছাড়া, ভার্সিটির ক’জন জানে তোমরা হাসবেন্ড-ওয়াইফ?
রিনির কথা গুলো শুনে মেঘালয় রাগ সহ্য করতে না পেরে টেবিলের ওপরে একটি গ্লাস নিয়ে সজোরে ছুঁড়ে মারল মেঝেতে।
রিনি হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রয়। মেঘালয় রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলল,
—ঘুড়ি যতই আকাশে উড়ুক লাটাই কিন্তু আমার হাতেই আছে৷ সুতা ছিড়ে যেতে চাইলে সোজা একটান দিয়ে জমিতে নামিয়ে আনব।
মেঘালয় নিজের ঘরে চলে গেছে। আর রিনি হতভম্ব হয়ে বসে আছে সোফায়। মানে যার ওপরে বোমা পরলে উহু করে না সে আজ গ্লাস ভেঙে ফেলেছে?
আলো ক্লাস শেষে অফিসরুমের সামনে বেশ কয়েকবার উকিঝুকি দেয় কিন্তু ডাক্তার সাহেবের ছায়াও দেখতে পেলো না। শেষমেশ প্রফেসার জোনাসের কাছ থেকে জানতে পারল যে, মেঘালয় বাড়িতে চলে গেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো।
আলো এবার নিজের কপালে হালকা করে চাপড় দিয়ে বলল,
— তুই কি রাগ করবি? তোর বর রাগ করেছে তোর সঙ্গে। এবার বাড়ি গিয়ে রাগ ভাঙা।
ভার্সিটি থেকে বাড়ি ফেরার পর আলো খেয়াল করল মেঘালয় চুপচাপ বসে আছে। আলো চোখের ইশারায় রিনিকে জিজ্ঞেস করল, “ কি হয়েছে”। রিনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বোঝালো, “আমি জানিনা”।
আলো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিল যখন তখন মেঘালয় উঠে আলোর পাশাপাশি হাঁটতে লাগল। আলো কিছু বলতে গিয়েও বলল না। কারণ সে রেগে আছে। এবং সেই রাগ ডাক্তার সাহেবকে ভাঙাতে হবে।
আলো রিনির ঘরের দরজা খুলে ঢুকতে যাচ্ছিল মেঘালয় হাত টান দিয়ে আলোকে কাছে টেনে এনে বলল,
— তোমার যাবতীয় সবকিছু আমার ঘরে শিফট করা হয়েছে।
কথাটি বলেই আলোকে টানতে টানতে নিয়ে যায় তার ঘরের দিকে। এদিকে মেঘালয়ের এবনরমাল বিহেভ আলো হজম করতে পারছে না। রুমের ভেতরে প্রবেশ করে দরজা লক করে আলো’র হাত ছেড়ে দেয়। এরপর, মেঘালয় বারান্দার দিকে যেতে যেতে বলল,
— ফ্রেশ হয়ে এসো জলদি।
মেঘালয় চলে যাবার পর আলো আলমারী খুলে দেখল, সত্যি সত্যি ওর সবকিছু গুছিয়ে রেখেছে। বেবি পিংক কালারের কামিজ, সাদা কালারের ওড়না-পাজামা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পরল। গোসল শেষ করে ওয়াশরুম থেকে বের হবার আলো দেখল, মেঘালয় রুমে আছেই। আলোকে দেখেই মেঘালয় উঠে আসে। আলোর সামনে দাঁড়িয়ে হাত বাড়ায় আলোর চুলের দিকে। চুল থেকে ভেজা টাওয়াল খুলে টাওয়াল দিয়ে আলতো হাতে চুল মুছতে মুছতে আলোর মুখটার দিকে বারবার তাকায়। আলো ভুল করেও একবার দৃষ্টি সরায়নি। সে তাকিয়ে তাকিয়ে ডাক্তার সাহেবকে দেখছে।
— শান্ত শাহনেওয়াজ তোমার পূর্ব পরিচিত?
এই প্রশ্নটা শুনে আলো কালক্ষেপণ না করেই বলল,
— হ্যা।
— সে তোমাকে পছ….
বাকি কথা উচ্চারণ করার সাহস জুটে না মেঘালয়ের। কিছুক্ষণ আগে সিতারা বেগমের সঙ্গে কথা বলে শান্ত’র সম্পর্কে জানতে পারে।
আলো মেঘালয়ের মনের অবস্থা টের পেলো কিনা? হাত বাড়িয়ে মেঘালয়ের হাত থেকে টাওয়াল নিয়ে ডিভানের ওপরে রেখে মেঘালয়ের দু-হাত ধরে বলল,
—- পৃথিবীর কে আমায় চাইল? কে আমায় পছন্দ করে? কে আমায় ভালোবাসে? এসব নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। আমি জানি আমাকে কেবল মেঘালয় ইমতিয়াজ আহমেদ ভালোবাসে। আর আমি তাকে ভালোবাসি। দ্যাটস ইট।
মেঘালয় আলোকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
— আমার হয়ে থেকো, আলো। আমার অবর্তমানে আর কাউকে গ্রহণ করো না। আমি সইতে পারব না তোমার গায়ে অন্য কারো গন্ধ মেখে থাকবে।
মেঘালয়ের কথা শুনে আলো’র দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। মেঘালয়ের হাতের পিঠে অজস্র চুমু দিয়ে আলো কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আখিরাতে যদি আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয় না, আমি আপনার দিকে বিরক্তকর দৃষ্টিতে তাকাব। কারণ, ভালোবাসা মাখা দৃষ্টি তো আপনার হজম হচ্ছে না। বিরক্তিকর দৃষ্টি না হয় আপনার জন্য বরাদ্দ রাখলাম।
মেঘালয়ের চোখ ভিজে ওঠে। জীবন এত ছোট বলেই কি জীবনের এত মূল্য!
কিছু মাস পর……
ক্লাস শেষ করে করিডর ধরে গুটুর গুটুর আলাপ করতে করতে হাঁটছিল আলো আর রিনি। যদিও আলো এই আলাপের একমাত্র শ্রোতা।
— আলো??
— হুম?
— আমার ব্যাগে মেহেদী আছে। চলো তোমাকে মেহেদী পরিয়ে দেই।
রিনির কথা শুনে আলো মুচকি হাসে। তারপর, ভ্রু নাচিয়ে বলল,
— মেহেদী কে কিনে দিয়েছে? আরাফাত ভাইয়া নাকি! কিন্তু, উনাকে দেখলে তো মনে হয় না উনি তোমার রোমান্টিক বর!!!
আলো’র কথা শুনে রিনি অবাক হয়। তারপর, আমতাআমতা করে বলল,
— কেন বর যদি রোমান্টিক না হয় তাহলে কি সমস্যা?
— বিশাল সমস্যা। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হয়ে যায় সাধারণ সম্পর্ক। রোজ খাওয়াদাওয়া, ঘুম আর বাচ্চা পয়দা করা কি স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হতে পারে? স্বামী শুধু স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহন করল আর স্ত্রী স্বামী, স্বামীর পরিবার আর সন্তানের খেদমতের দায়িত্ব। এটাই কি স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক?
আলোর কথায় সম্পূর্ণ সহমত প্রকাশ করে রিনি মাথা নেড়ে বলল,
— না, না। হতেই পারে না।
—সেটাই তো আমি বলছি।। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হচ্ছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পর্ক। এতটাই মূল্যবান যে এই সম্পর্ক আখিরাতে এবং জান্নাত অব্দি বহাল তবিয়তে থাকবে। যেখানে এত এত সম্পর্কের মারপ্যাচ সেখানেই কেন স্বামী আর স্ত্রীকে জোড়ায় জোড়ায় দুনিয়ায় এবং জান্নাতে রাখা হবে?
আলো’র কথা শুনে রিনির ঠোটের কোণে হাসি ফুটে উঠেছে। আলো’র হাত ধরে বলল,
— রোমান্টিক বর পেয়েছি কি না আমি জানি না। কিন্তু, আরাফাত আমার অতি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র বিষয়ে খেয়াল রাখে৷ আমি তো উল্টো মনে মনে ভেবেছি, আমাদের বিয়ের ছয়মাস পেরিয়ে গেলেই বুঝি আরাফাত আমার প্রতি আর্কষন কমে যাবে৷ তাই আমি ওর ছোট ছোট আদর, যত্নকে হেলায় ফেলায় দেখেছি। অথচ, আরাফাত আমাকে প্রায়ই বলে, ঠিক যেমন করে তুমি আমায় কথাগুলো বললে।
রিনির হাত ধরে আলো বলল,
— এবার তুমিও আরাফাত ভাইয়ার খেয়াল রাখবে। ছোট ছোট সারপ্রাইজ দিয়ে তাকে আনন্দ দিবে। দ্যাটস ইট। একটা সম্পর্ক ভালো রাখতে শুধু যত্নের দরকার হয়। অযত্নে অবহেলায় যেমন একটি বিশাল গাছ মরে যায় ঠিক তেমনি সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়।
— তাহলে তুমিও মেঘালয়ের খেয়াল রাখবে। যত্নে রাখবে। জানোই তো মেঘালয় একটু ভালোবাসার কাঙাল। তোমাকে ছাড়া ওর কেউ নেই।
মেঘালয়ের নাম উঠে আসতেই আলো মাথায় হাত দিয়ে বলল,
—রিনি আমি একটা বিষয় ভুলে গেছি।
রিনি আলোর কথা শুনে আতংকিত হয়ে যায়। বেচারি ভয়ে ভয়ে বলল,
— কিছু হয়েছে আলো?
— আজ নভেম্বর মাসের তিন তারিখ। আমাদের নবম বিবাহবার্ষিকী। অথচ আমি আজ ডাক্তার সাহেবকে উইশ করিনি। ডাক্তার সাহেব এবার সত্যি সত্যি বলবে, কেমন বউ হই আমি তার?
আলোর কথা শুনে রিনি কিছু একটা ভাবল। তারপর, বলল,
— সারপ্রাইজ প্ল্যান করতে পারো।
রিনির প্রস্তাব শুনে আলো খুশি হয়ে যায়। রিনির গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
— তুমি এত সুইট কেন, রিনি? আমার জীবনের এত এত সমস্যার সমাধান তোমার এক চুটকিতে সলভ হয়ে গেছে।
—আরে তুমি এত ভালো একটা মেয়ে। তোমার মন খারাপ আমি সহ্য করতে পারি না।
আলোকে জড়িয়ে ধরে কথাগুলো বলে থামল রিনি। তারপর, ব্যাগ থেকে মেহেদি বের করে আলো’র হাত টেনে ধরে মাঠের ঘাসের উপর বসতে বসতে বলল,
— এবার তো তোমাকে মেহেদী না লাগিয়ে ছাড়ছি না আমি। তোমাকে আজ রাতে আমি নিজ হাতে বউ সাজাব।
রিনি খুব মনযোগ দিয়ে আলো’র হাতে মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছে। আলো এই ফাঁকে একবার অফিস রুমের দিকে তাকায়। যদি একবার ডাক্তার সাহেবের দেখা মিলে এই ভেবে। কিন্তু, না তাকে দেখা যাচ্ছে না। আজ ক্লাসে দেখা হয়নি। কারণ, আজ ডাক্তার সাহেবের তাদের ডিপার্টমেন্টে ক্লাসের দিন না।
হঠাৎ সেখানে শান্ত উপস্থিত হয়। এসেই দেখল রিনি আলোর হাতে মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছে। আলো শান্তকে দেখে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। মেঘালয়ের সেদিনের মন খারাপের মূহুর্ত দেখার পর থেকে শান্তকে দেখলে আলো’র ইচ্ছে করে কাঁদামাটি ছুঁড়তে। তার এত ভালো বর কেবল এই অশান্তের জন্য কষ্ট পেয়েছে!
—হেই, আলো? তোমার মেহেদী রাঙা হাত তো অনেক সুন্দর লাগছে। আমার নামের ফার্স্ট লেটার লিখবে তোমার মেহেদী রাঙা হাতে?
শান্তের এমন উদ্ভট আবদার শুনে আলো কপালে ডানহাত রেখে বিড়বিড় করে বলল,
–তোর যন্ত্রণা সহ্য করতে পারছি না। দেখবি, কোনো একদিন তোর নাম আমি থানায় লিখে আসব। বাঁদর কোথাকার?
পাশে বসে থাকা রিনি হু হু করে হেসে ফেলল আলোর কথা শুনে। রিনিকে আচমকা হাসতে দেখে শান্ত বোকার মতো তাকিয়ে রইল।
— তোমার নাম আমি আমার হাতে লিখব কেন? তুমি আমার কে? কেউ না। হ্যা অনেক বছর ধরে আমরা একে অপরকে চিনি জানি। ব্যস এতটুকু তো।
শান্ত কিছু বলতে চায় তার আগেই আলো হাত উঁচু করে শান্তকে থামিয়ে বলল,
— এখন বলবে তুমি আমাকে পছন্দ করো। একপাক্ষিক পছন্দের দাবিদার একমাত্র তুমি নিজেই। আমি না। আমি আমার স্বামীকে মনে প্রাণে চাই। তাকে ইহকাল এবং পরকালেও চাই। তুমি আমাদের মাঝে তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে এসো না, শান্ত। অনেকগুলো বছর আমরা দুজনেই কষ্ট পেয়েছি। এবার একটু সুখের দেখা পেয়েছি। আমাদের কাছ থেকে সুখ ছিনিয়ে নিও না।
তোমার কাছে আমি হাত জোর করছি।
কথাগুলো বলেই রিনিকে নিয়ে সেখান থেকে চলে আসে আলো। বাড়িতে এসে ঢুকার পর আলোর মনে হচ্ছে বাড়ির কোথা থেকে পঁচা গন্ধ আসছে! গন্ধ এতটাই প্রকট যে আলো দৌঁড়ে বেসিনের সামনে গিয়ে বমি করে ফেলল। আলো’র হঠাৎ এই অবস্থা দেখে রিনি হতভম্ব হয়ে যায়। আলোর পাশে গিয়ে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছে আলো কখন স্বাভাবিক হবে। বেশ কিছুক্ষণ পর আলো স্বাভাবিক হলো। চোখেমুখে পানি দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। রিনি টাওয়াল এগিয়ে দেয় আলো’র সামনে। টাওয়াল হাতে নিয়ে মুখ মুছে আলো বলল,
— রিনি?
— হুম?
— তুমি ফুপি হতে যাচ্ছো, রিনি।
আলোর কথা শুনে রিনি স্ট্যাচু হয়ে গেছে। আলো’র কথা ওর বিশ্বাস হচ্ছে না। তাছাড়া…
রিনি কাঁপা কাঁপা হাতে আলোর উদর ছুঁয়ে বলল,
— সত্যি?
— হান্ড্রেন্ড পার্সেন্ট সত্যি।
কথাটি শেষ করতে না করেই আলো মাথা ঘুরে পরে যাবার মতো উপক্রম হলো। ভাগ্যিস সঠিক সময়ে রিনি ধরে ফেলেছিল। আলোকে কোনোমতে সোফায় এনে বসায় রিনি। তারপর, চলে যায় ডাক্তারকে কল করতে। কিছুক্ষণের মধ্যে রিনির পরিচিত এক বাঙালি ডাক্তার বন্ধু এসে আলো’র শারীরিক অবস্থা দেখে যায়। এবং এটাও বলে যায় আলো যেন নিজের শরীরের সর্বোচ্চ খেয়াল রাখে।
রিনির বন্ধু চলে যাওয়ার পর রিনি আলোর পাশে বসতে বসতে বলল,
— পিএইচডি ডিগ্রির জন্যই তো এই দেশে এসেছো? এখন বাচ্চা এলে….
— আমি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আর অধিক মূল্যবান মেঘালয়ের ভলোবাসার ডিগ্রি অর্জন করতে লন্ডন এসেছি। বাকি কি হবে না হবে ওসব আমি ভেবে দেখিনি।
আলোর কথা শুনে রিনি আলোর হাতের ওপর হাত রেখে বলল,
— আমার কথায় মনে কষ্ট নিও না। আমি জানি তুমি যা ভেবেছো তোমাদের ভালোর জন্যই ভেবেছো।
— জানো, ইদানিং আমার মৃত ছেলের মুখটা দেখতে ইচ্ছে করে রিনি। কিন্তু, দেখব কেমন করে? তাছাড়া, আমাদের বয়স তো চলে যাচ্ছে। তাই ভাবলাম আবারও সাহস করে নাহয়!
কথাগুলো বলতে বলতে আলো অন্যদেশে হারিয়ে যায়। যেই দেশে আলোর সঙ্গে আলোর অনাগত সন্তানের দেখা হবে কোনো একদিন।
রিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মেঘালয় ঠিক এভাবেই আলোর মতো হাহাকার করতো। সন্তান হারানোর বেদনা কি সত্যি কষ্টদায়ক?
— মেঘালয় জানে?
— না। এখনও তাকে কিছু বলিনি। আজ রাতেই ওকে বলব৷
— অভিনন্দন জানাই তোমাকে। যাক প্রমোশন হচ্ছে আমার। আমি গিয়ে আরাফাতকে বলে আসি। তাছাড়া স্পেশাল রান্নাবান্না করতে হবে। তুমি এখানেই বসে থাকবে। নড়বে না। আমি আসছি।
রিনি চলে গেছে। আলো একা বসে বসে বোর হচ্ছে। তাই ভাবল মেঘালয়ের সঙ্গে একটু দুষ্টুমি করা যাক। মোবাইল হাতে নিয়ে ইমেইল লিখল। তারপর, সেন্ড করল মেঘালয়ের কাছে।
মেঘালয় তখন ল্যাবে। ছাত্র-ছাত্রীরা সামনেই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক এমন সময় টুং করে মোবাইল মেসেজ টোন বেজে উঠল। মেঘালয় মোবাইল হাতে নিয়ে দেখল, পত্রলেখার মেসেজ এসেছে। এত মাস পর পত্রলেখার ইমেইল দেখে মেঘালয় ইমেইল ওপেন করে পড়তে শুরু করল,
“ এই আপনি এত অগোছালো কেন? আপনি কি জানেন আপনি যখন ঘুমের দেশে থাকেন তখন কতটা কিউট লাগে? আমার তো ইচ্ছে করে আপনার গালদুটো ইচ্ছামতো টেনে দেই!”
ইমেইল টুকু পড়েই মেঘালয়ের সন্দেহ গাঢ় হতে শুরু করে। অপরিচিত কেউ হতে পারে না। এটা স্রেফ আলো। বিগত কয়েকটা ইমেইল এর একেকটা শব্দ আলোর লেখা। আলো একমাত্র মেঘালয়কে কাছ থেকে দেখছে। এবং খুটিনাটি সবকিছুই জানে তার ব্যাপারে। মেঘালয় মৃদু হেসে আলোর উদ্দেশ্যে ফিরতি ইমেইল পাঠালো।
—আচ্ছা, আপনি কে বলুন তো? আপনার সাজানো কথার পেছনে কেমন পরিচিত একটা ভাব প্রকাশ পায়?
মেঘালয়ের ফিরতি ইমেইলটুকু পড়ে আলো চোখদুটো বন্ধ করে ফেলল। তারপর, চোখ খুলে প্রশান্তিময় হেসে লিখল…
— আমি আপনার খুব কাছের। কতটা কাছের জানেন? মোট ষাট সেকেন্ডে আপনার হৃদয় কতবার স্পন্দিত হয় আমি গুনে দেখেছি… আপনার খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির নীচে চাপা পড়ে যাওয়া ডান গালের আধ ইঞ্চি কাটা দাগটাকে আমি বেশ কয়েকবার ভীষণ আদর করে স্পর্শ করেছি। এবার ভেবে দেখুন তো, আমি আপনার কত কাছের?
পত্রলেখার ফিরতি ইমেইলটুকু পড়ার পর মেঘালয় হাসছে। তার বোকা বউটা যে লন্ডনে আসার আগ মূহুর্ত থেকে তাকে স্টক করছিল? সে কি ভেবেছিল পত্রলেখা আর কেউ নয় একমাত্র আলো হতে পারে? মেঘালয় মোবাইল ফোন বের করে কল করল রিনিকে। রিনি কল রিসিভ করতেই মেঘালয় বলল,
— সবকিছু ঠিকঠাক মতো হয়েছে? কোনো কমতি আছে? আমি লোক পাঠাব?
— সবকিছু পার্ফেক্টভাবে হইছে। আমি একটু পর বাবাকে নিয়ে আরাফাতদের বাড়িতে চলে যাব। তুমি কিন্তু সন্ধ্যা নামার আগেই চলে আসার চেষ্টা করবে।
— যথা আজ্ঞা গু রানী।
— মেঘালয়??
— সরি, সরি।
বলেই হাসতে হাসতে কল কেটে দেয় মেঘালয়। আর রিনি রান্নাঘর থেকে ড্রইংরুম বসে থাকা আলোর দিকে তাকিয়ে আনমনে বলল,
— মেঘের পাশে কেবল আলোকে মানায়।
মেঘের জীবনে রিনির জায়গা হতে পারে না।
সন্ধ্যা নামার আগেই রিনি আলোকে পুরোদস্তুর বাঙালি বউ সাজে সজ্জিত করালো। আলো তো আয়নায় নিজেকে দেখে অবাক হয়ে রিনিকে বলল,
— এটা তো আমার বিয়ের শাড়ি। এখানে এলে কেমন করে?
— তোমার ডাক্তার তোমার বিয়ের শাড়ি বাংলাদেশ থেকে আনিয়েছে বেশ কয়েকদিন হয়েছে।
রিনির কথা শুনে আলো অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ,
— রিনি আর কিছু কি বাকি আছে, যা আমি জানি না?
— তুমি মেঘালয়কে সারপ্রাইজ দিবা আর মেঘালয় তোমাকে সারপ্রাইজ দিবে। হিসাব কাটাকাটি। আর কিছু জানতে চাও?
রিনি আলোর প্রশ্নের জবাব দিয়ে আলোর শাড়ির আঁচল পিন দিয়ে আটকায়। আলো পেছনে ঘুরে রিনির হাতটা ধরে বলল,
— এজন্যই কি আজ সারাদিন ডাক্তার সাহেব আমার সামনে আসেনি?
রিনি জবাব না দিয়ে হাসছে। আলো আর জোর করে না রিনিকে। কারণ, রিনি আর কিছুই বলবে না। এই ক’মাসে রিনিকে সে মোটামুটি চেনে।
রিনি আরও একবার আলোকে আপাদমস্তক দেখে আলোর হাত ধরে ফুল দিয়ে সাজানো বাসরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
— তোমাকে পুরাই আদর আদর দেখতে লাগছে! মাশাআল্লাহ নজর না লাগুক।
আলোকে ফুলের বিছানায় বসিয়ে রেখে রিনি বলল,
— এবার তোমার অপেক্ষার পালা। মেঘালয় না আসা পর্যন্ত অপেক্ষার প্রহর গুনতে হবে তোমায়।
রিনি তৌহিদ সাহেবকে নিয়ে আরাফাতদের বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হলো।
ঘড়িট কাটা ঘুরতে ঘুরতে সময় অতিক্রম হয়ে দুই ঘন্টা। মেঘালয় ফিরে আসছে না। এবার সত্যি সত্যি আলোর ভয় লাগছে। অজানা আতংকে আলো’র হাত-পা কাঁপতে শুরু করে। বালিশের পাশ থেকে মোবাইল নিয়ে মেঘালয়ের নাম্বারে কল করে। বেশ কয়েকবার লাগাতার কল দেয়ার পরও যখন মেঘালয় কল রিসিভ করে না আলোর কানে কানে যেন কেউ এসে বলল,
“মেঘালয় আর ফিরে আসবে না!”
আলোর হাত-পায়ে আর শক্তি পাচ্ছে না। তবুও মনের জোরে রিনির নাম্বারে কল করে। রিনি কল রিসিভ করতেই আলো কান্নায় ভেঙে পরে। রিনি আতংকিত হয়ে বারবার জিজ্ঞেস করে ,
— আলো, কি হইছে? এই কিছু বলছো না কেন?
আলো অনেকটা জোর করে কান্না থামিয়ে সবকিছু খুলে বলে। সবটা শোনার পর রিনি বলল,
— আমি আসছি। তুমি ভেঙে পরো না। সাহস রাখো।
আলো’র দমবন্ধ হয়ে আসছে। এত সাজসজ্জা কার জন্য? মেঘালয়ের জন্যই তো। কিন্তু, মেঘালয় কই।
আলো চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— আপনি কই আছেন, ডাক্তার সাহেব? আমার এমন অস্থির লাগছে কেন?
এমন সময় দরজা খোলার শব্দ পেয়ে আলো যেন প্রাণ ফিরে পায়। দৌড়ে যায় দরজার সামনে। দরজা খুলে প্রবেশ করার মাত্রই আলো ঝাঁপিয়ে পরে মানুষটার বুকের ওপর। কয়েক সেকেন্ড কেটে যাবার পর আলো বুঝতে পারল, যার বুকে সে আশ্রয় নিয়েছে সেই মানুষটা মেঘালয় নয়। কারণ, মেঘালয়ের গায়ের গন্ধ আলো চেনে। এই মানুষটা অন্যকেউ। আলো ঝট করে মানুষটাকে এক ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়৷ তারপর, চোখের সামনে যাকে দেখল তাতেই আলোর অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। শান্ত’র হাতদুটো রক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে। শান্তকে আজ মোটেও স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। শান্তকে দেখে আলো ভয়ে কান্না করে ফেলল। আলো কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— তুমি এখানে এসেছো কেন? মেঘালয় তোমাকে দেখলে রাগ করবে আমার সঙ্গে। মেঘালয় ফিরে আসার আগে তুমি চলে যাও এখান থেকে।
আলোর কথা শেষ হবার পরপরই শান্ত বিদ্ঘুটে ভাবে হাসতে শুরু করলো। শান্ত’র হাসির শব্দ যেন ভৌতিক ব্যাপারের সঙ্গে মিশে আছে। শান্ত বহুকষ্টে হাসি থামিয়ে বলল,
— তোমার ডাক্তার আর তোমার ফিরে আসবে না। তাকে আর ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। আমি এবার রোজ তোমাকে দেখব। আমাকে বাঁধা দেয়ার জন মেঘালয় আর আসবে না। এই যে আমার হাতদুটোতে রক্ত দেখছো না, এই রক্ত কার জানো? তোমার ডাক্তারের রক্ত।।।
শান্ত পাগলের মতো হাসছে। আর আলো যেন পাথর বনে গেছে। চোখের পানি যেন শুকিয়ে গেছে। শান্ত হাসি থামিয়ে পুরো ঘরটাকে আর আলোর সাজসজ্জা দেখে আলোর সামনে গিয়ে বসল। আলোর হাতটা ধরতে গেলে আলো দূরে সরে যায়। কিন্তু, শান্ত আলোর হাত এতটাই শক্ত করে চেপে ধরল যে আলোর স্বর্ণের চুড়ি বেকে গিয়ে আলোর হাতের সঙ্গে গেঁথে যায়। আলো ব্যাথায় আর্তনাদ করে ওঠে। আলোর আর্তনাদ আজ আর শান্তকে ছুঁতে পারছে না। শান্ত আলোর দুই হাত একহাতে ধরে অন্যহাতে আলো’র থুতনি চেপে ধরল। আলো ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
— তাকাও আমার দিকে। তাকাও বলছি। আমার কি নেই যা ওই ডাক্তারের আছে? আটটা বছর তোমার পেছনে ঘুরেছি আমি শুধু তোমার একটু ভালোবাসা পাবার জন্য। আর তুমি পাষান নারী। আমার ভালোবাসাকে উপহাস করতে করতে তোমার ডাক্তার গলায় এসে আবার ঝুলে পরলে। কেন? আমার ভালোবাসা কম? মোটেও না। এবার আমার ভালোবাসার প্রমাণ দিলাম তোমাকে। তোমাকে পেতে যদি একটা মেঘালয় কেন একশ মেঘালয়কে খুন করতে হয় আমি শান্ত শাহনেওয়াজ একশ খুন করতে রাজি আছি।
শান্ত’র বলা এক একটা শব্দ আলোর মস্তিষ্কে গিয়ে সুঁইয়ের গুতোর মতো লাগছে৷ তার সামনে বসে থাকা এই পিশাচের জন্য যে মেঘালয়কে হারাতে হয়েছে তা বারবার মস্তিষ্কে হানা দেয়া মাত্রই আলোর পুরো শরীরের প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠছে। আলো’র যে কি হলো এক ঝটকায় শান্ত’র কোমড়ে গুঁজে রাখা পিস্তল হাতে নিয়ে শান্ত’র কপালের মাঝ বরাবর তাক করে বলল,
— আমি তোর কাছ একটু শান্তি চেয়েছিলাম। তুই দিয়েছিলি আমাকে শান্তি? তোর এই জোরজবরদস্তিকে তুই ভালোবাসার ট্যাগ দিয়ে কলঙ্কিত করিস না শান্ত। আমি মেঘালয়কে নিয়ে একটু ভালোমতো বাঁচতে চেয়েছিলাম। আর তুই… তুই আমার সুখকে ছিনিয়ে নিয়েছিস। এই তোর ভালোবাসা!! তুই আমাকে কখনোই ভালোবাসতেই পারিসনি। আমাকে তোর করে নেয়া হচ্ছে তোর জেদ। তোর জেদের রোষানলে আমি আমার ভালোবাসাকে হারিয়ে ফেলেছি, শান্ত। আমি এখন কি নিয়ে বাঁচব, বল?
কাঁদতে কাঁদতে আলো এবার নিজের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে বলল,
— আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করছে না। তোর মতো পিশাচের ছায়া আমার জীবনে পরার আগেই আমি মৃত্যুকে সাদরে গ্রহণ করব। এপাড়ে না হয় মেঘালয়কে তুই আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছিস। কিন্তু ওপারে পারবি না। ওপারে আমার জন্য মেঘালয় অপেক্ষা করছে।
আলো চোখ বন্ধ করে ট্রিগারে চাপ দেয়ার আগেই শান্ত আলোর কাছ পিস্তল ছিনিয়ে নেয়। প্রথম গুলি বের হয়ে সিলিংয়ে গিয়ে লাগে। গুলির শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা তৎক্ষনাৎ পুলিশকে খবর দেয়।
শান্ত আলোর হাত থেকে পিস্তল ছিনিয়ে নেয়। তারপর, তার পকেট থেকে টিস্যু বের করে পিস্তল সুন্দর করে মুছে ফেলল। যাতে আলো’র ওপর প্রশাসনের কোনো চাপ না আসে। পিস্তল মুছে ট্যিসু ফেলে আলোকে উদ্দেশ্য করে বলল,
— জানো আলো? যখন হৃদয় বলা শুরু করে তখন কান কিছুই শোনে না। আমিও একই ভুল করলাম এই একটা জায়গাতে এসে। আমি কাকে পাবার আশায় কি করে ফেললাম আলো? আমার ইহকাল, পরকাল কোনোকালেই তুমি নেই, আলো। তোমাকে নিয়ে সুখী হবার কল্পনায় এতটাই ডুবে ছিলাম আমি যে অজান্তেই তোমার দুঃখী হবার কারণ আমিই হলাম।
তাহলে তো আমারও বেঁচে থাকারও অধিকার নেই। তাই-না আলো…
ঠাসস, ঠাসস করে পরপর দুটো গুলির শব্দ হলো। শান্ত’র মাথা ছিন্নভিন্ন হয়ে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর আলো কানে হাত দিয়ে ভয়ে চিৎকার করছে। রিনি, আরাফাত, তৌহিদ সাহেব এসে যখন মেঘালয়ের ঘরের দরজা খুলল মেঘালয়ের ঘরের ভেতরে তখন রণক্ষেত্র। বাইরে থেকে পুলিশের গাড়ির সাইরেন বাজছে।
পুলিশ এসে শান্ত’র লাশ নিয়ে যায়। তদন্তকারী কর্মকর্তা আলোকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চলে গেছেন। পিস্তল আর ক্রাইম সিন দেখে বোঝা যাচ্ছে শান্ত সুইসাইড করেছে। আলোর অবস্থা বেগতিক। মেঘালয়ের কোনো খবরই পাওয়া যাচ্ছে না। এমন সময় আরাফাত এসে আলোকে বলল,
— ভাবী চলেন আমার সঙ্গে। মেঘালয়ের খোঁজ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় এক হসপিটালের মেঘালয়ের অপারেশন চলছে। আলো, রিনি, আরাফাত আর তৌহিদ সাহেব অপেক্ষা করছেন একটা ভালো খবর পাওয়ার আশায়।
মেঘালয়কে স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় পুলিশ এই হসপিটালে এডমিট করায়। পুলিশের কাছ থেকে যতটুকু জেনেছে তা হলো, এসিডের ছুড়ে মারার কারণে মেঘালয়ের গলা এবং বুকের কিছু অংশ ঝলসে। এবং পরবর্তীতে মেঘালয়ের মৃত্যু সুনিশ্চিত করার জন্য বুকের বা পাশে হৃদপিণ্ড বারবার গুলি করা হয়।
এসব কিছু শুনে সবাই ভেঙে পরে। ইতিমধ্যে মেঘালয়ের অপারেশন শেষ হয়। পেশেন্টকে নিয়ে ডাক্তার আশাবাদী নন। কারণ গুলি হৃদপিন্ড ছেদ করে না গেলেও অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের কারণে রোগী কোমায় চলে যেতে পারে। এখন একমাত্র রোগীর জ্ঞান ফিরে আসলে বাকিটা আন্দাজ করা যাবে।
সারারাত নির্ঘুম কাটায় রিনি, আলো, তৌহিদ সাহেব এবং আরাফাত। সিতারা বেগম, কাব্য এবং মাশফির পরিবার যেন দিশেহারা বোধ করছে। না পারছে মেঘালয়ের কাছে ছুটে যেতে আর না পারছে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে।
সকাল সাতটার দিকে নার্স এসে জানালো মেঘালয়ের জ্ঞান ফিরে এসেছে। এবং তিনি তার ওয়াইফের সঙ্গে কথা বলতে চায়। সবাই স্বস্তি পায় আর আলো যেন নিজের প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নার্সের পেছনে ছুটতে ছুটতে যায়। কেবিনের ভেতরে ঢুকতেই মেঘালয়ের মুমূর্ষু অবস্থা দেখে আলোর নিজেকে অপরাধী মনে হয়। চোখের জলে সব ঝাপসা দেখছে তবুও নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখেই মেঘালয়ের বেডের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
আলো’র গায়ের গন্ধ পেয়ে মেঘালয় চোখ খুলে তাকায়৷ আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে অনেক কষ্ট বলল,
— এই লাল শাড়িতে তোমাকে সত্যি সত্যি আমার আমার মনে হয়। আমার লাল টুকটুকে বউ।
আলো মেঝেতে বসে মেঘালয়ের বেডে মাথা ঠেকিয়ে কান্নায় ভেঙে পরে। মেঘালয় অনেক কষ্ট করে আলো’র মাথায় হাত রেখে বলল,
— আমার কাছে একটা সংসার চেয়েছিলে না তুমি। তোমায় আমি সংসার দিতে পারলাম না, আলো৷
— কে বলল, আপনি পারবেন না? আপনি পারবেন।
আলো পাগলের ন্যায় কথাগুলো বলে উঠে দাঁড়ায়। মেঘালয়ের গালের ওপরে হাত রাখতেই মেঘালয় ব্যাথায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। আলো খেয়াল করল এসিডের ছিটায় মেঘালয়ের এত সুন্দর গালের মাংস উঠে গেছে । এ যেন চাঁদের গায়ে কলঙ্কের দাগ।
আলো সামান্য ঝুঁকে মেঘালয়ের ব্যাথার ওপর চুমু দিয়ে বলল,
— আমরা আবার আগের মতো সুখে শান্তিতে থাকব। তাছাড়া, আপনি আবারও বাবা….
কথাটি সম্পূর্ণ করতে পারল না আলো। তার আগেই মেঘালয় কেমন যেন ছটফট করতে থাকে। আলো ভয় পেয়ে ডাক্তারদের ডাকছে। মেঘালয় আলোর হাত শক্ত করে চেপে ধরল। আলো মেঘালয়ের মুখের সামনে ঝুঁকে বারবার বলছে,
— আপনি ঠিক হয়ে যাবেন। নিজের ওপর আস্থা হারাবেন না। মেঘালয় আপনি শুনতে পারছেন আমি কি বলছি? এই মেঘালয়? মেঘালয়?
— সরি মিসেস মেঘালয় …..
এই একটা শব্দ বলেই মেঘালয় নিস্তেজ হয়ে পরে। আলো স্তব্ধ হয়ে যায়। ডাক্তাররা এসে আলোকে বের করে দেয়। রিনি এসে আলোকে জড়িয়ে ধরল। আলো রিনির বুকে মাথা রেখে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— রিনি তোমার ভাই আমাকে সরি বলল কেন? তার কাছে একটা ভালোবাসা ভরা সংসার চেয়েছিলাম। এখম সে আমায় সংসার দিতে পারবে না বলে সরি বলে সব মিটমাটের চেষ্টা করছে?
রিনি আলোর মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে কিন্তু আলো শান্ত হতে পারছে না।
—আপনার সরি আমি মানব না ডাক্তার সাহেব। আমার আপনাকেই লাগবে। শুনতে পারছেন আপনি? আমার আপনাকেই লাগবে। আমার সন্তানের বাবা লাগবে। আমার সন্তানকে না দেখে আপনি কোথাও যেতে পারবেন না।
(সমাপ্ত সিজন ৩ যদি আপনারা চান তাহলে আসবে)
