Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২১

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২১

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২১
সিমরান মিমি

শামসুল সরদার জেল থেকে ফিরলেন বিধ্বস্ত হয়ে। সরদার বাড়ির গেটে প্রবেশ করতেই ডাকপিয়ন চিঠি দিলো। আইনী নোটিশ দেখে চিন্তিত হয়ে খাম ছিড়লেন। চিঠিটা চোখের সামনে ধরার পর মাথায় যেনো বাজ ভেঙে পড়লো। কষ্টে হৃদয়টা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। পিপাসা ডিভোর্স পেপারে সাইন করে পাঠিয়ে দিয়েছে। শামসুল খোলা আকাশটার দিকে চাইলো। নিস্তব্ধ চিত্তে দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে ভেতরে প্রবেশ করলো। সেদিন বাড়িতে ঢুকে আয়জাকে দেখতেই ক্ষিপ্ত বাঘের ন্যায় তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু তবুও কিছু করতে পারেননি। ‘সরদার বাড়িতে আয়জা সম্মানের সাথে নিরাপদ থাকবে’ — একথা ওয়াদা করেই শামসুলের বাবা নিয়ে এসেছিলেন আয়জাকে।

বাবার অনুরোধে বলতে পারেননি কিছুই। চুপচাপ পড়ে ছিলেন নিস্তব্ধ, বদ্ধ ঘরে। যতক্ষণ বাড়িতে থাকতেন ততক্ষণ ভেতর থেকে দরজা আটকে বসে থাকতেন ভেতরে। আর যখনই রাজনৈতিক কাজে বাইরে যেতেন, তখন তালাবদ্ধ করে যেতেন ঘর। ফলস্বরূপ, আয়জা ক্ষুনাক্ষরেও দখল করতে পারেনি স্বামীর ঘর। পড়ে থাকতেন সরদার বাড়ির দোতলার কোনার রুমটাতে। এ বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া, যত্ন-আত্মি কোনো কিছুতেই অভাব নেই তার। এমনকি গৃহিনীর মতো রান্নাঘরে গিয়েও টুকটাক রাধতেন। শুধু অপূর্ণতা ছিলো স্বামীতে। সাজানো একটা সংসারে জোর করে গিয়ে সংসারের কর্তৃ হলেও, হতে পারেননি স্ত্রী। লজ্জায় কাউকে কিছু বলতেও পারছিলেন না। প্রথম দিকে সবটা ধৈর্য্য দিয়ে মানলেও দু-তিন মাস পর থেকেই শুরু হলো ঝগড়া। একবার শামসুল সরদারের অনুপস্থিতিতে তালা ভেঙে ঢুকেছিলেন সে ঘরে। যা দেখা মাত্র’ই সম্বিত হারিয়ে ফেলেন শামসুল সরদার। তীব্র ক্ষোভে গায়ে হাত তোলেন আয়জার। জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে দেন ঘরের বাইরে। সাবধান করে বলে দেন,

– এ ঘর টা শুধুই আমার এবং তৃষ্ণার। এখানে পাও রাখবি না দ্বিতীয়বার।
অশ্রাব্য গালিগালাজ এবং মারের চোটে সে দিনই বাড়ি ছাড়ে আয়জা। চলে আসে বাপের বাড়িতে। কিন্তু কাউকেই বলেন নি এ বিষয়ে। সপ্তাহ খানেক থেকে আবারো রওনা দেন সরদার বাড়ি। এভাবেই চলতে থাকে জীবন। জোর করে অধিকার পেতে গিয়ে ঝগড়া, মারামারি। এরপর রাগ করে বাপের বাড়ি কিছুদিন থেকে পুণরায় শ্বশুর বাড়ি। এভাবে করতে করতে প্রায় বছর পেরোলো। ইদানীং শামসুল বাড়ির বাইরেই থাকেন। নিজ বাড়িতে গেলে মানসিক শান্তি হারিয়ে ফেলেন। ঝগড়া-ঝামেলা, মারামারি তারও ভালো লাগে না।
গত এক বছরে আরো দু-বার যশোরে গিয়েছিলো শামসুল। স্ত্রী নয়, শুধুমাত্র সন্তানদের খোঁজে। কিন্তু পায় নি। পত্রিকায় ছবি ছাপাতে চেয়েছিলো, এমনকি পুলিশের কাছে নিখোঁজ ডাইরি লেখাতে গিয়েও পিছিয়ে যায়। কি বলবেন তিনি? এটাই যে, ক্লাবঘরে অন্য মেয়ে নিয়ে জনগণের কাছে ধরা পড়ে বিয়ে করায়, স্ত্রী- সন্তানদের নিয়ে ঘর ছেড়েছে। এটাই?

ব্যক্তিগত শামসুলকে ভুলে গেলেন শামসুল সরদার। সবকিছু ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিয়ে ব্যস্ত হলেন রাজনীতিতে। সেবার এমপি নির্বাচনে আমজাদ শিকদারের কাছে চরমভাবে পরাজিত হলেন। বিস্তীর্ণ পার্থক্য ছিলো ফলাফলে। লজ্জায় ঘর ছেড়ে বের হন নি। অথচ পর দিন শোনা যায় বিস্ময়কর, ভঙ্গুর ঘটনা। সে রাতে নির্বাচনে জেতার পর শিকদারদের লোকেরা আনন্দ উৎসব করার নামে তার ক্লাবঘর, রাজনৈতিক অফিস সব কিছু ভেঙে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। এমনকি সরদারের দলীয় লোক যতজনকে পেয়েছে, সবাইকে রাস্তায় ফেলে পিটিয়েছে। কতটা অমানবিক আয়োজন! ক্ষমতাহীন শামসুল সরদার পুণরায় ভেঙে পড়লেন। কিন্তু বাঁধা মানে নি আয়জা শিকদার। সেবার ভাইদের বর্বরতায় হতবাক হয়ে ছুটে গিয়েছিলো শিকদার বাড়ি। যত যাইই হোক, শামসুল সরদার যে আয়জার স্বামী সে -কথা কি করে ভুললো তারা? এতোটা অপমান, অসম্মান কিভাবে করতে পারলো?

সেবার শিকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমেও পা রাখে নি আয়জা। ভাইদের সাথে ঝগড়া- কথা-কাটাকাটি, অভিমান করে, চিরদিনের ন্যায় সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে চলে আসলো সরদার বাড়িতে। পড়ে রইলো পুণরায় সেই কোনার রুমটাতে। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? যে স্বামীর জন্য ভাইদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করলো, সে স্বামী এখনো তার দিকে একবার ফিরলো না? কাছে টেনে নিলো না? এ নিয়ে ঘোর আপত্তি উদয় হলো। সে পুণরায় অধিকারের জন্য লড়তে শুরু করলো। মাঝখানে লেখাপড়ার জন্য কম ছাড় দেয় নি শামসুল সরদারকে। প্রায় দু বছরের জন্য স্নাতক শেষ করতে তো ঢাকাতেই ছিলো। ভেবেছিলো, এই দুরত্বে তার প্রতি স্বামীর টান বাড়বে। কিন্তু ফিরে দেখলো যা ছিলো – তাই’ই। এরপর আর মাস্টার্সের জন্য ফিরলো না ঢাকায়। স্বামীর নির্বাচন কালীন সেও কম দৌঁড়ায়নি। এমনকি ভাইদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করার পরেও শামসুল নমনীয় হয়নি তার প্রতি। এ কেমন আচরণ! পুণরায় বাধলো সেই ঝগড়া -ঝামেলা। এ বারে তো ক্ষোভে ফেটে পড়ে আলমারি থেকে পিপাসার সকল শাড়িগুলো টেনে বাইরে ফেলে দিলো। সে স্থানে রাখলো নিজের পোশাক।

শামসুল পুণরায় ক্ষিপ্ত হলো। সেদিন ঘর আটকে মনের খায়েশ মিটিয়ে পিটিয়েছে পঁচিশ বছর বয়সী আয়জাকে। রাগে – অভিমানে পুণর্বার ঘর ছাড়লো আয়জা। হয়তো শ্বশুর বেঁচে থাকলে স্বামীর এতোটা অত্যাচার সইতে হতো না। তখন ছিলো বর্ষাকাল! নিরবিচ্ছিন্ন মুষলধারে বৃষ্টিতে সরদার বাড়ির গেটের বাইরে, রাস্তার মোড়ে গিয়ে বসে রইলো। কোথায় যাবে সে? শিকদার বাড়ি! কিন্তু সেখানে তো সম্পর্ক ছিন্ন করে এসেছে। এখন যেচে গেলেও তাদের কি বলবে? এটাই যে, তার একটা সংসার এখনো হয় নি। শামসুল এখনো নির্যাতন করে তাকে! একটানা সাত ঘন্টা বৃষ্টিতে ভিজেছিলো। জেদ নিয়ে নয়, অসহায়ত্ব অনুভব করে। সেই সন্ধ্যায় বেরিয়ে এসেছে বাড়ি থেকে। এখন বাজে দুইটা।

অবশেষে দারোয়ানের থেকে খবর পেয়ে সেদিন শামসুল নিজে নিয়ে আসে আয়জাকে। এতোটা মারার পর সে নিজেও বড্ড অনুতপ্ত। ভাইদের সাথে তার জন্যই সম্পর্ক ছিন্ন করেছে। নাহলে যাওয়ার জায়গার অভাব ছিলো না আয়জার। এতোটা আদুরে, আহ্লাদে বড় হওয়া আয়জার কি ভাগ্যে এটাই ছিলো? স্বামীর বিমুখতা, অত্যাচার, বাপের বাড়ির সাথে সম্পর্কের বিচ্ছেদ, এরপর রাস্তায় রাস্তায় ঝড়বাদলের রাতে অসহায়ের মতো হাঁটা। কিন্তু এসব সে যেচে এনেছে, শুধুমাত্র নিজের জেদের কারনে।

সেবার আয়জার প্রতি শামসুলের মায়া হয়, টান অনুভব হয়, শারীরিক চাহিদার আকাঙ্ক্ষা জন্মে। এরপর? এরপর হয়তো ভাঙাচোরা একটা সংসারের সৃষ্টি হয়। কিন্তু তারপরেও অশান্তি কমে না। শামসুল নিজে আয়জার রুমে থাকতে চাইলেও, তার আর পিপাশার রুমে আনতে চায় না। অথচ আয়জার তুমুল জেদ, সে ওই ঘরের সমস্ত জিনিসপত্র সরিয়ে নিজে রাজত্ব করবে। এ সংসার তার, শুধুই তার। এতোসব অশান্তির মধ্যে জন্ম নেয় আর্শি। আয়জা সহ্য করতে পারে না বাচ্চার যন্ত্রণা! নির্ঘুম রাত, সন্তানের প্রতি সারাদিন খাটা, সংসারে অশান্তি, শামসুলের ক্লাবে রাত যাপন, নতুন ভাবে রাজনীতিতে শক্ত হয়ে পদার্পন, এতো ব্যস্ততা সবকিছু শ্বাসরুদ্ধ কর ছিলো তার জন্য। আর্শির বয়স তখন আট মাস। এরই মধ্যে হঠাৎ নতুন ঝামেলার সৃষ্টি হয়। প্রতি বছর সন্তানদের খোঁজে যশোর যেতো শামসুল। বাড়িতে বলার প্রয়োজন বোধ টুকুও করলো না। কিন্তু সেবার ক্লাবের কারোর থেকে জেনে ফেলে আয়জা। এ নিয়ে ঝামেলা হয় তাদের মধ্যে, বাঁধা দেয় নানাভাবে। কিন্তু শামসুল শুনলো না। সে চলেই গেলো। তারপর? তারপর আবার দুঃখরা হানা দিলো।

যশোর থেকে পরেরদিন বাড়িতে এসে স্তব্ধ হয়ে যায় শামসুল সরদার। আয়জা নিজ কক্ষে গলায় দড়ি দিয়েছে। মানসিক অশান্তি নিয়ে মানুষ বাঁচেই বা কতক্ষণ? কতক্ষণই বা সুখ ছিনিয়ে আনা যায়। স্ত্রীর জানাজায় ও অংশ নিতে পারেনি শামসুল। এরইমধ্যে এরেস্ট হয় পুলিশের হাতে। আবারো মামলা! আমজাদ শিকদার বোনের আত্মহত্যা মেনে নিতে পারেন না। এটা সম্পুর্ণ পরিকল্পিত খুন ছিলো বলেই কেস করে শামসুলের নামে। তবে খুব বেশি কায়দা করতে পারে নি সেবার। স্পষ্টত, সে রাতে শামসুল সরদার যশোরে ছিলেন। সেজন্যই খুব বেশি দৃঢ় হতে পারে নি কেস। তবুও তার স্ত্রী কেনো আত্মহত্যা করলো, কেনো তিনি মানসিক ভাবে অসুস্থ ছিলেন – এনিয়ে নানা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেই কেস আজও চলছে থানায়। টাকার পর টাকার খনি নিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে তা।
আয়জার মৃত্যুর পর তার খুনের মামলায় পড়ে শামসুল কঠোর হলেন। বুঝতে পারলেন ক্ষমতার চাহিদা। এরপর তৃতীয়বারের মতো কৌশলী, হিংস্র হয়ে নামলেন রাজনীতিতে। রাজনীতিতে কেউ ভালোবেসে মাথা নোওয়ায় না, নত করে ভীত হয়ে – অপরপক্ষের হিংস্রতা দেখে।

শামসুল দিন- রাত ব্যস্ত হয়ে পড়লেন রাজনীতিতে। এদিকে আর্শি বড় হতে লাগলো সোনালীর কাছে। আয়জার মৃত্যুর ঠিক আড়াই মাস পর আমজাদ শিকদার পুণরায় আইনী ভাবে লড়াই শুরু করলেন। বোনকে মেরেছে, ভাগনীকেও বাঁচতে দেবে না। তাই বোনের মেয়ে তার চাই। কিন্তু বাবা শামসুল সরদারের সামনে পেরে ওঠেন নি। আদালত সকল ঘটনা শুনে রায় দিলো – প্রাপ্তবয়স্কা আর্শির মতামতের উপরে ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। থেমে গেলেন শিকদার রা।৷
আর্শি বেড়ে উঠলো বাবার গম্ভীরতা, কঠোরতা, হিংস্রতা দেখতে দেখতে। ধীরে ধীরে বড় হতে হতে বুঝলো সোনামা তার মা নয়, বরং চাচী। যখন সে অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী, তখন থেকে হঠাৎ করে গম্ভীর হয়ে উঠলো। বাবা শামসুল সরদার যতটা রাজনৈতিক ভাবে হিংস্র, ঠিক ততটাই হিংস্র ছিলো তার মায়ের ক্ষেত্রে। অমানুষিক অত্যাচার, নির্যাতন করতে করতে মেরে ফেলেছে তাকে। আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেছে। ধীরে ধীরে বাবার প্রতি অপ্রকাশিত ঘৃণাগুলো প্রকাশ হতে লাগলো। তার কোনো সিদ্ধান্তের পূর্বে রিহান, রুহানদের সিদ্ধান্তকে যখন শামসুল অধিক গুরুত্ব দিয়েছে, তখন বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষের প্রতি ঘৃণা জন্মেছে। ধীরে ধীরে সকলের প্রতি ভেতরকার ক্ষোভের কারনে সে একা হয়ে পড়লো।-

মায়ের সেই নিস্তব্ধ, নিরেট কক্ষ টাকেই বেছে নিলো নিজের জন্য। ডুবে গেলো অলীক কল্পনাতে, যেখানে বাবা- মায়ের একটা সুখের সংসার হচ্ছে, তাকে সবাই ভালোবাসছে, সে চঞ্চল হয়ে ঘুরছে, দৌড়াচ্ছে, হাঁসছে। ধীরে ধীরে সে এতোটাই কল্পনায় ডুবে গেলো যে খাবার সময়েও মাঝেমধ্যে থম মেরে তাকিয়ে থাকে নিজের মতো ভাবনায়। এভাবে বড় হতে হতে হুট করে জানতে পারলো তার মামা রা তাকে নেওয়ার জন্য চেষ্টায় আছে। কিন্তু সম্পূর্ণ অপরিচিত, অজ্ঞাত মানুষদের কাছে বাবাকে রেখে যাবে কি করে? কিন্তু গেলো, অবশেষে এতোগুলো বছর কাটার পর সে চলে গেলো। না জানি, মাথার মধ্যে কি ঢুকিয়েছে ওই শিকদার রা।
স্পর্শীয়া ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। ভীষণ ঘুম ঘুম পাচ্ছে। খাটের পায়ায় মাথা হেলিয়ে নিস্তব্ধ ভাবে তাকিয়ে আছে বাবার দিকে। হুট করে অতীতের বর্ননা থেমে যাওয়ায় সে নড়েচড়ে বসলো। কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
– আপনার ছোটো মেয়ে, আই মিন আর্শিয়া — ও কি এখন শিকদার বাড়িতে?
মলিন মুখে উপরনিচ মাথা নাড়ালো শামসুল। স্পর্শী তৎক্ষনাৎ আপত্তি করলো। বললো,

– এতো বছরেও যায়নি। ইনফ্যাক্ট সেদিন হস্পিটালে বারংবার বলার পরেও তাদের ফিরিয়ে দিয়েছে। তাহলে এখন কেনো যাবে?
শামসুল সরদার নির্লিপ্ত হয়ে তাকালেন। তিনি আন্দাজ করতে পারছেন আর্শির যাওয়ার কারন৷ কিন্তু সে ব্যাপারে স্পর্শীকে জানালে সে কষ্ট পাবে। তাই না জানার ভান ধরে শান্ত গলায় বললেন,
– কি জানি? হয়তো মেয়েটার মধ্যে আমার নামে বিষাক্ত কিছু ঢেলেছে।
স্পর্শীয়ার ভেতরটা জ্বলে অঙ্গার হতে লাগলো। তবু বাইরে সে নিরব, নিস্তেজ। ঠান্ডা কন্ঠে শুধালো,
– আপনি জাননি আনতে?

– নাহ! আনতে যে কোনো সময় যাওয়া যায়। কিন্তু আর্শিয়া যদি ফিরতে অস্বীকার করে, তখন? শিকদার দের সামনে আমি এতোটা নিচু হতে পারবো না। ওর যদি বাবার কাছে ফিরতে ইচ্ছে হয়, তবেই ফিরুক।
দুহাতে মাথার চুল খামচে ধরে নিস্তেজ হয়ে হাটুর উপর ভর করলো স্পর্শী। এতো নিষ্ঠুরতা, এতো বিষাদ কি করে সয়েছে তার বাবা? সারাটা জীবন কতভাবে পুড়িয়েছে ওই শিকদার রা। জেল থেকে শুরু করে শারীরিক, মানসিক কতই না যন্ত্রণা দিয়েছে। ক্রোধে চোখ বেয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে স্পর্শীর। এ কদিনে বাবার হিংস্রতা দেখে কতই না ঘৃণা করেছে, অথচ এই মানুষ টাকে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর বাধ্য করেছে হিংস্র হতে। এমনকি রাস্তায় ফেলেও পিটিয়েছে। ঠিক তার ভাইয়ের মতো। সেদিন সোভামকে রাস্তায় ফেলে মারার পর যতটা আঘাত, যন্ত্রণা স্পর্শীর মধ্যে উৎপাত ঘটিয়েছিলো, তার দ্বিগুণ যন্ত্রণা এখন অনুভব করছে। ভেতরটা জ্বলছে। সেও জ্বালাবে। এর দ্বিগুণ বিষাদে পোড়াবে শিকদারদের। পোড়াতে পোড়াতে অঙ্গার করে দেবে। প্রতিটা ঘটনার মধ্যে অতীতের প্রতিচ্ছবি দেখবে আমজাদ শিকদার। রাজনৈতিক কূট কৌশলে সে হাজার পটু হোক। কিন্তু নারীর ছলনা- কৌশল যে কতটা ভয়াবহ হয়, তা টের পাইয়ে ছাড়বে। দীর্ঘ দুই যুগ পূর্বে যে আগুন আয়জা শিকদার জ্বালিয়েছিলো, তাকে দাবানলে পরিণত করবে স্পর্শী। শিকদার মঞ্জিলকে জ্বলন্ত চিতা বানিয়ে ছাড়বে। প্রতিটা ঘটনায়, প্রতিটা দৃশ্যে তারা নিজের বোনের করা ভুল গুলো চিনে অনুতপ্ত হতে বাধ্য হবে।

– কাকে পোড়াবে?
স্পর্শী রাগে থরথর করে কাঁপছে। ঠোঁট দুটো দিয়ে বিরবির স্বরে উচ্চারণ হচ্ছে “পোড়াবো”। সেটাই কানে গিয়েছে শামসুল সরদারের। তিনি চিন্তিত হয়ে মেয়ের কাছে জানতে চাইলো এ বিষয়ে। তৎক্ষনাৎ সম্বিত ফিরে পেলো স্পর্শী। নিজেকে সামলে শান্ত কন্ঠে বললো,
– কই, কিছু না তো।
শামসুল সরদার আর প্রত্যুত্তর করলেন না। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে ইতোমধ্যে। ভাগ্যিস বড় ছেলেটা নেই, স্পর্শী একাই ছিলো ঘরে। একপ্রকার জোর করে ঢুকেছিলেন ভেতরে। যুগ ধরে নিজের ভেতরকার অসহনীয় কাহিনি গুলো উগড়ে দিয়েছেন মেয়ের সামনে। আর যে সহ্য করা যাচ্ছিলো না। সকলে ঘৃণা করে তাকে। স্ত্রী, সন্তান সকলে। সবার অভিযোগের শেষ নেই। অথচ শামসুল সরদারের ভেতরে ছিলো ব্যাথার পাহাড়। কাকে জানাবেন, কাকেই বলবেন, সকলেই যে দুর দূর করে তাড়িয়ে দিতে ব্যস্ত। আদৌ কি তিনি এতোটা ঘৃণার যোগ্য?
স্পর্শীয়া উঠে বসলো। বাবা আসার পর অভিমানে একটু মুখ তুলেও কথা বলেনি। গায়ের ওড়নাটা ভালো ভাবে জড়িয়ে অসস্তি নিয়ে বললো,

– আমি একটু আপনার জন্য চা করে আনবো? অনেকক্ষণ তো এলেন।
শামসুল সরদার হাসলেন। বললেন,
– বাবার উপর দয়া হচ্ছে, এখন? এর আগে তো কখনো কথাও বলতে চাও নি।
স্পর্শীয়া সময় নিলো না। গম্ভীর হয়ে বললো,
– এর আগে কি এমন পরিস্থিতি ছিলো? আমার বাবা মাকে ঠকিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। আর আমরা এতোগুলো বছর ধরে বাবা হীন এতিমের মতো বড় হয়েছি। এসব জানার পরেও কথা বলার ইচ্ছে থাকে? তাও তো টুকটাক বলেছি।
শামসুল হাসলেন। বললেন,
– তাও ঠিক। টুকটাক যে কথাটুকু বলেছো, সেটাই তো আমার মহাভাগ্য। আজ তাহলে আসি, তোমার মায়ের আদরের ছেলে আসে রেগে যাবেন আমার উপর।
এই বলে দিনে চাদর টা গায়ে জড়ালেন। স্পর্শীয়া আহত হলো। জড়তা, অসস্তি, লজ্জা কাটিয়ে সময় নিয়ে আমতা-আমতা করে ডাকলো। প্রথমবারের মতো বললো,
– আব্বু, এখানে শুতে কষ্ট হয় আমার। ফ্লোরে ঘুমাতে হয়। সরদার বাড়িতে কি আমাকে একটা রুম দেওয়া যাবে?
শামসুল সরদারের কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠলো। নিজেকে সামলাতে পারলেন না। চোখের বাঁধ ভেঙেছে। নিজের শক্ত খোলসটাকে ভুলে মেয়েকে জড়িয়ে হু হু করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বললেন,
– এভাবে বোলো না আম্মু। বাবার কলিজা ছিড়ে যায়। স্ত্রী- সন্তান থাকার পরেও আজ কতগুলো বছর একা থাকতে হয় আমায়। শূণ্য ঘর গুলো খাঁ খাঁ করে তোমাদের অনুপস্থিতিতে। এখনই যাবে?
স্পর্শীয়া মাথা উপরনিচ দুলিয়ে সায় দিলো। পরক্ষণেই দ্রুত হাতে ব্যাগ গোছালো। শামসুল চিন্তিত হয়ে বললেন,

– তোমার ভাইকে বুঝিয়ে নিয়ে চলো। এভাবে রুমের মধ্যে রান্নাঘর, থাকতে তো কষ্ট হয়।
তৎক্ষনাৎ নাক গলালো স্পর্শী। রুক্ষস্বরে বললো,
– ওর নাকটা অনেক উঁচু। এতো সহজে যাবে না।
মেয়েকে নিয়ে প্রথমবারের ন্যায় বাড়ির দিকে অগ্রসর হলেন শামসুল। সুখ বুঝি আজ এতোদিন পর ধরা দিলো। এভাবেই বুঝি হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো ধীরে ধীরে আসবে তার কাছে। তার শূণ্য ঘর পূর্ণ হবে তাদের বুলিতে। স্পর্শীয়া গাড়িতে বসে ফোন হাতে নিলো। দু আঙুলে ছোট্ট করে ভাইয়ের উদ্দেশ্যে লিখলো,
– আমি বাড়িতে যাচ্ছি আব্বুর সাথে। তোর ইচ্ছে হলে আসিস, নাহলে বাসি ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়িস।
এরপর ফোন রেখে ড্রাইভ করতে থাকা বাবার দিকে চাইলো। খানিকটা অসস্তি নিয়ে পুণরায় ডেকে উঠলো,
– আব্বু?
শামসুল চমকে তাকালেন। অদ্ভুত এক প্রশান্তি তার সারা মুখ জুড়ে। বললেন,

– হ্যাঁ আম্মু, বলো।
কিছু একটা ভেবে চিবুক শক্ত করে ফেললো স্পর্শী। কঠোর চিত্তে গমগমে স্বরে বললো,
– আমি কাল সকালে শিকদার বাড়িতে যাবো। আর্শিয়াকে নিয়ে আসতে।
আপত্তি করলো শামসুল। সে নিশ্চিত স্পর্শীকে দেখলে রেগে যাবে আর্শি। অপমান ও করে ফেলতে পারে। শেষে ভাই-বোনদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি বাড়বে। আর দূরত্ব চায় না শামসুল। বললো,
– থাক না মা। এতোদিন পর গেছে। সপ্তাহখানে ঘুরে ও নিজেই ফিরে আসবে। তাছাড়া তুমি আনতে গেলে যদি ও না আসে?
স্পর্শী নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি অটল। বিস্তর ভাবনা-চিন্তা করে বিরাট পরিকল্পনা এঁটেছে সে। এগুলো নিমিষেই ভাসিয়ে দিতে পারে না। বললো,

– আমি বুঝতে পারছি আব্বু। ও যে আমাদের উপর ক্ষোভের বসেই বাড়ি ছেড়েছে, তা আড়াল করতে হবে না। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার! যে কেউ বুঝে ফেলবে। এতো আইন- আদালত করার পরেও গেলো না, হুট করে কাল চলে গেলো বাড়ি ছেড়ে, তাও সবার অনুপস্থিতিতে।
শামসুল মেয়ের দিকে আহত দৃষ্টিতে তাকালেন। কিছুটা সাফাই গেয়ে বলে উঠলেন,
– আর্শি অবুঝ, একটু জেদি। ওর মায়ের মতোই। তাছাড়া গম্ভীর, একগুঁয়ে স্বভাবের হয়ে গেছে মেয়েটা। এর দায় আমারই।
স্পর্শী হাসলো। বাবাকে নিশ্চিন্ত করে বললো,

– যতটা আমি ওকে চিনেছি, তাতে মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত মনে হয়েছে। আমার মনে হয়, ওকে সময় দেওয়া উচিত। আমরা তো নাহয় সুন্দর একটা পরিবেশ পেয়েছি। কিন্তু ও তো তাও পায়নি। এমনটা হওয়াটাই স্বাভাবিক নয় কি? সবচেয়ে বড় কথা — আমার বোনকে শিকদার বাড়িতে রাখতে একটুও ভরসা পাচ্ছি না আমি। তাই নিয়ে আসবো কাল। আপনি বাঁধা দিবেন না।
শামসুল সন্তুষ্ট হয়ে মেয়ের দিকে তাকালেন। তার মুখশ্রী আনন্দে চকচক করছে। ছেলে-মেয়েরা এক সাথে থাকবে তার কাছে এই তো চান। কিন্তু তবুও কোথায় যেনো আপত্তিকর কিছুর অস্তিত্ব পাচ্ছেন। নিমিষেই ধরে ফেললেন তা। আপত্তি জানিয়ে বললেন,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২০

– আম্মু, বাবাকে আপনি করে ডেকো না। মনে হচ্ছে, এখনো ক্ষোভ জমে আছে, আমায় ঘৃণা করছো।
স্পর্শী মাথা নত করে ফেললো। মৃদু হেসে বললো,
– অভ্যাস তো তাই। আর তাছাড়াও কেমন যেনো অসস্তি লাগছে আব্বু।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২২