এক দেখায় পর্ব ১৪
সুরভী আক্তার
পরদিন হলুদের আয়োজনে পুরো বাড়ি মেতে উঠেছে । কালকের সংগীতের ডেকরেশন পাল্টে আজ আবার নতুন করে হলুদের জন্য ডেকরেশন করা হয়েছে গার্ডেনে ।
সকাল সকাল হেনা বেগম আর হালিমা বেগমের বাপের বাড়ি থেকে অনেকেই এসেছেন । আরো বেশি পরিপূর্ণ হয়ে গেছে চৌধুরী বাড়ি । দুপুর দুপুর আত্মীয় স্বজনসহ বাড়ির সব পুরুষরা সবাই একসাথে বসে পড়েছে লাঞ্চ করতে । চৌধুরী বাড়ির বিশাল ডাইনিং টেবিলের সাথে আরো একটা টেবিল যোগ করা হয়েছে । যেখানে একসাথে ২০-২৫ মিলে অনায়াসে বসা যায় । হেনা বেগম, হালিমা বেগম, লতা বেগমসহ বাড়ির অন্যান্য সার্ভেন্টরা এতগুলো লোকের খাবার পরিবেশন করতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছেন । আফসানা বেগম পা সোজা করে সোফায় বসে আছেন ।
মেহজাবিন,জেনি, রুহি, মিহি, মিরা মেহজাবিনের দুই বান্ধবী তানিয়া আর ইভা বসেছে টেবিলের একদিকে । রুহির মেঝো মামার মেয়ে বর্ষাও আছে ওদের সাথে । ওর বয়স চৌদ্দ বছর । বেশ শান্ত-শিষ্ট নরম স্বভাবের মেয়ে বর্ষা । জেনি পেয়েছে ওর দশ বছরের মামাতো ভাই জিহাদকে । দুজনে আলাদা করে খেতে খেতে নিজেদের মাঝে কথা বলছে । লিনা চেয়ার খালি পায়নি বসার জন্য । সোফার এক কোনায় বসে খাচ্ছে ও । আফসানা বেগম ওর পাশে বসে গল্প জুড়ে দিয়েছেন ওর সাথে । রুহি খাওয়ার মাঝে বারবার আড়চোখে দেখছে লিনা আর আফসানা বেগমকে । বাড়ির বড়রা খেতে খেতে হলুদের প্রোগ্রাম নিয়ে টুকটাক আলোচনা করছে । রুহিরা সব মেয়েরা মিলে আলোচনা করছে আজকের হলুদের সাজগোজ সম্পর্কে । পার্লার থেকে লোক আসবে কিছুক্ষণ পর । আজকে সবাই শাড়ি পড়বে । তার সাথে কে কি করবে,কে কি পারফর্ম করবে এই নিয়ে লো ভয়েসে কথা হচ্ছে ওদের মাঝে । ওদের শাড়ি পরার কথা শুনে জেনি ভাতের প্লেটে হাত চালাতে চালাতে বলে…..
” আপি, তোমরা সবাই আজকে শাড়ি পরবে…?
রুহি জেনির দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে উত্তর করে….
” হুম ।
জেনি অবাক হয়ে ঠোঁট উল্টে বলে….
” তোমরা সবাই শাড়ি পড়বে,, তাহলে আমি কি পড়বো ?
মেহজাবিন ভ্রু কুঁচকে বলে…
” কেনো ? তোর জন্য যেই ড্রেসটা আনা হয়েছে ঐটা পড়বি…
” না..
তোমরা সবাই শাড়ি পড়বে, আর আমি একা একা ড্রেস পড়বো ? কিছুতেই না । আমিও শাড়ি পড়বো ।
জেনির কথায় জিহাদ পাশ থেকে খেতে খেতে বড়দের মতো করে বলে….
” আরে ছোট মেয়েদের শাড়ি পড়তে নেই । যাদের বিয়ে হয় , তারা শাড়ি পরে । তোমার যখন বিয়ে হবে তখন তুমিও শাড়ি পড়বে ।
জিহাদের কথায় রুহি বলে…
” এই পাকা ছেলে ,, তোমাকে কে বলেছে যে – যাদের বিয়ে হয়, তারাই শুধু শাড়ি পরে..? আমাদের তো কারোর বিয়ে হয়নি…
” আমি কি জানি ।
– খেতে খেতে অন্যমনস্ক হয়ে বলে জিহাদ…. রুহি বলে….
” তাহলে বললে কেনো..?
জেনি রুহিকে থামিয়ে বলে….
” আপি আমি কিন্তু শাড়ি পরবো ।
জেনির কথায় মিহি বলে…
” আরে জেনি বুড়ি … তুমি তো দেড় ফুটের একটা মেয়ে । তুমি শাড়ি পড়ে সামলাতে পারবে..?
” হুম খুব পারবো । আমাকে তো শিখতে হবে নাকি … কদিন পর তো আমারো বিয়ে হবে । তাই এখন থেকে আমিও শাড়ি পড়া শিখবো ।
জেনির পাকা পাকা কথায় একসাথে হেসে ওঠে সবাই । মেহজাবিন চোখ সরু করে বলে…..
” কি বললি ? বলবো চাচ্চুকে ? আমার বিয়ের সাথে সাথে না হয় তোর বিয়েটাও দিয়ে দেবে । আমার একটা সুন্দর দেবর আছে । বিয়ে করবি ওকে…?
” একদম না । আমি তো রাফি ভাইয়া আর শান্ত ভাইয়ার মতো একটা হ্যান্ডসাম ছেলেকে বিয়ে করবো ।
রুহি হাঁ করে তাকিয়ে বলে…
” আরে বাহ্,, খুব পাকনা হয়েছিস দেখছি । আর যেদিকেই হাত বাড়াস না কেন খবরদার আমার ওনার দিকে……
বলতে বলতে থেমে যায় রুহি । মিহি আর মেহজাবিন রুহির অর্ধেক কথা বুঝতে পেরে ঠোঁট চেপে হেসে ওঠে । মিহি রুহিকে ফিসফিস করে বলে…..
” কি পিরিত রে তোর । একটা আট বছরের বাচ্চাকে’ও হিংসা করছিস..? এই অবুঝ মেয়েটা তো শুধু শান্ত ভাইয়ার মতো একটা ছেলেকেই চেয়েছে ,, শান্ত ভাইয়াকে তো আর চায়নি ।
মিহির কথায় মাথা নিচু করে খাবারে মনযোগ দেয় রুহি । ওদের খাওয়া প্রায় শেষ । এমন সময় রাফি আর শান্ত ঢোকে বাড়ির ভেতর । ওদের পায়ের শব্দে খাবার টেবিল থেকেই সবাই তাকায় ওদের দিকে । রাফি আর শান্তর সাথে ওদের সমবয়সী আরো একটা ছেলে । সম্পর্কে রাফির মামাতো ভাই – ‘ ইভান’ । ওদেরকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে । এই ঠান্ডাতেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে কপালে । এতক্ষণ বাইরে ডেকোরেশনের দিকটা সামলেছে ওরা । এখন কাজ প্রায় কমপ্লিট । হেনা বেগম ওদের কাছে গিয়ে বলেন….
” যা বাবা … তোরা তাড়াতাড়ি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে । অনেক হয়েছে, আর তোদের কিচ্ছু করতে হবে না । সকাল থেকে তেমন কিছুই খাস নি তোরা । ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি নিচে আয় ।
হেনা বেগমের কথায় তিনজনে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায় । রাফিকে উপরে উঠতে দেখে মেহজাবিন তাড়াতাড়ি খেয়ে হাত ধুয়ে সবাইকে পাশ কাটিয়ে চলে আসে সেখান থেকে । এদিকে উপরে উঠে রাফি ঢুকে পড়েছে নিজের ওয়াশ রুমে শাওয়ার নিতে । একে একে সিরিয়াল নিয়েছে তিনজনে । শান্ত অপেক্ষা করছে,,রাফির শেষ হতেই ও ঢুকে পড়বে । ইভান অপেক্ষা না করে রুহির ঘর ফাঁকা পেয়ে এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে ঢুকে পড়েছে রুহির ওয়াশ রুমে ।
মেহজাবিন নিজের ঘরে গিয়ে একটু সময় নিয়ে রাফির ঘরে যায় । এতোক্ষণে রাফির শাওয়ার নেওয়া শেষ হয়েছে । দরজার কাছে গিয়ে পা আটকে যায় মেহজাবিনের । দরজা খোলাই আছে । মেহজাবিন বাইরে থেকে একটু উকি দিয়ে দেখে – রাফি আয়নার সামনে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে ভেজা চুল শুকোচ্ছে । ঠান্ডায় চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে রাফির । মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে আছে,, মুখে ক্লান্তির ছাপ । মেহজাবিন কিছু একটা ভেবে রাফির ঘরের সামনে থেকে চলে আসার জন্য পা বাড়াতেই রাফি নরম কন্ঠে ডাকে মেহজাবিনকে । মেহজাবিন পিছন ফিরে তাকাতেই রাফি বলে…..
” বাইরে থেকে চলে যাচ্ছিস যে…? ভেতরে আয় ।
মেহজাবিন মাথা নিচু করে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যায় ঘরের ভেতর । মেহজাবিনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাফি বলে…
” বস…
পাশের সোফায় বসে মেহজাবিন । রাফি হেয়ার ড্রায়ার রেখে চুলগুলো সেট করে এগিয়ে আসে মেহজাবিনের কাছে ।
হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে মেহজাবিনকে মাথা নিচু করে থাকতে দেখে রাফি ওর দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলে…..
” কি হয়েছে ? কিছু বলবি ..?
মেহজাবিন নিশ্চুপ । একটা কথাও বলে না । শুধু মাথা নিচু করে আরো গুটি শুটি হয়ে বসে । রাফি ধীরে ধীরে মেহজাবিনের পাশে বসে । মেহজাবিনের মাথায় আলতো হাত রেখে নরম-শীতল কন্ঠে বলে…..
” কাল চলে যাবি,, তাই মন খারাপ হচ্ছে ?
ভাইয়ার আদুরে কন্ঠে মেহজাবিন নিজেকে সামলাতে না পেরে ঠোঁট ভেঙ্গে কেঁদে দেয় । এতোক্ষণের জমানো চোখের পানি কোটর ফেটে বেরিয়ে আসে । মেহজাবিনকে কাঁদতে দেখে রাফি ওকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ব্যাস্ত স্বরে বলে….
” আরে পাগলী,, কাঁদছিস কেনো..? কষ্ট হচ্ছে ? এই দেখ – ভাইয়া আছে তো । কি হয়েছে ভাইয়াকে বল । তুই কি একেবারেই আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছিস নাকি..? তোর যখন ইচ্ছে তখন আসতে পারবি আমাদের কাছে । শুধু একবার মাহিম’কে বলবি ও তোকে সাথে সাথে নিয়ে আসবে । আর যখন ইচ্ছে হবে আমাকে ফোন করবি আমি তোকে চোখের পলকে গিয়ে নিয়ে আসবো ।
মেহজাবিনের কান্নার বেগ আরো বেড়ে যায় । মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে ওঠে ও । রাফি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ওর দিকে । তারপর মেহজাবিনের দু’গাল আগলে নিয়ে ওর চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলে…..
” তোদের কতবার বলেছি না – যে , তোরা কাঁদবি না । তোদের চোখের পানি আমার সহ্য হয় না । তোদের চোখের পানি আমার দুর্বলতা,, কেনো বুঝিস না তোরা ? আমার পুরো দুনিয়া একদিকে আর তোরা একদিকে । তোরা শুধু আমার বোন না , তোরা আমার আত্মার একটা অংশ । কাঁদিস না বোন ।
মেহজাবিন এবার আচমকা জড়িয়ে ধরে রাফি কে । ভাইয়ার বুকে মাথা রেখে গদগদ হয়ে বলে…
” I love you ভাইয়া । আমি তোমাকে অনেক মিস করবো..
রাফি আলতো হেসে মেহজাবিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে…
” ভাইয়াও তোকে অনেক বেশি ভালোবাসে । আর সবসময় তোকে মিস করবে । যখন ভাইয়াকে মনে পড়বে শুধু একবার বলবি,, ভাইয়া তোর কাছে ছুটে চলে আসবে ।
মেহজাবিন রাফিকে ছেড়ে দিয়ে চোখের কোনে জমে থাকা শুকনো পানি মুছে নেয় । তারপর রাফির চোখের দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করতে করতে বলে…..
” ভাইয়া — তোমার কাছে একটা জিনিস চাইবো,, দেবে ? ধরে নাও তোমার কাছে এটাই আমার শেষ আবদার । রাখবে..?
” আমি কখনো তোদের কোন চাওয়া অপূর্ণ রেখেছি..? যে আজকে রাখবো..! আর এটাই তোর শেষ আবদার কেনো হবে..? ভাইয়ার কাছে বোনের আবদার কখনো শেষ হয় বুঝি ? বল কি চাই তোর ?
মেহজাবিন চোখ নামিয়ে নেয় । কথা গুলো সাজিয়ে নিচ্ছে মনে মনে । রাফি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে মেহজাবিনের শুকনো মুখের দিকে । রাফি জানে মেহজাবিন কি চাইতে পারে । তবুও সে মুখে কিছু না বলে মেহজাবিনকে সুযোগ দেয় বলার জন্য । মেহজাবিনকে কিছু বলতে না দেখে রাফি আবারো বলে….
” কি রে ,,বল কি চাই তোর ?
” ভাইয়া….
” হুম….
” আজকে আমার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে মা’কে একবার নিয়ে আসতে পারবে ? শুধু একবার ,, প্লিজ ভাইয়া । আমি চাই আমার গায়ে সবার আগে মা হলুদ লাগাক । মাকে শুধু কয়েক মুহূর্তের জন্য হলেও নিয়ে আসতে পারবে ভাইয়া..?
বলতে বলতে মেহজাবিনের চোখ আবারো টলমল করে ওঠে । রাফি তপ্ত শ্বাস ফেলে বলে…
” জীবনে কখনো তোর কোন চাওয়া অপূর্ণ রাখিনি । এটাও রাখবো না । আজকে সন্ধ্যায় সবার আগে তোর গায়ে মামনি’ই হলুদ লাগাবে । দেখে নিস । এখন চোখের পানি মুছে ফেল দেখি । আর কাঁদবি না ।
মেহজাবিন খুশিতে গদগদ হয়ে বলে….
” সত্যি বলছো ভাইয়া ..?
” ১০০ % সত্যি । এবার খুশি ..?
” অনেক অনেক খুশি । Thank you ভাইয়া ।
” হয়েছে,, এবার যা । রেডি হতে হবে তো নাকি ?
” আচ্ছা ভাইয়া ।
মেহজাবিনের মুখে প্রফুল্ল হাসি দেখে রাফির মুখেও হাসি ফুটে ওঠে । মেহজাবিন উঠে চলে যায় নিজের ঘরে । এদিকে মেহজাবিন ঘরে থেকে বের হতেই শান্ত বেরিয়ে আসে ওয়াশ রুম থেকে । ঘরের ভিতর চোখ বুলিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে রাফি কে জিজ্ঞেস করে….
” কি রে,, এতক্ষণ কার সাথে কথা বলছিলি ?
রাফি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দেয়…
” মেহজাবিনের সাথে ।
তারপর একটু থেমে বলে…
” আর শোন আজকে একটা অনেক বড় দায়িত্ব আছে আমাদের ওপর । মনে রাখিস…..
এদিকে রুহির ঘরে ঢুকে অচেনা অজানা একটা ছেলেকে দেখে জোরে চিৎকার করে ওঠে মিহি । মিহির সাথে সাথে চিৎকার করে ওঠে ইভান’ও । কেবল শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছিলো ইভান । পড়নে একটা সাদা টাওয়েল ছাড়া আর কিছু নেই । পুরো শরীর ভেজা,, ভেজা চুল গুলো কপালে লেপ্টে আছে ।
মিহির চিৎকার শুনে দৌড়ে ঘরে ঢোকে রুহি আর মিরা । ততক্ষণে মিহি উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে । ইভান’ও নিজের হাতে থাকা টিশার্ট দিয়ে নিজের শরীর ঢেকে নিয়েছে । ঘরে ঢুকেই প্রথমে রুহির নজর যায় মিহির দিকে । উল্টো দিকে ঘুরে চোখ খিচে বন্ধ করে নিয়েছে মিহি । রুহি মিহির কাছে গিয়ে ওর বাহু ঝাঁকিয়ে বলে…
” কি হলো Pakhi ..? চিৎকার করলি কেনো ..? ঠিক আছিস তুই ? কি হয়েছে…?
বলতে বলতেই রুহির নজর যায় ইভানের দিকে । মিরা শুরু থেকেই হাঁ করে তাকিয়ে আছে ইভানের দিকে । রুহি অবাক হয়ে চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে ইভানকে জিজ্ঞেস করে…
” আরে ভাইয়া,, তুমি এখানে ? তাও আবার এই অবস্থায় ?
ইভান নিজেকে সামলে নিয়ে বলে….
” ঐ…ও…ওয়াশ রুম ফাঁকা ছিল না । তাই তোর ঘর ফাঁকা পেয়ে তোর ওয়াশ রুম ইউজ করতে এসেছিলাম । আর বাকিটা ইতিহাস । এখন আমি যাই…..
বলেই দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ইভান । বাইরে বেরিয়ে একবার থেমে তাকায় মিহির দিকে । মিহি এখনো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে । কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দ্রুত পায়ে ছুট লাগায় রাফির ঘরের দিকে । এদিকে ইভান বের হতেই মিরা বলে….
” আরে ইয়ার… কে রে ওটা । কি হ্যান্ডসাম দেখেছিস ? কি বাইসেপ ইয়ার । আই এম তো ফিদা । নিশ্চয়ই জিম করে ।
রুহি বলে….
” আরে ওটা আমার মামাতো ভাই, ইভান । আজ সকালেই এসেছে । তোরা দেখিস নি হয়তো ।
তারপর মিহির দিকে তাকিয়ে বলে….
” কিন্তু তুই চিৎকার করলি কেনো Pakhi ..?
মিহি খাটের একপাশে বসতে বসতে বলে…
” না..না মানে , হঠাৎ অচেনা অজানা একটা ছেলেকে দেখেছিলাম তো ,,তাই ভয় পেয়ে গেছিলাম আর কি । । ভয় পেয়ে কখন চিৎকার করে ফেলেছি বুঝতেই পারিনি ।
এদিকে রাফির ঘরে ঢুকেই ধাম করে দরজা লাগিয়ে দেয় ইভান । বুকের উপর হাত রেখে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে । ইভানকে হাঁপাতে দেখে রাফি জিজ্ঞেস করে…
” কি রে,,তোর এই অবস্থা কি করে হলো ? শাওয়ার নিতে গেছিলি নাকি যুদ্ধ করতে..?
” সেটা পরে বলছি — আগে বল তোদের বাড়িতে যে একটা ডাগর চোখা পরী এসেছে, আগে বলিসনি তো । কি চোখ মাইরি । আর একটু হলেই তো ওর সামনে আমার ইজ্জতের দফারফা হয়ে যেত ।
রাফি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে….
” কি সব বলছিস ? এই পরীটা আবার কে..?
” আমি কি জানি । আমি তো চিনি না । আজকেই প্রথম দেখলাম । রুহির ঘরে ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়েই ওর সামনে পড়েছি । ভেবে দেখ আর একটু হলেই ওর সামনে আমার ইজ্জতের ফালুদা হয়ে যেত । রুহি ওকে Pakhi না কি যেন বলে ডাকছিল । ওর নাম কি Pakhi নাকি ? বেশ সুন্দর নাম কিন্তু । আচ্ছা কে ঐ মেয়েটা ? চিনিস তোরা ?
রাফির বুঝতে বাকি রইলো না ডাগর চোখা পরী টা কে হতে পারে । অমনি রাফির চোয়াল শক্ত হয়ে যায় । শান্ত বুঝতে পেরে রাফির দিকে তাকিয়ে একটা জোরে শ্বাস ফেলে । তারপর ইভানের দিকে তাকিয়ে বলে…
” হুম খুব ভালো করেই চিনি । ওটা আমার জানের Pakhi… মানে আমার জানের বেস্ট ফ্রেন্ড । তবে ওদিকে ভুলেও হাত বাড়াস না,, ঐ Pakhi অন্যের খাঁচায় অলরেডি বন্দি হয়ে আছে । কোন লাভ নেই…..
শান্তর কথা শেষ হতেই রাফি গম্ভীর স্বরে ইভানের দিকে তাকিয়ে বলে…
” কি হয়েছিল ঐ ঘরে…?
ইভান প্যান্ট পড়তে পড়তে বলে….
” আর বলিস না — আমি ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে দেখি আমার সামনে একটা মেয়ে দাড়িয়ে আছে । আমাকে দেখেই মেয়েটা মানে ঐ Pakhi জোরে চিৎকার করে উঠল, তার সাথে আমিও চিৎকার করে উঠলাম । ভাগ্যিস মেয়েটা এক পলকেই চোখ সরিয়ে নিয়েছে, নয়তো আমি আর কাউকে মুখ দেখাতে পারতাম না ।
নাটকীয় ভঙ্গিতে কথা গুলো বলে ইভান । ইভানের কথা শুনে রাফি বলে….
” কি অবস্থায় দেখেছে ও তোকে…?
” বেশি কিছু না ,, শুধু শার্ট’লেস অবস্থায় ।
ইভানের কথা শেষ হতেই দপাদপ পা ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে রাফি । রুহির ঘরে গিয়ে দেখে ঘরে কেউ নেই । মেহজাবিনের রুম থেকে একাধিক কন্ঠ ভেসে আসছে । রাফি রুহির ঘর পাশ কাটিয়ে মেহজাবিনের ঘরের সামনে আসতেই দেখতে পায় সবাইকে ।
পার্লারের লোক এসেছে । মেহজাবিনের ঘরে ভীর জমেছে সবার । মিরা, রুহি,মিহি, বর্ষা, জেনি, তানিয়া, ইভা – সবাই মিলে নিজেদের শাড়ি নিয়ে ব্যস্ত । সবার মধ্য থেকে রাফির চোখ খুঁজে নেয় মিহিকে । মিহিকে একবার দেখে সোজা নিচে চলে যায় রাফি ।
চৌধুরী বাড়ির প্রতিটা কোণা সেজে উঠেছে । গাঁদা ফুলে সজ্জিত পুরো বাড়ি । বাড়ির ভেতরেও প্রতিটা ধাপে ধাপে সাজানো হয়েছে । প্রতিটা কোণায় বড় বড় ফুলদানি । যেখান থেকে টাটকা কাঁচা ফুলের সুবাস ছড়াচ্ছে চারদিকে ।
বাড়ির প্রতিটা দেয়াল জুড়ে ফুলের মালা । বিভিন্ন রংয়ের ফেইরি লাইট ছাদ থেকে নেমে এসে পুরো বাড়িকে মুড়িয়ে নিয়েছে নতুন আলোয় । রঙিন ল্যাম্পশেডে আলোকিত চারপাশ । লাইটের পাশাপাশি সাদা আর গোলাপী রঙের পাতলা রেশমের লতানো কাপড় ছাদ বেয়ে নিচে নেমে এসেছে । হাওয়ার তালে তালে দোল খাচ্ছে সেগুলো । পুরো গার্ডেনে মাথার উপর লাইন দিয়ে ঝাড়বাতির মতো টানানো হয়েছে শত শত লন্ঠন । যা নজর কাড়ছে আরো বেশি । বাচ্চা থেকে শুরু করে মহিলা-পুরুষ , ছেলে-মেয়ে, সবার পড়নে আজ একই রঙের পোশাক । মেয়েদের পড়নে রানি পিংক কালারের শাড়ি , আর ছেলেদের পড়নে একই কালারের পাঞ্জাবি , তার সাথে গলায় পেঁচানো সরু সালের মতো ওরনা । মেয়েরা সবাই সেজেছে ফুল দিয়ে । চারদিকে উৎসব মুখর পরিবেশ । এখনো কনে নিচে আসে নি । যে যার মতো নিজেদের ছবি তুলতে ব্যস্ত সবাই । এমন সময় হালকা ধ্বনিতে “Cutiepie – Cutiepie — Ae Dil hai Mushlil” গানের ব্যাকগ্রাউন্ড সাউন্ড বেজে ওঠে । আলো গুলো একটু কমে আসে । সকল আলো নিভিয়ে দিয়ে একটা হলুদ আলো পড়ে মেহজাবিনের উপর । আশেপাশের সবাই আলো লক্ষ্য করে ঘুরে তাকায় মেহজাবিনের দিকে । লাল গালিচার উপর দিয়ে নরম গতিতে হেঁটে আসছে মেহজাবিন । প্রতিটা পায়ের ধাপে ধাপে ফুলের বৃষ্টি হচ্ছে ওর উপর । ইভা, তানিয়া, লিনা আর বর্ষা মিলে মেহজাবিনের মাথার উপর একটা রজনীগন্ধার চাদর ধরে ওর পায়ে পা মিলিয়ে এগিয়ে আসছে । মেহজাবিনের পড়নে হলুদ আর সবুজ রঙের মিশ্রণে ঝলমলে লেহেঙ্গা । মেহজাবিনের ঠোঁটে লাজুক হাসি , চোখে নরম আবেশের ছায়া । কাঁচা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে ওকে । যা সবার থেকে আলাদা । দুর থেকে সবার নজর কাড়ার মতো সুন্দর লাগছে ওকে । সবার মাঝে হইহুল্লোড় বেড়ে যায় । মেহজাবিনের এন্ট্রিতে একসাথে সবাই হাতে তালি দিয়ে চিৎকার করে ওঠে ।
মেহজাবিনকে বসানো হয় সোফার মাঝখানে । মেহজাবিনকে ঘিরে সবাই কথা বলছে ওর সাথে । কথা বলার মাঝেই মেহজাবিনের চোখ এদিক ওদিক খুঁজছে কাউকে । তবে কাঙ্ক্ষিত লোকের ছায়াও নেই আসেপাশে ।
মিহি আর রুহিরও পাত্তা নেই । কারোর নজরে পড়ে নি এখনো দু’জনে ।
মেহজাবিনকে হলুদ লাগানোর পর্ব শুরু হবে এখন । মেহজাবিনের চঞ্চল নয়ন বারবার এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজছে । অবশেষে কাঙ্ক্ষিত ব্যাক্তিকে খুঁজে পায় সে । দুর থেকে ওর দিকেই এগিয়ে আসছে রাফি । রাফি কে দেখে অচিরেই হাসি ফুটে ওঠে মেহজাবিনের মুখে । তবে রাফির কপালে ভাঁজ দেখে মুহুর্তেই মিলিয়ে যায় ওর মুখের হাসি । রাফির পাশে, পিছনে ভালো করে লক্ষ্য করে – কিন্তু কেউ নেই ।
রাফি স্টেজের কাছে মেহজাবিনের সামনে এসে দাঁড়ায় । রাফি কে দেখে ওর কাছে যান রাশেদ রায়হান চৌধুরী । রাফির ঘাড়ে হাত রেখে চোখের ইশারায় কিছু বোঝান । রাফি ও চোখের ইশারায় কিছু একটা বোঝায় রাশেদ রায়হান চৌধুরীকে ।
তারপর স্টেজে উঠে মেহজাবিনের পাশে গিয়ে বসে রাফি । মেহজাবিন ছলছল করে তাকিয়ে আছে ওর দিকে । রাফি মেহজাবিনের হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে…
” কি হয়েছে ? মুখের হাসি কোথায় ? মুখটা এমন গোমড়া করে রেখেছিস কেন ?
” ভা.. ভাইয়া…মা …..
মেহজাবিনের গলায় কথা আটকে আসছে । দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুনি কান্না করে দেবে । রাফি সামনের দিকে স্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ইশারায় বলে….
” ঐ দেখ … কে আসছে …!
রাফির দৃষ্টি অনুসরণ করে মেহজাবিন তাকায় সেদিকে । একে একে সবাই তাকায় একই দিকে । মেহজাবিনের সামনে এগিয়ে আসছে ওর মা – রাবেয়া চৌধুরী । নতুন শাড়ি, পরিপাটি সাজে এগিয়ে আসছেন তিনি । তার এক হাত ধরে রেখেছে মিহি আর অন্য হাত রুহি । মেহজাবিন হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে নিজের মায়ের দিকে । প্রায় ১৫ বছর পর রাবেয়া চৌধুরী নিজের ঘর থেকে বের হলেন । এতো এতো লাইটের আলো চোখে বিঁধছে তার । এক মুহুর্তের জন্য থেমে যান রাবেয়া চৌধুরী । মাথা চেপে চোখ খিচে বন্ধ করে নেন তিনি । মেহজাবিন উঠতে চাইলে ওকে বাঁধা দেয় রাফি । নিজে এগিয়ে গিয়ে সযত্নে রাবেয়া চৌধুরীর হাত ধরে নিয়ে আসে মেহজাবিনের কাছে । মেহজাবিনের পাশে সোফায় বসায় রাবেয়া চৌধুরীকে । রাবেয়া চৌধুরী এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছেন সবাইকে । মা’কে দেখে নিজেকে আটকে রাখতে পারে না মেহজাবিন । হুড়মুড়িয়ে জড়িয়ে ধরে মাকে । বাঁধ ভাঙা কান্নারা বেরিয়ে আসে চোখ থেকে । রাবেয়া চৌধুরী হতভম্ব হয়ে যান মেহজাবিনের কান্ডে । তিনি মেহজাবিনের মাথায় হাত রেখে বলেন….
” এই মেয়ে, কাঁদছিস কেনো ? তোকে কেউ কিছু বলেছে ? বকেছে তোকে ? বল কে বকেছে তোকে ?
মেহজাবিন আরো বেশি ডুকরে কেঁদে ওঠে । আশেপাশের সবার চোখে পানি । হেনা বেগম শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদছেন । রাশেদ রায়হান চৌধুরীর চোখের কোনে জল চিকচিক করছে । জুবায়ের চৌধুরী ভাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে হাত রেখে শান্তনা দেয় ভাইকে ।
কিছু সময় পর মাকে ছেড়ে দেয় মেহজাবিন । রাফি রাবেয়া চৌধুরীর পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে মেহজাবিনকে ইশারা করে বলে…
” মামনি,,বলো তো এটা কে…?
রাবেয়া চৌধুরী শিশু সুলভ নজরে একবার তাকায় মেহজাবিনের দিকে । তারপর রাফির দিকে তাকিয়ে বলে….
” কে ওটা..?
মেহজাবিন ঠোঁট উল্টে কেঁদে দেয় । রাবেয়া চৌধুরী আবারো বলেন…
” ও কাঁদছে কেনো…?
” ও কাঁদছে,,কারন ওর মা ওকে ভুলে গেছে । তুমি একটু আদর করে দাওতো ওকে ।
রাবেয়া চৌধুরী বলেন….
” মা কখনো সন্তানকে ভুলতে পারে ? আমার মিফতাহুল কে কি আমি কখনো ভুলে যাই ?
এবার মেহজাবিনের দিকে ঘুরে বলেন…
” এই মেয়ে কাঁদিস না । আমিও তো তোর মা । আয় আমার কাছে আয় ।
মেহজাবিনকে জড়িয়ে ধরে মিহির দিকে তাকায় রাবেয়া চৌধুরী । দুরে দাঁড়িয়ে আছে মিহি । তিনি মেহজাবিনকে জড়িয়েই মিহিকে ডাকেন…
” তুই ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন ? আয় আমার কাছে । এই দেখ আমার আরো একটা মেয়ে আছে । তুই তো বলেছিলি না,যে তুই আমাকে আমার মেয়ের কাছে নিয়ে যাবি । কোথায় আমার মেয়ে ?
সবাই তাকায় মিহির দিকে । এতক্ষনে রাফিও তাকায় মিহির দিকে । অমনি চোখ আটকে যায় ওর । এতক্ষণ এসব কিছুতে মিহিকে ঠিক মতো লক্ষ্য করে নি রাফি । এই প্রথম শাড়িতে মিহিকে দেখলো সে । তাও আবার নতুন সাজে । মিহির মাথায় আর কানে রজনীগন্ধা আর গোলাপের মিশ্রনের টিকলি আর দুল । দুহাতে ফুলের গাজরা । মুখে হালকা সাজ । ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক । চুলগুলো খুলে রাখা । সব মিলিয়ে অসাধারণ লাগছে মিহিকে । মিহির উজ্জ্বল শ্যামলা গায়ের রংয়ে রানি পিংক কালারের শাড়ি বেশ মানিয়েছে । মিহিকে এমন অবস্থায় দেখে পিছন দিকে ধপ করে বসে পড়ে রাফি । হৃৎপিণ্ড, শ্বাস প্রশ্বাস সবকিছু থমকে যায় । চোখ পলকহীন স্থির হয়ে আটকে রয় মিহির পানে । সবার এতগুলো দৃষ্টিতে অসস্থিতে মাথা নিচু করে রেখেছে মিহি । রুহি মিহিকে কনুই দিয়ে খুঁচিয়ে বলে….
” কি হলো..? মামনি ডাকছে তো,,যা ।
” না মানে… তুই ও চলনা ….!
” আমার অবস্থা দেখ ,, আমি ঠিক মতো হাঁটতেই পারছি না । এভাবে শাড়ি পড়ে কি আর হাঁটা যায়..? এখান থেকে স্টেজ পর্যন্ত যেতেই আমার আধা ঘন্টা লেগে যাবে । তুই যা । আমি ধীরে ধীরে আসছি ।
মিহি এগিয়ে যায় সামনে । রাফি টেনে হিচড়ে চোখ সরায় মিহির থেকে । শুকনো ঢোক গিলে সামলে নেয় নিজেকে । চোখ বন্ধ করে শ্বাস টানে । মেহজাবিন রাফিকে উদ্দেশ্য করে বলে….
” Thank you ভাইয়া,, আমার কথা রাখার জন্য ।
রাফি হাসার চেষ্টা করে একটু । মিহিকে ইশারা করে বলে….
” Thank you টা আমার প্রাপ্য নয় । ওনার প্রাপ্য । আমি মামনি কে এখানে নিয়ে আসিনি ,, উনি নিয়ে এসেছেন । তাই আমাকে ধন্যবাদ না দিয়ে ওনাকেই দে ।
মেহজাবিন মিহির দিকে তাকিয়ে আলতো হেসে কিছু বলতে যাবে, তার আগে মিহি বলে…
” আমাকে ওসব Thank you দিতে হবে না আপু । তুমি তো বলো, আমি তোমার বোনের মতো । তাহলে কি তোমার বোন তোমার জন্য এইটুকু করতে পারে না ?
রাফি অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মিহির দিকে । মেহজাবিন একবার রাফিকে দেখে মিহিকে বলে…
” আজ কিন্তু তোমাকে অনেক বেশি সুন্দর লাগছে মিহি । দেখো কেউ যেন আবার প্রেমে-টেমে পড়ে না যায় ।
মিহি লাজুক হাসে মেহজাবিনের কথায় । রাফি একই ভাবে বসেই তাকিয়ে দেখে মিহির হাসি । ওর চোখে অদ্ভুত মাদকতা । চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়েছে নিজের কাছে । মিহি আড়চোখে দেখে রাফিকে । রাফির ফর্সা বডিতে রানি পিংক কালারের পাঞ্জাবিটা টকটকে হয়ে ফুটে উঠেছে ।
এদিকে জীবনে প্রথম বার শাড়ি পড়েছে রুহি । শাড়ি সামলে এক পা এক পা করে কোন রকম কচ্ছপের মত হাঁটছে ও ।
স্টেজের সামনে এসে থেমে যায় রুহি । মাটি থেকে স্টেজটা একটু উঁচু । পা বাড়াতে অসুবিধা হচ্ছে রুহির । একহাতে শাড়ির কুচি ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে । রাফি রুহিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওর কাছে এগিয়ে যায় । রুহির অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে বলে…
” শাড়ি সামলাতে পারিস না তো পড়েছিস কেনো ? এখন তো হাঁটতেই পারছিস না ।
রুহি ঠোঁট উল্টে পিটপিট করে তাকিয়ে আছে । রাফি মুগ্ধ চোখে রুহির দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আবারো বলে…
” যাই হোক , অনেক সুন্দর লাগছে তোকে । প্রথম বার শাড়ি পড়েছিস তো তাই অসুবিধা হচ্ছে । আয় দেখি,, আমার হাত ধরে উপরে উঠে আয় ।
বলতে বলতে রুহির দিকে নিজের হাত বাড়িয়ে দেয় রাফি । রুহি এক হাত দিয়ে শাড়ির কুচি ধরে আছে । অন্য হাত বাড়িয়ে দেয় রাফির হাত ধরার জন্য । তবে রাফির হাত ধরার আগেই রুহির বাড়ানো হাত খপ করে ধরে ফেলে শান্ত । আচমকা ভড়কে যায় রুহি । শান্ত এক লাফে উঠে দাঁড়ায় রাফির পাশে । মেকি স্বরে বলে…
” বোনটা তোর হলেও হবু বউটা আমার । Soo , সাইড প্লিজ ।
অতঃপর রুহির দিকে তাকিয়ে একটু হেলে অভ্যর্থনা জানানোর মতো করে বলে…
” এসো জান । আমার হাত ধরে উপরে উঠে এসো । দেখো আবার, হাতে ব্যথা পেয়ো না যেন । হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে ? কোলে তুলে নিয়ে আসবো ?
রুহি কটমট করে তাকায় শান্তর দিকে । শান্ত ঠোঁট কামড়ে হাসছে । রুহিকে রাগাতে বেশ মজা পায় শান্ত । রাফি চোখ সরু করে তাকায় শান্তর দিকে । এমন সময় পাশ থেকে আফসানা বেগমের নিরেক কন্ঠ ভেসে আসে…
” দুই ভাই মিলে এখানে কি করছিস তোরা ? দেখতে পারছিস না, মেয়েটা শাড়ি পরে হাঁটতে পারছে না । তোদের ভাই-বোনদের ব্যপার-স্যপার আমি বুঝি না বাপু । এই শান্ত,, তুই বোনকে একটু সাহায্য করতে পারছিস না ? দেখছিস তো শাড়ি সামলে হাঁটতে পারছে না ।
বলেই সেখান থেকে মেহজাবিনের কাছে চলে যান আফসানা বেগম । মা চলে যেতেই শান্ত ফোস করে একটা শ্বাস ফেলে ।
” ভাগ্য করে একটা মা পাইছি ,, যে কথায় কথায় আমার হবু বউকে আমার বোন বানিয়ে দেয় । মানলাম ও আমার মামার মেয়ে । তাই বলে কি ও আমার বোন নাকি ? আমার বউকে বোন বানিয়ে দেওয়ার জন্য আমার মা সেরা রে…..
রাবেয়া চৌধুরী সবার আগে হলুদ লাগিয়েছে মেহজাবিনের গায়ে । এরপর সবাই একে একে হলুদ মাখাচ্ছে মেহজাবিনকে । সবার মাঝেই রাফি মেহজাবিনের পাশে বসে । মেহজাবিনের মুখে লাজুক হাসি । রাফি দু’আঙ্গুলে এক চিমটি হলুদ নিয়ে ছুঁইয়ে দেয় মেহজাবিনের গালে । হলুদ মাখিয়ে উঠতে গেলে মেহজাবিন হাত ধরে আটকে দেয় রাফিকে । এক গাল হেসে বলে..
” ভাইয়া , একটু বসো…?
রাফি বসে মেহজাবিনের পাশে । এবার মেহজাবিন মিহির দিকে তাকায় । একটু পর মিহি, রুহি , লিনা , তানিয়া, ইভা, মিলে একটা গানে পারফর্ম করবে । এই নিয়ে কথা হচ্ছিলো ওদের মাঝে । ওদের সবার মাঝ থেকেই মেহজাবিন ডাকে মিহিকে । মিহি মেহজাবিনের কাছে যেতেই মেহজাবিন ওর পাশে ইশারা করে বলে…
” এখানে বসো তো ..?
মেহজাবিনের অন্য পাশে বসে আছে রাফি । মিহি তাকায় রাফির দিকে । রাফি আগে থেকেই তাকিয়ে ছিল । মিহি আড়ষ্টতায় জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে দাঁড়িয়ে রইল । মেহজাবিন আবারো বলে…
” কি হলো বসো.. । আমাকে হলুদ লাগাবে না ?
মিহি মুচকি হেসে বসে ওর পাশে । একটু হলুদ নিয়ে ছুঁইয়ে দেয় মেহজাবিনের নাকে । মেহজাবিন হেসে ক্যামেরা ম্যানকে বলে…
” Excuse me … আমাদের তিনজনের কয়েকটা ছবি তুলে দিন তো । আর হ্যাঁ, সুন্দর করে তুলবেন কিন্তু ।
মেহজাবিনের কথার মানে বুঝতে পেরে রাফি চোখ নামিয়ে ঠোঁট কামড়ে একটু হাসে । ক্যামেরা ম্যান ফটাফট কয়েকটা ছবি তুলে নেয় ওদের । ওদের ছবি তুলতে দেখে শান্ত রুহির হাত টেনে নিয়ে আসে ওদের কাছে । হাত জড়ো করে বলে….
” দয়া করে আমাদের মতো দুই অবলা নর-নারিকে যদি আপনাদের ফ্রেমে জায়গা দেন তাহলে আমরা নিজেদের ধন্য মনে করতাম..!
শান্তর কথায় মেহজাবিন বলে…
” আরে ভাইয়া,, এসো ।
শান্ত আর রুহি দাঁড়ায় মেহজাবিনের পেছনে । ক্যামেরা ম্যান একটা ছবি তুলতেই ছুটে আসে জেনি । মেহজাবিনের কোলে বসে সে । ছয়জনের একটা সুন্দর মুহুর্তের ছবি ফ্রেম বন্দি হয়ে যায় ।
ইভানকে দেখা যাচ্ছে না কোথায় । শান্ত কয়েকবার কল দিয়েছে ওকে । তবে পায়নি । শান্ত আর রাফি একপাশে দাঁড়িয়ে আছে । দুজনে চোখ গোল গোল তাকিয়ে আছে সামনের দিকে । সামনে রুহি, মিহি, মিরা, লিনা, তানিয়া,আর ইভা – ডান্স করছে । ” London Thumakda ” গানে ছয়জনেই একে অপরের সাথে তাল মিলিয়ে নাচছে । মাঝপথে এই গান থেমে নতুন গান বেজে ওঠে….
Bhawonron ki college ka main
Professor hooon baby
Aiyashi ki computer kaa
Professor hooon baby
Ooo Raja…..
Redio pee Teri Mashoor kahani
Duniya sunegi ab ye
Akash vani…
Ooo Teri end jawani….
End jawani……
গান বাজতেই সবাই ‘ওওওওও’ করে চিল্লিয়ে ওঠে । এই গানের তালে নতুন করে আবারো নাচ শুরু করে ছয়জনে । রুহিকে এভাবে নাচতে দেখে শান্তর মুখ পুরো হাঁ হয়ে গেছে । রাফি বুকে হাত গুজে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । শান্ত শুকনো একটা ঢোক গিলে এক হাতে বুক চেপে ধরে । রাফিকে কনুই দিয়ে খুঁচিয়ে বলে….
” ভাই আমি ঠিক দেখছি তো ? এটা কি তোর বোন ? একটু আগেও তো শাড়ি পরে হাঁটতে পারছিল না ,, এখন দেখ কেমন কোমড় দুলিয়ে নাচছে ।
ইভান পেট চেপে ধরে এসে দাঁড়ায় ওদের সাথে । ইভানকে দেখে শান্ত সামনের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বলে….
” কি রে ,, তুই এতোক্ষণ কোথায় ছিলি ? আর , তোর এমন বেহাল দশা হলো কি করে ?
শান্তর কথায় রাফি তাকায় ইভানের দিকে । ইভানের অবস্থা বেহাল । পুরো নেতিয়ে আছে সে । পেট চেপে ধরে চোখ পিটপিট করে দাঁড়িয়ে আছে । ইভান ক্লান্ত স্বরে বলে…
” এই নিয়ে মোট ৪১ বার….
রাফি ভ্রু কুঁচকে বলে…..
” What…?
” আরে ,, মোট ৪১ বার বাথরুম টু বেডরুম , বাথরুম টু বেডরুম , করার পর আমার অবস্থা শেষ । আর পারছি না ভাই ।
” উল্টা পাল্টা কিছু খেয়েছিস নিশ্চয়ই…?
” আমি তো দুপুরের পর আর কিছুই খাইনি….
বলতে বলতে ইভানের নজর যায় সামনের দিকে । কতগুলো সুন্দরী সুনয়নার মধ্যে থেকেও নজর কাড়ে সেই ডাগর চোখা পরী টা । অমনি ইভানের পিটপিট করে থাকা চোখগুলো মার্বেলের মতো গোল গোল হয়ে যায় । মুহূর্তেই নেতিয়ে পড়া ক্লান্ত শরীর চাঙ্গা হয়ে যায় । ইভান কয়েক বার ঘন চোখের পলক ফেলে বলে….
” এটা ঐ ডাগর চোখা পরী টা না ? Wow ! What a beautiful Eyes…!
ইভান রাফির ঘাড়ে হাত রেখে একটু থেমে বলে…
” মেয়েটার মাঝে জাদু আছে বলতে হবে । অনেকের মাঝে থেকেও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য ওর ঐ চোখ দুটোই যথেষ্ট । তখন তো শুধু এক পলক দেখেছিলাম, আর এখন তো আমার পলকই পড়ছে না…
” উহুম.. এতো কিছু দেখিস না, Respect her…. হবু ভাবী হয় তোর । রেসপেক্ট দিয়ে কথা বল ।
রাফির গম্ভীর গলার তীক্ষ্ণ কথায় চোখ মুখ কুঁচকে ফেলে ইভান । রাফির ঘাড় থেকে হাত নামিয়ে চঞ্চল স্বরে বলে…
” কার ভাবী…? কার বউ ? ও কি married ?
রাফি আবারো গম্ভীর গলায় বলে….
” Married নয় ,, তবে বেশি দিন আর Unmarried থাকবে না..?
” মানে ? কি বলছিস বলতো ? কিছুই তো বুঝতে পারছি না.. একটু Clearly বলতো ।
পাশ থেকে শান্ত বলে…
” আচ্ছা ধরে নে ও তোর ভাবী হয় ,, তাহলে এবার বল ও কার বউ হলে তোর ভাবী হবে ?
ইভান ঘাড় চুলকে বলে….
” হয় তোর , আর না হয় রাফির । কিন্তু তুই তো….
” হুম, আমি এক নারীতে আসক্ত , বাকি নারীরা আমার কাছে অভিশপ্ত । Soo , আমার বউ হওয়ার কোনো চান্স নেই । আমি বাদে বাকি যে থাকে , ও তার ভবিষ্যৎ বউ , মানে তোর ভাবী , Understand ?
ইভান চোখ বড় বড় করে মুখ গোল করে বলে…
” ওওওওওও , তার মানে রাফি…. ? What ? Bro Seriously ? অবশেষে তুইও কোনো মেয়ের পাল্লায় পড়ে গেলি ? I can’t believe this ! কিন্তু কি করে ভাই..? মেয়েরা তোর জন্য লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকে , তুই জীবনে কোনো মেয়েকে পাত্তা দিস না । আর এখন একটা সাধারণ মেয়ের প্রেমে পড়ে গেলি ?
” ওও সাধারণ নয় ,, ও অসাধারণ । অসাধারণ না হলে নিশ্চয়ই আমি ওর পাল্লায় পড়তাম না । ও আমাকে Special Feel করাইছে । ওকে এক দেখায় আমার মনের ভেতর যে অনুভূতি হয়েছিল, তা অন্য কারোর মাঝে আমি খুঁজে পাইনি । ওকে যতবার দেখেছি ততবারই আমি ওর প্রেমে পড়েছি । উঁহু প্রেমে পড়েছি বললে ভুল হবে , আমি ওকে ভালবেসেছি । জীবনের প্রথম রুজান রাফি চৌধুরী কাউকে ভালোবেসেছে ।
সামনে মিহির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কথা গুলো বলে রাফি । কথা শেষ হতেই চোখ ফেরায় মিহির থেকে । শান্ত আর ইভানের দিকে তাকিয়ে দেখে ওরা চোখ বড় বড় করে হাঁ করে তাকিয়ে আছে । ওদের এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাফি সামান্য ভ্রু কুঁচকে বলে….
” এভাবে কি দেখছিস..?
ইভান অবাক হয়ে বলে…
” Bro… তুই রাফি তো নাকি ? তুই ঠিক আছিস ? আমার কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছে না । তুই এসব বলছিস ? Ohh God.. প্রেমে পড়লে মানুষের মাঝে এতো পরিবর্তন আসে বুঝি ?
” আসে, আসে । প্রেমে পড়লে মানুষের মাঝে এক ধরনের পরিবর্তন আসে । আর প্রেম করলে অন্য ধরনের পরিবর্তন আসে । ও তো কেবল প্রেমে পড়েছে , এখনো প্রেম করেনি , তাই ঠেলা টের পায় নি । একবার প্রেম করুক, তারপর বুঝতে পারবে কত ধানে কত চাল । এই বাচ্চা-কাচ্চাদের সাথে প্রেম করা যে কতটা টাফ তা হাড়ে হাড়ে টের পাবে ।
শান্তর দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলা কথায় রাফি বলে…
” কে বলেছে আমি প্রেম করবো ? আমি বলেছি ?
” তাহলে..?
ইভানের কথায় রাফি ওর দিকে তাকিয়ে বলে…
” হাজার বার প্রেমে পড়বো , কিন্তু প্রেম করব না । ডিরেক্ট বিয়ে করবো । বুঝলি ? আর না বুঝলেও এখন আর বুঝতে হবে না … চল ।
বোনের বিয়ে উপলক্ষে এই প্রথম বার রাফিকে নাচতে দেখছে সবাই । সবাই কিংকর্তব্য বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে রাফির দিকে । মেহজাবিনের সামন বরাবর তিন জন যুবক ফুল বিটে গানের তালে নাচছে । ইভান, শান্ত আর রাফি ।
Paan mein pudinaa dekha , Naak ka nagina dekha
Chikani chameli dekha , chikna kameni dekha
Chaand ne cheater hoke , cheat Kiya to saare
Taareephen bole gilee gilee Akkah….
Pa – para – para — pa – para – para
Pa – para – para
Para – Ra – para – Ra……
গানের তাল আর ওদের নাচের ঝোঁকে জমে উঠেছে চারপাশ । তিনজনের চোখের মোটা ফ্রেমের কালো চশমা । রাফির ফর্সা মুখশ্রীতে কালো চশমা ফুটে উঠেছে । গুঁড়ি গুঁড়ি রঙিন আলো গানের তালে দুলে দুলে পড়ছে তিনজনের মুখে । আশেপাশের যুবতী মেয়েরা চোখ গোল গোল করে হাঁ হয়ে তাকিয়ে আছে । সবার হাতেই ফোন । ফোনে ভিডিও ধারণ করছে তারা । এতো দিন সবাই রাফির কন্ঠে শুধু শ্রুতিমধুর গান শুনেছে , আর আজ ওকে নাচতে দেখছে । অবাকের চরম সীমানায় পৌঁছেছে সবাই । মিহি সামনে দাঁড়িয়ে সবার মতো নিজের ফোনে ভিডিও ধারণ করছে । মিহির চোখ স্থির ।
নাচ শেষ হতেই একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে রাফি, শান্ত আর ইভান । কেউ একজন পাশ থেকে পানির বোতল দেয় ওদের হাতে । কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে রাফির । কপালের ঘাম মুছে বোতল মুখ খুলে কয়েক ঢোক পানি খায় রাফি । স্টেজের দিকে তাকিয়ে দেখে মেহজাবিনের হাতে মেহেদি পড়ানো হচ্ছে । দুহাত ভরে মেহেদি পড়ানো হয়েছে ওকে । মেহেদি পড়ানো প্রায় শেষ । মেহজাবিনের হাত সামনে নিয়ে মিহি ওর হাতের কয়েকটা ছবি তুলে নেয়..। ছবি গুলো দেখার মাঝেই আজমাল হোসেনের কল আসে মিহির ফোনে । মিহি সবার থেকে একটু দূরে এসে কল রিসিভ করে কথা বলে নেয় । কথা শেষ করে আবারো স্টেজের দিকে যেতে গেলে একটা অল্প বয়সী বাচ্চা ছেলে মিহির শাড়ির আঁচল টেনে ধরে । আঁচলে টান পড়তেই পিছন ফিরে তাকায় মিহি । একটা বাচ্চা ছেলে,বয়স হবে হয়তো নয় অথবা দশ, কোন গেস্টের বাচ্চা হয়তো । ছেলেটার হাতে চকলেট । মিহি ওর দিকে একটু ঝুঁকে বলে…
” কি হয়েছে…?
বাচ্চা ছেলেটা চকলেট খেতে খেতে স্টেজের পিছনের দিকে ইশারা করে বলে…
” তো.. তোমাকে ঐ দিকে ডাকছে …
বলেই দৌড়ে চলে যায় সেখান থেকে । মিহি পিছন থেকে ডাকে, তবে ছেলেটা আর শোনে না । মিহি এদিক ওদিক তাকিয়ে স্টেজের পিছনের দিকে পা বাড়ায় । স্টেজের পিছনের দিকের লাইটগুলো নেভানো । গার্ডেনের এই জায়গাটুকু একটু অন্ধকার । তবে আশেপাশের বাকিসব আলোর কারনে মোটামুটি স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আশপাশটা । মিহি গুটি গুটি পা ফেলে এগিয়ে যায় । এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে দেখে এখানে কারোর কোনো চিহ্ন নেই । মিহি রুহির নাম ধরে ডাকতে ডাকতে আরো একটু এগিয়ে যায় সামনে । এখানে কেউ নেই,,সামনে প্রাচির । এই দিকটা আরো বেশি অন্ধকার । অন্ধকারে কেমন গাঁ ছমছমে ভাব । পাশে ফুলের গাছগুলোর কাছে কিছু একটা নড়ে ওঠে । মিহি ভয় ভয় চোখে আবারো আশপাশ টা ভালো করে দেখে নেয় । কাঁপা গলায় আরো একবার রুহির নাম ধরে ডাকে । তবে কারোর কোনো সাড়া নেই । ওদিকটায় উচ্চ স্বরে গান বাজছে । সবাই হাতে মেহেদি পড়ছে এখন । মিহি শুকনো একটা ঢোক গিলে পিছন ফেরে ওদিকে সবার কাছে যাওয়ার জন্য ।
দ্রুত পা চালায় মিহি , তবে কয়েক পা এগোতেই পেছন থেকে কেউ একজন শক্ত হাতে মিহির মুখ চেপে ধরে । মিহির পা সহ পুরো শরীর তৎক্ষণাৎ কেঁপে ওঠে । চোখ বড় বড় করে গুঙ্গিয়ে ওঠে মিহি । মিহির মস্তিষ্ক সম্পুর্নটা বোঝার আগেই অন্য একটা খড়খড়ে শক্ত হাত চেপে ধরে মিহির পেট । শাড়ির ভাঁজ গলিয়ে খড়খড়ে হাতটা মিহির নরম পেটে স্পর্শ করতেই শিহরিত হয়ে ওঠে মিহি । স্পর্শ গাঢ় হতেই মিহি যথাসম্ভব হাত-পা ছোড়াছুড়ি করতে থাকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য । এতে লোকটার শক্ত হাতের বাঁধন আরো বেশি শক্তিশালী হতে থাকে । লোকটার জোরের কাছে মিহির শক্তি নিতান্তই তুচ্ছ । মিহির মুখ থেকে মৃদু গোঙানির শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না । মিহির মুখ চেপে ধরা হাতটার দাপট ক্রমশ শক্ত হতে থাকে । মিহির নরম ফিনফিনে চোয়াল দেবে যায় খানিক । ব্যাথায় আরো বেশি গুঙ্গিয়ে ওঠে মিহি । পেছনে থাকা ব্যাক্তিটা এক মুহুর্তেই মিহির কোমর আর মুখ ছেড়ে শক্ত করে ওর এক হাত মুচড়ে ধরে পিছনের দিকে । অসহ্য ব্যাথায় মিহির মুখ থেকে গোঙানির স্বরে বেরিয়ে আসে…. ” আব্বু ” । পেছনের লোকটা অবিলম্বে ছেড়ে দেয় মিহিকে । ছাড়া পেতেই ধপ করে মাটিতে পড়ে যায় মিহি । মিহি এক হাত দিয়ে অন্য হাতটা চেপে ধরে । চোখের কার্নিশ বেয়ে পানি বেরিয়ে আসে মিহির । মিহি মাথা তুলে তাকাতেই দেখতে পায়… একটা কালো হুডি পড়া সুঠাম দেহি লোক দাঁড়িয়ে আছে । যার সম্পুর্ন শরীর কালোয় আবৃত । মাথায় হুডির টুপি, পুরো মুখটা কালো মাফলারে ঢাকা ।
এক দেখায় পর্ব ১৩
এমন অবস্থায় লোকটাকে কোন দস্যুর থেকে কম লাগছে না । ভয়ে মিহির শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায় । মুখ দিয়ে কথা বলার শক্তি টুকুও হারিয়ে ফেলেছে সে । মিহির থেকে দু’পা দুরে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা । ওর দিকে কেমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তা বোঝা যাচ্ছে না । মিহি কোন দিকে না তাকিয়ে মাটি থেকে উঠে এলোমেলো পায়ে ছুট লাগায় । দু’পা এগোতেই আবারো ধপ করে পড়ে যায় মাটিতে । নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে মিহি আবারো উঠে দাঁড়িয়ে ছুটতে থাকে । পেছনের দিকে আর একবারও ঘুরে তাকায় না সে । মুখে অস্ফুট স্বরে – “বাঁচাও, কেউ আছো ? Please help me..” বলতে বলতে কারোর বুকের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে মিহি….

খুব সুন্দর গল্প
বাদশাহনামার next part gulo দেবেন please please