এক দেখায় পর্ব ১৫
সুরভী আক্তার
” প্লিজ হেল্প ,,, আমাকে বাঁচান , ও..ওখানে ওখানে কেউ আছে ।
বলতে বলতে সামনে থাকা বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী ব্যক্তিকে আঁকড়ে ধরে মিহি । যথাসম্ভব নিজেকে লুকানোর চেষ্টা করে তার বুকের ভেতর । সেই বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী ব্যাক্তিটা আর কেউ নয়, রাফি । রাফি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে । সখের নারীর স্পর্শ প্রতিটা পুরুষের জন্য সবচেয়ে ভয়ংকর অনূভুতি । যা ক্ষতবিক্ষত করে দিতে পারে পুরুষের হৃদয়কে। মিহির এতো গভীর স্পর্শে রাফির হৃদয় অবধি কেঁপে ওঠে । হৃৎস্পন্দন বেড়ে যায় দ্বিগুণ ।
মিহি জানে না তার সামনে কে, সে কাকে আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে । মিহি শুধু শক্ত হাতে রাফিকে আঁকড়ে ধরে বিড়বিড় করে যাচ্ছে । মিহির পুরো শরীর ক্রমান্বয়ে কাঁপছে । আতঙ্ক আর ভয়ে পুরো শরীর ভমে গেছে । রাফি জানে না মিহি কেনো এমন করছে । তবে সে ভালো করেই বুঝতে পারছে যে , মিহি প্রচুর ভয় পেয়ে আছে । রাফি আলতো হাত রাখে মিহির পিঠে… নরম কন্ঠে ডাকে….
” মিহি…
রাফির কন্ঠ কর্ন কুহরে পৌঁছাতেই মিহি আরো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাফিকে । শব্দ করে কেঁদে ওঠে মিহি । মিহির বিড়বিড় করা কথা বুঝতে পারছে না রাফি । রাফি শুকনো ঢোক গেলে,,অজানা আশঙ্কা উঁকি দেয় রাফির মনে । রাফি না চাইতেও দুহাতে আগলে নেয় মিহিকে । অত্যন্ত শীতল কন্ঠে আবারো ডাকে…
” মিহি… কি হয়েছে ? এই দেখো, আমি এসেছি । কিচ্ছু হবে না তোমার । তাকাও আমার দিকে, বলো কি হয়েছে..?
মিহি রাফির বুকে মুখ গুজে ফুঁপিয়ে ওঠে । অস্পষ্ট স্বরে আওড়ায়…
” আমাকে বাঁচান । ও আমাকে…. আমাকে…. ওখানে..
আর কিছু বলতে পারে না মিহি । রাফিকে একটু ছেড়ে বুকে মুখ গুজেই দিয়ে এক হাতে পিছনের দিকে ইশারা করে দেখায় মিহি । মিহির ইশারা অনুযায়ী রাফি সেদিকে তাকায় । ওদিকটায় ছোপ ছোপ অন্ধকার । রাফি চোখ ঘুরিয়ে চারদিক ভালো করে দেখে নিয়ে বলে…..
” ওখানে কেউ নেই দেখো । কিচ্ছু হয়নি, তুমি তাকাও আমার দিকে…
মিহি ধীরে ধীরে মাথা তোলে । মিহির ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রাফির ভেতর আঁতকে ওঠে । মিহির চোখে মুখে স্পষ্ট আতঙ্কের ছাপ । ঠোঁট জোড়া তির তির করে কাঁপছে । চোখের কাজল লেপ্টে আছে । চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছিটিয়ে আছে মুখে । মিহি একবার পেছনের দিকে তাকিয়ে রাফির বাহু আঁকড়ে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে….
” ওখানে কেউ ছিল । ও আমার সাথে , ও আমার মুখ চেপে ধরে ছিল । ও আমার হাত মুচড়ে ধরে ছিল , আমার কো..কোমর…
রাফি দুহাতে মিহির মুখ আগলে নিয়ে বলে…
” হুশশশশ… কিচ্ছু হয়নি দেখো । শান্ত হও একটু । আমি এসেছি তো , তোমার আর কিচ্ছু হবে না । এদিকে তাকাও, তাকাও আমার চোখের দিকে ।
মিহি জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে । নিজেকে কিছুতেই স্থির করতে পারছে না সে । মিহি রাফির চোখের দিকে তাকায় । রাফি অজানা অধিকার বোধে মিহির এলোমেলো চুল গুলো কানের পাশে গুজে দেয় । মিহির চোখের পানি আলতো হাতে মুছে দেয় । নমনীয় স্বরে বলে….
” Don’t cry..! Listen… মিহি.. আমি জানি তুমি ভয় পেয়েছো কোন কিছু নিয়ে । ভয় পেয়ো না , দেখো আমি আছি তোমার সাথে ।
মিহি রাফির পাঞ্জাবি খামচে ধরে ক্ষীণ স্বরে বলে….
” আমাকে এখান থেকে নিয়ে চলুন, প্লিজ । আমি এখানে থাকবো না ।
” হুম ,, আমরা আর এখানে থাকবো না । চলো.. ঘরে যাবে..?
মিহি উপর নিচ মাথা নাড়ে । রাফি আবারো নরম হাতে মিহির চোখের পানি মুছে দেয় । সবার আড়ালে মিহিকে নিয়ে আসে বাড়িতে । বাড়িতে কেউ নেই বললেই চলে, সবাই এখন গার্ডেনে নিজেদের হাতে মেহেদি লাগাতে ব্যস্ত । রাফি মিহিকে রুহির ঘরে নিয়ে যায় । অন্ধকার ঘরে লাইট জ্বালিয়ে দেয় । মিহি পুরো চুপসে আছে , রাফির হাত এক মুহুর্তের জন্যও ছাড়েনি সে । মিহি যে হাতে রাফিকে ধরে আছে সেই হাতটা অনবরত কাঁপছে । রাফি মিহিকে সোফার একপাশে বসায় । নিজে বসে মিহির পায়ের কাছে । মিহি নিজেকে পুরো গুটিয়ে নিয়েছে । রাফি একহাতে পাশে থাকা পানির গ্লাসটা মিহির দিকে এগিয়ে দেয় । মিহি রাফির হাত ছেড়ে এক নিঃশ্বাসে পুরো গ্লাস ফাঁকা করে দেয় । গ্লাস রেখে আবারো খপ করে ধরে রাফির হাত । রাফিকে চোখের ইশারায় বোঝায় ..” কোথাও যাবেন না, প্লিজ ” । রাফি নিজের হাতের দিকে তাকায়, মিহির কম্পিত হাত শক্ত করে ধরে । বরাবরের মতো শীতল কন্ঠে বলে…..
” কি হয়েছিল ওখানে ? তুমি এতো ভয় পেয়ে আছো কেনো ? আর তুমি ওখানে গেলেই বা কি করে ?
মিহি চোখ বন্ধ করে জোরে জোরে শ্বাস নেয় । গলা কাঁপছে ওর । মিহি রাফির দিকে তাকিয়ে ভেজা কন্ঠে বলে…
” একটা বাচ্চা আমাকে বললো , আমাকে কেউ গার্ডেনের পিছনের দিকে ডাকছে । আমি ভেবেছিলাম হয়তো রুহি । তাই আমি ওখানে গেছিলাম । কিন্তু ওখানে কেউ আমার সাথে…
আমাকে কেউ..আমাকে বাজে ভাবে ছোঁয়ার চেষ্টা…
মিহি আর কিছু বলতে পারে না । বাকি কথা গুলো গলায় আটকে আসছে । কান্নার তোপে গলা ভারি হয়ে আসছে মিহির । মিহির কথায় রাফির চোয়াল শক্ত হয়ে যায় । চোখ বন্ধ করে নিজেকে সংযত করে রাফি । মিহির উজ্জ্বল শ্যামলা চোয়ালে আঙ্গুলের দাগ বসে গেছে । যা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে । রাফি আনমনে নিজের হাত বাড়িয়ে ছুঁইয়ে দেয় মিহির গাল । রাফির নরম স্পর্শে সপ্তদশীর হৃদয় কেঁপে ওঠে । মিহি তৎক্ষণাৎ বিদ্যুৎ বেগে রাফির হাতটা ছেড়ে দেয় । এতক্ষনের ঘটনা গুলো ধ্যানে আসে মিহির । রাফিকে জড়িয়ে ধরার কথা মনে পড়তেই সিটিয়ে যায় মিহি । মিহির অবস্থা বুঝতে পেরে রাফি ওর গাল থেকে হাত সরিয়ে বলে….
” খুব বেশি ব্যথা পেয়েছো..? কষ্ট হচ্ছে ?
মিহি দুদিকে মাথা নাড়ে । রাফি স্বাভাবিক কন্ঠে বলে…
” কে ছিল ওটা ? তুমি দেখেছো তাকে..?
মিহি আবারো দুদিকে মাথা নাড়ে । মিহির ভয়ের কারণ বুঝতে পেরে রাফি আর কথা বাড়ায় না । একটু সময় নিয়ে রাফি বলে…
” এখনো ভয় করছে..?
মিহি দুদিকে মাথা নাড়ায় । রাফি বলে…
” নিচে যাবেন..?
মিহি আবারো দুদিকে মাথা নাড়ায় ।
” তাহলে ফ্রেশ হয়ে নিন । আর নিচে যেতে হবে না । যান গিয়ে চেঞ্জ করে নিন ।
মিহি মাথা নামিয়ে বসে আছে । রাফি বলে…
” আমি যাবো এখান থেকে..?
মিহি তড়িৎ বেগে তাকায় রাফির দিকে । মিহির চোখের ভাষা বুঝতে অসুবিধা হয় না রাফির । রাফি শান্তনার স্বরে বলে…
” আচ্ছা ঠিক আছে, আমি যাবো না । আমি রুহিকে বলছি, ও এক্ষুনি এসে যাবে । ততক্ষণ আমি এখানেই আছি । আপনি যান ফ্রেশ হয়ে নিন ।
মিহির পড়নের শাড়িটা এলোমেলো হয়ে আছে । মিহি বসা অবস্থায় শাড়ি ঠিক করে উঠে দাঁড়ায় । ল্যাগেজ থেকে একটা ড্রেস বের করে নেয় । বাথরুমের দিকে দু’পা এগিয়ে আবারো ফিরে তাকায় রাফির দিকে ।
রাফি মিহির অসস্থি বুঝতে পেরে বলে….
” আমি বাইরে যাবো…?
” না , না , কোথাও যাবেন না । আপনি এখানেই থাকবেন প্লিজ ।
” আচ্ছা…
মিহি বাথরুমে ঢুকতেই হাত মুঠো করে নেয় রাফি । নিজের রাগকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করে । রাফি নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে কিছু একটা টাইপিং করে মেসেজ পাঠায় কারোর নাম্বারে । মেসেজ পাঠিয়ে কললিস্ট থেকে একটা নাম্বারে ফোন লাগায় । দু-একবার রিং হতেই ফোন রিসিভ হয় অপর পাশ থেকে । রাফি কঠিন স্বরে বলে….
” গার্ডেনের যতো সিসিটিভি ফুটেজ আছে, সব এক্ষুনি আমাকে পাঠাও । Fast…
বলেই ফোন কেটে দেয় রাফি । দুহাতে মাথা চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে সোফায় বসে । কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই টুং টুং করে ফোনটা বেজে ওঠে । সাথে সাথে ফোনটা হাতে নেয় রাফি । ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা ফুটেজ দেখে রাফির চোয়াল শক্ত হয়ে যায় । রাগে কপালের শিরা উপশিরা ফুলে ওঠে । মুহূর্তেই চোখ লাল হয়ে যায় রাফির । ক্রোধে পাশের সোফায় সজোরে একটা লাথি মারে । ফুটেজে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে মিহির সাথে কি কি হয়েছে । মিহিকে অন্য কেউ স্পর্শ করেছে এটা দেখেই রাফির মাথায় দপ করে আগুন জ্বলে ওঠে । রাফি দাঁতে দাঁত চেপে চোয়াল শক্ত করে স্ক্রিনে থাকা ছায়া মানবের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে…
” You Bastard ,
যেই হাতে তুই আমার Blossom কে ছুঁয়েছিস ,, I swear… তোর ঐ হাত আমি জ্বালিয়ে দেব । কুত্তার বাচ্চা… একবার খালি জানতে পারি কে তুই ,, তোকে ছাড়বো না আমি ।
তবে পরমুহূর্তেই রাফির রাগ একটু শিতল হয় । মিহি যখন রাফিকে জড়িয়ে ধরেছিল সেই ফুটেজটা দেখে রাফির ভ্রু খানিক শিথিল হয় । রাফি কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ফোনের স্ক্রিনের দিকে । তারপর আবারো ফোন লাগায় কারোর নাম্বারে । ফোন রিসিভ হতেই রাফি গম্ভীর স্বরে বলে….
” দশটা থেকে দশটা ত্রিশ পর্যন্ত যত সিসিটিভি ফুটেজ আছে সব ডিলিট করে দাও । দ্বিতীয় বার যেন বলতে না হয় । Mind it….
বলেই আবারো ফোন কেটে দেয় । সিঁড়ির দিক থেকে কারোর পায়ের আওয়াজ আসছে । রাফি একবার ওয়াশ রুমের দিকে তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে যায় । মিহি ফ্রেশ হয়ে চেঞ্জ করে বের হতেই রুহির সামনে পড়ে । মিহি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে রাফি নেই । আচমকা মিহি দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে রুহিকে । আকস্মিক জড়িয়ে ধরায় দু’পা পিছিয়ে যায় রুহি । রুহির হাতে মেহেদি লাগানো । রুহি আলতো হাতে জড়িয়ে ধরে মিহিকে । মিহিকে জড়িয়েই বলে….
” তুই ঘরে কখন আসলি Pakhi ? ঠিক আছিস তুই ? জানিস আমি তোকে কতক্ষন ধরে খুঁজছি । কতবার তোকে ফোন করেছি দেখেছিস ? ফোন কোথায় তোর ? তুই যে ঘরে আছিস একবারও আমাকে বলবি না । ভাগ্যিস ভাইয়া আমাকে মেসেজ করে বললো, যে তুই বাড়িতে এসেছিস । কিন্তু তুই হঠাৎ অনুষ্ঠান ছেড়ে বাড়িতে আসলি কেন ? আর ড্রেস ও চেঞ্জ করে ফেলেছিস ?
মিহি রুহিকে ছেড়ে দিয়ে বলে…
” ভালো লাগছিল না রে ওখানে । লাউড মিউজিকে মাথাটা একটু ধরে গেছিলো , তাই চলে এসেছি । Sorry রে… তোকে বলে আসা উচিত ছিল আমার ।
মিহি রুহিকে ওর সাথে ঘটে যাওয়া সবকিছু বলতে গিয়েও বলতে পারে না । মিহি জানে রুহি এসব শুনলে অনেক বেশি প্যানিক করবে । মিহি চায় না রুহির এই বিয়ে নিয়ে আনন্দটা একটুও নষ্ট হয়ে যাক ।
মিহির কথায় রুহি ব্যস্ত হয়ে বলে….
” খুব বেশি মাথা ব্যথা করছে..? মেডিসিন নিয়েছিস ?
” আমি এখন ঠিক আছি । টেনশন করিস না ।
রুহি একটু হেসে মিহির দিকে নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে….
” এই দেখ.. আমি কেমন দুহাত ভরে মেহেদি পড়েছি । কেমন হয়েছে বলতো ?
” আরে বাহ্ … অনেক সুন্দর হয়েছে । শান্ত ভাইয়ার নাম লিখিস নি হাতে ?
রুহি মাথা নামিয়ে লাজুক হেসে বলে…
” উঁহুম…..
” কেনো..? মেহেদি পড়ছিস অথচ প্রিয় মানুষটার নাম লিখিস নি ? অন্তত নামের ফার্স্ট লেটারটা লিখতি….
রুহি নিজের বাম হাত এগিয়ে দিয়ে বলে…
” এই দেখ….
রুহির বাম হাতের তালুতে ছোট্ট করে S লেখা । মিহি মুচকি হাসে তা দেখে । রুহি মিহিকে বলে…
” এখন আর নিচে গিয়ে কাজ নেই । আমিও গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেই । তুই তো হাতে মেহেদি পড়িস নি । আমি ফ্রেশ হয়ে এসে তোর হাতে মেহেদি পড়িয়ে দেব ।
ছাদে একটা চেয়ারে গম্ভীর হয়ে পায়ে পা তুলে বসে আছে রাফি । চোখ মুখ পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে ওর । পাশে একটা চেয়ারে বসে আছে ইভান । শান্ত ওদের থেকে দূরে রেলিং ঘেসে দাঁড়িয়ে বুকে হাত গুটিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে । ছাদে এসেছে থেকে তিনজনেই নীরব । কেউ কারোর সাথে কথা বলছে না । যে যার কাজে ব্যস্ত । রাফি হাতে থাকা ফোন স্ক্রল করছে । ইভানের মনযোগ ও ফোনে । ফোনে এক ধ্যানে গেম খেলছে ও । শান্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বারবার জোরে জোরে ভারী শ্বাস ফেলছে । নাক টানছে শব্দ করে । অনেকক্ষণ ধরেই শান্তর হাবভাব লক্ষ্য করছে রাফি । তবে কিছু বলছে না । শান্তর বারবার নাক টানায় এবার বিরক্ত হয়ে চোখ মুখ কুঁচকে তাকায় রাফি । তিন গুণ ভারী গলায় বলে…
” কি সমস্যা তোর ? বারবার এমন ষাঁড়ের মতো ফোস ফোস শ্বাস নিচ্ছিস কেনো ? হাঁপানি ধরেছে ?
শান্ত এতক্ষন যেন রাফির কথারই অপেক্ষায় ছিল । চট করে রাফির দিকে ঘুরে তাকায় সে । আবারো একটা দীর্ঘশ্বাস টেনে বলে….
” হাহহহ…. তুই এসব বুঝবি না । Any way… তুই কি আমায় ষাঁড় বললি..?
” ষাঁড়ের থেকেও বেশি কিছু হতো..?
” একদম ঠিক ভাই…!
ইভানের কথায় শান্ত রাগি দৃষ্টিতে তাকায় ওর দিকে । ইভান আপন মনে গেম খেলছে । শান্ত চোখ নরম করে রাফির দিকে তাকিয়ে বলে….
” আজকে যেন কয় তারিখ…?
রাফি নিজের হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকায় । ১২ টা পেরিয়েছে । সময় দেখে শান্তর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে….
” ১৩ তারিখ ।
” ওও , আচ্ছা আজকে যেন কি একটা বিশেষ দিন আছে ?
ভাবুক ভঙ্গিতে বলে শান্ত । শান্তর হেঁয়ালি কথায় রাফির কুঁচকানো ভ্রু আরো বেশি কুঁচকে যায় । রাফি তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলে….
” তোর মামার মেয়ের বিয়ে আছে আজকে ।
” আর কি আছে…?
রাফি একটু ভেবে বলে….
” আজ ১৩ ই ফেব্রুয়ারি…. ” কনজেনিটাল হার্ট ডিফেন্স অ্যাওয়ারনেস ডে..” ।
শান্ত চোখ বড় বড় করে তাকায় রাফির দিকে । আবারো ফোঁস করে একটা শ্বাস নিয়ে নিচু স্বরে বলে…
” আর কিছু নেই..?
রাফি এবার ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকায় শান্তর দিকে । শান্ত বোকা বোকা চাহনিতে তাকিয়ে আছে । রাফি কন্ঠে দৃঢ়তা বাড়িয়ে বলল…
” দেখ মাথা গরম করিস না । আর কি আছে আজকে..?
” ওরে শালা, আন’রোমান্টিকের পোলা — আজকে কি আছে জানিস না..? আজকে এই বিশেষ দিবস’টাকে তুই কি করে ভুলে গেলি ?
রাফি তীক্ষ্ণ চোখে তাকায় শান্তর দিকে । শান্ত আবারো পরপর শ্বাস টেনে বলে…
” You know… আজকে কি ডে …? আজকে হলো জাতীয় চুম্মা-চুম্মি দিবস । I mean…kiss day..! এই স্পেশাল দিনটাকে ভুলে গেলি ?
” এসব উল্টা পাল্টা দিনের কথা কবে মনে রেখে ছিলাম আমি…?
” সেটাই তো .. তুই তো শালা আন’রোমান্টিক । তুই কেন এসব মনে রাখবি ..? কিন্তু আমি মনে রেখেছি । জানিস,,আজকের এই দিনে একটা বউকে কতো বেশি মিস করছি..! আজ যদি একটা বউ থাকতো..। আহ্.. এই কষ্ট আমি কোথায় লুকাবো ?
রাফি সরু নেত্রে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে চোখ ফেরায় । আবারো মনযোগ দেয় ফোনে । শান্ত রাফির দিকে একবার তাকায় , ইভানের দিকে একবার তাকায়,, দুজনের কেউই ওকে পাত্তা দিচ্ছে না । শান্ত আবারো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ।
” আজ যদি একটা রোমান্টিক গার্লফ্রেন্ড থাকতো, তাহলে আমাকে এই দিন দেখতে হতো না ।
রাফি আবারো দাঁত পিষে ক্ষিপ্ত চোখে তাকায় শান্তর দিকে.. শান্ত ঢোক গিলে বলে…
” ওভাবে কি দেখছিস ? যেমন তুই , তেমন তোর বোন । রোমান্সের ছিটেফোঁটাও নেই তোদের কারোর মাঝে । তোর বোন হয়েছে আবার অন্যরকম । লজ্জাবতী লতা-পাতা আমার । যখনি দেখি তখনি লজ্জা পায় । লজ্জায় লাল, নীল, সবুজ, হলুদ সব রং ধারণ করে । হাত ধরা তো দুরের কথা, ওর দিকে তাকলেই লজ্জা পায় । বাকি সব তো বাদই দিলাম ।
রাফি শুকনো কাশি দিয়ে গলা ভার করে বলে…
” চাপকে ছাল তুলে দেবো , আর একটা বাজে কথা বললে । বড় ভাই হোই আমি ওর । একটু তো কমনসেন্স নিয়ে কথা বল ।
পাশ থেকে ইভান উচ্চ স্বরে চেঁচিয়ে বলে…
” মার ওকে মার… মার শালাকে ।
হঠাৎ ইভানের কথায় ওর দিকে চকিতে তাকায় রাফি আর শান্ত । ইভান পুরো চোখ মুখ ঢুকিয়ে ফোনে গেমস খেলায় মত্ত । শান্ত হাত মুষ্টি করে ওর কাছ থেকে ছোঁ মেরে ফোনটা নিয়ে নেয় । ফোন নেওয়ায় ইভান এক লাফে চেয়ার থেকে নেমে অস্থির হয়ে বলতে লাগে…
” ভাই ফোন দে ভাই ,,, ঐ এনিমি টারে এক্ষুনি মারতে হইবো । ওরে না মারলে আমি নিজেই মইরা যামু । ওরে হতচ্ছাড়া ফোন দে জলদি ।
ইভান এদিক ওদিক ছোঁড়া ছুড়ি করেও কিছুতেই শান্তর হাত থেকে ফোনটা নিতে পারে না । শান্ত এদিক ওদিক করে ফোনটা অফ করে দেয় । ইভান হতাশ হয়ে বলে…
” দিলি তো বারোটা বাজিয়ে । তোর কোন পাকা ধানে মই দিয়েছিলাম আমি ।
” আমরা এইখানে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং করছি , আর তুই গেম খেলছিস ?
শান্ত এবার রাফির দিকে তাকিয়ে বলে…
” Bro… তুই তোর বোনের ভাই হতে পারিস , তবে আমার কিন্তু বেস্ট ফ্রেন্ড, এটা ভুলে যাস না । আর হ্যাঁ ,, সম্পর্কে শালা’ও হোস বটে , সেটা বড় হোক বা ছোট ,শালা তো শালা’ই হয় ।
তাইনা শালা বাবু..?
শেষের কথাটা ইভানের দিকে তাকিয়ে বলে শান্ত । ইভান ভ্যাবলার মত তাকিয়ে আছে । এতক্ষনে ফোনে মত্ত থাকায় এখানে ঘটে যাওয়া কোন কিছুই ওর কান অবধি পৌঁছায় নি । ইভান কিছু না বুঝেই উপর নিচ মাথা নাড়ায় ।
মেয়েলি হাসির শব্দে ছাদের দরজার দিকে তাকায় তিনজনে । একসাথে বাড়ির সব মেয়েরা উঠে এসেছে ছাদে । মেহজাবিন, তানিয়া, ইভা, বর্ষা সবাই আছে । পেছনে গুটি গুটি পায়ে রুহি আর মিহিও আছে । রাফি চোখ সরু করে ভ্রু কুঁচকে তাকায় ওদের দিকে । ছাদের দরজার কাছে আসতেই আটকে গেছে সবাই । রাফি কে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাতে দেখে মেহজাবিন শুকনো একটা ঢোক গিলে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়ায় । রাফি সবাইকে একবার দেখে নিয়ে মেহজাবিনকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর স্বরে বলে…
” এতো রাতে ছাদে কি করছিস তোরা ?
পেছন থেকে রুহি গলা বাড়িয়ে শাসনের স্বরে বলে…..
” তোমরা এতো রাতে ছাদে কি করছো..? ঘুম নেই কারোর চোখে ?
” আর ঘুম । সময়ের সাথে সাথে জীবনেরও বারোটা বেজে গেছে । ঘুম আসবে কোথা থেকে ।
বলতে বলতে রাফির দৃষ্টি নজরে আসতেই সহসা জিভ কামড়ে দু’ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে নিজের মুখে লাগাম টেনে নেয় শান্ত । রাফি ঘাড় ঘুরিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলে….
” কি জন্য এসেছিস এখানে ?
রুহি স’শব্দে জবাব দেয়…
” আড্ডা দিতে । চাইলে তোমরাও যোগ দিতে পারো ।
রাফি মেহজাবিনের দিকে তাকিয়ে বলে…
” সারাদিন অনেক ধকল গেছে তোর উপর দিয়ে । একটু রেস্ট প্রয়োজন তোর । আর এখন তোরা এসেছিস আড্ডা দিতে । ঘুমাবি না ?
মেহজাবিন নরম দৃষ্টিতে তাকিয়ে মিনমিন স্বরে বলে…
” কালকে তো তোমাদের সবাইকে ছেড়ে চলেই যাচ্ছি ভাইয়া..। আজ একটু তোমাদের সাথে সময় কাটিয়ে নেই । আজকের রাতটাই তো আছি তোমাদের সাথে । তারপর তো চাইলেও আর এমন দিন ফিরে পাবো না ।
মেহজাবিনের কথা শুনে রাফি ওর দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে । তারপর চোখ ফিরিয়ে চোখ নিবদ্ধ করে ফোনের দিকে । ফোনের দিকে তাকিয়েই শমিত স্বরে বলে….
” তাহলে ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেনো ? ভেতরে আয় ।
রাফির কথায় মেহজাবিন’সহ বাকিদের চোখ চিকচিক করে ওঠে । সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে যায় ছাদে । ছাদের মাঝ বরাবর পাটি বিছিয়ে গোল হয়ে বসে সবাই । রাফি কয়েক বার আড়চোখে তাকায় মিহির দিকে । মিহি একবারও তাকায় নি । কেমন জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে সে । মিহি তাকাতে পারছে না রাফির দিকে । বুকের ভেতর অস্থির অজানা অনুভূতিরা দোল খাচ্ছে । একটু আগের মুহূর্ত গুলোর কথা ভাবলেই হাত-পা শিরশির করে উঠছে মিহির । রাফির চোখে চোখ রাখবে কিভাবে – এটা ভাবতেই বুক ঢিপঢিপ করছে । মিহি তবুও চোখ সরু করে একবার আড়চোখে তাকায় রাফির দিকে । রাফি ফোন ঘাটছে । মিহি ক্ষিপ্রবেগে চোখ সরিয়ে নেয় । লিনা দুহাতে দু’বোল পপকর্ন নিয়ে আসে ছাদে । মিহির একপাশে বসে পপকর্নের বোল গুলো সামনে রাখে । রুহি মিহির অন্য পাশে বসে গলা উঁচিয়ে ডাকে….
” ভাইয়া,,তোমরাও এসো এখানে প্লিজ । আমরা সবাই একসাথে একটা গেম খেলবো । তোমরা থাকলে আরো বেশি মজা হবে । প্লিজ এসো….
রুহির ডাকে চট করে ইভান গিয়ে বসে ওদের সাথে । শান্ত’ও ইভানের পাশে বসতে বসতে বলে…
” কি গেম খেলবে শুনি ? শুরু করো । আমিও খেলবো…
বলতে বলতেই শান্তর নজর যায় অন্য পাশে থাকা লিনা’র দিকে । অমনি ” আআআআআআ” বলে চিৎকার করে ওঠে শান্ত । শান্তর চিৎকারে সবাই ওর দিকে বিস্ময়ের নজরে তাকায় । শান্ত লিনার দিকে তাকিয়ে বুকে হাত রেখে বলে…
” ওরে কে রে… বাঁচা আমায় । ভুল জায়গায় এন্ট্রি নিয়ে ফেলেছি ।
বলতে বলতে হামাগুড়ি দিয়ে ইভানকে ঠেলে ওর জায়গায় বসে শান্ত । শান্তর কাহিনী দেখে মিহি ফিক করে হেসে দেয় । দুর থেকে সেই মায়াময় মুখের হাসিতে আটকে যায় রাফির চোখ । রাফি এক প্রণিধানে তাকিয়ে দেখে সপ্তদশীর রিনিঝিনি হাসি । যা মুহূর্তেই তোলপাড় সৃষ্টি করে রাফির স্থির হৃদয়ে । রাফি চোখ সরিয়ে শুকনো ঢোক গিলে চোখ বন্ধ করে নেয় ।
লিনা শান্তর কান্ডে আশ্চর্য বনে যায় । লিনা নিজেকে ভালোভাবে দেখে নিয়ে, মিহিকে বলে…
” আমাকে কি ভুতের মতো দেখাচ্ছে ? নাকি আমার আমার গাঁ থেকে গন্ধ আসছে ,, বলোতো ? উনি এমন করলেন কেনো ?
মিহি ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকে বলে…
” ওনার একটা নিজস্ব পরী আছে ,, সেই পরী’টা যদি ওনাকে অন্য একটা পরী মানে তোমার সাথে দেখে নেয় – তাহলে ওনার ঐ নিজস্ব পরী ওনার ঘাড় মটকে দেবে । তাই উনি তোমার পাশ থেকে দূরে চলে গেলেন ।
লিনা অবুঝের মতো ঠোঁট উল্টে তাকায় । রুহি রাফির দিকে ঘুরে রাফিকে ডাকে….
” ভাইয়া তুমিও এসো , দেখো তুমি বাদে আমরা সবাই আছি । আমরা সবাই এখন ট্রুথ ডেয়ার খেলবো । তুমিও এসো প্লিজ ।
রাফি ফোনের দিকে তাকিয়েই রাশভারী কন্ঠে বলে…
” আমি ওসব খেলবো না । তোরা খেল । আমাকে এসবে জড়াস না ।
মেহজাবিন ভেজা কন্ঠে পাশ থেকে ডাকে….
” ভাইয়া প্লীজ এসো । আজকের এই সময় টুকুই তো আমি আছি বলো । আমাকে সময় দেবে না একটু ?
শান্ত বলে….
” সবাই এতো করে বলছে ,, আয় না ।
রাফি হাতের ফোনটা অফ করে একে একে সবার দিকে তাকায় । লিনা রাফিকে একবার দেখে মাথা নামিয়ে লাজুক ভঙ্গিতে বলে….
” আসুন না ,, আপনি আসলে আরো বেশি মজা হবে । মেহজাবিন আপুর’ও অনেক বেশি ভালো লাগবে । আসুন ।
লিনার কথায় মিহি চট করে তাকায় লিনার দিকে । লিনা মাথা নামিয়ে রেখেছে । মিহি পরমুহূর্তেই তাকায় রাফির দিকে । ততক্ষণে রাফি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছে সবার ডাকে সাড়া দিয়ে । অজান্তেই মিহির মনে খারাপ লাগার সৃষ্টি হয় । মিহি মনে মনে ভাবে…
” উনি কি তবে লিনা আপুর ডাকে উঠে আসলেন । কোই এতক্ষণ ধরে তো সবাই ডাকছিলো, উনি তো এলেন না । লিনা আপুর এক ডাকেই কি উনি চলে আসলেন ?
মিহির ভাবনার মাঝেই রাফি এসে বসে পড়েছে শান্ত আর ইভানের মাঝখানে । মিহির ঠিক সামনে বরাবর বসেছে রাফি । মিহি লিনার অভিব্যক্তি বোঝার জন্য লিনার পানে তাকায়,, লিনার গাল দুটো অস্বাভাবিক ভাবে ব্লাস করছে । মিহি চোখ সরিয়ে নিজের মনকে শাসায়…
” আজব তো ,, তোর কেনো এতো খারাপ লাগছে ? তুই আজকাল একটু বেশি ভেবে ফেলছিস মিহি । তুই তো এমন নোস । It’s not good..!
মিহি মুখে ‘চ’ সূচক শব্দ করে চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস টেনে সামনে তাকায় ।
মিহির হাতে এখনো মেহেদি পড়ানো হয় নি । তানিয়া বেশ ভালো মেহেদি পড়াতে পারে । রুহি তানিয়াকে বলেছে মিহির হাতে মেহেদি পড়িয়ে দিতে । মিহির হাত ফাঁকা দেখে তানিয়া ওর হাতটা নিজের দিকে টেনে নেয় মেহেদি পড়ানোর জন্য । হাতের কব্জিতে টান পড়তেই আচমকা ‘আহ্’ বলে মৃদু স্বরে চেঁচিয়ে ওঠে মিহি । রাফি অবিলম্বে তাকায় ওর দিকে । রুহি ব্যস্ত কন্ঠে বলল…
” কি হলো Pakhi ,, হাতে লাগলো ? ব্যথা পেয়েছিস ? দেখি,হাত দেখি ।
” আমি তো আলতো করে হাত ধরেছি মিহি,, ব্যথা পেলে কি করে ।
তানিয়ার কথায় মিহি মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে…
” ব্যথা পাইনি আপু । ঐ এমনি ,, আমি ঠিক আছি । তুমি মেহেদি পড়িয়ে দাও…
মিহি হাত বাড়াতেই রাফি তাকায় ওর হাতের দিকে । কব্জির কাছে অনেকটা জায়গা কালচে হয়ে আছে । কারোর জোরে চেপে ধরার ছাপ ক্ষীন আলোতেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে । যা এড়ায় না রাফির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থেকে । রাফির মুখ বিবরে আবারো রাগ ফুটে ওঠে । চোখ মুখ শক্ত হয়ে যায় ওর ।
মিহির হাতে মেহেদি পড়ানো শুরু করতেই রুহি তানিয়াকে বলে….
” আপু , আমার পাখির ডান হাতের ঠিক মাঝখানে ছোট্ট করে R লিখে দিবে ।
মিহি সহ সবাই ভ্রু কুঁচকে তাকায় রুহির দিকে…রুহি আবারো বলে…
” আরে, R for Ruhi .. মিহির বেস্ট ফ্রেন্ড । বেস্ট ফ্রেন্ডের নাম তো বেস্ট ফ্রেন্ডের হাতে থাকতেই পারে । তাইনা..?
মিহি নিঃশব্দে আলতো হাসে । মেহজাবিনের হাতের দিকে তাকিয়ে বলে…..
” আপু,, তোমার মেহেদির রং তো অনেক গাঢ় এসেছে । শুনেছি , যার মেহেদির রং যত বেশি গাঢ় হয় , তার জীবন সঙ্গী তাকে ততো বেশি ভালোবাসে । ভাইয়া তোমায় নিশ্চয়ই অনেক বেশি ভালোবাসে, তাই না ?
মেহজাবিন লাজুক ভঙ্গিতে একটু হেসে মাথা নুইয়ে নেয় । রাফি বাঁকা চোখে তাকিয়ে থাকে মিহির দিকে ।
সবাই পপকর্ন খাচ্ছে ।
একটা কাঁচের বোতল নিয়ে আসা হয়েছে নিচ থেকে । সবার মাঝ বরাবর সেটা রাখা হয়েছে । রুহি সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে…
” তো সবাই খেলার নিয়ম জানো তো ? কারোর কোনো সমস্যা আছে ?
সবাই একসাথে মাথা দোলায় । অর্থাৎ কারোর কোনো সমস্যা নেই ।
” ওকে স্টার্ট…..
বলেই সবার মাঝে বোতল ঘুরিয়ে দেয় রুহি । সবাই বোতলের দিকে মনোযোগ সহকারে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । প্রথমেই বোতলের মুখো থামে মিরার দিকে । সবাই একসাথে চিৎকার করে ওঠে । মিরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় খানিক । ইভা বলে….
” বলো মিরা, তুমি কি নেবে ? ট্রুথ না ডেয়ার ?
” মিরা একটু ভেবে বলে…
” ট্রুথ….
” তাহলে তোকে প্রশ্ন আমি করবো । সত্যি বলবি কিন্তু । মিথ্যে বললে তোর বিয়ে হবে না । – বল তোর ক্রাস কে ?
রুহির প্রশ্নে মিরা আরো বেশি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় । একটা ঢোক গিলে, ভ্যাবলার মত একটু হেসে মিনমিনে গলায় বলে…
” তোর ভা.. ভাইয়া ।
রুহি জানতো মিরা এটাই বলবে । ও সব জেনে শুনেই নিজের ভাইয়াকে শোনানোর জন্য এই প্রশ্ন করেছিল মিরাকে । মিরার কথায় রাফি ব্যতীত সবাই হেসে ওঠে । লিনাও জোরপূর্বক একটু হাসে ।
পুনরায় ঘোরানো হয় বোতল । এবার বোতলের মুখ আটকায় বর্ষার দিকে । রুহি সবাইকে থামিয়ে বর্ষা কে বলে…
” তুই কি নিবি বল….
” ট্রুথ….
পাশ থেকে শান্ত চিল্লিয়ে ওঠে…
” সাবাশ ছোট শালি…. না মানে ছোট আপা । তোমাকে তো প্রশ্ন আমি করবো । আচ্ছা বলো- তুমি প্রেম করো ?
শান্তর প্রশ্নে চোখ গোল গোল করে তাকায় বর্ষা । সাথে সবাই । বর্ষা নরম স্বভাবের ছোট একটা মেয়ে । ওর কি প্রেম করার বয়স হয়েছে নাকি ? বড় ভাই বোনদের সামনে শান্তর কথায় বর্ষা মাথা নিচু করে উত্তর দেয়….
” না…
শান্ত ফের চিল্লিয়ে ওঠে….
” প্রেম করার বয়স আসলে আমাকে বলবে কিন্তু । আমরা দুজনে চুটিয়ে প্রেম করবো ।
বলেই রুহির দিকে তাকায় শান্ত । রুহির মুখের কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় না । শান্ত কপাল কুঁচকে তাকিয়ে ইভানকে ফিসফিস করে বলে….
” ভাই আমার হাতে একটা চিমটি কাটতো…
ইভান ও সহসা জোরে একটা চিমটি কাটে । শান্ত ‘আহহ’ সূচক শব্দ করে বলে…
” হতভাগা , চিমটি কাটতে বলেছি , ছোবল দিতে বলিনি । আচ্ছা তোর ফুফুর মেয়ের আজ কি হলো বলতো – কোন রিয়াকশন দেখাচ্ছে না কেনো ? জানিনা আবার কি ভুল করছি ।
ফের ঘোরানো হয় বোতল । ইভানের দিকে থামতে গিয়েও এবার বোতল আটকায় শান্তর দিকে । শান্ত খুশিতে লাফিয়ে উঠে । কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ও নিজেই বলে…
” Wait… আমি তোমাদের মতো ভিতু নোই । I am Daring ,, So… আমি ডেয়ার নেবো । বলো আমাকে কি করতে হবে ? I am ready…
সবাই একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে । শান্তকে কি করতে বলবে এটাই ভেবে পাচ্ছে না কেউ । মেহজাবিন হাত উঠিয়ে বলে….
” ভাইয়া তোমাকে ডেয়ার আমি দেবো । Unique একটা ডেয়ার দেবো ভাবছি । I think তুমি করতে পারবে ।
শান্ত গাঁ ছেড়ে ভাব নিয়ে বলে…
” Tell me.. কি করতে হবে ?
মেহজাবিন গলা খাঁকারি দিয়ে বলে…
” তোমাকে এই মুহূর্তে একটা মেয়েকে প্রোপোজ করতে হবে । তাও আবার যেমন তেমন করে নয়, Unique ভাবে প্রোপোজ করতে হবে । এখন তুমি কাকে প্রোপোজ করবে এটা তোমার ব্যাপার ।
” এইতো ভাইকা বোনের মতো কথা বলছিস । তোর ভাইয়ের কাছে এটা কোন ব্যাপারই না । একটা মেয়ে কে প্রোপোজ করতে হবে তো ? Just wait and watch…..
শান্ত উঠে দাঁড়ায় । পকেট থেকে একটা কালো সানগ্লাস বের করে ফুঁ দিয়ে চোখে লাগায় সেটা । হেলেদুলে এগিয়ে যায় রুহির দিকে । সবাই অধির আগ্রহে তাকিয়ে আছে দেখার জন্য । শান্তকে নিজের দিকে এগোতে দেখে রুহি ‘থ’ মেরে বসে আছে । মিহি গলা খাঁকারি দিয়ে রুহির পাশ থেকে একটু সরে বসে । শান্ত রুহির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে । ডান হাত বাড়িয়ে দেয় রুহির দিকে । রুহির বুকের ভেতর ঢিপঢিপ করছে । সে একবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখে রাফিকে । রাফি হাতে থাকা ফোনে কিছু একটা করছে । এদিকে মনযোগ নেই ওর । রুহি মুখ গোল করে একটা শ্বাস টেনে নেয় । রুহির শ্বাস ফেলার আগেই শান্ত বলতে শুরু করে…
” Oo My god ,, সাইকেলের রড…
ভ্যানের টিউ ,, I love you 😘….
শান্তর ইউনিক প্রোপোজ শুনে সবাই হাঁ করে তাকায় । ‘অ্যাহ্’ বলে সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে সবাই । রাফিও চোখ কুঁচকে অবিলম্বে তাকায় শান্তর দিকে । রুহির টেনে নেওয়া দীর্ঘশ্বাস ফোঁস করে বেরিয়ে আসে । রুহি ড্যাপ ড্যাপ করে তাকিয়ে আছে শান্তর দিকে । এতগুলো অবাক দৃষ্টি দেখে থতমত খেয়ে যায় শান্ত । একটুও না নড়ে চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে….
” কি দেখছিস তোরা ? ইউনিক ভাবে প্রোপোজ করলাম । পছন্দ হয় নি ? Wait.. আমার Dictionary তে আরো অনেক ইউনিক প্রপোজের ধরন জমানো আছে । ভেবে ছিলাম প্রতিদিন বউকে নতুন নতুন ভাবে প্রপোজ করবো । এটা পছন্দ হয় নি তো কি হয়েছে, অন্য ভাবে প্রপোজ করছি ।
বলেই আবারো চোখ ফেরায় রুহির দিকে । রুহি চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে আছে । শান্ত রুহির দিকে আবারো হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে…
” A , B , C , D , E , F , G —-
H, I love you —
Will You Marry Me…?
শান্তর এবারের প্রপোজ শুনেও সবার চোখ কোটর ফেটে বেরিয়ে আসার মত অবস্থা । রুহি শান্তর চোখ থেকে চোখ সরিয়ে শুকনো কাশি দিতে থাকে । রাফি আর ইভান এদিক ওদিক তাকাচ্ছে । বাকিরা হাঁ হয়ে তাকিয়ে দেখছে শান্ত কে । শান্ত এখনো একই ভঙ্গিতে বসে আছে । রুহি আড়চোখে লিনাসহ বাকিদের একবার দেখে নেয় । শান্ত আর রুহির ব্যপারে ওরা কেউ অবগত নয় । মেহজাবিন নিচু স্বরে গলা ঝেড়ে বলল…
” উঁহুম.. উঁহুম …
ভাইয়া, তোমাকে ইউনিক ভাবে প্রপোজ করতে বলা হয়েছে ,,, বিয়ের প্রপোজাল দিতে বলা হয় নি ।
” So what ব্যাহনা..? তোর ভাই সবসময় এক ধাপ এগিয়েই থাকে । যদি বিয়ের প্রপোজাল দিতে বলতি , তাহলে ডিরেক্ট বাচ্চা সহ হাজির করতাম ।
শান্তর কথায় একসাথে সবাই কাশতে শুরু করে । রুহি লজ্জায় মাথা নিচু করে রেখেছে । কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে ওর । চোখ তুলে তাকানো দায় হয়ে পড়েছে । মেহজাবিন রুহির অবস্থা বুঝে বলল…
” আচ্ছা হয়েছে , এবার তুমি নিজের জায়গায় এসে বসো । তোমার ডেয়ার তুমি কমপ্লিট করেছ ।
শান্ত প্রফুল্ল হাসি হেসে নিজের জায়গায় এসে বসে । রুহি চোখ তুলে তাকায়, শান্ত ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে । চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নেয় রুহি । ভেংচি কেটে আবারো বোতল ঘোরায় । এবার বোতল থামে মিহির দিকে । মিহি খানিক ভড়কে যায় এতে । মিহি ঘন পলক ফেলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ।
মিহি ঝট করে বলে…
” আমি ট্রুথ নেবো ।
” তাহলে মিহিকে এবার কে ট্রুথ দেবে ? আমি আর রুহি তো পারবো না । বলো কে কি বলবে..?
শান্ত স্বাভাবিক স্বরে বলল…
” আমি দেবো ।
রাফি সুক্ষ্ম চোখে তাকায় শান্তর দিকে । জানিনা এ আবার কি ট্রুথ দেবে ?
শান্ত রাফি কে দেখে মিহির দিকে তাকিয়ে বলে…
এক দেখায় পর্ব ১৪
” আচ্ছা Pakhi ,, বলতো , তুমি তোমার জীবনে কেমন জীবন সঙ্গী চাও ? মানে তোমার জীবন সঙ্গী হতে গেলে কি কি গুণ থাকতে হবে একটা ছেলের মাঝে ? বলো বলো..?
শান্তর প্রশ্ন পছন্দ হয়েছে রুহি আর মেহজাবিনের । রাফির সুক্ষ্ম নেত্র স্বভাবিক হয় । রাফি অধির ব্যগ্রতা নিয়ে অপেক্ষা করছে মিহির উত্তরের । রাফি মিহির দিকে তাকায় না । মিহি শীয় মুহুর্তের জন্য রাফির দিকে তাকায় । একবার নিজের মেহেদি লাগানো হাতের দিকে তাকায়, তানিয়া অতি যত্নে সুন্দর করে মেহেদি পড়িয়ে দিচ্ছে । মিহি কম্পনহীন চোখ বন্ধ করে শ্বাস টেনে নেয় । চোখ খুলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অদুরে । পুরো ছাদে এখন নিরবতা , সবাই ব্যাকুলতা নিয়ে তাকিয়ে আছে মিহির পানে । মিহি একটু সময় নিয়ে বলল……..
