অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২১
ফাহিমা ইসলাম
মেঘের গা ঘেঁষে নেমে আসা বিকেলটা আজ অদ্ভুত এক দ্বৈততার আবরণে মোড়া। না পুরোপুরি বিষণ্ণ, না সম্পূর্ণ প্রশান্ত। দিবাকরের ক্লান্ত সোনালি আভা ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এসে শহরের প্রাচীন প্রাচীরে। অলিগলি আর স্থবির স্থাপত্যের গায়ে পড়ে যেন অতীতের ধুলো ঝেড়ে তুলছে বিস্মৃত স্মৃতিগুলোকে। ব্যস্ত এই নগরীতে মানুষ নিজ কর্মে ছুটে চলেছে, রেস্টুরেন্টের একপাশে মনোযোগ সহকারে ফোনে মগ্ন শ্রাবণ। ব্যবসার হাল বর্তমানে সে ধরেছে, তাই এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে হয় থাকে। হঠাৎ ই দূর থেকে এক পরিচিত অবয়ব চোখে পড়ে শ্রাবণের। কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা খোলা চুল, হালকা শাড়ির আঁচলে আটকে থাকা বাতাসের অস্থির খেলা। সবকিছুই যেন অবিকল একই, অথচ কোথাও একটা অচেনা দূরত্বের ছাপ। তার দৃষ্টি অনিচ্ছাকৃতভাবেই থমকে যায় সেদিকে। যেন সময়ের গহ্বরে আটকে পড়েছে সে।
ইরা এখনো লক্ষ্য করেনি শ্রাবণকে। নিজের মধ্যে ডুবে থাকা এক গভীর উদ্বেগের ছায়া স্পষ্ট তার মুখাবয়বে। কিন্তু হঠাৎই যখন দৃষ্টি মিললো,এক মুহূর্তের জন্য চারপাশের সমস্ত শব্দ, সমস্ত গতি, সমস্ত বাস্তবতা নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। ইরার নিকট, দৃষ্টি বিনিময়ের এই ক্ষণস্থায়ী অথচ ভারী মুহূর্তে, তাদের অদৃশ্য বন্ধনের অপ্রকাশিত সত্য যেন আরও প্রকট হয়ে উঠলো। কতগুলো দিন পর আবারও এইভাবে মুখোমুখি হতে হবে ভাবতে পারেনি ইরা। পা দু’টো কেমন অচল হয়ে এসেছে তার। তার থেকে খানিক দূরত্বেই শ্রাবণ বসে আছে।
“ আপনি… এখানে?”
ইরার কণ্ঠে বিস্ময়ের চেয়ে বেশি ছিল সংশয়, আর সেই সংশয়ের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এক অস্বীকারযোগ্য কম্পন। শ্রাবণ মৃদু হেসে ফেললো, কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতার চেয়ে বিদ্রূপই যেন বেশি প্রতিফলিত হলো নিজের ভাগ্যের প্রতি।
“এই প্রশ্নটা তো আমিও করতে পারি, ইরা।”
একটা নীরবতা নেমে এলো। ভারী, অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতি। ইরা দৃষ্টি সরিয়ে নিলো, যেন তার চোখে চোখ রাখাটা অপরাধের শামিল। কণ্ঠ কিছুটা দৃঢ় করে বললো,
“আমার বাড়িতে… বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে।”
শ্রাবণের ভ্রু কিঞ্চিৎ কুঁচকে উঠলো।
“তাই নাকি? তা কবে বিয়ে?”
কথাটা ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত অর্থ যেন অসংখ্য প্রশ্নের ভার বহন করছিলো। ইরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো এবার, না চাইতেও শ্রাবণের এমন নির্লিপ্ত বাক্য হজম করতে খানিকটা সময় নিলো সে।
“ আপনি কিছু বলবেন না?”
শ্রাবণ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। তারপর ধীর, ভারী স্বরে বলে-
“কি বলবো? যে আমরা… ইতোমধ্যেই এমন এক সম্পর্কে আবদ্ধ, যার অস্তিত্বটাই অস্বীকার করে চলেছি আমরা দুজনেই?”
ইরার শ্বাস এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেলো। চারপাশের বাতাস যেন হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠছে।
“ওটা… একটা ভুল ছিল। আপনি জানেন সবটা।”
শব্দগুলো উচ্চারণ করতে গিয়ে তার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো, অথচ সে নিজেকে শক্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। শ্রাবণ চোখের ইশারা দ্বারা সামনের ফাঁকা জায়গাতে বসার আদেশ করলো। ইরা শাড়ির আঁচল খামচে ধরে বসে পরে। শ্রাবণের চোখে এক অদ্ভুত স্থিরতা না রাগ, না কষ্ট; বরং এমন এক অনুভূতি, যার ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন।
“সব ভুল এত সহজে মুছে ফেলা যায় না, ইরা। কিছু ভুল… বাস্তবতার চেয়েও বেশি স্থায়ী হয়ে যায়।”
ইরা আর কিছু বলতে পারলো না। কারণ তার অন্তরের গভীরে কোথাও সে নিজেও জানে। সম্পর্কটা ভুল হোক কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত, তবুও এর অস্তিত্ব অস্বীকার করার ক্ষমতা তাদের কারোরই নেই। ইরা কিছু বলতে যাচ্ছে, তবে শব্দগুচ্ছ গুলো কেমন জানি নিজের ভিতরই বিলিন হয়ে যাচ্ছে। হাসফাঁস লাগছে তার।
“চুপ করে থাকাটা কি স্বীকারোক্তির সমান ধরে নেবো মিসেস ইরা?”
ইরা খিঁচিয়ে নেত্রজোড়া বন্ধ করে নিলো ধীরে শ্বাস টেনে নিলো বড় একটা, নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণে আনার এক ব্যর্থ প্রয়াস।
“ সব সত্য উচ্চারণ করার প্রয়োজন হয় না, কিছু সত্য অস্বীকার করলেই বাঁচা সহজ হয়।”
“সহজ?”
শ্রাবণের ঠোঁটে এক ক্ষীণ, তাচ্ছিল্যভরা রেখা ফুটে উঠলো।
“তাহলে আপনি সহজ পথটাই বেছে নিচ্ছেন? দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সেই সুপরিচিত পন্থা?”
ইরার চোখে মুহূর্তেই দপ করে জ্বলে উঠলো এক চেপে রাখা ক্ষোভ।
“দায়িত্ব?” – তার কণ্ঠ এবার আর নরম থাকলো না, বরং ধারালো হয়ে উঠলো প্রতিটি শব্দ।
“একটা আকস্মিক, অপ্রস্তুত, অবিবেচিত সিদ্ধান্তকে আপনি দায়িত্বের অভিধানে ফেলছেন? যেটার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না?”
শ্রাবণ কয়েক সেকেন্ড নীরব রইলো। কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর শ্রাবণ ধীর,গম্ভীট স্বরে বলে-
“প্রস্তুতি না থাকলেই কি বাস্তবতা অস্বীকার করা যায়? আপনি হয়তো যেটাকে ভুল বলছেন। কিন্তু আইন, সমাজ সবকিছু সেটাকে অন্য নামে চেনে, ইরা।”
ইরা হালকা মাথা নাড়লো, যেন এই যুক্তি সে বহুবার নিজের মধ্যেই খণ্ডন করেছে। একটা তিক্ত হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে।
“যে সমাজের কাছে আমরা এখনো অপরিচিত, তাদের স্বীকৃতি বা অস্বীকৃতির কি মূল্য আছে এখানে? আমার পরিবার জানে না, আপনার পরিবার জানে না তাহলে এই সম্পর্কের অস্তিত্বটাই কোথায়?”
শ্রাবণ এবার এক ধাপ এগিয়ে এলো, টেবিলের উপর তার বলিষ্ঠ হাতখানা বেশ জোরেই রাখলো। সে এতটাই কাছাকাছি যে ইরার শ্বাসপ্রশ্বাসের সূক্ষ্ম ওঠানামাও অনুভব করতে পারছে।
“ তাহলে আপনার বিয়ে হবে নাকি হবে সেটা আমাকে কেনো জানাচ্ছেন? হু অ্যাম আই টু ইউ দ্যাট ইউ আর টেলিং মি অল দিস? অ্যান্ড দ্যাট টু আফটার সো লং।”
ইরা চোখ নামিয়ে নিলো। তার আঙুলগুলো অস্থিরভাবে জড়িয়ে আছে একে অপরের সঙ্গে, যেন নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বকে বেঁধে রাখতে চাইছে। অতি নিকটে আসা শ্রাবণকে এখন প্রচন্ড ভয়ানক লাগছে তার নিকট। ফর্সা মুখশ্রী কেমন ক্রোধে লালচে বর্ণ ধারণ করেছে।
“ জানি না!”
শব্দগুলো খুবই নিচু স্বরে বের হলো, আবারও ধীর নিচু ভীতু স্বরে বলে-
“আমি এই অনিশ্চয়তার মধ্যে বাঁচতে পারবো না, শ্রাবণ। বাড়িতে প্রতিদিন নতুন নতুন প্রস্তাব আসছে। প্রত্যাশার বোঝা দিন দিন ভারী হচ্ছে। আমি আর পালিয়ে বেড়াতে পারছি না।”
শ্রাবণের দৃষ্টি কঠিন হয়ে উঠলো।
“তাহলে আপনি কি চান ইরা?”
ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। এই নীরবতার প্রতিটি সেকেন্ড যেন অসীম দীর্ঘ হয়ে উঠছিলো। অবশেষে সে ধীরে মুখ তুলে তাকালো-
“আ..আমি চাই… আপনি কিছু বলুন।”
“কি বলবো?”
শ্রাবণের স্বর এবার নিম্ন, গভীর অন্তর্নিহিত চাপা বিস্ফোরণের পূর্বাভাস যেন। নিজের জায়গায় ভাবশীল ভাবে বসে পরে শ্রাবণ, তার তীর্যক দৃষ্টি সামনে শাড়ি পরিহিত ইরার উপর নিবন্ধন। ইরা ঠোঁট কামড়ে ধরলো, তারপর ধীরে, স্পষ্ট বললো-
“এই সম্পর্কটা রাখার মতো কোনো কারণ আছে কিনা… সেটা জানতে চাই।”
শ্রাবণ শান্ত নদীর মত ইরার অস্থিরতায় ভরা মুখপানে চেয়ে রইলো অবলীলায়। শ্রাবণ ইরার মুখপানে চেয়ে থেকে সাবলীল ভাবে বলে ওঠে-
“ কারণ থাকলে কি এই অস্তিত্বহীন সম্পর্কের নাম হবে সমাজে? আপনি শুরুতেই বলেছেন ইরা,আপনি এই সম্পর্ক মানেন না। তাহলে আজ এত অস্থিরতা কেনো এই অস্তিত্বহীন সম্পর্ক নিয়ে?”
বার বার ‘ অস্তিত্বহীন সম্পর্ক’ শব্দটা শুনতে শুনতে ইরার কর্ণকুহর কেমন জ্বালা ধরে গেলো। মস্তিষ্কের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বে অন্তস্থলে জ্বলতে থাকা, জ্বলন্ত প্রদীপের মত এক দাবানল মুখ ফসকিয়ে উচ্চারণ করালো-
“ আপনি আমার স্বামী শ্রাবণ। তখন যাই বলি না কেনো বিয়েটা তো মিথ্যে হয়ে যাবে না আমাদের। আর আপনিও জানেন স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায়, অন্যত্রের বিয়ে করা হারাম। আপনি কিছু কেনো করছেন না?”
“ আমার কি কিছু করার কথা ইরা?”
নির্লিপ্ত স্বরে বলে ওঠে শ্রাবণ। ইরা যেনো কেঁদে দিবে প্রায়, অশ্রু এসে হানা দিয়েছে তার নেত্রকোণে। ঠোঁট কামড়ে সেটা আটকানো চেষ্টা করলো। শ্রাবণ ইরার অশ্রুসিক্ত চোখে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে-
“ কাঁদছেন কেনো ইরা? আপনিই তো চেয়েছিলেন এই সম্পর্কের ইতি টানতে। অজানা হয়ে থাকতে, তাহলে আজকে আপনার চোখের অশ্রু আসার কারণটা কি?”
“ আপনি কিছু করবেন না তাহলে? ঠিক আছে আমিও তাহলে বিয়ে করে নিবো, কিন্তু আপনি কোনোদিন বিয়ে করতে পারবেন না। যদি করেন আমি কোর্টে আপনার নামে কেস করবো।”
অশ্রুসিক্ত কাজলদিঘী নেত্রজোড়া শ্রাবণের দিকে চেয়ে কথাগুলো ভীষণ অভিমান নিয়ে। শ্রাবণ চেয়ে রইলো কাজলদিঘী আঁখিপল্লবের দিকে, আঁখি জোড়া তাকে জানান দিচ্ছে সামনে বসা রমণী তার উপর ভীষণ অভিমান জমিয়ে কথাগুলো কথাগুলো বলছে। কিন্তু তার উপর এত অভিমানী জমানোর কারণ খুঁজে পেলো না, কতটুকুই চেনে তারা নিজেদের। একরাত! হ্যাঁ একরাত অব্দিই তাদের চেনা-জানার হালখাতা তাদের। তবুও এই রমণীকে দেখে মনে হচ্ছে, সামনে বসা শ্রাবণকে সে কত জনম ধরে চেনে। শত বছরের মান-অভিমানের সম্পর্ক তাদের। শ্রাবণ ওষ্ঠপুট অদ্ভুত ভাবে হালকা বাঁকা একখানা হাসির রেখা ফুটে উঠলো।
“ বিয়ে নাহয় করলাম না, তাহলে আপনার সঙ্গেই পরকীয়াটা শুরু করবো কি বলেন? যেহেতু বিয়ে করাতে কেস খেতে হবে, এরচেয়ে ভালো প্রেমিকা নিয়ে বাকি জীবনটা কাটাবো।”
ইরা যেনো আরও ক্রোধে ফেঁপে উঠলো। ফর্সা মুখশ্রীতে শোভা পাচ্ছে লাল রঞ্জক। হাত দ্বারা ভিজে ওঠা নেত্রকোণ মুছে নিয়ে বলে-
“ সেটাও করতে পারবেন না। পরনারী নিষিদ্ধ আপনার জন্য। থাকুন, আমি বিয়ে করে হানিমুনে যেয়ে ভিডিও কল দিবো।”
কথাটুকু শেষ করা মাত্রই অতি তেজ নিয়ে উঠে গেলো ইরা। পরে রইলো শ্রাবণ, কি সাংঘাতিক মেয়ে তাকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। তাও আবার হানিমুনের মত বিষয় নিয়ে, শ্রাবণের ওষ্ঠপুটের হাসির রেখাটা আরি চওড়া হলো। শাড়ি পরিহিত এক শিল্পের হাতে আঁকা নিপুণ সৌন্দর্যে ঘেরা নারীর যাওয়ার পানে চেয়ে রইলো অত দূর অব্দি দেখা গেলো।
গোধূলির নিঃশব্দ অবক্ষয়ে আলো আর আঁধারের মধ্যবর্তী এক অনির্ধারিত সীমারেখা। পক্ষিরাজরা নীড়ের পথে। সিকদার বাড়িটা খানিকটা নিরিবিলি জায়গায়, যার ফলে আশেপাশের কোনো প্রকার গাড়ি কিংবা অন্যকিছুর শব্দ কমই শোনা যায়। বাড়ি থেকে কিছুটা দূট হাঁটলে সুবিশাল এক মাঠের মত খোলা জায়গা। সেখানটায় দাঁড়িয়ে আছে দু’জন রৌদ্রিক এবং তূর্ণা। পৃথিবী যেন ওই ক্ষণিক বিরতিতে নিঃশ্বাস আটকে রেখেছে, আর এই থমকে থাকা সময়ের ভাঁজে জমাট বেঁধে ছিল এক অজ্ঞেয় সম্পর্কের অপ্রকাশিত ব্যঞ্জনা। তূর্ণা মাটিতে বসে আছে, দু’হাত দিয়ে শুকনো ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে অদ্ভুত এক নিষ্ঠায় সাজাচ্ছে। রৌদ্রিকের নিকট হঠাৎ বায়না তার বাহিরে যাবে, তাই সেই আবদার রাখতেই বাহিরে আসা তাদের। দুপুরেই বাড়িতে ফিরে এসেছে সে। পুরোটা সময় রোদেলা আর তূর্ণার সঙ্গেই কেটেছে। আগে তার অবসর সময়ের সঙ্গী ছিল রোদেলা, আর এখন আর একজন যোগ হয়ে দু’জন হয়ে গেছে।
তূর্ণার চোখে সেই চিরচেনা অস্থিরতা কখনো শিশুসুলভ, কখনো সম্পূর্ণ অপরিচিত এক জগতের বাসিন্দা যেন। হঠাৎই সে মাথা তুলে তাকালো রৌদ্রিকের দিকে। এমন এক দৃষ্টিতে, যেখানে প্রশ্ন নেই, তবু উত্তর খোঁজার অদম্য তৃষ্ণা আছে। রৌদ্রিক দাঁড়িয়ে ছিল তার থেকে কিছুটা দূরে, এক নিঃস্পৃহ নির্লিপ্ততার আবরণে নিজেকে মুড়ে। তার মুখাবয়বে কোনো আবেগের রেখা স্পষ্ট নয়; যেন অনুভূতিগুলো বহু পূর্বেই নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। তবু, তূর্ণার দিকে তাকালে তার দৃষ্টি অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে আসে, যদিও সে নিজেই তা উপলব্ধি করতে অক্ষম।
“দেখো…” – ‘ তূর্ণা হঠাৎ হাত বাড়িয়ে বলল, শিশুর মতো উচ্ছ্বাসে ভরা কণ্ঠে বলে-
“আমি একটা ঘর বানিয়েছি।”
তার ছিঁড়ে রাখা ঘাসের টুকরোগুলো জোড়া দিয়ে বানানো সেই অদ্ভুত কাঠামোর দিকে রৌদ্রিক কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। কোনো অর্থ নেই, কোনো গঠনগত শৃঙ্খলা নেই তবু তূর্ণার চোখে সেটাই যেন এক পরিপূর্ণ পৃথিবী। রৌদ্রিক ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তার পাশে। তার আঙুলগুলো সামান্য এগিয়ে এসে ছুঁয়ে দিল সেই ভঙ্গুর ‘ঘর’-এর প্রান্ত। তূর্ণা অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠছে, আগের থেকে আরও অনেকটা বুঝদার হয়ে উঠেছে। তবে সম্পূর্ণ নিয়ামক হওয়ার মত নয় কিছু জিনিস। তেমনটা তূর্ণারও সে আর পাঁচটা মানুষের মত জীবন-যাপন করতে পারলেও। সম্পূর্ণ আর পাঁচটা মানুষের মত হয়ে যাবে না। তবে যতটুকুই হোক রৌদ্রিক এতেই খুশি। তূর্ণার রৌদ্রিক শান্ত ঊর্মিমালার মত হয়ে আছে, তূর্ণা সেদিকে তাকিয়ে বলে ওঠে-
“ আপনাকে আমার ভীষণ পছন্দ বর।”
এই একটিমাত্র বাক্য যেন কোথাও গিয়ে আঘাত করল রৌদ্রিকের অন্তরের গভীরতম স্তরে। যেখানে সে নিজেও কখনো প্রবেশ করেনি। এক অদ্ভুত নীরবতা তাকে গ্রাস করল। তার যুক্তিবাদী মন এই বাক্যের অর্থ খুঁজে পেতে ব্যর্থ হলো, কিন্তু তার ভেতরের অচেনা কোনো অংশ নিঃশব্দে কেঁপে উঠল। তূর্ণা ধীরে ধীরে তার হাত বাড়িয়ে রৌদ্রিকের আঙুল চেপে ধরল। স্পর্শটি ছিল নিখাদ, অপ্রশ্নিত,কোনো হিসেব-নিকেশহীন যেন সে এই মানুষটিকে নিজের জগতের একমাত্র নির্ভরতা হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে বহু আগেই। রৌদ্রিক চমকাল না, হাত সরিয়েও নিল না। বরং এক অদ্ভুত দ্বিধায় স্থির হয়ে রইল। তার ভেতরে কোনো ভালোবাসা নেই, সে জানে। অন্তত সে তাই বিশ্বাস করে এসেছে। কিন্তু তূর্ণার এই অগোছালো নির্ভরতায়, এই অকারণ বিশ্বাসে, তার কঠিন সত্তার গায়ে কোথাও এক সূক্ষ্ম ফাটল ধরছে। যা সে প্রতিনিয়তই অস্বীকার করতে চায়, কিন্তু পারছে না।
গোধূলির লগ্নের সময় এক নির্মল দমকা হওয়া এসে সবকিছু কিন্তু শীতলতায় ভড়িয়ে দিলো। হয়তো তারা চাইছে দু’টি মানব মন কাছে আসুক, সরে যাক এক অদৃশ্য এক দূরত্বের মায়াজ্বাল। প্রকৃতির এই নির্মল হওয়ায় তূর্ণার এলোমেলো চুলগুলো উড়ে এসে ছুঁয়ে গেল রৌদ্রিকের গাল। সে অবচেতনভাবে হাত বাড়িয়ে চুলগুলো সরিয়ে দিল। স্পর্শটি ছিল অত্যন্ত সতর্ক, যেন সে সামনে থাকা অতি কোমল সত্তাকে আঘাত করতে ভয় পাচ্ছে। তূর্ণা মৃদু হেসে উঠল; একটা অদ্ভুত, নির্ভার, অথচ গভীর হাসি যেখানে কোনো জটিলতা নেই, শুধু আছে অনুভবের সরল স্বীকৃতি।
অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২০
রৌদ্রিক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেই হাসির দিকে,জীবনের পথ চলা অনেকটাই বাকি তার। তার না হলেও তূর্ণার পথচলার পথ অনেকটাই দীর্ঘ। তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে কি না সেটাও জানা নেই। সম্পর্কটার সূচনাতেই দায়িত্ব নামক বাক্য দিয়েই শুরু। এর উপসংহার কেমন হওয়া উচিৎ জানা নেই তার, সীমাহীন অনুভূতির পাহাড় থাকলেও সে সেটা প্রকাশে বরাবরই ব্যর্থ। তার ভালোবাসা মানেই নীরবতা। আর নীরবতার ভাষা সকলেই বুঝতে সক্ষম হয় না। সে না চাইতেও, না বুঝেও, এই অদ্ভুত সম্পর্কের ভেতরে জড়িয়ে পড়ছে ধীরে ধীরে, অনিবার্যভাবে।
