Home অবেলার প্রণয়ভেলা অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩০

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩০

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩০
ফাহিমা ইসলাম

প্রভাত আজ নিঃশব্দ প্রশান্তির এক ধূসর-সোনালি চাদরে আচ্ছাদিত। আকাশের বিস্তীর্ণ নীলিমার উপর ভাসমান মেঘমালাগুলো। যেন রাত্রির শেষ প্রহরের অলস স্মৃতিগুলোকে বুকে নিয়ে ধীরে ধীরে গমন করছে অজানার দিকে। পূর্বাকাশে উদীয়মান দিবাকরের কোমল আভা জানালার স্বচ্ছ কাঁচ ভেদ করে নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়েছে কক্ষের অভ্যন্তরে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে সিক্ত মাটির গন্ধ, তার সঙ্গে মিশ্রিত রাতের অবশিষ্ট রজনীগন্ধার মৃদু সৌরভ। সিকদার বাড়ির বিশাল প্রাসাদোপম অন্দরমহলও আজ তুলনামূলক নিরব। গত রাতের বিয়ের উচ্ছ্বাস, হাস্যরোল, গানের সুর, সবকিছু যেন ক্লান্ত হয়ে নিস্তব্ধতার কোলে আশ্রয় নিয়েছে। অথচ সেই নিস্তব্ধতার মাঝেও একটি কক্ষে নিঃশব্দে জেগে আছে এক কোমল অনুভূতির রেশ।
বিছানার একপ্রান্তে বসে আছে তূর্ণা।

খোলা জানালা দিয়ে আসা বাতাস তার এলোমেলো চুলগুলোকে বারবার উড়িয়ে দিচ্ছে। পরনে হালকা সাদা রঙের নরম পোশাক, পায়ের পাতায় সোনালী নূপুর জোড়া। আঙুলের ডগা দিয়ে আপনমনে নূপুরের ক্ষুদ্র ঘণ্টিগুলো স্পর্শ করছে সে। আর সেই স্পর্শে টুংটাং শব্দ উঠলেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠছে অদ্ভুত এক মুগ্ধকর হাসি! রাত্রির স্মৃতিগুলো বারবার ভেসে উঠছে তার মস্তিষ্কে।
“ মা…”
অস্পষ্ট, আধোঘুমে জড়ানো ছোট্ট কণ্ঠস্বর কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো তূর্ণা। পাশে শুয়ে থাকা ছোট্ট রোদেলা চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসেছে। এলোমেলো চুল, গোলগাল মুখ আর আঁধোঘুমে ঝাপসা চোখ নিয়ে তাকে ঠিক ক্ষুদ্র এক তুলতুলে পাখির ছানার মতো লাগছে। রোদেলা কিছুক্ষণ মিটমিট করে তাকিয়ে রইলো তূর্ণার মুখের দিকে। তারপর হঠাৎ করেই দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটে উঠলো তার অধরজুড়ে।

“ তুনি হাসতেছো কেন্নো?”
তূর্ণা চমকে উঠে ঠোঁট চেপে ফেললো।
“ কই? আমি হাসছি না।”
রোদেলা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লো প্রবল আপত্তিতে।
“ হুহ! হাসতেছো তো! পাপার উপল লাগ ভেংগে গ্যাছে?”
শেষ কথাটা অস্পষ্ট উচ্চারণে বলেই সে খিলখিল করে হেসে উঠলো। তূর্ণার কান লাল হয়ে উঠলো সঙ্গে সঙ্গে।
“ কে বলেছে?”
“ আনি জানি।”
“ তুমি কিছুই জানো না।”
রোদেলা এবার হামাগুড়ি দিয়ে কাছে এসে তূর্ণার পায়ের নূপুরে হাত দিলো। টুং করে শব্দ উঠতেই তার চোখ গোল হয়ে গেলো।

“ এইতা পাপা দিয়েতে না?”
তূর্ণা দ্রুত পা সরিয়ে নিলো।
“ না।”
“ মিতা।”
শিশুসুলভ দৃঢ়তায় বলা কথাটাতে তূর্ণা নিজেও হেসে ফেললো। রোদেলা সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ীর মতো দুই হাত কোমরে দিয়ে বসলো।
“ আনি সব্ব জানি। “ পাপা কি হামি দিয়েতে তুমায়? লাগ করলে পাপা আনাকেও হামি দেয়। তুনিও হামি দিয়েছে তো মা?
তূর্ণার চোখ লজ্জায়,বিস্ময়ে বড় হয়ে গেলো। কোনো রকমে নিজেকে সামলে বলে-
“ এ..এমন কিছু না, তুমি পঁচা হয়ে যাচ্ছো কিন্তু পুতুল। এত কিছু জানতে হয় না।
রোদেলা গর্বভরে মাথা দোলালো।

“ হুম! আনি সব্ব জানি।
এরপর হঠাৎ সে তূর্ণার গলা জড়িয়ে ধরলো।
“ তুনি আর পাপার সাতে লাগ কইর না। তাহলে পাপালও মন খালাপ হয়ে যাবে।”
কথাগুলো এতটাই সরল, এতটাই নিষ্পাপ ছিল যে তূর্ণার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কোমল ব্যথা অনুভূত হলো। শিশুরা বোধহয় সবচেয়ে নিখুঁতভাবে অনুভূতির পরিবর্তন বুঝতে পারে। তূর্ণা আলতো করে রোদেলার নাকে চাপ দিলো।
“ আচ্ছা, আর রাগ করবো না।”
“ প্রমিছ?”
“ প্রমিস।”
রোদেলা সঙ্গে সঙ্গে উচ্ছ্বসিত হয়ে বিছানার উপর দাঁড়িয়ে পড়লো। তারপর হঠাৎ নূপুরের শব্দ নকল করতে গিয়ে নিজেই পা দাপাতে শুরু করলো।
“ টুং টাং টুং টাং!”

তূর্ণা এবার হেসে ফেললো জোরে। বহুদিন পর তার হাসিটা এত স্বতঃস্ফূর্ত লাগছে। সেই হাসির শব্দে পুরো কক্ষ যেন প্রাণ ফিরে পেলো। ঠিক তখনই দরজার পাশে নিঃশব্দে এসে দাঁড়ালো রৌদ্রিক। কয়েক মুহূর্ত নীরবে তাকিয়ে রইলো সে সামনের দিকে। এইদিকে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে নাচছে রোদেলা, অন্যদিকে সেই দৃশ্য দেখে প্রাণ খুলে হাসছে তূর্ণা। এই দৃশ্যটা যেন তার দীর্ঘ ক্লান্ত জীবনের সবচেয়ে প্রশান্তিময় দৃশ্যগুলোর একটি।
আর তূর্ণার পায়ের নূপুর জোড়া তখনো মৃদুস্বরে বেজে চলেছে।।যেন রাত্রির সমস্ত অভিমান ভেঙে জন্ম নেওয়া নতুন এক অনুভূতির নীরব সংগীত।
“ মা মেয়ে কি নিয়ে এত খুশি?”
রৌদ্রিকের কথা শোনা মাত্রই রোদেলা আস্তে করে বিছানা থেকে নেমে রৌদ্রিকের কাছে যেতেই। রৌদ্রিক মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে আদরে ভড়িয়ে দিলল। রোদেলা হাসতে হাসতে রৌদ্রিকের গ্রীবাদেশ জড়িয়ে বলে-
“ মাল লাগ ভেনে গেতে। তুনি হামি দিয়েতো তো পাপা?”
“ তুমি তোমার মত তোমার মাও এখন অভিমান করা শিখে গেছে। তাই ভাঙাতে তো হবেই!”
“ আতকে কিন্ত ততলেট খাবু, তিতকেত, ডেইলি মিল্ক, সিকাল সব খাবু।”
রৌদ্রিক ঘোর বিরোধিতা করে বলে-

“ এতগুলো না, সবগুলোর একটা একটা করে পাবে। এতগুলো একসঙ্গে খেলে দাঁতে পোকা ধরবে। তারপর রোদেলার কাছে কেউ আসবে না।”
রৌদ্রিকের কথা শুনে রোদেলা নাক ছিটকালো। তারপর অভিমানী কণ্ঠে বলে-
“ পুতাকে না কলে দাও আসতে। তোদেলা এত্তই খাই বেতি!”
“ পোকা তো আমার কথা শোনে না। সে তো চায় রোদেলার দাঁতে হামলা করতে, যাতে কেউ রোদেলার কাছে না আসতে পারে। তুমি কি চাও তোমার দাঁতে দুষ্টু পোকা বাসা বানাক?”
“ ইইই! না! না এতদম না! তোদেলা এতদমই তায় বা পুতা!”
” এই তো গুড গার্ল। আসো পাপা ব্রাশ করিয়ে দেই তাড়াতাড়ি।”

তিনমাস পর-
সময়, এই ক্ষণস্থায়ী অথচ চিরন্তন সত্তাটি বড় বিচিত্র। কখনো সে বসন্তের মৃদুমন্দ সমীরণের ন্যায় জীবনে প্রশান্তি বয়ে আনে। আবার কখনো শ্রাবণের কৃষ্ণমেঘ হয়ে মানুষের অস্তিত্বজুড়ে বিষণ্নতার অতল ছায়া বিস্তার করে দেয়। সময়ের নিজস্ব কোনো হৃদয় নেই, তবুও সে মানুষের হৃদয় নিয়েই সবচেয়ে নিষ্ঠুর খেলা খেলতে পছন্দ করে। এক মুহূর্তে যে মানুষটির হাসি সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করতো, পরমুহূর্তেই সময় তাকে কেড়ে নিয়ে চারপাশ নিস্তব্ধ করে দিতে পারে। আবার কখনো দীর্ঘ অন্ধকার শেষে সেই সময়ই কোনো বিধ্বস্ত আত্মার জীবনে পুনরায় আলো ফিরিয়ে আনে।মানবজীবন মূলত সময়েরই নির্মম রসিকতা।কিছু ক্ষত সময় গভীর করে, কিছু ক্ষত আবার সময়ের পরশেই শুকিয়ে যায়। কিছু মানুষ সময়ের সঙ্গে বদলে যায়, আর কিছু মানুষ,অদ্ভুতভাবে সময়ের কাছেই নিজেদের হারিয়ে ফেলি।তূর্ণা ঠিক তেমনই এক হারিয়ে যাওয়া আত্মা ছিল।এ কটা সময় ছিল, যখন তার দৃষ্টিতে বাস্তবতা আর বিভ্রমের মাঝখানের পার্থক্যটুকুও অস্পষ্ট হয়ে যেত। রাতের অন্ধকারে হঠাৎ আতঙ্কিত হয়ে উঠতো সে, অকারণে কেঁদে ফেলতো, কিংবা নিজের ভেতরেই গুটিয়ে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিশ্চুপ বসে থাকতো। তার চারপাশের পৃথিবীটা ছিল ছিন্নভিন্ন কাঁচের মতো,যেখানে প্রতিটি স্মৃতি তাকে রক্তাক্ত করতো। আপন বলতে কেউই আশ্রয় দেয়নি তাকে, আপন মানুষ থেকে আপন ছিল না তার কিন্তু সময়, ধীরে, অতি সূক্ষ্মভাবে তাকে বদলে দিয়েছে। সম্পূর্ণ সুস্থতা হয়তো এখনো তার নাগালের বহু দূরে, যা আল্লাহর তরফ থেকে নিয়ে আসা সেটা চাইলেই মানুষেরা বদলাতে পারে। শুধু পারে তাকে স্বাভাবিক করতে, নতুন করে বাঁচতে শিখাতে। সে আর এখন আগের মতো ভেঙেচুরে অবহেলায় পড়ে থাকা মেয়ে নয়। এখন তার চোখে মাঝেমধ্যে শিশুসুলভ উজ্জ্বলতা ফুটে ওঠে, কখনো হালকা অভিমানী হয়ে ওঠে, কখনো কিংবা কারণবিহীন হাসিতে মেতে ওঠে। সে এখনো মাঝরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে কেঁপে ওঠে, কিন্তু আগের মতো আর একা নয় সে, তার জীবনে তাকে আগলে রাখার মানুষ হয়েছে। সে যতবার নিজেকে অন্ধকারে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, ততোবার অন্ধকারের মাঝে, ঠিক তার পাশেই কেউ একজন নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। রৌদ্রিক!

মানুষটা অদ্ভুত। ভালোবাসার প্রকাশ সে জানে না, অথচ যত্ন নিতে জানে নিখুঁতভাবে। অনুভূতি ব্যক্ত করতে পারে না, অথচ প্রতিটি ক্ষুদ্র বিষয়ে তার অদৃশ্য উপস্থিতি অনুভব করা যায়। আজকের সকালটাও তেমনই এক নরম প্রশান্তিতে মোড়ানো। ঠান্ডার এই আবহাওয়ায়, বাগানের একসাইডে দাঁড়িয়ে আছে তূর্ণা। সকালের সোনালি আলো এসে পড়েছে তার মুখাবয়বে। খোলা চুলগুলো হালাকা বাতাসে এলোমেলো হয়ে উড়ছে। দূরে বাগানের মাঝখানে ছোট্ট রোদেলা প্রজাপতির পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছে। রোদেলার হাসির শব্দ পুরো বাগানজুড়ে এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে দিচ্ছে।তূর্ণা মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে রোদেলার দিকে। ঠিক তখনই তার কাঁধে আলতো এক শাল জড়িয়ে দিলো কেউ।চমকে পেছনে তাকাতেই রৌদ্রিককে দেখতে পেলো।

“ ঠান্ডা লাগবে।”
স্বাভাবিক, সংক্ষিপ্ত কণ্ঠ বলে ওঠে। যেন ব্যাপারটা খুব সাধারণ। অথচ তূর্ণা জানে, এই মানুষটা কখনো সরাসরি উদ্বেগ প্রকাশ করে না। যত্নগুলো সবসময় এমন নীরব হয়। তূর্ণা কিছুক্ষণ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর নিচু স্বরে বললো-
“ আপনি সবসময় এমন গম্ভীর থাকেন কেনো?”
রৌদ্রিক ভ্রু তুললো।
“ আমি গম্ভীর?”
“ হুম। মনে হয় পৃথিবীর সব গম্ভীরতা আপনার কাঁধে এসে বসেছে।”
রৌদ্রিক উত্তর দিলো না। কেবল দৃষ্টি সরিয়ে রোদেলার দিকে তাকালো। তার হাতে মাফলার আর হাতমোজা। রোদেলা ফুল ছিঁড়তে গিয়ে নিজেই ঘাসের উপর বসে পড়েছে। মুহূর্তেই রৌদ্রিক দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো তার দিকে।

“ রোদ।”
তার কণ্ঠে কঠোরতার চেয়ে উদ্বেগই বেশি ছিল।রোদেলা ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
“ আনি ফুল ধরতে গিয়েতিলাম।”
রৌদ্রিক হাঁটু গেড়ে বসে রোদেলার জামা থেকে মাটি ঝেড়ে দিতে দিতে, দেখলো কোথাও আঘাত পেয়েছে কিনা।
“ পড়ে গিয়ে ব্যথা পেলে কি হতো।”
“ পাইনি তো।”
“ পাওনি মানে পেতে না এমন না। এমন কাজ আর করবে না, তুমি ব্যথা পেলে পাপার কষ্ট হয় জানোনা।”
বলতে বলতে অতি যত্নে মেয়ের হাত পরিষ্কার করে দিয়ে, যত্ন নিয়ে হাত মোজা পরিয়ে দিতে থাকে। এমনিই শীতের সময়, তারউপর অল্পতেই রোদেলার ঠান্ডা লেগে যায়। রৌদ্রিক সুন্দর মত সবকিছু পরিয়ে দিতেই, রোদেলা বিড়াল ছানার মত গা ঘেঁষে মিশে গিয়ে বলে-
“ লাগ করেতো পাপা? তোদ অন্নেক সরি! আর করলবো না এমন।”
“ মনে থাকবে তো?”
“ না, একদমই থাকবে না।
কথাটা বলেই তূর্ণার ঠোঁটে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠলো। মানুষটা ঠিক এমনই। নিজের উদ্বেগকে সবসময় কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে রাখে।রোদেলা আচমকাই রৌদ্রিকের গলা জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে-
“ তোলে নাও পাপা।”

রৌদ্রিক কোনো বাক্য ব্যয় না করে মেয়েকে কোলে তুলে নিলো। রোদেলা কোলে উঠেই রৌদ্রিকের সারা মুখে অসংখ্য চুমুতে ভড়িয়ে দিতে লাগলো, রৌদ্রিক নীরবে সবটা উপভোগ করলো। তার রাগ ভাঙানোর জন্য রোদেলা এই কাজটা বরাবরই করে থাকে। যখনই দেখবে তার পাপা তার কারণে একটু মন খারাপ করেছে, তখনোই কোলে উঠে চুমু দিতে থাকবে। তূর্ণা শান্ত চোখে সবটা দেখছে, না চাইতেও হৃদয় বয়ে এক প্রশান্তি বয়ে গেলো তার। কেনো গেলো জানা নেই! হয়তো বাবা-মেয়ের এমন ভালোবাসা দেখে। এই রৌদ্রিক নামক গম্ভীর ব্যক্তিত্বের মানুষটা নিজের কন্যার সামনে সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে যায়। রোদেলা হঠাৎ তূর্ণার দিকে হাত বাড়িয়ে বললো-
“ মা, তুনি এখানো দাঁড়িয়ে আতো কেনো? আতো তালাতালি”

তূর্ণা ধীর পায়ে এগিয়ে আসতেই রোদেলা তূর্ণার গলাও একহাতে আঁকড়ে ধরে তাকেও একই ভাবে আদর করে দিলো। দূর থেকে জবা সিকদার আর রোমানা সিকদার দেখছিলেন সবটা, তারা আর সামনে এগোলেন না। তিনজনের এই সুন্দর মুহূর্তের মাঝে গিয়ে বাগার দেওয়ার মানে হয় না।
“ যাক আমাদের রৌদ্র এবার হয়তো শান্তির দেখা পাবে। তূর্ণার মতো মেয়ে দরকার ছিল রৌদ্রিকের জন্য, তাই হয়তো এতকিছু করিয়েছে আল্লাহ। তাই না আপা?
” হয়তো তাই, আল্লাহ উত্তম পরিকল্পনাকারী। তিনি যা চেয়েছেন সেটা সর্বোত্তম। চল, ওদের নাস্তাটা দিয়ে নেই। খেয়ে বের হবে আবার।”
বলেই দুই জা ভিতরে চলে গেলো। বাগানে রয়ে গেলো তিনটি হাসোজ্জল প্রাণ, যারা কিনা নিজেদের জগতে হারিয়ে আছে।

“চাঁদ উঠেছে, ফুল ফুটেছে,কদম তলায় কে?হাতি নাচছে, ঘোড়া নাচছে,সোনামণির বিয়ে…”
বড় স্কিনের রাইম ভিভিও চলছে আর সেটার তালে রোদেলাও গাইছে আর স্কিনের থাকা ভিডিওর মত নাচার ট্রায় করছে। পাশেই তূর্ণার বসে উৎসাহ দিচ্ছে তাকে। দু’জনেই জগৎ – সংসার ভুলে ভিডিও দেখায় ব্যস্ত। বাহিরে পরন্ত বিকেল, পক্ষীরাজরা নিজেদের নীড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে৷ শীতের সময় দিবাকাল বড্ড ছোট হয়ে আসে। চোখের পলকেই কেটে যায় সময়, হুট করেই পিছন থেকে গম্ভীর একজোড়া কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই তূর্ণা জমে যায়।
“ পড়া হয়েছে তো সব পড়াচোর বউ?”
তূর্ণা ভয়াতুর চোখে পিছনে ফিরতেই রৌদ্রিকের দরজার সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পায়। যেকিনা তাদের দু’জনের দিকেই তাকিয়ে আছে ভ্রু নাচিয়ে। তূর্ণা যেনো ফেঁসে গেছে, কোনো রকম হাসার চেষ্টা করে আমতা আমতা করে বলে ওঠে-

“ ইয়ে মানে! না মানে আপনি, এত তাড়াতাড়ি এলেন আজ।”
“ কেনো খুশি হওনি বুঝি তাড়াতাড়ি আসায়?”
“ বিষয়টা তেমন না বর।”
“ তাহলে বিষয়টা কেমন মিসেস রৌদ্রিক সিকদার?”
রৌদ্রিকের মিসেস রৌদ্রিক সিকদার ডাকটা কানে আসতেই কেমন দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম। তূর্ণা ফোঁস করে শ্বাস টেনে নিয়ে নিজেকে শান্ত রেখে,হাসার চেষ্টা করে বলে-
“ আ..আপনি কখন এসেছেন?”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ২৯ (২)

“ নাচানাচি দেখি ভালোই পারো। আগে তো দেখিনি, এখন থেকে পড়া না পারলে নিয়ম করে ১ ঘন্টা নিউ স্টাইলে নেচে দেখাবে আমায়। আর টাইম টেন মিনিট, আমি ফ্রেশ হয়ে এসে তোমার সিটি এক্সাম শুরু হবে। হান্ডেট মার্কের মধ্যে যদি ৮০ নিচে পাও, তাহলে পানিশমেন্টের সঙ্গে এক্সট্রা এক্সাম দিতে হবে।”
বলেই রৌদ্রিক চলে যায়, এইদিকে রোদেলা ফিক করে হেসে দেয়। রোদেলাকে হাসতে দেখে তূর্ণা অসহায় চোখে তাকিয়ে রোদেলাকে বলে-
“ তুমি মজা নিচ্ছো মায়ের পুতুল?”
“ ইইইই! না! আমি তো এমনি হাতলাম। দেখ আর হাতি নাই।”

অবেলার প্রণয়ভেলা পর্ব ৩১