obsession vs love part 20
নিরুর কল্পনারাজ্য
দরজার ওপারে ঝিলিককে দেখে খানিক ঘাবড়ালো রুশ ক্রিমিনাল সায়ান। হুট করে মনের কোণে ভয় জমলো–কিছু কী শুনে ফেললো মেয়েটা? নিজের সকল সংশয় একপাশে রেখে অতি বিচক্ষণতায় পরিস্থিতি সামলাতে সে শুধায়,
— ঝিলিক? তুমি এখানে?
ঝিলিক সায়নকে দেখে খানিকটা গম্ভীর স্বরে বলে,
— আম.. একটু ওদিকে আসবেন? কিচেনে যেনো কিছু একটা নড়চড় করছে। আপনার ঘর থেকে শব্দ পাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম আপনি জেগে!
সায়ন ভেতর থেকে শান্তি পেলো। কিছু শোনেনি। তবে ঝিলিকের বাচ্চামোতে সে হেসে ফেললো। বললো,
— আচ্ছা, চলো দেখি!
ঝিলিকের পিছু পিছু সায়ন কিছেনে গেলো ধীর কদমে। সারা বাড়ি তখন ঘুমে নিমগ্ন। কিচেনে পৌঁছামাত্রই সায়ন সামনে গিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে ঝিলিককে শুধায়,
— কোন স্পটে?
ঝিলিক হাত বাড়িয়ে আঙুল তুলে দেখায় সেই জায়গাটি। জানালার কাছাকাছি ওটা। সায়ন ওদিকে এগোয়। সত্যিকার অর্থেই ওখানে কিছু একটা নড়ছে। মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে যায় সে। সাবধানী এক সত্ত্বা আপনাআপনি বেরিয়ে আসে। এগিয়ে গিয়ে জানালার কপাটে হালকা ধাক্কা দিতেই একটা বিড়ালের দেখা মিলে। খাবারের খোঁজে এসেছিলো হয়তো বিড়ালটি। মানুষ দেখেই পালিয়ে গেলো। তা দেখে সায়ন হেসে পিছু ফিরে। বলে,
— সি, অনলি আ ক্যাট! নাথিং এলস।
ঝিলিক যেনো স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে৷ কী কে কী মনে করে বসেছিলো সে? ঝিলিক এবার মৃদু হেসে বলে,
— থ্যাঙ্কস, স্যার!
— ইটস মাই প্লেজার।
সায়ন সামনে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। ট্রাওজারের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বেশ কায়দা করে হাঁটে সে। কী মনে করে থেমে গিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে আবারও ঝিলিককে শুধোয়,
— বাই দ্যা ওয়ে, এতোরাতে এখানে?
ঝিলিক ফ্রিজ থেকে আইসক্রিম বের করতে করতে জবাব দেয়,
— নাথিং জাস্ট, ওয়ান্টেড টু ইট সামথিং।
সায়ন কিছু বলেনা। বক্র হেসে পা চালিয়ে এগিয়ে যায়। যেতে যেতে শীষ বাজিয়ে গুণগুণ করে যায় তার সেই অতি পছন্দের সুর!
~আলতো ছোঁয়ায় চোখেরই চাওয়ায়,
পাওয়া না পাওয়ার কী যে নেশা!
সেই স্মৃতিটাই আজও হাতরাই,
হারিয়ে ফেলা ভালোবাসা!
প্রভাতের নরম আলোয় ধরণী কেবলই নিজেকে অন্ধকার আবেশ হতে বিচ্ছিন্ন করেছে। সূর্যোদয় হয়েছে অনেকটা সময়। এখন সময় আনুমানিক আটটা। সকাল সকাল সকলেরই তাড়া থাকে। মির্জা পরিবারও ব্যতিক্রম নয়। সকাল সকাল আজ সকলেই একত্র হয়েছে ডাইনিং এ। ঝিলিক অবশ্য এখনো আসেনি। ততক্ষণে তিয়া-তোতা-নিড়ঝর আর ঐশী এসে বসেছে।প্রতিদিনকার মতোই সাঁঝ কিচেন সামলাচ্ছে মা-চাচীদের সাথে। ঐশী খানিক পরপরই আড়চোখে নির্ঝরের পানে তাকাচ্ছে। মুখখানা গম্ভীর। নির্ঝর তার তাকানো শুরুতে এড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে তার ঘনঘন তাকানোতে বিরক্তবোধ করে ক্ষীপ্র কণ্ঠে বলে বসে,
— এভাবে তাকাচ্ছিস কেনো বারবার? খাওয়ার সময় এমন নজর ফেলবিনা একদম।
ঐশীর ও কড়া বাক্য ভেসে আসে,
— আমি মোটেই নজর দিচ্ছিলাম। আর তোমার দিকে কেনো তাকিয়ে থাকবো আমি? গাণ্ডেপিণ্ডে গেলো তুমি, ওসব দেখার ইচ্ছে মোটেই নেই আমার!
নির্ঝরের ভ্রু কুঁচকে গেলো। তিয়া-তোতা কুটকুটে হেসে মজা নিচ্ছে তার। নির্ঝরের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। কপট রাগ দেখিয়ে আওড়ালোও,
— তোকে তো আমি পরে দেখে নিচ্ছি!
ঐশী কিছু বলেনা প্রত্যুত্তরে। ততক্ষণে ঝিলিক নামে। বাবা-চাচাদের টেবিলে উপস্থিত না দেখে শুধায়,
— বাবা কোথায় ছোট ভাইয়ু?
সাঁঝ রুটি ছেঁকে আনতে আনতে ঝিলিকের কথার জবাব দেয়,
— ওরা সবাই ব্রেকফাস্ট সেরে চলে গিয়েছে আগেই। তুই-ই সবার লেইট।
ঝিলিক গম্ভীর হয়ে গেলো। নিজেই নিজেকে একদফা ঝাড়লো। আজ তার অফিসে যাওয়ার কথা ছিলো। ইশ! চেয়ারে বসতে গিয়ে হঠাৎই অনাকাঙ্ক্ষিত এক জিনিসের পানে নজর গেলো তার। তা হলো– সাঁজের গলার পানে! ঝিলিকের চোখ-মুখ শক্ত হয়ে এলো মুহূর্তেই। সাঁজের গলায় কামড়ের দাগ। লালচে হয়ে আছে জায়গাটা একদম। ঝিলিক চোখ বুজে রইলো কিছুক্ষণ। নিজেকে শান্ত করে বলে উঠলো,
— আপু, খাবার দাও!
সাঁঝ হেসে ঝিলিককে পরোটা আর সাথে সেদ্ধ ডিম দিলো। নির্ঝর হঠাৎ বলে উঠলো,
— বড় আপু, একটু তো লাজ বাঁচিয়ে রাখো।
তিয়া-তোতা মুখ টিপে হেসে উঠলো। ঐশী অতসব খেয়াল না করায় বুঝতে পারলোনা কিসের কথা হচ্ছে। সাঁঝ নিজেও অবুঝের ন্যায় শুধায়,
— কী?
— ঘাড়ে ওটা কী হু? বুঝিনা ভেবেছো….?
সাঁঝ হঠাৎ লজ্জা পাওয়ার মতো করে হাসে। তাড়াহুড়ো করে চলে যায় ডাইনিং থেকে। ঝিলিক নির্বিকারে খাওয়া শেষ করে উঠে পড়ে। ঝিলিক ব্যতীত বাকি চারজনের একত্রে গাড়িতে করে যাওয়ার কথা আজ। ঝিলিক ব্যতিক্রমী হয়েই জিজ্ঞেস করে নির্ঝরকে,
— ছোট ভাইয়ু, তোমার বাইকের চাবিটা দাও তো!
নির্ঝরের ভ্রু দুখানি কুঁচকে ওঠে। বলে,
— চাবি? বাইকের চাবি দিয়ে তুই কী করবি?
— লাগবে, দাও না প্লিজ!
— না। একদমই না। এই অবস্থায় বাইক তো একদমই নয়।
ঝিলিক নাছোরবান্দা। কোনোরকমে আদায় করে নেশ বাইকের চাবি। বাকিরাও অবশ্য নিষেধ করে। তবে সে নিষেধের থোরা-ই ধার ধারে ঝিলিক? ঝিলিক তর্জনী আঙুলে চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে বেরিয়ে যায়। কেবল বলে যায়,
— মাকে বলে দিও ছোট ভাইয়ু যে আমি অফিসে যাচ্ছি। বাবার সাথে আমার অনেক আগেই কথা হয়েছে এ ব্যাপারে। তাই মাকে নিশ্চিন্ত থাকতে বলো।
নির্ঝর কেবল হা হয়ে তাকিয়ে থাকে ঝিলিকের কর্মকান্ডে। ঝিলিক বাইক চালাতে জানে আদৌ? কিছু হয়ে গেলে? ও তাড়াহুড়ো করে আইয়ুশকে ফোন দেয়। বলে,
— বড় ভাইয়ু, একটা কান্ড হয়েছে।
আইয়ুশ তখন পেপারে কিছু কাজ করছিলো। ফোনের অপরপাশ থেকে নির্ঝরের এমন কথায় সে থমকায়, শুধায়,
— কী হয়েছে?
— ঝিলিক বেরিয়ে গিয়েছে তাও আবার বাইক নিয়ে। আমার থেকে জোর করে চাবিটা নিয়ে নিলো।
— হোয়াট রাবিশ! তুই কী ছোট যে তোর থেকে জোর করে নিয়ে নিলো?
— ও নিয়ে নিলো…
— গর্দব, ফাস্ট গিয়ে ওকে ধর।
ঝিলিক বেসমেন্ট হতে তখন বাইকটা বের করেছে সবে। বিএমডব্লিউ! বাইকের লোগোটা ঝিলিকের কাছে এতো দারুণ লাগলো। বাইকে হাত বোলাতে বোলাতে তার মনে পড়ে গেলো কিছু স্মৃতি!
বাইক চালানো অবশ্য আইয়ুশ-ই ঝিলিককে একসময় শিখিয়েছিলো। ঝিলিক থমথমে মুখে বাইকের হ্যালমোটটা মাথায় বাধলো। সে বাইক স্টার্ট করতেই পেছনে নির্ঝর দৌড়ে এলো ডাকতে ডাকতে। ঝিলিক তা শুনলোনা। বাইক নিয়ে বেরিয়ে গেলো। নির্ঝর হাঁপাতে আরম্ভ করলো। এই মেয়েটা যে কী! সরাসরি আইয়ুশ কে ফোন দিয়ে জানালো সবটা।
হাইওয়ে তে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ঝিলিকের বাইক। এমন নয় যে তা অতিস্পিডে চলছে। প্রভাতের মৃদুমন্দ হায়ায় ঝিলিকের কালো বাইকটি নজরকাড়া ভঙ্গিতে এগিয়ে যাচ্ছে সকল যান্ত্রিক গাড়িকে পিছু ফেলে। মির্জা’স গ্রুপ হতে গুলশান অবশ্য বেশি দূরত্বে অবস্থান করেনা। বেশি হলে হয়তোবা ত্রিশ মিনিটের পথ। হাইওয়ে পেরিয়ে ঝিলিক সামনে এগিয়ে যেতে যেতে তীক্ষ্ণ চোখে। বাইকের ভেতরে থাকা হ্যাজেল রঙা মণিদুটোয় জ্বলন্ত অগ্নিপিন্ড। বারংবার সাঁঝের ঘাড়ে থাকা সেই লাভবাইটকের কথা মনস্পটে ভাসছে। ঝিলিক বাইকের এক্সিলারেটরে আরও জোর লাগিয়ে বাইকের স্পিড বাড়ায়। একই তেজে মনে মনে বিড়বিড় করে সে,
—Life is a game!
If you’r not a pro gamer then you be neglected by this world and jhilick mirja isn pro she is extra!
If you play game with me then I’ll teach you the tricks!
ঝিলিকের পিছু পিছু আরও একটি কার সমবেগে এগিয়ে আসছে। কারের মাঝে অবস্থানকারী কারও অস্তিত্ব বোঝা মুশকিল।
কিছুক্ষণের মাঝেই ঝিলিক এসে পৌঁছালো মির্জা’স গ্রুপের সামনে। ঝিলিক মাথা হতে হেলমেট খুলে অফিসের গেইটের সামনে থাকা নেইমপ্লেটের সামনে তাকালো একবার৷ তাকিয়েই অফিসে গেলো। ভেতরে গিয়ে রিসেপশনিস্টের কাছে ফ্লোর নম্বর জানতে চাইলো। কেননা অফিসটি আটতলা বিশিষ্ট। রিসেপশনিস্ট তাকে দেখে চিনলোনা। তাই শুরুতেই শুধালো,
— ম্যাম? হুম ডু ইউ ওয়ান্ট টু মিট উইথ? ডু ইউ হ্যাভ এনি ভিজিটিং কার্ড ফর মিট উইথ দ্যা মির্জাস?
ঝিলিক অবুঝে মাথা নাড়ে। ঠোঁট কামড়ে বলে,
— উম, হোয়াই শ্যুড আই? আই হ্যাভ দ্যা পাওয়ারফুল সারনেইম ইন হুল ঢাকা!
— স্যরি ম্যাম?
— ঝিলিক মির্জা। দ্যা ডটার অফ শাহদাদ মির্জা হু ইজ দ্যা মোস্ট পাওয়ারফুল শেয়ারহোল্ডার অফ মির্জা গ্রুপ!
রিসিপশনে থাকা মেয়েটি চমকিতে চোখ বড় করে ফেললো। হাসি হাসি মুখ মিইয়ে গেলো মুহূর্তেই। পরিবর্তে ভয়ার্ত স্বরে বললো,
— স্যরি, ম্যাম। এক্সট্রেমলি স্যরি। আমি জানতাম না।
ঝিলিক কেবল বলে,
— নো নিড।
ঝিলিকের মূল লক্ষ্য বর্তমানে টপ ফ্লোর। যেখানে মির্জা গ্রুপের স্পেশাল ফোর্স কাজ করে সাথে বাবা-চাচা সাথে আইয়ুশ ও সেখানেই। ঝিলিক যত কদম সামনে এগোচ্ছে তত কদমেই যেনো রশ্মির অবতরণ ঘটাচ্ছে। পরণে তার ফর্মাল পোশাক। কোট খুলে হাতে নিয়েছে। ওয়েস্ট কোট থাকায় ঝিলিকের রূপ অন্যদের কাছে অতি মোহনীয় লাগলো।।তার থেকেও দ্বিগুণে নজর কাড়লো তার গলায় এবং কানে থাকা কিছু পাথর। যেগুলো অতিরিক্ত মাত্রায় আলো ছড়াচ্ছে। ওগুলো ডায়মন্ডের! ঝিলিকের অবশ্যই সেসবে মনোযোগ এগিয়ে সে লিফটে গেলো। লিফটে উঠেই আট নম্বরে প্রেস করতেই কিছুক্ষণের মাঝে বিল্ডিংয়ের অষ্ট তলায় এসে উঠলো।
আইয়ুশ মনিটরে বসে এতক্ষণ সকলকিছু পর্যবেক্ষণ করছিলো। ফোনের সাথে অফিসের সিসিটিভি কানেক্টেড বিধায় অসুবিধে হলোনা। সামনেই তার পি এ রায়ান। রায়ান মনোযোগ দিয়ে তাকে দেখে যাচ্ছে। আইয়ুশ ওই ফোনে এতোটা ডুবে আছে যে কিছুক্ষণ আগের সাইন হওয়া দু’কোটি টাকার একটা প্রজেক্টে সে সাইনটুকু করতেও ভুলে গিয়েছে। এসব অবশ্য নিত্যনতুন নয়। আইয়ুশকে এভাবে অন্যমনষ্ক দেখে সে শুধালো,
— স্যার অফিসে এসে আপনি সর্বদা ফোনের কাছে পড়ে থাকেন কেনো? কী এতো দেখেন?
আইয়ুশ একদম ধীরে বিড়বিড় করে ঠোঁট নাড়লো কেবল,
— আমার দুনিয়াকে!
অবশ্য মুখে এসব বললো না। রুক্ষ স্বরে ধমকে বললো,
— মাইন্ড ইউর ওন বিজন্যাস!
আইয়ুশের রুক্ষতায় রায়ান ঘাবড়ে গিয়ে মাথা নত করলো। ভয়ে ভয়ে বললো,
— স্যরি স্যার।
— বলো, কোথায় সাইন করতে হবে!
রায়ান এগিয়ে এসে একটা ফাইল এগিয়ে দিলো আইয়ুশের পানে। আইয়ুশ তিক্ত আদলে তা সাইন করে কয়েক পাতা উল্টোতেই চক্ষু তার চড়কগাছ। সাথে রায়ানেরও। তাদের এ সপ্তাহের সবচেয়ে বড় এমাউন্টের ডিলের পেপারটা মিসিং। আইয়ুশ অবাক চোখে রায়ানের পানে তাকায়। গমগমে স্বরে শুধায়,
— হোয়াট দ্যা হ্যাক ইজ ইট? হোয়ার ইজ দ্যা মেইন পেপার?
রায়ান থতমত খায়। ক্যাভিনে পিনপতন নীরবতা। নীরবতা ভাঙিয়ে রায়ান জবাবে বলে,
— আ..আমি জানি না স্যার। আমি তো..আমি তো এখানেই…
— এখানে মানে? এখানে রাখলে কোথায় গেলো?
— স্যরি স্যার, হয়তো আমারই কোনো গাফিলতি হয়েছে। আমি খুঁজে দেখছি স্যার। কিন্তু আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি ফাইলটা দেখেই এনেছিলাম।
— তাহলে নিশ্চয় কাগজটারই ডানা ছিলো, তাই না মিস্টার রায়ান?
— স্যরি স্যার!
— ইউ আর ফায়ার্ড!
আকাশ থেকে পড়লো যেনো রায়ান। করুণ কন্ঠে বললো,
— স্যার প্লিজ, এমন করবেন না স্যার। প্লিজ!
— গেট আউট!
রায়ান কাঁদোকাঁদো হয়ে পড়ে। অথচ আইয়ুশ তেমনই নির্বিকার।
— স্যার আমি তাহলে আমার বউ বাচ্চাকে কী করে খাওয়াবো স্যার? দয়া করুন স্যার! এমন ভুল আর হবেনা।
— যে এতো বড় পেপার সামলে রাখতে অক্ষম তাকে মির্জা গ্রুপ কখনোই নিজেদের কোম্পানিতে রাখতে পারেনা। জাস্ট গেট আউট অফ মাই কেভিন।
অগত্যা নিরুপায় রায়ান বেরিয়ে যায়। কিছুদূর যেতেই তার ভাবভঙ্গি পাল্টে যায়। লিফটে উঠে বিড়বিড় করে,
— শিট ম্যান! এখন কী জবাব দিবো বসকে? এতো বড় মিস্টেইক কী করে হলো..
তাড়াহুড়োয় ফোন দেয় সে কাওকে। ফোন তুলতেই অনর্গল বলে যায় সবকিছু,
— বস! আমাকে মির্জা গ্রুপ হতে বের করে দেওয়া হয়েছে। এখন কী করবো?
ওপাশ থেকে গমগমে স্বর ভেসে আসে,
— হোয়াট! কিন্তু কেনো?
— একটা মিস্টেইক করে ফেলেছিলাম স্যার। মির্জাদের একটা ইম্পর্ট্যান্ট পেপার আমি হারিয়ে ফেলেছি। বোধহয় আজ সকালে তাড়াহুড়ো করে আসতে গিয়েই হারিয়েছে।
— ইউ বুলশিট!
— আ’ম স্যরি বস!
— গো টু দ্যা হেল। আই ডোন্ট লাইক দ্যা ফাকিং ওয়ার্ড। ইউ বাস্টার্ড!
অকথ্য ভাষায় অনবরত গালাগাল দিয়ে ফোন কাটে ওপাশের ব্যক্তিটি। ফোন কাট হতেই রায়ান বিড়বিড় করে,
— শালা, সাইকোর চামচা একটা। এখন আমাকেও দ্রুত শহর ছাড়তে হবে আদারওয়াইজ কখন আমাকেই মেরে দেয়!
ফোনের স্ক্রিনে এসব দেখে হাসতে হাসতে অজ্ঞান হবার যোগাড় হয় আইয়ুশের। স্ক্রিনের পানে নজর রেখেই সে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসির রেখা টেনে ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে মনে মনে বলে,
— If you are the game creator
Then I’m the game changer!
ঘুরি যতই আকাশে উড়ুক না কেনো;
পাবে তো সেই–লাঠাই যার হাতে!
গগনবিদারী চিৎকারে আশপাশ কেঁপে উঠছে। ঢাকা শহরের ছোট্টো এক গলির গোডাউনে হাতকাটা অবস্থায় পড়ে কাতরাচ্ছে এক বৃদ্ধ পুরুষ। সেই কাটা হাতের ওপর গাঢ় সালফিউরিক এসিড ঢেলে যাচ্ছে নির্দয়; পাষাণ পুরুষ এবং রুশ ক্রিমিনাল মনস্টার কিং। পাশেই নিকোলাস। নিকোলাস জেইন। এই মুহূর্তে সামনে নিচে পড়ে থাকা বৃদ্ধটি রাশেদ চৌধুরী। তিনি বারংবার অনুনয় করে যাচ্ছে,
— তুমি কী করছো এসব? আমাকে বাঁচতে দাও দয়া করে। আমাকে ছাড়া বাকি পথ তুমি কীভাবে এগোবে সায়ন? আমি তো তোমার বাবা…
বাকিটুকু শেষ করার আগেই সায়ন সম্পূর্ণ এসিড তার হাতে ঢেলে দেয়। ভেসে আসে রুশ ক্রিমিনালের কড়া শব্দগুচ্ছ, ঠোঁটে তার সিগারেট। নিকোটিনের কালো ধৌঁয়া আকাশে উড়িয়ে সে বিষাক্ত এবং শীতল কন্ঠে বলে,
— তুই পুরোটাই ভুল। আর ভুলকে এই এমকে বাঁচিয়ে রাখেনা।
বাম হাতের তর্জনীতে ইশারা করে এমকে বেরিয়ে যায় গোডাউন হতে। সে বেরোতেই একটি গাড়ি এসে তাকে আড়াল করে দাঁড়ায়। গাড়িটি ভ্যানিশ হওয়ার পরমুহূর্তেই এমকে তথা সায়নকেও আর দেখা যায়না।
গোডাউনের ভেতরে নিকোলাস নিজের বাকি কাজটুকু বুঝে নিতে কোমড়ে গুঁজে রাখা ছোটো গানটা বের করে। তাতে বুলেট ঢুকাতে ঢুকাতে হাস্যরসাত্মক কন্ঠে বলে,
— তোর মতো বুড়ো কে মেরে মজা পাচ্ছিনা। হাত ময়লা করছি কেবল! বাট আই লাভ টু শ্যুট। জানিস তো, তোর কপাল বরাবর দুটো; বুকে দুটো সাথে তোর পেটে দুটো শ্যুট করবো।
— না, দয়া করে…
রাশেদ চৌধুরী তার বাকি কথাগুলো শেষ করার আগেই গোডাউন জুড়ে কেঁপে উঠলো কোনো এক ভয়ঙ্কর শব্দ। অবশ্যই তা গুলির শব্দ। পরপর ছ’বার এই শব্দ সাথে এতক্ষণের চিৎকার করা ব্যক্তিটির নিথর রক্তাক্ত দেহ। রাশেদ চৌধুরীর রক্তাক্ত দেহ ছুটে এলো কিছুটা নিকোলাসে মুখে। তাতে গোডাউনের এক ফাঁকফোকরে চোখ যেতেই তার কপালে দু’টো ভাঁজ পড়লো। হিংস্রাত্মক হয়ে গলা ছাড়িয়ে হুমকি দিলো মাফিয়া লিডার নিকোলাস,
— হেই, হু ইজ দেয়্যার! কে ওখানে?
তিয়া ভার্সিটির ক্লাস না করে ঢাকা এক্সপ্লোর করতে বেরিয়েছিলো। এদিকটা নাকি ভূতের বাড়ি আছে। তাই ভেবেছিলো এক্সাইটিং কোনো অভিজ্ঞতা হবে। তবে এমন অভিজ্ঞতা হবে তা সে কখনোই ভাবেনি। চিৎকারে আওয়াজে এদিকটা আসাটা তার মোটেই উচিত হয়নি। এটা তো সেই ম্যাভিয়াস কেইভার। এমন বিভৎস খুন। তিয়া প্রাণপনে দৌড় দিলো। নিকোলাসের গ্যাংয়ের কিছু লোক সামনে। আর তিয়া উঁকি দিয়েছিকো পিছন দিক হতে। চিতার বাঘের ন্যায় নিকোলাস দৌড়ে বেরোলো গোডাউন থেকে। শুনশান সেই স্থানটি জনমানবশূন্য। নিকোলাস বেরিয়ে যেতে যেতে তীব্র হুংকার ছুড়লো গোডাউনের বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের,
— গোডাউনে আগুন জ্বালিয়ে দাও। প্যান্থ হাউসে গিয়ে আমার অপেক্ষা করো। আমার গাড়ি রেখে যাবে। দেয়্যার ইজ সামওয়ান আই নিড টু কিল!
বলেই নিকোলাস তিয়ার পিছু ছুটলো। তিয়া দৌড়াতে দৌড়াতে এক স্থানে এসে লুকিয়ে পড়লো। মুখে হাত চেপে বসে রইলো। কোনো এক জঙ্গলে ঢুকে পড়েছে হয়তো সে। ইশ! তোতাকে না বলে ক্যাম্পাস থেকে বেরোনো তার মোটেই উচিত হয়নি। জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ার ফলে বুকে ধুকপুকানি স্পষ্ট। কিছুক্ষণের মাঝেই নিকোলাস সেই জায়গায় এসে হাজির হলো,
— ভালোয় ভালোয় নিজেই বেরিয়ে এসো, মেয়ে!
নিকোলাস সেই স্থানটি তন্য তন্য করে খুঁজলো। তবু তিয়াকে পেলোনা। তিয়া নিঃশব্দে ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে রইলো। কিছুক্ষণের মাঝেই নিকোলাসের চলে যাওয়ার চব্দে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। মনে মনে আল্লাহকে শুকরিয়া জানালো। ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে নজর বুলিয়েও যখন নিকোলাসকে দেখতে পেলোনা ঠোঁটে খানিক হাসি ফুটলো। হাসিমুখে অন্যপাশে ফিরতেই অতিমাত্রায় শকড হলো। তার পেছনেই নীল নেত্রের সেই অধিক সুন্দর পুরুষটি দাঁড়িয়ে। রক্তাক্ত আদলে তাকে কোনো হিংস্র বাঘের চেয়ে কম কিছু লাগলোনা তিয়ার কাছে। তখনই নিকোলাসের ফিসফসানো স্বর ভেসে এলো তার কানে,
obsession vs love part 19 (2)
— ফাইনালি ফাউন্ড ইউ, লিটল র্যাবিট!
সঙ্গেই সঙ্গেই জ্ঞান হারালো তিয়া। বিরক্ত হলো নিকোলাস। এই মেয়ের মুখ খুব করে চেনাচেনা লাগছে। কোথাও তো একটা দেখেছে এই মেয়েকে সে।
