Home এক দেখায় এক দেখায় পর্ব ৩৮

এক দেখায় পর্ব ৩৮

এক দেখায় পর্ব ৩৮
সুরভী আক্তার

পরদিন ঠিক সকাল আটটা ।
রোজকার মতো আজও মাহি, জেরিন,আর রেহা ক্যাফেতে এসেছে ‌। রোজ এক সাথে আসে না । মাঝে মাঝে বিলম্ব হয় শুধু । রোজ রোজ মাহি আসতে পারে না । দেরি করেও আসে ও অনেক সময় ।
তবে ফেরার সময় সময় একই সাথে ফেরে তিনজনে । ক্যাফেতে অনেক ভিড় আজ । কালকেও ছিলো । আজ আরো বেশি । সচরাচর ভিড় থাকলেও এতোটা হয় না । আশেপাশে লোক-জনবসতি কম , এতোটা হওয়ার কথাও নয় অন্যসময় ।

মাহিরা ভেতরে ঢুকে কাজে লেগে পড়েছে যে যার । বাইরে চারচাকা গাড়ি অনেক , তবে রাফির গাড়ি নেই , তারমানে রাফি আসে নি এখনো ‌ । মাহি হাঁফ ছাড়ল এতে । জারিফ, নিহার আর বাকি দুজন – ওনারা এসেছেন অনেক আগে । বাইরে জমজমাট ভিড় আজ । ভেতরের চারটা টেবিল শূন্য । আজকেও ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি কাউকে । বাইরের কাস্টমারদের মধ্যে অধিকাংশই মেয়ে । সবাই বেশ রুচিশীল , পরিপাটি । যতটুকু বোঝা গেল , মেইন শহর থেকে এসেছে অনেকে । শহুরে আভিজাত্যের ছোঁয়া আছে প্রত্যেকের মাঝে ‌ । শহর ছেড়ে শহরের বাইরের এই মফস্বলে এসেছে তারা । সবার আসার কারণ – রুজান রাফি চৌধুরী ! তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে আসা অনেকের । ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে তার এই ক্যাফের কথা । দশটা পর্যন্ত স্বস্তিতে ছিলো মাহি । এরপর রাফির আগমন । রাফির গাড়ি ক্যাফের সামনে থামতেই হইহই শুরু হয়ে গেছে । রাফি কোনো কিছুতে তোয়াক্কা না করে দ্রুত গটগট পায়ে ঢুকেছে নিজের কেবিনে । মাহি ওর উপস্থিতি টের পেয়ে কিচেনে ঢুকেছে । বের হয় নি আর । রাফির সহকারী – সেক্রেটারি মি. নেওয়াজ রাফি কে এক কাপ কফি দিতে বলেছেন । এটা রেগুলার রুটিনে যুক্ত করে নিতেও বলেছেন তিনি । জেরিন নাচতে নাচতে কফি বানিয়েছে আজও । কফি নিয়ে রাফির কেবিনের সামনে যাওয়ার সময় আরেক বিপত্তি । কফির মগটার দিকে তাকিয়ে হাটছিলো সে । ফাঁকা পেয়ে আশে পাশে চোখ বুলিয়ে মগে একটা চুমুক ও বসিয়েছে জেরিন । চুমুক দিয়েই পা বাড়াতে গেলে শক্ত মতো কোনো কিছুর সাথে ধাক্কা খেয়ে টাল খেয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কফির মগটা একেবারে উপুড় হয়ে পড়লো মেঝেতে । সাথে সাথে বিকট শব্দ তুলে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো মগটা । গরম কফি খানিকটা ছিটকে পড়েছে জেরিনের পায়ে । ড্রেসের নিচের অংশেও পড়েছে । জেরিন কাঁচ ভাঙ্গার বিকট শব্দে চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে নিয়েছে তৎক্ষণাৎ । সেকেন্ড কয়েক বাদ চোখ খুলে পিটপিট করে তাকালো মেঝেতে ঝড়ঝড়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে থাকা কাঁচ গুলোর দিকে । অমনি ঠোঁট উল্টালো জেরিন । কত স্বাদ করে কফি বানিয়ে এনেছিলো সে । স্বাদের বারোটা বাজায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো জেরিন । কার সাথে ধাক্কা লাগলো ? ও না হয় দেখেনি , তাই বলে অন্য জন ও দেখবে না নাকি ? জেরিন চোখ রাঙিয়ে মাথা তুলে সামনে তাকানোর আগেই শান্ত চেঁচিয়ে উঠলো….

” এই মেয়ে ,, দেখে চলতে পারো না ?
চমকে উঠলো জেরিন । চোখ তুলে তাকাতেই সামনের সুদর্শন পুরুষ টাকে দেখে হাঁ বনে গেলো পরমুহূর্তে । মুখ প্রসস্থ হলো ওর । সামনে শান্ত চোখ মুখ শক্ত করে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে । হাতে ফোন । সেটার দিকে খেয়াল থাকায় ধাক্কা লেগেছে এই মেয়েটার সাথে । শান্ত চরম বিরক্ত । আরো দ্বিগুন বেশি বিরক্ত হলো জেরিন কে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে । সকাল থেকেই মেজাজ বিগড়ে আছে একে । শান্তর খিটখিটে মেজাজ বিগড়ালো আরো বেশি । ক্রুদ্ধ স্বরে ধমকে উঠলো শান্ত…
” এই মেয়ে ,, কি দেখছো ? আগে ছেলে দেখোনি কখনো ? নাকি আমার মতো স্মার্ট, হ্যান্ডসাম, ছেলে দেখোনি ?
জেরিনের ধ্যান কাটলো । চোখ ফিরিয়ে ঘন পলক ফেললো এদিক ওদিক । ওর কোনো উদ্বেগ না দেখে শান্ত ফোঁস করে বিড়বিড় করতে করতে পাশ কাটিয়ে ঢুকলো রাফির কেবিনে ।
ও সামনে থেকে সরতেই জেরিন তিড়িং করে উঠলো । নিচে মেঝেতে পড়ে থাকা কাঁচের বড় বড় টুকরো গুলো তুললো ঝটপট । মেঝেতে পড়া কফির তরলের ধারা গড়িয়েছে রাফির কেবিনের দরজার ভিতর পর্যন্ত । জেরিন ঝট করে উঠে দৌড় লাগালো কিচেনের দিকে ! ধড়ফড়িয়ে কিচেনে ঢুকেতেই রেহা আর মাহি দু’জনেই চকিতে তাকালো । জেরিন গদগদ হয়ে হাত নেড়ে বলল….

” আরে ভাই ,, এ তো দেখি হিরোর থেকে সাইড হিরোও কোনো কিছুতে কম নয় । কি পার্সোনালিটি ইয়ার…!
একটু থেমে দম ছেড়ে আবার বললো…
” এক কাপ কফি বানা দেখি ,, আমি এক্ষুনি ওয়াশ রুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসছি !
” কাপটা ভাঙ্গলি কি করে ?
রেহার প্রশ্নে জেরিন ছুটতে ছুটতে জবাব দিলো গলা বাড়িয়ে…
” ব্রেক ফেইল করে সাইড নায়কের সাথে ধাক্কা লেগে পড়ে গেছে । তুই কফি বানা ,,আর পারলে সিঙ্গার স্যার এর কেবিনের বাইরে টা পরিষ্কার করে দিস….
রেহা শীতল দৃষ্টি ফিরিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেললো । বিরক্তি লাগলো না , ও এসবে অভ্যস্ত ।
মাহি নীরবে নিভৃতে নিস্তেজ হয়ে বসে আছে এক পাশে । এদিক ওদিক চোখ বুলিয়ে নরম দৃষ্টিতে দেখছে শুধু । রেহা ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ । মাঝে মাঝে এই মেয়েটার কি হয় কে জানে ? জিজ্ঞেস করলে তো বলেও না কিছু ?
রেহা কফি বানিয়ে জেরিনের অপেক্ষায় থাকে নি । নিজে এবার নিয়ে গেছে রাফির কেবিনের সামনে ‌। বাইরে থেকে নক্ করে ঢুকেছে ভেতরে । রাফি পায়ে পা তুলে বসে আছে আরামে । মুখের ভঙ্গিমা বেশ স্বাভাবিক শীতল । রেহা দরজা মারাতেই রাফি ঘাড় কাত করে মুচকি হাসলো ওকে দেখে । রেহা এবার পাশে খেয়াল করলো । রাফির ঠিক পাশেই একটা ছেলে দাঁড়িয়ে । ওকে চিনতে অসুবিধা হলো না । আগে দেখেছে অনেক , বাস্তবে সামনাসামনি এই প্রথম দেখলো । তাহলে এর কথাই বলছিলো জেরিন । শান্তর মুখের ভঙ্গিমা গম্ভীর । রাফির দৃষ্টি অনুসরণ করে ও তাকালো দরজার দিকে । রেহা কে দেখে কপাল কুঁচকালো । রেহা চোখ সরিয়েছে আগেই । সে এগিয়ে বললো হালকা স্বরে….

” আপনার কফি ,, স্যার !
রাফির মোলায়েম কন্ঠ…
” থ্যাঙ্ক ইউ । বাইরে গিয়ে আর এক কাপ পাঠাও…
রেহা ঘাঢ় কাত করে সম্মতি দিয়ে বেরোলো বাইরে ‌। রেহা বেরোতেই শান্ত ফিরলো রাফির দিকে । শ্বাস ফেললো দীর্ঘ । তপ্ত স্বরে বলল…
” প্রশ্নের উত্তর দিলি না যে ?
” কি প্রশ্ন ?
রাফির গাঁ ছাড়া ভাব দেখে শান্ত কন্ঠে গম্ভীরতা টানলো… দোনামোনা ব্যতীত সোজাসুজি আবারো একই প্রশ্ন করলো..
” হঠাৎ এখানে ? এভাবে ? এসবের মানে কি ?
” মানে না থাকলে রুজান রাফি চৌধুরী কিছুই করে না ।
” সেটাই তো জানতে চাইছি ,, রুজান রাফি চৌধুরীর হঠাৎ এসব করার মানে কি ? কি হলো হঠাৎ তার ?
রাফি হাসলো একটু । দৃষ্টি সামনের দেয়ালের দিকে । দৃষ্টি বজায় রেখেই মোলায়েম কন্ঠে বলল শুধু….
” অপেক্ষা কর ! মানে তোকে খুঁজতে হবে না । সামনেই হাজির হবে আপনা আপনি !
জেরিন এখনো আসেনি ‌। কে জানে আবার কোন ধ্যানে মগ্ন হলো ? মাহি একই ভঙ্গিতে বসে । ভিতরের কিচেন ফাঁকা । বাইরের ফুড কর্ণার কিচেনে ব্যস্ততা চলছে । রেহা কফি মেকারে হাত চালাতে চালাতে মাহির দিকে ফিরে বললো…

” আমি বাইরে যাচ্ছি ,, কফিটা স্যার এর কেবিনে দিয়ে আসবি ?
মাহি তাকালো । কপাল গুটিয়ে প্রশ্ন করলো…
” আবার কেনো ?
” ওনার ফ্রেন্ড এসেছেন । তার জন্য !
মাহি আঁতকে উঠলো । মুখে প্রকাশ করলো না । নিচু স্বরে ক্ষয়িত কন্ঠে বললো…
” আমি পারবো না । তুই যা !!
” বাইরে অনেক কাজ । তুই যা না প্লিজ । বাইরে যেতে হবে না তোকে । আমি যাচ্ছি । তুই দিয়ে আসিস কফিটা…
বলেই বেরিয়ে গেল রেহা । মাহি বাঁধা দিলো না । শ্বাস ফেললো চোখ বুজে ‌ । দৃপ্ত ভঙ্গিতে কফির কাপ হাতে এগোলো । আজ আর নক করলো না দরজায় ‌। নিজে থেকেই অনুমতি বিহীন ঢুকলো ভেতরে । ঠিক সামন বরাবর রাফি । পিছন ফিরে বসা শান্ত । ওর পিঠের অংশ দেখা যাচ্ছে । মাহি ঢুকতেই দরজার শব্দে তড়িতে চোখ তুলে চাইলো রাফি ‌। তৎক্ষণাৎ হাসলো ঠোঁট বাঁকিয়ে । রাফির সাথে সাথে শান্ত ও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছে এবার । চোখের সামনের সহজ দিপ্তীর মেয়ে টাকে দেখে হতভম্ব শান্ত । হতবাকই দাঁড় করালো ওকে । আপনা আপনি বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো সে । চোখে এক রাশ অবিশ্বাস । চোখ বৃহৎ আকার ধারণ করেছে ওর । মুখ প্রসারিত হয়েছে অল্প স্বল্প । চোখে পলক পড়লো বেশ কয়েক মুহূর্ত বাদ । অমনি ঘোর কাটলো ওর । অস্ফুটে ফিসফিসিয়ে আওয়াজ তুললো সে…

” মিহি…
এবার তড়িতে তাকালো রাফির দিকে । রাফির দিকে চেয়েই ঢোক গিলে পরপর প্রশ্ন সূচক দুবার আওড়ালো মিহি নামটা । রাফি চেয়ে আছে নীরবে । শান্ত প্রগাঢ় নেত্রে ফের চাইলো মাহির পানে । মাহি চেয়ে আছে কম্পিত আহত দৃষ্টিতে । শান্ত এবার জোরে সোরেই উচ্চারণ করলো….
” মিহি ? তুমি ?
তৎক্ষণাৎ পেছন থেকে রাফির নিরেট কন্ঠ ভেসে আসলো…
” উহুম…
ভুল করছিস ! ভুল করেও এই ভুলটা করিস না আমার মতো !
শান্ত ফের চাইলো । কম্পমান অবস্থা তার । দৃষ্টি কাঁপছে অনবরত । নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছে না । যা দেখছে তা সত্যি ? তার মানে এই জন্য রাফি…?
শান্ত আর কিছু ভাবলো না । রাফির কথার প্রতি উত্তরে বললো…
” মানে ?

রাফি হাসলো রহস্যময় । উঠলো বসা থেকে । মাহির দিকে এগোতে এগোতে মেকি গম্ভীরতা টানলো কন্ঠে….
” মানের মানে নেই কোনো ! ভুল করছিস তুই ? এই যে মেয়েটাকে দেখছিস , ও শুধু দেখতেই আমার মিহির মতো , নামটাও মিহির মতো । কি নাম জানিস ? মাহিতা ইসলাম ওরফে মাহি ! মাহি নাম ম্যাডামের ! কি হলো ম্যাডাম , ঠিক বললাম তো ?
মিহি কে একবার পরিক্রমা করে ওর সামনে দাঁড়িয়ে খানিক টা ঝুঁকে শেষ কথাটা বললো রাফি । মাহি মাথা নুইয়েছে । বক্ষ স্থল ধুকপুক করছে অবিরত । চোখের কোণা ভিজে আসছে । শান্ত এখনো বিস্ময়কর সংকিত নজরে চেয়ে আছে । সে অবিশ্বাস্য স্বরেই বলল…
” রাফি ,, কি সব বলছিস ?
” ঠিক বলছি । একদম ঠিক ! এই মেয়েটার চেহারা আর নামের সাথেই শুধু আমার মিহির মিল আছে । মাহিতা ইসলাম মিহি আর মাহিতা ইসলাম মাহি ! সবচেয়ে বড় মিল কোথায় জানিস ? ঐ দুটি চোখে ! একদম তার চোখের মতোই চোখ দুটো এই মেয়ের । কিন্তু এ আমার মিহি নয় ! ও নিজেই বলেছে ও মিহি নয় । মাহি ও ! অন্য কেউ ও !

চোয়াল শক্ত করে নত জানু মাহির পানে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল রাফি । মাহি পেছালো দুই কদম । শান্ত বাকরুদ্ধ । মাথা কাজ করছে না ওর । এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে সবকিছু । মিহির সাথে এমন অপ্রত্যাশিত সাক্ষাৎকার গুলিয়ে দিচ্ছে সবকিছু । যে মেয়েকে গত সাত মাস ধরে খুঁজে গেছে রাফি , সেই মেয়েকে পাওয়া গেছে আজ ! তাও এভাবে ? এজন্যই রাফি এখানে ছিলো ? কিন্তু কি বলছে ও এসব ?
মিহি , মিহি নয় মানে ? শান্তর মস্তিষ্ক ফাঁকা হয়ে আসছে । ফাঁকা মস্তিষ্কে প্রশ্ন করলো ও…
” কি বলছিস ব্রো ? ও মিহি নয় মানে ? পাগল হয়ে গেছিস…
” উহু… একদম না । আমি কেনো পাগল হতে যাবো এখন ? পাগল তো এতো দিন ছিলাম , এই মিহি নামক মেয়েটা পাগল বানিয়ে ছেড়েছিল আমায় ! কিন্তু এখন আমি একদম ঠিক আছি ।
আমি যা যা বললাম , বিশ্বাস হচ্ছে না তোর ? কি ভাবছিস , এই মেয়েটা মিহি ? হ্যাঁ ? ওকে ফাইন , আমার কথা বিশ্বাস করতে হবে না তোকে । তুই ওকে জিজ্ঞেস কর , কে ও ? জিজ্ঞেস কর ওকে ? ও আমার মিহি কি না, জিজ্ঞেস কর ওকে ?
রাফি কথা শেষ করে পিছন ফিরে দাঁড়িয়েছে চোখ আড়াল করে । শান্ত এবার মাহির দিকে তাকালো । মেয়েটা চোখ তুলে তাকায় নি এ পর্যন্ত । শান্ত এগোলো , শ্বাস ফেলে শুধালো নরম কন্ঠে….

” রাফি এসব কি বলছে মিহি ? আমার মাথায় ঢুকছে না কিছু । কি হচ্ছে এসব ? তুমি এখানে কি করছো ? তুমি জানো , রাফি কত খুঁজেছে তোমায় !
মাহি হাত কাঁপছে । কাঁপা হাতে কফির কাপ টা এগিয়ে দিলো ও । দৃষ্টি না তুলে কম্পিত মৃদু স্বরে বলল….
” আ..আপনার কফি নিন ভাইয়া ! আমার কাজ আছে বাইরে !
” আমার প্রশ্নের উত্তর দাও আগে ! কাজ আছে মানে ? কি কাজ তোমার ? আর , তুমি ? তুমি কেনো চলে এসেছিলে ? এখানে , সিলেটে কি করছো তুমি ?
মাহি নিরুত্তর । হাঁটু কাঁপছে ওর । ও কোনো রকমে দু’পা এগিয়ে কফির মগটা রাখলো ডেস্কের উপর ‌। দ্রুত পিছন ফিরে ছুট লাগালো বাইরের দিকে । দরজা খুলে বাইরে পা রাখা মাত্রই চেঁচিয়ে উঠলো আহ্ সূচক মৃদু আর্তনাদে । চোখ মুখ খিচে গুমড়ে উঠলো সে । ওর মৃদু আর্তনাদ কানে আসা মাত্রই ধক্ করে উঠলো রাফি । দ্রুত পায়ে বাইরে বের হলো সেও । পিছু পিছু শান্ত । মাহি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে থম মেরে । চিবুক গলায় ঠেকানো । ঠোঁট কামড়ে রেখেছে । একটু হেলে নিচু হয়ে আছে ও । ওকে দেখেই উত্তেজিত হয়ে শুধালো রাফি….

” কি হয়েছে ?
শান্ত নিজেও বললো…
” কি হয়েছে মিহি ?
” কিছু না ?
মাহি পা বাড়াতে গেলে কুকিয়ে উঠলো ফের । খুঁড়িয়ে পা বাড়াতে দেখে রাফি তৎক্ষণাৎ পায়ের দিকে তাকালো , মেঝের দিকে দৃষ্টি পড়লো এবার । সাদা চকচকে মেঝেতে রক্তের দাগ ছোপ ছোপ । ডান পা কুঁকড়ে রেখেছে মাহি । রাফি তেঁতে উঠলো । এক ঝটকায় কনুই চেপে ধরল মাহির । তপ্ত স্বরে ধমকে বলল….
” এই মেয়ে , পায়ে কি হয়েছে তোমার ?
” বললাম তো কিছু না !
মাহির কন্ঠে খানিক তেজ । রাফি কথা বাড়ালো না , বসলো হাঁটু গেড়ে । কোন প্রকার তোয়াক্কা না করে মাহির পা টা ধরতে গেলে পিছিয়ে আসলো মাহি ।
” কি করছেন ?

রাফি চোখ তুলে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকালো । নাকের পাটা ফুলে উঠেছে ওর । রাফি সেভাবে বসা অবস্থায় হাত বাড়িয়ে পাশ থেকে একটা চেয়ার টেনে মাহি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর হাতে হেঁচকা টানে চেয়ারে বসালো ওকে । এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে মাহির পা টা তুলে রাখলো নিজের অন্য হাঁটুর উপর । মাহি বিমোহিত, আশ্চর্য । শান্ত ও ধীরস্থির ভাবে চেয়ে আছে । দেখছে শুধু ।
মাহির ডান পায়ের তালু থেকে রক্তের ধারা গড়াচ্ছে । এক টুকরো মোটা শক্ত কাঁচ ঢুকে গেছে সেখানে । তখন ভাঙ্গা কাঁচের বড়বড় টুকরো গুলো তুললেও একটা ছোট টুকরো রয়ে গেছিলো । সেটাই বিদ্ধ হয়েছে মাহির খালি পায়ে । রক্ত গড়াচ্ছে চুঁইয়ে চুঁইয়ে । রাফি পায়ের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে মাহির পানে তাকালো । ছলছল সিক্ত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মেয়েটা । দেখে মনে হচ্ছে – কেঁদে দেবে এক্ষুনি । পায়ের ব্যথায় কি না জানা নেই । রাফি মাহির পানে চেয়ে দৃষ্টিতে দৃষ্টি বজায় রেখেই এক টানে বের করলো কাঁচের টুকরো টা । অমনি ব্যাথায় চোখ খিচে ‘আহহ্’ বলে কুকিয়ে উঠলো মেয়েটা । পায়ের তালু থেকে ফিনকি বেয়ে রক্ত বেরিয়ে আসলো গলগলিয়ে ।
রেহা আর জেরিন সবে ক্যাফের ভিতর ঢুকেছে । মাহির অস্পষ্ট স্বর শুনে ঝট করে ওদিকটায় তাকালো ওরা ‌। সামনের দৃশ্য দেখে দুইজনেই ছুটে আসলো । রেহা মাহির অবস্থা দেখে আতঙ্কিত স্বরে উদ্বিগ্ন হয়ে বলতে লাগলো…
” মাহি , কি হলো তোর ? পায়ে কাঁচ ফুটলো কি করে ? ইশশ ,কতো রক্ত বের হচ্ছে দেখ তো ।
মিহি চোখ খিচে রেখেছে এখনো । শ্বাস ফেলছে বেগতিক । ফুঁপিয়ে উঠলো সে । রাফি উদ্বিগ্ন হয়ে মিহি সম্বোধনে বললো…

” কিচ্ছু হয় নি মিহি !
অতঃপর রেহার দিকে ফিরে আদেশের সুরে বললো…
” ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে এসো … ফাস্ট !
আদেশ মোতাবেক রেহা হন্তদন্ত হয়ে ছুটলো । জেরিন বোকার মতো ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে এখনো । ওর দৃষ্টি রাফির হাঁটুর দিকে , যেখানে স্থান পেয়েছে মাহির পা । রাফি আবার এক হাতে ধরেও রেখেছে ওর পা টা । রক্তে ভিজে ওর হাঁটুর প্যান্টের অংশ ।
জারিফ ভেতরে ঢুকতেই সামনে দেখতে পেলো সবাই কে । একটু এগোতেই মাহি কে অমন অবস্থায় দেখে বিচলিত হয়ে শুধালো….
” আরে মাহি , এ কি অবস্থা তোমার ? কি করে হলো এমন ?
মাহি কোনোরূপ কথা বলার অবস্থায় নেই । পায়ে অস্থির ভাবে টনটন শুরু হয়ে গেছে । কাঁচের অনেক টা অংশ ফুটেছিল ভেতরে । চোখ ভিজে গেছে মাহির । গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে অনবরত । একেই ব্যাথা , অন্যতে চাপা কষ্ট । দুটোতে মিলেমিশে নোনা জল চোখ থেকে খসে পড়ছে অবাধ্য হয়ে ।
মাহি তুললো এবার । ভেজা চোখে রাফির অস্থির করুন মুখখানা নজরে ঠেকলো । ঠোঁট উল্টালো মাহি । দু’চোখ ভরে উঠলো আবারো টই-টুম্বুর পানিতে । রেহা ফাস্ট এইড বক্স নিয়ে এসেছে । রাফি কে দিলো সেটা । রাফি বক্স খুলতেই জারিফ খানিক ইতস্তত হয়ে জোর দেখিয়ে বললো….

” আমায় দিন স্যার ! আমি করে দিচ্ছি…
কথা শেষ হতেই মাহির ফোপানোর শব্দ কানে আসলো আবার । অমনি জারিফ তাকালো মাহির দিকে । মাহির কোলের উপর রাখা ওর হাতের উপর নিজের হাত রাখলো বন্ধুত্বের খাতিরে । খানিক বোঝানোর স্বরে বলল…
” ব্যাথা করছে মাহি ? আমি এক্ষুনি ঔষধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি ! দেখো,, আর ব্যাথা করবে না !
রাফি অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো জারিফের হাতের দিকে । যেটা এখন মাহির হাতের উপর রাখা ‌। রাগে টগবগ করে উঠলো রাফির হিংসাত্মক সত্ত্বা । গর্জে উঠে বজ্র কন্ঠে দাঁত পিষে ধমকে উঠলো ও….
” ওকে টাচ করতে বলেছি তোমায় ? অধিকার খাটাতে বলেছি ওর উপর ? হাত সরাও…
চমকে উঠে হাত সরালো জারিফ । আচমকা এহেন ধমকের জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না ও । জড়বুদ্ধি হয়ে তাকিয়ে মিনমিন করতে লাগলো জারিফ….
” সরি স্যার !

আ..আমায় দিন ,, আমি ঔষধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি ।
” আমি পারবো ,, সরো সামনে থেকে ।
জারিফ উঠে দাঁড়ালো । রাফির শক্ত মুখশ্রী দেখে আর কিছু বলার সাহস দেখালো না । ক্ষত স্থানে তুলো দ্বারা অ্যান্টিসেপ্টিক চেপে ধরতেই দাঁতে দাঁত চেপে খিঁচুনি দিয়ে উঠলো মাহি । রেহা তৎক্ষণাৎ ওর কাঁধ জড়িয়ে চেপে ধরেছে ওকে । জারিফ আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে অসহায় কন্ঠে বলল….
” একটু আস্তে স্যার ,,, ব্যাথা পাচ্ছে ও..!
রাফি ফের তাকালো ক্ষিপ্ত অগ্নি চক্ষু তুলে ‌। এই ছেলেটার আলগা কথা বার্তা মোটেও সহ্য হচ্ছে না ওর । ও নিরেট কন্ঠে কটাক্ষ করে বলল…
” ওর ব্যাথা বোঝার যথেষ্ট ক্ষমতা আমার আছে । তোমাকে ভাবতে হবে না । ফোকাস অন ইউর ওউন ওয়ার্ক । যে কাজে এসেছো সেটা করো ।
চুপসে গেল জারিফ । অপমানিত বোধ হলো খানিক । মাথা নুইয়ে চলে আসলো সেখান থেকে । এতক্ষণ জেরিন হতবুদ্ধি থাকলেও এবার সম্বিতে ফিরলো ও । গোল গোল দুচোখ স্বাভাবিক হলো এবার । চোখে এখনো অবিশ্বাস ।
রাফি অ্যান্টিসেপ্টিক দিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে ‌। মাহি ফিকড়ে উঠছে খানিক বাদ বাদ । রাফি সব শেষে উঠে দাঁড়িয়ে নরম কন্ঠে বলল…

” উঠে দাঁড়াও দেখি…
মাহি শুনলো না । ফের বললো রাফি…
” ওঠো….
রেহাও শান্ত কন্ঠে বললো…
” মাহি , একটু উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা কর তো ।
মাহি এক পায়ে বেশি ভর করে দাঁড়ালো । রেহার হাত শক্ত করে ধরে রাখা । খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কয়েক পা বাড়ালো কোনো রকমে । রাফির দৃষ্টি থেকে অগোচর হয়ে এক কোণায় গিয়ে বসলো আবারো । ভেজা চোখ মুছলো হাতের উল্টো পিঠে । রেহা শান্ত ধীর কন্ঠে বলল…

” খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে মাহি ? তুই দেখে হাঁটবি না, বল তো ? এই জেরিন টাও না একেবারে যা তা । কাপ ভেঙ্গেছে অথচ কাঁচের টুকরো গুলো তোলে নি ঠিকমতো । আমাকেও বলেছিল পরিষ্কার করে দিতে,, দেখ মনে ছিল না, আমার । সরি রে , আমি ক্লিন করে দিলে এমনটা হতো না আর । খুব কষ্ট হচ্ছে তোর , তাই না ?
দুদিকে মাথা ঝাঁকালো মেয়েটা । রুদ্ধতায় গলা আটকে গেছে । কথা বের হচ্ছে না মুখ দিয়ে । রাফি এদিক থেকে ওকে পরখ করলো শান্ত চোখে ‌ । শান্ত এতক্ষণ বিমোহিত দৃষ্টিতে দেখছিল দুজনকে । এখন ওর কাছে সবকিছু পরিষ্কার । শুধু পরিষ্কার নয় – মিহি আর মাহি’র এই ঘটনাটা । এখানে সবাই মিহি কে মাহি বলে ডাকছে । রাফি ও ব্যাঙ্গার্থে তাল দিচ্ছে ওদের সাথে । কি চলছে এসব ? এতো দিন , এতো কাঠখড় পোড়ানোর পর অবশেষে মিহি কে খুঁজে পাওয়ার পর রাফির যে অনুভূতি , যে আকাঙ্ক্ষায়িত তৃপ্তি , তা সম্পর্কে যথেষ্ট অবধারিত শান্ত । ও বুঝতে পারছে রাফির বেসামাল মনের সামলে নেওয়া অবস্থা সম্পর্কে । রাফিকে বাঁকা চোখে নিজের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাহি মিনমিন করে বললো শুধু…
” ব..বাড়ি যাবো আমি !

মাহি কে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে । রেহা আছে ওর সাথে । রাফি নিজে যেতে চাইলেও মনকে সংযত করেছে ‌। মনের বিরুদ্ধে গিয়ে এই অবস্থায় একা ছেড়েছে মাহি কে । যায় নি সে । মাহি চলে যাওয়ার পর চুপচাপ নিজের কেবিনে বসে আছে ও । স্থির দৃষ্টি মেঝের দিকে । শান্ত এতক্ষণ চুপ করে পর্যবেক্ষণ করলো রাফি কে । গুমোট নীরবতা পুরো কক্ষে । নীরবতা ভাঙ্গলো শান্ত….
” এবার আমাকে একটু বলবি,, এই মাহি’র ফ্যাসাদ টা কিসের ?
রাফি মেঝেতে দৃষ্টি রেখেই বাঁকা হাসলো কথা শুনে । ডান হাতের দুই আঙ্গুল দ্বারা চিবুকে স্লাইড করে বললো….
” ও কে ?
” মিহি !
” তাহলে মাহি নাম নিয়ে অতো ভাবছিস কেনো ?
” ভাবার কারণ অজানা নয় তোর ! ওকে এখানে সবাই মাহি বলে ডাকছে কেনো ? আর ওর হাবভাব , এমন করছে কেনো ও ? দেখেছিস মেয়েটাকে , কতোটা পরিবর্তন এসেছে চোখ মুখে ! কি অবস্থা হয়েছে ওর !

” চোখ, মুখ, নামে, পরিবর্তন আসলেও ও পাল্টে যায় নি । ও যে ছিলো সেই আছে । ও আমার মিহি ছিল , আর আমার মিহিই আছে !
” তোর মিহিই ?
শান্ত প্রশ্ন টা অহেতুক লাগলো রাফির নিকট । এবার চোখ তুলে তাকালো রাফি । নিরেট দৃষ্টি রেখে ভ্রু গুটিয়ে শক্ত কন্ঠে পাল্টা প্রশ্ন করলো…..
” আমার নয় ?
রাফির প্রশ্নাত্মক চাহনি । শান্ত কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ও তীব্র জেদি কন্ঠে আবারো বললো….
” যেটা আমার সেটা শুধু আমারই । ও প্রথম থেকে আমার ছিলো , আমারই আছে । আর আমারই থাকবে । যেদিন এক পলকে ও আমার চোখে পড়েছে, সেদিন থেকেই ও আমার ! ও হারালেও আমার , পালালেও আমার । পরিবর্তন হলেও আমার , না হলেও আমার । মাহি সেজে নাটক করছে ও এখন , করুক নাটক । দেখবো আমি ওর নাটক ‌। দর্শক না হলে নাটক জমবে কি করে ? এখানে কেউ এই নাটকের প্লট জানে না । আমি জানি , ওর এই নাটকের একমাত্র দর্শক আমি । নাটক করে পালিয়ে বাঁচবে ও ? কতোদিন এভাবে নাটক করে পালিয়ে বেড়াবে ? পালিয়েছিলো তো , পেরেছে পালাতে ? আমি খুঁজে না পেলেও সময়ের ব্যবধানে ঠিক তো আবার আগের মতোই ধরা পড়লো আমার হাতে ।

” এতো দিন কোথায় ছিলো ও ? এখানে ?
শান্ত সন্দিহান হয়ে প্রশ্নটা করলো । সন্দিহান হওয়ার কারণ যথেষ্ট । এখানে যে ওকে খোঁজা হয়নি তা তো নয় ! সব জায়গায় খোঁজা হয়েছে ওকে ।
শান্তর প্রশ্নের এক শব্দে উত্তর করলো রাফি….
” না …
” তাহলে ?
রাফি চুপ থাকলো কয়েক মুহূর্ত । চোখ বন্ধ করে খুললো আবার । বললো হুতাশ হয়ে….
” দুই মাস হলো এখানে আসার ।
” বাকি পাঁচ মাস কোথায় ছিলো !
” কানাডায় !
” হোয়াট ? কিভাবে ?
” সব জানতে পারবি ! আপাতত এটাই শুনে রাখ । এখানে আসার দুই মাস হলো ওর ।
” মাহি পরিচয়ের মানে কি ?
” সেটা ও নিজেই বলবে ?
” কবে ? আর কতো ? অনেক তো হলো !
রাফি মাথা এলিয়ে দিলো চেয়ারের উপর । দীর্ঘ একটা শ্বাস পড়লো নিজে থেকেই । তবুও শক্ত কন্ঠ ওর…
” যখন ওর সময় হবে, তখন । আমি আগেও বলেছিলাম , ও নিজে থেকে আমার কাছে ধরা না দিলে ওকে ধরবো না আমি । ও খাঁচায় বন্দী আছে , খাঁচাতেই থাক । উড়াউড়ি করুক সেখানেই । যেদিন মুক্ত হবে , সেদিন আমার মাঝেই বিলিন হতে হবে ওকে । সেটা ও নিজে থেকে চাইলে তবেই ।

রাত্রি বারোটার কোঠায় ‌। আম্মু সবে ঘুমিয়েছে । তার ঘুমানোর আভাস পেতেই পিটপিট করে চোখ দুটো মেললো মাহি । ভীষণ জ্বলছে চোখ দুটো । লাল হয়ে আছে । ঘরের অন্ধকারে রক্তিম বর্ন ধারন করা চক্ষু দ্বয় ঠাহর করা যাচ্ছে না ঠিকমত । ঠাহর করারই বা কে আছে ? পায়ে ব্যথা প্রচুর । ধিক্ ধিক্ করে বেড়েই চলেছে ব্যাথা । পায়ের উপরের পিঠ ফুলে গেছে অনেকটা । বাড়িতে আসার পর ফের স্যানিটাইজ করে নতুন করে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছেন আম্মু । চিন্তিত তিনি মেয়ের জন্য । হালকা গাঁ গরম মাহির । এতোক্ষণ মেয়ের শিয়রে বসে ছিলেন তিনি । ঘুমিয়েছেন সবে । আম্মু কে দেখিয়ে মিছে মিছি চোখ বুজে রেখেছিল মাহি ।
ঘুম আসছে না কিছুতেই । ছটফট করছে অন্তঃস্থল । শান্তি লাগছে না কোনো কিছুতে । ধীরে ধীরে উঠে বসলো মাহি । ঘরে অন্ধকার পুরো পুরি । বসা অবস্থায় পেছাতে পেছাতে ব্যাক বোর্ডে গিয়ে পিঠ ঠেকালো মেয়েটা । মাথা এলিয়ে দিলো পিছনের দিকে । উপরের দিকে মুখ করে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো গহীন অন্ধকারের মধ্যে । অন্ধকারে চোখের সামনে ভেসে উঠলো কিছু দৃশ্য । কিছু রঙ্গিন ছবি , দৃশ্য, ঘটনা , সময় , কিছু সুন্দর মুহুর্ত । যা মন মস্তিষ্কে গেঁথে আছে এখনো । এখনো বাস্তবের ন্যায় অনুভূত হয় সবকিছু । কিন্তু সেই বাস্তবতার ইতি ঘটেছে অনেক আগে । ইতি টানতে হয়েছে সেই সুন্দর অবিস্মরণীয় মুহূর্ত গুলোর । এখন আর ঘটে না ওসব । ঘটেছিল কোনো এক সময় । এখন সব স্মৃতি হয়ে আছে শুধু ।

পুরনো স্মৃতিগুলো নতুন করে জীবনে স্থান করে নিতে চাইলেও আর স্থান দেওয়া হবে না মাহির নিকট । ভুলতে হবে সব । নতুন করে ঘটনা ঘটার আগেই পূর্ণচ্ছেদ ঘটাতে হবে । আগের মতো আর কিছু শুরু করতে চায় না সে । শুরু হওয়ার আগেই এখানে শেষ করতে হবে সব ।
মাহি উপরের দিকে নির্মল দৃষ্টি রেখেই ভাবলো অনেক । ভাবতে ভাবতে চোখ ভরাট হয়ে আসলো । হাত তুলে চোখ দুটো মোছার শক্তি কুলালো না । পলক পড়তেই পানি গড়িয়ে পড়লো আপনা আপনি । সেই পলকের সাথে সাথে আরো কিছু ছায়া দৃশ্য চোখের সম্মুখে এসে ধরা দিলো ।
অনেক তো হলো , আর কতো ? আর তো উপায় নেই , উপায় থাকলে এতো দিন এভাবে থাকতে হতো না । হতো না দূরে থাকতে ! উপায় থাকলে দূরে আসারই প্রয়োজন হতো না । ছেড়ে আসার প্রয়োজন হতো না কোনো কিছু । ফেলে আসা স্মৃতি ঘিরে এভাবে কষ্ট পেতে হতো না ।
ম্মৃতি হয়ে আছে, এটা অনেক নয় কি ? বাস্তবের কি প্রয়োজন ? ভুলে তো যায় নি ও কোনো কিছুই । ভুলে যেতে পারবেও না আদোও । ভুলে যাওয়ার চেয়ে অন্তত স্মৃতি নিয়ে বাঁচাটা কম কষ্টের । কষ্টের তবুও ! এইটুকু কষ্ট সই । মাহি অনেকটা সময় ধরে বসে বসে ভাবলো অনেক কিছু । মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো কয়েকটা ।

মাঝে আরো একটি দিন কেটে গেছে । মাহি ক্যাফে তে আসে নি ‌। পরের দিন এসেছে । আজ এসেছে চূড়ান্ত ভাবে । আজ আসাটাই শেষ ‌। খুঁড়িয়ে হাঁটছে এখনো ও । ক্যাফের ভেতরে চারটা টেবিল । ভেতরের এই টেবিল গুলো কাপলদের জন্য । তিনটে পরিপূর্ণ ‌কাপলে । একদল মেয়ে আড্ডা দিচ্ছে অন্যটায় । মোটে চারজন ওরা । পড়নে ওয়েস্টার্ন । ওদের আসা মূলত রুজান রাফি চৌধুরীর সাথে সাক্ষাৎ । রাফি আসে নি এখনো । অপেক্ষমান ওরা । কিছু অর্ডার দেয় নি এখনো । মাহি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগোলো ওদের দিকে । নরম কন্ঠে বলল….
” ম্যাম ,, আপনাদের অর্ডার ?
চার জনই তাকালো বিরক্তির নজরে । মাহি কে আগাগোড়া দেখলো সরু নেত্রে । একজন খিটখিটে স্বরে বলল….
” কি কি পাওয়া যায় , তোমাদের এখানে ?
মাহি নরম হাসলো । সশব্দে বললো…
” মেনু কার্ড রাখা আছে আপনাদের সামনে ? দেখে নিন , তারপর অর্ডার দিন ।
একে অপরের দিকে তাকালো ওরা । ফের তাকালো মাহির দিকে । একজন ঠোঁট বাঁকিয়ে রুক্ষ কন্ঠে বললো…
” চারটে কোল্ড কফি নিয়ে এসো,, যাও !

মাহি অর্ডার মোতাবেক একই ভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগোলো কিচেনের দিকে । ফাস্ট ফুডের কর্নার বাইরে ‌। ভাগ্যিস তেমন কিছু অর্ডার দেয় নি , না হলে এভাবেই বাইরে যেতে হতো ওকে । এমনিতে ওকে বাইরের দিকে যেতে দেয় না কেউ । ফাস্ট ফুড কর্ণার হওয়ায় বাইরে ভিড় থাকে অনেক । বাইরে টা বাকিরা সামলে নেয় ‌, ভেতরটা ওর দায়িত্বে । তাও রেহা বা যেকোনো একজনের সহায়তা থাকে ওর সাথে । গত দেড় মাসে এভাবেই চলছে ।
কিছুক্ষনের মধ্যে মাহি আর নিহার চারটে কোল্ড কফি নিয়ে হাজির । মাহির হাতের ট্রে তে একটা ‌। বাকি তিনটে নিহারের হাতে । মাহি কে ওভাবে হাঁটতে দেখে ওকে সবাই আরো তোল তোলা করে রাখছে । হাত লাগাতে দিচ্ছে না তেমন কিছুতে । নিহার বারবার বারন করলো চুপচাপ একপাশে বসে থাকতে । অর্ডার সার্ভ করে দেবে ও নিজেই । কিন্তু মাহি শুনলো না । নিহারের পিছু পিছু এসেছে তবুও । নিহার আগে এগিয়ে তিন জনের সামনে তিনটে কফি সার্ভ করলো । একজন বাকি , ওরটা মাহির হাতে । মাহি লিম্প করে ধীর পায়ে এগোতে এগোতে অসাবধানতাবশত ব্যাথাতুর পায়ে ফের হোঁচট খেলো প্যাঁচ করে । ভারসাম্য হারিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সামনের দিকে । হাতের কোল্ড কফির মগটা উল্টে পড়লো মেয়েগুলোর মধ্যে একজনের গায়ে । ব্যাথার স্থানে ব্যাথা ঠিকরে উঠলো মাহির । মূহুর্তেই সাদা ব্যান্ডেজ ভেদ করে লাল টকটকে রক্তের তরল দৃশ্যমান হলো । মাহি হুমড়ি খেয়ে হাঁটু মুড়ে পড়েছে টেবিলের সামনে । কুকিয়ে উঠেছে সে ।
নিহার ব্যাস্ত হয়ে মাহি বলে আঁতকে উঠলো । দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে চোখ খিচে রেখেছে মাহি । বিদ্যুতের শকের ন্যায় পুরো শরীর তিরতির করে কেঁপে উঠলো । চিনচিন করে উঠলো ঝিঁঝিঁ ধরার মতো । নিহার দুই হাঁটু মুড়ে বসে ব্যাতি ব্যাস্ত স্বরে বলতে লাগলো ….

” ব্যাথা পেলে আবারো ? হাজার বার বললাম কিছু করতে হবে না তোমায় ! কে শোনে কার কথা ? এখন সামলাও ?
মাহি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বললো…
” আমি ঠিক আছি, ভাইয়া ! বেশি ব্যথা লাগে নি !
” হাউ ডেয়ার ইউ ? কি করলে এটা তুমি ? দেখে চলতে পারো না ?
চিৎকার করে ঝাঁজিয়ে উঠলো সামনের মেয়েটা । চমকে তাকালো মাহি । তাকাতেই চোখে পড়লো মেয়েটার অতিরিক্ত রাগে গজগজ করতে থাকা চেহারা খানা । রিতিমত কাঁপছে সে । চোখ টাটিয়ে দাঁড়িয়ে ফোঁস ফোঁস করছে মেয়েটা । ওর ড্রেসের কোলের অংশ ভিজে গেছে । কফি গিয়ে পড়েছে সেখানে ‌। মাহি উঠে দাঁড়ালো কোনো রকমে । নিরিহ দৃষ্টিতে চেয়ে অনুতপ্ত কন্ঠে বলল….
” সরি ম্যাম ! আমি বুঝতে পারি নি । আই এম রিয়েলি সরি ।
” কিসের সরি ? ভুল করে আবার সরি বলছো ? চোখ কি মাথার পেছনে নাকি ? দেখে হাঁটতে পারো না ?
আরেক জন এভাবে রুষ্ট কন্ঠে তেঁতে উঠলো । বাইরে থেকে জেরিন,রেহা, জারিফ, আওয়াজ শুনে ছুটে এসেছে ওরা । ভেতরের অন্যান্য তিন টেবিলের কাপল রাও দাঁড়িয়ে পড়েছে । দেখছে ওদের । অস্বস্তিতে পড়লো মাহি । একে পা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না । কোনো রকমে এক পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে । রেহা মাহির অবস্থা বুঝে এগিয়ে এসে ওকে ধরলো শক্ত করে । জারিফ নিশ্চিত হওয়ার তাগিদে শুধালো….

” কি হয়েছে এখানে ?
মাহি ওর কথার উত্তর না করে মিনমিন করলো…
” মানুষ তো ভুল করলেই সরি বলে ! আমি তো নিজে থেকে ভুল করিনি ! টেবিলের সাথে পা লেগে গেছিল ! ওদিকে ওয়াশ রুম আছে , আপনি চলুন , ড্রেসটা ক্লিন করে নিন !
” আবার মুখে মুখে তর্ক করছো ? তুমি জানো এই ড্রেসটার দাম কত ? এটা কতো এক্সটেনসিভ ? এভাবে নষ্ট করে দিলে যে ? ক্লিন করলেই হয়ে যাবে ? কোনো আইডিয়া আছে তোমার এর প্রাইজ সম্পর্কে ? কিছু বোঝো তুমি ? তোমার অর্ধেক বছরের মাইনের থেকেও বেশি এর দাম ? এবার আইডিয়া হলো ? দুচোখে দেখেছো কখনো এতো দামি ড্রেস ?
কটাক্ষ করে কথা গুলো বললো মেয়েটা । মাহি চোখ সরু করে তাকালো ‌। জারিফ তপ্ত স্বরে বলে উঠলো….
” একটু বেশি বলে ফেলছেন না আপনি ? আপনার ড্রেসের দাম জানতে চায় নি কেউ । ও তো বলছে , ভুল হয়েছে ! নিজে থেকে তো আর আপনার এক্সটেনসিভ ড্রেসে কফি টা ফেলে নি । ওর পায়ের অবস্থা টা দেখুন ।
মাহি , তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে আছো কেনো ? রক্ত ঝড়ছে আবার ,,, চলো ওদিকে…
জেরিন , ওনাকে ওয়াশ রুমে নিয়ে যা । আপনি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন…
এক সাথে এতো কথা বলে থামলো জারিফ । মিহি পাশ কাটিয়ে হাঁটতে গেলে গায়ে কফি পড়া মেয়েটা দাঁত পিষে ঝাঝিয়ে উঠলো পুনরায়…

এক দেখায় পর্ব ৩৭

” এই মেয়ে , কোথায় যাচ্ছো তুমি ? তুমি ভুল করেছো না ? চলো , তুমিই ভুল শোধরাবে । নিজের হাতে পরিষ্কার করবে আমার ড্রেস ! চলো…
মাহি চমকে উঠলো ‌। রিতিমত ক্ষিপ্ত হয়ে ধমকে উঠেছে মেয়েটা ‌। জারিফ, নিহার, জেরিন,রেহা – চোখ সরু করে তাকালো । মেয়েটা কে দেখে কেমন উগ্র বখাটে দেখাচ্ছে । বাকি তিন জন ও তাই । ওরা আর কিছু বলার আগেই পিছন থেকে পুরুষালি ভরাট কন্ঠ ভেসে আসলো….
” কি হচ্ছে এখানে ?

এক দেখায় পর্ব ৩৯