Mad for you 2 part 17
তানিয়া খাতুন
আজ বহুদিন পর বাড়ি ফিরেছেন শরিফুল খান।
দেশের কাজের সূত্রে প্রায়ই তাকে বাইরে থাকতে হয়।
মন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ব্যস্ততা যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে তার।
মিটিং, রাজনৈতিক সভা, সরকারি দায়িত্ব— সব মিলিয়ে নিজের বাড়িতে সময় দেওয়ার সুযোগ খুব কমই পান তিনি।
কিন্তু আজ বাড়িতে ফিরেই যেন আলাদা এক প্রশান্তি অনুভব করলেন শরিফুল সাহেব।
কারণ আজই প্রথমবারের মতো তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে রুহির।
মেয়েটাকে দেখেই অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করেছিল তার মনে।
চোখেমুখে শান্ত ভদ্রতা, কথাবার্তায় লজ্জা আর সম্মানের ছাপ— সবকিছু মিলিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই রুহিকে পছন্দ হয়ে যায় ।
জীবনে প্রথমবারের মতো নিজের ছেলের কোনো সিদ্ধান্তে সত্যিকারের স্বস্তি অনুভব করলেন তিনি।
মনে মনে ভাবলেন—
“ছেলেটা অন্তত একটা ভালো কাজ করেছে…”
ডাইনিং টেবিলে বসে ছিলেন শরিফুল খান।
সামনে খবরের কাগজ খোলা থাকলেও চোখ তার সেদিকে ছিল না।
তার দৃষ্টি বারবার চলে যাচ্ছিল রান্নাঘরের দিকে।
সেখানে ব্যস্ত হয়ে তার জন্য চা বানাচ্ছিল রুহি।
তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সে।
রুহিরও শরিফুল সাহেবকে খুব ভালো লেগেছে।
এত বড় একজন মানুষ হয়েও তার মধ্যে কোনো অহংকার নেই।
কথাবার্তায় ছিল অদ্ভুত এক আন্তরিকতা।
তিনি ঠিক রুহির নিজের বাবার মতো করেই কথা বলছিলেন।
স্নেহভরা কণ্ঠে বারবার “মা” বলে ডাকছিলেন তাকে।
সেই ডাক শুনে অজান্তেই নরম হয়ে এসেছিল রুহির মন।
ট্রেতে চা নিয়ে ধীরে ধীরে ডাইনিংয়ে আসে রুহি।
শরিফুল সাহেব মৃদু হেসে কাপটা হাতে নেন।
— “তুমি নিজে বানিয়েছ?”
রুহি লাজুক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে।
— “জি…”
চায়ে চুমুক দিয়ে শরিফুল খান প্রশান্তির হাসি হাসেন।
— “বাহ… খুব ভালো হয়েছে তো।”
তার প্রশংসা শুনে লজ্জায় হালকা লাল হয়ে ওঠে রুহির মুখ।
মুহূর্তটার ভেতর অদ্ভুত এক পারিবারিক উষ্ণতা ছিল।
রুহি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ নিজের জীবনটার কথা ভাবতে শুরু করে।
কখনও কি সে কল্পনাও করেছিল—
দেশের শিক্ষামন্ত্রী শরিফুল খানের ছেলের সঙ্গে তার বিয়ে হবে?
যে মানুষটাকে এতদিন শুধু টেলিভিশন আর খবরের কাগজে দেখেছে, আজ সেই মানুষটাই তার সামনে বসে চা খাচ্ছেন।
ভাবতেই অদ্ভুত লাগছিল রুহির।
জীবন কত অপ্রত্যাশিতভাবে বদলে যায়…
কেউ হয়তো আগে থেকে কখনও বুঝতেই পারে না।
রুহি যখন নিজের ভাবনায় ডুবে ছিল।
ঠিক সেই সময় উপরের সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে ক্ৰিশ।
তার হাঁটার শব্দে রুহি চমকে তাকায়।
ক্ৰিশ এসে কোনো কথা না বলেই ডাইনিং টেবিলের উপর রাখা চায়ের কাপটা তুলে নেয়।
পরমুহূর্তেই সোফায় বসে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে চুমুক দেয় তাতে।
ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটেছিল যে রুহি কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাপটা ক্ৰিশের হাতে চলে যায়।
শরিফুল খান বিরক্ত চোখে ছেলের দিকে তাকান।
— “কী সমস্যা তোমার? চা-টা আমি খাচ্ছিলাম, তুমি নিলে কেন?”
ক্ৰিশ নির্বিকার ভঙ্গিতে আবারও চায়ে চুমুক দেয়।
তারপর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে ওঠে—
— “আমার বউয়ের হাতের চা আমি খাব, এটাই স্বাভাবিক।
আমি পছন্দ করি না আমার জিনিসে অন্য কারও ভাগ বসানো।”
কথাটা শুনে মুহূর্তেই ভ্রু কুঁচকে যায় শরিফুল সাহেবের।
তিনি বিরক্ত স্বরে বলে ওঠেন—
— “রুহি আমার মেয়ের মতো। ওর হাতের চা আমি খেতে পারব না?”
ক্ৰিশ এবার ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
তার চোখে তখন পরিচিত সেই কঠিন জেদ।
— “না, পারবেন না।”
— “আর দ্বিতীয়বার আমার বউকে রান্নাঘরে পাঠাবেন না।
তাহলে খুব খারাপ হয়ে যাবে।”
তার কণ্ঠে হালকা সতর্কবার্তার আভাস ছিল।
কথাগুলো বলেই ক্ৰিশ এগিয়ে এসে দাঁড়ায় রুহির একদম সামনে।
রুহি এতক্ষণ অবাক হয়ে শুধু বাবা-ছেলের কথোপকথনই শুনছিল।
মনে হচ্ছিল এদের দুজনের সম্পর্কটা অদ্ভুত ধরনের।
ক্ৰিশ হঠাৎ সামান্য ঝুঁকে আসে তার দিকে।
তারপর খুব নিচু স্বরে, শুধু রুহির কানে ফিসফিস করে বলে ওঠে—
— “সকাল সকাল এত হট লাগছে কেন, বাটারফ্লাই?”
কথাটা শুনে মুহূর্তের মধ্যেই লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে রুহির গাল।
সে বিস্মিত চোখে ক্ৰিশের দিকে তাকায়।
কিন্তু ক্ৰিশ আর দাঁড়ায় না।
ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বড় বড় পা ফেলে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়।
আর রুহি দাঁড়িয়ে থাকে স্থির হয়ে।
লজ্জা আর বিরক্তি মিলেমিশে তার মুখ আরও লাল হয়ে ওঠে।
মনে মনে দাঁত চেপে শুধু একটাই কথা বলে—
— “অসভ্য একটা…”
সিটি বাজাতে বাজাতে অন্ধকার ঘরটার ভেতরে ঢোকে ক্ৰিশ।
ঘরজুড়ে তখন ঘন অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে গন্ধ।
মনে হচ্ছিল বহুদিন ধরে এখানে সূর্যের আলো পর্যন্ত প্রবেশ করেনি।
ক্ৰিশ দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেয়।
তারপর ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে সুইচ অন করতেই জ্বলে ওঠে ঘরের আলো।
হঠাৎ তীব্র আলোয় চোখে ঝাঁঝ লাগতেই মেঝেতে পড়ে থাকা মানুষটা কুঁকড়ে ওঠে।
চোখ-মুখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলে সে।
দৃশ্যটা দেখে অদ্ভুত এক আনন্দ অনুভব করে ক্ৰিশ।
মনে হয় যেন অন্যের যন্ত্রণায় আনন্দ খুঁজে পায় সে।
তাই ইচ্ছে করেই ঘরের সবগুলো লাইট জ্বালিয়ে দেয়।
মেঝেতে পড়ে থাকা লোকটা ধীরে ধীরে চোখ খুলে উঠে বসে।
তার দৃষ্টি গিয়ে থামে ক্ৰিশের উপর।
চোখে এখনও রাগ আছে, কিন্তু সেই রাগের তেজ বহু আগেই নিভে গেছে।
দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকার কারণে মুখটা শুকিয়ে কঙ্কালসার হয়ে গেছে।
মাথাভর্তি এলোমেলো বড় চুল আর মুখজুড়ে ঘন দাড়ি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল— বহুদিন ধরে তাকে এখানে আটকে রাখা হয়েছে।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসে।
তারপর লোকটার সামনে বসে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলে—
— “খুব খিদে পেয়েছে, না?”
লোকটা কোনো উত্তর দেয় না।
শুধু ঘৃণাভরা চোখে তাকিয়ে থাকে ক্ৰিশের দিকে।
ক্ৰিশ মৃদু হেসে আবার বলে—
— “চিন্তা করিস না। আজ তোকে খেতে দেব।”
— “কারণ একদম না খেতে দিলে তো তুই মরে যাবি… আর আমি সেটা চাই না।”
তার চোখে ধীরে ধীরে ভয়ংকর এক উন্মাদনা ফুটে ওঠে।
— “আমি চাই তোকে তিলে তিলে মরতে দেখতে…”
কথাগুলো বলে হঠাৎ করেই উচ্চস্বরে ডেকে ওঠে—
— “আমান!”
ঠিক সেই মুহূর্তেই কিছু একটা ঘটে যায়।
মেঝেতে বসে থাকা লোকটা আচমকা একটা ছোট ছুরি বের করে ক্ৰিশের হাতে বসিয়ে দেয়।
ধাতব ধারালো ফলাটা মুহূর্তের মধ্যেই চামড়া চিরে ঢুকে যায়।
রক্ত বেরিয়ে আসে সঙ্গে সঙ্গে।
ক্ৰিশ দাঁতে দাঁত চেপে ওঠে।
চোখদুটো মুহূর্তেই ভয়ংকর হয়ে ওঠে।
সে শক্ত করে লোকটার কবজি চেপে ধরে।
তারপর এক ঝটকায় ছুরিটা ছিটকে ফেলে দেয় দূরে।
ঠিক তখনই আমান ঘরে ঢোকে।
সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ক্ৰিশ সজোরে একটা চড় বসিয়ে দেয় লোকটার মুখে।
আঘাতের তীব্রতায় লোকটার মাথা গিয়ে সজোরে দেয়ালে লাগে।
পরমুহূর্তেই জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে সে।
ক্ৰিশ নিজের হাত চেপে ধরে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
আঙুলের ফাঁক গলে রক্ত ঝরছিল।
আমান দ্রুত এগিয়ে আসে।
— “দেখি… অনেকটা কেটে গেছে। হাসপাতালে চল।”
ক্ৰিশ বিরক্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে।
— “আমি ঠিক আছি। আগে এর ব্যবস্থা করি…”
আমান এবার গম্ভীর হয়ে যায়।
— “ওকে আমি সামলে নেব। তুই হাসপাতালে চল।”
— “কারণ বাড়িতে রুহি আছে। তোকে এই অবস্থায় দেখলে সন্দেহ করবে।”
“রুহি” নামটা শোনামাত্রই ক্ৰিশের চোখ সরু হয়ে আসে।
সে ধীরে ধীরে আমানের দিকে তাকায়।
তারপর দাঁতে দাঁত চেপে নিচু স্বরে বলে ওঠে—
— “কি বললি? আরেকবার বল…”
আমান সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুল বুঝতে পারে।
মুখ শুকিয়ে যায় তার।
তাড়াতাড়ি জড়ানো গলায় বলে—
Mad for you 2 part 16
— “স-সরি ভাই! আম্মু… আম্মু তোকে এই অবস্থায় দেখলে সন্দেহ করবে।
চল, আমার আব্বু…”
কথা শেষ করেই সে ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে ফেলে।
ক্ৰিশ কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে আমানের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তারপর ধীরে ধীরে হাতের রক্ত মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
