Mad for you 2 part 18
তানিয়া খাতুন
বাইরে তখন তুমুল বৃষ্টি।
মনে হচ্ছিল আকাশ যেন সমস্ত জমে থাকা পানি একসঙ্গে পৃথিবীর বুকে ঢেলে দিচ্ছে।
প্রচণ্ড বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঝরছিল বৃষ্টিধারা।
মাঝে মাঝে আকাশজুড়ে বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানি ছড়িয়ে পড়ছিল, আর তার কয়েক সেকেন্ড পরেই কানে ভেসে আসছিল বজ্রপাতের বিকট গর্জন।
রাস্তাঘাটের অবস্থা ভয়াবহ।
ঝড়ের তাণ্ডবে অনেক গাছপালা উপড়ে পড়েছে।
কোথাও ভেঙে পড়েছে বড় বড় ডাল, কোথাও আবার পুরো গাছ রাস্তার মাঝখানে আড়াআড়ি হয়ে শুয়ে আছে।
প্রকৃতি যেন আজ নিজের সমস্ত রুদ্ররূপ উন্মোচন করেছে।
অন্যদিকে বিশাল বাড়িটার ভেতর গুটিসুটি মেরে বসে আছে রুহি।
ঘরজুড়ে ঘন অন্ধকার।
ঝড়ের তীব্রতায় কোথাও শর্ট সার্কিট হয়ে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ চলে গেছে অনেক আগেই।
এখন চারদিকে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার।
মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি জানালার কাচ ভেদ করে ঘরের ভেতর এসে পড়ছে।
সেই ক্ষণিক আলোয় চারপাশের আসবাবপত্রগুলোকে আরও ভৌতিক মনে হচ্ছিল।
রুহি দুই হাঁটু জড়িয়ে বিছানার এক কোণে বসে ছিল।
শৈশব থেকেই বজ্রপাত আর অন্ধকারকে ভয় পায় সে।
আজ সেই ভয় যেন আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
কারণ এই মুহূর্তে পুরো বাড়িতে সে একা।
শরিফুল সাহেব বিকেলের দিকে কোনো কাজে বেরিয়েছিলেন।
এতক্ষণ হয়ে গেলেও এখনও বাড়ি ফেরেননি।
আর ক্ৰিশ…
সকাল থেকে মানুষটার কোনো খোঁজই নেই।
কোথায় গেছে, কখন ফিরবে, আদৌ ফিরবে কি না— কিছুই জানে না রুহি।
বাড়ির এত বড় বড় ফাঁকা ঘর, লম্বা করিডোর আর নিস্তব্ধ পরিবেশ তাকে আরও অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছিল।
মোমবাতি কোথায় রাখা আছে, সেটাও তার জানা নেই।
জানলেও হয়তো এই অন্ধকারে খুঁজে বের করার সাহস হতো না।
হঠাৎ বাইরে প্রচণ্ড শব্দে বজ্রপাত হতেই চমকে ওঠে রুহি।
নিজের বাহু দুটো আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
তারপর জানালার দিকে তাকায়।
বৃষ্টির ধারার ওপারে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে বারবার মনে পড়ছে একজনের কথা।
এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে মানুষটা কোথায় আছে?
ঠিক আছে তো?
কোনো বিপদে পড়েনি তো?
ভাবনাগুলো হঠাৎ করেই এসে ভিড় করছে তার মনে।
আর সেগুলোকে যত দূরে সরিয়ে দিতে চাইছে, ততই যেন আরও বেশি করে ফিরে আসছে।
রুহি নিজের মনকেই বুঝতে পারছে না।
কয়েকদিন আগেও যে মানুষটার প্রতি তার ছিল শুধু রাগ, বিরক্তি আর ভয়— আজ সেই মানুষটাকে নিয়েই কেন এত অস্থির লাগছে?
কেন বারবার মনে হচ্ছে, দরজাটা খুলে যদি এখনই ক্ৰিশ ভেতরে ঢুকে পড়ত, তাহলে হয়তো এই অন্ধকারটাও আর এত ভয়ঙ্কর লাগত না?
ভাবনাটা মাথায় আসতেই নিজেই চমকে ওঠে রুহি।
মনে মনে নিজের উপরই বিরক্ত হয়।
তবুও বুকের ভেতরের অদ্ভুত অস্থিরতাটা কিছুতেই কমে না।
বাটারফ্লাই…”
পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে আসতেই চমকে মুখ তুলে তাকায় রুহি।
মুহূর্তের মধ্যেই যেন তার নিস্তেজ হয়ে আসা দেবে প্রাণটা ফিরে আসে।
এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর যে অজানা আতঙ্ক জমে ছিল, তা যেন এক নিমিষে মিলিয়ে যায়।
দরজা খুলে ঘরের ভেতরে ঢুকেছে ক্ৰিশ। তার হাতে থাকা ফোনের আলোই এই মুহূর্তে ঘরটাকে সামান্য আলোকিত করে রেখেছে।
সেই আলোয় ক্ৰিশের মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
বাইরে এখনও মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছে।
আকাশজুড়ে একের পর এক বিদ্যুতের ঝলকানি ছুটে যাচ্ছে, আর তার সঙ্গে কেঁপে উঠছে চারদিক।
রুহির ভীত-সন্ত্রস্ত, কান্নাভেজা মুখটা দেখেই ক্ৰিশ থমকে দাঁড়ায়।
নরম স্বরে বলে ওঠে—
— “সরি বাটারফ্লাই আসতে দেরি হয়ে…”
কিন্তু বাকিটা আর বলা হয়ে ওঠে না তার।
তার আগেই রুহি দৌড়ে এসে জাপটে ধরে তাকে।
এক নিমিষে ক্ৰিশের বুকে আশ্রয় নেয় সে।
আকস্মিক ধাক্কায় রুহির হাত গিয়ে লাগে ক্ৰিশের আহত হাতে।
তীব্র ব্যথায় ক্ৰিশের ভ্রু কুঁচকে উঠলেও সে কোনো শব্দ করে না।
বরং নিজের সুস্থ হাতটা দিয়ে রুহিকে আরও শক্ত করে নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়।
কিছুক্ষণ আগেও যে মেয়েটা অন্ধকার ঘরে ভয়ে গুটিসুটি মেরে বসেছিল, সে এখন ক্ৰিশের বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে আছে।
বাইরে বজ্রপাতের শব্দ হচ্ছিল, কিন্তু সেই মুহূর্তে রুহির কানে যেন আর কিছুই পৌঁছাচ্ছিল না।
কিছুটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎই নিজের কাণ্ডের কথা বুঝতে পারে রুহি।
লজ্জায় দ্রুত সরে আসে সে।
মাথা তুলে তাকাতেই তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে যায় ক্ৰিশের হাতে বাঁধা ব্যান্ডেজে।
সাদা ব্যান্ডেজের উপর রক্তের দাগ স্পষ্ট।
আর ক্ৰিশের শার্টেও লেগে আছে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত।
রুহির মুখ মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
“একি! এত রক্ত কেন আপনার শার্টে? নিশ্চয়ই আবার কাউকে মেরেছেন?”
কথাগুলো বলার চেষ্টা করল সে কঠিন গলায়।
কিন্তু তার কণ্ঠে স্পষ্ট উদ্বেগ ধরা পড়ে গেল।
চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল।
সে অস্থির দৃষ্টিতে ক্ৰিশের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর অজান্তেই বিড়বিড় করে বলে,
“হে আল্লাহ… তুমি তাকে সুস্থ করে দাও…”
কথাটা বলা মাত্রই ক্ৰিশের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
তার চোখদুটো স্থির হয়ে গেল রুহির মুখে।
চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
মনে হলো, মেয়েটার বলা একটা সাধারণ কথাও যেন তার ভেতরে কোথাও গভীরভাবে আঘাত করেছে।
সে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এল।
রুহি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
পরের মুহূর্তেই ক্ৰিশ নিজের শক্ত হাত দিয়ে রুহির গাল দুটো দৃঢ়ভাবে চেপে ধরল।
তার দৃষ্টি ছিল গভীর তীব্ৰ অধিকারপূর্ণ।
“শালী, তুই আমার বউ। আমার জন্য চিন্তা করবি… আমার জন্য কষ্ট পাবি… আমার জন্য কাঁদবি।”
“সেখানে তুই কেন অন্য পুরুষের কথা ভাববি?”
রুহি বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
ক্ৰিশের চোখে তখন রাগের সঙ্গে এক অদ্ভুত ঈর্ষাও স্পষ্ট।
যেন পৃথিবীর কোনো কিছুই সে ভাগ করে নিতে রাজি নয়।
“Fuck your mind, baby…”
ক্ৰিশের কথা শুনে মুহূর্তের মধ্যেই রাগে ফুঁসে ওঠে রুহি।
এমন পরিস্থিতিতেও লোকটার মুখে এসব কথা কীভাবে আসে, সেটাই যেন তার মাথায় ঢুকছিল না।
কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই সে হঠাৎ ক্ৰিশের হাত টেনে ধরে।
পরমুহূর্তেই ক্ৰিশের হাতের তালুতে জোরে কামড় বসিয়ে দেয়।
অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে ক্ৰিশ।
সে ভ্রু কুঁচকে রুহির দিকে তাকায়।
মেয়েটা সত্যিই রাগ করেছে। তার ছোট্ট মুখটা অভিমানে ফুলে আছে, আর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে রাগে।
রুহির দাঁতের চাপে হাতের তালুতে হালকা ব্যথা অনুভব হলেও ক্ৰিশ কোনো শব্দ করে না।
বরং চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
মনে হচ্ছিল রাগে ফুঁসতে থাকা রুহিকে দেখতে তার বেশ ভালোই লাগছে।
কিছুক্ষণ পর রুহি নিজেই ক্ৰিশের হাত ছেড়ে দেয়।
তারপর বিরক্ত গলায় বলে ওঠে—
— “ফালতু লোক!”
ক্ৰিশের মুখে ব্যথার কোনো চিহ্ন না দেখে রুহির বিরক্তি যেন আরও বেড়ে যায়।
এত জোরে কামড় দেওয়ার পরও মানুষটার যেন কিছুই হলো না!
ক্ৰিশের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।
পরমুহূর্তেই সে রুহির কোমর জড়িয়ে টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসে।
আকস্মিক ঘটনায় চমকে ওঠে রুহি।
দুজনের মাঝের দূরত্ব মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়।
— “মুড আসছে, বউ। এত সুন্দর ওয়েদারটা কি কাজে লাগানো যায় না…?”
বাইরে তখনও টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে।
জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা আছড়ে পড়ে অদ্ভুত এক সুর তুলছিল।
সেই পরিবেশে ক্ৰিশের কথাগুলো শুনে রুহির বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে ওঠে।
ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে যায় তার শরীর জুড়ে।
সে দ্রুত নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।
ক্ৰিশের শার্ট মুঠো করে ধরে অসহায় স্বরে বলে—
— “আমি অসুস্থ… আজ না, প্লিজ…”
কথাগুলো বলার সময় তার চোখে অনুরোধ স্পষ্ট ছিল।
ক্ৰিশ কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।
তারপর হঠাৎই দুই হাতে তুলে নেয় রুহিকে।
ভয়ে সিটিয়ে যায় রুহি।
তার বুক ধড়ফড় করতে থাকে।
মুহূর্তের জন্য তার মনে হয়, ক্ৰিশ হয়তো এবার তার কথা শুনবে না তাঁর উপর জোর করবে।
কিন্তু পরের ঘটনায় তার সমস্ত আশঙ্কা ভুল প্রমাণিত হয়।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে তাকে বিছানায় শুইয়ে দেয়।
তারপর নিজের ফোনটা এগিয়ে দেয় রুহির দিকে।
— “নাও, তোমার বেস্টির সঙ্গে গল্প করো। আমি কিছু বানিয়ে আনি। ভীষণ খিদে পেয়েছে।”
কয়েক সেকেন্ড রুহি বোকার মতো তাকিয়ে থাকে ক্ৰিশের দিকে।
সে যেন এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না।
যে মানুষটাকে সে সবসময় একগুঁয়ে, জেদি আর নিজের ইচ্ছামতো চলা মানুষ বলে জেনেছে, সেই মানুষটাই আজ তার অসুস্থতার কথা ভেবে নিজের ইচ্ছাকে পাশে সরিয়ে রেখেছে।
রুহির বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি জন্ম নেয়।
যার নাম সে নিজেও জানে না।
কাঁপা হাতে ফোনটা নিয়ে সিমরানের নম্বরে কল দেয় সে।
ওপাশে ফোন বেজে উঠতেই তার মুখে অজান্তেই ছোট্ট একটা হাসি ফুটে ওঠে।
এদিকে ক্ৰিশ ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোরে এসে থামে।
দুই হাত কোমরে রেখে গভীর শ্বাস নেয়।
তারপর মাথা পেছনে হেলিয়ে নিজেকেই ধমক দিয়ে বলে—
— “কন্ট্রোল ক্ৰিশ… কন্ট্রোল। বাটারফ্লাই অসুস্থ। এখন এসব নয়…”
কথাগুলো বলেই চোখ বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে সে।
তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায়।
সকালের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে শহরের ওপর।
আজ রুহির শরীরটা বেশ খারাপ ছিল।
তাই কলেজে যাওয়া হয়নি তার।
ক্ৰিশও সকাল সকাল বেরিয়ে গিয়েছিল মার্কেটে।
মেয়েটা গত দুদিন ঠিকমতো কিছু খাচ্ছিল না, মুখটাও কেমন শুকিয়ে গিয়েছিল।
তাই নিজের মতো করে তার জন্য চকলেট, কেক, কুকিজ আর আরও কিছু পছন্দের জিনিস কিনতে বেরিয়েছিল সে।
কিন্তু ফেরার পথে অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা ঘটে গেল।
রাস্তায় একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনা দেখে ক্ৰিশ বাইক থামিয়ে দেয়। আহত লোকটিকে হাসপাতালে পৌঁছে দিতে গিয়ে তার বেশ অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে যায়।
ফলে বাড়ি ফিরতে ফিরতে দুপুর নেমে এসেছে।
বাইক নিয়ে বাড়ির সামনে এসে থামতেই ক্ৰিশের কপাল কুঁচকে গেল।
সদর দরজাটা অস্বাভাবিকভাবে হাট করে খোলা।
আর তার সামনে অসংখ্য মানুষের ভিড়।
ক্যামেরা, মাইক্রোফোন, পুলিশের গাড়ি—সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশটা বিশৃঙ্খল।
এক মুহূর্তেই ক্ৰিশের বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা জন্ম নিল।
বাইক থেকে নেমে ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে যেতেই কয়েকজন সাংবাদিক তাকে ঘিরে ধরল।
মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য মাইক্রোফোন তার মুখের সামনে এগিয়ে এল।
“মিস্টার ক্ৰিশ খান, আপনার পিতার বিরুদ্ধে নারী পাচার ও বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে আপনি কিছু জানেন?”
“আপনার কি মনে হয়, এই অভিযোগ সত্য?”
“আপনি কি আপনার পিতার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন?”
একটার পর একটা প্রশ্ন ছুটে আসতে লাগল।
কিন্তু ক্ৰিশের মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না।
যেন কিছুই শুনছে না সে।
সম্পূর্ণ নির্বিকার ভঙ্গিতে সাংবাদিকদের মাঝখান দিয়ে হেঁটে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
ভেতরে ঢুকতেই দৃশ্যটা আরও স্পষ্ট হলো।
ড্রয়িংরুমে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে আছে।
আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন শরীফুল খান।
তার দুই হাতে হাতকড়া।
মুখটা রাগে ও অপমানে শক্ত হয়ে আছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি কখনো হননি।
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেল।
চারপাশের সবাই তখন তাদের দিকে তাকিয়ে।
সে শরীফুল খানের সামনে এসে থামল।
তারপর সামান্য ঝুঁকে খুব নিচু স্বরে কানের কাছে বলে—
“গেমটা কেমন লাগল, মিস্টার শরীফুল খান?”
কথাটা শুনেই শরীফুল খানের চোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল।
তিনি ঝাঁপিয়ে পড়ে ক্ৰিশ কে আঘাত করতে হাত তুললেন।
কিন্তু তার আগেই পাশে থাকা দুই পুলিশ কর্মকর্তা তাকে ধরে ফেলল।
“শান্ত হোন, স্যার।”
শরীফুল খান দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সেই দৃষ্টিতে ছিল রাগ, ঘৃণা আর অসহায়তার মিশ্রণ।
একজন পুলিশ কর্মকর্তা এবার ক্ৰিশের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“ক্ৰিশ খান, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই বাড়ি এবং আপনাদের অন্যান্য সম্পত্তি সরকারি তত্ত্বাবধানে থাকবে। আমরা সবকিছু সিল করছি। আদালতের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত এখানে থাকা সম্ভব হবে না।”
ক্ৰিশ শান্তভাবে মাথা নাড়ল।
তারপর আর কিছু না বলে একবার শরীফুল খানের দিকে তাকাল।
কিন্তু সেই দৃষ্টিতে কোনো আবেগ ছিল না।
শুধু এক ধরনের অদ্ভুত শীতলতা।
পরের মুহূর্তেই সে লম্বা পা ফেলে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা—রুহি।
এত সাংবাদিক, এত পুলিশ, এত হট্টগোল দেখে মেয়েটা নিশ্চয়ই ভয় পেয়ে গেছে।
হয়তো নিজের ঘরে বসে কাঁদছে।
হয়তো তার অপেক্ষা করছে।
এই ভেবেই দ্রুত উপরে উঠে গেল ক্ৰিশ কিন্তু রুমে ঢুকে সে থমকে দাঁড়াল।
ঘর ফাঁকা।
রুহি নেই।
প্রথমে সে ভাবল হয়তো অন্য কোনো রুমে আছে।
পুরো বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফেলল সে।
কোথাও রুহি নেই।
মুহূর্তের মধ্যে ক্ৰিশের মুখের রং বদলে গেল।
তার বুকের ভেতর যেন আগুন জ্বলে উঠল।
চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
শিরাগুলো ফুলে উঠল রাগে।
“রুহি…”গর্জে উঠল সে।
কিন্তু কোনো উত্তর এলো না।
হঠাৎ প্রচণ্ড রাগে সামনে থাকা একটি টেবিলে লাথি মারল ক্ৰিশ।
টেবিলটা উল্টে গিয়ে ধপাস করে পড়ল।
তারপর একের পর এক চেয়ার ছুড়ে ফেলতে লাগল।
দেয়ালে ঝোলানো শোপিস ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।
কাঁচের সেন্টার টেবিলে ঘুষি মারতেই সেটা ঝনঝন শব্দে ভেঙে পড়ল মেঝেতে।
পুরো বাড়িটা কয়েক মিনিটের মধ্যে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।
কিন্তু তাতেও তার রাগ কমল না।
বরং আরও বাড়তে লাগল।
মেয়েটা কি পালিয়ে গেছে?
নাকি কেউ তাকে নিয়ে গেছে?
যে উত্তরই সত্য হোক, ফলাফল ভালো হবে না।
একেবারেই না।
তার চোখ দুটো ভয়ংকরভাবে লাল হয়ে উঠেছে।
পরের মুহূর্তেই সে ঘুরে দাঁড়াল।
দ্রুত নিচে নেমে এল।
বাড়ির বাইরে এসে বাইকে উঠল।
ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল বাইক।
Mad for you 2 part 17
“Butterfly… যেখানে থাকো, আমি তোমাকে খুঁজে বের করব।”
তারপর প্রচণ্ড গতিতে বাইক ছুটিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল রাস্তার মোড়ের ওপারে।
