Mad for you 2 part 4
তানিয়া খাতুন
হোস্টেলের রুমটা আজ যেন নতুন করে সাজানো হয়েছে।
ছোট্ট ঘরটার প্রতিটা কোণা যত্ন করে গুছিয়ে তুলেছে রুহি আর সিমরান।
বিছানার চাদরটা টানটান করে বিছানো, টেবিলের ওপর বইগুলো সুন্দর করে সাজানো, জানালার পাশে ছোট্টো ফুলদানিটাও ঠিকঠাক জায়গায় বসানো—সব মিলিয়ে ঘরটা যেন একদম পরিপাটি আর শান্ত একটা অনুভূতি দিচ্ছিল।
কিন্তু এই পরিপাটির পেছনে ছিল অনেকক্ষণ ধরে করা পরিশ্রম।
রুহি হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ে। এক হাত কপালে রেখে চোখ বন্ধ করে ফেলে , ক্লান্ত গলায় বলে ওঠে—
“উফ… আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে রে…”
তার কণ্ঠে এমন এক ক্লান্তি ছিল, যেন আর এক মুহূর্তও জেগে থাকা সম্ভব না।
সিমরান একটু দূর থেকে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে।
তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে রুহির পাশে বসে পড়ে। তার চোখদুটোতে ছিল কৌতূহল, সঙ্গে একটু সন্দেহও।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে নিচু গলায় বলে—
“তুই কিন্তু আমাকে এখনও বললি না… ওই ক্ৰিশ তোকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল?”
প্রশ্নটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই রুহির শরীরটা হালকা কেঁপে ওঠে।
চোখ বন্ধ থাকলেও তার ভেতরে যেন ঝড় বয়ে যায়। মুহূর্তেই মনে পড়ে যায় ক্ৰিশের সাথে কাটানো সেই সময়গুলো… তার কথা, তার চোখের দৃষ্টি, আর সেই অদ্ভুত অনুভূতি, যা রুহিকে এখনো নাড়িয়ে দিচ্ছে।
রুহির বুকটা ধড়ফড় করতে থাকে। গলা শুকিয়ে আসে।
যেন কথাগুলো বলতে গেলেই সবকিছু বেরিয়ে পড়বে।
সে তাড়াতাড়ি চোখ খুলে অন্যদিকে তাকিয়ে ফেলে, যেন সিমরানের চোখ এড়িয়ে যেতে চায়।
তারপর কোনো রকমে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে।
“তুই না গোসল করবি? এতক্ষণ ধরে কাজ করলি… আগে যা, তারপর আমি যাব…”
কথাগুলো বললেও তার গলায় স্পষ্ট অস্বস্তি।
সিমরান কিন্তু এত সহজে ছাড়ার মেয়ে না।
সে ঠোঁট বাঁকিয়ে একটু হাসে, তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়।
চোখ সরায় না রুহির দিক থেকে।
“তোর হাবভাব কিন্তু আমার একদম সুবিধার লাগছে না…”
তারপর একটু থেমে, ভ্রু তুলে—
“তুই সত্যি সত্যি আবার মিস্টার ক্ৰিশ খানের প্রেমে পড়ে যাসনি তো?”
এই কথাটা যেন রুহির ভেতরের সবকিছু নাড়িয়ে দেয়।
সে হঠাৎ করেই উঠে বসে পড়ে বিছানায়। চোখ বড় বড় হয়ে যায়, কণ্ঠে অদ্ভুত এক অস্থিরতা—
“তুই… তুই যাবি?”
সিমরান কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, সে আরও কিছু বলতে চেয়েছিল… কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই বলে না।
“হুম…” —একটা ছোট্ট শব্দ করে সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
তারপর আর দেরি না করে সোজা ওয়াশরুমের দিকে চলে যায়।
রুহি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এলোমেলো হয়ে বিছানা জুড়ে শুয়ে পড়ে।
চোখ দুটো ধীরে ধীরে বন্ধ করে নেয়।
ক্লান্ত শরীরটা যেন মুহূর্তেই ঢলে পড়ে গভীর শান্তিতে…
কিন্তু সেই শান্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।
হঠাৎ করেই একটা লাফিয়ে পড়ার শব্দ—
“ধপ!”
রুহি আঁতকে উঠে বসে পড়ে।
বুক ধড়ফড় করতে থাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেউ একজন হঠাৎ করে তার মুখ চেপে ধরে তাকে আবার বিছানায় ফেলে দেয়।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে রুহি মুহূর্তের জন্য পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়।
চোখ দুটো বড় বড় হয়ে যায় তার…
আর পরের মুহূর্তেই সে দেখতে পায়—ক্ৰিশ।
রুহি নিচে, আর ক্ৰিশ ঠিক তার উপরে ঝুঁকে আছে। দুজনের মুখ একেবারে কাছে।
ক্ৰিশের চোখে এক অদ্ভুত তীব্রতা, যেন সে অনেকক্ষণ ধরে শুধু এই মুহূর্তটার অপেক্ষা করছিল।
রুহি কিছু বলতে চায়… কিন্তু পারে না। ক্ৰিশ এখনো তার মুখ চেপে ধরে আছে।
ক্ৰিশ নিচু গলায়, একটু বিরক্তি আর অদ্ভুত অধিকার মেশানো স্বরে বলে—
“কি প্রবলেম তোর? আমার স্বপ্নে কেন আসছিস? আমাকে ঘুমোতে দিচ্ছিস না কেন?”
রুহি হতভম্ব হয়ে যায়।
স্বপ্নে?
তার মাথায় যেন কিছুই ঢোকে না।
সে কি সত্যিই ক্ৰিশের স্বপ্নে যাচ্ছে?
না কি… এটা ক্ৰিশেরই কোনো অজুহাত?
রুহির ভেতরে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরতে থাকে।
ক্ৰিশ আবার বলে ওঠে—
“এইটুকু একটা মেয়ে… আমার জীবনটা তোছনছ করে দিতে উঠে পড়ে লেগেছিস?
আমাকে চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে এসে… নিজে এখানে শান্তিতে শুয়ে আছিস?”
তার কণ্ঠে অভিযোগ, রাগ… আর অদ্ভুত এক টান, যা রুহির বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দেয়।
রুহি “উম্ম… উম্ম…” করে বোঝানোর চেষ্টা করে—
সে কিছুই করেনি…
সে কিছুই জানে না…
কিন্তু ক্ৰিশ যেন কিছুই শুনতে চায় না।
হঠাৎ করেই সে ঝুঁকে পড়ে—
রুহির গালে একটা চুমু খায়।
রুহির পুরো শরীর যেন জমে যায় সেই স্পর্শে।
ক্ৰিশ খুব নিচু স্বরে, প্রায় নিজের সাথেই কথা বলার মতো করে বলে—
“ক্ৰিশ খান-এর ফার্স্ট কিস পেলি… ভাগ্য ভালো তোর…”
তার ঠোঁটে হালকা এক রহস্যময় হাসি।
এরপর আর এক মুহূর্তও দেরি করে না।
যেভাবে হঠাৎ করে এসেছিল—
ঠিক সেভাবেই একটা লাফ দিয়ে জানালার দিকে যায়, আর মুহূর্তের মধ্যে বাইরে নেমে অদৃশ্য হয়ে যায়।
ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
রুহি স্থির হয়ে বসে থাকে বিছানায়।
তার হাত ধীরে ধীরে নিজের গালে চলে যায়… যেখানে এখনও ক্ৰিশের ঠোঁটের উষ্ণতা যেন রয়ে গেছে।
সে কিছুই বুঝতে পারছে না—
এটা কি সত্যি ছিল?
না কি… সে স্বপ্ন দেখছিল?
তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে কাঁপছে।
চোখ দুটো ফাঁকা হয়ে আছে, ঠোঁট কাঁপছে —
“এটা… কী হলো?”
সে নিজের কাছেই উত্তর খুঁজে পায় না।
শুধু বসে থাকে…
স্থির, স্তব্ধ, আর পুরোপুরি অবাক হয়ে—
কারণ কয়েক মুহূর্ত আগে যা ঘটেছে, তা তার কল্পনারও অনেক বাইরে।
কলেজের ঠিক মুখোমুখি, ক্যাম্পাসের পাশেই একটা লম্বা বাইক স্ট্যান্ড।
সেখানে সারি সারি বাইক দাঁড়িয়ে আছে, আর সেগুলোর মাঝখানে একটু ফাঁকা জায়গা করে বসে আছে ক্ৰিশ।
তার পেছনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে তার পুরো টিম— কেউ ফোন ঘাঁটছে, কেউ সিগারেট ধরাচ্ছে, কেউ আবার বিরক্ত মুখে বারবার সময় দেখছে।
প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেছে তারা এখানে বসে আছে।
কিন্তু কেউ ওঠার সাহস পাচ্ছে না।
কারণ— ক্ৰিশ এখনো ওঠেনি।
আর ক্ৰিশ এখানে বসে আছে একটাই কারণে—রুহি।
ক্ৰিশ নিজেও বুঝতে পারছে না, তার ভেতরে ঠিক কী চলছে।
গতকাল রাতটা তার জীবনের অদ্ভুত রাতগুলোর মধ্যে একটা।
সারারাত সে একবারও ঠিকমতো চোখ বন্ধ করতে পারেনি।
যেই চোখ বন্ধ করেছে, সাথেসাথেই রুহির মুখটা ভেসে উঠেছে।
ক্ৰিশ বিরক্ত হয়ে কয়েকবার উঠে বসেছিল, পানি খেয়েছিল, বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিল—
কিন্তু কিছুতেই ওই মুখটা মাথা থেকে সরাতে পারেনি।
মনে হচ্ছিল—
যদি একবার তাকে সামনে বসিয়ে রাখতে পারত…
চুপচাপ, নিজের চোখের সামনে…
তাহলে হয়তো এই অস্থিরতাটা কমে যেত।
কিন্তু কেন এমন হচ্ছে—তার কোনো উত্তর নেই তার কাছে।
ক্ৰিশ নিজের চুলে হাত চালাল, বিরক্ত হয়ে মাথা নিচু করল।
তার আঙুলের ফাঁকে সিগারেটটা ধীরে ধীরে জ্বলছে, ধোঁয়া উড়ছে বাতাসে।
তার চোখ বারবার কলেজের গেটের দিকে চলে যাচ্ছে।
কেউ ঢুকছে…
কেউ বের হচ্ছে…
কিন্তু যার জন্য সে বসে আছে—
সে এখনো আসেনি।
পেছন থেকে অর্ক হঠাৎ বিরক্ত গলায় বলে উঠল,
—”ভাই, আর কতক্ষণ বসে থাকবি?
তোর লাইলা আজকে আসবে না মনে হয়। চল, ক্যান্টিনে যাই।”
ওর কথা শেষ হতেই আশেপাশে হালকা হাসির শব্দ উঠল।
কিন্তু সেই হাসি এক সেকেন্ডও টিকল না।
ক্ৰিশ ধীরে মাথা ঘুরিয়ে অর্ক র দিকে তাকাল।
তার চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল…
চোয়াল শক্ত…
চোখে একরকম অদ্ভুত আগুন।
এমন দৃষ্টি, যেটা দেখলে বুকের ভেতর ঠান্ডা স্রোত নেমে আসে।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
—”ওর নাম… আমি কারো মুখে শুনতে চাই না।”
পুরো জায়গাটা এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
—”কেউ ওকে কোনো নাম ধরে ডাকবি না।”
অর্ক একটু থতমত খেয়ে গেল।
সে বুঝতে পারছে না—এত সিরিয়াস রিয়্যাক্ট করার কী আছে!
আমান একটু হেসে পরিস্থিতি হালকা করার চেষ্টা করল,
—”তা হলে কী বলব? তোর বউকে ডাকব না? তাহলে ভাবি বলি?”
ক্ৰিশের চোখ এবার আমান-এর দিকে ঘুরল।
দৃষ্টি আরও ঠান্ডা… আরও ধারালো।
—”না। ভাবিও না।”
আমান এবার পুরোপুরি চুপ।
মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেছে।
আশিষ কপাল কুঁচকে একটু সামনে ঝুঁকে বলে,
—”তা হলে কী বলবো? কিছু তো একটা বলতে হবে!”
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার লম্বা ছায়াটা মাটিতে পড়ে আরও ভয়ংকর লাগছে।
সে একবার গেটের দিকে তাকাল,
—”আম্মু বলবি।”
সবাই একসাথে থমকে গেল।
—”যদি ডাকতেই হয়—আম্মু বলবি।”
তার কণ্ঠে কোনো রাগ নেই…
কিন্তু সেই ঠান্ডা স্বরটাই আরও ভয়ংকর।
আমান হতভম্ব হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
—”কী বলিস ভাই! ওইটুকু মেয়েকে আম্মু ডাকব? তুই কি আমাদের বাপ নাকি?”
কেউ হালকা হেসে ফেলল, কিন্তু সাথে সাথে চুপও হয়ে গেল।
ক্ৰিশ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ভেতরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে শুধু বলল,
—”আম্মু ছাড়া অন্য কিছু বললে…
তাকে আমি নিজের হাতে শেষ করব।”
তার কণ্ঠে এমন একটা নিশ্চিততা ছিল—
যেন এটা কোনো হুমকি না…
এটা একটা ঘোষণা।
ক্লাস শেষ হয়েছে একটু আগেই।
কলেজের করিডোর দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটছে সিমরান আর রুহি।
দুজনেই আজ অনেক টা আগে এসেছিল—কারণ একটা ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস ছিল।
সেই ক্লাসটা নিয়েই এখনো আলোচনা করছে তারা।
দুজনেই কথায় এতটাই মগ্ন ছিল যে আশেপাশের দিকে বিশেষ খেয়ালই করছিল না।
চারপাশে স্টুডেন্টদের ভিড়, কেউ হাসছে, কেউ তাড়াহুড়ো করে কোথাও যাচ্ছে…
তার মাঝেই—
হঠাৎই সামনে থেকে আসা কারো সাথে জোরে ধাক্কা লাগল রুহির।
রুহির পা টলমল করে উঠল।
তার হাত থেকে একটা বই ছিটকে নিচে পড়ে গেল।
সে প্রায় পড়ে যাচ্ছিল—
কিন্তু ঠিক তখনই ছেলেটা তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে তার হাত চেপে ধরল।
এক সেকেন্ডের জন্য রুহি পুরোপুরি থমকে গেল।
ছেলেটার হাতের স্পর্শে তার শরীর শক্ত হয়ে গেল—
একটা অদ্ভুত অস্বস্তি তাকে গ্রাস করল।
ছেলেটা দ্রুত হাত ছেড়ে দিয়ে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলে,
—”সরি! সরি… আমি খেয়াল করিনি, সত্যি…”
রুহি নিজের ওরনা ঠিক করে, নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত গলায় বলে,
—”কোনো ব্যাপার না… ঠিক আছে।”
তার কণ্ঠে ভদ্রতা ছিল, কিন্তু ভেতরে একটা হালকা অস্বস্তি এখনো রয়ে গেছে।
ছেলেটা নিচু হয়ে দ্রুত বইটা তুলে নিল।
সে বইটা রুহি-র দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আবার বলে,
—”আবারও sorry…”
রুহি মাথা নাড়িয়ে বইটা নিয়ে নেয়।
ছেলেটা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না—
তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে গেল।
সিমরান একটু এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলে,
—” এমন ভাবে মানুষ ধাক্কা দেয় নাকি! চোখে দেখে না?”
রুহি হালকা হাসল, কিন্তু কিছু বলল না।
সে আবার হাঁটা শুরু করল—
কিন্তু তার অজান্তেই—
দূর থেকে সবকিছু দেখছিল আরেক জোড়া চোখ।
সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল, দেয়ালের পাশে হেলান দিয়ে।
তার হাত দুটো পকেটে, মুখে কোনো এক্সপ্রেশন নেই।
কিন্তু তার চোখ…
সেগুলো একদম স্থির হয়ে আছে রুহির ওপর।
রুহির সাথে ধাক্কা লাগার মুহূর্তটা—
ছেলেটার তার হাত ধরা—
সবকিছু সে স্পষ্ট দেখেছে।
ক্ৰিশের চোয়াল ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠল।
তার চোখে একটা ঠান্ডা, অদ্ভুত অন্ধকার নেমে এল।
তার আঙুলগুলো মুঠো হয়ে গেল—
নখ প্রায় তালুতে ঢুকে যাচ্ছে।
তার ভেতরে হঠাৎ জ্বলে উঠেছে—রাগ?
না…
এর চেয়েও বেশি কিছু।
একটা অজানা, তীব্র অধিকারবোধ…
যেটার কোনো নাম সে এখনো দেয়নি।
বিল্ডিং-এর একদম শেষ মাথায়, ছাদের ওপর।
চারপাশটা নির্জন…
শুধু হালকা বাতাস বইছে, আর দূরে কলেজ ক্যাম্পাসের শব্দগুলো ভেসে আসছে ক্ষীণভাবে।
এক কোণে একটা পুরনো চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে ক্ৰিশ।
তার এক পা অন্য পায়ের ওপর তুলে রাখা।
হাতে জ্বলন্ত সিগারেট…
সে ধীরে ধীরে টান দিচ্ছে, ধোঁয়াটা মুখ দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে আকাশের দিকে।
তার মুখে কোনো এক্সপ্রেশন নেই—
অস্বাভাবিক শান্ত…
কিন্তু সেই শান্তির ভেতরে লুকিয়ে আছে একটা চাপা ঝড়।
তার চোখ নিচের দিকে…
মনে হচ্ছে কিছু একটা ভাবছে সে।
ছাদের দরজাটা জোরে খুলে গেল।
আমান আর অর্ক মিলে একটা ছেলেকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে এলো।
ছেলেটার অবস্থা খারাপ—
মুখে ভয় স্পষ্ট, বারবার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না।
ওকে টেনে এনে একদম ক্ৰিশের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল তারা।
আমান একটু হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
—”দেখ ভাই… এই ছেলেটাই তো?”
ক্ৰিশ কোনো উত্তর দিল না।
সে শুধু ধীরে মাথা তুলল।
তার চোখ গিয়ে পড়ল ছেলেটার ওপর।
এক সেকেন্ড…
দুই সেকেন্ড…
সে একদম নিঃশব্দে ওকে দেখছে।
ছেলেটার গলা শুকিয়ে গেল।
সে কাঁপা গলায় বলে,
—”… আমি কিছু করিনি…যদি করি ভুল হয়ে গেছে…”
ক্ৰিশে ঠোঁটের কোণে ধীরে একটা বাঁকা হাসি ফুটল।
সে সিগারেট থেকে একটা লম্বা টান দিল…
তারপর ধোঁয়াটা ছেলেটার মুখের দিকে ছেড়ে দিল।
—”ভুল?”
তার গলা খুবই নিচু… ঠান্ডা…
—”আমার সামনে ভুলের কোনো ক্ষমা নেই।”
সে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
চেয়ারের শব্দটা ফাঁকা ছাদে অদ্ভুতভাবে প্রতিধ্বনিত হলো।
ক্ৰিশ সামনে এগিয়ে এসে ছেলেটার একদম কাছে দাঁড়াল।
তার চোখ সরাসরি ছেলেটার চোখে—
এমন দৃষ্টি, যেটা সহ্য করা কঠিন।
—”ওর হাত ধরেছিলি…?”
ছেলেটা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল,
—”না ভাই! আমি তো ধরেছিলাম শুধু পড়ে যাচ্ছিল।
কথা শেষ হওয়ার আগেই— এ্কটা চড়!!!
ছেলেটা দুলে মাটিতে পড়ে যেতে যেতেও কোনোভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
—”এই বালটা কে ক্যাম্পাসে নিয়ে যা…”
—”গাছের সাথে ভালো করে বেঁধে দিবি।”
তার গলায় কোনো চিৎকার নেই—
কিন্তু প্রতিটা শব্দে আদেশ স্পষ্ট।
আর অর্ক তুই ওকে,
—”সারাদিন ধাক্কা মারবি…”
অর্ক একটু চমকে উঠল,
—”মানে?”
ক্ৰিশ ধীরে মাথা কাত করল,
—”যতক্ষণ না এই শুয়োরের বাচ্চাটা জ্ঞান হারায়…”
তার ঠোঁটে আবার সেই ভয়ংকর হাসি ফুটে উঠল—
—”ততক্ষণ মারবি।”
Mad for you 2 part 3
আমান আর অর্ক ছেলেটা কে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল ছাদ থেকে।
দরজাটা আবার জোরে বন্ধ হলো।
ছাদটা আবার নিস্তব্ধ।
ক্ৰিশ একা দাঁড়িয়ে রইল।
বাতাস তার চুল এলোমেলো করে দিচ্ছে…
তার ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটল—
কিন্তু সেই হাসির ভেতরে ভালোবাসার চেয়ে অনেক বেশি ছিল—
অধিকার… আর ভয়ংকর এক পাগলামি।
