Mad for you 2 part 5
তানিয়া খাতুন
আজ কলেজে নবীন বরণ উৎসব। সকাল থেকেই যেন পুরো ক্যাম্পাসটা অন্য এক রূপ নিয়েছে।
গেটে ঢুকতেই রঙিন কাগজের ফেস্টুন, বেলুন আর আলপনার ছোঁয়া—সব মিলিয়ে এক উৎসবের আমেজ।
সেই হিসেবেই কলেজের সব ছেলেরা পাঞ্জাবি আর মেয়েরা শাড়ি পরে এসেছে।
কারো গায়ে গাঢ় নীল, কারো লাল-সাদা, আবার কারো হালকা প্যাস্টেল রঙ—চারদিকে যেন রঙের মেলা বসেছে।
সাধারণ দিনের তুলনায় আজ কলেজে ভিড় অনেক বেশি।
শুধু স্টুডেন্টই না, আশেপাশের অনেক মানুষও এসেছে এই অনুষ্ঠান দেখতে।
হাসি, গল্প, আড্ডা—সব মিলিয়ে পুরো জায়গাটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
স্টেজের সামনে সারি সারি করে চেয়ার সাজানো।
সেগুলো প্রায় ভরে গেছে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়ে।
কেউ বন্ধুদের সঙ্গে বসে গল্প করছে, কেউ আবার মোবাইল দিয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত।
একটু আগেই অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। মাইকের শব্দে আর তুমুল হাততালিতে চারপাশ গমগম করছে।
কেউ মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশন করছে— আবার কেউ সুরেলা কণ্ঠে গান গেয়ে মানুষের মন জয় করছে।
মাঝে মাঝে দর্শকদের উল্লাস আর চিৎকারে পুরো পরিবেশটা আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে।
মনে হচ্ছে যেন আজকের দিনটা সবাই নিজের মতো করে উপভোগ করতে চায়, কোনো দুঃখ বা চিন্তার জায়গা নেই এখানে।
স্টেজে উপস্থিত আছেন কয়েকজন সম্মানিত প্রফেসর এবং মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী শরিফুল খান, যাকে আজকের অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে।
তিনি মাঝে মাঝে হাসিমুখে চারপাশ তাকাচ্ছেন, আবার পারফরম্যান্সগুলো মন দিয়ে উপভোগ করছেন।
প্রফেসররাও গর্বিত চোখে তাদের ছাত্রছাত্রীদের প্রতিভা দেখছেন।
এই বিশাল ভিড় আর আনন্দের মাঝেও ক্ৰিশ তার পুরো দল নিয়ে স্টেজের পাশেই বসে আছে।
তার বন্ধুরা কেউ হাসছে, কেউ মজা করছে, কিন্তু ক্ৰিশ যেন এই জগতে নেই।
তার চোখ বারবার ভিড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে—একবার বাম দিকে, একবার ডান দিকে, আবার কখনো স্টেজের দিকে স্থির হয়ে যাচ্ছে।
তার দৃষ্টিতে এক ধরনের অস্থিরতা, যেন সে কাউকে খুঁজছে… খুব গুরুত্বপূর্ণ কাউকে।
হয়তো সেই মানুষটা এখনও আসেনি, অথবা এই ভিড়ের মাঝেই কোথাও আছে—কিন্তু ক্ৰিশ তাকে খুঁজে পাচ্ছে না।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমান দৌড়ে এসে ক্ৰিশের একেবারে কাছে ঝুঁকে পড়ে, কানে কানে তাড়াহুড়ো করে কিছু বলে।
কথাটা এতটাই গুরুতর ছিল যে শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ক্ৰিশের মুখের সব ভাব এক নিমিষে বদলে যায়।
তার চোখের মণি যেন মুহূর্তেই গাঢ় হয়ে ওঠে, চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, আর পরের সেকেন্ডেই চোখ দুটো রক্তিম হয়ে জ্বলে ওঠে রাগে।
সে দাঁতে দাঁত চেপে ধরে, শ্বাসটা ভারী হয়ে আসে।
খুব নিচু গলায়, প্রায় ফিসফিস করে আমানকে কিছু নির্দেশ দেয়।
তার গলায় এমন একটা ঠান্ডা কঠোরতা ছিল, যেটা শুনলে শরীর কেঁপে ওঠে।
আমান কোনো প্রশ্ন করে না, শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
তারপর খুব দ্রুত তাদের পুরো দলটাকে ইশারায় পাশে সরিয়ে নিয়ে যায়।
তারা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করতে থাকে—মুখগুলো গম্ভীর, চোখে চাপা উত্তেজনা।
দেখে মনে হচ্ছে তারা আগেই কোনো পরিকল্পনা করে রেখেছিল, আর এখন শুধু সেটা বাস্তবায়নের সময় এসে গেছে।
কিছুক্ষণ পর ক্ৰিশ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। তার ভঙ্গিতে এখন এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস,
কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাসের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অশুভ ছায়া।
সে একবারও পেছনে তাকায় না—সোজা বড় বড় পা ফেলে স্টেজের দিকে এগিয়ে যায়।
ঠিক তখনই মাইকে ঘোষণা ভেসে আসে—
“এবার নৃত্য পরিবেশন করতে আসছেন… রুহি রহমান…”
ঘোষণাটা শেষ হতে না হতেই দর্শকদের মধ্যে হালকা হাততালি পড়ে।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেই হাততালি থেমে যায়, যখন সবাই দেখে—ক্ৰিশ হঠাৎ করেই স্টেজে উঠে পড়েছে।
কোনো অনুমতি, কোনো দ্বিধা—কিছুই নেই।
সে সরাসরি এগিয়ে গিয়ে মাইক্রোফোনটা এক প্রকার ছিনিয়ে নেয় পাশের একজনের হাত থেকে।
পুরো হলরুমে তখন গুঞ্জন শুরু হয়ে গেছে—
“ক্ৰিশ কী করছে?”
“এভাবে স্টেজে উঠল কেন?”
স্টেজের মাঝখানে এসে ক্ৰিশ থামে। একবার ধীরে ধীরে চারদিকে তাকায়—তার সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যেটা দেখে অনেকেই অজান্তেই চুপ হয়ে যায়।
তারপর সে ঠাণ্ডা, নিয়ন্ত্রিত গলায় বলে—
“Hello everyone…
আমি সবার সাথে একটা ডিল করতে এসেছি।”
তার কণ্ঠে এমন এক চাপা হুমকি ছিল, যেটা কথার থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর।
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কেউ আর ফিসফিস করতেও সাহস পায় না।
স্টেজে বসে থাকা প্রফেসররা একে অপরের দিকে তাকান—কেউই বুঝতে পারছেন না কীভাবে এই পরিস্থিতি সামলাবেন।
কারণ ক্ৰিশ কে সবাই চেনে—সে কখনোই কলেজের অনুষ্ঠানে এভাবে হস্তক্ষেপ করে না।
আজ করেছে মানে কিছু এ্কটা হতে চলেছে।
মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী শরিফুল খানও অস্বস্তিতে কুঁকড়ে যান।
এত মানুষের সামনে এই ঘটনা—তার সম্মান যেন এক নিমিষে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে।
তিনি দাঁত চেপে বসে থাকেন, কিন্তু চোখে স্পষ্ট রাগ আর অপমানের ছাপ।
“ডিলটা খুব সোজা… আমার লোকেরা এখন সবার হাতে একটা করে রুমাল দেবে। সবাই পেছনে তাকাও।”
তার গলা এবার আরও শক্ত, কোনো প্রশ্নের সুযোগ নেই।
ধীরে ধীরে সবাই পেছনে তাকায়… আর দেখে—আমান আর তার বন্ধুরা ইতিমধ্যেই ভিড়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
তারা এক এক করে সবার হাতে রুমাল তুলে দিচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করার আগেই কাজটা দ্রুত এগিয়ে চলেছে।
পুরো পরিবেশটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে—আনন্দ আর উৎসবের জায়গায় জায়গা করে নিচ্ছে অজানা ভয়।
“এবার… সবাই চোখে রুমালটা বেঁধে ফেলো।
সবাই মানে—এখানে যারা আছে, সবাই। প্রফেসররাও।”
যে বাঁধবে না তাঁকে আমি নিজে হাতে খুন করবো।
একজন, দুজন… তারপর ধীরে ধীরে সবাই চোখে রুমাল বেঁধে নেয়। যেন কেউ সাহস পাচ্ছে না অবাধ্য হতে।
এমনকি স্টেজে বসে থাকা প্রফেসররাও শেষ পর্যন্ত মাথা নিচু করে রুমাল বেঁধে ফেলেন।
হঠাৎ করেই শরিফুল খান আর সহ্য করতে না পেরে উঠে দাঁড়ান—
“এটা কী হচ্ছে ক্ৰিশ ? বন্ধ করো এসব! তুমি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছো!”
ক্ৰিশ ধীরে ধীরে তার দিকে ঘুরে তাকায়। ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে—যেন পুরো পরিস্থিতিটাই সে উপভোগ করছে।
“এই… আমার বাপ, কেউ একটা রুমাল দে তো…
ক্ষমা করবেন আব্বু… আপনার বউমার খুব ইচ্ছে হয়েছে আজ পারফর্ম করার।
এখন যদি আমি তাকে সুযোগ না দিই… তাহলে বেচারির কষ্ট হবে, তাই না?”
তার কথায় ছিল স্পষ্ট ব্যঙ্গ, সাথে অদ্ভুত এক অধিকারবোধ—যেন সে যা বলছে, সেটাই শেষ কথা।
স্টেজের নিচে তখন নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। কেউ চোখে রুমাল বেঁধে দাঁড়িয়ে, কেউ বসে—কিন্তু সবার বুক ধড়ফড় করছে।
ক্ৰিশ এবার মাইক্রোফোন থেকে মুখ সরিয়ে নেই্ , কিন্তু এমনভাবে বলে যেন আমান ঠিকই শুনতে পায়—
“আমান… ব্যাকস্টেজ থেকে ‘লেদু সোনা’কে পাঠাও।”
তারপর আরও নিচু, ভয়ঙ্কর গলায় যোগ করে—
“আর তুইও রুমালটা বেঁধে নে… নাহলে তুইও আমার হাতে মরবি।”
এই কথাটা যেন পুরো পরিবেশকে জমাট বাঁধিয়ে দেয়।
চারদিকে শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ… আর চাপা আতঙ্ক।
সবাই চোখ বাঁধা অবস্থায় অপেক্ষা করছে—
কি হতে চলেছে এখন?
কে আসবে স্টেজে?
আর ক্ৰিশ… আসলে কী করতে যাচ্ছে…
এই সময় ক্ৰিশ ধীরে ধীরে স্টেজের এক পাশে রাখা একটা চেয়ার টেনে নিয়ে আসে।
কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো অস্থিরতা নেই—বরং তার প্রতিটা মুভমেন্টে একটা অদ্ভুত স্বচ্ছন্দতা।
যেন এই বিশৃঙ্খলার মাঝেও সে নিজের একটা আলাদা জগতে আছে।
চেয়ারটা স্টেজের ঠিক মাঝখানে রেখে সে বসে পড়ে।
তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে এক পা তুলে অন্য পায়ের ওপর রেখে দেয়।
হেলান দিয়ে বসে, মাথাটা একটু কাত করে—তার চোখ স্থির স্টেজের পর্দার দিকে।
মুখে হালকা একটা হাসি… কিন্তু সেই হাসির ভেতরে লুকিয়ে আছে ভয়ঙ্কর এক অধিকারবোধ।
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতার পর ধীরে ধীরে স্টেজের ব্যাকস্টেজ থেকে আলো জ্বলে ওঠে।
নরম, মিষ্টি সুরে একটা গান বাজতে শুরু করে…
আর সেই সুরের সাথে সাথে স্টেজে পা রাখে রুহি রহমান।
সে কিছুই জানে না—চারপাশে কী হয়েছে, কেন সবাই চোখ বেঁধে আছে, কেন এত নিস্তব্ধতা।
তার কাছে এটা শুধুই একটা পারফরম্যান্স… একটা স্বপ্নের মুহূর্ত।
আজ সে সেজেছে খুব সাধারণ অথচ অপূর্বভাবে। হালকা রঙের শাড়ি, চুলগুলো খোলা, চোখে এক চিলতে কাজল—মুখে লাজুক কিন্তু আত্মবিশ্বাসী একটা হাসি।
গানটা শুরু হতেই রুহি ধীরে ধীরে নড়তে শুরু করে। তার হাতের ভঙ্গি, চোখের এক্সপ্রেশন, শরীরের মুভমেন্ট—সবকিছু এতটাই কোমল আর নিখুঁত যে মনে হয় সে গানটার প্রতিটা শব্দকে নিজের ভেতর থেকে অনুভব করছে।
স্টেজের আলো তার ওপর পড়ে তাকে আরও স্বপ্নের মতো করে তুলছে।
যেন এই অন্ধকার, ভয়ভরা পরিবেশের মাঝেও সে এক টুকরো আলো হয়ে জ্বলছে।
ক্ৰিশ সেই চেয়ারেই বসে আছে—একদম নড়ছে না। তার চোখে এখন কোনো রাগ নেই, কোনো হিংস্রতা নেই… বরং এক ধরনের মুগ্ধতা।
সে ধীরে ধীরে সিগারেটটা ঠোঁটে তোলে, একটা লম্বা টান দেয়, তারপর ধোঁয়াটা আস্তে করে ছেড়ে দেয়—চোখ কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও রুহির দিক থেকে সরায় না।
তার দৃষ্টিতে এমন এক অধিকার, যেন এই পুরো পৃথিবীতে এই মুহূর্তটা শুধু তার জন্যই তৈরি।
রুহির প্রতিটা স্টেপ, প্রতিটা ঘুরে দাঁড়ানো, প্রতিটা এক্সপ্রেশন—সবকিছু যেন তাকে মোহিত করে ফেলছে।
তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন হয়ে যায়… সে চোখ সরাতে পারে না।
যেন প্রথমবারের মতো সে কাউকে এইভাবে দেখছে—এতটা গভীরভাবে অনুভব করছে।
গানের সুর একটু একটু করে চূড়ান্ত জায়গায় পৌঁছায়… রুহির নাচও ততটাই আবেগে ভরে ওঠে।
চারপাশে সবাই চোখ বাঁধা—কেউ দেখতে পাচ্ছে না এই সৌন্দর্য, এই অনুভূতি।
শুধু ক্ৰিশ এই মুহূর্তের সাক্ষী।
একজন দেখছে নিজের অধিকার নিয়ে…
নিঃশব্দে, মুগ্ধ হয়ে…
গানটা শেষ হওয়ার ঠিক আগে
ধীরে ধীরে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায় ক্ৰিশ।
তার চোখে আবার সেই পুরনো দৃষ্টি ফিরে এসেছে—অধিকার, আগ্রাসন আর এক অদ্ভুত স্থিরতা।
সে কোনো কথা না বলে নিজের গায়ের শার্টটা খুলে ফেলে।
ধীরে ধীরে রুহির দিকে এগিয়ে যায়।
রুহি তখনও নিজের পারফরম্যান্সের মধ্যে ছিল। কিন্তু হঠাৎ সামনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে সে থেমে যায়।
এতক্ষণ সে ক্ৰিশ কে লক্ষ্যই করেনি। হঠাৎ সামনে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে চমকে ওঠে।
“আপনি…?”
তার গলায় বিস্ময় আর অজানা আশঙ্কা।
ক্ৰিশ কোনো উত্তর দেয় না। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে সে নিজের শার্টটা তুলে সরাসরি রুহির মুখের ওপর ঢেকে দেয়।
সবকিছু এত দ্রুত ঘটে যে রুহি বুঝে ওঠার আগেই তার দৃষ্টি অন্ধকারে ঢেকে যায়।
“এই—কি করছেন—!”
তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।
কিন্তু সেই প্রতিবাদের আগেই ক্ৰিশ তাকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নেয়।
রুহি সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যায়। তার শরীর শক্ত হয়ে আসে।
সে বোঝার চেষ্টা করে কী হচ্ছে, কিন্তু মুখ ঢাকা, চারপাশ অন্ধকার—কিছুই পরিষ্কার না।
শার্টটা সরানোর সাহসটুকুও যেন তার হয় না।
তার বুক ধড়ফড় করছে, শ্বাস দ্রুত হয়ে গেছে।
স্টেজের নিচে তখনও সবাই চোখ বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে—কেউ কিছু দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু উত্তেজনা আর ভয় বাতাসে ছড়িয়ে আছে।
ক্ৰিশ তখন হঠাৎ করে জোরে চিৎকার করে ওঠে—
“আমান! সবাইকে চোখ খুলতে বল…
আমি আমারটাকে নিয়ে গেলাম!”
তার কণ্ঠে এমন এক চূড়ান্ত ঘোষণা ছিল, যেন সে যা করার তা করেই ফেলেছে—এখন আর কিছু করার নেই।
কথাটা শোনার পর আমান দ্রুত এগিয়ে যায়, চারদিকে ছড়িয়ে থাকা মানুষদের বলে—
“রুমাল খুলে ফেলো… সবাই!”
সিনেমা শেষ…………
ফুল স্পিডে ছুটে চলছে বাইকটা। রাতের ঠান্ডা হাওয়া ছুরির মতো কেটে যাচ্ছে, রাস্তার দুপাশের আলো একটার পর একটা পেছনে মিলিয়ে যাচ্ছে।
রুহি ক্ৰিশের পেছনে কুঁকড়ে বসে আছে। তার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে, বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে।
কান্না পাচ্ছে তার, চোখে পানি এসে জমছে, কিন্তু ভয় আর অজানা আতঙ্কে সে ঠিকমতো কাঁদতেও পারছে না।
ক্ৰিশ নিজের টি-শার্ট দিয়ে রুহিকে নিজের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে নিয়েছে, যার ফলে রুহি একটুও নড়তে পারছে না।
এইভাবে এত কাছে… ক্ৰিশের শরীরের সাথে লেগে থাকতে থাকতে রুহির ভেতরে এক অদ্ভুত অনুভূতি তৈরি হচ্ছে—ভয়, লজ্জা, অস্বস্তি সব মিলেমিশে গেছে।
তার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠছে।
রুহি কাঁপা কাঁপা গলায় বলে ওঠে—
“আমরা কোথায় যাচ্ছি? Please আমাকে হোস্টেলে ছেড়ে দিন… রাত হলে ওখানে ঢুকতে দেবে না…”
ক্ৰিশ কোনো উত্তর দেয় না।
শুধু বাইকের গতি আরও একটু বাড়িয়ে দেয়।
তারপর নির্লিপ্ত গলায় বলে তো?
রুহির মাথা যেন গরম হয়ে যায়। ভয় আর রাগ একসাথে মিশে তার গলায় উঠে আসে—
“তো? মানে কি? আমি একটা মেয়ে… রাতে কোথায় থাকবো?”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ক্ৰিশ ঠান্ডা, নির্লিপ্ত গলায় বলে—“আমার সাথে…”
এই দুটো শব্দ যেন বজ্রপাতের মতো পড়ে রুহির মাথায়।
তার বুকটা ধক করে ওঠে, পুরো শরীর কেঁপে ওঠে অজানা আশঙ্কায়।
তার মাথায় একের পর এক ভয়ঙ্কর চিন্তা ভিড় করে—
তবে কি তার সাথে খারাপ কিছু করবে?
তাকে কোথাও নিয়ে গিয়ে…?
আর ভাবতে পারে না রুহি। ভয় যেন তার গলা শুকিয়ে দেয়, ঠোঁট কাঁপে কিন্তু কোনো শব্দ বের হয় না।
কিছুক্ষণ পর বাইকটা এসে থামে একটা বিশাল লোহার গেটের সামনে।
ক্ৰিশ জোরে হর্ন বাজায়।
মুহূর্তের মধ্যেই দুজন দারোয়ান গেট খুলে দেয়।
বাইকটা ধীরে ধীরে ভেতরে ঢোকে।
রুহি বিস্মিত চোখে চারপাশে তাকায়। বিশাল বাড়ি, চারদিকে অদ্ভুত নিরবতা… জায়গাটা যত বড়, ততটাই ভয়ের।
তার বুকের ভেতরটা আরও জোরে ধুকপুক করতে থাকে।
এই লোকটা তাকে বিক্রি করে দেবে না তো?
এত বড় বাড়ি… কে জানে কী হয় এখানে…
ক্ৰিশ বাইকটা সাইডে দাঁড় করায়। ইঞ্জিন বন্ধ হতেই চারপাশে এক অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে আসে।
তারপর সে ধীরে ধীরে নিজের টি-শার্টটা খুলে নেয়, যেটা দিয়ে রুহিকে বেঁধে রেখেছিল।
বাঁধন খুলতেই রুহি যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। এক সেকেন্ড দেরি না করে সে তাড়াতাড়ি বাইক থেকে নেমে দৌড় দেয়—
এখনই পালাতে হবে… এখন না হলে আর কখনো না!
কিন্তু কয়েক কদম যেতেই—
হঠাৎ পা হড়কে যায়।
ধপ করে মাটিতে পড়ে যায় সে।
“আহ…!”
তার হাতটা ঘষা লেগে ছিঁড়ে যায়। তীব্র জ্বালায় চোখে পানি চলে আসে।
সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যথায় কুঁকড়ে যায়।
ক্ৰিশ এতক্ষণ দূর থেকে স্থির চোখে সব দেখছিল—যেন আগেই জানতো ঠিক এটাই হবে।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। তার হাঁটার ভঙ্গিতে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো উদ্বেগ নেই—বরং এক অদ্ভুত নিশ্চিন্ততা।
রুহি উঠতে গিয়েও পারে না, ব্যথায় আবার বসে পড়ে। ঠিক তখনই ক্ৰিশ কাছে এসে এক ঝটকায় তাকে আবার কোলে তুলে নেয়।
রুহি ছটফট করে ওঠে, তার কণ্ঠে ভয় আর অসহায়তা স্পষ্ট—
“কি করছেন! কি করছেন! ছাড়ুন আমাকে! এটা ঠিক না! আমি কিন্তু পুলিশ ডাকবো!”
ক্ৰিশ নির্লিপ্ত।
তার মুখে কোনো ভাব নেই, চোখে কোনো অনুভূতি নেই।
সে রুহির কথার কোনো জবাব দেয় না। যেন তার এই প্রতিবাদ, কান্না—সবকিছুই তার কাছে অর্থহীন।
বড় বড় পা ফেলে সে বাড়ির ভেতরের দিকে হাঁটতে থাকে।
রুহি এখনও ছটফট করছে, তার হাত দিয়ে ক্ৰিশ কে ঠেলতে চেষ্টা করছে, কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না।
ক্ৰিশের শক্ত বাঁধনে সে পুরোপুরি বন্দী।
Mad for you 2 part 4
বাইরের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে…
অন্ধকার আর নিরবতার মাঝে তারা ঢুকে পড়ে সেই বিশাল, বাড়ির ভেতরে।
রুহির বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে—
সে জানে না সামনে কী অপেক্ষা করছে…
শুধু জানে—এখান থেকে বের হওয়া এত সহজ হবে না…
