Naar e Ishq part 29
তুরঙ্গনা
ভাইবা রুমের নিস্তব্ধতায় কেকে-র মুখে ‘চশমিশ’ সম্বোধনটা অনেকটা চাবুকের ঘাতের ন্যায়ই শোনাল। টেবিলে বসে থাকা বাকি তিনজন প্রফেসর একে অপরের দিকে তাকালো;বিস্ময় আর বিভ্রান্তি তাদের চোখে স্পষ্ট।
তারা জানে, প্রফেসর হিসেবেও কেকে বাকিদের চেয়ে ভিন্ন। ভাবগম্ভীর্য অত্যন্ত বেপরোয়া; মেজাজ আর মর্জির ওপরও কার হাত নেই। কিন্তু তাই বলে এতটা অপেশাদার আচরণ? পূর্বের ইন্টারভিউ গুলোতেও তো সে একদম স্বাভাবিক ছিল। হুট করে তবে কি হলো?
সুহিনের চোখের সামনে তখন সবকিছু দুলছে। মাথার ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করছে, শরীরের সমস্ত শক্তি যেন নিংড়ে কেউ শুষে নিয়েছে। যার থেকে মুক্তি পেতে, যাকে ভুলে থাকতে তার এতো আয়োজন, সেই মানুষটা আবারও তার সামনে। যাকে খুঁজে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এক সময় তাকে তাড়িয়ে বেড়াত, আজ তাকেই মুখোমুখি দেখে সুহিনের সমস্ত চেতনা কেন জানি আতঙ্কে নীল হয়ে আসছে।
রমণীর অস্থিরতা এখন আর আড়ালে নেই; কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম আর কাঁপতে থাকা হাতগুলো তার মানসিক বিপর্যয়ের জানান দিচ্ছিল।
কেকে-র পাশে বসে থাকা বয়োজ্যেষ্ঠ প্রফেসর বিষয়টি লক্ষ্য করে কিছুটা নমনীয় স্বরে রোমান-ইংরেজিতে বললেন,
“প্লিজ, কাম অ্যান্ড টেক ইউর সিট। ঘাবড়ানোর কিছু নেই।”
সুহিন যান্ত্রিকভাবে এগিয়ে গিয়ে চেয়ারে বসল। সে সচেতনভাবেই নিজের নজর কেকে-র থেকে সরিয়ে নমনীয় প্রফেসরের দিকে নিবদ্ধ করল। সে জানত, যদি একবারও ওই পাশের লোকটার দিকে সে তাকায়, তবে চোখের বাঁধ ভেঙে জল উপচে পড়বে নয়তো সে এখানেই ভেঙে গিয়ে সোজা অজ্ঞান হবে।
বাকি তিনজন প্রফেসর সুহিনের থেকে ফাইলটা চেয়ে নিলেন। কেকে-কে পাশ কাটিয়েই তারা সুহিনকে একের পর এক একাডেমিক প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। সুহিন নিজের ভেতরকার সমস্ত জড়তা আর ভয়কে একপাশে সরিয়ে রেখে খুব ধীরস্থিরভাবে উত্তর দিতে লাগল। তবে এবারের জন্যও নিজের দৃষ্টি কেকের দিকে ফেরালো না।
সুহিনের বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তর আর সাজানো গোছানো প্রোফাইল দেখে তারা বেশ সন্তুষ্ট হলেন। একজন প্রফেসর তো ফাইলটা নেড়েচেড়ে প্রশংসার সুরে বলেই ফেললেন,
“আই মাস্ট সে, ইওর পোর্টফোলিও ইজ কোয়াইট ইম্প্রেসিভ। উই আর রিয়েলি ফাসিনেটেড বাই ইওর থটস।”
তিনজন প্রফেসরের চোখেমুখে যখন সন্তুষ্টির ছায়া—অর্থাৎ সুহিনের অ্যাডমিশনের সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত—ঠিক তখনই পাশ থেকে হিমশীতল গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল। কেকে চেয়ারে কিছুটা নড়চড় করে বসে পাশে থাকা প্রফেসরের নাম ধরে ডাকল,
”প্রফ. জোভান্নি…”
কণ্ঠস্বরটা এতই ভারী যে পুরো রুমের পরিবেশ মুহূর্তেই থমকে গেল। কেকের সম্পূর্ণ দৃষ্টি সুহিনের উপর। সে একটিবারেরর জন্যও তার থেকে দৃষ্টি সরায়নি। যথারীতি সুহিন মাথা নুইয়ে বসে রইলেও, কেকে তার দিকে চেয়ে থেকেই খুব ধীরলয়ে অকপটে যোগ করল,
“আই বিলিভ, আই অ্যাম অলসো এ পার্ট অফ দিস বোর্ড। ডোন্ট ইউ থিঙ্ক মাই ওপিনিয়ন ম্যাটারস?”
সুহিন এতক্ষণ একবারের জন্যও মাথা তোলেনি, কিন্তু তার ষষ্ঠেন্দ্রিয় চিৎকার করে বলছিল—কেকে পুরোটা সময় কেবল তার দিকেই তাকিয়ে আছে। এক মুহূর্তের জন্য কৌতূহল আর সংশয় দমনে ব্যর্থ হয়ে সুহিন খুব সামান্য মাথা উঁচিয়ে আঁড়চোখে কেকে-র দিকে তাকাল।
যা ভেবেছিল তাই। কেকে-র সম্পূর্ণ তীক্ষ্ণ, তির্যক দৃষ্টি একমাত্র সুহিনের দিকেই নিবদ্ধ। লোকটা চোখের পলক পর্যন্ত ফেলছে না। তার বাম হাতের কনুই ব্যাক-চেয়ারের হাতলে ঠেকানো, আর সেই হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি ঠেকানো তার ওষ্ঠাধরের বাম কোণে। সে যেন বনের সবচেয়ে নিষ্ঠুর শিকারি নেকড়েটি; যে তার শিকারকে জালে বন্দি করে এখন তার ছটফটানি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সুহিন ওই মারাত্মক চোখের চাহুনিতে বেশিক্ষণ টিকতে পারল না। এক লহমায় মনে হলো তার বক্ষ বির্দীর্ণ হতে শুরু করেছে। সে দ্রুত নিজের মাথা নুইয়ে নিল।ওদিকে অন্য প্রফেসররা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বললেন,
“অফকোর্স প্রফেসর, সরি অ্যাবাউট দ্যাট। হেয়ার ইজ হার ফাইল।”
কেকে বেশ গুরুগম্ভীর ভাবমূর্তি নিয়ে একহাতে ফাইলটা টেনে নিল। অন্যহাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে তার ঠোঁটের কোণটা স্লাইড করতে করতে সে ফাইলে নজর বুলাতে লাগল। অচিরেই তার কপালে পড়ল সূক্ষ্ম একটি ভাঁজ। জিহ্বার অগ্রভাগ মুখের অভ্যন্তরের দ্বন্তে ঠেকিয়ে সে পুরো ফাইলটা এমনভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল, যেন সে কোনো মহাজাগতিক রহস্য উদঘাটন করছে। কয়েক মিনিট পর, অত্যন্ত অবহেলার সাথে ফাইলটা বন্ধ করে, একপ্রকার সজোরে টেবিলের ওপর ছুঁড়ে ফেলল।
ফাইলটা সজোরে টেবিলের ওপর আছড়ে পড়তেই সুহিন শিউরে উঠল। কেকে তার চোখের মণি ঘুরিয়ে বাকি প্রফেসরদের দিকে একবার তাকাল, তারপর অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে সুহিনের দিকে চাইল,
”আই’ম নট ইমপ্রেসড্ অ্যাট অল!”, কেকে-র কণ্ঠস্বর নিরাসক্ত।
সে আবারও সরাসরি সুহিনের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত অবজ্ঞার সুরে বলতে লাগল,
“এই ফাইলটা আহামরি কিছু না। আমাদের ভার্সিটির যে স্ট্যান্ডার্ড, তার ধারেকাছেও এটি নেই। সো জেন্টলম্যান, আই ডোন্ট থিঙ্ক হার এডমিশন ইজ পসিবল হিয়ার।”
তার কথা শুনে পাশ থেকে আরেকজন প্রফেসর কিছুটা বিস্ময়ের সাথে চাপা স্বরে বলল,
“প্রফ কেকে, আপনি কি ভেবে চিন্তে…?”
এবারও কেকে তার দৃষ্টি সুহিন হতে সরালো না। নির্বিকার ভঙ্গিতে আয়েশ করে চেয়ারে কিছুটা হেলে পড়ে বলল,
“ইয়াহ্,আই ডোন্ট ফাইন্ড এনিথিং স্পেশাল হেয়ার। দিস ইজ জাস্ট অ্যান অর্ডিনারি প্রোফাইল। উই হ্যাভ বেটার ক্যান্ডিডেটস ওয়েটিং আউটসাইড।”
বাকিদের কণ্ঠস্বর চাপা রইলেও, কেকে’টা স্পষ্ট। ফলে সুহিন তার সব কথাই শুনতে পাচ্ছে। কেকে আবারও বলে,
“সো, লেটস নট ওয়েস্ট ইচ আদারস টাইম। ইটস অ্যা ‘নো’ ফ্রম মাই সাইড।”
সুহিন স্তম্ভিত হয়ে বসে রইল। দানিয়েল আর নিমরার এত আশা—সব কি তবে এই এক মুহূর্তের ব্যক্তিগত আক্রোশে ধুলিসাৎ হয়ে যাবে? সে মাথা নিচু করে নিজের স্কার্টের একাংশ মুচড়ে ধরল। কেকে-র এই অমানবিক প্রত্যাখ্যান তাকে যতটা না আহত করেছে, তার চেয়ে বেশি অপমানিত করল।
যদিও কেকে-কে এই জায়গায় দেখামাত্রই সুহিন স্থির করেছিল, সে মরে গেলে আর এই ভার্সিটিতে পা রাখবে না। কিন্তু তাকে এভাবে প্রত্যাখানের বিষয়টিও যেন একদমই মেনে নিতে পারছে না।
ভাইবা রুম থেকে সুহিন বেরিয়ে এল; তার মুখখানা শরতের মেঘের মতো ফ্যাকাসে হয়ে আছে। এক বুক আশা আর জড়তা নিয়ে সে ভেতরে ঢুকেছিল, কিন্তু বেরিয়ে এল একরাশ অস্বস্তি, অপমানের বোঝা বয়ে। করিডোরে অপেক্ষারত নিমরা সুহিনকে দেখামাত্রই ছুটে এল। রমণীর চোখের কোণে জমে বিষণ্ণতা দেখে নিমরার বুঝতে বাকি রইল না যে ভেতরে কিছু একটা ওলটপালট হয়েছে।
তবুও সে উচ্ছ্বাসের সাথে জিজ্ঞেস করল,
“কি রে, কেমন হয়েছে? সবকিছু ঠিকঠাক তো?… ”
সুহিন কোনো প্রত্যুত্তোর করল না।নিমরা সুহিনের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে বলল,
“কী হয়েছে? খুব খারাপ হয়েছে ইন্টারভিউ? বাদ দে না, একটাতে না হলে অন্যটাতে হবে। কিন্তু আমরা হাল ছাড়ব না, ঠিক আছে?”
সুহিন এবারও কোনো উত্তর দিল না। তার কানে তখনো বেজে চলেছে সেই মেটালিক কণ্ঠস্বরের নিষ্ঠুর রায়। তারা দুজন ধীরপায়ে ভার্সিটির মেইন গেটের দিকে এগোতে লাগল। কিন্তু গেট পেরোনোর আগেই হঠাৎ এক তীব্র গতির শব্দের সাথে তাদের দৃষ্টি থমকে গেল।
ভার্সিটির সামনে একদম রাজকীয় ভঙ্গিতে এসে থামল একটা ম্যাট-ব্ল্যাক Porsche। গাড়িটা রোদের আলোয় হিরের মতো চকচক করছে। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এল এক যুবক, যার উপস্থিতি পুরো চত্বরের পরিবেশটাই বদলে দিল। পরনে কালো জ্যাকেট আর ফিটেড প্যান্ট, সিল্কি চুলগুলো নিখুঁতভাবে ব্যাকব্রাশ করা। সে তার কালো সানগ্লাসটা নাক থেকে নামিয়ে টি-শার্টের কলারের সাথে ঝোলাতে ঝোলাতে উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে চারপাশ দেখছিল। দেখছিল নয় বরং কিছু একটা খুঁজছিল।
সুহিন দূর থেকেই তাকে বেশ ভালো মতোই চিনতে পারল। নিমরা পাশ থেকে নিজের মতো বকতে থাকলেও, সুহিন হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করল,
”সাদ ভাইয়া…”
নিমরা মাঝপথে থেমে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“অ্যা? কী বললি?” তারপর সুহিনের দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকাতেই দেখল—সেই বাদর লোকটা আবারও তাদের সামনে! নিমরা আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সুহিনের হাতটা শক্ত করে ধরে অন্য পথের দিকে টানতে শুরু করল। সে চায় না এই আপদটা আবারও তাকে দেখে ফেলুক।
কিন্তু ভাগ্য বোধহয় আজ অন্য কিছু ঠিক করে রেখেছিল। নিমরা আর সরে যাওয়ার সুযোগ পেল না। সাদের তীক্ষ্ণ নজর নিমরার ছোট চুলের ওপর পড়তেই সে সব কাজ ফেলে উল্কার বেগে এদিকে ছুটে এল,
”আরে মাধুমা—”
সাদ থামল। কিন্তু নিমরার বদলে তার দৃষ্টি স্থির হলো তার পাশে দাঁড়ানো শান্ত, মায়াবী, নাজুক রমণীর ওপর। সাদের চোখের মণি যেন বিস্ময়ে কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। সে যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারছে না। কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বেরোল না তার গলা দিয়ে।
”হেই বোকা-সুন্দরী! আমি কি হ্যালুসিনেট করছি? এটা… এটা তুমিই তো?”
সুহিন কিছুটা ইতস্তত করে মাথা নিচু করে সায় দিল,
“ভালো আছেন ভাইয়া?”
স্পষ্ট বাংলা শুনে, সাদের আর কোনো সন্দেহ রইল না। সে তীব্র উচ্ছ্বসিত গলায় শুধালো,
“তুমিই কেকে-র ওই বোনটাই তো, তাই না?”
সুহিন এবার কী উত্তর দেবে ভেবে পাওয়ার আগেই সাদ অভাবনীয় এক কাণ্ড করে বসল। সে কোনো কিছু চিন্তা না করেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে, সুহিনকে দুহাতে জাপটে জড়িয়ে ধরল। এক মূহুর্তেই বাচ্চাদের ন্যায় বিশাল এক কোলাকুলি দিয়ে বসল। সাদ যেন ভুলেই গেছে সুহিন কতটা নাজুক; সাদের শক্তিশালী বাহুডোরে সুহিন প্রায় পিষ্ট হওয়ার দশা!
যথারীতি এই দৃশ্যখানা গিয়ে বিঁধল আরো এক অন্ধকার অবয়বের দৃষ্টিতে। ভার্সিটির দোতলার করিডোর হতে কেউ একজন তাদেরকে একমনে চেয়ে চেয়ে দেখছে। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, চোয়াল শক্ত। নিজেকে আড়াল করে না হলেও, তার অন্ধকার ছায়া এই লোকারণ্যে অস্পষ্ট।
এদিকে সাদের কান্ডে, নিমরা পাশ থেকে ভয়ে আর বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল,
“এই, এই! কী করছেন আপনি? ছাড়ুন ওকে, চ্যাপ্টা হয়ে মরে যাবে তো মেয়েটা!”
নিমরার চিৎকারে সাদের হুঁশ ফিরল। সে দ্রুত সুহিনকে ছেড়ে দিয়ে লজ্জা পেয়ে মাথা চুলকে হাসল,
“সরি বোকা-সুন্দরী! আসলে তোমাকে এতদিন পর এভাবে এখানে দেখব, জাস্ট কল্পনাও করিনি। তুমি বিশ্বাস করতে পারবে না,আমি তোমাকে দেখে ঠিক কতটা খুশি হয়েছি।”
সুহিন কোনোমতে একটু হাসার চেষ্টা করল। এর মধ্যেই সাদ নিমরার দিকে ফিরে তার স্বভাবজাত ভঙ্গিতে দুহাত বাড়িয়ে বলল,
“মাধুমাক্ষী, লেটস হ্যাভ আ হাগ!”
নিমরা ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“কিহ্?”
সাদ আবারও তার সহজাত ভঙ্গিতে, নিমরাকে প্রায় জড়িয়ে ধরবে এমন দশা করে বলল,
“কাম অন! মাধুমাক্ষী, হাগ মি!”
—“আরে আরে! কী করছেন আপনি? দূরে থাকুন!”, নিমরা এক ঝটকায় ছিটকে দূরে সরে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল।
—“আরে এমন করছো কেনো? সুহিন আর আমি করেছি যখন, আসো তুমিও করো!”
সাদ দমে না গিয়ে আবারও বলে,
“মাধুমাক্ষী, হাগ মি!”
নিমরা এবার চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে,দাঁতে দাঁত চিবিয়ে বলল,
“এ দেশে পাবলিক টয়লেট নেই? ওখানে গিয়ে হাগুন; মাথা পরিষ্কার হবে।”
সাদ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তারপর চোখ ছোট করে নিমরার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওহ গড! মাই ব্যাড। আমার বোঝা উচিত ছিল,তুমি তোমার নামের মতোই তেঁতো। তার চেয়ে আমার বোকা-সুন্দরীই ভালো।”
এই বলেই সে আবার সুহিনের দিকে ফিরল। নিমরা পাশে দাঁড়িয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
“এই, কী বলতে চাচ্ছেন আপনি?”
সাদ তার কথায় পাত্তাই দিল না। সে সুহিনকে জিজ্ঞেস করতে লাগল,
“তো তুমি এদেশে কবে এসেছ? কেকে জানে? জানেই হয়তো, তুমি তো ওর বোন হও। অথচ ওই বেটা আমাকে কিছুই বলেনি!”
সাদ নিজের মনেই বকবক করতে করতে আবার নিমরার দিকে তাকায়। কি যেন ভেবে নিয়ে তৎক্ষনাৎ সুহিনকে জিজ্ঞেস করে,
“এই, তোমরা দুজন কি পরিচিত? নয়তো দুজন একসাথে কীভাবে?”
নিমরা গম্ভীর হয়ে উত্তর দিল,
“উই আর ফ্রেন্ডস।”
সাদ এবার খুশিতে আরো বেশি আত্মহারা হলো,
“রিয়েলি? হোয়াট আ সারপ্রাইজ! অলসো আ গ্রেট ইন্সিডেন্স—হানি যেখানে, মাধুমাক্ষী সেখানে!”
নিমরা এবার সরাসরি প্রসঙ্গে এল,
“সবই বুঝলাম, কিন্তু আপনি এখানে কী করছেন? এবার বলবেন না যে আপনি আমাদের পিছু… ”
সাদ তার কথা শেষ হতে না দিয়েই বলল,
“একদমই না! আমি এখানে কেকে-র কাছে এসেছি।”
”কেকে এখানে?”— নিমরার কপালে সুক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। কিন্তু সে আর কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেল না। সাদ হুট করে সুহিনের হাতটা শক্ত করে ধরে টানতে টানতে নিজের পোরসে গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
সুহিন বিস্ময়ে অবাক হয়ে বলল,
“আ… ভাইয়া, কী করছেন?”
সাদ না থেমেই উত্তর
“এতদিন পর তোমাকে পেয়েছি, বাড়ি নিয়ে যাব না? চলো আমার সাথে। তালহা, জায়ান আর ফারিস দেখলে তো পাগল হয়ে যাবে! আর বাড়িতে রোজিও আছে, সে-ও কেকে-র বোনকে দেখলে খুব খুশি হবে।”
সুহিন বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল; আমতা আমতা করে বলল,
“কিন্তু ভাইয়া, আমি তো…”
নিমরা পেছন থেকে দৌড়ে এসে সাদকে থামানোর চেষ্টা করল,
“আরে পাগল লোক নাকি আপনি? ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
সাদ কোনো উত্তর দিল না। সে থামলও না। উল্টো হুট করে নিমরার হাতটাও তার অন্য হাতে খপ করে চেপে ধরল।
“ওহ,তুমিও আছো তো। চলো তোমাকেও নিয়ে যাই!”
—“ছাড়ুন বলছি, যাবো না আমি কোথাও।”
নিমরার প্রায় শুয়ে পড়ার দশা। সে কোনোভাবেই এগোতে চাইছে না৷ অথচ সাদের সাথে যেন পেরেই উঠছে না। তার কথায় কোনো গুরুত্ব না দিয়ে আবারও বলল,
“আমরা সবাই মিলে আজকে বড় একটা পার্টি দেব; সবাই অনেক মজা করব, ওকে? লেটস্ গো!”
নিমরা আর সুহিন দুজনকেই টেনেহিঁচড়ে সাদ তার গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগল। নিমরার আর্তনাদ তখনও আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছে,
“পাগল লোক! ছাড়ুন আমাদের! আমি আপনার সাথে কোথাও যাব না! ছাড়ুন বলছি, আআআআ!”
গাড়ির চাকা বিশাল প্রাসাদের নুড়ি বিছানো পথে এসে থামল; মিলানের বিকেলের ম্লান আলো প্রাসাদতুল্য বাড়ির চূড়ায় এক মায়াবী বিষণ্ণতা ছড়িয়ে দিয়েছে। গাড়ি থেকে নেমেই সাদ যেন পুরো এলাকাটা নিজের কলকাকলিতে ভরিয়ে তুলল। নিমরা আর সুহিন একযোগে চারপাশটা দেখতে লাগল। সবদিকে কালো রঙের ছড়াছড়ি, অদ্ভুত সুন্দর হলেও কেমন যেন ভুতুড়ে।
কিন্তু সুহিনের কাছে এই রাজকীয় আভিজাত্য তখন এক মূর্তমান খাঁচা ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছিল না। নিমরা তখনও বিড়বিড় করে সাদের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করছিল, কিন্তু সুহিন পাথরের মতো স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বিশাল সদর দরজার সামনে।
সাদ হইহই করে বাড়ির ভেতরে ঢুকল,
“হেই গাইস! সব কেথায়? দেখো আমি কাদেরকে নিয়ে এসেছি!”
সাদের চিৎকার শুনে ভেতর থেকে বেশ কয়েকজন বেরিয়ে এল। সবার আগে বেরিয়ে এল লাল চুলের এক তন্বী রমণী—ইসাবেলা রোজি। পরনে তার অত্যন্ত আধুনিক এবং পাশ্চাত্য ঢঙের পোশাক, যা তার শরীরের প্রতিটি রেখায় এক উগ্র আভিজাত্য ফুটিয়ে তুলেছে। রোজিকে দেখামাত্রই সুহিন খানিকটা থমকে গেল।
তার স্মৃতিপটে ভেসে উঠল সেই রাতের এক ঝাপসা দৃশ্য—রোমের কনসার্ট শেষ হওয়ার পর ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় এই মেয়েটিই কি কেকে-কে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরেছিল না? সেই দৃশ্যটা সুহিনের অবচেতন মনে এখনো এক জ্বলন্ত ক্ষতের মতো জেগে আছে। রোজির এই আত্মবিশ্বাসী চাহনি আর মোহনীয় রূপ সুহিনকে এক লহমায় বুঝিয়ে দিল যে, কেকে-র বৃত্তে তার অবস্থান কতটা সুদৃঢ় হতে পারে।
এদিকে সুহিনকে দেখে রোজি প্রথমে কিছুটা বিভ্রান্ত হলো। কেকে’র যে কোনো বোনও আছে,এটা সে আগে কখনোই জানত না। এখন সাদ এ-কথা বললেও, কই আগে তো কখনো কেউ এসব বলেনি!
সাদ বড় বড় পা ফেলে ভেতরে ঢুকে সবাইকে প্রশস্ত লিভিং রুমে জড়ো করল। অবশ্য সেখানে আগে থেকেই বসা ছিল তালহা। সাদ উচ্ছ্বসিত গলায় সুহিনকে সবার সামনে দাঁড় করিয়ে ঘোষণা দিল,
“গাইজ, মিট মাই বোক সুন্দরী। ওকে তো সবাই চিনিস। তবে রোজি দেখেনি হয়তো। যাই হোক, রোজি! সুহিন কিন্তু কেকে-র বোন হয়। আর এটা ওর ফ্রেন্ড। কিন্তু ওকে আমি আগে থেকেই চিনি,তাই ওকে আমি আদর করে মাধুমাক্ষী ডাকি!”
নিমরা মনে মনে চোখ-মুখ খিঁচে নিল তার কথায়। কিসব কথাবার্তা! আদর করে মাধুমাক্ষী ডাকে!
অন্যদিকে সুহিন মাথা নিচু করে এক চিলতে ম্লান হাসার চেষ্টা করল। তার নীল চোখ দুটোতে তখন হাজারো প্রশ্ন আর সংশয়। একে একে সবার দিকে তাকাতে তাকাতে তার নজর গিয়ে স্থির হলো তালহার ওপর।
তালহা তার সহজাত গাম্ভীর্য নিয়ে সোফায় বসে ছিল। সুহিনকে দেখে সে কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করল না, কেবল স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সুহিন ইতস্তত করে কম্পিত গলায় জিজ্ঞেস করল,
”ভালো আছেন ভাইয়া?”
তালহা তার সেই চিরচেনা রাশভারী গম্ভীর স্বরে খুব ছোট করে উত্তর দিল,
“এইতো ভালো। তুমি এখানে আসবে, এটা সত্যিই অপ্রত্যাশিত ছিল।”
এদিকে রোজি শুরুতে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও ধীরে ধীরে তার চোখেমুখে খুশির ঝিলিক দেখা দিল। সুহিনের বাদামী চুল, নীল চোখ, শান্ত-নাজুক ভাবমূর্তি—সবই রোজিকে প্রভাবিত করল। এই বিশাল বাড়িতে সে একমাত্র মেয়ে হিসেবে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠেছিল। অবশেষে এখানে তার মতো আরো একজনের আগমন হলো। একজন নয় বরং দুজন। তার ভাবতেই বেশ খুশি খুশি লাগছে।
সুহিনের দিকে রোজি এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিল,
“হাই! আমি রোজি। বিশ্বাস করো, আমি জানতামই না কেকে-র এত কিউট একটা বোন আছে। ইউ আর রিয়েলি সো বিউটিফুল!”
সুহিন বিশেষ কিছু বলল না। তার বিষন্নতার মাঝেই পাশ থেকে নিমরা ফিসফিস করে বলল,
“কি রে ভাই,এরা তোকে কেকে-র বোন কেনো ভাবছে? মানে সত্যিই কেউই তোদের ব্যাপারে কিছুই জানে না?”
সুহিন দ্রুততর নিমরার হাত চেপে ধরে বলে,
“চুপ থাক, জানে না যখন, তবে না জানানোই ভালো। যে সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে,সেটাকে নতুন করে জানানোরই বা কি দরকার?”
সাদ তখন রোজিকে সুহিনের সাথে আরেকটু ঘটা করে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু পরিচয় পর্বের মাঝপথেই সে হুট করে সুহিনের কানের কাছে মুখ নামিয়ে আনল। অত্যন্ত নিচু স্বরে, রহস্যময় হাসির আভা মিশিয়ে ফিসফিস করে বলল,
”বোকা সুন্দরী! একটা কথা বলো তো।”
—“জ্বী ভাইয়া।”
—“তোমার কাছে রোজিকে কেমন লেগেছে?”
হুট করে এহেন প্রশ্নে, সুহিন তার দিকে নজর ফিরিয়ে,স্মিথস্বরে বলে,
“সুন্দর, অনেক সুন্দর।”
সাদ এবার কিছুটা গদগদ স্বরে বলল,
“সুন্দর তাই না? রোজি কিন্তু কেকে-র শুধু ভালো ফ্রেন্ড নয়, বোকা-সুন্দরী। ও কেকে-কে প্রচণ্ড পছন্দ করে। মানে যাকে বলে একদম পাগল! আই হোপ, ও খুব শীঘ্রই এই বাড়ির অফিশিয়াল বউ হয়ে যাবে। তোমার ভাইয়ের সাথে ওর জুটিটা কিন্তু ফাটাফাটি হবে, তাই না?”
সাদের এই রসিকতা মাখানো কথাগুলো সুহিনের কানে উত্তপ্ত সীসার মতো লাগল। সে রোজির উজ্জ্বল হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে এক তীব্র দহন অনুভব করল। তার মানে তার সন্দেহটা ভুল ছিল না। কেকের হাতের রিং-টাও তবে ভুল কোনো সংকেত ছিল না। সবটাই তবে সত্য, আর এটাই সেই রমণী। অথচ যে মেয়েটি কেকে-র হবু স্ত্রী হতে চলেছে, তার সামনে সে এখন বোন পরিচয়ের এক মিথ্যে আবরণে দাঁড়িয়ে আছে! কী নিষ্ঠুর এই নিয়তি!
সুহিন এক মুহূর্তের জন্য সারা বাড়িটা চটজলদি খুঁজে দেখল। না, কেকে বাড়িতে নেই। থাকার কথাও না। সে তো এখনো বাড়ি ফেরেনি। কেকের অনুপস্থিতি সুহিনকে সাময়িক স্বস্তি দিলেও মনের কোণে এক গভীর অস্থিরতা রয়েই গেল।
এদিকে নিমরা পাশ থেকে সাদের দিকে তেড়ে গিয়ে, চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,
“আপনার এই সার্কাস কখন বন্ধ হবে? আমরা হোটেলে ফিরে যাবো। আপনি নিয়ে যাবেন নাকি আমরাই যাবো?”
সাদ ভ্রু উঁচিয়ে হেসে ফেলল। তার হাসিতে নিমরা ভ্রু কুঁচকে ফেলল,
“হাসছেন কেনো?”
Naar e Ishq part 28
—“হাসবো না? তুমি এমন কেনো বলতো? আজ রাতে তোমরা দুজন এখানেই থাকবে। যদি তোমার বেশি সমস্যা হয় তবে একাই হোটেলে ফিরে যেতে পারো। কিন্তু আমি সুহিনকে ছাড়তে পারব না। এখনো কেকে বাড়িতে আসেনি, ও আসবে তারপর ভেবে-চিন্তে ও যা বলবে তাই। আফটার অল, সুহিন তো কেকে-রই বোন।”
সাদের কথা শুনে নিমরার দাঁতে দাঁত পিষে মনে মনে আওড়ায়,
“ওরে হাঁদারাম, ও বোন না বউ! ঐ বেটাই তো সব নষ্টের মূল। নিজেও সাইকো, তার বন্ধুগুলোও সাইকো। মাঝ থেকে আমার ভাইটা শুধু খেটে ম’রছে।”
