এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২৭
নুসরাত ফারিয়া
এক সপ্তাহ পর আজ ভার্সিটিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আলো। সে এখন পুরোপুরি সুস্থ। দ্রুত তৈরি হয়ে কাঁধে ব্যাগ চাপিয়ে, বাম হাতের কব্জিতে ঘড়ি বাঁধতে বাঁধতে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। কারণ তার দেরিতে হয়ে গিয়েছে। ঠিক সময়মতো ক্লাসে না পৌঁছালে আবার কথা শুনতে হবে। তাই সে ঝড়ের বেগে ছুটে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে।
-“চলো, তোমাকে ভার্সিটিতে পৌঁছে দেই।”
আলো রাস্তা দিয়ে হেঁটে সামনে যেতেই, কই থেকে বাইক নিয়ে সামনে এসে হাজির হলো রাত। আলো একবার হাতঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে বিরবির করে বলল,
-“ভার্সিটির বদলে আবার হাসপাতালে পৌঁছে দিবেন না তো?”
রাত হেঁসে মাথার চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলল,
-“আমার উপর ভরসা রাখতে পারো।”
-“বাইক কিন্তু ধীরে চালাতে হবে।”
-“কচ্ছপের গতিতে চালাব, ওখেই?”
আলো হেঁসে বাইকের পিছনে বসতে বসতে বলল,
-“ওখেই!”
এ ক’দিনে রাতের সাথে একটু ভাব হয়েছে তার। সে প্রথমে যতটা খারাপ ভেবেছিল, অতটাও খারাপ না ছেলেটা। শুধু ওই একটু-আধটু প্লেবয় টাইপের এই! তবে তার সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি। আর না সে খারাপ ব্যবহার করেছে।
রাত বাইক নিয়ে একেবারে ভার্সিটির ভেতরে এসে থামল। আলো নেমে একগাল হেঁসে বলল,
-“ধন্যবাদ ভাইয়া। আপনার জন্য সময়মতো পৌঁছাতে পারলাম।”
রাত হেলমেট খুলতে খুলতে বলল,
-“কাছের মানুষদের ধন্যবাদ বলতে নেই।”
-“নেক্টস টাইম মনে রাখব, এখন আসি। বাই!”
একথা বলে আলো চলে যেতে চাইলে রাত পিছন থেকে ব্যাগ টেনে ধরল। আলো থমথমে মুখে পিছনে ফিরে তাকায়। এরা দুই ভাই এটা সেটা ধরে শুধু টানাটানি করে ক্যান?
-“কিছু বলবেন?”
-“উমমম….নাও!”
রাত দুটো চকলেট বাড়িয়ে ধরল। আলো চুপচাপ নিয়ে বিদায় দিয়ে ক্লাসের উদ্দেশ্যে ছুটে গেল। রাত কিছুক্ষণ ওখানে থেকে হেলমেট পরে বাইক নিয়ে বেরিয়ে যায় ভার্সিটি থেকে। তারা কেউ-ই খেয়াল করল না, তাদেরকে এতক্ষণ পাঁচ তলায় দাঁড়িয়ে থেকে দেখছিল আধার।
আলো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে চকলেটের কাগজ খুলে কামড় দিতে যাবে, তখনই খেয়াল করল তার হাত থেকে দুটো চকলেটই উধাও। সে চমকে উঠে মাথা তুলে সামনে তাকায়। তারপর কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
-“বাঁদরে মতো আপনি আমার চকলেটগুলো ছোঁ মে’রে নিয়ে নিলেন কেন স্যার?”
আধার অদূরে চকলেট দুটো ছুঁড়ে মে’রে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“এত চকলেট খেয়েও তোমার মন ভরেনি?”
আলো হতবাক হয়ে নিচে পড়ে থাকা চকলেটের দিকে তাকায়। অবাক কণ্ঠে শুধাল,
-“আপনি আমার চকলেট এইভাবে ফেলে দিলেন?”
-“ভাগ্যিস, চকলেটের জায়গায় তোমাকে ছুঁড়ে মা’রিনি।”
আলো দাঁতে দাঁত চেপে কিছু না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময় শুনতে পেল,
-“তোমাকে পুরো চকলেটের দোকান এনে দিবো। তবুও যেন অন্য কারোর থেকে আর চকলেট বা অন্য কিছু না নেওয়া হয়। যেটা লাগবে আমাকে এসে বলবে, আমি এনে দিবো।”
একথা শুনে আলো থেমে গিয়ে বলল,
-“আমি কার থেকে কী নিবো না নিবো, তাতে আপনার কী?”
কথাগুলো তার বলতে দেরি হলেও আধারের তেড়ে এসে তাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরতে একটুও দেরি হলো না।
এক মূহুর্তের জন্য আলোর নিঃশ্বাস থমকে যায়। নরম ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে তার পুরো শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। বারবার শুকনো ঢোক গিলে দু’হাতে পরণের জামা খামচে ধরল।
-“আজকাল বড্ড বেশি জ্বালান আপনি, মিসেস খান! যেগুলো পছন্দ করি না, সেগুলোই করেন। যদি বলি ডান দিকে যেতে, আপনি যান বাম দিকে। এত অবাধ্য কেন আপনি, হুম?”
আধার হিসহিসিয়ে কথাগুলো বলে। আলো চোখ বুজে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে আজ বুঝতে পারল, কেউ কাউকে চুমু খেলে ঠিক কেমন অনুভূতি হয়। সে তো এতদিন কিছু না ভেবেই হুটহাট চুমু খেয়েছে স্যারকে। কারণ লোকটা সেটা পছন্দ করত না, তাই তো সেও ত্যাড়ামি করে ঘুরেফিরে ওই একই কাজ করে বসে থাকত। কারণ পঁচা স্যারকে জ্বালাতে ভীষণ ভালো লাগে৷ কিন্তু আজ লোকটার এলোমেলো স্পর্শের কাছে তার শরীরটা ভেঙে আসছে।
-“ক….কী করছেন কী? ছাড়ুন আমায়। আজ নিশ্চয়ই আপনি নেশাটেশা করে এসেছেন। কেউ দেখে ফেললে, সর্বনাশ হয়ে যাবে!”
আধার গলায় মুখ ডুবিয়ে ছিল। আর তার একহাত মেয়েটার জামার ভেতর কোমরে মাঝে রয়েছে। সে চোখ বুজে লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলিয়ে নিল। একটু সময় নিয়ে মেয়েটাকে ছেড়ে দিল। তবে অবাধ্য হাতে মেয়েটাকে একটু গভীরভাবে ছুঁয়ে দেওয়ার পর।
স্যারের কাজে আলো কয়েক মিনিটের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। অনুভব করল তার পা জোড়া কাঁপছে। মেয়েটা বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, সিঁড়ি ওপরই ধপ করে বসে পড়ল। লোকটা যে এমন কিছু করতে পারে, সেটা কল্পনারও বাইরে ছিল। তার হার্টবিট অস্বাভাবিকভাবে লাফাচ্ছে। একই সাথে লজ্জায় এখন ইচ্ছে করছে ছুটে পালিয়ে যেতে। অন্যদিকে, আধার সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুঁজে মেয়েটার হাবভাব দেখে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“কাউকে ছুঁয়ে দিলে কেমন লাগে, এখন সেটা ফিল করতে পারছো?”
আলো কপালের ঘাম মুছে অস্ফুটস্বরে বলল,
-“আপনি কিন্তু এটা একদম ঠিক করলেন না।”
-“আমি আজ যেটা করেছি, ওটা তুমি প্রতিনিয়ত আমার সাথে করো। কি ভাবো তুমি? আমি সবসময় ঘুমিয়ে থাকি? গতকাল রাতে তুমি কোথায় কামড়, চিমটি মে’রেছিলে, সেটাও জানি। আর আমি তো শুধু ছুঁয়েছি, তোমার মতো কামড়, চিমটি মা’রিনি!”
আলোর ইচ্ছে করল মাটির নিচে ঢুকে যেতে। সে আর ওখানে এক মূহুর্তের জন্যও থাকল না। নিচ থেকে ব্যাগ নিয়ে এক ছুটে নিচে নেমে গেল। তার আজ ভার্সিটিতে আসাটাই ভুল হয়ে গেছে। সকালে কার মুখ দেখে যে উঠেছিল কেহ জানে!
ভার্সিটি থেকে ফিরে গোসল নিয়ে খাওয়াদাওয়া করে ভাতঘুম দিয়েছে আলো। সে আজ সব ক্লাস করলেও ওই অসভ্য লোকটার ক্লাসের আশেপাশেও যায়নি। সোফার মাঝে খরগোশের ছানারা গুটিসুটি মে’রে শুয়ে আছে। তাদের নাম রেখেছে—টুনা, টুনি! এটা নিয়ে লোকটা কয়েকদিন তাকে পচিয়েছে।
ঘুম ভাঙল বিকেলের দিকে। ড্রয়িংরুমে এসে কাউকেই দেখতে পেল না। তাহমিনা খান গিয়েছে পাশের বাসায়। দাদাজান গিয়েছে মেবি বাজারে। আর শেফালি চাচি কই গেছে জানে না৷ পুরো বাড়িতে একা সে। এখন কী করবে ভাবতে ভাবতে রান্নাঘরে গিয়ে ফ্রিজ থেকে আইসক্রিম নিয়ে এসে সোফায় বসল। তারপর টিভিতে গোপাল ভাঁড় দিয়ে দেখতে থাকল।
কিছুক্ষণ সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পর বাইরে থেকে রাত ফিরল। এই ছেলেটা সারাদিন শুধু বাইক নিয়ে টইটই করে ঘুরে বেড়ায়। কোনো কাজকর্ম নেই!
-“কফি পাবো?”
আলো আইসক্রিম খেতে খেতে বলল,
-“ফ্রেশ হয়ে আসুন, বানিয়ে দিচ্ছি।”
রাত মাথা নাড়িয়ে দোতলায় উঠে গেল৷ আলো আইসক্রিম শেষ করে টিভি বন্ধ করে রান্নাঘরে গিয়ে কফি বানাতে শুরু করল। সাথে কিছু নাস্তাও তৈরি করতে থাকল, কারণ মানুষটার আসার সময় হয়ে গেছে। রাত শাওয়ার নিয়ে তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ড্রয়িংরুমে এল। আলো এসে ধোঁয়া ওঠা কফি দিয়ে যায়।
আলো কাজ করার মধ্যে খেয়াল করল—রাত তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। সে ঘাড় ঘুরিয়ে একপলক তাকিয়ে বলল,
-“আপনার জামাকাপড় নেই?”
রাত কপাল কুঁচকে বলল,
-“আমাকে দেখে তোমার গরিবস মনে হয়? উমম…বেকার হতে পারি, বাট গরিবস নই!”
-“তাহলে সারাক্ষণ এমন গোপাল ভাড়ের মতো খালি গায়ে থাকেন কেন?”
-“তুমি আমাকে ওই টাকলু, পেট মোটা গোপাল বললে? আর ইউ সিরিয়াস? তুমি জানো? আমাকে দেখে কত মেয়ে পাগল?”
আলো বিরবির করে বলল,
-“খোলা জিনিসে মাছি পড়ে বেশি।”
রাত কিছুক্ষণ চুপ থেকে আলোর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“বাই এনি চান্স….আমাকে এমনভাবে দেখলে তোমার সমস্যা হয়?”
আলো অবাক কণ্ঠে বলল,
-“আমার কেন সমস্যা হবে আজিব!”
একথা বলে আলো পাশে তাকাতেই ভরকে গেল। গম্ভীর কণ্ঠে বলার চেষ্টা করল,
-“আমার দিকে এগোচ্ছেন কেন?”
রাত কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে বলল,
-“তুমি এত কিউট কেন, বলো তো?”
আলো প্রচুর বিরক্ত হয়। ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল,
-“বড় ভাইয়ের বউয়ের সাথে ফ্লার্টিং করা বন্ধ করুন।”
-“ভাইয়ের বউ যদি হয় একটা বার্বিডল, তাহলে তার সাথে একটু-আধটু ফ্লার্টিং করাই যায়।”
আলো কিছু বলতে যাবে তখনই শুনতে পেল,
-“আজকাল দেখছি, তুই রান্নাঘরেই থাকিস বেশি।”
বড় ভাইয়ের কথা শুনে রাত পিছনে ফিরে বলল,
-“আমার মন যেখানে চাইবে, আমি সেখানেই থাকব ব্রো।”
আলো স্বামীর দিকে তাকায়। লোকটা বাড়ি ফিরে ফ্রেশ না হয়ে সোজা এখানে চলে এসেছে। দু’জনের চোখাচোখি হতেই আলো নজর নামিয়ে নিল। আধার গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“রুমে যাও!”
আলো কিছু না বলে টুনা-টুনির জন্য দুটো গাজর ও নাস্তার প্লেট নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রাত একটা আপেল নিয়ে খেতে খেতে চলে যেতেই আধার বলে উঠল,
-“দাঁড়া।”
রাত থেমে ঘাড় কাত করে বলল,
-“বলো?”
-“ওর থেকে দূরে থাক।”
-“কেন?”
-“কারণ….ও আমার বউ।”
-“সো হোয়াট?”
আধার দাঁতে দাঁত পিষলো,
-“নিজের লিমিট ক্রস করিস না রাত। নয়তো তোর পুরো ব্যাকগ্রাউন্ড তোর মায়ের সামনে নিয়ে আসব। তুই দেশের বাইরে থাকাকালীন কী কী করেছিস, আর দেশে এসে কী কী করছিস, সবকিছু কিন্তু আমি জানি!”
-“মায়ের ভয় দেখাচ্ছো?”
-“জানি, উনি কিছু করবেন না। তবে তোর ফুলের মতো
চরিত্রের ইতিহাস জানলে, ঠিকই বিয়ে দিয়ে দিবেন।”
রাত কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
-“তুমি তো ওই মেয়েটাকে বউ হিসেবে মানো না, আর না ভালোবাসো। তাহলে এত সমস্যা কেন?”
-“তুইও তো তোর গার্লফ্রেন্ডদের মন থেকে ভালোবাসিস না, তাহলে ওদের সাথে রুম ডেটে যাস কেন?”
একটু থেমে পুনরায় বলল,
-“আমি বিদেশে থাকতে তোকে বারবার বলেছি এসবের নেশা ছেড়ে দিতে। কিন্তু তুই উল্টো আমার সামনেই বিদেশি মেয়েদের সাথে ঘনিষ্ঠ হতিস। যেখানে ওদেরই এসবে কোনো আপত্তি নেই, সেখানে আমি বাঁধা দিয়ে কী করতাম? তাই তোর ব্যাপার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি৷ তোর জীবন, তোর সবকিছু, এতে আমার কী? এত বছর পর যখন দেশে ফিরে এলি আর স্বাভাবিক ভাবে চলাফেরা করলি, তখন ভেবেছিলাম নিজেকে শুধরে নিয়েছিস। কিন্তু তুই আবারো সেই ঘুরেফিরে একই পথে চলতে শুরু করেছিস৷ আর এসবের মাঝখানে এখন আমার বউকে টানছিস কেন? ও ভীষণ সাদাসিধা একজন সহজসরল মেয়ে, একটুতেই তোকে ভালো ভেবে বিশ্বাস করে নিয়েছে। এর মূলত কারণটাই হচ্ছে তুই আমার ছোট ভাই, এইজন্য মেয়েটা তোকে ভাইয়ের মতো দেখে তোর সাথে মিশছে, গল্প করছে, হাসাহাসি করছে। কিন্তু, শালা তোর মতলব খারাপ!
দেখ রাত! তোকে আমি শেষ বারের মতো বলছি, ওই মেয়েটার থেকে দূরে থাকবি। ওর কাছে যাওয়ার একটুও চেষ্টা করবি না। তোর জন্য যদি আমার বউয়ের কিছু হয়, তাহলে আই সোয়ার! জীবনের প্রথম খু’নটা তোকেই করব আমি।”
কথাগুলো বলে হনহনিয়ে দোতলায় উঠে গেল আধার। রাত দাঁড়িয়ে থেকে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছেড়ে আনমনে বলল,
-“আমি বোম্বাই মরিচকে কখনোই খারাপ নজরে দেখিনি।”
আধার রুমে এসে সোজা ওয়াশরুমে গিয়ে লম্বা শাওয়ার নিয়ে মাথা ঠান্ডা করে, বেশ কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এল৷ সোফায় বসে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে পিছনে মাথাটা ঠেকিয়ে রাখল। আলো বিছানায় বসে থেকে টুনা, টুনিকে নিয়ে খেলছিল আর মানুষটাকে খেয়াল করছিল। সে উঠে এসে সোফার পিছনে দাঁড়িয়ে ওড়নার আঁচল দিয়ে, মানুষটার মাথার ভেজা চুলগুলো যত্নের সাথে মুছে দিতে লাগল।
আধার চোখ মেলে তাকিয়ে ওই ইনোসেন্ট মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। মেয়েটা নিজের কাজ শেষ করে চলে যাওয়ার সময় আধার চট করে ওড়নার আঁচল খামচে ধরল। আলো অদ্ভুত চোখে লোকটার দিকে তাকায়। এই অসভ্য লোকটা তার পুরো ওড়না খুলে নিয়েছে। আধার হাতে থাকা ওড়নার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
-“ওড়না কীভাবে পড়ো? একটু টান দিতে না দিতেই খুলে যায়?”
আলো দাঁত কিড়মিড় করে এগিয়ে এসে নিজের কাঁধ দেখিয়ে বলল,
-“একটু টান হ্যাঁ? এই একটু টানের জন্য কখনো সেফটি পিন খুলে বাঁকা হয়ে যায়?”
আধার মুখ তুলে মেয়েটার কাঁধে বাঁকা হয়ে খুলে যাওয়া সেফটি পিনের দিকে তাকায়। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিঃশব্দে উঠে এসে মেয়েটার সামনে দাঁড়াল। অতঃপর ওড়নাটাকে একদম হিজাবের মতো করে পেচিয়ে মেয়েটাকে পরিয়ে দিল। মাথার চুল থেকে হাতের কনুই পর্যন্ত ঢেকে গেল। শুধু ফর্সা, গোলগাল মুখখানা বেরিয়ে থাকল।
-“এখন থেকে রুমের বাইরে গেলে এমন করে ওড়না পরে যাবে। আর সবসময় সুতির বড় ওড়না পরবে। আমি কাল আরো ওড়না এনে দিবো। বাড়িতে দাদাজান, শেফালি চাচি না থাকলে রুমের দরজা ভেতর থেকে লক করে টুনা, টুনিকে নিয়ে খেলবে। অহেতুক ড্রয়িংরুমে বা রান্নাঘরে যেতে হবে না। আমি রুমেই শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করে রাখবোনি। আগামীকাল থেকে আমার সাথে ভার্সিটিতে যাবে। কারোর বাইকে যেন উঠতে না দেখি! আর রাতের থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করবে।”
কথাগুলো শুনে আলো ভ্যাবলার মতো হা করে তাকিয়ে আছে। মেয়েটাকে এমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আধার চোয়াল শক্ত করে, ওড়নাসহ মেয়েটার এক কান টেনে ধরে বলল,
-“যা যা বললাম সব কানে ঢুকেছে?”
ব্যথায় আলো ছটফটিয়ে উঠে বলল,
-“ঢুকেছে, ঢুকেছে, সব কথা ঢুকেছে।”
-“সব মেনে চলবে? নাকি আমার অবর্তমানে অবাধ্য হবে?”
আলো কান্নারত কণ্ঠে বলল,
-“ম….মানবো, সব মানবো। একটুও অবাধ্য হবো না। আয়ায়া….লাগছে তো!”
আলো আর্তনাদ করে উঠতেই আধার কান ছেড়ে দিল। মেয়েটা ওড়না টেনেটুনে খুলে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের কান চেক করল। লাল টমেটোর মতো হয়ে আছে। এটা দেখে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
-“আপনার ওটা হাত নাকি অন্য কিছু হ্যাঁ? এত শক্তি পেয়েছেন কোথায় থেকে? খান তো ওই গরুছাগলের মতো ঘাসপাতা! অথচ আমি এত এত মাংস খেয়েও একটু শক্তিশালী হলাম না। যেখানে সেখানে শুধু উল্টে পড়ে যাই।”
আধার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল,
-“তুমি তো তুলোর মতো। যাকে একটা ফুঁ দিলেই উড়ে যাবে।”
আলো মুখ ভেংচি কেটে কান মালিশ করতে করতে কিছু একটা মনে পড়ল। সে পিছনে ফিরে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
-“ভাইয়া, আপুর বিয়েতে যাবেন?”
রহিত ও মেঘলার বিয়ে আর কিছুদিন পর। এই তো দু’দিন আগে মতিউর রহমান এবং মাহবুব রহমান এসে বিয়ের কার্ড দিয়ে পুরো পরিবারকে দাওয়াত করে গিয়েছেন। তাহমিনা খান সাফসাফ জানিয়ে দিয়েছে তিনি যাবেন না, আর তিথিও আসতে পারবে না, রাতও যাবে না, সোবহান খানও যেতে পারবে না, কারণ তিনি পরশু গ্রামের বাড়িতে যাবেন। এখন শুধু সে বাকী রইল।
আধার একটু সময় নিয়ে আওরাল,
-“তুমি চাও, আমি যাই?”
আলো তড়িঘড়ি করে মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“হুম…চাই, চাই!”
-“ঠিক আছে, যাবো।”
মূহুর্তেই আলো খুশি হয়ে গেল। আধার ব্যাগ খুলে অনেকগুলো চকলেট বের করে টি-টেবিলের ওপর রেখে দিল। আলো গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে একটা চকলেট নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“এইগুলো আমার জন্য?”
-“না, আমার আরেকটা বউ আছে। তার জন্য!”
আলো চকলেট খেতে খেতে শব্দ করে হেঁসে উঠে বলল,
-“আপনার মতো হিটলার আদা খান-কে, কে বিয়ে করবে?”
আধার দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দু’হাত বুকের ওপর ভাজ করে রেখে বলল,
-“মেয়ের অভাব রয়েছে নাকি?”
আলো এক ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“আপনার কী আবার বিয়ে করার ইচ্ছে আছে?”
-“যেখানে একটাই বিয়ে করতে চাইনি, সেখানে আবার বিয়ে করে কী করব? চাইলে তুমি করতে পারো। আই ডোন্ট মাইন্ড!”
-“আমাকে অন্য পুরুষের সাথে শেয়ার করতে পারবেন?”
আধার কোনো জবাব দিল না। সে এখন এটা কিছুতেই করতে পারবে না। যেখানে সামান্য কারোর নজরই সহ্য করতে পারছে না, সেখানে অন্য কারোর সাথে শেয়ার করা অসম্ভব! সে এটা কল্পনাও করতে পারে না। আধার চোখ বুজে শান্ত গলায় বলল,
-“আমি যাকে দেখেছি, ছুঁয়েছি, নিজের বুক শেয়ার করেছি, তাকে অন্য কারোর সাথে শেয়ার করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। বিকজ….আধার খান নিজের ব্যক্তিগত জিনিসের ভাগ দিতে পছন্দ করে না। আর না ওই জিনিসের ওপর কারোর নজর সহ্য করে। যেটা আমার, সেটা শুধু আমারই!”
আলো হেঁসে এগিয়ে এসে বলল,
-“আমাকে নিয়ে এতটা পজেসিভ কবে থেকে হলেন?”
আধার সোজা হয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“পজেসিভ আর তোমাকে নিয়ে? কখনোই না। আমি তো কথাগুলো জাস্ট এমনি বললাম, মানে উদাহরণ দিলাম। এটাকে সিরিয়াসলি নিও না! আমি তোমাকে আগে যেমন অপছন্দ করতাম, ঠিক এখনো তেমনটাই অপছন্দ করি।”
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আমাকে একটু ভালোবাসা যায় না?”
‘ভালোবাসা’ কথাটা শুনে মূহুর্তেই আধারের চেহারার রঙ পাল্টে গেল। সে এতদিনের সবকিছু ভুলে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল,
-“ভালাবাসা? আধার খান কখনোই ভালোবাসবে না। অন্তত তোমাকে তো কখনোই না! এইগুলো জাস্ট নিজের দ্বায়িত্বের খাতিরে পালন করছি। বিয়েটা যেভাবেই হোক, হয়েছে তো? এই অনাকাঙ্ক্ষিত সম্পর্ক-কে তো আর অবহেলা করতে পারি না। তুমি তোমার বাবার আদরের মেয়ে, কখনো কষ্ট, কোনোকিছুর কমতি অনুভব করোনি। সেখানে আমি তোমাকে অবহেলা করি কীভাবে বলো তো? এতকিছু করছি মানে এই নয়, আমি তোমাকে ভালোবাসি। কোনো পুরুষ বউকে মানুক বা না মানুক, তবুও বউকে অন্য কারোর সাথে সহ্য করতে পারবে না। ওই যে বউ বলে কথা! না চাইতেও একটা সম্পর্ক আছে তো।”
একটু থেমে পুনরায় বলল,
-“সকালের ঘটনার জন্য আমি খুব সরি! ইচ্ছে করে তোমাকে স্পর্শ করতে চাইনি, আবেশের বশে ভুল করে ফেলেছি। এসবের কারণে কোনো ভুল ধারণা নিজের মনে পুষে রেখো না। নয়তো পরে নিজেই কষ্ট পাবে!”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে আধার বারান্দায় চলে গেল। অন্যদিকে, আলো থম মে’রে দাঁড়িয়ে রইল। সে ভেবেছিল, লোকটা একটু একটু করে তাকে মেনে নিচ্ছে। এতকিছুর মধ্যে সে বাজেভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে মানুষটার প্রেমে। আগের থেকেও বেশি এখন ভালোবাসে লোকটাকে। হ্যাঁ, সে ভালোবাসে তার পঁচা স্যারকে, ভীষণ ভীষণ ভালোবাসে। হয়তো সেটা একতরফা ভালোবাসা! তবুও সে ভালোবাসে। অথচ মানুষটা তাকে একটু ভালোবাসতে পারল না! এতদিন যা, যা করেছে এবং করছে, সবটাই দ্বায়িত্ব শুধু৷
আলো শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। টুনা, টুনিকে নিয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসল। হেড বোর্ডের সাথে মাথাটা ঠেকিয়ে চোখ বুজতেই, গাল বেয়ে কয়েকটা ফোঁটা নোনা অশ্রুজল গড়িয়ে পড়ল। মেয়েটা তড়িঘড়ি করে চোখ মুছে নিল। সে কাঁদছে কেন আশ্চর্য! আগে থেকেই তো জানত, ওই লোকটা তাকে পছন্দ করে না, আর না ভালোবাসে। তাহলে আজ কেন এত কষ্ট হচ্ছে তার? সে তো সবকিছু জেনেশুনেই ভালোবেসেছে ওই ত্যাড়া লোকটাকে। আর এতে তার কোনো আপত্তি ছিল না। সে এভাবেই মেনে নিয়েছে সবটা। তাহলে এখন কেন এমন দম বন্ধ অসহনীয় অনুভূতি হচ্ছে? আচ্ছা, স্যার কী তাকে কখনো ভালোবাসবে না? একটু ভালোবেসে কী কখনোই নিজের মনে জায়গা দিবে না? নাকি সারাজীবন শুধু নিজের দ্বায়িত্বটুকুই পালন করে যাবে?
এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ২৬
কোনো প্রশ্নের জবাব পেল না আলো। আর না খোঁজার চেষ্টা করল। লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলিয়ে নিল এবং একসময় ওইভাবেই ঘুমিয়ে পড়ল। আধার অনেকক্ষণ পর রুমে এসে দেখে মেয়েটা রাতের খাবার না খেয়েই ঘুমিয়ে গেছে। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কাছে এসে কোল থেকে টুনা, টুনিকে নামিয়ে মেয়েটাকে ঠিক করে শুয়ে দিয়ে শরীরে কম্ফোর্টার টেনে দিল। একটু পর শেফালি চাচি খাবার খাওয়ার জন্য ডাকতে এলে সে জানিয়ে দেয়—খাবে না। উনি চলে যাওয়ার পর দরজা লাগিয়ে, বাতি নিভিয়ে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এল। তারপর মেয়েটার পাশে বিছানার সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসল। মাথাটা বিছানায় ঠেকিয়ে ঘাড় কাত করে ঘুমন্ত মেয়েটার দিকে অপলক নয়নে তাকিয়ে রইল। এবং একসময় অস্ফুটস্বরে বিরবির করে বলে উঠল,
-“আমার এই ছন্নছাড়া, অন্ধকার জীবনে না এলেও পারতে, মিসেস আধার খান!”
