Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 31

Naar e Ishq part 31

Naar e Ishq part 31
তুরঙ্গনা

“ডোন্ট ইউ ফাকিং ডেয়ার মেক অ্যা সাউন্ড। আই হেইট নয়েজ ঠু মাচচচ!”
সুহিন নড়াচড়া করার শক্তি হারিয়ে ফেলল।
রান্নাঘরের জমাট বাঁধা অন্ধকারে কেকে-র হিংস্র চাউনির সামনে রমণীর সমস্ত সত্তা যেন প্রতিনিয়ত কুঁকড়ে যাচ্ছে। শরীরের প্রতিটি লোমকূপ খাড়া হয়ে গিয়েছে, এক তীব্র কম্পন তার সর্বাঙ্গে ঢেউয়ের খেলছে।
রমণীর সেই থরথরানি কম্পন কেকে-র শক্ত হাতের মুঠোয় স্পষ্ট ধরা পড়ল। ঠিক তখনই, অদ্ভুত এক ঘোরের বশেই যেন কেকে হঠাৎ সুহিনকে ছেড়ে দিল। তার সেই দৃঢ় হাতদুটো আলগা হতেই সুহিন দীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলল; কিন্তু তার আতঙ্ক কাটল না।

​কেকে সুহিনের দিক থেকে নজর সরিয়ে নুইয়ে পড়া চোখে নিচের দিকে তাকায়। মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা পানির আল্পনা আর চূর্ণ-বিচূর্ণ কাঁচের টুকরোগুলো চাঁদের আলোয় বিঁধছে। কেকে এক মুহূর্তও কালবিলম্ব করল না; অত্যন্ত অবিশ্বাস্যভাবে সে নিজেই হাঁটু গেড়ে মেঝের ওপর বসে পড়ল। তার সেই অভিজাত ব্যক্তিত্বের আড়ালে থাকা মানুষটা যেন আচমকা বদলে গেল। সে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে, ধীরস্থিরভাবে একটার পর একটা কাঁচের টুকরো একযোগে তুলতে শুরু করল।
​সুহিন তখনও মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। তার চোখের সামনে যেন এক পরাবাস্তব দৃশ্য। কেকে-র পরনে কেবল একটি কালো ফিটেড টি-শার্ট আর ট্রাউজার। নিচের দিকে ঝুঁকে কাজ করায় তার অবিন্যস্ত ওল্ফ-কাট চুলগুলো কপালের ওপর এসে চোখ দুটোকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে। তার সমস্ত মনোযোগ তখন মেঝেতে পড়ে থাকা সেই তীক্ষ্ণ কাঁচের কণাগুলোর দিকে। সুহিন একনজরে তাকে পরখ করে নিল।
​খানিক বাদে হুঁশ ফিরতেই সুহিন তড়িঘড়ি করে নিচে বসে পড়ল। সে চাইল অন্তত এই কাজে তাকে সাহায্য করা যাক। কাঁপা গলায় সুহিন বলে উঠল,

“আ…আমি করে দিচ্ছি, আপনি রাখুন…”
​কিন্তু রমণীর কথা শেষ হওয়ার আগেই কেকে-র হাতটা বিদ্যুতের গতিতে এসে সুহিনের হাতখানা চেপে ধরল। সেই অতর্কিত বাধায় আর অসাবধানতায় একটি ধারালো কাঁচের ফালি সুহিনের আঙুলের একাংশে বিঁধে গেল। সূক্ষ্ম রক্তপাত শুরু হলেও সুহিনের সেদিকে খেয়াল ছিল না, কারণ তার সমস্ত চেতনা তখন কেকে-র স্পর্শে অবশ। কেকে সুহিনের ব্যথিত হাতের দিকে না তাকিয়েই, তার হাতটা একপ্রকার সরিয়ে দিয়ে অত্যন্ত চাপা-গম্ভীর ঘরনায় ভগ্নস্বরে বলল,
​”আই ক্যান ডু ইট।”
​সুহিন আর কিছু বলার সাহস পেল না। তার অন্তরাল অভিমানে ভারী হয়ে এল। কেকে-র এই রূঢ় তব দায়িত্বশীল আচরণ তাকে এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় বিদ্ধ করল। সে নিজের কেটে যাওয়া আঙুলটা দ্রুত গাউনের আড়ালে লুকিয়ে ধীরপায়ে উঠে দাঁড়াল।
ওদিকে কেকে অত্যন্ত নিপুণভাবে কাঁচের শেষ কণাটুকুও সরিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিল।
​কাজ শেষে কেকে সিঙ্কের কাছে গিয়ে হাত ধুতে লাগল। সুহিন কিচেনের এক অন্ধকার কোণে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। তার মস্তিষ্কে তখন নানান চিন্তার ভাবনা । এখন কী করবে সে? নিঃশব্দে প্রস্থান করবে, নাকি একটা কথা বলবে? কিন্তু কী বলবে? সে কেমন আছে—এমন অর্থহীন প্রশ্ন? এই মানুষটা যে তার ঐশ্বর্য আর প্রতিপত্তিতে ভালোই আছে, তা তো বাড়ির দেওয়ালের প্রতিটি ইট সাক্ষ্য দিচ্ছে।

ভার্সিটিতে আজ সে যে অমানুষিক আচরণ করেছে, তারপর এই সৌজন্যবোধ দেখানোর তো কোনো মানেই হয় না! তবে কি ডিভোর্সের ব্যাপারে কথা তুলবে? এই মাঝরাতে, এই অন্ধকার রান্নাঘরে? নাকি জিজ্ঞেস করবে সে এত রাতে এখানে কী করতে এসেছিল? সুহিন নিজের মনেই হাসল—এটি তার বাড়ি, সে যখন খুশি যেখানে ইচ্ছে সেখানে যেতে পারে; এই বোকামি প্রশ্ন তোলার কোনো যুক্তি নেই।
​সবটুকু চিন্তা ঝেড়ে ফেলে সুহিন সিদ্ধান্ত নিল, এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। পানির পিপাসা সে সকালেই মিটিয়ে নেবে। এই ভাবনায় সে রান্নাঘর থেকে চলে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়াল মাত্র, ঠিক তখনই সিঙ্কে হাত ধুতে থাকা কেকে-র সেই তীক্ষ্ণ-শীতল হাস্কি কণ্ঠস্বর নিস্তব্ধতা চিরে সুহিনের কর্ণমূলে আছড়ে পড়ল,
​”আমি এখনো যেতে বলিনি তোকে!”
​সুহিন শিউরে উঠল। তার পায়ের পাতা মেঝের সাথে যেন আটকে গেল। কেকে তখনও তার দিকে ফিরে তাকায়নি, কিন্তু
​রান্নাঘরের ঘুটঘুটে অন্ধকার কোণে সুহিন এক জীবন্ত মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে। ওদিকে কেকে অত্যন্ত ধীরলয়ে একটি গাঢ় নীল রঙের কিচেন অ্যাপ্রন গায়ে জড়িয়ে নিল। অতঃপর চুলোয় একখানা প্যান বসাল; ফ্রিজ আর শেলফ থেকে একে একে সবজি আর রান্নার সরঞ্জাম বের করে টপ-কাউন্টারে সাজাল। সসপ্যানে পানি গরম হতে দিয়ে তাতে কিছু স্প্যাগেটি ছেড়ে দিল সে।

​সবটাই দূর হতে দেখছিল সুহিন৷ তবে সে কিছুটা অবাক হয়ে ভাবছে, এতো রাতে পাস্তা? এই মাঝরাতে লোকটা কার জন্য পাস্তা রান্না করছে? নিজের জন্য? কিন্তু তাকে এখানে এভাবে জিম্মি করে রাখার মানে কী!
​কেকে এবার সবজিগুলো চপিং বোর্ডে কাটতে শুরু করল। তার হাতে এক সুতীক্ষ্ণ ধারালো ছুরি। প্রতিটি ঘাতে বলিষ্ঠ ফর্সা দু’হাতের নীলচে রগগুলো ফেঁপে উঠছে। কপালে এসে পড়া অবিন্যস্ত চুলগুলো বারবার তার দৃষ্টি আড়াল করায় কেকে বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকে নিচ্ছে। সুহিন দূর থেকে নিঃশব্দে সেই দৃশ্য দেখছে। চপিং বোর্ডের সেই ঠকঠক শব্দগুলো এই গা ছমছমে পরিবেশে সুহিনের মনে অজানা অজান্তেই এক ভীতি ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এরিমধ্যে কেকে অত্যন্ত মৃদু স্বরে এক অদ্ভুত ঘরনায় শিস বাজাতে লাগল। ছুরি দিয়ে সবজি কাটছে আর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে শিস দিচ্ছে। সেই সুর কানে যেতেই সুহিনের শিরদাঁড়া বেয়ে হাড়হিম করা এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। এই সুর তার পরিচিত ঠেকছে, কোথাও তো একটা শুনেছে সে।
​পরক্ষণেই মূল ঘটনা মনে পড়তেই সুহিন শুষ্ক ঢোক গিলল। মনে মনে ভাবতে লাগল,

‘এটা তো ‘ডেথ হুইসেল’ বা ‘ব্যাডওল্ফ হুইসেল’! ইউরোপীয় লোককথার সেই ভয়ংকর নেকড়ের গল্প, যে কি না মৃত্যুর বার্তা নিয়ে শিস বাজাতে বাজাতে উদয় হয়। গল্পের মূল চরিত্রে থাকা বিড়ালটার আটটি জীবন ধ্বংসের পর নবম জীবন কেড়ে নিতে যখন বিগ ব্যাডওল্ফ আসে, তখন সে ঠিক এই সুরটাই বাজায়। কিন্তু সেসব তো রূপকথার গল্প; কেকে হঠাৎ এইসব করে কি বোঝাতে চাচ্ছে? তবে কি ইচ্ছে করেই তাকে ভয় দেখাচ্ছে? তা নয়তো কি! আশ্চর্য, মানুষটা সত্যিই কতটা অসভ্য!’
​সুহিনের এসকল ভাবনার মাঝেই কেকে হঠাৎ ঘাড়টা কিঞ্চিৎ ঘুরিয়ে তার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাল। কপালে আছড়ে পড়া অবিন্যস্ত চুলের আড়াল থেকে এক শীতল হিং-স্ত্র চাহনি দৃশ্যমান হলো। সুহিন না চাইতেও কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল। এ কেমন অদ্ভুত চাহুনি? এই লোকটার মস্তিষ্কে আদতে চলছে-টা কি? ওদিকে রমণীর সেই ক্ষীণ কম্পন কেকে-র নজর এড়ালো না। বরং তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তির্যক হাসি ফুটে উঠল। অত্যন্ত শান্ত ঢঙে হাস্কি টোনে কেকে শুধালো,

​”আর ইউ স্কেয়ার্ড, পুসিক্যাট?”
​বলেই সে চপিং বোর্ডে ধারালো ছুরিটা সজোরে ক্যাপসিক্যামের ওপর বসিয়ে দু-ফালি করে দিল। ছুরির ইস্পাতে চাঁদের আলো প্রতিফলিত হয়ে সরাসরি সুহিনের চোখে গিয়ে বিঁধল। সুহিন দাঁতে দাঁত চিপে দু-পা পিছিয়ে গিয়ে টপ-কাউন্টারের সাথে নিজের পিঠ ঠেকিয়ে দিল।
​কেকে আবারও সামান্য হাসল। একটি কাঁচা চেরি টমেটো মুখে পুরে পরম আয়েশে চিবোতে চিবোতে আবারও নজর ফিরিয়ে কাজে মন দিল। সুহিন তখনও আতঙ্কে কুঁকড়ে আছে। পিপাসা মেটাতে এসে এখন তার গলার ভেতরটাই যেন মরুভূমির মতো হয়ে গেছে। সে ভাবল, এখান থেকে এখনই ভাগতে হবে। বেঁচে থাকলে সকালে শুধু এই বাড়ি নয় বরং মিলান ছেড়েই চলে যাবে।
​সুহিন যেই না প্রস্থান করার জন্য উদ্যত, ওমনি কেকে দাঁতে দাঁত পিষে ত্যাছড়া স্বরে গর্জে উঠল,
“খবরদার! এক পা-ও নড়বি না। নয়তো এটা দিয়ে তোর কলিজা ছিঁড়ে খাবো।”
​সুহিন স্তম্ভিত হয়ে নজর ফেরাতেই দেখল, কেকে তার দিকে সেই তীক্ষ্ণ ছুরিটি উঁচিয়ে শাসাচ্ছে। কেকে আবারও চাপা স্বরে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

“তোকে জানে মেরে ফেললেও কারো সাহস হবে না আমার ওপর আঙুল তোলার। সো বি কেয়ারফুল! এই হাতে অনেক কলিজা ছিঁড়েছি, তোরটাও ছিঁড়তে দুবার ভাবব না।”
​সুহিন বাকরুদ্ধ। কেকে এক মুহূর্ত থেমে আবারও বলল,
“মানুষ আমাকে ততটুকুই চেনে যতটুকু আমি তাদের দেখাই। কিন্তু আমার ভেতরটাকে চেনার অধিকার তো আমি শুধু তোকে দিয়েছি, তাই না?”
​শেষভাবে কেকের কন্ঠস্বর আশ্চর্যজনক ভাবে শিথিল হলো; সুহিনের ভ্রু কুঁচকে গেল সহসাই। লোকটা কি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে? কিসের অধিকার? এত বছর পর কিসের দাবিতে সে এসব প্রলাপ বকছে? সুহিন এবার সমস্ত ভয় সরিয়ে দিয়ে চাপা ঢঙে দৃঢ় স্বরে বলল,
“আপনি কি পাগল? সমস্যা কী আপনার? এইসব কী ধরণের কথা বলছেন আপনি?”
​সুহিন উত্তরের অপেক্ষায়, অথচ কেকে কোনো উত্তর দিল না। স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ সুহিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আবারও নির্বিকার ভঙ্গিতে সবজি কাটতে শুরু করল। সুহিন মনে মনে তটস্থ হলো—কেকে নিশ্চিতভাবেই একজন সাইকো। নয়তো এইসব কার্যকলাপ কোনো স্বাভাবিক সুস্থ মানুষের হতে পারে না। কিন্তু শতবার চেয়েও আর সে কেকের হুশিয়ারির পর এখান থেকে যেতে পারল না। বরং একটা সংশয় নিয়েই আড়ষ্ট হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

তবে এটাই হয়তো সুবর্ণ সুযোগ। যা আলোচনা করার এখনই করে ফেলতে হবে। ডিভোর্সের ঝামেলাটা চুকিয়ে ফেলে এই বিভীষিকা থেকে তাকে মুক্ত হতেই হবে। সুহিন চোয়াল শক্ত করে ভাবতে থাকল, ঠিক কি যায়।
এদিকে রান্নাবান্নার কাজ শেষ হতেই কেকে অত্যন্ত পরিপাটিভাবে পাস্তাটা সার্ভ করল। ইতালীয় সিরামিক বোলে মেল্টেড চিজের প্রলেপের সাথে সুগন্ধী মশলার মিশেলে পাস্তাটা দেখতে কোনো দক্ষ শেফের হাতের জাদুই মনে হলো। পরিবেশন শেষ করে কেকে আচমকা চুলার পাশের টপ-কাউন্টারের ওপর আয়েশি ভঙ্গিতে বসে পড়ল।
​সে কাঁটাচামচ দিয়ে স্প্যাগেটি পেঁচাতে পেঁচাতে মুখে পুরতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেল। সুহিনের দিকে মুখ ফিরিয়ে চামচটা কিছুটা এগিয়ে ধরল সে। অত্যন্ত স্বাভাবিক ঢঙে নির্লিপ্ত স্বরে শুধালো
“খাবি?”

​সুহিন মুহূর্তের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। এই মানুষটা কি ভুলে গেছে যে তাদের মাঝের সম্পর্কটা এখন আর স্বাভাবিক নেই? অবশ্য সম্পর্ক তো কোনোকালেই স্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু এইসব অভিনয়ের মানে কি? ভাবটা এমন ধরছে যেন, তাদের মাঝে কোনোকালেই বিশেষ কিছুই ঘটেনি। না চাইতেও কেকের এই অদ্ভুত শান্ত আচরণ সুহিনের কাছে চরম অস্বাভাবিক ঠেকল।
​সুহিন কোনো প্রত্যুত্তর করল না দেখে কেকে কিঞ্চিৎ বিদ্রূপাত্মক হাসল। অতঃপর নিজের দিকে চামচটা ফিরিয়ে নিয়ে বেশ আয়েশ করে খেতে শুরু করল। সুহিন মনে মনে ভাবছে, লোকটা তবে রাতের খাবার খেতেই এই মাঝরাতে রান্নাঘরে হানা দিয়েছিল। অর্থাৎ তার আসার পেছনে অন্য কোনো গূঢ় উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু তার এই রহস্যময় ব্যবহার সুহিনকে প্রতি মুহূর্তে নতুন নতুন সংশয়ে ফেলছে।
​নিজের জড়তা কাটিয়ে সুহিন এবার একটু সাহস সঞ্চয় করল। সে কেকের উদ্দেশ্যে চাপা স্বরে বলল,
“আমার কিছু দরকারি কথা বলার আছে।”
​কেকে খেতে খেতেই মাথা নাড়িয়ে অত্যন্ত নির্লিপ্ত এক ভাবমূর্তি প্রকাশ করল। চিবানো অবস্থাতেই নির্বিকার গলায় সে উত্তর দিল,

“আই নো, আই নো! বাট নাউ আই অ্যাম ইটিং, সো ডোন্ট ডিস্টার্ব মি!”
​সুহিন দাঁতে দাঁত চিপে দাঁড়িয়ে রইল। তার শরীরের প্রতিটি কোষ তখন তীব্র বিরক্তি আর রাগে জ্বলছে। সে মনে মনে সংকল্প করে ছেড়েছে—একবার এই ডিভোর্সের ঝামেলা মিটে যাক, তারপর মরে গেলেও সে আর কোনোদিন এই বান্দার ছায়া মাড়াবে না।
​খানিক বাদে কেকের খাওয়া শেষ হলো। সে কাউন্টার টপ থেকে চট করে নেমে প্লেটটা সিঙ্কে নিয়ে খুব সুন্দর করে ধুয়ে রাখল। এরপর ফ্রিজ খুলে একটি ব্ল্যাক মনস্টার এনার্জি ড্রিংকসের ক্যান বের করল। ক্যানটা খুলে আয়েশ করে চুমুক দিতে দিতে সে সুহিনের পাশ কাটিয়ে যেতে শুরু করল;​সুহিন ভ্রু কুঁচকে তার প্রতিটি গতিবিধি পরখ করছিল। সে আবারও চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“এবার কি আমি আমার কথাগুলো বলতে পারি?”
​কেকে কোনো বিশেষ উত্তর দিল না। সে কিচেন থেকে বাইরের করিডোরের দিকে এগোতে এগোতে কেবল সংক্ষিপ্ত এক আদেশ ছুঁড়ে দিল,
“উপরে চল!”
​সুহিন ক্ষণিকের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই মাঝরাতে তার রুমে যাওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে তার মনে দ্বিধা থাকলেও সে নিজেকে শান্ত করল। এই সমস্যার শেষ আজই হওয়া দরকার। সে নিঃশব্দে, একরাশ অস্বস্তি নিয়ে কেকে-র দীর্ঘ ছায়া অনুসরণ করে ওপরের দিকে পা বাড়াল।

রান্নাঘরের সেই শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ থেকে বেরিয়ে সুহিন ভেবেছিল, কেকে হয়তো তাকে নিজের বেডরুম অব্দি টেনে নিয়ে যাবে। মনের ভেতর একরাশ দ্বিধা আর আশঙ্কা দানা বাঁধলেও, কেকে দোতলার বিশাল করিডোরের সামনে এসে আচমকা থমকে দাঁড়াল। বাড়ির স্থাপত্যশৈলী অনুযায়ী এই অংশটি বিশাল গ্লাস ওয়াল দিয়ে ঘেরা। একপাশে চমৎকার ব্যালকনি আর বসার জন্য রাখা দুটো আরামদায়ক সোফাও সাজিয়ে রাখা।
সুহিন গ্লাসের রেলিং-এর পাশে জড়সড় হয়ে দাঁড়াল। কেকে একহাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে অন্যহাতে এনার্জি ড্রিংকসের ক্যানটা ধরে আছে। সে ধীর পায়ে পাশের একটি কালো রঙের অ্যাকসেন্ট ক্যাবিনেট থেকে ছোট একটি ফাস্টএইড বক্স বের করল। ক্যানটি ক্যাবিনেটের ওপর রেখেই, তুলোতে মেডিসিন লাগিয়ে নিল। অতঃপর অত্যন্ত অতর্কিতভাবে সুহিনের দিকে এগিয়ে এল। হঠাৎ তার আগমনে সুহিন হকচকিয়ে অপ্রস্তুত হলো; কিন্তু দু-পা পেছানোর আগেই কেকে তার ডান হাতটা সজোরে টেনে নিল,
“আ… কী করছেন এটা…”

সুহিন কিছু বুঝে ওঠার আগেই কেকে অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে তার বৃদ্ধাঙ্গুলির ক্ষতের ওপর অ্যান্টিসেপটিক ভেজানো তুলো চেপে ধরল। তীব্র জ্বালাপোড়ায় সুহিন শিউরে উঠল। কাঁচ তুলতে গিয়ে আঙুলটা যে কেটে গিয়েছে, বেখেয়ালির বশে সে তা ভুলেই গিয়েছিল। রক্ত জমাট বেঁধে প্রায় শুঁকিয়ে গিয়েছে জায়গাটা। কিন্তু কেকে হঠাৎ কখন এটা খেয়াল করল?
​কেকে অত্যন্ত ধীরস্থিরে শুকনো রক্ত ও ক্ষতযুক্ত জায়গাটা পরিষ্কার করছে। তার সম্পূর্ণ দৃষ্টি সুহিনের হাতের দিকে নিবদ্ধ। এদিকে পুরোটা সময় মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় আকারে প্রায় হাতখানেক লম্বাটে মানুষটার দিকে চেয়ে রইল সুহিন। চাদের নীলচে আলোয় ঝুঁকে থাকা কেকের গম্ভীর অবয়ব অজান্তেই তার মনে এক বিচিত্র শিহরণ জাগাচ্ছে। অবিন্যস্ত চুলগুলো তার চোখ অব্দি ঢাকা। তবুও তার আড়াল হতে তীক্ষ্ণ চোখদুটো তাকে দেখছে কিনা কে জানে?
আশ্চর্য! এতো খুঁটিয়ে সে কাকে দেখছে?যাকে নিয়ে কখনো বিশেষ কোনো অনুভূতি জাগারও সুযোগ হয়নি, আবার কখনো তাকে ঠিককরে চেনারও সুযোগ হয়নি, তবুও এই অদ্ভুত-উগ্র রহস্যময় মানুষটাই তার ভাগ্যের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে; যার থেকে আজও সে মুক্তি পায়নি।
কাজ শেষ হতে হতে কেকে হঠাৎ কর্তৃত্বপূর্ণ স্বরে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,

“এদেশে কার সাথে এসেছিস?”
​সুহিন নিজের ঘোর থেকে বেরিয়ে এল।কেকে তার হাতে ছোট্ট একটা ব্যান্ডেজ ট্যাপ লাগিয়ে দিতেই সে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“আরহাম ভাই আর নিমরার সাথে।”
এই বলেই সুহিন মুখ নামিয়ে নিল। কেননা কাজ শেষ হতেই কেকে নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার দিকেই নিক্ষেপ করেছে। আর সে তার দৃষ্টির সাথে একদমই নজর মেলাতে পারেনা৷ কেকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখন সুহিনের দিকে স্থির। সে বিড়বিড় করে মনে মনে দুবার আওড়াল,
“আরহাম,আরহাম… দানিয়েল আরহাম!”
​পরক্ষণেই সে আবার শুধালো,
“এই বাড়িতে কেন এসেছিস?”
সুহিন কি উত্তর দেবে বুঝে উঠতে পারল না। আসলেই তো, কেন এখানে এসেছে সে? গায়ে লজ্জা-শরম থাকলে তো আসার কথা ছিল না। নিজের উপর কটাক্ষ করেই, রমণী উত্তর দিল,
“সাদ ভাইয়া জোর করে এনেছে। আসতে চাইনি।”

​—–“থেকে গেলি কেন?”
কেকের সরাসরি প্রশ্নে সুহিন স্তব্ধ। এখন কি তবে অপমানের পালা? থেকে যাবার জন্য সরাসরি অপমানিত করবে? তবুও সে হঠাৎ কেকের চোখে চোখ মিলিয়ে ফেলল। নীল চোখদুটো একনাগাড়ে কেকের অবিন্যস্ত চুলে ঢাকা পড়া ধূসর-কালো চোখের দিকে স্থির রইল।
—“হয়তো প্রয়োজনে।” সুহিন শান্ত গলায় বলল। কেকে চটজলদি পাল্টা প্রশ্ন করল,
“কাকে? আমাকে? এত মাস পর আমাকে তোর কী প্রয়োজন?”
কেকে খানিকটা তাচ্ছিল্যের সহিত হাসল। সুহিন অবাক হলো লোকটার এহেন ভাবমূর্তিতে। কতটা স্বাভাবিক, নির্লিপ্ত! যেন সব দোষ কেবল তারই।
​সুহিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্পষ্ট গলায় বলল,
“এখনো একটা দেনাপাওনায় আটকে আছি আমরা। আমার আপনার কাছে কিছু চাওয়ার আছে।”
কেকে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। পাশ থেকে ক্যানটা হাতে তুলে নিয়ে তাতে চুমুক দেয়৷ আরেক হাত টাউজারের পকেটে গুজে বিস্তৃত চাঁদের দিকে চেয়ে থাকে সে। শীতল দমকা হাওয়া দুজনের চুলগুলো উড়ছে; অদ্ভুত এক শিহরণে গা শিউরে উঠছে,তবুও দুজন স্থির জ্যান্ত মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে।
সুহিনের কথার প্রত্যুত্তরে কেকে স্বাভাবিক ঢঙে বলল,

“বল, কি চাই তোর? ”
সুহিন দুদন্ড সময় নিয়ে ভারী শ্বাস ফেলল।সহসাই মুখ ফুটে বলে উঠল,
“আমার ডিভোর্স চাই।”
​কেকে মুহূর্তকাল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।সুহিন আশায় থাকে কেকে হতে কোনো এক বিশেষ উত্তরের। মনপ্রাণ চাইছে ঝামেলা এবার মিটে যাক।তবুও একটা সুক্ষ্ম টান তার অন্তরালে ব্যথিত হচ্ছে।
কেকে কিঞ্চিৎ তির্যক হেসে, ক্যানে চুমুক দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
“পেয়ে যাবি।”
​সুহিন থমকে গেল। মনের সেই অবাধ্য টানটুকুও যেন নিমেষেই ছিঁড়ে গেল।ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একখান মলিন হাসি। কেকে ততক্ষণে তার দিকে মুখ ফিরিয়ে আবারও বলল,
“আর কিছু?”

সুহিন নিজের ওষ্ঠধর চেপে কেকের দিকে চেয়ে থাকে। সে কি খুব বেশি নির্লজ্জ? নয়তো এখনো সে কিসের আশা করছে? কেনো এই মানুষটার এতো নির্লিপ্ততার পরও তার তীব্র কান্না পাচ্ছে। কেনো? সে তো ঘৃণা করে এই মানুষটাকে। এই মানুষটাকে ভালোবাসা যায় না, কারণ কেকে ভালোবাসা নয় বরং ঘৃণারই যোগ্য। যে সমাজ মানে না, যে নিয়ম মানে না, যার কাছে একটা সম্পর্কের মূল্য অতিতুচ্ছ্য তার কাছে এখনো সে কিসের আশায় দাঁড়িয়ে?
সুহিন বোধহয় আরো কিছু বলার জন্য উদ্যত হয়েছিল, ঠিক তখনই দেখল কেকের বাম হাতের তালুতে বেশ খানিকটা কেটে যাওয়া ক্ষত। সুহিন থমকে দাঁড়াল। এটা কিসের দাগ? তখন কাঁচ তুলতে গিয়ে নিজেরও এই অঘটন ঘটিয়েছে? অচিরেই তার কি হলো কে জানে, কিছুটা বিস্ময় নিয়ে সে আচমকা কেকের হাত টেনে নিল। ক্ষতটা বেশ খানিকটা; বিস্ময়ের সাথে সুহিন কেকের দিকে মুখ তুলে বলে উঠল,
“এটা কিভাবে হলো? অনেকটা কেটে গিয়েছে তো!”
রমণীর এরূপ বিচলতায় কেকের ভ্রু কুঁচকে গেল। সে সুহিনকে আপাদমস্তক একবার দেখে নিয়ে একপ্রকার সজোরে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। চাপা স্বরে বলল,
“ইট’স নাথিং টু বি সিরিয়াস…”

—“কিন্তু….”
সুহিন কিছু বলার জন্য উদ্যত ছিল, কিন্তু তার কন্ঠস্বর থমকে গেল। কেকে অকস্মাৎ টিস্যু বক্স থেকে বেশ কয়েকটা টিস্যু নিয়ে, রমণীর ছোঁয়া হাতটা বেশ অবজ্ঞার সাথে মুছতে লাগল। সুহিন থমকে গেল তার এরূপ আচরণে। তার ছোঁয়ায় এতো ঘৃণা? আসলেই হয়তো সে একটা নির্লজ্জ, নয়তো কোন মানুষটার প্রতি সে বারবার দূর্বল হচ্ছে তা সে কেনো প্রতিবার ভুলে যায়?
সুহিন নিজের প্রতি তাচ্ছিল্যের সাথে ক্ষীণ হাসল। পরক্ষণেই কি যেন মনে পড়তেই সে বলল,
“প্রায় এক বছর তো হয়ে গিয়েছে, আগেও বলেছিলেন ডিভোর্স দিয়ে দিবেন,আজও দেননি। আমার মনে হয়,এবার আর দেরি করে বেশি একটা লাভ নেই।”
—“এতো তাড়া?”কেকের কন্ঠে তাচ্ছিল্য। সুহিন জোর গলায় বলল,
—“মুক্তি পাচ্ছি না তো। পুরোপুরি মুক্ত হলে শান্তি পেতাম।”
কেকে তাচ্ছিল্যের সহিত আবারও ক্ষীণ হাসল। সুহিন একমনে আবারও দেখল তাকে। মানুষটা প্রচন্ড অদ্ভুত; একদমই তার ভাবনারও ধরাছোঁয়ার বাহিরে।
সুহিন বুকভরে দীর্ঘশ্বাস টেনে বলল,

“সরি!”
হুট করে ‘সরি’ শুনে কেকের ধ্যান ভাঙল। কিছুটা ভ্রু কুঁচকে সুহিনের দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল,
“কিসের জন্য?”
—“ঐ রাতে আপনার মাকে নিয়ে ওসব কথা বলার জন্য। উচিত হয়নি আমার ওইসব বলা…!”
কিছুটা ভয়ে ভয়ে বলল সুহিন। কেকের চলে যাবার পর সে কেকে-কে অনেক গাল-মন্দ করলেও, একদিন বাড়ির সবচেয়ে পুরোনো এক সার্ভেন্টের কাছে সে শুনেছিল, কেকে তার মাকে নিয়ে প্রচন্ড সিরিয়াস। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি যদি সে কাউকে ভালোবাসতো তবে সেটা কেবল তার মা-ই ছিল। এই কারণে সুহিন আজও ভাবে,সেদিন ওইসব কথা বলা হয়তো একদমই ঠিক হয়নি। অন্তত তার মাকে নিয়ে বলা তো উচিতই হয়নি। তার নিজের মা-কে নিয়েও তো কতরকমের লোককথা সমাজে ছড়িয়ে আছে, কই কেকে তো কখনো তার মা আরশিয়াকে নিয়ে অসম্মানজনক কিছু বলেনি। তবে সে কোন মূর্খতায় ঐ কথা বলতে গিয়েছিল, আজও সেই আফসোস করে সুহিন কূলকিনারা খুঁজে পায়না।
সে যেটাই হোক,সেই সূত্র ধরেই তো তাদের বিচ্ছেদের সূচনা। তবে এবার এই দ্বিধা-অপরোধবোধ হতেও মুক্তি পাওয়া হোক।
কিন্তু সুহিন হয়তো কেকের উত্তরের জন্য একদমই প্রস্তুত ছিল না। কেকে একমনে সুহিনের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর, অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে ক্যানে চুমু্ক দিয়ে বিস্তৃত চাঁদের দিকে তাকাল। অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,
—”ইটস ওকে, আই নো মাই মাদার ওয়াজ আ প্র’সটি’টিউট। অ্যান্ড আই অ্যাম দ্য অনলি সান অফ দ্যাট প্র’সটি’টিউট মাদার।”

| ই’টস ওকে,আমি জানি আমার মা একজন প’তি’তা ছিলেন। আর আমি সেই প’তি’তা মায়ের একমাত্র সন্তান। |
সুহিন স্তব্ধ হয়ে গেল তার কথা শুনে। এই কথাটা এতো সহজে কিভাবে বলল কেকে? একবারও মুখে বাঁধল না? লোকটা এমন কেনো? কেনো সে এমন? সুহিন বিস্ময়ে ভাবনার কূলকিনারা খুঁজে পায়না।

Naar e Ishq part 30

কেকে আর দাঁড়াল না। সুহিনের বিস্ময়ের মাঝেই সে পকেটে ডানহাত গুঁজে দিয়ে শেষবারের মতো সুহিনকে একবার দেখে নিল। অতঃপর ক্ষীণ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ক্যানে চুমুক দিতে দিতে অন্ধকার করিডোরের দিকে এগোতে লাগল। একইসাথে তার ওষ্ঠধরে বেজে উঠল ব্যাডওল্ফ খ্যাত ডেথ হুইসেল ও মেহ হু না নামক শিস দুটোর অদ্ভুত সংমিশ্রণ। নিমিষেই সেই ভীতিকর শীতল সুরে সুহিন শিউরে উঠল। একমনে চেয়ে রইল অন্ধকারে মিশে যাওয়া কেকের অবয়ব ও তার অদ্ভুত সুরের মূর্ছনায়।

Naar e Ishq part 32