obsession vs love part 15
নিরুর কল্পনারাজ্য
—এতোরাতে ছাদে কী করছো মিস. ঝিলিক?
ছাদ থেকে নামবে নামবে করেও নামতে পারেনি ঝিলিক। আজই তো শেষ। আর কবেই বা দেখতে পাবে ওই মানুষটাকে? যে অন্যের হয়ে বসে আছে। ঝিলিক তাই তাকিয়ে ছিলো; যতক্ষণ না চোখদুটো তৃপ্তি পায়। হঠাৎ পুরুষালি গম্ভীর স্বরে পিছু ফিরলো সে। পেছনে হঠাৎ সায়নকে দেখে অবাকই হলো। উনি এখনও যাননি? ঝিলিক তড়িঘড়ি করে শাড়ের আঁচল টেনে ধরলো যাতে পিঠটুকু দৃশ্যমান না হয়। এই সময়ে ঝিলিক অবশ্যই সায়নকে এখানে আশা করেনি। তাই খানিকটা অপ্রস্তুত হলো সে। সায়ন এসে ঝিলিকের কাছ থেকে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেই দাঁড়ালো। ঝিলিক দ্বিধান্বিত চোখে চেয়ে শুধালো,
—স্যার, এতোরাতে আপনি? যাননি এখনো?
—তুমি বুঝি চেয়েছিলে আমি যেনো তোমাদের বাড়িতে বেশিক্ষণ না থাকি?
ঝিলিক আবারও বেশ অপ্রস্তুত হলো। সে এমনটা কখন বললো। এই মুহূর্তে তার সায়নকে খানিকটা বিরক্তও লাগছে।
—না, একদমই না। আমি তা বলতে চাইনি স্যা…
—আ…আমি এখানে তোমাকে একটা ধন্যবাদ দেওয়ার জন্য খুঁজছিলাম। নেভার মাইন্ড!
সায়ন ঝিলিকের কথা অসম্পূর্ণ রেখেই বললো। ঝিলিক সৌজন্যমূলক অল্প ঠোঁট টানলো। বললো,
—না না, এসবের দরকার নেই।
—আসি তবে এখন।
ঝিলিক বিরস মুখে মাথা নাড়লো। সায়ন ধীর পায়ে আগালো সামনের দিকে। ঝিলিক তা দেখে ফের নিজের কাজে মত্ত হলো। অথচ সায়ন ছাদের দরজার কাছে গিয়েই থামলো। ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে নিঃশব্দে ঠোঁট টানলো। চোখে খেলে গেলো তার অন্য রহস্য।
ঝিলিক আবারও আইয়ুশকে দেখায় ব্যস্ত হলো। তবে অদ্ভুতভাবে সেখানে তাকে আর দেখতে পাওয়া গেলোনা। চলে গেলো কী? বোধহয়। ঝিলিকের ঠোঁটে ফুটে ওঠে বিষন্নতার হাসি।
ছাদ থেকে নেমে ঝিলিক বাবার রুমে গেলো। সেখানে অবশ্য শাহদাদ মির্জা ছিলেন না। চৈতী চৌধুরী ছিলেন। ঝিলিকের মন ভার হয়ে এলো। চৈতী বেগম কাবার্ডে কাপড় ভাঁজ করে রাখছিলেন। আজকের দিনে যা দখল গিয়েছে। বাকিসব সার্ভেন্টরা দেখে নিচ্ছে। তাই ওদিকে যাওয়ার প্রয়োজন নেই আপাতত। তিনি ঝিলিককে লক্ষ্য করেননি। ঝিলিক এসে চৈতী বেগমকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। মায়ের শুষ্ক সেই ঘ্রাণ নাসারন্ধ্র চিনে ফেললো। ফলস্বরূপ অন্তস্থল শান্ত; শীতল হলো জানা-পরিচিত কোনো সুভাষে। মায়ের ঘ্রাণে সন্তানদের সুখ লুকিয়ে থাকে। যে মা ছোটো থেকে অতিযত্নে বড় করেছেন তাকে না বলে চলে যেতে ঝিলিকের বিবেকে বাধছে। এটা অন্যায়! তবে ও নিজেও যে মা! কোনো এক ছোট্ট সত্ত্বা তার গর্ভে অতি ভরসায় লালিত হচ্ছে এই ভেবে যে–তার মা ও তাকে পরম মমতায় দুনিয়া দেখাবে। ঝিলিক নিরুপায়। ঝিলিক পেছন থেকে জড়িয়ে ধরায় চৈতী বেগম হাসলেন। তিনি বুঝে গেলেন কে হতে পারে! সন্দিহান কন্ঠে মমতা নিয়ে শুধালেন,
—কী হয়েছে হু? মন খারাপ?
ঝিলিক স্তব্ধ হয়ে রইলো। মায়েরা এতো সহজে সবকিছু বুঝে যায় কী করে? তারা কী কোনো দৈব্যদৃষ্টির অধিকারিণী হয়? বোধহয় হয়! নিস্তব্ধতা ভাঙিয়ে ঝিলিক বলে,
—না মা, তোমার উপস্থিতি মন খারাপ ভুলিয়ে দেয়।
চৈতী বেগম কাপড় ভাঁজে মনোযোগ রেখেই শুধালেন,
—মহোদয়া কী বাবাকে খুঁজছে?
ঝিলিক সন্তপর্ণে মাথা নাড়ায়। চৈতী বেগম কিছুটা অভিযোগের সুর টানলেন। নিখাদ কন্ঠে শুধালেন,
—বাবাকেই দেখতে আসা হয়েছে তবে? মায়ের কথা কী মনে পড়েনা?
ঝিলিক মলিন হাসে। বলে,
—মা-কে কোনো সন্তান ভুলতে পারে? খোদাতায়ালা যার পায়ের নিচে বেহেশত প্রদান করেছেন তাকে ভোলা যায়?
—হয়েছে হয়েছে! প্রশংসায় একদম পঞ্চমুখ। বাবা বাগানের দিকের বারান্দায় আছেন।
ঝিলিক মায়ের গালে নিগূঢ় এক চুমু আঁকলো। মা-ও মেয়ের গালে অতিযত্নে হাত বুলিয়ে দিলেন। ঝিলিক বেরিয়ে এসে বাগানের দিকটায় গেলো। সেখানকার সকল লাইটিং প্রায় খুলে নেওয়া হয়েছে। বাকি যেগুলো রয়েছে সেসবে আলো নেই। অল্প আলো-আঁধারির মিশেলে শাহদাদ মির্জা রয়েছেন। বাগানের দিকের লম্বাটে, সরু বারান্দে শেষে সেখানে চেয়ার-টেবিল পাতা হয়েছে। সেখানেই বসে চা খাচ্ছিলেন। চোখে-মুখে অল্প দুশ্চিন্তার ছাপ। ঝিলি গিয়ে বাবার সামনের চেয়ারে বসলো। শাহদাদ মির্জা মেয়েকে দেখে হতচকিত একই সাথে মলিন চেহারায় তাকালেন। শাহদাদ মির্জা মেয়েকে দেখেই নড়েচড়ে বসলেন। বললেন,
—বলো মামণি!
ঝিলিক বলার ভাষা পেলোনা। কন্ঠ বিরোধ হয়ে আসছে হয়তো তার। তবু শান্ত স্বরে শুধালো,
—বাবা, টিকিটের ব্যবস্থা হয়েছে?
তিনি বড্ড অসহায় কন্ঠে স্বীকারোক্তি জানালেন,
—হয়েছে।
—ছ’টায়-ই তো?
—হু!
শাহদাদ মির্জা মলিন কন্ঠে শুধালেন,
—মামণি? যেতেই হবে?
—হ্যাঁ বাবা!
—এভাবে কাওকে কিছু না বলে…..
—কাওকে বললে যেতে দিবে? তুমি তো জানো বাবা অন্তত।
শাহদাদ মির্জা অতি কিছু বলেন না। ঝিলিক বাবার ভাবাবেগ বুঝতে পারে। বাবার হাতের ভাঁজে নিজের রেশম তুলো হাতখানা গুঁজে তাকে বোঝানোর চেষ্টায় বললো,
—বাবা, এখানে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। আমার শ্বাস নিতেও বিষাকৃত মনে হয়। আমি দূরে যেতে চাই। সবকিছু থেকে। তুমি আমায় আটকাবেনা, আমি জানি।
শাহদাদ মির্জা নিশ্চুপ বসে রইলেন। ঝিলিক উঠে এসে বাবার গলা জড়িয়ে ধরলো। বললো,
–ইট’স ওকে বাবা। তুমি তোমার মেয়েকে সুখেরআস্থানায় পাঠাচ্ছো। চিন্তা করোনা। ওখানে জিয়া তো আছেই। আমি সামলে নিবো সব। হু? এবার হাসো তো! দেখি, স্মাইল!
শাহদাদ মির্জা মেয়ের কথায় মৃদু হাসলেন। ঝিলিকও হেসে বললো,
—দ্যাটস মাই ড্যাড। চিন্তা করোনা বাবা। সব ঠিক হবে। আসছি এখন। সকালে দেখা হবে।
অতঃপর ঝিলিক প্রস্থান করে। ঝিলিক যেতেই শাহদাদ মির্জা চিন্তিত মুখে কাওকে ফোন লাগালেন। ফোনে বললেন,
—ও কালকেই ফ্লাইট ধরবে। ওর প্রত্যেকটা আপডেট কিন্তু আমার চাই। কড়া সিকিউরিটির ব্যবস্থা করো।
সিঁড়ি বেয়ে ওপরের দিকে যেতে যেতে ঝিলিক নিজের মাঝে পাথরসম চাপ অনুভব করলো। একবার ভাবলো সাঁঝের ঘরে যাবে। আবার ভাবে-হয়তো আইয়ুশ ফিরেছে? সেই ভেবে আর এগোয় না। নিজের রুমেই ফিরে যায়। দরজা লাগিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে। কাপড় বদলায়। বেলকনির দিকটায় এগোয়। তখন ঝিলিকের মনের মতোই আকাশের মতোই ঝড়ের তান্ডব বয়ছিলো। ঝিলিক বেলকনির রেলিং ধরে দাঁড়ায়। একহাত বের করে বৃষ্টির ছোঁয়া অনুভব করে। বৃষ্টির ফোঁটা খুব যতনে তার হাত ভিজিয়ে দেয়। মেঘের বুক চিঁড়ে যেমন টপটপ পানি পড়ছিলো তেমনই ঝিলিকের সবুজ-বাদামীতে মিশ্রিত নয়নজোড়ায় ও পানির অস্তিত্ব দেখা দেয়; যা কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। ঝিলিক অবাক হয়। অশ্রু? এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। ওর কেনো এতো খারাপ লাগছে। লাগার তো কথা নয়। ওই বিশ্বাসঘাতকটার জন্য তো একদমই নয়। তবু লাগছে। ঝিলিক তো আর এই আইয়ুশকে ভালেবাসেনি। বেসেছে অন্য আইয়ুশকে। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর প্রয়াস চালায় রমণী। অথচ হয়ে ওঠেনা। ঝিলিকের বুক চিঁড়ে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাসেরা,
—কেনো বিশ্বাসঘাতকদের প্রতি আমাদের অগাধ বিশ্বাস থাকে? তারা আমাদের ভুলে গিয়ে কত সহজে অন্যকে আপন করে নেয়। অথচ আমরা থেকে যাই তাদের স্মৃতির পাহারাদার হয়ে; যে স্মৃতির বাগান আমাদের হয়েও রাজত্ব ছিলো অন্যকারো।
ঝিলিক নিজের উদরে হাত ছোঁয়ায়। কোমল মাতৃকন্ঠ বেড়িয়ে আসে তার মধ্য থেকে,
—মাই বেইবি? মাম্মা লাভস ইউ মোর দ্যান এনিথিং। আমার অন্ধকার জীবনের একমাত্র সাথী তুমিই। তুমি জেনে রাখো-তোমাকে পেয়ে মাম্মা কখনো আফসোস করেনি; তার অতীত যতটা আক্ষেপিত ধ্বংসলীলার রণক্ষেত্র হোক না কেনো! মা তোমাকে সবসময় চেয়েছে। তবে তুমি মাকে ক্ষমা করে দিও। মা কখনো তোমাকে তোমার বাবার পরিচয় দিতে পারবেনা। মা একটু বেশিই ভরসা করেছিলো কিনা। তার ভাগ তোমারও বইতে হবে
ঝিলিক শেষ রাত অব্দি বেলকনিতে বসে রইলো। জীবনের হিসেব-নিকেষে নিজেকে খুঁইয়ে ফেললো। অথচ অন্যদিকে সেই ঝড়ো হাওয়া উপেক্ষা করে বৃষ্টির মাঝেও তার তীক্ষ্ণ চাহুনির গাঢ় কালো মণিতে নিজের প্রেম-প্রেয়সীকে আবদ্ধ করতে থাকা এক পুরুষ—যার সম্পূর্ণ অবয়ব মোড়ানো কালো এক পোশাকে। চোখে তার অসহায়ত্ব, হৃদমাঝারে তার ভালোআাসা। নিগূঢ় খাতের লাল-গোলাপি মিশেলে তৈরি হওয়া সেই রঙের ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে ফিসফিসানো কয়েকটি শব্দ,
—প্রাণ আমার!
রজনী তখন নিস্তব্ধতায় ভরপুর। আশপাশ নিগূঢ় শান্ত। এতোটাই যে–পাখিরাও তাদের ডাক বন্ধ করেছে। রাত তখন তিনটে। নিশাচরেরা বুঝি তখুনি বের হয়? লোকমুখে শোনা যায়–পিশাচরদের জন্য রাতের আধার। তাদের রাতের আধার পছন্দ। তাইতো মানুষেরা রাতের আধার ভয় পায়। অথচ এক মানব সেসব ভয়কে কৌতুক প্রমাণিত করে নিজেই যেনো সেই নরপিশাচ হয়ে উঠেছে। এই রাতের আধারের নিস্তব্ধতা ভেদ করে তার নরকসীমানা হতে ভেসে আসছে কিছু শব্দ–কিছু কাটার শব্দ। অথচ পুরুষটি নির্বিকার। এতোটাই যে-যেনো এসব তার নিত্যদিনের কার্য। হাতে তার বড় রামদা। সামনে শায়িত এক আস্ত মানব। সম্পূর্ণ উলঙ্গ তার শরীর। চেতনায় আছে কী? নেই। নয়তো নিজের এই নিশৃংস পরিণতি কী তার মস্তিষ্ক সহ্য করতে পারতো? পারতোনা। পুরুষটির পরণে কেবল স্লিভলেস এক টি-শার্ট সাথে ট্রাওজার। হাতের পেশি মজবুদ। সুঠাম দেহের হস্তদ্বয়ের নীল রগ ভেসে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। শায়িত সেই পুরুষদেহ ছিন্ন-বিন্ন। অথচ তখনও প্রাণ যায়নি। শ্বাসের ওঠানামা কিছুটা হলেও বিদ্যমান। পুরুষটির পায়ের আঙুলগুলো মমতায় কাটার পর পা দুটো শরীর থেকে আলাদা করতে করতে ধীরে ধীরে ওপরের দিকে রামদা’টি ঘোরাতে থাকে পুরুষটি। উরু, উদর, বুক সর্বত্র নির্দয়ভাবে একের পর এক কোপ বসায় সে। রামদার সাহায্যে পেটের নারী ভুরি কেটে বের করে। হাতে নিয়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণে করে। অতঃপর রামদাটি ওঠে বুকের ওপর। ধপ করে কোপ বসায়। ব্যস, মৃত হয়ে যায় মানবটি। বুকে থাকা প্রতিটি চামরা সন্তপর্ণে কাটে। বের করে আনে হৃদপিন্ড। হৃদপিন্ডখানা দেখেই তার চোখে দেখা গেলো জয়ের ঝিলিক। রক্তাক্ত গ্লাভসযুক্ত হাতে নিয়ন আলোয় তা দেখে মৃদু হাসে। প্রতি কোপেই রক্ত ছিটকে পড়ে তার গায়ে। অথচ তার পলক অব্দি নড়ে না তাতে। এতোটা নিখুঁত ভঙ্গিতে সে কাজটি করছে–যেনো এসব তার সুণিপণে শেখা কোনো কারুকার্য। শায়িত সেই মানবদেহের শরীর হতে মাংসসমূহ আলাদা করতে করতে সে গুণগুণিয়ে গান ধরলো,
—আলতো ছোঁয়ায় চোখেরই চাওয়ায়,
পাওয়া না পাওয়ার কী যে নেশা!
সেই স্মৃতিটাই আজও হাতরাই,
হারিয়ে ফেলা ভালোবাসা!
গুণগুণিয়ে এগিয়ে যায় তার পেছনে রাখা কাচের বায়মগুলোর কাছে। খালি একটি বয়ামে সংরক্ষণ করে তার জয়ের চিহ্ন। পুরুষটির পেছনে রাখা গুটিকয়েকট কাচের বয়াম যেখানে স্পষ্ট রাখা রয়েছে মানবদেহের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘মস্তিষ্ক’। অবশ্য বয়ামগুলো কেবল মস্তিষ্কতেই সীমাবদ্ধতা নেই। চোখ, রক্তাক্ত হৃদপিন্ড সহ আরও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গাণু। এমন বয়ামের সংখ্যা বর্তমানে শত ছাড়ানোর উপক্রম। কোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে এসব দেখা এবং সহ্য করা দুই-ই অসম্ভব। তাইতো বোধহয় সেই পুরুষটি সকলের কাছে নরপিশাচ। তাছাড়া সেখানে পড়ে রয়েছে অসংখ্য ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন মানবাংশ। রক্তাক্ত সেই স্থানটি। অথচ পুরুষটি ভ্রুক্ষেপহীন শায়িত সেই পুরুষটির অবশিষ্টংশ মাংসপিন্ড কুচি কুচি করে কাটছে–যেনো তা কোনো সবজি। ধর থেকে শরীরের বাকি অংশ আলাদা করা শেষে সেসব ভালো করে বেসিনে ধুয়ে ইন্ডাকশন চুলোয় সিদ্ধ হওয়া গরম পানির মধ্যে ঢেলে দিলো। অতঃপর সন্তপর্ণে তাতে মরিচ-লবন এবং রান্নার সকল ধরণের প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে তা করে তুললো গ্রহণযোগ্য এবং সুস্বাদু আহার। কার্য শেষে গম্ভীর; কঠিন সুর চিঁড়ে বেরোলো তার শক্ত স্বর,
—হেই, চার্লি!
ব্যস, এটুকুতেই পালিত সেই সিংহটি বুঝে গেলো মালিকের ইশারা। লাফিয়ে গিয়ে গর্জে উঠলো-উত্তরের প্রতীক স্বরূপ। তা দেখে রক্তাক্ত সেই পুরুষটি এগিয়ে এসে খুব সুন্দর করে তাকে সার্ভ করলো চার্লি তথা পালিত সেই সিংহের পছন্দের আহার। সঙ্গেই চার্লি মুখ ডুবিয়ে দিলো তাতে। ক্ষুধার্তের ন্যায় হামলে পড়লো সেই খাবারে। তা দেখে নীল নেত্রের পুরুষটি সুগভীর হাসে। ঠোঁট টেনে ভয়ঙ্কর স্বরে বলে,
—ইজ ইট টেস্টি চার্লি?
সিংহটিও গর্জে ওঠে। যেনো সে তাল মেলাচ্ছে মালিকের কথার বিপরীতে। তার উত্তরের পিঠে হাসে সেই পুরুষ। অতিরহস্যময় সেই হাসি।
সকাল তখন সারে চারটা। ঝিলিকের সারা রাত ঘুম হয়নি বিধায় সে বেলকনিতেই ছিলো। ছ’টার ফ্লাইট। দ্রুত বেরোতে হবে। টনক নড়তেই সে উঠে দাঁড়ালো। কাপড় গুছিয়ে অতি রেডি হয়ে নিলো। অতি সাবধানে বেরিয়ে এসে শাহদাদ মির্জার রুমের সামনে গেলো। পুরো মির্জা বাড়ি তখন ঘুমে বিভোর। এমনকি সার্ভেন্টরাও। ঝিলিকের বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করতে হলো। ঘড়িতে বরাবর পাঁচটা বাজতেই তিনি বেরিয়ে এলেন মলিন মুখশ্রীতে। ঝিলিক বাবাকে দেখেই জিজ্ঞেস করে,
—মা? ঘুমাচ্ছে তো?
শাহদাদ মির্জা মাথা নাড়েন। ঝিলিক ফের বলে,
—চলো বাবা, আমাদের দ্রুত বেরোতে হবে। তা নয়তো সকলো জেগে যাবে।
বলেই সে এগিয়ে গেলো। শাহদাদ মির্জা নিজেও পিছু পিছু এলেন। সাবধানে সকলকিছু পরখ করলেন। মেয়ের জন্য তিনি সবকিছুর বিরুদ্ধেই যেতে পারেন। তিনি জানেন এটা অন্যায়। তবে মেয়েতো অন্তত ভালো থাকবে! ঝিলিকের শত নিষেধের পরও তিনি আর তার দুভাই–তারা তিনজনই চেষ্টা করেছে গোপনে সেই ছেলেকে খোঁজার। অথচ ঝিলিকের বাহিরের কারো সাথে তেমন কোনো ব্যক্তির খোঁজই পাওয়া যায়নি। এমনকি কোনো সন্দেহজনক কেও ও নেই। ঝিলিকের যাওয়ার ব্যাপারটা ওসমান মির্জা আর শাহমীূ মির্জাও জানেন। ঝিলিকের অগোচরে শাহদাদ মির্জা তাদের জানিয়েছেন কেননা তার আর চৈতী চৌধুরীর পরে যদি ঝিলিককে কেও খুব বেশি স্নেহ করে তবে তা ওসমান মির্জা আর শাহমীদ মির্জা। ঝিলিক বাড়ির গেইট পেরোতেই সেখানে গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে অবস্থানরত শাহমীদ মির্জা আর ওসমান মির্জাকে দেখে আঁতকে উঠলো। একি! তারা এখানে কেনো? কথাটা মাথায় আসতেই তড়াক গতিতে পিছু ফিরে বাবার চোখে চাইলো। বাবার চোখে তাকাতেই ঝিলিক যা বোঝার বুঝে গেলো। তবে শাহমীদ মির্জা তাকে আশ্বস্ত করলেন। ঝিলিক অপরাধীর ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে তাদের সামনে গেলো। তাকে দেখতেই শাহমীদ মির্জা এগিয়ে এলেন। বললেন,
—মা, আমরা কী এতোটাই পর হয়ে গিয়েছিলাম যে আমাদের জানানোর অব্দি প্রয়োজন মনে করলে না?
ঝিলিক তড়িতে মাথা তোলে। বলে,
—না, ছোট বাবা। তোমরা আমাকে বাধা দিতে পারো…
ওসমান মির্জা ঝিলিকের কথা কাটলেন। বললেন,
—তোমার সুখে আমরা কখনো বাধা দিতে পারি?
তিনি হাসলেন। সাথে শাহমীদ মির্জাও হাসলেন। তারা তিনজনই ঝিলিককে খুব বেশিই ভালোবাসেন। পরিবারের সকলের ছোট সদস্য হওয়ার দরুণ ঝিলিক সকলের চোখের মণি। তাদের হাসতে দেখে ঝিলিক আলতো হাসলো। এগিয়ে গিয়ে বললো,
—এসো এখন তোমরা, নইলে ফ্লাইট মিস হয়ে যাবে!
তারা তিনজনই উঠে বসলো গাড়িতে। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করলো। মেইন গেইটের দারোয়ান তখন হয়তো ঘুম থেকে উঠেছিলো। এতো এতো সকাল সকাল তাদেরকে দেখে অবাক হলো ভীষণ!
সকাল সকাল চৈতী চৌধুরী, মালিহা বেগম সাথে প্রহেলিকা আক্তার একজোট হলেন। সমস্যা একটা-ই তাদের তিনজনের স্বামীই অনুপস্থিত। সকালে উঠে সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে ঘুরেও তাদের পাওয়া যায়না। কল করলেও তাদের কেও-ই ফোন ধরছেন না। চিন্তায় তারা আটখানা। সাথে সকাল সকাল বাচ্চাদেরও ডেকে তুলেছেন। নির্ঝরের ঘুমের ঘোর এখনও কাটেনি। হামি দিয়ে অপরিষ্কার স্বরে তাদেরকে বললো,
—আরে, ওরা কী ছোট নাকি? তোমরা শুধু শুধু এতো টেনশন করছো। হয়তো কোনো কাজে গিয়েছে দেখো!
ঐশীও নিরব থেকে সরব হলো। বললো,
—তা বলে সাতসকালে তাও আবার না জানিয়ে? এমন কখনো হয়েছে?
নির্ঝর তার কথা শুনে হাত জোড় করে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বললো,
—মা আমার, প্লিজ অফ যা! ওদের তোর কাছে বাচ্চা মনে হচ্ছে?
মালিহা বেগম এবার তাদের ডাক দিলেন। বললেন,
—চুপ করবে তোমরা?
সকলে চুপ হয়ে গেলো। তিয়া-তোতা এমনিতেই নিশ্চুপ। তখুনি আইয়ুশকে ভেতরে আসতে দেখা গেলো। ক্লান্ত তার মুখশ্রী; চোখদুটো টকটকে লাল। উষ্কখুষ্ক চুল। আইয়ুশ আসতেই মালিহা বেগম ছেলের কাছে এলেন। খুলে বললেন সকলকিছু। আইয়ুশ অবাক হয়৷ বলে,
—আশ্চর্য! ওরা কোথায় যাবে?
—সেটাই তো কথা।
—আচ্ছা চিন্তা করোনা, চলে আসবে।
বলেই উপরে ওঠার জন্য পা আগায়। ততক্ষণে মির্জা বাড়ির সকল সার্ভেন্টের কাছে খবরখানা পৌঁছেছে। সিকিউরিটি গার্ড–আব্দুল্লাহ এসে তাদের সামনে দাঁড়ালেন। বললেন,
—ম্যাডাম, আমি জানি স্যার কোথা গিয়েছেন।
আইয়ুশ থেমে গেলো। ঘাড় ঘুরিয়ে বুঝতে চাইলো আব্দুল্লাহ’র পরবর্তী কথা। আব্দুল্লাহ বললেন,
—আমি বাগানের দিকের কল থেকে অযু করতে গিয়েছিলাম। তখন তাদেরকে বলতে শুনেছিলাম, তারা কোথাও যাচ্ছেন। আর সাথে ঝিলিক আম্মাও ছিলো।
আইয়ুশের ভ্রু কুঁচকে গেলো। ঝিলিক ওদের সাথে কী করবে? সে কৌতুহলে ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
obsession vs love part 14
—আর কী বলছিলো?
—জানিনা, ঝিলিক আম্মা কোনো ফ্লাইটের কথা বলছিলো।
আইয়ুশের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো। বিস্ফোরিত চোখে বোঝার চেষ্টা করলো সবটা। ঝিলিক কী তবে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে?
