Home obsession vs love obsession vs love part 17

obsession vs love part 17

obsession vs love part 17
নিরুর কল্পনারাজ্য

—আমি কী আসতে পারি?
সায়ন ওসমান মির্জা এবং ঝিলিকের কথার মাঝে ঢুকতে ঢুকতে বললো। তাকে দেখে ওসমান মির্জা হাসলেন। বললেন,
—এসো এসো বাবা! বসো।
সায়নের আওয়াজ শুনে আইয়ুশ যেতে গিয়েও গেলোনা। বরং সেখানে থেকেই পরখ করতে থাকলো তাদের। সায়ন বললো,
—আঙ্কেল, আসলে আজ সকাল টাইমটা খুব ফ্রি ছিলাম। ভাবলাম ওয়ান এন্ড অনলি ছাত্রীকে পড়িয়ে আসি।
—বেশ করেছো বাবা!
তিনি ঝিলিককে বললেন,

—ঝিলিক, পড়বে এখন?
ঝিলিক দ্বিধা করেনা। পড়াই যায়। তাছাড়া সামনে তার আরও অনেকদূর যাওয়ার আছে। সে লক্ষ্য কিছুতেই ভাঙা যাবেনা এসবের চক্করে। তাই সে রাজি হয়। বলে,
—হ্যাঁ, কেনো নয়!
সাঁঝ আসে ততক্ষণে নাস্তা নিয়ে। ঝিলিককে নাস্তা দিতে দিতে বলে,
—ওমা, স্যার ও তো চলে এসেছেন দেখছি। স্যার, আপনি কিছু নিবেন?
—না, আমি সকালের টাইমটা কিছুই খাই না।
হেসে জবাব দিলো সায়ন। সাঁঝও বিনিময়ে হাসলো। ঝিলিককে শাসিয়ে বললো,
—এগুলো সব ফিনিশ করবি আর তারপর ওষুধ কিন্তু।
সায়ন চিন্তিত ভঙ্গিতে শুধায়,
—কী হয়েছে ওর?
—আর বলবেন না, দূর্বল খুব। এই আরকি।
—এটা তো ঠিক নয় ঝিলিক। তোমার এখন খাওয়া-দাওয়া করা উচিত।
মাঝ থেকে ওসমান মির্জা বললেন,
—ঠিকাছে তবে। সায়ন, তুমি আজ একটু ম্যানেজ করে নাও এদিকটায়। ওর আজ শরীর ভালো নয়। তাই আরকি…
—ইটস ওকে আঙ্কেল। এসব কোনো ব্যাপার না।
ঝিলিকের পানে তাকিয়ে শুধালো,

—কী পড়বে স্টুডেন্ট?
ঝিলিক ভেবে চিন্তে বলে,
—একাউন্টিং পড়া যায়।
তাদের কথোপকথনে ওসমান মির্জা বলেন,
—আসি তবে আমরা!
ওসমান মির্জা হেসে চলে গেলেন। সাঁঝ ঝিলিককে বললো,
—তাহলে আমি বইগুলো এনে দিচ্ছি।
সাঁঝ যাওয়ার সময় আইয়ুশকে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শুধায়,
—আপনি যাবেন না?
আইয়ুশ সাঁঝের পানে তাকায় না। দৃষ্টি তখনও সামনে বসা দুজনের ওপর। নাকের ডগা ফুলে উঠছে ক্রমশ। গমগমে স্বরে বলে,

—যা তুই!
সাঁঝ বিনা প্রশ্নে চলে গেলো। কিছুক্ষণের মাঝেই ফিরে এসে ঝিলিকের বইগুলো দিয়ে গেলো।
তবে আইয়ুশ যেতে পারলোনা। ওর কেবল মনে হলো–’ঝিলিক আর সায়ন একা থাকবে?’ আইয়ুশের বেরোনোর কথা ছিলো। মিটিংয়ের জন্য একেরপর এক কল আসা আরম্ভ হলো। আইয়ুশ বিরক্ত হয়ে ফোনটাই বন্ধ করে রাখলো। বাগানের দিকটা সে ঘুরঘুর করা শুরু করলো। নজর কেবল তাদের দিকেই। সহ্য হলোনা তাদেরকে তার একসাথে। ঝিলিক আবার হাসছে? আইয়ুশের হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। আইয়ুশ এগিয়ে গেলো প্রচন্ড ক্ষীপ্ততায়। প্রচুর জোরে; শব্দ করে থাবা মারলো টেবিলে। সায়ন আর ঝিলিক দুজনই হতবাক হলো। সায়ন অবাক হয়ে শুধালো,

—কী হয়েছে মি.মির্জা?
আইয়ুশ নিজেকে সংযত করে মৃদু হাসলো। বললো,
—কফি?
সায়ন বিরক্তিতে দুপাশে মাথা নাড়লো। বললো,
—লাগবেনা মি.মির্জা!
আইয়ুশ আবারও মৃদু হাসলো। চলে এলো তাদের মাঝ হতে।
সায়ন আবারও পড়াতে মন দিলো। সায়ন ঝিলিককে বাগানের দিকটা বসে পড়াচ্ছে আর আইয়ুশ সেদিকটায় নানান বাহানায় বারংবার ঘুরঘুর করছে এখনও। ঝিলিকের নজর এড়ায়নি তা। তবে তার ভাবে কোনো পরিবর্তন নেই। পরেরবার আইয়ুশ আসলো আবারও তাদের সামনে। সায়ন চশমা ঠেলে তার দিকে তাকালো। এই নিয়ে কম করে হলেও দশবার আইয়ুশ ঘুরে গেলো। সায়নের সাথে সাথে ঝিলিকও তাকালো তার দিকে। আইয়ুশের মনে মনে হিংসে অথচ ওপর ওপর যেনো ভালোবাসা উপচে পড়লো সায়নের প্রতি তার। জিজ্ঞেস করলো,
—কফি?
সায়ম কুঞ্চিত ভ্রুতে জবাব দিলো,

—এই নিয়ে সপ্তমবারের মতো আপনি আমাকে কফি খেতে বললেন। আপনাদের বাড়িতে কী কফি ছাড়া আর কিছুই নেই? নাকি আপনারও আমার কাছে পড়তে মন চায়ছে?
আইয়ুশ নিজের ওপর বিরক্ত হলো। এখন এই প্রফেসরকে সে কোনোভাবে বের করতে পারবেনা। ঝিলিক তা হতে দিবে বলে মনে হয়না। ঝিলিককে অন্যকারো সাথে দেখাটাও তার সহ্যক্ষমতার বাহিরে। ঝিলিককে তো সে পরে দেখে নেবে। আপাতত সায়নের কথাটাও তার খারাপ লাগলোনা। সায়ন নামক পুরুষটি ভীষণ চিপকু। আপাতত চড়ে যাওয়া মেজাজে তার হিতাহিতজ্ঞানশূন্য। ফট করেই বলে বসলো,
—বই-খাতা আনবো?
সায়ন অবাক হলো। হাতের বইখানা বন্ধ করে আইয়ুশের দিকে তাকিয়ে রাগত্ব স্বরে বিরক্ত হয়ে বললো,
— মষ্করা করছে মি. মির্জা?
—না না, আপনি স্যার মানুষ। মষ্করা তাও আপনার সাথে? তওবা কাটা উচিত এ’কথা ভবার আগেও!
সায়ন তখনও বিরক্ত ভঙ্গিতে আইয়ুশের পানে তাকিয়ে। সায়ন তিক্ত; বিরক্ত হয়ে বললো,
—আজ এটুকুই থাক ঝিলিক! কাল আবার আসবো।
উঠে দাঁড়ালো এই বলে সে। আইয়ুশ বিজয়ীর মতো করে হাসলো। সায়ন যাওয়ার আগে বললো,

—পরেরবার অন্য বাহানা খুঁজবেন মি.মির্জা!
—হ্যাঁ, হ্যাঁ একদম। আবার আসবেন। বিদায়য়!
হাত নেড়ে বিদায়ের ভঙ্গি করলো। ঝিলিক বিরক্ত হলো। সায়ন পড়ালো মোটে এক ঘন্টা। সায়ন চলে যেতেই আইয়ুশ ঝিলিকের সামনে এলো। ঝিলিক তাকানোর প্রয়োজনবোধ করলোনা
সার্ভেন্টদের মধ্যে একজনকে হাঁক ছেড়ে ডাকলো বইগুলো নিয়ে যাওয়ার জন্য। পাশ থেকে একজন এসে বইগুলো সাথে নিলো। আইয়ুশ ঝিলিকের সাথে কথা বলতে চাইলো। ঝিলিক তাকালোনা। উঠে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালোনা। আইয়ুশের চোখদুটো রক্তিম। শ্বাসের ওঠানামার বেগ কিঞ্চিত বেড়েছে। ঝিলিককে ডাক দিয়ে বলে,
—ঝিলিক, সায়নের কাছে তুমি আর পড়বেনা।
আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো–ঝিলিক তার দিকে ফিরেও চায়লো না। আপনমনে গুণগুণ করতে করতে চলে গেলো। আইয়ুশ অবাক হলো। ঝিলিক আইয়ুশকে এমনভাবে এড়িয়ে গেলো যেনো সেখানে ঝিলিকবিহীন কারও অস্তিত্ব বিদ্যমান ছিলো না। আইয়ুশ আবারও ডাকলো,

—ঝিলিইইইক!
কোনো সাড়াশব্দ আসেনা। ঝিলিক চলে যায়। আইয়ুশ ক্লান্ত ভঙ্গিতে সেখানে থাকা একখান চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে। শরীরের অবস্থা বেগতিক। জড়-টর আসছে বোধহয় হুড়মুড়িয়ে। সবকিছু কেমন অসহ্য লাগছে। হাত দুটো কপালে ঠেকিয়ে মাথাটা খানিক নোয়ালো। কবে এসব ঝড়ের ইতি ঘটবে কে জানে? আইয়ুশের মনে প্রশ্ন জাগলো–ও কী আদৌও এসব থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে? আর যদি পারেও; ততদিনে যদি অনেকটা দেরি হয়ে যায়? ঝিলিক কী তখন তাকে ভুল বুঝবে? ক্ষমা করতে পারবে? ভাবতে পারেনা আর সে। ঝিলিকের এড়িয়ে চলা তার ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ে ঘাঁ হয়ে বিধছে৷ মনে হচ্ছে–রক্তাক্ত হৃদয়ের গোলাপ হঠাৎ কাটাতে পরিবর্তিত হয়েছে; যে গোলাপ এতোদিন হৃদয়ের দোলাচল প্রশমিত করেছে সে হৃদয়ে তুফান সৃষ্টি করেছে। আর সেই অমায়িক ঘূর্ণির নাম–ঝিলিক মির্জা!
আইয়ুশ কোনো রকমে উঠে দাঁড়ালো। সায়নের মতিগতি তার ঠিক লাগলোনা। পুরুষটি কোথাকার? তাকে ওসমান মির্জা পেলো-ইবা কী করে? একবার ভাবলো ওসমান মির্জার সাথে কথা বলে নেবে। হয়তো এটাই উচিত। উঠে যাওয়ার জন্য পায়ের পাতায় ভর দিতে গিয়েই তার মাথাটা ঘুরে উঠলো। পাশের চেয়ারটা তার শক্তপোক্ত হাতখানা আষ্টেপৃষ্ঠে ধরলো। অন্যহাত গেলো মাথায়। কস্মিনকালেও আইয়ুশের শরীর জ্বর সয় না। অবস্থা প্রচন্ড খারাপ হয়ে যায়। এখনও একই দূর্দশা৷

—একি! কী হলো আপনার?
সাঁঝ বাগানের দিকটায় এসেছিলো ঝিলিকের পড়াশোনার পাঠ চুকেছে কিনা তা পরখ করতে। অথচ এখানে আইয়ুশের এমন অবস্থা দেখে সে আতঙ্কিত হলো। দৌড়ে গিয়ে তাকে ধরার জন্য হাত বাড়ালো। আইয়ুশ দু’পা পেছনে সরে এলো। চেয়ার ধরে রাখা হাতখানার মাধ্যমে তার সীমারেখা তাকে মনে করিয়ে দিলো। বললো,
—ঠিক আছি আমি। নিজের কাজে যা!
বলেই টলতে টলতে কোনোরকমে নিজেকে স্থির করে নিলো। বাবার রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। পেছনে ফেলে গেলো একজোড়া বারিধারায় বর্ষণমান আঁখিদ্বয়। যার মনে ব্যর্থতার ছায়া। অস্ফুটস্বরে সে বললো,
—সে নারী ভাগ্যমান; যার জন্য আপনার এতো সীমারেখা!

—আব্বু, ওই প্রফেসর টাকে তুমি কীভাবে চেনো?
ওসমান মির্জা নিজ কক্ষে কাউচে বসে হিসেবের কাজ করছিলেন। আইয়ুশের এমন কথায় তিনি তার ওপর নজর নিবিষ্ট করলেন। কপাল কুঁচকে জানতে চায়লেন,
—হু? কী বললে…?
আইয়ুশ ভেতরে এলো। মালিহা বেগম বোধহয় কিচেনে৷ সেখানেই হওয়ার কথা। আইয়ুশ বাবার সামনে গিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসলো,
—আব্বু, প্রফেসর যে ঝিলিককে পড়ায়–ওনাকে তুমি কীভাবে চেনো?
ওসমান মির্জা নড়েচড়ে বসলেন। গম্ভীরমুখোয় জবাব দিলেন,
—সে আমার এক বন্ধুর ছেলে। আমি বলাতেই সে এখানে পড়াতে এসেছে। এইদিন-ই ল্যান্ড করেছে বাংলাদেশে।
—বন্ধু? কোন বন্ধু? ল্যান্ড করেছে মানে? প্রফেসরটা বাংলাদেশের নয়?
—না, এইদিন-ই রাশিয়া থেকে বাংলাদেশে ল্যান্ড করেছে৷ তোমার রাশেদ আঙ্কেলের ছেলে ও৷
রাশেদ চৌধুরী কে? এ বিষয়ে আইয়ুশের মনে নেই৷ তবে খুব ছোটবেলায় হয়তো তিনি মির্জা বাড়িতে আসতেন। আইয়ুশের মনে নেই। আর না-তো চেনা৷ আইয়ুশ ভাবুক হয়ে ভাবতে আরম্ভ করলো। ওসমান মির্জা তাকে দেখে বললেন,

—কী ভাবছো? আর হঠাৎ এইসব প্রশ্ন কেনো?
—সায়ন চৌধুরীর পরিবর্তে অন্যকোনো ফিমেইল টিচারকেও তো আনা যায়।
—কেনো?
—কেনো মানে? বাড়িতে মেয়ে রয়েছে; ছেলেটা ভালো নাকি খারাপ এসব যাচাই না করেই……..
—ঝিলিক কিছু বলেছে?
ওসমান মির্জা আইয়ুশকে থামিয়ে শুধালেন। আইয়ুশ কপাল কুঁচকালো। বললো,
—কী বলবে?
—তাহলে তোমার এতো কৌতুহল কিসে? ভুলে যেওনা–বিয়ের বিষয়টা নিয়ে এখনো কিন্তু আমি তোমায় মাফ করিনি। তার ওপর তুমি প্রতিরাতে অফিসে কাটাও;, এমনকি বাড়িতেও থাকোনা খুব একটা৷ তাহলে বিয়েটা করলে কেনো? মেয়েটা যে কষ্ট পাচ্ছে এটা তুমি দেখতে পাচ্ছো না?
আইয়ুশ এসবে কান দেয়না। ওসমান মির্জার কথাগুলোর প্রত্যুত্তরে কেবল বিরক্তি ঝাড়ে। বেরিয়ে আসে গম্ভীর ভঙ্গিতে। ওসমান মির্জা চেঁচালেন তার ওপর,
—কথা শুনছো না কেনো তুমি? এই ছেলে….
ওসমান মির্জা ছেলের কার্যকলাপে হতাশ হলেন। কিছুদিনের মাঝে ছেলেটার এমন অবনতি মানা যায়না।

আইয়ুশ বেরিয়েছিলো সকালে। মাগরিবের আযানের আগে করে বাড়িতে ফিরেছে। মাগরিবের নামাজটা কোনোরকমে আদায় করেছে। জায়নামাজে বসলেই আইয়ুশের কেমন নিজেকে শান্ত মনে হয়। মনে হয়–সে সবকিছু পেরোতে পারে যদি আল্লাহতায়ালা সহায় হন৷ নামাজ আদায় করে বেরোনোর প্রচেষ্টায় আপাতত। অথচ শরীর মানছেনা। জ্বর উঠে গিয়েছে। কাওকে জানায়নি। জ্বর এলেই আইয়ুশ নিজে হুঁশ হারায়। এটা পরিবারের সকলেরই জানা কথা। তখন মালিহা বেগম সারারাত ছেলের পাশে পড়ে থাকেন। অথচ আজ তিনি নেই। আইয়ুশ জানায় নি। জ্বরে তার চক্ষুদ্বয় রক্তাভ হয়ে উঠেছে। চোখদুটো ক্রমশ ঝাপসা হচ্ছে। মেলে রাখা দুষ্কর। উষ্কখুষ্ক চুল আর ফ্যাকাসে আদল। শোচনীয় অবস্থা।

সাঁঝ রুমে এসেছে। সাধারণত আইয়ুশ এসময় বাড়িতে থাকেনা। তাই এই সময়টা সে আইয়ুশের রুমেই কাটায়। আজ হঠাৎ আইয়ুশকে রুমে দেখে অবাক হলো। লাইট নিভিয়ে শুয়ে ছিলো সে। সাঁঝ লাইট ধরাতেই চমকে উঠলো। চোখের ওপর হাত রেখে শুয়ে আছে আইয়ুশ। কম্ফোর্টার কোমড় অব্দি জড়ানো। ধবধবে মুখশ্রী বেরঙিন। সাঁঝ তড়িঘড়ি করে এগোয়। সকালেও আইয়ুশের শরীরটা খারাপ ছিলো। আইয়ুশের কপালে হাত দিতে গিয়েও থমকে যায় তার হাত। আইয়ুশ কিছু বিড়বিড় করছে হয়তো। জ্বর কী খুব বেশি? এভাবেই বা কতক্ষণ থাকবে সাঁঝ? যদি খুব অসুস্থ হয়ে যায়? দোনামোনা করে কপাল পরখ করার জন্য হাত বাড়ায় সাঁঝ। মুহূর্তেই আইয়ুশ চোখ মেলে। আইয়ুশের লাল আভাযুক্ত চোখ দেখে খানিক ভয় পায় সাঁঝ। পিছু সরে আসে। আইয়ুশের মাথা তোলার উপায় নেই৷ চোখ মেলতেও তার বহুকষ্ট হলো। চোখে জ্বালাপোড়া শুরু হয়েছে। সাঁঝ আমতা আমতা করে বললো,

—ও..ই আমি জ্বর…থার্মোমিটার…দিয়ে মাপতে চাইছিলাম।
আইয়ুশের কথা বলার জোর নেই। জ্বরে কাহিল অবস্থা। সাঁঝ অবাক হলো। সাঁঝের উপস্থিতি আইয়ুশ কীভাবে বুঝলো? আইয়ুশের জ্বর হলে ওর কোনো হুঁশ-ই থাকেনা। কী করছে, না করছে..! কিছুই না। সেখানে সাঁঝের উপস্থিতিতে ওর টের পাওয়ার কথা ছিলোনা।
আইয়ুশ প্রচন্ড কষ্টে উঠে বসে। মাথা তুলতেই সে অনুভব করলো তার পুরো পৃথিবী ঘুরছে। মাথা চেপে বসে রইলো খানিকক্ষণ। সাঁঝ দ্রুততায় বেডসাইড ড্রয়ার হাতড়ে থার্মোমিটার বের করলো। আইয়ুশের দিকে বাড়িয়ে দিতেই আইয়ুশ সাঁঝের হাত স্পর্শবিহীন-ই থার্মোমিটার খানা ফেলে দিলো। আপাতত নিজের ওপর কোনো কন্ট্রোল তার নেই। সাঁঝ আঁতকে উঠলো। পিছু সরে এসে শুধালো,
—আপনার কী খুব খারাপ লাগছে?
আইয়ুশ উত্তর দেয় না। বহুকষ্টে নিজেকে দাঁড় করায়। যতবার পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ায় ততবার! সাঁঝ তাকে ধরতে আসতেই এবার সে নিয়ন্ত্রণহীন জবাব দেয়,
—দূরে থাকুন, যে-ই হোন-স্পর্শ করবেন না আমায়! আমার ওপর কলঙ্ক লেগে যাবে; আল্লাহতায়ালা রুষ্ঠ হবেন। দূরে থাকুন!

আইয়ুশ ধীরগতিতে বেরিয়ে গেলো। অনিয়ন্ত্রিত মস্তিষ্ক সাঁঝকে চিনতে পারলোনা। পারার কথাও না। হুঁশবিহীন এই মস্তিষ্ক জ্বরের সময়টায় কেবলই মায়ের স্পর্শকেই চেনে। আর কাওকে নয়! তবে বোধহয় একজন রয়েছে। যাকে মস্তিষ্কের কাছেও হার মানতে হয়; কেননা তার উপস্থিতি কেবল মস্তিষ্কেই নয়—বক্ষস্থলে ও! আইয়ুশ বেরিয়ে কোথায় যাবে তার চিন্তা করেনা; কক্ষে অন্যকারো উপস্থিতি লক্ষ্য করেই বেরিয়ে আসে। জ্বরের মাঝেই বিড়বিড়িয়ে বলে,
—তোমার অস্তিত্বের ছায়া আমার রন্ধ্রে এমনভাবে মিশে রয়েছে যে–আমার বেসামাল; হুঁশবিহীন মস্তিষ্ক তুমি ব্যতীত অন্য নারীর নৈকট্যের আধার ও মেনে নিতে অক্ষম! তুমিহীনা অন্যনারী ধারে কাছে এলেই আমার প্রতিটি নিউরনে তুমিনামক অসুখের সংকেতময় ঢেউ বয়ে চলে; দেখো, এই ১০৪ ডিগ্রি জ্বরের মাঝেও পরনারীর স্পর্শে আমি নিজেকে কুলষিত হতে দিইনি, প্রাণ আমার!

টলতে টলতে ছাদের দিকে যায়। সাঁঝ পিছু করতে চেয়েছিলো। তবু যায়না। আরও যদি রেগে যায় আইয়ুশ? চিন্তাও কম হয়না। ছাদে ছোটোখাটো একটি চিলেকোঠার ঘর রয়েছে। আপাতত আইয়ুশের গন্তব্য সেদিকপানে। মাথা কেমন ঝিম ঝিম করে উঠছে প্রতিটি মুহূর্তেই। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে যেয়েও ক’বার যে হোঁচট খেলো। সন্ধ্যার সময়–সকলেই বোধহয় নিচে আড্ডারত। আইয়ুশকে কেও-ই লক্ষ্য করেনি। আইয়ুশ ধীরপায়ে ছাদে যায়। অনাকাঙ্ক্ষিতবশত-ই চোখের সামনে ঝিলিককে দেখতে পায় সে। এটা কী তার বিভ্রম? জ্বরের ঘোরে কী সে হ্যালুসুনেট করছে? ঝিলিকের এখানে থাকার কথা কী? তাও এসময়ে? মেঘলা ঝড়োলা হাওয়া চারিপাশে। কালবৈশাখী হানা দিচ্ছে বুঝি? আইয়ুশের মনের মতো? আইয়ুশ ধীরপায়ে পেছন ফিরে থাকা রমণীর দিকে পা বাড়ায়। ওর কী এমুহূর্তে ঝিলিকের সান্নিধ্য প্রয়োজন? প্রয়োজন! কিন্তু সে অধিকার কী বাকি রয়েছে তার জন্য? নেই তো। আইয়ুশ হাত বাড়ায়। অথচ ঝিলিককে স্পর্শ করার সাহস তার আসেনা। ঝিলিক কারো উপস্থিতি টের পেতেই পিছু ফিরলো। বাহিরে প্রচন্ড হাওয়া। সন্ধ্যের এই কাল বৈশাখীর ঝড়ো হাওয়া তার বড্ড পছন্দের। তাই সকলের থেকে আলাদা হয়ে এখানে এসেছে খানিকক্ষণ একা থাকার উদ্দেশ্যে। এ হাওয়ায় ঝিলিকের লালচে কমলা রঙা কেশদ্বয় উড়ে বেড়াচ্ছে মুক্তমনা হয়ে। সন্ধ্যার শহরের আলো-আধারে ঝিলিককে এই মুহূর্তে অপার্থিব মনে হলো। আইয়ুশ হুট করে নিজের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারাতে আরম্ভ করলো। চোখদুটো টকটকে লাল হলো তার। ঝিলিকের আদলখানা একবার ছুঁয়ে দেওয়ার বড্ড লোভ জাগলো। এই জ্বরে সে সম্পূর্ণ খেঁইহীন এক মানব। তার কেবল মনে হলো–সামনের রমণীটিকে সে ছুঁয়ে দেখেনা বহুদিন! আইয়ুশের এমন ভাবগতি দেখে পিছিয়ে আসে ঝিলিক। ভ্রু কুঁচকে কঠোর স্বরে বলে,

—কী করছেন এসব?
রুক্ষ স্বরে কথাখানা বলেই সে পা বাড়ালো। আইয়ুশ ঝিলিকের হাতখানা মুঠো করে ধরলো। ঝিলিক সাথে সাথে ঝাড়া মেরে ফেলে দিলো হাতখানা। সাথে এক অবাক করা কান্ড করে বসলো। থাপ্পড় বসিয়ে দিলো আইয়ুশের গালে। সাথে ঝাঁঝালো স্বরে বললো,
—আমাকে ছোঁয়ার সাহস আপনার হয় কী করে?
আইয়ুশ অবাক হয়। চোখে জল জমে। স্বর বিঁধে আসে। নিজেকে সংযত রাখার বহুচেষ্টা চালায়। আঁধারে তা মিশে যায়। দৃশ্যমান হয়না ঝিলিকের দৃষ্টিতে। বলে,
—ঝিলিক..আ..আমার বড্ড খারাপ লাগছে ঝিলিক। জ্বর হয়েছে বোধহয়!
ঝিলিক নির্লিপ্ততায় বলে,
—তো?
—এভাবে বলো না, দোহায় তোমার!
ঝিলিক অস্ফুট হাসে। কী অদ্ভুত ছলনা এই পুরুষের? তাকে ভাঙার অন্য এক প্রচেষ্টা বুঝি এটা? তবে সে তো আর ভাঙবেনা। রুক্ষতায় বলে,

—আজ থেকে বড়োজোর ছ’দিন আগে আমিও এভাবে কেঁদেছিলাম জানেন? পায়ে পড়ে আর্জি জানিয়েছিলাম; স্বীকৃতি চেয়েছিলাম। পরির্বতে পেয়েছিলাম বিশ্বাসঘাতকতা। সেদিন আমিও কেঁদেছিলাম। তবে আজ আপনি কেনো আমার দ্বারে? যার জন্য আমাকে ঠকিয়েছেন তার কাছেই নাহয় আপনার ঠাঁই হোক। আমিই কেনো?
আইয়ুশের বলার মতো কিছু থাকেনা। বলেওনা কিছু। আইয়ুশের নিরবতায় ঝিলিক হাসে। একমুহূর্তের জন্য তার মনে হয়েছিলো–হয়তো আইয়ুশের অন্তত অনুশোচনা হচ্ছে। তবে তার নিরবতা-ই তাকে প্রমাণ করে দিলো। ঝিলিক ফের বললো,
—কী? বলার মতো কিছু নেই তাইতো? থাকার কথাও নয়। আমার থেকে দূরে থাকবেন নয়তো ভালো হবেনা!
—এতো নির্দয় কবে হলে ঝিলিক?
—যেদিন আপনি আমার জায়গা অন্যকাওকে দিয়ে দিলেন!
ঝিলিক থাকেনা।
ঝিলিক চলে গেলো। একবার ফিরেও তাকালোনা। নাহ..একবারের জন্যেও নয়। আচ্ছা–সেদিনও বুঝি ঝিলিকের এমন অনুভূত হয়েছিলো যেদিন ও নিজে অন্যকাওকে বিয়ে করে এনেছিলো? যেদিন ঝিলিক কেঁদে কেঁদে তাদের সন্তানের কথা ভাবতে বলেছিলো? পরিস্থিতি যেমনই হোক–ঝিলিককে তো সে মেরেই ফেলেছে ভেতর থেকে। তবে এখন; এইমুহূর্তে কোন ধরণের সহানুভূতি সে আশা করছে সে ঝিলিকের কাছ থেকে? আইয়ুশ তাকিয়ে রইলো ঝিলিকের যাওয়ার পথে।

ঝিলিক বুকের কাছটা আঁকড়ে ধরলো। খুব করে বিঁধছে কোথাও। মানুষটার জ্বর হয়েছিলো। আর ও? না! একদম ভুল কিছু করেনি সে। তবে? তার তো খারাপ লাগার কথাও নয়। বিড়বিড় করে সে,
—ঘৃণিত পরিণয়ে কী ভালোবাসা হয়? হয় না! আপনার–আমার প্রণয়ে ভালোবাসার দাফন হয়ে গিয়েছে বহু পূর্বে। আপনিই সেই মৃত ভালোবাসার দাফনকারী। আমাদের কেবল মুক্তিটুকুই বাকি!
আইয়ুশ ধীরে ধীরে নিচে নামে। শান্ত ভঙ্গিতে ড্রইংরুম হয়ে বেরিয়ে যায়। মালিহা বেগম ছেলেকে দেখে ডাক দেন,
—আইয়ুশ, কোথায় যাচ্ছিস? শোন…
আইয়ুশের সারাশব্দ আসেনা। সে বেরিয়ে যায়। ঐশিরা আড্ডা দিচ্ছিলো। আইয়ুশকে এমতাবস্থায় দেখে সকলেই অবাক হয়ে যায়। মালিহা বেগম চিন্তিত হলেন।।আইয়ুশের জ্বর এসেছিলো। সাঁঝ বলেছিলো। সে কিচেনের কাজ সেরে সেখানেই যাচ্ছিলো। ছেলেটা গেলো কোথায় হঠাৎ? জ্বর হলে তো আইয়ুশের বেহাক দশা হয়, তাহলে এখন বেরিয়ে গেলো কেনো এভাবে?

আইয়ুশ বেরিয়ে বেজমেন্টের একটি গোপন রুমে যায়। অতি সন্তপর্ণে; যাতে কেও তাকে দেখতে না পায়। সকলের নজর এড়িয়ে সেখানে যেতেই সামনের একখান দেখালে দৃশ্যমান হয় ঝিলিকের অজস্র ছবি। দেয়ালে এক এক করে টাঙানো।কিশোর বয়স থেকে এখনও অব্দি। আইয়ুশ সেসবের পানে অশ্রুসজল চোখে চেয়ে রইলো। চোখ বেয়ে বারিধারায় জল গড়িয়ে পড়লো। সে এগিয়ে গিয়ে ছুঁয়ে দিলো ঝিলিকের বড় একটি পেইন্টিং। তার নিজের হাতেই অঙ্কিত। যেটা দেয়ালের বড় অংশ জুড়ে এবং আশেপাশে ঝিলিকের ছোট ছোট বহু ছবি। অন্যরকম হলো তার চাহুনি। পিছিয়ে আসলো আইয়ুশ। সামনে থাকা টেবিল থেকে একটা রিমোটে চাপ প্রয়োগ করতেই দেয়ালের একটু থাকা এক বড় স্ক্রিনে ভেসে উঠলো ঝিলিকের দীর্ঘপল্লব বিশিষ্ট আঁখিদ্বয়। আইয়ুশ নিজেকে সংযত করতে চায়। কিছুক্ষণ আগের দৃশ্য মনষ্পটে ভেসে উঠতেই বারংবার কান্না উগড়ে আসে তার। সেখানেই পড়ে থাকা এক গিটার হাতে তুলে একটা চেয়ারে বসে পড়ে। চেয়ারখানায় বসে সম্মুখে থাকা সেই চোখদুটোর পানে মনোযোগ নিবিষ্ট করে। গান কষ্টকে হালকা করে। এমনই প্রচলন। সেই প্রথা অনুযায়ী আইয়ুশের স্বর চিঁড়ে আপনাআপনি বেড়িয়ে এলো এক ভঙ্গুর সুর,

obsession vs love part 16

~চিন্তাতে তোর, কাটছে প্রহর!
শান্তি নেই, এ যন্ত্রণার!
মন মাঝিরে, বলনা কোথায়?
মন মাঝিরে, আয় ফিরে আয়…..
সাথে তার অশ্রুদ্বয় বাধ ভাঙে। মন খারাপী পরিবর্তিত হয়ে বক্ষস্থলে অসহ্য যন্ত্রণা আরম্ভ হয়।
এসবের মাঝেই হুট করে আইয়ুশের মস্তিষ্কে হানা দিলো অবাককর এক বিষয়। বাবা যে বললো–রাশেদ আঙ্কেল? অথচ তিনি তো আমেরিকার বাসিন্দা। এমনকি তার কোনো ছেলেও নেই। তাহলে ওসমান মির্জা তাকে মিথ্যে বলেছে? নাকি এমন কোনে সত্য আছে তা তারই অজানা?

obsession vs love part 18