obsession vs love part 3
নিরুর কল্পনারাজ্য
যার বাচ্চা নিজের পেটে ধারণ করে আছে তারই বাসরঘর সাজাতে হচ্ছে তাকে। কতটা সৌভাগ্যবান হলে কারও এমন ভাগ্য হয়। তাচ্ছিল্য করে হাসে ঝিলিক। তিয়া টেনে নিয়ে এসে ফুল ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছে ঝিলিককে। সে ফুলগুলোর দিকে একমনে তাকিয়ে রইলো ঝিলিক। তার অনুভূতি কেমন যেনো শূন্য হয়ে গিয়েছে। অতি শোকে পাথরের মতো অবস্থা। হাতের ঝুড়িতে রাখা সাদা গোলাপ। ঝিলিকে প্রিয় ফুল। একসময় এই সাদা গোলাপ দিয়েই নিজের ভালোবাসার কথা জানিয়েছিলো আইয়ুশ। অথচ এখন সে বিয়ে করেছে; অন্য কাওকে। এ ফুল অন্যকারো উদ্দেশ্যে লাগানো হচ্ছে। তাও আবার নিজের বড় বোনের জন্য।
–এই ঝিলিক! ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী ভাবছিস?
তিয়ার কথায় টনক নড়ে ঝিলিকের। ও দ্রুত ফুলগুলো সাজানোর কাজে লেগে পড়লো। একটুপরই সকলের সব কাজ শেষ হলো। সকলে ক্লান্তিতে কাউচে বসে পড়লো। ঝিলিকের মন বারবার পালাতে চাইছে অথচ তাহলেই এখন তাকে অঢেল প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। যার উত্তর তার কাছে নেই। এরইমাঝে ঐশি আসে। সে এসবের মধ্যে ছিলোনা। ঐশি ঝিলিককে আইয়ুশের রুমে দেখে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। হুট করে রেগে গেলো। ক্ষীপ্র মেজাজে ঝাড়লো সবাইকে,
—কী সমস্যা তোদের? ওকে কেনো আবার এখানে ডেকেছিস?
তিয়া অবাক হলো। বললো,
—যা বাবা! এখানে রাগার কী আছে আপু? ঝিলিক ও তো আমাদের বোন, আমরা সবাই আনন্দ করছি আর ওকে ডাকবোনা? তোমাদের দুই ভাই-বোনের আজ হয়েছে টা কী বলো তো?
ঐশি কিছু বলেনা। বিরক্ত চোখে চেয়ে থেকে ঝিলিকের কাছে যায়। ঝিলিককে ধরে নিয়ে আসে,
—ঝিলিক আয় তো! এখানে থাকার দরকার নেই তোর।
ঝিলিক কেমন ফ্যাকাশে চোখে চেয়ে থাকে তার পানে। ওকে এখন যে যেভাবে বলবে হয়তো ও সেভাবেই করবে। হুশ জ্ঞান খুঁইয়েছে নিজের। ঝিলিককে নিয়ে বেরিয়ে এলো রুম থেকে। করিডোরের সামনে গিয়ে হুট করে জড়িয়ে ধরলো ঝিলিককে। ঝিলিক তখনো নিস্তেজ।
—ঝিলিক! বোন আমার..তুই ঠিক আছিস? হু? আমি জানি না, ভাইয়ু এটা কী করলো! ও-তো, ও-তো তোকে…..
—থাক না আপু, আমি ঠিক আছি। দেখো আমি হাসছি।
ঐশি তাকালো। এ হাসি কী আদৌও খুশির হাসি? তার কী নিজের ভাইকে বুঝতে এতোটাই ভুল হলো? ঐশি ভাবতে পারেনা। আইয়ুশের ওপর তার প্রচুর রাগ জন্মেছে। ঝিলিক তখনও কৃত্রিম হেসে দাঁড়িয়ে, বহুকষ্টে বলে,
—আপু, আমাদের মাঝে তেমন কিছুই নেই যেমনটা তুমি ভাবছো।
ঐশি অবাক হলো। ঝিলিক ফের বললো,
—আপু আমাকে একটু রুমে দিয়ে আসবে? প্রেশারটা বোধহয় আবারও লো করছে।
ঐশি দিয়ে আসে তাকে তার রুমে। ঝিলিক দরজা আটকে দেয়৷ ঐশি বুঝে ওঠে না কিছু। মলিন মুখে বেরিয়ে যায়।
একটু পরই বোধহয় সাঁঝকে নিয়ে আসা হলো। হই-হুল্লোর করছে তোতা-তিয়ারা। ঝিলিক এসব শুনে নিজের কানদুটো চেপে ধরলো। সারাকক্ষ জুড়ে তার আর আইয়ুশের সকল ছবি। বিছানার কাছ ঘেষে বসে আছে সে। গায়ের ওড়না মেঝেতে পড়ে আছে। নিজের চুলগুলো খামচে ধরে কষ্টটুকু কমাতে চাইলো। একসময় হুট করে উঠে দাঁড়ালো। বেরোলো রুম থেকে। বড়রা তখন যার যার ঘরে। ঝিলিক সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজলো আইয়ুশকে। কোথাও নেই! যতদূর শুনেছে আইয়ুশ এখনও নিজের রুমেও যায়নি। সবশেষে ছাদ বাকি রইল। ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে গেলো সেদিকপানে। কোমড়সমান চুলগুলে তখন সম্পূর্ণ অগোছালো। ছাদে পৌঁছেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে পেলো। সিগারেটের ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। ঝিলিক এগিয়ে গেলো। অর্ধেক যেতেই কাশি পেলো তার। তখন পূর্ণচন্দ্র বোধহয়। ঝিলিকের কাশের শব্দে সে পিছু ফিরে। তৎক্ষনাৎ হাত থেকে সিগারেট ফেলে পায়ে পিষে ফেলে। ঝিলিক নিজেকে সামলে উঠতে পারেনা। দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরে আইয়ুশকে। আইয়ুশের বুকে মুখ গুঁজে শব্দ করে কেঁদে ওঠে। আইয়ুশের হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়। কেমন বিধ্বস্ত এক অবস্থা তার। কাঁদতে কাঁদতে ঝিলিক বলে,
—বলে দাও সব মিথ্যে। এসব একটা স্বপ্ন! আমার আর সহ্য হচ্ছেনা আইয়ুশ!
আইয়ুশ তখনও একই পাথুরে ভঙ্গিতে। একসময় হাত দ্বারা নিজের বুক থেকে আলাদা করে ঝিলিককে। ঝিলিক অসহায় চোখে তাকায়।
—আমি মরে যাচ্ছি আইয়ুশ। দেখো, আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি।
—বাচ্চামো করোনা ঝিলিক। এতো রাতে ছাদে কেনো এলে? যাও এখান থেকে।
—বাচ্চামো করছি আমি? তোমায় অন্য কেও ছোঁবে, গভীরভাবে ছোঁবে। আমি কীভাবে সহ্য করবো বলো? আমাকেও যদি সেভাবে কেও ছুঁতো, তুমি সহ্য করতে? বলো?
—ঝিলিক!
ধমকে ওঠে আইয়ুশ। ঝিলিক ডুকরে ওঠে। বুদ্ধি সব যেনো লোভ পেয়েছে। আইয়ুশের বাম হাতখানা নিজের পেটের কাছে নিয়ে বলে,
—আইয়ুশ, নিজের বাচ্চাটার কথা একটাবার ভাবছো না কেনো তুমি? বলো?
আইয়ুশ চুপ থাকে।
—দেখো, আমার মাইগ্রেশেনের ব্যাথাটা বেড়েছে। আগলে নিবেনা তুমি আমায়? ঠিক আগের মতো! কী হলো, চুপ কেনো তুমি?
—না!
—ঠকালে কেনো আমায়? ভালোই যদি না বাসতে তাহলে কেনো এতসব?
—নিচে যাও।
—আমি সত্যিই মরে যাচ্ছি আইয়ুশ। একটাবার জড়িয়ে ধরোনা আমায়? আমার বুকটাতে খুব ব্যাথা করছে। একটু জড়িয়ে ধরোনা আমায়?
—ঝিলিক, বাড়াবাড়ি করোনা।
—আমি মরে গেলে তুমি খুশি হবে আইয়ুশ?
আইয়ুশ যেনো বিরক্ত হয় ঝিলিকের এমন কথায়।
—হ্যাঁ, হবো!
বলেই পা বাড়ায় সে। ঝিলিক তৎক্ষনাৎ আটকে নিলো তার পথ। পায়ের কাছে গিয়ে বাচ্চাদের মতো আগলে ধরে তার পা। ভীষণ কাতর স্বরে বলে,
—যেওনা আইয়ুশ। দয়া করে আমার বিশ্বাস ভেঙো না।
—পা ছাড়ো ঝিলিক! পাগল হয়েছো? করছো টা কী?
—যাবেনা তুমি পরনারীর কাছে। আমি তোমার বিয়ে করা বউ আইয়ুশ। তুমি এমনটা করতে পারোনা।
আইয়ুশ শোনেনা তার মানা। পা ছাড়িয়ে ঠিক চলে যায়। ঝিলিক কেমন যেনো পাগলের মতো করে ওঠে। চেঁচিয়ে বলতে থাকে,
—যেওনা, ফিরে এসো আইয়ুশ। আমার কষ্ট হচ্ছে খুব। আইয়ুশশশশ……
অথচ আইয়ুশ আসেনা। একবার পিছন ফিরেও তাকায় না। ঝিলিক কতক্ষণ ওভাবে পড়ে ছিলো জানে না সে। উঠে দাঁড়াতেই বুঝতে পারে তার শরীরে শক্তি নেই। একবিন্দুও নেই। টেনে হিঁচড়ে ওই দূর্বল শরীরখানা নিয়ে নিচে নামলো সে। নিজের রুমে গিয়ে সকল অগোছালো জিনিস সন্তপর্ণে গোছালো। ওয়াশরুমে গিয়ে মুখ ধুয়ে এলো। চুল বেধে ওড়না জড়িয়ে বেড়লো ও। সিড়ি ভেঙে শাহদাদ মির্জার ঘরে গেলো। দুটো বারি দিতেই দরজা খুলে গেলো। রাত প্রায় একটার সময় ঝিলিককে এখানে আশা করেননি শাহদাদ মির্জা। ঝিলিক তাকে দেখতেই মুচকি হাসলো। শাহদাদ মির্জা আহ্লাদ নিয়ে বললেন,
—কী হয়েছে মা? কিছু কী প্রয়োজন তোর?
—না বাবা। আমি কী আজ রাতটা তোমার কাছে ঘুমোতে পারি? তুমি আমায় ঠিক ছোটোবেলার মতো?
মাথায় হাত বুলিয়ে দিবে?
শাহদাদ মির্জা হাসলেন।
—কেনো নয় আম্মু? ভেতরে আয়। আমি তো আরও খুশি হয়েছি যে তুই এলি। তোর মা-টা বুঝলি, কবে যে আসবে।
ঝিলিক ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে মলিন হাসে।
—মাকে ছাড়া থাকতে পারোনা তাইনা বাবা?
তিনি হাসলেন। বললেন,
—অভ্যেস কখনো ছাড়া যায়?
ঝিলিক কিছু বলেনা। ছাড়া যায়! অভ্যেসও একসময় চলে যায় নতুন কারো আগমনে। ঝিলিক বাবার কোলে শুয়ে পড়লো। বললো,
—মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দাও বাবা। কিছুক্ষণ পরই চলে যাবো।
—সে-কি? তুই না বললি তুই আজ রাতটা থাকবি?
—না বাবা, সময় ফুরিয়েছে!
ঝিলিকের কথা শাহদাদ মির্জার কাছে কেমন অদ্ভুত লাগলো। মেয়ে কখনো তার এমন করে কথা বলেনি।
—কিছু হয়েছে ঝিলিক?
ঝিলিক দু’পাশে মাথা নাড়ে। বিরবির করে বলে,
—আমি তোমার মান রাখতে পারলাম না বাবা। যতটা আমাকে দিয়েছো তার সম্মানটুকুও আমি তোমায় দিতে পারলাম না। ভুল মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকে গিয়েছি। যাকে কখনো কষ্ট পেতে দাওনি সে আজ কষ্টের পাহাড়ের চূড়ায়। আমাকে ক্ষমা করে দিও!
অথচ সেসব বলতে পারলোনা সে। মুখপ বলে,
—মাকে মনে পড়ছে খুব!
শাহাদাত মির্জা হাসলেন স্বল্প,
—বোকা মেয়ে!
ত্রিশ মিনিট যাবত ওভাবেই শুয়ে থাকলো ও। শাহদাদ মির্জাও মেয়ের মাথায় পরম যত্নে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। ঝিলিক সময় দেখেয় নেয়। রাত প্রায় দেড়টা। সে উঠে পড়ে। যাওয়ার আগে বাবাকে বলে,
—একবার জড়িয়ে ধরি?
—জিজ্ঞেসের কী আছে মামণি?
ঝিলিক মৃদু হেসে জড়িয়ে ধরে বাবাকে। শ্বাসানোর স্বরে বলে,
—একদমই ওষুধে ফাঁকিবাজি করবেনা। সবসময় ঠিকঠাক খাবার খাবে।
—আমার মা যখন বলছে অবশ্যই খাবো!
দুজনেই হেসে ওঠে। ঝিলিক বলে,
—আসি বাবা!
—আয়।
ঝিলিক চলে গেলো। নিজের রুমে ঢোকার আগে একবার আইয়ুশের রুমের দিকেও তাকালো। নিস্তব্ধ রাতে তার হাহাকার শোনার মতো কেও রইলোনা। হাসলো সে। নিজের রুমে গিয়ে বিছানায় বসে পড়লো। পেটে হাত বুলিয়ে বললো,
obsession vs love part 2
—মাকে ক্ষমা করে দিও তুমি। মা তোমাকে পৃথিবীতে আনতে পারবেনা। আমরা বরং তোমার বাবাকে আর বিরক্ত না করি। তার আমাদের প্রয়োজন নেই; ফুরিয়েছে। মাম্মামের সাথে যাবে তো হেভেন এ? হু? জানো, তোমাকে নিয়ে আমার অনেক সাধ ছিলো। অথচ কোনোকিছুই হলোনা। পরেরজন্মে তুমি আবার আমার গর্ভে আসবে কেমন? সে জন্মে মাম্মা তোমাকে জন্ম দেওয়ার মতো স্ট্রং হবো!
পরদিন সকাল ছয়টার দিকে নির্ঝর ঝিলিককে ডাকতে গেলো। ওর একটা প্রজেক্ট ঝিলিকের কাছে রয়ে গিয়েছে। ওটা নিতে হবে। অথচ দশমিনিট ধরে ধাক্কানোর পরও ঝিলিকের কোনো সারাশব্দ নেই……..
