Remedy part 11
মীরা রায়াদ
” সরি। বিশ্বাস করুন ব্যাথা দিতে চাইনি। কিন্তু ব্যাথা দেয়ার পর আরো দিতে ইচ্ছে করছে। শান্তি শান্তি লাগছে। আরো একটু ব্যাথা দিলে কি আপনি রাগ করবেন বউ?”
বলতে দেরি হলেও ঝুমের গালে আলতো কামড় দিতে দেরি হলো না। মেয়েটা এত আদুরে, যে দেখলেই শুধু আদর আদর পায়। আবারও গালে ঠোঁট ছুঁয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা তার বাবা মায়ের ঘরে গিয়ে করা নাড়ল। দরজা খুলল শাইয়ানের বাবা ইব্রাহীম।
” কি ব্যাপার শাইয়ান? এতো রাতে আপনি?”
” আম্মাকে লাগতো আব্বা। ডেকে দিন একটু।”
ইব্রাহীম কথা না বাড়িয়ে ফিরে গেলেন। কিছুক্ষন পর মেহেরুন্নেসা এসে প্রশ্ন করলো –
” সব ঠিক আছে আব্বা? ঝুম ঠিক আছে?”
” আপনাকে বলেছিলাম ওনার সাথে থাকতে। ওনাকে একা ছেড়ে আসলেন কেন আম্মা?”
” ঝুম আমার সাথে কথা বলছিল না শাইয়ান। একা থাকতে চায় বলেছিল। এতো কিছুর পর আর জোর করতে পারিনি আমি। কেন কিছু হয়েছে?( তাকে চিন্তিত লাগলো খুব)”
শাইয়ান মাথা নেড়ে বলল –
” উনি হয়তো জানতেন না আমি আর্মিদের ডাক্তার। প্যানিক এ্যাটাক করেছিল। বলছিল আমার সাথে থাকবে না। তাকে কেউ কেন বলেনি আমি আর্মি ফোর্সের সাথে জড়িত।”
মেহেরুন্নেসাকে চিন্তিত লাগলো ভীষণ।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” এখন কি অবস্থা ওনার? কি করছে?”
” ঘুমাচ্ছে। ভীষণ দুর্বল তাই স্যালাইন দিয়েছি। সাথে ঘুমের ইঞ্জেকশনও। কাল সকালের আগে ঘুম ভাঙ্গবে না হয়তো। রাতে কি কিছু খেয়ে ছিল?”
তাদের মাঝে হওয়া ঘটনা সে মেহেরুন্নেসার থেকে লুকিয়ে গেল। মায়ের সামনে কথাগুলো বলতে লজ্জা পেতো ভিশন। মেহেরুন্নেসা মাথা নেড়ে বুঝাল খায়নি।
” আচ্ছা সমস্যা নেই। আপনি মাঝে মাঝে গিয়ে একটু ওনাকে দেখে আসবেন। যদিও এখন ঘুম ভাঙবে না, তবুও খেয়াল রাখবেন।”
” কোথাও যাচ্ছেন আপনি?”
” হ্যাঁ, কাজ আছে।”
মেহেরুন্নেসা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলেকে দেখে নিয়ে বলল –
” আপনার খালাজান আর কায়সারকে ( আমিরুন্নেসার মেয়ে জামাই) বিয়ে শেষে আর দেখা যায়নি। আপনি কি কিছু জানেন এই ব্যাপারে?”
শাইয়ান ভাবলেশহীন মেহেরুন্নেসার দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে বলল –
” দেখুন হতো বিয়েতে ওসব করার পর লজ্জার সম্মুখীন হবে না বলে চলে গেছে। আসছি।”
ঘুরে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই মেহেরুন্নেসার কথা শুনে থেমে যায় তার পা।
” আর যাই করুন জানে মারবেন না। সাবধানে থাকবেন, তাড়াতাড়ি ফিরবেন।”
শাইয়ান একই ভাবে দাঁড়িয়ে পিছু ফিরে মেহেরুন্নেসাকে দেখে নিয়ে বড়বড় পায়ে মেহেরুন্নেসার দৃষ্টি সীমানার বাইরে চলে গেল। মেহেরুন্নেসা নিশ্বাস ফেলে পা বাড়ালো শাইয়ানের ঘরের উদ্দেশ্যে।
শহর থেকে অনেকটাই দূরে একটি অর্ধ কাজ করা পুরনো ভাঙ্গাচূড়া বিল্ডিং এর সামনে একটি গাড়ি এসে থামলো। ড্রাইভিং সিট থেকে আহির আর তার পাশের সিট থেকে শাইয়ান ধীরে সুস্থে বের হয়ে এলো। আহির এখনো বুঝতে পারছে না শাইয়ান কেন তাকে এই বাড়ি খুজতে বলেছিল আর কেনই বা এতো রাতে তারা এখানে? রাস্তায় যতবার প্রশ্ন করেছে প্রতিবার শাইয়ান অদ্ভুত অদ্ভুত উত্তর দিচ্ছিল। এই যেমন একবার
বলল –
” বউটাকে খুব মিস করছি আহির।”
অন্যবার বলল –
” আজতো আমাদের প্রথমরাত। ইস্, বউ রেখে এতরাতে বাইরে থাকার যন্ত্রণা তুমি বুঝবে না আহির। বলছি বিয়ে করে নাও এবার বুড়ো হয়ে গেছো।”
হতভম্ব আহির কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছিল তখন। সে জানতো শাইয়ান একটু অন্য রকম তাই বলে এতটা? বিয়ে হতে না হতে নতুন বউদের মতো রূপ খুলছে দেখি! তাকে বুড়ো বলে কত বড় সাহস ভাবা যায়? সে বুড়ো হলে শাইয়ান নিজে কি? কিন্তু সেই কথাটা আর বলা হয়নি তার। কিছু বললেই দেখা যাবে উল্টা পাল্টা বলে অপমান করবে।
শাইয়ানের পিছু নিয়ে ৮ তলা বিল্ডিং এর একদম টপ ফ্লোরে উঠে এলো তারা। এতগুলো শিরি বেয়ে আহিরের প্রাণ ওষ্ঠাগত। নিশ্বাস ভারী হয়ে এসেছে। হাঁটুতে দুহাত রেখে ঝুঁকে ঘনঘন নিশ্বাস নিতে নিতে শুনতে পেলো পুরুষালি আর্তনাদ। আর্তনাদ যেদিক থেকে আসছে সে দিকে তাকিয়ে হচকচিয়ে গেল সে। কায়সার এখানে? চোখ সরিয়ে পাশে দেখলো আমিরুন্নেসা তার পাশে চেয়ারের সাথে বাধা। হচ্ছে কি বুঝতে তার কিছুটা সময় লাগলো। যখন বুঝতে পারল তখন দৌড়ে শাইয়ানকে ধরলো সে। শাইয়ান তখন কায়সারকে বেদরম মার মারছিল।
” হচ্ছে কি শাইয়ান থামো। পাগলামোর একটা লিমিট থাকে। এভাবে মারলে মরে যাবে। এখানে হচ্ছে কি? খালাজানকে এভাবে বেঁধে রেখেছো কেন?”
আমিরুন্নেসা আহিরকে দেখতে পেয়ে অসহায়ের মতো কেঁদে দিল। মুখ বাধা থাকায় শব্দ করতে পারল না। অনবরত মাথা নেড়ে আওয়াজ করছে। তার আশেপাশে ইলেকট্রিক ওয়ার ছড়িয়ে ছিটিয়ে। যা আমিরুনন্নেসার মাথার সাথে লাগানো। আহির অবাক হয়ে শাইয়ানের দিকে তাকালো। শাইয়ান তার দিকে রক্ত লাল চোখে তাকিয়ে। আহির ভয় পেয়ে ছেড়ে দিলো শাইয়ানকে। হাসার চেষ্টা করে বলল –
” মরে যাবে ভাই।”
” তো?”
আহির শুকনো ঢোক গিলে ভীতু গলায় বলল –
” তোমার আপন খালা লাগে ভাই। সামান্য দোয়া তো করো।”
” তোমাকে এখানে দোয়া দেখাতে আনিনি। যা হচ্ছে চুপচাপ দেখো।”
শাইয়ান এগিয়ে গিয়ে আমিরুন্নেসার মুখ খুলে দিলো। খুব ধীর, শান্ত গলায় বলল –
” কেমন আছেন খালাজান?”
আমিরুন্নেসা শব্দ করে কেঁদে ফেলল।
” আমাকে ছেড়ে দাও শাইয়ান। আমার ভুল হয়েছে। আমি আর কখনো করবো না।”
শাইয়ান তখনো একই ভাবে শান্ত স্থির হয়ে প্রশ্ন করলো –
” কি করেছেন আপনি খালাজান? ক্ষমা চাইছেন কেন?”
উত্তর না দিয়ে আমিরুন্নেসা কেঁদে চলছে। এবার রাগে ক্ষোভে শাইয়ান চেঁচিয়ে উঠলো। আমিরুন্নেসার দুবাহু ধরে ঝাকিয়ে বলল –
” উত্তর দিচ্ছেন না কেন? কি করেছেন আপনি? বলুন.. বলছেন না কেন?
ভয়ে আতঙ্কে আমিরুন্নেসা কাদতে কাদতে বলল –
” লোকগুলোকে আমরাই টাকা দিয়ে এনেছিলাম ওই মেয়েটার নামে বাজে কথা বলতে।”
” ওই মেয়েটা কি হ্যাঁ? ওই মেয়েটা কি? সে শাইয়ান রেহমান আনসারীর বউ। তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলুন। আপনি জানেন সে আমার কাছে কত মূল্যবান? তার একফোঁটা চোখের পানিও আমার নিশ্বাস আটকে দেয়। আর সেই মানুষটাকে আপনারা ওভাবে অপমান করলেন? বাজে কথা বলে কাদালেন? কার কলিজায় হাত দিচ্ছেন ভেবে দেখা উচিৎ ছিল না খালাজান? এতো সহজে আপনাকে ছাড়ি কিভাবে? আমার বউকে দেয়া কষ্টের শোধ তুলতে হবে তো। আপনাদের কি শান্তি দেয়া যায় বলুন তো? উমমমম( ভাবার ভঙ্গি করে বলল) বিশ্বাস করুন আপনাদের নেয়া প্রতিটা নিশ্বাসও আমার সহ্য হচ্ছে না। মন চাচ্ছে মেরে দিই। কিন্তু আম্মা বলেছে জানে না মারতে। তাই আপনার জন্য স্পেশাল ট্রিটমেন্ট রেডি করিয়েছি।”
বলে দক্ষ হাতে TENS machine এর সুইচ অন করে পাওয়ার বাড়িয়ে টাইম সেট করে দিল। সাথে সাথে আমিরুন্নেসার পুরো শরীর ঝাকিয়ে উঠল। এভাবে কয়েকবার করার পর আমিরুন্নেসা প্রায় নিস্তেজ হয়ে পরলো। পাশে দাঁড়ানো লোকদের মাঝে একজনকে বলল –
” ওনাকে হসপিটালে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করো। আর একে ( কায়সারকে উদ্দেশ্য করে) ক্যাম্পে নিয়ে স্পেশাল থেরাপি দাও।”
বলে ওখানে না দাঁড়িয়ে সোজা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। আহির এতক্ষন বিস্মিত নয়নে শাইয়ানের হিংস্রতা দেখছিল। শাইয়ান এর আগে এমন অনেক কাজ করেছে যার চাক্ষুষ প্রমাণ সে নিজে। কিন্তু এবারেরটা ভয়াবহ ছিল। নিজের খালাকে যে এভাবে শাস্তি দিতে পারে সে সব পারে। নিচে নেমে দেখতে পেল এবার ড্রাইভিং সিটে শাইয়ান বসে। আহির কথা না বাড়িয়ে অন্য পাশে বসে পরলো। সে এখনো শকে আছে।
” কিছু বলতে চাও আহির।”
ড্রাইভিং করতে করতে আহিরকে দেখছিল সে। তার এই রূপ হজম করতে পারেনি হয়তো। অন্য সময় কথা বলে মাথা খেলেও আজ চুপচাপ শান্ত। শাইয়ানের প্রশ্নে আহিরের ধ্যান ভাঙ্গে।
” খালাকে এভাবে অত্যাচার করলে আর কায়সারকে শুধু মেরে ছেড়ে দিলে কেন? আর যে লোকগুলো তখন ভাবিকে নিয়ে বাজে কথা বলছিল তারা কোথায়? তুমি এদের এখানে কখন আনলে?”
” বাহ্, অনেক প্রশ্ন তোমার। (একটু থেমে বলল) বিয়ের পরপরই আমার লোকেরা ওদের এখানে এনেছিল। আর তোমার কি মনে হয় আমার বউয়ের দিকে কেউ বাজে দৃষ্টিতে তাকাবে আমি তাকে ছেড়ে দিবো? খালাকে ছাড়া ওদের প্রত্যেককে এখানে আনার পর থেকে ওয়াটার থেরাপি দেয়া হয়েছে। জানো তো আহির। আমাদের ফোর্সে সব থেকে ইন্টারেস্টিং পানিশমেন্ট হলো ওয়াটার থেরাপি। মাথাটা ধরে একবার পানিতে চেপে ধরো আবার কিছুক্ষন পর তুলে নাও। এই মনে হবে দম ফুরিয়ে এলো বুঝি পর মুহূর্তে নিশ্বাস নিতে পারবে। দারুন না( খুব উৎসাহের সাথে বলল)? বাকিদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে কিন্তু কায়সারকে ক্যাম্পে নিয়ে আরো কিছু দিন আদর আপ্যায়ন করা হবে।”
আহির অবাক নয়নে শাইয়ানকে দেখলো। ঝুমকে শাইয়ান এতো ভালবাসে?
” কবে থেকে এতো ভালবাসতে শিখলে ভাই?”
” জানি না। শুধু জানি ওনার চোখে পানি দেখলে অস্থির লাগে। দুনিয়া ধ্বংস করে দিতে মন চায়। উনি খুব ভালো আহির। পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা উনি শিখেনি। দুনিয়ার সব সুখ উনি ডিজার্ভ করে। আমার সাধ্যে যতটা সম্ভব আমি ওনাকে ভালো রাখার চেষ্টা করবো।”
আহির দৃষ্টি সরিয়ে বাইরে দিলো। উদাস কন্ঠে বলল –
” এতো ভালোবাসা ভালো না ভাই। দিন শেষে যে যত বেশি ভালবাসবে সে তত কষ্ট পাবে।”
শাইয়ান তাকালো তার দিকে। কি একটা ভেবে বলল –
Remedy part 10
” আর ইয়ু ওলরাইট আহির।”
” হুম।”
” তাকে এখনো ভুলতে পারোনি?”
“যা ভোলা যায় তাকে ভালবাসা বলে না শাইয়ান।”
শাইয়ান কথা বাড়ায় না। কিছু কষ্ট একান্ত নিজের হয় তা করো সাথে ভাগ করা যায় না।
