Tell me who I am 2 part 10
আয়সা ইসলাম মনি
বোন হয়ে ভাইয়ের নামে এমন নিকৃষ্ট অপবাদ—ভাবতেই ইলিজার শরীর ঘৃণায় রি-রি করে উঠল। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলো। কী উত্তর দেবে সে? এমন বিকৃত অভিযোগে শুধু একজন পুরুষ নয়, পুরো মানবিক বিবেককেই যেন কলঙ্কিত করা হয়েছে। ক্ষোভে পুরো মেয়ে জাতির মুখেই থুতু মারতে মন চাচ্ছিল ইলিজার।
লজ্জাহরণ সমাজের কাছে সবচেয়ে ভয়াবহ কলঙ্কের নাম। অথচ এটাকেই ব্যবহার করে জেনে-বুঝে কোনো নিরপরাধ ছেলেকে ফাঁসিয়ে দেওয়া কি তার চেয়েও জঘন্য অপরাধ নয়?
ইলিজা মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে রইল। চোখের কোণে জমে ওঠা জল কাব্যের সামনে পড়তে দিল না। সামনে বয়ে চলা নদীর স্বচ্ছ জলের দিকে স্থির তাকিয়ে রইল। কয়েক মিনিটের জন্য কেউই মুখ খুলল না। তবে নিঃশব্দতার মধ্যেও অনুভব করা যাচ্ছিল, এই মুহূর্তে দু’জনের মন একে অপরকে জর্জরিত করছে।
প্রায় আধঘণ্টা পর কাব্য ধীরস্বরে আবার কথা শুরু করল, “যেদিন ঘরের দরজা পেরিয়ে বাইরে পা রাখলাম, সেদিন নিজেকে বলেছিলাম, এই বাড়ি, এই মানুষগুলোর সাথে আমার এ জনমে দেখা না হোক। তবু যে বোনটাকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবেসেছিলাম, তার প্রতি মায়াটা কেন জানি সম্পূর্ণ কাটাতে পারিনি। আমি চলে এলেও ওর খবর নিয়েছি আড়ালে থেকে। যাক সে কথা।
সেদিন রাস্তায় নামার পর নতুন করে দুনিয়াকে চিনতে শিখলাম। ঘরের কাজ যতটা কঠিন মনে হতো, বাইরের লড়াই তার চেয়েও নির্মম। তবু মনোবল ভাঙিনি। কিছু একটা করে চলতে তো পারব!
প্রথম দুটো দিন একফোঁটা খাবার পর্যন্ত মুখে তুলতে পারিনি। ভিক্ষার কথা ভাবতেই বুকের ভেতর কোথাও যেন কাঁটার মতো বিঁধে যেত, আত্মসম্মানের অবশিষ্ট স্নায়ুটুকু তখনো প্রতিবাদ করছিল। কিন্তু পেটের ক্ষুধা বড়ো নিষ্ঠুর; সে কোনো নীতি বোঝে না, কোনো বংশমর্যাদাও মানে না। তৃতীয় দিনে অবশেষে আমাকেও রাস্তার ধারে বসতে হলো।
কিন্তু ভালো পোশাক দেখে পয়সা দিত না কেউ। অথচ ভিতরে ভিতরে কেন জানি আমার মনে হতো, এভাবে বসে থাকলে শেখ ইমতিয়াজের নাম, তার গড়া সম্মান, আমার রক্তে বয়ে চলা পরিচয়—সবকিছুই যে মাটিতে মিশে যাবে। তাই রাস্তায় পড়ে থাকা একটা পুরোনো মাস্ক তুলে মুখে লাগালাম।”
এবার কাব্য বিষণ্ন হাসিতে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “অর্থাৎ শেষমেষ শিল্পপতি শেখ ইমতিয়াজ বায়জিদের একমাত্র ছেলে শেখ আরভিন কাব্য ক্ষুধার দায়ে হাত পাতল। শুনতে নিশ্চয়ই খুব বিশ্রী লাগছে, তাই না? জানি না, আপনি ঠিক কী অনুভব করছেন। কিন্তু এই কথাগুলো বলতে গিয়ে আমার ভীষণ লজ্জা লাগছে, খুব বেশিই লজ্জা লাগছে। এখন আপনি যদি ভাবেন, আমি ভিক্ষুকদের উপহাস করছি, এটা ভুল। কিন্তু আমি ভিক্ষা করাটাকে কখনোই সমর্থন করি না। আমরা মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। আমরা হাত পাতব আল্লাহর কাছে, কেন আমার মতোই মাটি দিয়ে বানানো আরেকটা মানুষের কাছে হাত পাতব? তাই আমার আত্মসম্মানে খুব আঘাত লেগেছিল সেদিন।”
কথা থামিয়ে সে ঢোক গিলে নিল। গভীর নিশ্বাস টেনে জিভ দিয়ে অধর ভিজিয়ে নিল। গলা শুকিয়ে কাঠ। একটু জল হলে হয়ত স্বস্তি পেত। কিন্তু ইলিজা কিংবা কাব্য, কারোরই এখন পানির কথা মনে পড়ল না। দু’জনেই ডুবে আছে এক ভয়ংকর সত্যের অতলে; যে সত্য সমাজে খুব কমই দৃশ্যমান, কারণ আত্মসম্মানের ভয়ে অধিকাংশ মানুষই নিজের ক্ষত ঢেকে রাখে।
কাব্য ভাঙা গলায় আবার কথা শুরু করল, “এতে কোনোভাবে দিন-রাতের খাবার জুটলেও পড়াশোনার খরচ তো আর এভাবে চলার নয়।
একদিন আমার পাশেই এক বাদাম বিক্রেতা বসেছিলেন। বয়সের ভারে ক্লান্ত তার শরীর, হাত কাঁপছিল। সাহস সঞ্চয় করে বললাম, ‘কাকু, আমি বিক্রি করে দিই, আপনি একটু জিরিয়ে নিন।’
মানুষটা অবাক হলেও খুশি হলেন। সেদিন পুরো বাদাম আমি বিক্রি করলাম। বিদায়ের সময় তিনি হাসিমুখে কিছু টাকা হাতে ধরিয়ে দিলেন।
পরদিন আবার একই জায়গায় তার দেখা পেলাম। এভাবে টানা সাতদিন কাজ করার পর তিনি আমাকে নিজের কাজে রেখে দিলেন।
শুরুর দিকে কয়েকজন ভবঘুরে ছেলের পাশে ফুটপাতে রাত কাটিয়েছি। প্রথম রাতে লজ্জায় শুতে পারিনি, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাত পার করেছি। পরে শরীর আর সইতে পারেনি। কিন্তু যখন কাকু আমাকে কাজে নিলেন, তখন তার বাসার ঠান্ডা মেঝেতে এক টুকরো আশ্রয় জুটেছিল আমার। খুব খুশি হয়েছিলাম ওইদিন।
এভাবে ছয়টা মাস কেটে গেল। পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছিলাম সাথে। মাঝখানে একটা বাচ্চাকে টিউশনি পড়ানো শুরু করেছিলাম।
কিন্তু একটা কথা না বললেই নয়, ‘যাহার নিয়তি দুঃখে বোনা, তাহার আনন্দও বিষের মতোই তীব্র হয়।’ আমার ক্ষেত্রেও তাই ঘটল।
সেদিন কাকু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তাই পুরো দিনের বাদাম বিক্রির দায়িত্ব আমার কাঁধে পড়ল। বিক্রি করলামও। আশ্চর্যজনকভাবে সেদিন বিক্রি ভালো হয়েছিল। সন্ধ্যার দিকে টাকা গুনতে গুনতে ফিরছিলাম৷ মনের ভেতর প্রথমবারের মতো একটু স্বস্তি পাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই হুট করে কেউ একজন আমার হাত থেকে টাকাগুলো ছিনিয়ে নিয়ে দৌড় দিল।
ওখানে ছিল মোট চব্বিশশো টাকা। যেখানে মাস শেষে আমার পারিশ্রমিকই মিলত তেরোশো। মাথার ভেতর হিসাবটা যেন বিস্ফোরণ ঘটাল। আমি আর ভাবলাম না, ছুটলাম ওর পেছনে। রাগে যেমন গা জ্বলছিল, তেমন চোখও টলমল করছিল।
ছুটে গিয়ে যেখানে গিয়ে থামলাম, সেখানে টাকা চুরি করা ছেলেটা একা ছিল না। ওদের দলের আরও কয়েকজন ছিল—ড্যান্ডি খেয়ে নেশায় বুঁদ সবগুলো। হাত-পা জুড়ে ব্লেডের কাটাছেঁড়া দাগ, চোখে অস্বাভাবিক উন্মত্ততা দেখলাম। ওসব দেখে আমার তখন ভয় পাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তার বদলে আমার মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুরতে থাকল, টাকাটা দরকার আমার, খুব দরকার।
তাই আমি টাকা চাইতেই ওরা হো হো করে হেসে উঠল। একজন স্পষ্ট করে বলল, চলে যেতে, টাকা তারা দেবে না। আমি অনেকবার অনুরোধ করলাম, ‘ভাই, টাকাটা দিয়ে দেন, আজ দিয়ে দেন। অন্য কখনো সুযোগ মিললে আমি আপনাদের নিজে টাকা দিব। কিন্তু আজ টাকাটা দিয়ে দেন।’
কিন্তু ওরা আমার অনুরোধে আরো উপহাসের সাথে উচ্চস্বরে হাসল। উপায় না পেয়ে অসহায় রাগে ফুঁসে উঠে আমি ওদের একজনকে ঘুসি মারলাম। এরপর আর কিছু বোঝার সুযোগ পাইনি। সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রামধোলাই খেয়ে পড়ে গেলাম রাস্তায়।
শরীরটা তখন ক্ষত-বিক্ষত। কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম জানি না, ঘণ্টাখানেক হবে হয়ত। পরে হুট করেই একজন লোক এসে চোখে-মুখে পানি ঢাললেন। জ্ঞান ফিরতেই আমাকে পানি দিলেন, রুটি দিলেন। খেয়ে একটু শক্তি ফিরলে আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় থাকি—আরো অনেক প্রশ্ন করলেন। কিন্তু আমার গলা দিয়ে তখন এসব বেরোল না।
শুকনো চোখে শুধু বলেছিলাম, ‘আংকেল, ওরা আমার টাকা নিয়ে গেছে। টাকাটা আমার খুব দরকার, আংকেল।’
কীভাবে নিয়েছে, কী ঘটেছে, সব খুলে বললাম।
লোকটা চুপচাপ শুনলেন। তারপর অবাক করে দিয়ে আমার হাতে পুরো চব্বিশশো টাকা গুঁজে দিলেন। বললেন, ‘আগে হাসপাতালে যেতে হবে, বাবা।’
কিন্তু আমি টাকাগুলো নিলাম না। ফেরত দিলাম। ওই যে… আত্মসম্মানবোধটা আমার বরাবরই প্রখর ছিল। উনি যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সেটাই তখন আমার কাছে অমূল্য মনে হয়েছিল।
আমি বললাম, ‘আমি একদম ঠিক আছি, আংকেল। হাসপাতালে যাব না।’
উনি বললেন, অন্তত বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। কিন্তু যেখানে আমার নিজের বলার মতো কোনো ‘বাড়ি’ই নেই, সেখানে আর কী বলব। তাছাড়া ওই এলাকার অলিগলি আমার চেনা ছিল। তাই হালকা একটা হাসি দিয়ে শুধু ধন্যবাদ জানিয়ে চলে এসেছিলাম।
আর সেই লোকটাই ছিলেন মিস ইলির বাবা।”
এতক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে সবটা শুনছিল ইলিজা। শেষ কথাটা কানে যেতেই সে চমকে উঠে কাব্যের দিকে তাকাল। চোখ দুটো বিস্ফোরিত, কপাল কুঁচকে গেল মুহূর্তেই।
হতভম্ব কণ্ঠে বলল, “আমার বাবা? সিরিয়াললি? কিন্তু… কিন্তু মানে… এটা কীভাবে সম্ভব?”
কাব্য শান্ত কণ্ঠেই বলল, “এত অবাক হচ্ছেন কেন? সেদিন আংকেল যদি ওভাবে পাশে না দাঁড়াতেন, হয়ত রাস্তায় পড়ে থাকা কাব্যের শীর্ণ শরীরটা কুকুর-বিড়ালের খাওয়ার জিনিসে পরিণত হতো।
আর আপনাদের বাসায় যেদিন গিয়েছিলাম, সেই দিনের কথাটাও বলি। আংকেলকে সেদিন বাজারে দেখেই চিনে ফেলেছিলাম। দেখে প্রচণ্ড খুশি হইছিলাম বইকি। উনি রিকশা পাচ্ছিলেন না বলে একা একা হেঁটে যাচ্ছিলেন।
সেদিন রাতে আমার চেহারা ছিল র*ক্তাক্ত, মুখটা ফুলে বিকৃত হয়ে গিয়েছিল, তাছাড়া বয়সেও তখন ছোট ছিলাম। তাই তার চেনার কথা না। আমিও পরিচয় দিইনি। দিলে হয়ত মনে করতেন, উপকার করেছিলেন বলেই বুঝি শোধ তুললাম। আর সেটা তো উচিত না, বলুন?”
সব কাহিনি অদ্ভুতভাবে এক সুতোয় গাঁথা হতে দেখে ইলিজার ঠোঁটের কোণে অনিচ্ছাকৃত মৃদু হাসি ফুটে উঠল। কাব্যের জীবনের ভয়াবহতার মাঝেও এই মিলগুলো যেন কোথাও গিয়ে আশ্বাসের মতো কাজ করছিল।
ভাগ্যিস কাব্য সেদিন বাসায় এসেছিল। পরিচয়টা হয়েছিল। এখন সে যদি বাসায় কাব্যের কথা তোলেও, বাবা-মা হয়ত আর তেমন আপত্তি করবেন না। এই ভেবে ইলিজা নিঃশব্দে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
একই সঙ্গে সে বুঝে গেল, কেন কাব্য মানুষকে এত সাহায্য করে।
কাব্য নিজের স্বাভাবিক গাম্ভীর্য ধরে রেখেই হালকা ঢোক গিলে আবার বলতে শুরু করল, “এরপর ওই রাতেই আমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাসায় ফিরি। বাদাম বিক্রেতা কাকু আমাকে ভালোবাসতেন, বিশ্বাস করতেন; আমারও বিশ্বাস ছিল, তিনি বোঝার চেষ্টা করবেন।
কিন্তু একটা কথা জানেন তো, শিক্ষিত মানুষের চিন্তার ভাণ্ডারে অন্তত একফোঁটা হলেও জ্ঞানের আলো বেশি জ্বলে থাকে। তাই সেদিন তাকে সব খুলে বলেও কোনো লাভ হয়নি। উনি ধরে নিলেন, আমি মারামারি করে টাকা লুকিয়েছি, তারপর গল্প বানাচ্ছি।
কথায় কথায় আমাকে চোর বললেন। বললেন, ফকিন্নির বাচ্চা, ভিখারি, তাই বেশি টাকা দেখে জিভ সামলাতে পারিনি। এতক্ষণ সব অপমান গিলে ফেললেও ওই কথাটা আর গিলতে পারিনি। আমি মুখ খুলে বলিনি আমি কার ছেলে। অনেক কিছু বলার ইচ্ছে ছিল, তবু বলিনি। যতই হোক, উনি আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।
আমার জমানো কিছু টাকা ছিল। ঈদে আমার জন্য, কাকুর জন্য, আর তার ছোট ছেলের জন্য কিছু কিনব ভেবেছিলাম। মোটামুটি দুই হাজার টাকার মতো। সেগুলো ওনার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে শুধু বলেছিলাম, ‘আমি ভিখারির ছেলে না। আমার মা উকিল ছিলেন।’
এই বলেই বেরিয়ে এলাম।”
সে এক মুহূর্ত থামল। তারপর ধীরে যোগ করল, “তাতে আমার খুব একটা আফসোস হয়নি। মাঝে যে বাচ্চাটাকে টিউশনি পড়াতাম, ওটা দিয়েই চলত। কিন্তু চিন্তা তখন থাকব কোথায়!
ওই যে বাচ্চাকে পড়াতাম, সেখানে আবার ওর বড়ো বোন ছিল, ও নাইন ক্লাসে পড়ত। আমি তখন ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে। প্রথমদিকে একদিন ওর মায়ের সামনেই মেয়েটাকে একটা চ্যাপ্টার বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। তখন আন্টি জোর করলেন, যেন ওকেও পড়াই।
কিন্তু আমি রাজি হচ্ছিলাম না। নিজের পড়াশোনার চাপ ছিল। সাইন্সে পড়তাম যেহেতু, আপনি তো জানেনই, কতটা চাপ থাকে।
আবার মেয়ে ব্যাপারটাতেও আমার অ্যালার্জি ছিল। একটু আগের ঘটনায় কারণটা নিশ্চয়ই বুঝেছেন। কিন্তু বাদাম বিক্রির পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় টাকার দরকার ছিল, থাকার জায়গারও। সেই বাস্তবতার চাপেই শেষমেষ মেয়েটাকে পড়াতে রাজি হলাম।
কিন্তু সমস্যা ছিল অন্যখানে। ঢাকায় ভাড়া দিয়ে থাকা আমার সাধ্যের বাইরে, এ কথা আমি জানতাম। তাই প্রথম দিনই সাহস সঞ্চয় করে আন্টিকে নিজের অবস্থার কথা খুলে বলি। ওনারা বড়লোক্স মানুষ। আংকেল বললেন, তাদের গেস্ট রুম সবসময় খালি পরে থাকে, আমি চাইলে ওখানেই থাকতে পারি।
কিন্তু আন্টি সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি তুললেন। বললেন, গেস্ট রুমে থাকলে নোভাকে পড়ানোর টাকা দেওয়া হবে না।
এখন ঢাকার বাসাভাড়ার যা অবস্থা, তার উপর ব্যাচেলরদের জন্য বাসা পাওয়া তো প্রায় অসম্ভব। তাই হিসেব কষে রাজি হয়ে গেলাম। ভাবলাম, শুধু ছোটোটাকে পড়িয়েই তো দিব্যি চলে যাবে।
এরপর একটা বছর বেশ শান্তিতেই কেটে গেল। তখন আমি ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। কী জানি, আমার চেহারায় হয়ত তখন খানিকটা মায়া লেগে ছিল। ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পর সে মায়া ধীরে ধীরে পুরুষত্বে রূপ নিল। ক্লাসের গুটিকয়েক মেয়ের চোখে ভালো লাগার আভাস টের পেতাম। কিন্তু কেউ খুব একটা এগোয়নি। মাঝেমধ্যে কেউ মুখ খুললেও, বাকিদের মুখে বাবা-মা নেই শুনে আবার সরে গেছে।
আমি অবশ্য এতে খুশিই ছিলাম। মেয়েদের চক্কর বড়ো সর্বনাশা। এবার অন্তত পড়াশোনায় মন দেওয়ার সুযোগ মিলবে।
কিন্তু আরেক ঝামেলা ছিল। নোভা। ও মাঝেমধ্যে আমার দিকে অকারণে তাকিয়ে থাকত, কখনো কখনো উলটো-পালটা কথাও বলত। বয়ঃসন্ধির এসব আবেগ আমি চিনতাম। তাই পড়ানোর সময় ছাড়া ওর কাছ থেকে সচেতনভাবেই দূরে থাকতাম। কিন্তু—”
এটুকু বলেই কাব্য থেমে ইলিজার দিকে তাকাল।
ইলিজার ফরসা মুখটা তখন রাগে দপদপ করছে। কিছুক্ষণ আগেও যে চোখে জল জমে ছিল, সেই চোখেই এখন হিংসা দাউ দাউ করে জ্বলছে। কাব্যকে অন্য মেয়েদের চোখেও ভালো লেগেছে! এই ভাবনাটুকুতেই তার ভেতরটা ক্ষোভে ফেটে পড়ছে।
ইলিজার কুঁচকে যাওয়া ভ্রূ আর নিঃশব্দে ফুঁসতে থাকা আগুনের কারণ কাব্য বুঝে ফেলল অনায়াসেই। কাব্যের মুখ ভার থাকলেও ঠোঁটের কোণে অচেতনেই টেনে উঠল একরাশ দুষ্টু হাসি।
এক ভ্রূ তুলে, ইচ্ছে করেই খানিক রোমান্টিক ভঙ্গিতে বলল, “মিস ইলি…”
ইলিজা কোনো জবাব দিল না। সামনের বিস্তৃত মাঠের পানে তাকিয়ে বসে আছে। পাশের ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে রাগ সামলানোর মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।
কাব্য এবার হালকা ভেজা ঠোঁটে স্বর নামিয়ে বলল, “কী হয়েছে, করলানী?”
ইলিজা হঠাৎ তীক্ষ্ণ চোখে তার দিকে ফিরে প্রায় চিৎকার করল, “কতবার বলেছি আপনাকে, আমাকে এই নামে ডাকবেন না!”
এত তীব্র রাগের বিস্ফোরণেও কাব্য বিচলিত হলো না। বরং মুখটাকে আরও কঠিন করে সামনে তাকাল। তারপর ইচ্ছে করেই তার পাশে ঘাসের উপর রাখা ইলিজার বাঁ হাতটা আলতোভাবে ধরল।
ইলিজা মুহূর্তেই ছটফট করতে লাগল। হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল প্রবলভাবে। কিন্তু কাব্য অবিচল কণ্ঠে আওড়ালো, “আপনারা মেয়েরা ভালোবেসেও কত চমৎকারভাবে সব অনুভূতি বুকে লুকিয়ে রাখতে পারেন—এ এক আশ্চর্য শক্তি। কারণ প্রকাশ পেলেই আবেগের মর্যাদা সস্তা হয়ে যায়। আর আমার বিশ্বাস, ভালোবাসা তখনই টিকে থাকে, যখন তা শব্দের বাড়াবাড়ি বা নাটকীয়তার ভার ছাড়াই, নীরবে হৃদয়ের গভীরে জ্বলতে থাকে।”
ইলিজা চোখ-মুখ কুঁচকে কড়াভাবে শুধালো, “রাখুন আপনার ফিলোসোফির বুলি। সরুন তো!”
তার ক্রোধ দেখে কাব্যের মনে পরিতৃপ্তি কাজ করল, আবার সেই সঙ্গে মুখের দীপ্তি খানিকটা নিভেও গেল। দীর্ঘ এক নিশ্বাস ছাড়ল সে। তারপর ধীরস্বরে বলল, “একটা অনুরোধ রাখবেন?”
ইলিজা বিরক্ত ভরে হাত ছাড়াতে ছাড়াতে বলল, “কী? আর আপনি হাত ছাড়ুন।”
কাব্য এবার গভীর, পুরুষালি কণ্ঠে শুধালো, “তোমার হাতটা ছাড়িয়ে নিও না, চঞ্চলা।”
এই প্রথম কাব্যের কণ্ঠে ‘তোমার’ শব্দটা শুনে ইলিজা স্তব্ধ হয়ে গেল। হাতের ছটফটানিও থেমে গেল অজান্তেই। কেবল নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল কাব্যের দিকে, যে কিনা এখন ইলিজার নরম হাতটাকে আরও যত্নে, আরও দৃঢ়তায় দু’হাতে ধরে রেখেছে।
‘চঞ্চলা’ নামটা বোধ হয় তার এই অস্থিরতার কারণেই কাব্যের মুখ থেকে হঠাৎ করে বেরিয়ে এসেছে। এতটা আকুতিভরা স্বরে কাব্য কখনো কথা বলেনি। হয়ত এই মুহূর্তে তার ইলিজার ভরসাটুকু দরকার। কারণ এখন সে এমন কিছুই বলতে চলেছে।
ইলিজা চোখ নামিয়ে নিঃশব্দে বসে রইল।
কাব্য এবার বলতে শুরু করল, “সুন্দরী মেয়েদের প্রতি আমার বরাবরই এক ধরনের অনীহা কাজ করত। তার পেছনে দুটো কারণ—এক শেখ ইফা বায়জিদ, আরেক নোভা চৌধুরি। নোভাও অসম্ভব সুন্দরী ছিল। কিন্তু আমি কখনো তার দিকে চোখ তুলেও তাকাইনি। কীভাবে জানি সে সুন্দরী, সেটা আস্তে আস্তে বলি।
এদিকে ধীরে ধীরে নোভার আমার প্রতি আকর্ষণ বাড়তে থাকল। একদিন সে সরাসরি প্রস্তাব দিয়ে বসল। এমন কিছু যে অসম্ভব, তা আমার অজানা ছিল, সেটা বলব না। পড়াতে পড়াতেই আমি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেছিলাম, ‘আমরা দু’জনেই এখন ছোট। বড়ো হও আগে।’
কিন্তু তাতেই ওর জেদ চেপে বসল। সেদিন কিছু না বললেও, তার পর থেকে ও একের পর এক উদ্ভট কাণ্ড ঘটাতে লাগল। ইচ্ছা করে আমার ঘরে চা দিয়ে যাওয়া, আমার চিরুনি দিয়ে নিজের চুল আঁচড়ানো, এমন আমার অজান্তে আরো কী কী করেছে, সবকিছু আমি জানিও না।
একদিনের কথা। সেদিন বাসায় ও ছাড়া আর কেউ নেই। আমি কলেজ থেকে ফিরেছি। গোসল সেরে সবে ঘরে ঢুকেছি। দেখি, শাড়ি পরে আমার ঘরেই বসে আছে সে। আমার বইগুলো হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করছে।
প্রথমে ভ্রূ কুঁচকে উঠেছিল আমার। তবু নিজেকে সামলে অন্য দিকে ফিরে শান্ত গলায় বললাম, ‘আমার অনুমতি ছাড়া আমার ঘরে প্রবেশ আমার পছন্দ না। এখান থেকে বের হও।’
কিন্তু ও বের হলো না। উলটো আমার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে নিজের রূপের প্রশংসা করতে লাগল। আমি তবু তাকালাম না ওর দিকে। স্পষ্ট করে বললাম, ‘এক্ষুনি বের না হলে এবার আন্টিকে ডেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করতে বাধ্য হবো।’
কারণ আমি জানতাম, আংকেল রাতে ছাড়া বাসায় ফেরেন না। নোভা তখন ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, ‘ডাকো আম্মুকে। দেখো আসে কিনা।’
ওর কনফিডেন্স দেখে একটু ভড়কে গেলেও, এরপর আমি অনেকক্ষণ ডাকলাম আন্টিকে। কিন্তু কেউ এলো না। তখন নোভা হেসে বলল, ‘দেখো কাব্য, তুমি সবকিছুতেই এত ভয় পাও কেন আমি বুঝতে পারি না। একটাবার আমার দিকে তাকালেও তো পারো। কোন দিক থেকে কম আমি? বরং সব দিক থেকে বেশিই। স্কুলে হাজারো সুন্দর ছেলের ভিড়েও আমার পছন্দ এই শ্যামবর্ণ, সুদর্শন কাব্যকেই। আর কেন পছন্দ যদি জানতে চাও, তবে বলব, কাব্য মানুষটাই এমন, যাকে ভালো না বেসে থাকা যায় না; বরং না ভালোবাসলে নিজেকে অপরাধী মনে হবে।’
আমি এবার আর স্বর নরম রাখলাম না। কঠোরভাবে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আন্টি কোথায়?’
‘মা নোহানকে নিয়ে বাইরে গেছে। আমিই জোর করে পাঠিয়েছি।’
আমি চমকে উঠলাম। বললাম, ‘বাসায় একটা ছেলে থাকা সত্ত্বেও আন্টি এটা কীভাবে করলেন? উনি তো কখনো এমনটা করেননি।’
ও ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল, ‘কাল তুমি যখন পাপাকে বলেছিলে আজ কলেজের পর তোমার কোচিং নেই—আমি শুনেছিলাম। মা তো আর জানে না, তাই গেছে।’
আমি তখন দু’হাত বুকে বেঁধে মুখ আরও কঠিন করে বললাম, ‘তুমি কেমন নির্লজ্জ মেয়ে! একটা ছেলের ঘরে এভাবে ঢুকেছ। আমি চাইলে তো উলটো-পালটা সুযোগও নিতে পারি।’
মেয়েটা নির্লজ্জভাবেই বলল, ‘আমি তো চাই সুযোগ নাও।’
ওর কথা শুনে আমি যেন মুহূর্তের মধ্যে আকাশ থেকে মাটিতে আছড়ে পড়লাম। রাগে দাঁত কিড়মিড় করে উঠল। চেঁচিয়ে বললাম, ‘নিজের বয়স দেখেছ? অসভ্য, ইতর, বেয়াদব মেয়ে! এখান থেকে বের হও। না হলে আমি সত্যিই তোমার গায়ে হাত তুলতে বাধ্য হবো।’
কিন্তু ও হঠাৎ করেই আমাকে জড়িয়ে ধরল। কাঁপা কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না। সত্যি বলছি, বাঁচব না। তোমার কথা, তোমার অঙ্গভঙ্গি—সবকিছু আমার ভালো লাগে। সব, সবকিছু। আমি মা-বাবাকে বুঝাব, তারা ঠিকই মেনে নিবেন। দয়া করে আমাকে ভালোবাসো, কাব্য। তোমার জন্য নাহলে মরে যাব আমি!’
এইসব কথা বলতে বলতে সে আরও আঁকড়ে ধরছিল। আমার শরীরে তখন রাগে আগুন ধরে গেছে। মুহূর্তের মাথায় ওকে এমন জোরে ধাক্কা দিলাম যে ও পিছনে ছিটকে গিয়ে ছোট কাচের টেবিলটার ওপর পড়ল। ফুলদানি সহ টেবিলটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ও মুখ থুবড়ে পড়ায় ওর গালের এক পাশ কেটে গেল।
আমি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ভাবিনি ধাক্কাটা এতটা জোরে হয়ে যাবে। ছুটে গিয়ে ওকে ধরতে চাইলাম। তখন ও কাঁদতে কাঁদতে আমার দিকে তাকাল।
ওই প্রথম আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, এত অপরূপা হয়েও মেয়েটা কেন কাব্যকে চাইল? কোনো উত্তর পেলাম না। ওর বয়সের দোষ দিলাম। কিন্তু জানতাম, এখন যদি নরম হই, ও আরও এমন কাজ করবে।
তাই গলা শক্ত করে বললাম, ‘তোমার বাবা-মাকে আমি সব জানাব। এক্ষুনি বের হও রুম থেকে।’
ও এবার উলটো চাল চালল। হঠাৎ করেই চেঁচিয়ে উঠল। আর ওর সেই বাজে চিৎকার, আর্তনাদের ভঙ্গিটা ঠিক আগেরবারের ইফার মতো ছিল। মুহূর্তেই আমার মাথার ভেতর সতর্কতার ঘণ্টা বেজে উঠল। বুঝে গেলাম, এবারও আমি ফেঁসে যাব।
আমি ওকে বোঝানোর জন্য ছুটে গিয়ে ওর মুখ চেপে ধরলাম। কিন্তু ততক্ষণে সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমার ঘরের জানালা খোলা ছিল। পাশের বাসার লোকজন এসে দেখল আমি একটা মেয়ের মুখ চেপে ধরেছি।
এরপর আরকি! দরজা ভেঙে লোক ঢুকল। কেউ পেছন থেকে আমাকে জাপটে ধরল, কেউ হাত মুচড়ে ধরল। আমি হাঁকাচ্ছি, ‘আমি কিছু করিনি, বিশ্বাস করুন। আমি কিছুই করিনি।’
কিন্তু আমার কথার আগেই নোভা হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। কান্নার ফাঁকে ফাঁকে সবাইকে বলল, আমি জোরজবরদস্তি করেছি।
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। মাথার ভেতর সব এলোমেলো। কী করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। রাগে, অপমানে, অসহায়তায় জর্জরিত হয়ে আমি সবাইকে ছাড়িয়ে ছুটে গিয়ে নোভার গলা চেপে ধরলাম। তখন আমার মাথা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছিল। কোনো বোধ, কোনো বিবেচনা কাজ করছিল না।
এই অবস্থাতেই আন্টি বাসায় ঢুকলেন। পরিস্থিতিটা এক নজর দেখেই উনি আর কিছু না বুঝে আমাকে থাপড়াতে থাপড়াতে মা-বাবা তুলে গালাগাল শুরু করলেন। সেই ফাঁকেই লোকজন আমাকে মারতে লাগল। কেউ কিল, কেউ চড়, কেউ ঘুসি মারতেই থাকল। আন্টি নোভাকে জাপটে ধরে কাঁদতে লাগলেন। নোভা বানিয়ে বানিয়ে তাকে অনেক কিছু বলতে থাকল।
কেউ একজন আবার নোভার বাবা নাহিয়ান আংকেলকে কল দিলেন।
সেই মুহূর্তে আমার কাছে পুরো দুনিয়াটাই নিকৃষ্ট মনে হলো। দু’দুবার বিনা দোষে একই অপবাদ! আমি ভিতর থেকে ভয়ংকরভাবে ভেঙে পড়লাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নোভার বাবা ছুটে এলেন। কারো কথা না শুনেই গায়ের জোরে যতটা পারেন আমাকে জুতোর বারি মারতে থাকলেন। আমি তখনো ছটফট করছি, সবার হাত থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছি, আর চিৎকার করে বলছি, আমার কোনো দোষ নেই।
একপর্যায়ে কয়েকজন মিলে আংকেলকে ধরে আমাকে মারার হাত থেকে ছাড়াল।
পুলিশ ডাকা হলো।
আমি তখনো শেষ চেষ্টা হিসেবে হাত জোর করে নোভাকে চিৎকার করে বলেছি, ‘নোভা, সত্যিটা বলো। প্লিজ নোভা, সত্যিটা বলো। আজ আরভিন কাব্য প্রথমবার কারো পায়ে পড়ে ভিক্ষা চাইছে। আমি তোমার পায়ে পড়ছি। দয়া করে সত্যিটা বলো। নোভা…’
কিন্তু ও তখনো মুখ ফিরিয়ে অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছে।
যেহেতু টেবিল ভাঙা, নোভার গাল কাটা, আমি মুখ চেপে ধরেছি—সবকিছু সবাই নিজের চোখে দেখেছে, তাই কেউ আমার কথা বিশ্বাস করল না। তবু পুলিশ আমাকে নিজের সাফাই দেওয়ার সুযোগ দিল।
আমি বললাম, ‘ওকে শুধু জিজ্ঞেস করুন, ও কেন শাড়ি পরে আমার রুমে এসেছিল?’
নোভা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমি… আমি তো শুধু নিজেকে দেখার জন্য শাড়ি পড়েছিলাম। আমি কি জানতাম আপনার বাজে নজর আছে আমার ওপর? আসলে রাস্তার ছেলেকে রাস্তাতেই মানায়। বেশি আদর করে ফেলেছিল আম্মু।’
এই কথা শুনে আন্টি রাগে ফেটে পড়লেন। বললেন, ‘দুধ দিয়ে কালসাপ পুষেছি। শয়তানটার গলা কাটবো আমি। আমাকে ছাড়ো, নাহিয়ান!’
এরপর মা-বাবা তুলে এমন কোনো গালি নেই, যা শুনতে হয়নি। কিন্তু প্রতিবার মাকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলা হলেই আমি লাগাতার চেঁচিয়ে উঠতাম। আর প্রতিবারই তার জবাবে মার খেতাম।
শেষ পর্যন্ত আমাকে পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হলো।
পুলিশ তারপর আমার বাবা-মায়ের নাম জানতে চাইল। বাবার নাম বলতে চাইনি। কিন্তু জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হলাম।
যখন তারা জানল, আমি একজন প্রভাবশালী শিল্পপতির সন্তান, আর আমার মা আরশিয়া রহমান নামকরা অ্যাডভোকেট—তাদের চোখ কপালে উঠে গেল। মা আইনজীবী হওয়ায় শেখ ইমতিয়াজের সঙ্গে অনেকেরই পূর্বপরিচয় ছিল। চাইলে তিনি একাই আমার কেস নিখুঁতভাবে সামলে নিতে পারতেন। তাকে ফোন করা হলো। ঘটনা সংক্ষেপে জানানো হলো।
ওপাশ থেকে তিনি শুধু বললেন, ‘আমি কোনো কুলাঙ্গারকে জন্ম দেইনি। না আমি ওর বাবা। আপনারা পারলে ওকে ফাঁসি দিয়ে দিন। এই জা*নোয়ার আমার কাছে অনেক আগেই মৃত।’”
এইটুকু বলেই কাব্য থেমে গেল। শেষ কথাগুলো বলার সময় কাব্যের কণ্ঠ আর স্বাভাবিক ছিল না। কেমন ভাঙা ভাঙা, বেদনাদায়ক ছিল। শরীর কাঁপল, ঠোঁট কাঁপল। এতক্ষণ তার চোখে এক ফোঁটা জলও দেখা যায়নি। কিন্তু এবার আর পারল না। নিঃশব্দে জমে থাকা পানি চোখের কোণে ঝিলমিল করে উঠল।
ইলিজাও আর নিজের চোখ সামলাতে পারল না।
একজন মানুষের ওপর এতখানি নৃশংসতা কীভাবে নেমে আসে? এত অপমান, এত অবিচার বয়ে নিয়েও কাব্য বেঁচে আছে, এই বিস্ময়টাই তাকে ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। সমাজের প্রতি তীব্র ঘৃণা জন্মাল তার মনে। মেয়েদের প্রতি—বিশেষ করে এমন মেয়েদের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা চেপে বসল। কিছু বলতে পারল না। কেবল কাব্যের শুষ্ক, রুক্ষ মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল।
আজ কাব্যের জন্য ইলিজার ভেতরে এত আবেগ জন্মাল কেন, সে নিজেও জানে না। কিন্তু আবেগটা জন্মেছে গভীর, ভয়ংকর গভীর। এই প্রথম কাব্যের চোখে এমন জল দেখে তার বুকের ভেতরটাও ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। এতদিনেও সে বুঝতে পারেনি, একটা মানুষের হাসির আড়ালে কতখানি দুঃখ লুকিয়ে থাকতে পারে।
কাব্য কয়েক মুহূর্ত থেমে পাঞ্জাবির হাতায় চোখের পানি মুছে নিল। তারপর ভারাক্রান্ত স্বরে আবার বলতে শুরু করল, “আমার ভাগ্যটাই কেমন দেখুন। তখন সবে আঠারোতে পা দিয়েছি। তাই শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের বদলে সরাসরি জেলেই পাঠাল তারা। একজন পুলিশ বলেছিল, ‘রেইপের চেষ্টার মামলায় সাত থেকে চৌদ্দ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে, সঙ্গে জরিমানাও। তবে কেস আগে আদালতে যাবে, কিন্তু রায় কবে আসবে, কেউ জানে না। তবে এমন মামলার বিচার মাসেও হয় না, বছরের পর বছর গড়ায়।’
তাই আমি ধরেই নিয়েছিলাম, এই জেলের দেওয়ালই হয়ত আমার জীবনের শেষ ঠিকানা।
কিন্তু এক মাসের মাথায়ই আদালতে শুনানির দিন ঠিক হলো। সেদিন আমি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। সামনে নোভাকে সাক্ষী হিসেবে ডাকা হলো। ওর ওপর তখন আমার এমন রাগ হচ্ছিল, পারলে সেদিনই ওখানে ওকে মেরে ফেলতাম।
কিন্তু কীভাবে যেন সব উলটে গেল।
নোভা আদালতে দাঁড়িয়ে স্বীকার করল, ওর দেওয়া অভিযোগটা মিথ্যা ছিল। বাকি সবকিছু সে স্বীকার করল। আমি তখন কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। রাগের চেয়ে বিস্ময়ই আমাকে বেশি গ্রাস করেছিল।
আদালত থেকে বেরিয়ে দেখি, বাইরে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে নোভা। বোঝা যাচ্ছিল, এই কয়দিনে ও নিজের সঙ্গেই যুদ্ধ করেছে। তবুও আমি ওর দিকে তাকালাম না, হাঁটতে শুরু করলাম। মনে হাজারটা প্রশ্ন জমে ছিল, কিন্তু একটাও করিনি।
ঠিক তখনই পিছন থেকে নোভা ডেকে উঠল, ‘কারণটা জানতে চাও না?’
আমি থামলাম। কিন্তু ফিরে তাকালাম না। শুধু বললাম, ‘দরকার নেই।’
এই বলে আবার হাঁটা ধরতেই নোভা প্রায় অনুনয়ের স্বরে বলে উঠল, ‘কিন্তু তোমার জানা দরকার।’
আমি আর এগোলাম না।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বলতে শুরু করল, ‘তোমাকে জেলে নেওয়ার পর থেকেই আমি ভিতরে ভিতরে মরছিলাম। টানা তিন দিন একফোঁটা খাবার মুখে তুলিনি। রাতে ঘুমোইনি। শুধু তোমার রুমে যেতাম। তোমার জিনিসপত্র ছুঁয়ে দেখতাম। এত বড়ো একটা অভিযোগ করেছি, মা-বাবাকে কীভাবে বোঝাবো, সেটাই বুঝতে পারছিলাম না। সবাই যদি জানে আমি মিথ্যা বলেছি… এই ভয়েই নিজের মধ্যে চুপচাপ মরছিলাম।
কয়েকবার ভেবেছি নিজেকে শেষ করে ফেলি। আমি কত বড়ো পাপী! কিন্তু তাও সাহস হচ্ছিল না। অবশেষে সিদ্ধান্ত বদলালাম।
একদিন বাবাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, যদি কেউ মিথ্যা অভিযোগ করে আর সেটা আদালতে প্রমাণ হয়, তাহলে কী শাস্তি হবে? বাবা বলেছিল, সাত বছরের জেল। সেই কথা শুনে আবার ভেঙে পড়লাম। সত্যিটা বলার সাহস হচ্ছিল না। কিন্তু যখন আদালতে সাক্ষ্য দিতে ডাকল, তখন আর পারিনি। সাহস করে সব সত্য বলে দিয়েছি। সব স্বীকার করায় আমাকে সতর্ক করে ছেড়ে দেওয়া হলো। যদিও আমি ভেবেই নিয়েছিলাম আমার জেল হবে। জানো, আদালত থেকে বের হতেই মা দুটো থাপ্পড় মেরেছিল। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, কমই খেয়েছি। তোমাকে কত আঘাত করেছে সবাই!’
এই বলে নোভা থেমে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এসে আমার পায়ের কাছে বসে পড়ল। চোখ নামিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমাকে ক্ষমা করো। ক্ষমা করো, কাব্য। কিন্তু আমি তোমাকে সত্যিই খুব ভালোবাসি। এতটাই যে জানতাম সত্যিটা বললে আমার জেলও হতে পারে, তবু এক মুহূর্ত দ্বিধা করিনি।’
ওর কথায় এবার আমার মন কিছুটা গলেই গেল, হয়ত ওর আকুতি মিনতি করার প্রক্রিয়াটাই আমাকে আচ্ছন্ন করেছে। কিন্তু দুর্বল হলাম না।
আমি শান্ত গলায় বললাম, ‘তোমার সামনে গোটা একটা সুন্দর জীবন পড়ে আছে, নোভা। সেটা নষ্ট করো না, উপভোগ করতে শিখো। ক্ষণিকের টানকে ভালোবাসা ভেবে নিজেকে পোড়াতে যেও না। বয়ঃসন্ধিতে এমন এলোমেলো, ঘরহীন, বেকার ছেলেদের ভালো লাগে, কিন্তু বড়ো হলে বুঝবে, তুমি আসলে ভালোবাসোনি—তুমি শুধু একটা কল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলে। বাস্তব জীবন ফ্যান্টাসিতে চলে না, নোভা; ওটা দায়িত্ব চায়, স্থিরতা চায়।’
ঠিক তখনই নোভার বাবা-মা এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলেন। আমি মাথা নুইয়ে সহমর্মিতা দেখালাম। আর কিছু বলিনি। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই নোভা পিছন থেকে বলল, ‘আমি অপেক্ষা করব।’
আমি আর পিছন ফিরে তাকাইনি।
পরদিন ওদের বাড়িতে গেলাম জিনিসপত্র নিতে। দ্বিতীয়বার ওই ঘরে ঢুকতে মোটেও ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু মায়ের কিছু জিনিস নেওয়া দরকার ছিল। দেখলাম, রুমের সব গুছিয়ে রাখা। তবে একটা জিনিস পেলাম না—আমার একটা কলম। ওটাও মায়ের ছিল। কালি ভরে ভরে ওটা দিয়েই লিখতাম। আমি বুঝেছিলাম, ওটা নোভাই সরিয়ে রেখেছে। কিন্তু চাইনি আর।
ঘর থেকে নামার সময় দেখি, নোভা পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কিছু বলিনি। সেও না।
ওর নাক টানার অস্পষ্ট আওয়াজ কানে এসেছিল, কাঁদছিল হয়ত। কিন্তু সেদিকে আর না ফিরে তাকিয়ে আমি বেরিয়ে এলাম।
তারপর কেটে গেল অনেকগুলো বছর। একদিন ইউনিভার্সিটির সামনে ওকে হঠাৎ দেখলাম। প্রথমে তো আমি ওকে চিনতেই পারিনি। সময় ওকে অনেক বদলে দিয়েছে, বড়ো হয়ে গেছে যে। ও পিছন থেকে ডাকল। পরিচিত কেউ ভেবে এগিয়ে গেলাম। ও নিজের নাম বলল। ইউনিভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা মানায় না ভেবে চায়ের প্রস্তাব দিলাম। ও হালকা হাসল, বলল, ‘এখন আর অনুভূতি বাড়িয়ে কী লাভ?’
আমি সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কীসের জন্য এসেছ?’
ও আমার হাতে একটা বিয়ের ইনভাইটেশন কার্ড ধরিয়ে দিল। কিন্তু ওর কণ্ঠ আর মুখের রেখা দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম, এই বিয়েতে ও খুশি না।
ও জিজ্ঞেস করল, ‘জীবনে কেউ এসেছে? কাউকে ভালোবাসো?’
‘হুম্।’
‘নাম কী?’
‘ইলিজা।’
‘সুন্দর নাম। বয়সে কি আমার থেকে বড়ো?’
‘কয়েক বছর আগে তুমি যে বয়সে ছিলে, ওর বয়স ঠিক ততটাই।’
নোভা গভীর আফসোসে বলল, ‘আমাকে এভাবে খু*ন না করলেও পারতে, প্রাণপুরুষ। এখন আর তোমার এই বয়সকে ফ্যান্টাসি মনে হয় না?’
আমি কোনো উত্তর দিইনি।
অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল উত্তরের অপেক্ষায়। কিন্তু না পেয়ে ও হঠাৎ আমার হাতে মায়ের সেই কলমটা ধরিয়ে দিল। তারপর শান্ত গলায় বলল, ‘ওই ভাগ্যবতী মেয়েটাকে একবার… একটাবার দেখতে ইচ্ছে করছে। থাক, না হয় অপূর্ণই থাকল সে ইচ্ছে। শেষ আবদার—মেয়েটাকে সুখে রেখো।’
এই বলে সে সামনে পা বাড়াল।
আমি আর ওকে নতুন জীবনের শুভেচ্ছাও জানাইনি। আসলে ওকে আমি শাস্তি দিয়ে যাচ্ছিলাম নিজের অজান্তেই। কারণ ওর কারণেই আমি আরেকবার শেখ ইমতিয়াজের কাছে প্রমাণিত হয়েছিলাম, কাব্য একজন রে’পিস্ট।”
শেষ কথাগুলো ইলিজা কতটুকু শুনেছে, কাব্য জানে না। কিন্তু নোভার বলা কথাগুলো, কাব্যের মুখে নিজের নাম শোনা, আর কাব্যের জীবনের এই দীর্ঘ ঝড়—সব মিলিয়ে ইলিজার বুকের ভেতর হাহাকার উঠল। এতক্ষণ চোখ দিয়ে অল্প অল্প জল ঝরছিল, এবার আর বাঁধ মানল না। হুড়হুড় করে নামতে লাগল।
কাব্য আরও কিছু বলবে কি না, ইলিজা জানে না। সে হুট করেই কাব্যকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। কাব্য হতভম্ব। বুঝে উঠতে পারল না এই আকুতিভরা কান্নার উৎস কোথায়।
কাব্য মুখ খুলতে যাবে, ঠিক তখনই ইলিজা কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল, “নোভা আপু ঠিকই বলেছিল, আমি ভাগ্যবতী। নাহলে কি আপনাকে পেতাম? আপনি এত ভালো কেন, বলুন তো? আমি তো এত ভালো মানুষকেও ডিজার্ভ করি না।”
Tell me who I am 2 part 9
ইলিজার কান্না থামার নাম নেই। কাব্য হালকা হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। ইলিজা তাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। কাব্যের পাঞ্জাবির বুকের এক পাশ ভিজে গেছে তার অশ্রুতে।
একসময় কাব্য নরম গলায় বলল, “আমাকে কখনো ছেড়ে যাবেন না তো?”
ইলিজা আলিঙ্গনের বাঁধন আরও দৃঢ় করে বলল, “কক্ষনো না। এবার থেকে আমি আপনাকে আর কোনো কষ্ট পেতে দেব না। একদমই না। কিন্তু আপনি আমাকে কেন পছন্দ করলেন বলুন তো? আমিও তো শুরুতে আপনাকে কত কষ্ট দিয়েছি!”
