Tell me who I am 2 part 11
আয়সা ইসলাম মনি
কাব্য হঠাৎ করেই খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির উৎস ইলিজার শেষ বাক্যটি, কারণ শুরু থেকে তার সাথে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা কেবল কাব্যের পছন্দই নয়, অদ্ভুতভাবে তার হৃদয়ের একান্ত, অব্যক্ত কোনো প্রান্তকে স্পর্শ করেছিল। অথচ এমন এক অনুপযুক্ত মুহূর্তে, এমন অকস্মাৎ অপ্রস্তুত হাসি ইলিজাকে বিস্ময়ের চূড়ান্ত কিনারায় ঠেলে দিল।
বুকের ওপর রাখা মাথা তুলে সে প্রথমবার কাব্যের এমন অকৃত্রিম, শিশুসুলভ হাসি দেখল। দৃশ্যটি ছিল মনোমুগ্ধকর। কী অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল লোকটাকে! সেই সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ যদিও ছিল, তবু তার থেকেও প্রবল হয়ে উঠল ইলিজার বিস্ময়। কিছুক্ষণ পর কাব্য নিজেকে সামলে নিয়ে হাসি থামাল এবং সামান্য দূরে সরে বসল। তার এই আচরণে ইলিজার কপালের ভাঁজ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে অজান্তেই একটু এগিয়ে এলো।
কাব্য লজ্জা আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টায় বলল, “এভাবে বারবার কাছে আসবেন না, মিস। আমাদেরও কিন্তু লজ্জা-টজ্জা বলে একটা বিষয় আছে। নাকি পুরুষ বলে এসব গোনায় ধরেন না?”
কথাটায় ইলিজা মুহূর্তেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে চোখ বন্ধ করে নিজের লজ্জাটুকু গোপন করতে চাইল, কিন্তু ততক্ষণে গালের লালচে আভা বিশ্বাসঘাতকতা করে ফেলেছে। একটু দূরে গিয়ে বসে সে অন্যমনস্কভাবে ঠোঁট কামড়াতে লাগল।
কাব্য খুকখুক করে কাশল। কণ্ঠে ফিরে এলো স্বাভাবিক স্বর, “দেখেছেন, গল্প বলতে বলতেই তো বিকেল গড়িয়ে গেল। অথচ আপনাকে পুরো শহরটা ঘোরানোর কথা ছিল। চলুন, এবার উঠি।”
ইলিজা চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে আলতো হেসে বলল, “কি দরকার? এখানেই তো বেশ ভালো লাগছে।”
কাব্য ভ্রূ তুলে চমৎকারভাবে মৃদু হাসল।
“উঠবেন, নাকি কোলে তুলে নিতে হবে, ম্যাডাম?”
না চাইতেও ইলিজার ঠোঁটের কোণে একফোঁটা হাসি গড়িয়ে এলো। সে হাতের উলটো পাশ দিয়ে চোখের পানি মুছে উঠে দাঁড়াল। লজ্জায় এবার তার গালজোড়া যেন পুরোপুরি টমেটোর রং ধারণ করেছে। ইলিজা সামনে হাঁটতে লাগল। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। হালকা বাতাসে তার চুল আলতোভাবে উড়ে যাচ্ছে।
পেছনে কাব্য মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে একবার মাথা চুলকে, একবার চুল ব্যাকব্রাশ করে উঠে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ পর সাইকেলটা ঠেলে ইলিজার পাশে এসে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “একটু আগে আপনার চোখ থেকে পানি ঝরছিল, অথচ আপনাকে একটা টিস্যু দেওয়ার সামর্থ্যও আমার ছিল না। আর আপনি কিনা এমন একজন মানুষের জন্য নিজের চোখের অমূল্য জল নষ্ট করলেন!”
ইলিজা হঠাৎ থেমে কাব্যের বিষণ্ন মুখের দিকে তাকাল। স্নিগ্ধ কণ্ঠে আওড়ালো, “মূল্যবান মানুষের জন্য অমূল্য কিছু ক্ষয় করলে তার মূল্য কমে না, বরং বেড়ে যায়।”
একটি নির্দিষ্ট ও অঘোষিত উদ্দেশ্যে ব্লাডশেড ডার্ক ও অবস্কিউরকে তাদের বহুদিন পুরোনো আস্তানায় তলব করেছে। হঠাৎ এমন জরুরি ডাকে ডার্কের ভেতরে অস্থিরতা জমে উঠেছে। তার ধারণা ছিল, নিশ্চয়ই ব্লাডশেড নতুন কোনো মেয়ে এনেছে। কিন্তু এসে দেখে সেই প্রত্যাশার কোনো চিহ্ন নেই। ফলে বিরক্তি আর ক্রোধ মিশিয়ে সে গর্জে উঠল, “হোয়াট দিস মিনস? আইটেম কোথায়?”
ব্লাডশেড একটি চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। দুই পা ছড়িয়ে, শরীরটা পেছনে হেলিয়ে ঠান্ডা স্বরে বলল, “বিফোর ইউ গাইজ রিঅ্যাক্ট, তোদের একটা শকিং নিউজ দিতে যাচ্ছি।”
এতক্ষণ অবস্কিউর নির্বিকারভাবে সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছিল। কথাটা শুনে শেষ টান দিয়ে সিগারেটটা মাটিতে ছুঁড়ে ফেলল, তারপর পায়ের নিচে চেপে নিভিয়ে দিল। ব্লাডশেডের সামনের চেয়ারে বসে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “ডোন্ট প্লে গেমস, ব্লাডশেড। জাস্ট সে ইট। এত জরুরি কলের কারণ কী?”
ব্লাডশেড ঠোঁট ভিজিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কণ্ঠে কোনো উত্তেজনা ছাড়াই ঠান্ডা চেহারায় আওড়ালো, “আজ থেকে এসব কাজ বন্ধ। আর কোনো মেয়েকে রে’ইপ করা যাবে না।”
“হোয়াট দ্য হেল? আর ইউ ক্রেজি, ব্রাদার?”
একসাথে অবস্কিউর আর ডার্ক চেঁচিয়ে উঠল। কিন্তু ব্লাডশেডের মুখভঙ্গি বদলাল না, কণ্ঠ একই রকম নির্লিপ্ত রইল।
“লিসেন কেয়ারফুলি। এবার পুলিশ একচুল এদিক-ওদিক হলেই ধরে ফেলবে। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু টেক দ্যাট রিস্ক। যদি পরিস্থিতি আবার আমাদের পক্ষে আসে, তখন নতুন করে শুরু করা যাবে। আপাতত সবকিছু স্থগিত। এখন নিজের মতো লাইফ এনজয় করি কিছুদিন।”
ডার্ক চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, চোখে লালসার ক্ষুধা স্পষ্ট। কণ্ঠে বিকৃত বিরক্তি ঝরিয়ে শুধালো, “সিন্স হোয়েন ডিড পুলিশ বিকাম এ প্রবলেম? এসব নতুন করে ভাবার কী আছে? আমি মেয়েদের শরীরের গন্ধ ছাড়া থাকতে পারব না। ওদের শরীরের প্রতিটি অংশ মুখে না নিলে দম আটকে আসবে আমার। সো, আই ক্যান্ট জাস্ট স্টপ।”
ব্লাডশেড চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। ভ্রূ উঁচু করে কড়া স্বরে বলল, “এজ ইয়োর উইশ। বাট আই’ম আউট ফর নাউ। আমাকে থানায় যেতে হবে—টু ফিগার আউট দ্য ফুল সিনারিও।”
এই কথা বলেই ব্লাডশেড জঙ্গলের অন্ধকার গলিপথে মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর অবস্কিউর ডার্কের কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল, “হি মে বি রাইট। লাস্ট টাইম আমরা বেঁচে গেছি, ডাজ নট মিন এভরিটাইম উই উইল।”
এই বলে সেও চলে গেল। ডার্ক একা রইল। টেবিল থেকে গ্লাস তুলে নিয়ে তাতে মদ ঢালল। গাঢ় তরলটা ঠোঁটে ছুঁইয়ে ধীরে ধীরে চুমুক দিতে থাকল। যদিও তার নিশ্বাসের গতি ক্রমশই দ্রুত হচ্ছে। ভ্রূ কুঁচকে কিছু একটা গভীর চিন্তায় মগ্ন রইল।
গতকাল থেকেই হুমায়ুন উঠেপড়ে লেগেছে OWL-দের সবকিছু বের করার জন্য। পুরো বিভাগ এখন তার একক সংকল্পের টানে সচল। সারারাত অফিসের কৃত্রিম আলোয় বসে ফাইলের পর ফাইল উলটে পুরোনো রিপোর্ট, বিস্মৃত নথি, অর্ধসমাপ্ত কেস—নিরবচ্ছিন্নভাবে সবকিছুকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করেছে। প্রতিটি তথ্যই যেন আরেকটি তথ্যের দিকে ইঙ্গিত করছে, অথচ চূড়ান্ত সত্যটা বারবার ধরা দিয়েও অধরা থেকে যাচ্ছে।
ভোরের আলো ফোটার আগেই হুমায়ুনের টিম দুই দিকে রওনা দেয়। কেউ ডুব দিয়েছে পুরোনো অপরাধের আর্কাইভে, কেউ শহরের দক্ষিণপ্রান্তের পরিত্যক্ত গুদাম, ভাঙা কারখানা আর বিস্মৃত গলিগুলোতে নজরদারি বসাতে। ইনফর্মার নেটওয়ার্ক সক্রিয় করা হয়েছে, অপরাধের সামান্য গন্ধ পেলেই যাতে হুমায়ুনকে গোপন সংকেত পৌঁছে দেওয়া হয়।
সাইবার ইউনিটও নিশ্চুপ নেই। রাতের মধ্যেই তারা একটি এনক্রিপ্টেড চ্যাটরুম হ্যাক করে ডেটা উদ্ধার করেছে। সেটার নাম হলো The OWL Nest। সেখানে বিকৃত কিছু ছবি, অসংলগ্ন কোড আর অজানা লোকেশনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হুমায়ুন এক মুহূর্ত দেরি না করে নির্দেশ দিয়েছিল, “প্রতিটি কো-অর্ডিনেট ট্রেস করুন। একটা পয়েন্টও যেন বাদ না যায়।”
দুপুর নাগাদ সে হাজির হয় ফরেনসিক ল্যাবে। পুরোনো ভিকটিমদের রিপোর্টের সঙ্গে নতুন স্যাম্পল মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। ডিএনএ সিকোয়েন্সে ক্ষুদ্র হলেও একটি মিল ধরা পড়েছে, যেটা অনেকটাই আশা জাগিয়েছে। হুমায়ুন জানে, এই লড়াই সহজ নয়। OWL-দের ধরতে হলে আইন ছাড়াও দরকার অসীম ধৈর্য আর সিংহের মতো সাহস। সে এটাও জানে, এই পথে এগোলে তার পরিবারও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবু এবার সে আর পেছনে তাকাচ্ছে না। তার লক্ষ্য একটাই—ওদের যেকোনোভাবে থামাতেই হবে।
সন্ধ্যা নামার আগেই হুমায়ুন থানায় বসে প্রতিটি বিষয় নতুন করে যাচাই করছে। এমন সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা এসে স্যালুট জানিয়ে বলল, “স্যার, সব তথ্য পুরোপুরি বের করতে আর মাত্র কিছুদিন লাগবে। আর ওদের একেবারে হাতেনাতে ধরতেও কিছুটা সময় প্রয়োজন। তাছাড়া এগুলো তো সবই আমান স্যারের তত্ত্বাবধানে, তাই…”
হুমায়ুনের ইচ্ছে ছিল আজকেই সব মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিবে, তাই তার কণ্ঠস্বর হঠাৎই চড়া হয়ে উঠলো, “তাই কি? তার মানে আবারও মেয়েগুলোর ওপর হামলা হোক, সেটাই আপনারা চান?”
পুলিশ কর্মকর্তা কিছুটা সামলে নিয়ে বলল, “স্যার, সে সম্ভাবনা আপাতত নেই বললেই চলে। ইসহাক স্যারের অর্ডারে পলাশের লাশ উদ্ধারের আশেপাশের এলাকা তো বটেই, দূরের জায়গাগুলোতেও টহল বসানো হয়েছে। এখন ওদের পক্ষে এমন কিছু করা মানেই সরাসরি ধরা পড়া। আর এরা অন্তত এতটুকু তো অবশ্যই বুদ্ধিমান। অর্থাৎ এই ভুল করবে না।”
ইসহাক নিজেই যেহেতু এবার কাজে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছেন, তাই হুমায়ুন ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল, “এই ব্যাপারে ইসহাক স্যার কি কিছু জানিয়েছেন?”
“আমাকে তো কিছু বলেননি, স্যার। শুনেছি আমান স্যারকে জানিয়েছেন। খুব দ্রুতই ধরার ব্যবস্থা চলছে।”
হুমায়ুন মুখ বাঁকিয়ে একরাশ হতাশ শ্বাস ছাড়ল।
“এই হয়েছে! এইভাবে করে করে বছরের পর বছর কেটে গেল। কিন্তু ওদের কাজ থামল কই?”
একটু থেমে দৃঢ় স্বরে যোগ করল, “আর সর্বোচ্চ সাত দিন। এরপর সবকিছু পুরো দেশের সামনে আসবে। এখন চলো, ফরেনসিক বিভাগের সঙ্গে কথা বলে আসি।”
পুরো বিকেলটা কাব্য ইলিজাকে সঙ্গে নিয়ে কাটিয়েছে। একসাথে টং-এর দোকানে বসে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক, নিরর্থক আড্ডা, তারপর পাশাপাশি হাঁটা; সবকিছুই সময়ের স্বাভাবিক ধারায় গড়িয়ে গেছে। সন্ধ্যার নরম আলো যখন নিভে এসেছিল, তখনই কাব্য ইলিজাকে গাড়িতে তুলে বিদায় জানিয়েছে। গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই কাব্যের মনটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল।
কিন্তু এখন তার সামনে আরেকটা গুরুদায়িত্ব অপেক্ষা করছে। গতরাতে শুভ্রকে সে স্পষ্ট করেই বলেছিল, স্নেহার বিষয়টা নিয়ে থানায় যাবে। সেই প্রতিশ্রুতির কথাই মাথায় রেখে সে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। অনেকটা দূর আসার পর মনে হলো, শুভ্রকে একবার ফোন করা দরকার। পকেট থেকে ফোন বের করতেই আচমকা চোখে পড়ল এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্য—বনের দিক থেকে বেরিয়ে শুভ্র সামনের দিকেই যাচ্ছে।
কাব্যের কপাল অজান্তেই কুঁচকে গেল। বিড়বিড় করে বলল, “সন্ধ্যার টাইমে শুভ্র ওইদিকে কই গেছিলো?”
শুভ্র নির্বিকার ভঙ্গিতে সামনের দিকে এগোচ্ছিল। ঠিক তখনই পিছন থেকে কাব্যের কণ্ঠ ভেসে এলো, “ওই, শুভ্র!”
হঠাৎ পিছন ফিরল সে। কাব্যকে দেখে এক মুহূর্তের জন্য বিস্ময় তার চোখে ঝিলিক দিলেও, ভয় বা অস্বস্তির কোনো ছাপ মুখে ফুটে উঠল না। বরং চেনা ভঙ্গিতে হেসে বলল, “গোলামের পুত কাব্য রে! তোরেই তো এইমাত্র কল লাগাইতাম। থানায় যাবি নাকি?”
কাব্য মুখে কোনো অভিব্যক্তি না এনে শুভ্রকে একবার মাথা থেকে পা পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখল। সেই দৃষ্টিতে ছিল না বন্ধুত্ব, ছিল নিখাদ অনুসন্ধান। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “হুম্, থানায় চল।”
শুভ্র একটু থমকাল।
“কিন্তু তুই এইদিকে কই যাচ্ছিলি?”
“এইদিকে আমার টিউশনি থাকে, জানোসই তো।”
শুভ্র মাথা নেড়ে বলল, “ওহ, হ। চল তাইলে। সামনে গাড়ি আছে। ধুর বা’ল! ভুলেই তো গেছিলাম, তুই তো আবার হাঁইটা যাইতে পছন্দ করিস।”
তার মুখে হালকা হাসি খেললেও কাব্যের মুখে হাসির কোনো চিহ্ন দেখা গেল না। সে নীরবে সামনে এগোতে থাকল। শুভ্র মাঝেমধ্যে কথা বলার চেষ্টা করলেও কাব্যের জবাব সীমাবদ্ধ থাকল কেবল ‘হুঁ’ আর ‘হ্যাঁ’-এর ভেতরেই। কারণ তার মন তখন অন্য এক অদৃশ্য আশঙ্কার জালে বন্দি।
শেষমেষ তারা থানায় পৌঁছাল।
ডিউটিতে থাকা পুলিশ স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই জানতে চাইল—তারা কারা, কী কারণে এসেছে, কোনো এফআইআর হবে কি না। তখন কাব্য দৃঢ় কণ্ঠে স্নেহার নিখোঁজ হওয়ার পুরো ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরল।
থানার পাশের একটি কক্ষে হুমায়ুন কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে OWL-দের নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত ছিল। কিন্তু কাব্যের কথাগুলো কানে যেতেই তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই সে উঠে এসে সেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে কাব্যের সামনে দাঁড়াল।
হুমায়ুন ঠান্ডা গলায়ই জিজ্ঞেস করল, “ওই রাতে স্নেহা আর ইলিজার সাথে ঠিক কী কী ঘটেছিল, সব বিস্তারিত বলুন।”
যা যা সংঘটিত হয়েছিল, কাব্য পুনরায় যথাযথভাবে খণ্ড-খণ্ড করে খুলে বলল।
আপাতত থানার ভেতরে হুমায়ুনের ডেস্কের সামনে রাখা চেয়ার দুটোয় কাব্য আর শুভ্র পাশাপাশি বসে আছে। চারপাশ নীরব, অথচ উদ্বেগের অতিমাত্রিক তীব্রতা সবাইকেই ভারাক্রান্ত করে রেখেছে।
কাব্য এক গ্লাস পানি চাইলো। হুমায়ুন হাতের ইশারায় একজনকে ইঙ্গিত করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পানির গ্লাস চলে এলো। কাব্য কয়েক ঢোকে পানি শেষ করে হালকা মাথা নেড়ে ধন্যবাদ জানাল। তারপর পুনরায় মুখ গম্ভীর করে, হুমায়ুনের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল, “তার মানে আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, স্নেহার মা’র্ডারটা কে করেছে?”
হুমায়ুন পিঠ সোজা করে চেয়ারে বসলো। চোখ কঠিন হয়ে উঠল। গলার স্বর ভারী করে আওড়ালো, “আউলরা। আর শুধু মা’র্ডার নয়—রেইপ করে, তারপর জঘন্যভাবে খু’ন করেছে।”
“কিহ?”
একসাথে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে গেল কাব্য আর শুভ্র।
কাব্যের চোখ বিস্ফোরিত হয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ড সে যেন কথাটার মানেই ধরতে পারছে না। অর্থাৎ মস্তিষ্ক শব্দগুলো গ্রহণ করছে, কিন্তু বিশ্বাস করতে অস্বীকার করছে। রে’ইপ। খু’ন। একই বাক্যে আটকে আছে শব্দগুলো। বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা শূন্যতা তৈরি হলো। এত নৃশংসভাবে মানুষ হয়ে আরেকটা মানুষকে কীভাবে মারতে পারে?
আর শুভ্রের শরীরটা তো কেঁপে উঠেছে। নিশ্বাস এলোমেলোভাবে পড়ছে, হৃৎপিণ্ড সংকুচিত হয়ে আসছে। চোখের কোণে জল জমে উঠল কখন, সে নিজেও জানে না। মাথার ভেতর একটাই বাক্য ঘুরছে, তার জন্যই… সবকিছুর জন্য দায়ী সে-ই।
সে যদি সেদিন বাধা দিত, যদি স্নেহাকে আসতে না বলত, তাহলে হয়ত ও বেঁচে থাকতো।
অনুশোচনার ভারে চোখ নামিয়ে ফেলল শুভ্র। তার নীরবতাই এই পরিণতির পথ খুলে দিয়েছিল, এই ভাবনাটা বুকের ভেতর বারংবার ছুরির মতো খোঁচা দিচ্ছে।
হুমায়ুন হাত তুলে ইশারায় দুজনকেই বসতে বলল।
“শান্ত হন। বসুন।”
তারা বসল ঠিকই, কিন্তু শরীরের ভেতর জমে থাকা আতঙ্ক আর ঘাম কিছুতেই থামছিল না।
হুমায়ুন বুঝতে পারছিল, এখন আর কিছুই আড়াল করার সময় নয়। এবার জনসম্মুখে আউলদের মুখোশ খুলে পড়বে। তাই কাব্য আর শুভ্রকে সব জানানো দরকার।
একটার পর একটা তথ্য টেবিলের উপর নামাতে লাগল। OWL কীভাবে কাজ করে, কত বছর ধরে এই নরক চলেছে, কীভাবে শতশত মানুষ খু’ন করেছে, কীভাবে নারীদের ওপর বিকৃত পাশবিকতা চালানো হয়েছে, কোন সময়ে বন্ধ ছিল, আবার কীভাবে শুরু হয়েছে, সবকিছুই বিস্তারিত জানালো। বিবরণগুলো এতটা ছিল বিশ্রী যে, যেগুলো শুনে যে-কোনো মানুষের গা শিউরে উঠবে।
কথার মাঝখানে কাব্য কয়েকবার অস্থির হয়ে উঠল।
“এতদিন চুপ করে ছিলেন কেন?”
রাগ আর ক্ষোভ মিশে তার কণ্ঠটা কেঁপে উঠছিল বারংবার।
আর শুভ্র? সে যেন পাথর হয়ে গেছে। স্নেহার মৃ’ত্যুর বিবরণ তার মাথার ভেতর বারবার আছড়ে পড়ছে। কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না, শুধু চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে।
হুমায়ুন এরপর আলি আবসার, পলাশের মৃ’ত্যু, আর কোন কোন পুলিশের কী ক্ষতি হয়েছে, সবই বলল।
সব শুনে কাব্য আর শুভ্র হতভম্ব হয়ে একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল।
দেশের ভেতর এত ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটে গেছে, অথচ সাধারণ মানুষ কিছুই জানত না!
হুমায়ুন এবার স্নেহার ঘটনার শেষ অংশে এলো। কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল।
“অনেক আগেই সিমেন্টের ড্রামে ওর লা’শ পাওয়া গেছে। কিন্তু ওর পরিবারকে জানানো হয়নি। এতদিন তাদেরকে বোঝানো হয়েছে যে, স্নেহা কিডন্যাপড।
বলেছি, আমরা খুঁজছি। পেয়েছি। তবে ওকে আপনাদের হাতে দিতে সময় লাগবে। অর্থাৎ আজেবাজে কথা বলে ব্যাপারটা সামলে রাখার চেষ্টা চালানো হয়েছে এতদিন।”
ব্যাপারটি যে আমান ইচ্ছাকৃতভাবে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছিল, এই তথ্যটি হুমায়ুন কাব্য ও শুভ্রকে অবগত করায়নি। কারণ তা প্রকাশ পেলে পুলিশের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হতো, বাহিনীর প্রতি আঙুল উঠত, এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিটাই টালমাটাল হয়ে পড়ত।
একটু থেমে দৃঢ় স্বরে যোগ করল, “কিন্তু আর না। এবার জানানো হবে। শুধু স্নেহার পরিবার নয়, পুরো দেশ জানবে।”
এই কথাটুকুতেই কাব্যের বুকের ভেতর অদৃশ্য এক চাপা ভার নেমে এলো, শ্বাস নিতে কষ্ট হলো। মুহূর্তেই ইলিজার নিষ্পাপ মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। স্নেহার এমন নৃশংস ও অমানবিক পরিণতির কথা শুনলে ইলিজা যে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে, তা কাব্য নিশ্চিত জানে। এখন অন্তত ইলিজা বিশ্বাস করে, স্নেহা কোথাও না কোথাও বেঁচে আছে। সেই ভ্রান্ত আশাটুকুই তাকে টিকে থাকতে সাহায্য করছে।
এই বিশ্বাস চূর্ণ হয়ে গেলে কী হবে? তাদের প্রেম শুরুর আগেই ইলিজা এতটা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়বে যে, হয়ত আর কখনোই তাকে আগের মতো জোড়া লাগাতে পারবে না।
স্নেহাকে ফিরিয়ে দেওয়া অসম্ভব, এই নির্মম সত্য কাব্য জানে। তাই ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়া মেয়েটাকে আরেকবার ভাঙার অপরাধ সে করতে চায় না। এই মুহূর্তে তার দায়িত্ববোধের চেয়েও মানবিক দুর্বলতাই বড়ো হয়ে উঠল; তাকে একটু স্বার্থপর হতেই হবে।
হঠাৎ করেই প্রায় অনুনয়ের সুরে গলা কাঁপিয়ে বলে উঠল, “না প্লিজ। এখন জানাবেন না। ওর বাবা-মাকেও না। কিছুদিন পর জানান দয়া করে।”
ইলিজা ভয় পাবে, তার থেকেও বেশি কাঁদবে; এই চিন্তাটাই কাব্যের হৃদয়কে আরও ভারী করে তুলল। কারণ ইলিজার চোখের জল সহ্য করার শক্তি তার নেই।
কথাটা শুনে হুমায়ূন ভ্রূ কুঞ্চিত করে ক্ষণিক নীরবতা ভাঙল, “তাতে লাভ কী?”
“আগে ওদের ধরে ফেলুন, তারপর জানান।”
“সে দেখা যাবে। আপনারা আপাতত যেতে পারেন। আর কোনো নতুন তথ্য পেলে আপডেট জানাতে ভুলবেন না।”
থানা থেকে বেরিয়ে এলো কাব্য আর শুভ্র। স্নেহার কথা, দেশের অগণিত মেয়ের কথা, ভেঙে পড়া পরিবারগুলোর আর্তনাদ—সব মিলিয়ে কাব্যের মন এমন এক বিষণ্নতায় নিমজ্জিত হলো যে শরীরটাও তাকে আর সঙ্গ দিচ্ছে না। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি রাস্তায় লুটিয়ে পড়বে।
শরীরটা দুর্বল, মাথা ঝিমঝিম করছে, বুকের ভেতরটাও ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে। নিজের অভিজ্ঞতাগুলো ইলিজাকে বলতে গিয়ে যে মেয়েজাতির প্রতি তার অন্তরে একসময় ঘৃণা জমেছিল, আজ সেই একই বুকের ভেতর জন্ম নিচ্ছে হাহাকার।
কাব্য ক্লান্ত, হতাশ কণ্ঠে বলে উঠল, “পুরুষ জাতি পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট।”
শুভ্র কথাটা শুনল কিনা বোঝা গেল না। সে সেই কখন থেকেই নিশ্চুপ, যন্ত্রচালিত মানুষের মতো হেঁটে চলেছে। তার মন আজ অস্বাভাবিকভাবে ভারী। স্নেহার কথা ভাবলেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে বলল,
“আমার কি তাইলে স্নেহারেই ভালোবাসা উচিত ছিল? কিন্তু… কিন্তু জোর কইরা কেমনে ভালোবাসবো আমি? আমার তো ওর উপর কোনোদিনই ফিলিংস আসে নাই। আমি ক্যান ওরে ওইদিন আইতে কইলাম? ক্যান কইলাম? আমার ভিতরটা হতাশায়, অনুশোচনায় জ্বলেপুড়ে খাক হইয়া যাইতেছে। নিজেরে নিজেই খু’ন করতে মন চাইতেছে। হে আল্লাহ! তুমি কি আমারে ক্ষমা করবা?”
শুভ্রের এই আত্মবিধ্বস্ত, নিরুত্তর ভাব দেখে কাব্য হঠাৎ থেমে গেল। হালকা করে শুভ্রের গায়ে ধাক্কা দিয়ে বলল, “শুভ্র!”
শুভ্র ছলছল চোখে কাব্যের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে অপরাধবোধ আর অসহায়ত্ব একসাথে জট পাকিয়ে আছে। কাব্য অকারণেই গলা ভারী করে ফেলল। যদিও সে আপাতত নিজের সন্দেহকেও ভয় পাচ্ছে। তাই ধীরে ধীরে গভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “তুই ওই জঙ্গলে কোথায় গিয়েছিলি?”
এই প্রশ্নে শুভ্র অবাক হওয়ার বদলে দীর্ঘ এক নিশ্বাস ফেলল। ক্লান্ত স্বীকারোক্তির মতো বলল, “কোনো কারণ ছাড়াই। এইটার নাম দেইখা ক্যান জানি আকর্ষণ কাজ করল। ‘নিষিদ্ধ শাশ্বত’ বনের নামটা অদ্ভুত, তাই না ক?”
কাব্য কোনো উত্তর দিল না। কেবল সন্দেহে ভারী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। শুভ্র নিজেই বাকিটা বলে চলল, “কিন্তু বেশি দূর আগাইতে পারিনাই। অন্ধকারটা কেমন জানি গা ছমছমে লাগল, তাই বের হইয়া গেলাম। আর তহনই তো তুই ডাকলি।”
তার কথা শেষ হতেই কাব্য আচমকা এমন এক প্রশ্ন ছুড়ে দিল, যেটার সঙ্গে আগের প্রসঙ্গের কোনো দৃশ্যমান যোগ নেই, “তুই কি ম্যারিড?”
কাব্যের কপাল কুঁচকানো, অস্বাভাবিক শান্ত মুখে এমন প্রশ্ন শুনে শুভ্রও কপাল কুঁচকে চোখ পাকিয়ে বলল, “মানে? কী সব বাজে কথা বলছিস? আমি ক্যান ম্যারিড হইতে যাব? আর হইলে তুই জানতি না নাকি?”
কাব্যের চোখের দৃষ্টি এবার আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। স্পষ্ট করে বলল, “সেদিন তোর সাথে একটা মেয়েকে দেখেছি আমি।”
শুভ্র থমকে গেল। তারপর প্রশ্ন করল, “কোন দিন?”
কাব্য সামনের দিকে এগোতে এগোতে পাঞ্জাবির পকেটে হাত গুঁজে বলল, “রেস্টুরেন্টে। দেখে তো মনে হলো, ও তোর বউ বা গার্লফ্রেন্ড। তোর সাথে এমনভাবে চিপকে ছিল… আমি অবশ্য ভিতরে ঢুকিনি। রুমমেট তপন একটা বার্গার নিয়ে বেরিয়ে এলো, ওর সাথেই আসছিলাম। কাচের দরজার কারণে বাইরে থেকেই তোকে আর ওই মেয়েটাকে দেখেছি।”
শুভ্র এতক্ষণ কয়েক কদম পিছিয়ে থেমে থাকলেও এবার তাড়াহুড়ো করে কাব্যের পাশে এসে হাঁটতে হাঁটতে বলল, “কসম, বন্ধু। ওই মাইয়া আমারে পছন্দ করে দেইখা, নিজে থেকেই ওমন চিপকাইছিল। আমি তো ওইটারে চিনিও না। ও জাস্ট আমার একজন ফ্যান। বলছিল, মিট করতে চায়। আমি তো তহন বুঝতে পারি নাই, মা*গীর উদ্দেশ্য ভালো না। কিন্তু বুঝার পর পরই উইঠা পড়ছিলাম…”
শুভ্রের কথাগুলো কতটা সত্য, নাকি তাৎক্ষণিক আত্মরক্ষার প্রয়াস, সেই হিসাব কষার প্রয়োজন কাব্য অনুভব করল না। আচমকা নির্বিকার ভঙ্গিতেই সে আরেকটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “তুই একবার বলছিলি না, ছোটোবেলায় পড়াশোনায় তোর একটা গ্যাপ গেছিল? কয় বছর?”
এই অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে শুভ্রের কপালে অদৃশ্য শীতল স্রোত বয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যেই কপাল ভিজে উঠল ঘামে। তবু নিজেকে সামলে নিয়ে সে প্রশ্ন করল, “হঠাৎ এই প্রশ্ন ক্যান, কাব্য? কী হইছে বল তো?”
কাব্য হাঁটা থামাল না। কণ্ঠটা ভারী হয়ে এলো, “জানি না ক্যান, আউলদের কথা শোনার পর থেকেই কাউকেই আর ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না। যেইদিন আমরা ওদের দেখা পাই, সেইদিন একটা লোকরে দেখছিলাম—লম্বা, ফরসা। অন্ধকার ছিল তো, তাই মুখটা স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু হালকা আলোতে হাত আর চোখ দুইটা দেখছিলাম। চোখ দুটো নীল। লম্বায় একদম তোর মতো। তখন ভয় এত বেশি ছিল যে তোর কথা মাথায় আসেনি। কিন্তু এখন… এখন তো তোর ফিটনেসের সাথেও মিল পাচ্ছি।”
কাব্য একটু থেমে শ্বাস নিল, তারপর ধীরে বলল, “পুলিশ যে তিনটা নাম বলেছে, ডার্ক, ব্লাডশেড, অবস্কিউর; তার মধ্যে ব্লাডশেডের সাথে তোর মিলটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলছে।”
এই কথাগুলো শুনেই শুভ্রের ভেতরের শেষটুকু ভারসাম্যও ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। নিজের এত কাছের বন্ধু, যার সঙ্গে বছরের পর বছর হাসি-কান্না ভাগ করেছে, জীবনের অন্ধকার কোণগুলো নির্ভয়ে খুলে দিয়েছে—সেই মানুষটাই এমন সন্দেহ পোষণ করতে পারে, এই ভাবনাটাই শুভ্রের মাথার ভেতর প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিল।
বুকের ভেতর ধুকপুকানিটা এমন বেপরোয়া হয়ে উঠল যে শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। মাথা ঝিমঝিম করে উঠল, চোখের সামনে দৃশ্যটা ঝাপসা হয়ে আসলো। মনে হলো, আর এক পা এগোলেই সে সত্যিই মাটিতে লুটিয়ে পড়বে।
রাগে, আতঙ্কে, আপমানে হঠাৎ সে চিৎকার করে উঠল, “তোর মাথা খারাপ নাকি, কাব্য? তাই বলে তুই আমাকে ওইসব ভাবছিস?”
কথা বলতে বলতে তার গলা কাঁপছিল, তবু সে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল।
“নীল চোখ কি শুধু আমার একার? তুই তো জানিসই, আমার বাপ ইংল্যান্ডের। তার থেকেই এই চোখের হরমোন পাইছি। মা-বাবার ডিভোর্স হইছে কত বছর আগে! আমি তো মায়ের কাছেই বড়ো হইছি। সব জেনেও তুই… তুই কেম…কেমনে এইসব ভাবলি?”
শেষ কথাগুলো আর ঠিকমতো বেরোল না। কণ্ঠ ভেঙে গেল মাঝপথেই। গলার ভেতর যেন শক্ত কিছু আটকে রইল, যা না গেলা যায়, না ফেলা যায়। এবার শব্দগুলো প্রায় ফিসফিস করে বেরোল, “তুই না আমার ভাই, কাব্য? নিজের ভাইরে নিয়ে কেউ এমন জঘন্য সন্দেহ করতে পারে? কেমনে পারলি, ভাই? কেমনে?”
চোখের কোণে জমে থাকা জল আর আটকে রাখা গেল না। এক ফোঁটা গড়িয়ে পড়তেই বুকের ভেতরের বাঁধটা ভেঙে গেল। শুভ্র কাব্যের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই মুহূর্তে সে কোনো অভিযুক্ত নয়, কোনো সন্দেহভাজনও নয়; সে কেবল একজন আহত মানুষ, যে সবচেয়ে বিশ্বাসের জায়গা থেকেই আঘাত পেয়েছে। তার বুকটা সত্যিই ভার হয়ে এসেছে।
কিন্তু শুভ্রের এত আবেগমথিত কথার পরেও কাব্যের চেহারা আশ্চর্যরকম শান্তই রইল। সে ইচ্ছে করেই অনুভূতির ঢেউটাকে নিজের গলায় উঠতে দিচ্ছে না।
“ভাবছি না। কিন্তু… যাক গে, বাদ দে। চল, চা খাবি?”
এই উদাসীন সংযমটাই শুভ্রের ভেতরের শেষ শক্তিটুকুও ভেঙে দিল। সে হঠাৎই কাব্যের ডান হাত নিজের দুই হাতে চেপে ধরল। চোখের কোণ থেকে আরো এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
“নাহ ভাই, তুই আগে বল, এমনটা ক্যান বললি আমারে? তুই কেমনে এইসব ভাবলি ক? আসলেই কি সবাইরেই অবিশ্বাস করা উচিত? এমন হইলে তো আমার তোরেও সন্দেহ করা উচিত, কিন্তু আমি তো তা করছি না। তুই জানিস, ভিতরটা আমার খাইয়া যাইতেছে এই ভাইবা যে আমার লাইগা একটা মাইয়া মইরা গেল, তাও এতটা নৃশংসভাবে।”
কথাগুলো বলতে বলতে তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো, শূন্য চোখ দুটো তাকিয়ে রইল অদূরে কোথাও।
“নিজেরে কতটা অপরাধী মনে হইতেছে জানিস? নিশ্বাস নিলেই মনে হয়, আমি দোষী। আমি নিজেরে কিছু একটা করলেও হয়ত…”
বাকিটুকু আর বলা হলো না। অপরাধের ভারে কথাগুলো গলার ভেতরেই আটকা পড়ল।
শুভ্রের কণ্ঠে এমন আকুলতা ছিল যে, কাব্য না চাইতেও তাকে টেনে নিজের বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল। তবু তার ভেতরে দ্বিধার কাঁটা বিঁধেই রইল; সে এখনো নিশ্চিত নয়, বিশ্বাস আর সন্দেহের মাঝখানে ঝুলে আছে। ভাবনাটা মিথ্যাও হতে পারে, আর যদি তাই হয়, তবে এত কাছের বন্ধুকে এমন যন্ত্রণা দেওয়া নিঃসন্দেহে অন্যায়। বিপদে-আপদে শুভ্রই তো বারবার তার পাশে দাঁড়িয়েছে, নিঃশব্দে আগলে রেখেছে। সেই স্মৃতিগুলো হঠাৎ করেই মাথাটা ভারী করে তুলল। কাব্য ধীরে ধীরে শুভ্রের পিঠে হাত বুলিয়ে চাপড় দিল।
ছেলেটা হয়ত সত্যিই ভেতর থেকে ভেঙে পড়েছে। আর সেই ভাঙনটুকুর সামনে এখন সন্দেহ নয়, অন্তত মানবিক সান্ত্বনাটুকু দেওয়া উচিত।
মিরা আজ খুশিতে একেবারে মাতোয়ারা। কতদিন পর বাবার বাড়ি যাচ্ছে। কতদিন বলাও ভুল, দিন গুনলে দেড় বছরেরও বেশি পেরিয়ে গেছে, অথচ মনে হচ্ছে তারও বেশি। এই দীর্ঘ বিরতির ভেতরে জমে থাকা অভিমান, নস্টালজিয়া আর মা-বাবার স্মৃতিগুলো আজ একসাথে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। তাই তার প্রস্তুতিতেও কোনো কমতি নেই। আলমারি খুলে কত কাপড় যে বের করেছে, নিজেও ঠিক জানে না।
চৌধুরি বাড়ি নিয়ে তার কত না কৌতূহল ছিল, কত গল্প এখনো অজানা, কিন্তু আজ সেসব তুচ্ছ ভাবনা মনের কিনারাতেও ভিড় করেনি। মা, বাবা, পরিবার, শেকড়—এই মুহূর্তে এগুলোর বাইরে আর কিছুই তার মনে আসছে না।
খুশিতে লাফাতে লাফাতে মিরা কারানের কক্ষে ঢুকল।
কারান সন্ধ্যা থেকেই বিছানায় বসে ম্যাকবুকে কাজ করছে। স্ক্রিনের আলোয় তার গম্ভীর মুখটা দেখা গেল, তার মনোযোগ পুরোপুরি কাজে নিবদ্ধ। মিরা এসে তার পাশে বসল। কারান তাকাল বটে, কিন্তু তাতে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই।
আসলে মনটা তার ভালো নেই। নিজের বউকে ছেড়ে টানা দু’দিন দূরে থাকতে হবে, এই ভাবনাটাই ভিতরে ভিতরে তাকে ভারাক্রান্ত করে রেখেছে। আবার এটাও সে জানে, এতদিন মিরাকে ইচ্ছে করেই আটকে রেখেছিল, তাই এখন যেতে না দেওয়াটাও অনুচিত হবে। মন খারাপ হলেও মুখে সে কঠিন রেখাটুকু টেনে রেখেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে মিরা হাসতে হাসতে কারানের বাহু জড়িয়ে ধরল।
“কারান, কিছু টাকা ধার দাও।”
এই হঠাৎ আবদারে কারান ভ্রূ কুঁচকে তার দিকে তাকাল। কণ্ঠে খানিকটা বিস্ময় ঢেলে আওড়ালো, “ধার? মানে পরে ব্যাক দেবে?”
মিরা মাথা নেড়ে বলল, “হুম্।”
কারানের কৌতূহল এবার আর চাপা রইল না। সে ম্যাকবুক বন্ধ করে পাশে সরিয়ে রাখল। মিরাকে টেনে নিজের কোলের মধ্যে বসাল। তার কপালের সামনে নেমে আসা ছোট ছোট চুলগুলো আঙুল দিয়ে সরিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করল, “কীভাবে দেবে?”
“সে আমি মাটি কাটার কাজ করে হলেও দিয়ে দেব। তুমি আগে দাও।”
কারান না চাইতেও এবার ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি এসে গেল।
“সিইও কারান চৌধুরীর স্ত্রী মাটি কাটবে! ব্যাপারটা কিন্তু দারুণ ইন্টারেস্টিং লাগবে।”
মিরা বিরক্ত হয়ে মুখ বাঁকাল।
“মজা করো না তো। প্লিজ, দাও।”
“কত?”
“ত্রিশ হাজার হলেই হবে।”
কারান চোখ বড়ো করে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, “ত্রিশ হাজাআর? এত টাকা আমি কোথায় পাব, জান?”
“কারান, ঢং করো না তো।”
মিরা এবার স্বরটা নরম করল, “মাহিকে অনেকদিন ধরে একটা ফোন দেওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু টাকায় হয়নি, তাই দিতেও পারিনি।”
কারান চোখ সরু করে তাকাল।
“কারণ জানতে চাইনি আমি। কিন্তু এটা আমাকে আগে বললে কী ক্ষতি হতো?”
“কেন? তোমার টাকায় কেন আমার বোনকে গিফট দেব?”
কারানের ঠোঁটের কোণে একচিলতে বিদ্রুপের হাসি খেলল।
“তার মানে আমার টাকা আর তোমার টাকা আলাদা?”
“আলাদাই তো।”
কারান সামান্য মাথা ঝাঁকাল, “হুম… ঠিক। তোমার টাকা, তোমার টাকা। আর আমার টাকা, মিসেস মিরা চৌধুরীর টাকা।”
একটু থেমে ঠোঁট বাঁকিয়ে যোগ করল, “বউ, মাঝে মাঝে আমাকেও কিছু ধার দিয়ো।”
মিরা চোখ উলটে বিরক্তির নিশ্বাস ছাড়ল।
“শুরু হয়ে গেল! থাক, লাগবে না।”
এই বলে সে জোর করেই কারানের কোল থেকে উঠে যেতে চাইলে কারান হঠাৎ তার হাত টেনে ধরল। সেও বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মিরার হাতের মুঠোয় প্ল্যাটিনাম ক্রেডিট কার্ডটা গুঁজে দিল। তারপর একেবারে কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, “এতে কিন্তু খুব বেশি টাকা নেই।”
মিরা হেসে পা উঁচু করে কারানের গালে আলতো চুমু বসাল। কিন্তু এতে কারান সন্তুষ্ট হলো না। সে ঠোঁটের দিকে তর্জনী তুলে নিঃশব্দে ইশারা করল।
মিরা তার ইচ্ছেটা বুঝে প্ল্যাটিনাম ক্রেডিট কার্ডটা টেবিলের উপর রেখে দিল। তারপর পা উঁচিয়ে কারানের অধরে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিতে যেতেই, কারান হঠাৎ তার পিঠে ধাক্কা দিয়ে তাকে নিজের শক্ত বুকে চেপে ধরল। পরমুহূর্তেই তার ঠোঁট মিরার ঠোঁটকে আঁকড়ে ধরল।
মিরা প্রথমে হেসে তার সাথে তাল মেলাল, কিন্তু কারানের চুম্বনের গতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠল। সেই আদরে ছিল হিংস্র অধিকারবোধ। মনে হচ্ছে, বহুদিন জমে থাকা ক্ষুধা উজাড় করে দিতে চায় সে। আস্তে আস্তে দুজনের নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। শরীরে উত্তপ্ততা বেড়েই চলেছে।
কারান মিরার কোমরের নীচের অংশ শক্ত করে আঁকড়ে ধরে তাকে একটু উপরে তুলে নিল। এবার চুম্বনের গতির তীক্ষ্ণতা বাড়লো। মিরার ছোট্ট শরীরটা তার বাহুতে আরও সংকুচিত হয়ে এলো। আদরের তীব্রতায় মিরার নিশ্বাস এলোমেলো হয়ে গেল। সে অজান্তেই ঢোক গিলল।
সে জানে, কারান যখন আবেগে ডুবে যায়, তখন নিজেকে সামলাতে পারে না। রাগ আর ভালোবাসা মিলেমিশে তার ঠোঁটকে বেপরোয়া করে তোলে। আজ এই হঠাৎ রূপান্তরের কারণ সে জানে না, শুধু অনুভব করছে—এই মুহূর্তে কারান ভয়ংকরভাবে আবেগি।
কারান তাকে নিয়েই বিছানায় শুয়ে পড়ল। চুম্বনের গতি আরও বেড়ে গেল, এতটাই যে মিরা আর তাল রাখতে পারল না। তার দম আটকে আসছে। কারানের হাত এলোমেলোভাবে তার শরীরজুড়ে ঘুরছে, আর ঠোঁট থামার কোনো নাম নেই।
মিরা এবার সত্যিই দিশেহারা। সে কারানের বুকে ধাক্কা দিতে যাবে, ঠিক তার আগমুহূর্তে কারান হঠাৎ ঠোঁট ছাড়ল।
অদ্ভুতভাবে কারানের নিশ্বাস তখনও প্রায় নিয়ন্ত্রিত, শুধু সামান্য দ্রুতভাবে পড়ছে। অথচ মিরার অবস্থা সম্পূর্ণ উলটো। তার নিশ্বাস ভেঙে ভেঙে আসছে, বুকটা ওঠানামা করছে অস্বাভাবিকভাবে। সে কাশতে শুরু করল। ঠোঁট লাল হয়ে ফুলে উঠেছে, চোখে পানি জমে গেছে।
এই অবস্থা দেখে কারান পাশের টেবিল থেকে পানির গ্লাস তুলে দিল। মিরা দ্রুত উঠে বসে পানি খেয়ে নিল। তবু নিশ্বাস স্বাভাবিক হতে চায় না। চোখ দুটো লাল হয়ে জ্বলছে।
কারান তাকে শান্ত করতে পিঠে হাত রাখতেই মিরা এক ঝটকায় তার হাত সরিয়ে দিল। কণ্ঠে জমে থাকা ক্ষোভ আর ভয় একসাথে ফেটে বেরোল, “সাইকোর মতো আচরণ কেন করো তুমি?”
মিরা আবার দ্রুত নিশ্বাস ফেলতে থাকল। বুকের ওঠানামা ক্রমেই অনিয়মিত হয়ে উঠছে। কারান নির্বিকার দৃষ্টিতে সেই ওঠানামার দিকেই তাকিয়ে রইল; কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই। সেই নীরব দৃষ্টি মিরার গায়ে কাঁটা বিঁধে দিল।
মিরা হঠাৎ তার বুকে ধাক্কা দিয়ে কটমট করে বলল, “কোথায় তাকিয়ে আছো? এমন অদ্ভুত কেন তুমি? সমস্যা কী তোমার?”
কারান কোনো উত্তর দিল না। যেন প্রশ্নটা তার কানে পৌঁছায়ইনি। সে উঠে যেতে চাইলে মিরা আচমকা তার হাত ধরে টান দিল। ভারসাম্য হারিয়ে কারান আবার তার উপরই পড়ে গেল। আশ্চর্যজনকভাবে এতে কারানের চোখে তৃপ্তির ঝিলিক ফুটে উঠল।
ঠোঁট বেঁকিয়ে সে বাঁকা হাসল। হাসিটা আদরের নয়, বরং বিপজ্জনক রকমের অস্বস্তির। মিরার গলায় মুখ ডুবাতে যেতেই মিরা চেঁচিয়ে উঠল, “এই কারান! আমি তোমার সাথে কথা বলছি। আমার প্রশ্নের উত্তর দাও। কেন? কেন এমন করো তুমি?”
“কারণ আমি এরকমই।”
কারানের কণ্ঠ অবিশ্বাস্য রকম শান্ত।
এই অতি স্বাভাবিক উত্তরেই মিরার রাগ দ্বিগুণ হয়ে গেল। সে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, “আমি কাল সকালেই বাবার বাড়ি চলে যাব। তাও কয়েক সপ্তাহের জন্য। থাকো তুমি একা একা।”
কারান ঠোঁট উলটিয়ে হালকা হাসল। চোখে কোনো উদ্বেগ ছাড়াই কৌতূহলী কণ্ঠে শুধালো, “তাই? তুমি থাকতে পারবে আমাকে ছাড়া?”
মিরা একদম তার ঠোঁটের কাছে এগিয়ে এলো। চোখ কঠিন করে, দৃঢ় কণ্ঠে আওড়ালো, “তুমি কি মনে করো, আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না?”
কিন্তু মিরার এই দৃঢ় মুখশ্রী দেখেও কারানের চোখে উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ল। সে মোলায়েমভাবে মিরার গালের সাথে নিজের গাল ছুঁইয়ে দিল। চোখ বন্ধ করে নেশাগ্রস্ত স্বরে বলল, “তোমাকে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে, সুইটহার্ট। একটু খাই?”
মিরার চোখ ছলছল করে উঠল। সে তড়িঘড়ি করে নিজের গাল সরিয়ে নিল। কারানের গালে এক হাত রেখে প্রায় মিনতির সুরে বলল, “তুমি কেন আমাকে বোঝো না, কারান? কেন নরমাল ব্যবহার করো না? তোমার এই রুড বিহেভিয়ার দেখে মাঝে মাঝে আমার খুব ভয় লাগে। একটু শান্ত হও। আমার ভয় হয়, কারান।”
তার কণ্ঠে আকুতি স্পষ্ট, চোখে সাহায্যের আবেদন। কিন্তু মিরার এত আবেগঘন কথার পরেও কারানের মুখমণ্ডলে কোনো পরিবর্তন এলো না। সে কথার ভাবার্থ বুঝল কিনা, তা বোঝারও কোনো উপায় নেই।
কারান খুব ধীরে, যত্নের ভান করে মিরার ঘাড়ে হাত রাখল। আঙুলের অল্প চাপ দিল। একটা শান্ত বাক্যের আশায়, একটা আশ্বাসের অপেক্ষায় মিরা তখনো ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
হঠাৎই কারানের মুখরেখাসমূহ কঠোরতায় জমে উঠল। তার দৃষ্টিযুগল হয়ে উঠল নিষ্প্রাণ ও শীতল। সেই চোখে না ছিল ক্রোধের উত্তাপ, না ছিল স্নেহের কোনো আভাস।
মিরার অন্তঃস্থল অজান্তেই কেঁপে উঠল। অথচ কারানের মুখাবয়ব সম্পূর্ণ নির্বিকার। কিন্তু সেই শান্ত অবয়বের অন্তরালে যে তার চেতনা আজ সংযম হারিয়েছে, তা প্রকাশ পাচ্ছিল দৃষ্টির গভীরে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা অদম্য অগ্নিশিখায়।
মিরা কিছু বলতে উদ্যত হতেই, তার পূর্বেই কারান আকস্মিক ঝড়ের বেগে তাকে শয্যার ওপর নিক্ষেপ করল। ভারসাম্যহীন হয়ে মিরা বিছানার মধ্যভাগে গড়িয়ে পড়ল। এক নিমেষেই চারপাশের বাস্তবতা রূপান্তরিত হয়ে গেল।
তার বক্ষপিঞ্জর ধরাস করে উঠল। এলোমেলো কেশরাশি চোখমুখ, গলা আচ্ছন্ন করল। শ্বাসপ্রশ্বাস যেন কণ্ঠদেশে রুদ্ধ হয়ে এলো। নিজের উদরের ওপর কারানের উত্তপ্ত ও ভারী দেহের উপস্থিতি তীক্ষ্ণভাবে অনুভব করল, যদিও সে কিঞ্চিৎ ভার সমর্পণ করেছে, যেন মিরা ব্যথা না পায়।
পার্শ্বস্থিত তুলোর মতো কোমল বালিশটি নিয়ে সে নির্মমভাবে মিরার মুখাবয়ব চেপে ধরল। আতঙ্ক ও বিস্ময়ে বিস্ফোরিত মিরার দৃষ্টিযুগল বালিশের কোণ ঘেঁষে স্পষ্ট দৃশ্যমান রইল। কারানের প্রশস্ত বক্ষদেশের ওঠানামা প্রত্যক্ষ করে মিরা ভিতরে ভিতরে শিউরে উঠলো।
কারান ধীরে ধীরে ঝুঁকে এলো। তার নিশ্বাসের উষ্ণতা মিরার ত্বকে অস্বস্তিকর লাগল। সাপের ন্যায় ফোঁস ফোঁস করতে করতে কটমট করে বলল, “কেন বললে আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে? থাকতে পারবে আমাকে ছাড়া, সুইটহার্ট?”
মিরার শরীর কেঁপে উঠল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু কণ্ঠস্বর বেরোল না। কারান আরও কাছে এলো। এতটাই যে তার উপস্থিতি শ্বাস নেওয়াকেও কঠিন করে তুলল।
“পারবে, মিরা?”
কণ্ঠটা এবার আরও নিচু, আরও ঠান্ডা করল, “এই মিরা… পারবে তুমি আমাকে ছাড়া নিশ্বাস নিতে?”
এদিকে মিরার নিশ্বাস আটকে আসছে। মিরা হাত ছুঁড়ে মুখের বালিশ সরানোর জন্য ছটফট করছে। শরীরের প্রতিটি কোষ যেন বাঁচার জন্য চিৎকার করছে। কারানকে অপ্রকৃতস্থের মতো লাগছে। স্বাভাবিক সময়ে কারানের এই আকর্ষণীয়, সম্মোহনী উপস্থিতি দেখলে মিরা নিঃসন্দেহে তার মুখে চুম্বনের বৃষ্টি নামাত। কিন্তু এই মুহূর্তে তার হৃদয়জুড়ে শুধুই শঙ্কা কাজ করছে।
কারান যেই দেখল মিরার চোখের রং পরিবর্তন হয়ে আসছে, চোখ উলটে যাবে, তৎক্ষণাৎ বালিশটা সরিয়ে নিল। সেও সরে এলো মিরার উপর থেকে। মিরা দম ফিরে পেয়ে দ্রুত উঠে বসল। গভীর গভীর কতগুলো দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ল। কান্না আর থামছে না। চোখ থেকে অঝোরে পানি ঝরছে, শরীর কাঁপছে অনিয়ন্ত্রিতভাবে। সেই অবস্থাতেই কারান একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। অথচ তার ভিতরে কোনো অপরাধবোধ কাজ করছে না।
কান্নার আবেশের মাঝেও মিরাকে কারানের চোখে অপার সুন্দর মনে হচ্ছিল। ফরসা মুখাবয়বে লাজের আভা লেগে আছে, বিশেষ করে নাকের ডগাটা হয়ে উঠেছে কোমল লাল। সেই দৃশ্য কারানের অন্তরে এক ক্ষণিক দুর্বলতার জন্ম দিল; ইচ্ছে হলো নাকের ডগাটা আলতো করে টেনে দিতে। যদিও এ মুহূর্ত তার জন্য উপযুক্ত নয়। তবু আত্মসংযম ভেঙে গিয়ে সে মিরার সেই লাল হয়ে ওঠা নাকের ডগায় এক মৃদু চুম্বন এঁকে দিল। এরপর হালকা হেসে মিরাকে নিজের বুকে টেনে নিল। স্পর্শটা এবার নরম। মিরা শ্বাসকষ্টের মধ্যে তার বুকেই ভেঙে পড়ল।
কারান মিরার চুলে আলতো চুমু খেল। কণ্ঠে মমতা মিশিয়ে বলল, “তুমি এখনো আমার সাথে থাকার জন্য উপযুক্ত হওনি। তোমাকে আরো স্ট্রং হতে হবে। এতটুকুতেই এই অবস্থা হলে চলবে, স্টারলিং?”
তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, “লাভ ইউ, মেরি জান। শান্ত হও। কিছুই হয়নি।”
মিরাকে হঠাৎ করেই জাপটে ধরল কারান। এবার আর সেই আলিঙ্গনে কোনো উষ্ণতা ছিল না, ছিল নিষ্ঠুর দখলদারিত্ব। এতক্ষণ যে বুকটাকে মিরা আশ্রয় ভেবেছিল, মুহূর্তের মধ্যেই সেটাই তার কাছে অচেনা কারাগার হয়ে উঠল। কারানের বাহু শক্ত হতে হতে এমন এক চাপ তৈরি করল, যেখানে নিশ্বাস নেওয়ার জায়গাটুকুও ক্রমে সংকুচিত হয়ে এলো।
মিরার ভেতরটা হঠাৎ করে শীতল আতঙ্কে জমে গেল। এই মানুষটাকে আর মানুষ মনে হলো না, একটা ভয়ানক মন্সটার মনে হলো। সে আবার ছটফট করে উঠল, বুক ঠেলে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগল।
কিন্তু কারান ইতোমধ্যেই সব অনুধাবন করে ফেলেছিল। সে আরও দৃঢ়তর করে তাকে আবদ্ধ করল। এমন নিঃশর্ত চাপে, যেন দুটি দেহ পৃথক সত্তা হারিয়ে একাকার হয়ে যায়।
মিরার শ্বাসপ্রশ্বাস ক্রমে ভারাক্রান্ত হতে লাগল; বক্ষগহ্বরে বাতাস আবদ্ধ হয়ে মাথার ভেতর ঝিমুনিভাব ছড়িয়ে পড়ল। আশঙ্কা এবার নিছক ভয় অতিক্রম করে পরিণত হলো বিশুদ্ধ আতঙ্কে।
তার মনে হতে লাগল, কারানের নিশ্বাসরুদ্ধকারী চাপে সে বুঝি পিষ্ট হয়ে যাবে; তার অক্সিজেন প্রয়োজন। শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত কক্ষ হওয়া সত্ত্বেও উভয় দেহ থেকেই ঘাম নিঃসৃত হচ্ছিল।
ঝাপসা হয়ে আসা দৃষ্টির মধ্যেও মিরা লক্ষ্য করল, কারানের কণ্ঠদেশে খোলা শার্টের বোতামের ফাঁক গলে বিন্দু বিন্দু ঘামের চিহ্ন চিকচিক করে উঠছে। তার চেতনা ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে আসছিল।
মুখ খোলার জন্য অনেকটা চেষ্টা করে, অবশেষে কাঁপা কাঁপা গলায় মিরা বলল, “কা…কারান, ছা…ছাড়ো। আমার… আমার দম আটকে আসছে।”
কারান তার উন্মুক্ত কাঁধে নাক ঘষলো। কানের কাছে মুখ নামিয়ে নিচু, শীতল কণ্ঠে বলল, “কীসের ছাড়াছাড়ি? আর কখনো যদি শুনি আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাও, মে’রে ফেলব তোমাকে। বুঝেছ, জান? একদম মে’রে ফেলব।”
ফিসফিসে, ভয়ানক কথাগুলো শুনে মিরা কেঁপে উঠল, যদিও কারানের কথাও এখন কানে তেমনভাবে ঢুকছিল না। তার শরীর অবশ হয়ে আসছিল, অথচ ভেতরটা চিৎকার করে উঠছিল পালাতে। সে দুর্বল হাতে আবার কারানের বুক ঠেলতে লাগল, কিন্তু সেই স্পর্শেই যেন কারানের নিয়ন্ত্রণ আরও গাঢ় হয়ে উঠল।
চোখ বন্ধ করে অসহায় স্বরে মিরা বলল, “কারান… প্লিজ। আমি পারছি না। তোমার এই রূপটা…”
কথাগুলো কর্ণগোচর করে সহসা মিরার কানের লতি দুই ঠোঁটের মাঝে আঁকড়ে ধরল কারান, চুম্বনের মাত্রা এমনভাবে বাড়িয়ে তুলল যেন খেয়ে ফেলবে। ওই অংশটা রক্তিম হয়ে গেল। মিরা কেঁপে কেঁপে উঠল। অথচ ইতোমধ্যেই সে নেতিয়ে পড়েছে কারানের আবেদনে।
চোখ বন্ধ করে মিরা কেঁপে কেঁপে বলল, “কারান, কার…কারান, প্লিজ আমার কথা শোনো। আমি তোমার এই হিংস্রতা নিতে… নিতে পারছি না।”
কারান মিরার কানের লতি কামড়ে ধরে বলল, “চুপ। একদম চুপ।”
তার কণ্ঠের তীব্রতা মিরার হৃদয়ে ঝড় তুলল। মিরার কোমর ধরে আরো কাছে টেনে আনলো। কারান তর্জনী ও মধ্যমা আঙুলের ভাঁজে মিরার ঠোঁট আবদ্ধ ধরে সম্মোহনী চোখে তাকিয়ে হাস্কি কণ্ঠে বলল, “You’re not sleeping tonight, baby, not until I’ve explored every inch of you. I won’t ask twice. Just lie back and let me worship you the way you deserve.”
মিরা কারানের নেশান্বিত, ব্যাধিগ্রস্ত চেহারা দেখে আঁতকে উঠল। ইচ্ছে হলো কারানের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়ার। কিন্তু হঠাৎই কারানের উন্মত্ততা তার কাছে আকর্ষণীয় মনে হলো। মিরা নিজের অজান্তেই তার শরীরকে কারানের কাছে প্রেরণ করার জন্য আকুল হয়ে উঠলো। কারানের নেশালো চাহনি যেন মনের গভীরতম অংশকে ম্যানিপুলেট করে ফেলেছে।
অনিচ্ছাকৃতভাবেই মিরার আঙুল কারানের শার্টের বোতামে গিয়ে ঠেকলো। মুহূর্তের ভেতরেই সে স্বামীর সেই মাদকতাময় দৃষ্টির সঙ্গে নিজের চোখ মিলিয়ে নিল। তারপর ধীর গতিতে একে একে বোতামগুলোর বন্ধন খুলে দিতে লাগল।
কারানের সুঠাম দেহ ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হলো; ঘামের হালকা চকচকে ভাঁজগুলো আলোয় ঝিলমিল করে উঠল। মিরা দৃষ্টি সরাতে পারল না। গলা শুকিয়ে এলো, অজান্তেই ঢোক গিলল। কোমল আঙুলে আলতো করে উদরের স্পষ্ট রেখাগুলোয় ছুঁয়ে দিল। সেই ক্ষণিক স্পর্শেই কারানের নিশ্বাস হঠাৎ আটকে গেল। জিভ দিয়ে অধর ভিজিয়ে নিল। চোখ খিঁচে বন্ধ করে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ভেতরের পশুত্বটাকে সংযত করার প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল, হাত মুষ্টিবদ্ধ করল; যেন মালদ্বীপের সেই প্রথম রাতের মতো মিরাকে পুনরায় আঘাত না করে বসে। কিন্তু বুকের ভেতর জমে থাকা উত্তাপ যে শিরা-উপশিরায় ছুটোছুটি করছে, তবুও সে নিজেকে থামিয়ে রাখল।
কিন্তু সেই নিয়ন্ত্রণ বেশিক্ষণ টিকল না। একটু পরেই মুঠো করা হাত শিথিল হয়ে এলো। কারান চোখ খুলে তাকিয়ে রইল মিরার উত্তেজনায় লাজুক হয়ে ওঠা মুখাবয়বের দিকে। তার স্বামী যেন স্বাভাবিকের চেয়েও অতিরিক্ত সুন্দর। পুরো শরীরজুড়ে নেশা ছড়িয়ে আছে, যাকে চাইলেও দূরে সরিয়ে দেওয়া অসম্ভব। গ্রীক দেবতার মতো নিখুঁত গড়ন, প্রতিটি রেখা এত হিসেবি, এত অবধারিত কেন কারানের দেহে—এই প্রশ্নটাই মিরার মনে ঘুরপাক খেতে লাগল।
মিরার চোখে ধীরে ধীরে ভেসে উঠল দমিত কামুকতা। কিন্তু কারানের চোখে তা আরও গভীর, আরও অনিবার্য। নিশ্বাসের গতিও তার নিয়ন্ত্রণ ছাড়িয়ে বেগ পেতে শুরু করল, এমনকি মিরার চেয়েও বেশি। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল, এই মুহূর্তে কারান ঠিক কতটা নিখুঁতভাবে মিরার অনুভূতিগুলোকে নিজের মুঠোয় নিয়ন্ত্রণ করে নিয়েছে।
কারান অস্বাভাবিক, রহস্যময় হাসি হেসে বলল, “দু-দিন উপোস থাকার জন্য আজ রাতে সব উসুল করতে হবে।”
এই কথা বলেই সে মিরার কণ্ঠদেশে কামড় বসাল। ব্লাউজের নীচ দিয়ে হাত সঞ্চালিত করে সে মিরার গলাকে হালকাভাবে আবদ্ধ করল।
Tell me who I am 2 part 10
মিরার এক হাত কারানের কেশরাশি কচলাতে লাগল, অপর হাত তার পৃষ্ঠদেশে ধীরে ধীরে বিচরণ করতে লাগল। তার পদযুগল কারানের পায়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ল অজান্তেই।
কারান পাগলের ন্যায় মিরার গাল, কণ্ঠ ও কাঁধের প্রতিটি অংশে ঠোঁটের কোমল চাপ অর্পণ করতে লাগল। একসময় দুজনেই একসঙ্গে শয্যায় শুয়ে পড়ল।
