Tell me who I am 2 part 2
আয়সা ইসলাম মনি
নিচে নেমে কারান অনায়াস ভঙ্গিতে চুলের গোছা একত্রিত করে নিপুণ হাতে রাবার ব্যান্ডে বেঁধে ফেলল। রান্নাঘরে প্রবেশ করেই সে অ্যাপ্রোন গায়ে চড়িয়ে কয়েকটি সতেজ সবজি বাছাই করল। ঠান্ডা পানির স্রোতে সেগুলো ধুয়ে নিল। তারপর ছুরির ধার ঘষে নিয়ে চৌকস ও অভ্যস্ত হাতে নিপুণভাবে কাটতে শুরু করল।
ঠিক তখনই এ্যারোন তার পাশে এসে স্থির দাঁড়াল। যান্ত্রিক কণ্ঠে উচ্চারণ করল, “হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ, একে?”
কারান সামান্য মুখ তুলল, “তুমি মিরার কাছে যাও। ওর সাথে কিছুক্ষণ গল্প করো।”
এমনটা বলে সে আবার কাজে মনোনিবেশ করল।
রোবটটি বাক্যবিনিময়ের প্রয়োজনবোধ না করেই নির্দেশ পালন করল। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। মিরার কক্ষের দরজা অতিক্রম করতেই দেখল, সে কপালে হাত রেখে শুয়ে আছে।
তখন সমগ্র ঘর অনির্বচনীয় নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। জানালার ফাঁক গলে আসা ক্ষীণ আলো বিছানার চাদরে ছড়িয়ে পড়ছে। বাতাসে জানালার পর্দাগুলো পতপত করে দোল খাচ্ছিল। তবে মিরার দৃষ্টি সেখানে স্থির নয়, তার চেতনাবিন্দু অনির্দেশ্য শূন্যতায় নিমগ্ন। অ্যারোন কিছুক্ষণ নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইল, যেন তার অনস্তিত্বের মধ্য দিয়ে মিরার চিন্তাস্রোতে কোনো বিঘ্ন না ঘটে।
যান্ত্রিক হলেও অ্যারোনের অভ্যন্তরে শীতল বুদ্ধিমত্তা প্রোথিত। সে মানুষের মুখাবয়বের সূক্ষ্ম পরিবর্তন থেকে অনুভূতির স্পন্দন শনাক্ত করতে সক্ষম। হয়ত এই কারণেই কারান তাকে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছে।
কারানের আদেশ ছিল মিরার সাথে সংলাপের সূচনা করা। সে অনুসারে অ্যারোন এবার স্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করল, “হ্যালো, হ্যালো।”
চেনা স্বর শুনে মিরা ধীরে ধীরে কপাল থেকে হাত সরিয়ে উঠে বসল। তার চোখে-মুখে অস্থিরতা আর সংশয়ের রেখা স্পষ্ট বোঝা গেল। কোনো এক গভীর ভাবনা তার মনের অলিগলিতে নির্বিচারে হেঁটে বেড়াচ্ছে, আর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা হয়ে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে তাকে। বলা বাহুল্য, সেই চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু কারান। মানুষটাকে সে চেনে, অথচ কখনো কখনো মনে হয়, সে এক ধাঁধার মতো—পরিচিত হয়েও অচেনা। কেন এমন মনে হয়? নিশ্চয়ই কারণ আছে। কারানকে ঘিরে অসংখ্য প্রশ্নের জাল ছড়িয়ে আছে, যার উত্তর সে জানে না। কিংবা হয়ত সে জানে, কিন্তু বিশ্বাস করতে চায় না।
মিরা এক মুহূর্ত আনমনে এ্যারোনের দিকে তাকিয়ে থাকল। তার যান্ত্রিক অবয়বে কোনো অভিব্যক্তি নেই। তবু মনে হয় সে যেন বোঝে; বোঝে মিরার দোলাচল, বোঝে সেই সমস্ত না বলা প্রশ্ন।
একটু সময় নিল মিরা। বিভ্রান্তির চাদর সরিয়ে ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটিয়ে বলল, “হাই।”
এ্যারোন প্রশ্ন করল, “হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ, মিসেস কারান চৌধুরি?”
‘মিসেস কারান চৌধুরি!’ শব্দ তিনটি মিরার কানে বাজতেই ঠোঁটের কোণে একফালি লজ্জা মেশানো হাসি খেলে গেল। সারাদিন-রাত তো সে এই মানুষটাকে নিয়েই ভাবে, তার প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গেই কারান জড়িয়ে থাকে। কিন্তু যখন অন্য কারও মুখে নিজের পরিচয় এভাবে ধ্বনিত হয়, অনুভূতিটা একটু অন্যরকমই হয়। যেন অনামিকা প্রশান্তি এসে বুকে ঠাঁই নেয়। সে কয়েক মুহূর্ত রোবটটির দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল। এ্যারোনের চোখ ধাতব। কিন্তু সেখানে কি বুঝতে পারার ক্ষমতা রয়েছে?
মিরা নরম স্বরে বলল, “তুমি বাংলা বুঝো?”
“ইয়েস।”
মিরা বুঝল, রোবটটি অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তির ফল। এটি আমেরিকায় নির্মিত, স্বাভাবিকভাবেই বাংলা বোঝার কথা নয়—তবুও বোঝে! নিশ্চয়ই এর আবিষ্কারকের কোনো না কোনোভাবে বাঙালিদের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে, নতুবা বাংলা ভাষার ফাংশন এতে সংযোজন করার প্রয়োজনই বা কেন হতো?
হঠাৎই মিরার ভ্রূ কুঁচকে উঠল। রোবটটি বাংলা বোঝে, তবে কি এটা কারানের সৃষ্টি? হতেও তো পারে। কারণ সে তো কারান সম্পর্কে তেমন কিছুই জানে না। মাঝে মাঝেই এমন উদ্ভট চিন্তা তার মনে উঁকি দেয়। কিন্তু এত বিশ্লেষণের প্রয়োজন কী? সরাসরিই না হয় রোবটটিকে জিজ্ঞেস করা যাক! তবে আগে একে খানিকটা যাচাই করে নেওয়া দরকার।
একটু থেমে মিরা প্রশ্ন করল, “তুমি এখানে কত বছর ধরে আছো?”
“ফাইভ ইয়ার্স।”
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এবার তাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি করতেই হবে, নাহলে মনের অস্থিরতা কমবে না। গভীর মনোযোগে কিছুক্ষণ ভাবল সে। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “তোমার ক্রিয়েটর কে?”
“সাইন্টিস্ট এমেকা ওকনকো।”
নামটি শুনে মিরার কপালের মাঝখানে কয়েকটি সূক্ষ্ম ভাঁজ ফুটে উঠল। এমন নাম তো সে কখনো কারানের মুখে শোনেনি! মুহূর্তেই তার মনে সন্দেহের কুয়াশা ঘনীভূত হয়ে উঠল।
“ইনি কে?”
“একের ফ্রেন্ড।”
মিরা কিছুক্ষণ চুপচাপ রইল। অদৃশ্য কোনো জট একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করছিল। কারানের বন্ধু! নিশ্চয়ই সে আমেরিকান, তাই তো কারান তার কথা বলেনি। কিন্তু ফারহানের কথা তো বলেছে, এমেকার কথা কেন নয়? এর পেছনে কোনো বিশেষ কারণ লুকিয়ে নেই তো?
মিরা হঠাৎই অজানা তাগিদে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “কারান কে?”
রোবটটি নিশ্চুপ রইল। মিরা সামান্য ঝুঁকে এলো, কৌতূহলভরা কণ্ঠে আবার জিজ্ঞেস করল, “কারান কে, এ্যারোন?”
তবুও কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। মিরা ধীরে ধীরে সোজা হয়ে বসল। বুঝতে পারল, যন্ত্রটির প্রোগ্রামে হয়ত সে উত্তর নেই, যা তার মনে জমে থাকা প্রশ্নের জট খুলতে পারে।
এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল, “আমি কি কারানকে নিয়ে অযথাই বেশি ভাবছি?”
অন্যদিকে কারান ইতোমধ্যেই রান্নার আয়োজন করে ফেলেছে। গ্যাসের চুলায় তেল গরম হতে না হতেই রসুন-পেঁয়াজের খটখটে শব্দ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। কারান দ্রুত ও নিখুঁত হাতে মাংসের টুকরোগুলো মশলার সাথে নেড়েচেড়ে নিয়ে ধীরে ধীরে স্টকে ঢেলে দিল। ফুটন্ত ঝোলের মসলাদার সুগন্ধ ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল। সে আঙুলের ডগায় সামান্য তুলে নিয়ে মুখে পুরে স্বাদ পরখ করল। এমন সময় ফারহানের কল এলো। কারান হাত ধুয়ে ডাইনিংয়ের দিকে এগিয়ে ফোনটি কানে তুলল।
ওপাশ থেকে ফারহানের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ ভেসে এলো, “ভাই, তুই কি আমার কথা সিরিয়াসলি নিচ্ছিস না?”
কারান নির্লিপ্ত গলায় বলল, “কোন কথা?”
“তুই আমেরিকা ছেড়ে দুবাই চলে আয়। আমার ভয় হচ্ছে, ইয়ার।”
কারান ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসল।
“তুই আমাকে নিয়ে আমার বউয়ের চেয়েও বেশি টেনশন করিস। এত চিন্তা করিস না, আমি ঠিক আছি।”
“তোর বউয়ের থেকেও আমি তোকে বেশি চিনি। আমাদের ১৯ বছরের বন্ধুত্ব। আর তোকে ছাড়া এসব সম্ভব না। তুই ফিরে আয়।”
কারান গম্ভীর মুখে বলল, “আসবো। এমেকা কিছু জানিয়েছে?”
“হ্যাঁ, এমেকা খুলিগুলো পরীক্ষা করেছে। রাসায়নিক বিশ্লেষণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রথমত, এগুলোর বয়স আনুমানিক ৫ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে হতে পারে, কারণ হাড়ের বৃদ্ধির হার এবং দাঁতের বিকাশ দেখে এটা অনুমান করা হয়েছে। এমনকি হাড়ের অম্লতা ও প্রোটিনের অবস্থা বিশ্লেষণ করে বোঝা গেছে, এই শিশুদের মৃত্যু অনেক দিন আগেই হয়েছে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খুলির মধ্যে ক্ষতিকারক কীটনাশক বা স্নায়ুবিষের চিহ্নও পাওয়া গেছে, যা নিশ্চিত করে যে, এগুলো সংগ্রহ করার পেছনে কোনো সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য আছে—অঙ্গপাচার কিংবা অন্য কোনো ভয়ংকর চক্রান্ত হতে পারে।”
কারান নীরবে শ্রবণ করছিল, তবে নিষ্ক্রিয় ছিল না। শুনতে শুনতেই সুচারুভাবে খাবার পরিবেশন করছিল। সময় অপচয় তার স্বভাবে নেই; দু-তিনটি কাজ একসঙ্গে সামলানো তার জন্য সাধারণ ব্যাপার। ডায়নিং টেবিলে একের পর এক ব্যঞ্জনের বাটি সুচারুভাবে সাজিয়ে রেখে গভীর কণ্ঠে বলল, “আয়লা কোথায়?”
“শি ইজ আ জিনিয়াস গার্ল, ব্রো। ও জেহেরকে ম্যানিপুলেট করে গোপন তথ্য বের করেছে। আর মেইন কালপ্রিট জেহেরই। এতদিন আমরা ভুল পথে ছুটছিলাম। জেহের তার অঙ্গ পাচারের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের লোকজনকে ব্ল্যাকমেইল করছে। তারও একটা গোপন চুক্তি রয়েছে। সে নারীদের পাচারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যদি জেহের এক্সপোজ হয়, তাহলে পুরো চক্রটাই ভেঙে পড়বে।”
কারান ঠোঁটের কোণে শীতল হাসি ঝুলিয়ে বলল, “তাহলে তো আমার কিছুই করার দরকার নেই।”
“উফফ, তুই ছাড়া এটা সম্ভব নয়। আয়লা শুধু মূল অপরাধীকে শনাক্ত করেছে, কিন্তু পুরো খেলাটা এখনো বাকি।”
কারান কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর শান্ত স্বরে বলল, “ওকে, বাকিটা দেখছি। রাখছি।”
“ওকে, ওকে।”
ফোন কেটে দিয়ে কারান দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। সেখানে চিন্তার গভীরে নিমজ্জিত মিরা চুপচাপ বসে আছে। কারান এক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল, “বউ।”
মিরা কারানের কণ্ঠ শুনে পাশ ফিরে তাকাল।
“রান্না শেষ?”
“হুঁ। আমাদের শিগগিরই বাংলাদেশ ফিরতে হবে, বুঝেছ?”
মিরা মাথা ঝাঁকালো। কারান মিরার পাশে এসে বসল। মিরা তার দিকে এগিয়ে এসে তার চক্ষু পানে তাকিয়ে বলল, “তোমাকে আজ বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে, কারান।”
কারান দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল। হ্যাঁ, উদ্বেগ তাকে গ্রাস করছে। এখনো কত কাজ পড়ে আছে, অথচ মিরাকে তার একটুও বুঝতে দেওয়া চলে না। কিন্তু সমস্ত দুশ্চিন্তার মাঝেও একটা প্রধান ভাবনা তার বুকের গভীরে ধাক্কা দেয়, আর সেই ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু মিরা।
“আমি হারানোর ভয় পাই,” বলতে গিয়ে থেমে গেল কারান।
মিরা ধীরে ধীরে তার মুখের কাছে এগিয়ে এলো। তার নরম হাত কারানের বাম গালে রাখতেই উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল কারানের চামড়ার গভীরে। মিরা একটুখানি সামনে ঝুঁকল। আস্তে করে বলল, “কি হারানোর কথা বলছ?”
কারান তার গালে রাখা মিরার হাতটা আলতো করে সামনে এনে, আঙুলের ওপর এক আবেগময় চুম্বন এঁকে দিল।
মিরার অন্তর্গত অনুভূতির ঢেউ তীব্র হয়ে বুকের গভীরে আছড়ে পড়ছিল। কারানের প্রতিটি স্পর্শেই সে অদ্ভুতভাবে কেঁপে ওঠে। অজানা শিহরন শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে এই স্পর্শেই সমস্ত হতাশা, সমস্ত সংশয় বিলীন হয়ে যায়। মিরার ঠোঁটে সামান্য হাসির রেখা ফুটে উঠল, কিন্তু কারানের চোখে তখনো অস্থিরতা খেলছে। সে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। বলা-না বলা শত অনুভূতির ভারী ভারী শব্দগুলো আটকে আছে তার কণ্ঠনালিতে।
মিরা আরেকটু এগিয়ে এলো, তাদের ঠোঁটের মাঝে শুধু এক ইঞ্চির ক্ষীণ ব্যবধান। নিশ্বাসের উষ্ণতাও পরস্পরের ত্বক ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
কারান শীতল ও গভীর কণ্ঠে বলল, “তোমাকে।”
মিরা কোনো উত্তর দিল না, শুধু তার ঠোঁট কারানের ঠোঁটে নিবিড়ভাবে মিলিয়ে দিল। কারানের হাত ধীরে ধীরে মিরার ঘাড়ের পেছনে নেমে এলো। আঙুলগুলো চুলের নিচে নরম ত্বক স্পর্শ করতেই দুজনের মাঝখানে শিহরন খেলে গেল। সে মিরার ঘাড় আলতোভাবে আঁকড়ে ধরল। মৃদু টানে তাকে আরও কাছে টেনে নিল। দুজনের শ্বাসের দূরত্বও বিলীন হয়ে গেল। চুম্বনের গভীরতা অনুভব করতেই তাদের চোখ আপনা-আপনি বুজে এলো। তারা দুজন গভীর সেই মধুর স্বাদে ডুবে যেতে লাগল। না, কারান আজ আর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে না, প্রয়োজনও পড়ে না। তার মিরা যে নিজেই সমস্ত দ্বিধার বন্ধন ছিন্ন করে তাকে পূর্ণভাবে গ্রহণ করেছে। তার অস্তিত্বের সমস্ত দাবিই তো মিরা স্বেচ্ছায় পূরণ করে দিয়েছে।
সময়ের হিসেব হারিয়ে তারা সেই চুম্বনের সুরে বাঁধা পড়ল। উপরের ঠোঁট নিচের ঠোঁটের বেষ্টনীতে বারংবার মিলিয়ে যেতে লাগল। দীর্ঘ অনুরণন শেষে মিরা ঠোঁট সরিয়ে নিল। তার ঠোঁট তখন আবেশের গভীর লালিমায় রঞ্জিত।
কারান চোখ মেলে মিরার লজ্জাভরা মুখের দিকে তাকাল। এতবার তারা একে অপরকে পেয়েছে, তবুও এই মেয়েটার লজ্জা কমে না, বরং আরও বেশি মোহময় হয়ে ওঠে। অথচ সে নিজেই কারানের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকতে চায়। তার বাহুডোরে নিশ্চিন্ত আশ্রয় খুঁজে নিতে চায়। তবে সে তো মেয়ে, তার লজ্জার আভা ছাড়া সে অসম্পূর্ণ। কারানের গভীর দৃষ্টি মিরার শিরায় শিরায় আগুন জ্বেলে দিল। সে হঠাৎই কারানের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার গরম নিশ্বাস কারানের কানে এসে ছুঁয়ে গেল।
কারানের কানে কানে ফিসফিস করে বলল, “এই যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলাম, মৃত্যুর আগে আর ছাড়ছি না।”
কারান হাসল। এটাই তো তার চাওয়া—মিরাকে এভাবে কাছে পাওয়াই তো তার আকাঙ্ক্ষা। সে মিরাকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল, যেন কোনো শক্তিই তাদের আলাদা করতে না পারে। এখন থেকে তারা চিরন্তন বন্ধনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। একবার হাতের বাঁধন আলগা করলেই মিরা হয়ত হারিয়ে যাবে, তাই কারান আরও গভীর মমতায় আলিঙ্গন শক্ত করল।
তাদের বুক একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে মিশে আছে৷ কারানের গলা মিরার গলার সঙ্গে লেপ্টে আছে। কারানের ঠোঁট থেকে এক দীর্ঘ নিশ্বাস ঝরে পড়ল। তবে এ নিশ্বাস ক্লান্তির নয়, উদ্বেগের নয়, বরং গভীর প্রশান্তির। মিরাকে এতটা কাছে পাওয়ার, তার উষ্ণতা অনুভব করার, তাকে জড়িয়ে ধরে রাখার অতল স্বস্তির নিশ্বাস।
ক’দিন ধরেই ইলিজার মনে অস্থিরতা, সাথে হৃদয়ের গহীনে অমোচনীয় দ্বিধা চলছিল। কাব্যকে কি একবার ফোন করা উচিত? এই প্রশ্নের উত্তর সে পাচ্ছে না। অজানা অস্বস্তি, অনির্বচনীয় সংকোচ যেন তার আত্মাকে কোনো অদৃশ্য শিকলে বেঁধে রেখেছে।
মমতাজ রান্নাঘরে নিমগ্ন। আব্দুর রহমান সকালেই কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। মমতাজের ফোনটা ইলিজার কক্ষের বিছানার ওপর পড়ে আছে। বহুক্ষণ ধরে ফোনটার দিকে তাকিয়ে ছিল সে। আর বিছানায় বসে নিজেকে বুঝিয়ে যাচ্ছিল। যুক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে মনে সাহস সঞ্চারের চেষ্টা করছিল। শেষমেশ নিস্তরঙ্গ বিড়বিড়ানিতে নিজেই নিজেকে নিরস্ত করল, “ফোন দেওয়াটা বোধ হয় ঠিক হবে না।”
কিছুক্ষণ পরে দীর্ঘ এক নিশ্বাসে বুকটা হালকা করার ব্যর্থ প্রয়াসে সে ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। সামনের জানালাটা খোলা, সেখানে ভোরের হিমেল হাওয়া বইছে। অথচ সেই শীতল হাওয়া তার অব্যক্ত বাসনাগুলোকেও ধীরে ধীরে উসকে দিচ্ছে।
পুনরায় সে বিছানায় বসল, অন্যমনস্ক দৃষ্টিতে কয়েকবার তাকালো দরজার দিকে— মা আসছেন না তো? যদিও ভালোভাবেই জানত, মমতাজ ব্যস্ত, এখন আসার প্রশ্নই ওঠে না। তবুও মনের গহীনে দ্বিধার এক মনস্তাত্ত্বিক খেলা শুরু হলো।
সে উঠে জানালার পাশে গিয়ে কিছুক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকল। মাঝেমধ্যে দিগন্তের ছায়াপথে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে তার। তবে সেটা কেবলই ক্ষণিকের ইচ্ছে।
সে এক গহিন নিশ্বাসে বুকভর্তি অস্থিরতা কমানোর চেষ্টা করল। হঠাৎ করেই আবার হাঁটু মুড়ে বিছানায় বসল, ফোনটার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। নিজেকেই ফিসফিস করে বলল, “না, একবার দিয়েই দেখি। কী-ই বা হবে? উফফ, কী চিন্তায় পড়লাম রে বাবা!”
বারবার নিশ্বাস টেনে নিল। তবুও স্বস্তি মিলল না। সিদ্ধান্তহীনতার ক্লান্তি আর আত্মসংঘাতের ভারে সে আর স্থির থাকতে পারল না। ঘরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পায়চারি শুরু করে দিল।
অবশেষে চোখ বন্ধ করে এক গভীর নিশ্বাস নিল। অর্থাৎ সেই নিশ্বাসের গভীরতায় কিছু সাহস সঞ্চয় করল।
এরপর ফোনটা হাতে তুলে নিল। কাপা কাঁপা আঙুলে কাব্যের নম্বর ডায়াল করল।
রিং বাজছিল। সময়টা কেমন যেন অসহ্য দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। হাতের তালুতে হিমশীতল ঘাম জমে উঠছিল। বুকের ভেতরে অনিশ্চয়তা আর ঘূর্ণায়মান চিন্তার বুননে দমবন্ধ লাগছে তার। সে এই প্রথমবার, হ্যাঁ, প্রথমবার ফোনের ওপাশ থেকে কোনো পুরুষ কণ্ঠস্বর শুনবে। তাও এমন একজনের সাহচর্যে, যার সঙ্গে মধুর স্মৃতির তুলনায় বিষাদঘন দুর্বিপাকই অধিকতর প্রাবল্যে প্রতিভাত হয়েছে।
এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ করেই ওপাশ থেকে কাব্যের পরিচিত, ভারী ও অনুরণিত কণ্ঠস্বর ভেসে আসল, “আসসালামু আলাইকুম। কে বলছেন?”
শব্দগুলো তার কানে পৌঁছাল ঠিকই, কিন্তু মস্তিষ্কে তা প্রতিধ্বনির মতো বারবার ধাক্কা দিল। এখন কী বলবে সে? কোথা থেকে শুরু করবে? কণ্ঠস্বর বের হবে তো?
হঠাৎ করেই মনে হলো, শব্দেরা তার কণ্ঠনালীতে আটকে আছে।
অন্যদিকে কণ্ঠে একটুখানি সংশয় মেশানো চাপা বিরক্তি নিয়ে কাব্য আবারও জিজ্ঞেস করল, “হ্যালো? কথা বলছেন না কেন?”
তবুও ইলিজা নীরবতার গণ্ডি পেরোতে পারল না। শব্দহীন আতঙ্কে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। একবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিল। তবুও কণ্ঠনালি যেন বালুকায় আটকে আছে। কী অদ্ভুত, একটা কণ্ঠস্বরেই শরীরের প্রতিটি স্নায়ু থরথর করে কাঁপতে পারে?
কাঁপতে কাঁপতে ইলিজা মনে মনে বলল, “এবার আমি কী বলবো? কেন এমন হচ্ছে? হে আল্লাহ, এত অস্বস্তি হচ্ছে কেন?”
ওপাশে কাব্য এবার রীতিমতো বিরক্ত গলায় বলল, “আচ্ছা, আমি রেখে দিচ্ছি তাহলে।”
এটা শুনে ইলিজা হঠাৎই ঝাঁকি খেয়ে উঠল। কাঁপা কণ্ঠে বলে উঠল, “আমি… আমি ইলিজা।”
এ কথা কর্ণগোচর হতেই কাব্যের ঠোঁটে প্রশান্তিময় হাসি ফুটে উঠলো। ইলিজার সেই কোমল কণ্ঠস্বরেই যেন তার সমস্ত অবসন্নতা, ক্লান্তি, আর গুমোট অনুভব মুহূর্তে গলে গিয়ে কোথাও মিলিয়ে গেল। হৃদয়ের গভীরে অনির্বচনীয় সুখ ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ল।
সে নরম কণ্ঠে হেসে বলল, “হায় আল্লাহ! আমার ইলিজা! কেমন আছেন আপনি?”
এই সম্বোধনেই থমকে গেল ইলিজা। চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে রইল শূন্যের দিকে। ঢোক গিলে বিস্মিত গলায় বলল, “কি বললেন?”
কাব্য একটু হেসে, খুকখুকিয়ে কাশি দিয়ে সামলে নিল নিজেকে। বলল, “আপনার খোঁজ জানতে চাইলাম।”
ইলিজার ঠোঁটে অগোচরে একটুখানি হাসি খেলে গেল।
“জি, আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?”
“অনেক ভালো… সত্যিই, অনেক বেশি ভালো।”
কাব্যের কণ্ঠে প্রশান্তির আভাস লুকিয়ে ছিল। ইলিজার মনে হলো, তারই বলা এই ক’টি শব্দেই হয়ত তার অস্থির বুকটা স্থিরতা খুঁজে পেয়েছে। এই উপলব্ধিতে সে মৃদু হেসে ফেলল।
তবে পরক্ষণেই গলায় ভর করল চাপা গাম্ভীর্য। ইলিজা বলল, “থানায় গিয়েছিলেন?”
কাব্য খানিক চুপ করে থেকে মাথা চুলকে বলল, “কিন্তু আমি তো কোনো অপরাধ করিনি।”
এবার ইলিজার কণ্ঠস্বর অনেকটা নরম হয়ে এলো।
“স্নেহার জন্য।”
“ওহ হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। ওরা চেষ্টা করছে, এর বেশি কিছু জানায়নি।”
স্নেহার নাম উচ্চারিত হতেই ইলিজার বুকের গভীরে বিষাদের এক বিশাল ঢেউ ছুটে এলো। তার প্রিয়তম বান্ধবী, একমাত্র নির্ভরতার ছায়া, কোথায় হারিয়ে গেল সে? সে কি তবে নিয়তির অন্ধকারে বিলীন হয়ে গেল চিরতরে?
তার চোখের কোণে ধীরে ধীরে জমে ওঠা এক বিন্দু জল মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল।
ভাঙা কণ্ঠে নিজেকেই প্রশ্ন করল, “আমাকে কি তুই একবারও মনে করিস না, সেনু? এতটা স্বার্থপর কবে হলি তুই? ফিরে আয় না, মা। আমি তো এখনো তোকে প্রতিটি নিশ্বাসে খুঁজে ফিরি। স্নেহা, চলে আয় লক্ষ্মীটি…”
বলতে বলতেই ইলিজার গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। এপাশ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে কাব্য বুঝে গেল, ইলিজার মনটা ভেঙে পড়েছে। গভীর একটা নিশ্বাস ফেলে কাব্য শান্ত গলায় বলল, “আজ বিকেলে দেখা করতে পারবেন?”
ওড়নার প্রান্ত দিয়ে চোখ মুছল ইলিজা। গলাটা একটু খাঁকারি দিয়ে নীচু স্বরে বলল, “কখন?”
“মেসেজে জানিয়ে দেব। তবে একটা কথা, মা-বাবাকে জানিয়ে আসবেন কিন্তু।”
মনের ভেতর ভার জমে থাকলেও, কাব্যের অবাস্তব কথায় এবার ইলিজার মুখে এক টুকরো বিষণ্ন হাসি ফুটে উঠল।
“একটা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যাব, মা-বাবা যেতে দেবে—এমনটা আশা করেন আপনি?”
কাব্য মৃদু হেসে বলল, “তাহলে নাহয় একটু মিথ্যা বলে আসবেন। প্রেমে পড়লে দু-একটা মিথ্যা বললে খুব একটা পাপ হয় না মনে হয়।”
কাব্যের দুষ্টুমি মাখা কথায় ইলিজার চোখের ভেতর জমে থাকা কান্নার মাঝেও অধরে একফালি হাসি ফুটে উঠল। হাসির শব্দ শুনেই কাব্য নিজের মনে বলল, “এই তো! এই তো আপনাকে হাসাতে পেরেছি, মিস ইলি।”
একটু থেমে ইলিজা নরম গলায় বলল, “আচ্ছা… আসব।”
কথাটা কর্ণধার করে কাব্যের হৃদয়ের সুগভীর অনুভবকোষে আনন্দপ্রবাহের বিস্ফোরণ ঘটল। ঠোঁটের প্রান্তে অনাবিল হাসি প্রস্ফুটিত হলো। এবার হয়ত সমস্ত দুর্ঘটনার বিভীষিকা অপসৃত হয়ে, বহু প্রতীক্ষিত মিলনের সূচনা ঘটবে। আর কোনো প্রতিবন্ধকতা তাদের প্রগাঢ় সংলগ্নতার পথে অন্তরায় হবে না; হলেও কাব্য তা প্রতিহত করতে প্রস্তুত।
এসব ভেবেও বাহ্যিক সংযমের আবরণে নিজেকে স্থির রেখে, স্নিগ্ধ স্বরে বলল, “আমি কিন্তু অপেক্ষা করব। অবশ্যই গাড়িতে আসবেন। রাখছি তাহলে?”
“জি।”
ইলিজা মুচকি হেসে ফোনটা কেটে দিল। কিছুক্ষণ পরই ফোনটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে, বিছানায় বসে নিঃশব্দে হাসতে লাগল। তার হাসির গভীরে ছিল অজানা আলোড়ন। হঠাৎই কাব্যের প্রতি অদ্ভুত টান অনুভব করছে সে। কী আশ্চর্য! একজন সম্পূর্ণ অচেনা ছেলের প্রতি এমন আকর্ষণ! কেন? কীসের এত টান? কে এই কাব্য? কেনই বা তার নাম উচ্চারণে এমন কোমলতা জেগে ওঠে মনে? পরিচয় নেই, তেমন জানেও না—তবুও কেন যেন মনে হচ্ছে, সে অনেক চেনা, খুব আপন। এত মায়া কেন?
ভাবনার ঘূর্ণিতে আবিষ্ট ইলিজা বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে নিজের পড়ার টেবিলের সামনে চেয়ারে বসল। পেন্সিল বক্স খুলে একটা রঙিন পেন্সিল তুলে নিল। আঙুলের ফাঁকে ঘুরাতে লাগল সেটি। তার কল্পনার অনন্ত পটভূমিতে ভেসে আসছিল নানা দৃশ্য, নানা হাস্যোজ্জ্বল মুহূর্ত। মাঝে মাঝে নিজের অজান্তেই মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠছিল।
তবে পরক্ষণেই বাস্তবতার টানে অযথা ভাবনার রেশ কাটিয়ে নিজেকে সজাগ করল ইলিজা। সামনে রাখা চিত্রাঙ্কনের খাতা খুলে নিল। ফিসফিস করে উচ্চারণ করে লিখতে শুরু করল, “মিস ইলি প্লাস কা…”
এই মুহূর্তে পিছন থেকে মমতাজ এসে হঠাৎ পিঠে একটা হালকা চাপড় দিয়ে বললেন, “কানটা একদিন না উড়িয়ে দেই, দেখিস! কখন থেকে ডাকছি, শুনিস না নাকি?”
মায়ের হঠাৎ আঘাতে ইলিজা মাত্রাতিরিক্ত চমকে উঠে প্রায় চেয়ার থেকে পড়েই যাচ্ছিল। কিন্তু মমতাজ চেয়ারটা ধরে বললেন, “হ্যাঁ, এবার চেয়ারের সঙ্গে নিজের পা-টাও ভেঙে ফেল।”
ইলিজা তড়িঘড়ি খাতাটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “তু-তুমি কখন আসলে? আর তোমার কাছে তো তোমার মেয়ের থেকে চেয়ার দামি বেশি। যাও যাও, আর ভালোবাসা দেখাতে হবে না।”
মমতাজের চোখে-মুখে গম্ভীর ভাব থাকলেও, ঠোঁটে লুকানো হাসিটা ধরা পড়ল।
“হলো? কতক্ষণ ধরে খাওয়ার জন্য ডাকছি। কী করছিলি বলতো?”
প্রশ্ন শুনে ইলিজা এক মুহূর্ত থমকে গেল, কী বলবে ভাবল। তারপর একটু হাসি মুখে বলল, “প…পড়ছিলাম, মা। সত্যি পড়ছিলাম।”
মমতাজ জানালার দিকে তাকিয়ে থেকে ঠাট্টার স্বরে বললেন, “আজ সূর্য কোন দিক থেকে উঠেছে? আমার পাজি মেয়েটা পড়তে বসেছে—এটাও বিশ্বাস করতে হবে এখন?”
ইলিজা মুখ বেঁকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে বলল, “সবসময় ‘পাজি’ বলবে না তো। আমি এখন ছোট নেই, বুঝলে?”
এই বলে সে সটান ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর এমন ছটফটে বেরিয়ে যাওয়া দেখে মমতাজ হেসে ফেললেন। তারপর একা একা বললেন, “পাজি হলেও আমার মেয়েটার জন্যই এই ঘরটায় এখনো প্রাণ আছে। মিরুটা থাকলে জানি না কতটা দুষ্টুমিই করতো। আচ্ছা, কেমন আছে আমার পরীটা? কতদিন দেখি না! না, আর সহ্য হচ্ছে না। এবার ওকে আসতে বলতেই হবে।”
এসব চিন্তায় বিমর্ষ হয়ে মমতাজ এক দীর্ঘশ্বাসে বুক হালকা করলেন। চোখের কোনে একফোঁটা আর্দ্রতা জমে উঠল। অতঃপর আহারের উদ্দেশ্যে ধীরপায়ে নিচে নেমে এলেন। অন্তরে গুমরে ওঠা অসংখ্য ব্যথা, স্মৃতির বিষম ক্ষরণ ও উদ্বিগ্নতা—সব মিলিয়ে ভারাক্রান্ত অবস্থা। জানে মেয়েটি পরের বাড়িতে নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে রয়েছে, তবুও মাতৃত্বের অন্তঃস্থ নীরব বেদনা যেন প্রতিনিয়ত বুকের গভীরে অদৃশ্য শূন্যতার দহন সৃষ্টি করে।
ভোরের প্রথম রোদের কিরণ মাঠের ঘাস ছুঁয়ে নিঃশব্দে নতুন দিনের আরম্ভ জানান দিচ্ছে। ঘরের ভেতরেও জানালার কাঠের ফাঁক দিয়ে সূর্যের হালকা আলো আলতা রাঙা বিছানার চাদরে ছায়া ফেলেছে।
জানালার পাশে বিছানায় বসে ফাতিমা আর তারান্নুম ব্যস্ত হাতে শাড়ি গুছাচ্ছিল। গৃহস্থালির রেওয়াজমাফিক সকালে উঠেই কাজে মন দেয় মেয়েরা। এই তো সবেমাত্র দিন শুরু হয়েছে, অথচ হাতে কাজ জমে আছে অনেক অনেক।
ফাতিমা একপাশে ভাঁজ করা শাড়ির স্তূপ রেখে মৃদু হাসি হেসে বললেন, “ফারহানের লগে কথা কওয়াইলো কারান। বড্ড ভালো ছেলে। বড়োগো কেমনে সম্মান দিয়া কথা কইতে হয়, কেমনে আপন কইরা নিতে হয়—ভালোই জানে। কথার মধ্যে রসেরও অভাব নাই, ভদ্রতাও আছে।”
ফারহানের নাম শুনতেই তারান্নুমের মুখটা যেন ধীরে ধীরে পলাশফুলের মতো লাল হয়ে উঠল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল। কতটুকু সময়ই বা হলো পরিচয়ের! অথচ মনে হয়, সে তাকে বহু কাল থেকে চেনে। আর ক’দিন পরেই হয়ত নতুন এক সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হবে তারা। বিয়ের পর সংসার হবে, নিজের ছোট্ট একটা জগৎ হবে—যেখানে থাকবে শুধু তারা দু’জন। এই ভাবনাতেই তারান্নুমের চোখ চকমক করে উঠল, মাথাটা নুয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটুখানি লাজুক হাসি খেলে গেল।
ফাতিমা তার মেয়ের মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করে হালকা হেসে বললেন, “ওর বাপ-মা তো আগেই রাজি। এখন আমগো অনুমতির লাইগা বইসা আছে ছেলেটা।”
শাড়ির একেকটা ভাঁজে নিপুণতা রেখে কথা বলছিলেন ফাতিমা। একটু পর গুছিয়ে রাখা শাড়িখানা একপাশে সরিয়ে রাখলেন। মুখে হালকা প্রশান্ত হাসি ঝুলিয়ে পরম মনোযোগে আরেকটি শাড়ি গুছানোর নিমিত্তে তুলে নিলেন। অথচ তারান্নুম যেন বাস্তবতা থেকে বিস্মৃত হয়ে গেছে। সে আর কিছুই শুনছে না, শুনলেও তা যেন অস্পষ্ট গুঞ্জনের মতো কানে এসে মিলিয়ে যাচ্ছে। সে বিলীন হয়ে গেছে নিজস্ব এক ধূসর স্বপ্নলোকের অতল গহ্বরে, সেখানে সে আর ফারহান দুজনের চোখে চোখ রেখে পাশাপাশি হেঁটে চলেছে, আর রোমাঞ্চকর কথোপকথন করছে। এদিকে ফাতিমা তো অবিরাম বাকপ্রবাহে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন।
ফাতিমা বললেন, “ভাবলাম, মারে একবার কইয়া দেহি। ছেলেটারে আমার বেশ পছন্দ হইছে।”
তারান্নুম কোনো উত্তর দিল না। গুটি গুটি হাতে শাড়ির ভাঁজ ঠিক করতে করতে হঠাৎ ভুল করে ফাতিমার কোলে ভাঁজ করা শাড়িটা রাখল।
ফাতিমা ভ্রূ কুঁচকে তাকালেন। বললেন, “ওই মাইয়া, মন কোনদিকে?”
তারান্নুম তবুও নিশ্চুপ। কারণ হৃদয়ের অন্তঃস্থলে প্রেমের অনির্বচনীয় বাসন্তিক ঝংকার ধ্বনিত হচ্ছে। যে এখন অন্য এক গ্রহে হারিয়ে গেছে, যেখানে আকাশেও ফারহানের নাম লেখা আছে। মনে মনে হাসছে সে। তার মন কি আর এই জাগতিক বাস্তবতায় নিবদ্ধ? সে তো ভবিষ্যতের সম্ভাব্যতা নিয়ে মগ্ন—খান পরিবারে একজন সম্মানিত গৃহিণী রূপে নিজেকে কল্পনায় প্রত্যক্ষ করছে।
ফারহান কবে এসে বলবে, ‘এবার চলো তোমাকে বিয়ে করে ঘরে তুলি। অনেক তো অন্যের বাড়িতে থাকলে, গোবরচারিনী।’
আরও কত প্রলোভনমূলক, মধুর বাক্য বর্ষণ করবে সে! প্রেমকৌশলে ফারহান তো চিরকালই চাতুর্যময়। আর যেখানে হৃদয়ের অভিষেকপ্রাপ্ত রানি তারান্নুম, সেখানে তার বাক্পটুতাও দ্বিগুণ প্রখর হয়ে ওঠে।
এদিকে ফাতিমা বিস্ময়বিস্মৃত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ মেয়ের বিমুগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর এক দীর্ঘ, ক্লান্ত নিশ্বাস ফেলে বিরক্ত ভঙ্গিতে তার গায়ে ধাক্কা দিয়ে ধমক দিয়ে বললেন, “ওই ছেমড়ি!”
তখনই তারান্নুমের আনন্দরত চৈতন্যে প্রবল আঘাত হানল। সকালের স্বপ্নিল তন্দ্রাচ্ছন্নতার মধ্যে কেউ যদি হঠাৎ বরফশীতল জল মুখে ঢেলে দেয়, তখন যে অনুভূতি হয়; ফাতিমার ধাক্কায় তার মধ্যে তেমনি এক প্রকম্পিত অনুভূতির জন্ম হলো।
বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে, তখনও ভ্রান্ত বিভ্রম থেকে পুরোপুরি মুক্ত না হয়েই সে থরথর কণ্ঠে বলল, “কিক… কি হইছে, মা?”
ফাতিমা চোখ পাকিয়ে বললেন, “তোয়ার মাথা, আর আমার ঘাড় হইছে। জলদি কইরা শাড়িগুলান গুছাইয়া আলমারিতে ঢুকাইয়া রাখ। আমি রান্নার দিকে গেলাম।”
তারান্নুম তখন মাথা নীচু করে শাড়ির ভাঁজে হাত চালাতে লাগল।
ফাতিমা একটি ভাঁজ করা শাড়ি বিছানার পাশে গুছিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। একটা ঝাড়া দিয়ে পরনের কুঁচকানো কাপড়টা সোজা করে নিলেন। তারপর তারান্নুমের দিকে একবার চেয়ে নাক ফুলিয়ে চলে গেলেন।
ফাতিমার প্রস্থান করা মাত্র, তারান্নুম মন খারাপ করে শাড়ি ভাঁজ করতে করতে বলল, “সবাই শুধু আমার লগেই পারে, আমি ফ্রিতে গালি খাই। সব দোষ ফয়সাইল্লার পোলার। উনি যদি আগেই বিয়া কইরা নিত, তাইলে তো এত কথা শুনতে হইতো না আমার।”
কথা বলার মাঝপথেই হঠাৎ টুন করে মোবাইলের ক্ষীণ শব্দটা ছড়িয়ে পড়ল ঘরের নিস্তব্ধতায়। তারান্নুম ভ্রূ কুঁচকে, সামান্য বিরক্তিভরে পাশ ফিরে তাকাল। ফোনটা হাতে তুলে স্ক্রিনে চোখ ফেলতেই দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। ফারহানের নামটা উজ্জ্বলভাবে জ্বলছে। এক মুহূর্তে বুকের গভীরে অজানা আলোড়ন বয়ে গেল। একটা অস্থির ধুকপুকুনি যেন হৃৎস্পন্দন ছাপিয়ে স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়ল। সে তাড়াতাড়ি মেসেজটা খুলে পড়তে শুরু করল, “মাই ডিয়ার গোরবচারিনী, খুব ভালো আছেন বুঝি? আমাকে তো ভুলেই গেছো, কুইন।”
তারান্নুম মোবাইল ফোনের বার্তাটি পড়তে পড়তে ঠোঁটে অপ্রকাশিত তৃপ্তির রেখা টেনে দিল। এই তো শ্বাসপ্রশ্বাসের ভিড়ে এতক্ষণে অন্তর্জগৎ কিছুটা স্থির হলো। মনের অন্তঃস্থল থেকে উচ্চারিত করল, “তাই তো! আপনারে তো একটুও মনে পড়ে না আমার, অথচ চব্বিশ ঘণ্টা আপনার নামটাই জপি।”
তারপর হেসে আবার পড়তে আরম্ভ করল, “বেশি ভালো থাকবেন না। খুব শিগগিরই আপনার ফয়সাইল্লার পোলা হাজির হবে। তখন এটা-সেটা বলে পালিয়েও লাভ নেই। ঘরে তুলে এনে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে রাখব। এক সেকেন্ডও ছাড় দেব না।”
বার্তাটি পড়ার পর তারান্নুমের গালদুটি লালাভ হয়ে উঠল। চোখদুটি মুহূর্তে বিস্ময়ে প্রশস্ত হয়ে গেল। উদরের গভীরে অগণন রঙিন প্রজাপতিরা ডানা মেলে উথালপাতাল শুরু করল।
এতটা বেপরোয়াভাবেও কেউ কথা বলতে পারে? যেখানে তাদের সম্পর্কের সূচনাটুকু কেবলমাত্র দৃষ্টিসীমায় সীমাবদ্ধ, সেখানে ছেলেটি এমন নির্লজ্জ নির্ভরতায় তাকে বুকের ভেতর আগলে রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করল! তারান্নুমের জন্য এটি এক নবাগত অভিজ্ঞতা, কিন্তু ফারহানের জন্য তো বহু পরিচিত পথের সহজচর্যা। তাই তার মধ্যে বিন্দুমাত্র সংকোচ বা লজ্জার চিহ্নও নেই।
“কত্ত বড় স্পর্ধা! আইস না, তোরে গরুর গোয়ালে বাইন্ধা রাখুম!”
হঠাৎ নিজ মুখের রূঢ়তা উপলব্ধি করে এক হাত ঠোঁটে চেপে ধরল তারান্নুম। ফারহানকে অপমান করার ওই চর্চা আজও ছাড়েনি সে। যদিও একথা বললে অন্যায় হবে না—এসব শব্দকে ‘গালি’ বলাটাই গালির প্রতি অবিচার হবে।
তারান্নুম আবার মেসেজের শেষাংশ পড়তে শুরু করল, “ভেবেছিলাম আমার কুইন অনেক আপডেটেড। আমার আগেই আমাকে বলবে। কিন্তু আফসোস! তার মুখ থেকে ভালোবাসি শব্দটা শুনতে গেলে আমাকে আরো দুই যুগ অপেক্ষা করতে হবে বুঝলাম। আমার আবার ধৈর্যের ধ-ও নেই! তাই আর অপেক্ষা করতে পারছি না, গোবরচারিনী।
ইফ লাভ ওয়ার আ মেলোডি, ইউ’ড বি মাই সুইটেস্ট সং।
ইফ লাভ ওয়ার আ জার্নি, আই’ড ওয়াক ইট অনলি উইথ ইউ।
আই লাভ ইউ বিয়ন্ড ওয়ার্ডস। উইল ইউ লেট মি লাভ ইউ ফরএভার?”
এমন আকস্মিক প্রস্তাবে তার হৃৎস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে উঠল। বুকের গভীরে যেন তুষারশীতল প্রবাহ বয়ে যেতে লাগল। ফারহান এভাবে সরাসরি প্রণয় প্রকাশ করবে, তা কখনো কল্পনাতেও আনেনি সে। কী বলবে এখন? এত লজ্জা কোথায় চাপবে? ইশ, এভাবে প্রকাশ না করলেও তো পারত। এখন তো তার গলার স্বরটাই স্তব্ধ হয়ে গেছে।
ঠিক তখনই ফারহানের পক্ষ থেকে আবার একটি মেসেজ এলো, “ব্যাপারটা কি? কুইনের কি প্রোপোজালটা ভালো লাগেনি?”
তারান্নুম নির্নিমেষ দৃষ্টিতে ফোনের পর্দার দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া জানাল না। তবে হঠাৎ ভিডিও কলের রিংটোন বেজে উঠল। বিছানা থেকে ফোনটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল তারান্নুম। কিন্তু উত্তেজনায় কাঁপতে থাকা হাত থেকে ফোনটা হঠাৎই মেঝেতে ছিটকে পড়ে গেল।
সে তড়িঘড়ি করে ফোনটা তুলে দেখল, স্ক্রিনে ফাটল ধরেছে। মুখ বেঁকিয়ে বিড়বিড় করল, “এই লোকটা ফোন করলেই কিছু না কিছু ঝামেলা হইবেই।”
একটি গভীর নিশ্বাস ফেলে ফোন রিসিভ করল সে। উল্টোদিকে ফারহান গম্ভীর স্বরে বলল, “এত দেরি কেন, কুইন? বুঝতে পারো না আমি ওয়েট করছিলাম?”
তারান্নুম চোখ ছোট করে উত্তর দিল, “আপনি সবসময় ভিডিও কল দ্যান ক্যান?”
“তোমার লজ্জায় রক্তাভ মুখটা দেখতে চাই যে।”
একে তো ফারহান হঠাৎ করেই বিবাহপ্রস্তাব দিয়ে বসেছে, তার ওপর এই বাক্যটি শুনে তারান্নুমের লজ্জা সীমা ছাড়িয়ে রক্তিম মুখাবয়বে বিস্তার লাভ করেছে। ওড়নাটি তড়িঘড়ি মুখে টেনে নিয়ে মুখশ্রী ঢেকে বলল, “এইবার দেখেন।”
ফারহান হেসে কপাল কুঁচকে বলল, “এভাবে অত্যাচার করলে কিন্তু চুমু দিয়ে ফেলব, কুইন।”
তারান্নুম তৎক্ষণাৎ ওড়না সরিয়ে ফেলল। রোষে মুখাবয়ব ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। সরস স্বরে বলল, “অসভ্য, নির্লজ্জ, বেহায়া পুরুষ। একে তো হুট করে প্রোপোজাল দিছে, আবার আইছে চুমু খাইবে। তোমাকে রান্না করে হাঁসের মাংস খাওয়াবো আমি, তারপর অ্যালার্জিতে চুলকাবে, তখন ঠেলাটা বুঝবা।”
ফারহান চুলে অস্থিরভাবে হাত বুলিয়ে কৌতুকমিশ্রিত হাসি ছড়িয়ে নেশালো গলায় বলল, “পরেরবার এমন শাস্তি দিলেই হবে, বেবি। তোমার হাতের রান্না খেয়ে অ্যালার্জির টর্চারও সহ্য করতে রাজি আমি। আর আরেকবার ‘তোমাকে’ বলো, জান।”
তারান্নুম মুহূর্তের অসতর্কতায় জিহ্বা কেটে বিব্রতবোধে চোখ নামিয়ে ফেলল। আর তাতে ফারহানের হাসি আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বলল, “আর তোমাকে কে বলল যে আমি প্রোপোজাল দিয়েছি? আমার আইডি হ্যাক হয়েছে, হয়ত তারা কোনো উল্টোপাল্টা মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছে তোমাকে।”
তারান্নুম এবার চোখ তুলে স্ক্রিনের ফারহানের দিকে তাকাল। ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “গ্রামের মাইয়া দেইখা এতটাও বোকা ভাইবেন না, অসভ্য ব্যাটা। হ্যাকারের আইডি হ্যাক হইছে, তাই না?”
ফারহান ফোনটি একদম ঠোঁটের কাছে নিয়ে নেশাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল, “আইডি হ্যাক না হলেও মন ঠিকই সম্পূর্ণরূপে হ্যাক হয়ে গেছে আমার।”
তারান্নুমের অন্তর ধক করে উঠল। সে জানে ফারহানের ইঙ্গিত কী, তবু মনের গহীনে অদ্ভুত প্রশ্নগুলোর খেলা শুরু হয়ে গেল। নিজেকে সংযত করে বলল, “আচ্ছা তাই? তা সেই হ্যাকারটার নাম কী?”
“মাই কুইন, তারান্নুম তাজিন সোহা।”
তারান্নুমের লজ্জা যেন আকাশ ছুঁয়ে গেল। কাঁপতে থাকা আঙুলে ফোনটি ঝটপট কেটে দিয়ে বিছানায় ছুঁড়ে দিল। তারপর শাড়ির ভাঁজ খুলে তার মধ্যে মুখ লুকিয়ে শুয়ে পড়ল, যেন সমস্ত লজ্জার ভার সেই নরম শাড়ির গভীরে অজ্ঞাত করে দিতে পারে।
অন্যদিকে ফারহান ফোনের উলটো প্রান্ত থেকে হাসিমাখা গলায় বলল, “আমার লজ্জাবতী কুইন, খুব শীঘ্রই তোমার জন্য বিশেষ সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে।”
রোমানা স্থির চোখে আরিয়ানের হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ যেন মানুষটার চেহারায় অচেনা রহস্যময় আবরণ মনে হচ্ছে। কীসের গল্প বলতে যাচ্ছে সে? রোমানার? কিন্তু সে জানলো কীভাবে? অসংখ্য প্রশ্ন ক্রমশ তার চিন্তার পরতে জট পাকিয়ে যাচ্ছে।
আরিয়ান কোমল হাসি ছড়িয়ে বলল, “এক দেশে এক সাধারণ রাজা ছিল। তার ছিল তিন কন্যা, যাদের তিনি পরম যত্নে রাজকন্যা করে গড়ে তুলেছিলেন। তাদের জীবনে কোনো অভাব রাখেননি, এমনকি মার্শাল আর্ট শেখাতেও কার্পণ্য করেননি। তাছাড়া ড্রাইভিং শেখানো, সাঁতার শেখানো, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার, পাসপোর্ট-ভিসা আবেদন, ইলেকট্রিক সুইচ-মিটার বোঝানো কিংবা গুগল ম্যাপ ব্যবহার—সবই নিজ হাতে শিখিয়েছেন তিনি, যেন মেয়েগুলো জীবন নামের যাত্রাপথে একা হলেও পথ ভুল না করে। যদিও বড় কন্যা এসবে বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি, তবে মেজো কন্যা প্রতিটি শিক্ষা, প্রতিটি কৌশল শোষণ করেছে।
তার বড় কন্যা ছিল শ্যামবর্ণা, কিন্তু রূপের বাহ্যিক সীমারেখার চেয়েও তার খিটখিটে স্বভাব প্রকট ছিল বেশি। মেজো কন্যা ছিল ঝড়ের মতো চঞ্চল, সাগরের মতো গভীর, আর দুঃসাহসী। তার রূপের বিবরণ শব্দে বেঁধে রাখা অসম্ভব। তার নিখুঁত চেহারায় এক বিন্দু দাগ পড়লেও তার বাবা ব্যাকুল হয়ে নিজ হাতে মলম নিয়ে আসতেন। এমনকি কাজ করে যেন মেয়ের চেহারায় বা শরীরে কোনো আঘাত না লাগে বা সৌন্দর্য এতটুকু পরিমাণ নষ্ট না হয়, তাই কাজও করতে দিতেন না। কিন্তু মেজো কন্যা এসবে পরোয়া না করে বরাবরই বাবা মায়ের সাহায্য করে যেত। মায়ের সাথে হাতেহাতে রান্নার কাজ এগিয়ে দেওয়া, ঘর পরিষ্কার রাখা কিংবা মাকে সবজি কাটাকাটিতে সে জোর করেই এগিয়ে যেত। আবার তার বাবা ঘরে ফিরে এলে বাবার হাতে ঘাম মোছার জন্য তোয়ালে ধরিয়ে দেওয়া, বাজারের ব্যাগ হাত থেকে নেওয়া, শরবত বানিয়ে দেওয়ার মতো সাহায্য সে সবসময়ই করতো। মায়ের মন খারাপ থাকলে পাশে বসে সান্ত্বনা দেওয়া, ওষুধ খাওয়ার সময় মনে করিয়ে দেওয়া, ছোট বোনের পড়ালেখায় সাহায্য করা, মায়ের মাথায় তেল দেওয়া, বাবার পা টিপে দেওয়া—এমন আরো কত কাজে যে সাহায্য করতো সে, তা বলে শেষ হবে না। কারণ একটাই, যেন বাবা মাকে একটু শান্তি দেওয়া।
তাছাড়া মেজো কন্যা বাবার নিঃশব্দ কষ্টের পরিমাণও বুঝতে পারতো। সীমিত আয়ে পাঁচজনের সংসার চালানো কতটা কঠিন, তা সে অনুভব করত। অথচ বড় কন্যার চোখে এসব ধরা পড়ত না। সে নির্দ্বিধায় ব্যয় করত, বিলাসে মগ্ন থাকত, বাবার ক্লান্ত মুখের গভীরতা কখনো তার হৃদয়ে আলোড়ন তুলতে পারেনি।
অন্যদিকে ছোট কন্যা বয়সে ছোট থাকায় বাস্তবতার ভার বোঝার অবকাশ পায়নি। অথচ এই দুই ভিন্ন মনোভঙ্গির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল মেজো কন্যা। তবে তার মনে এক তীব্র জেদ জন্ম নিয়েছিল। কেন তার বাবা একা সংগ্রাম করবে? বড় করে তুলেছেন, এটাই কি যথেষ্ট নয়? তার বাবার কষ্টকে ভাগ করে নেওয়া কি তারও দায়িত্ব নয়?
সে দেখেছে, বাবা কীভাবে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে একা বসে ভাবতে থাকেন, কীভাবে মা পুরোনো শাড়ির টুকরো জোড়া দিয়ে পর্দা বানান। এসব দৃশ্য তার ভেতরে বড়দের মতো ভাবনার জন্ম দেয়।
একদিন সে স্থির করল, কিছু একটা করতেই হবে। যুক্তি দিয়ে বাবাকে বোঝালো। অবশেষে সমস্ত দ্বিধা ছাপিয়ে তার বাবাও রাজি হলেন।”
আরিয়ান থেমে গেল। এদিকে রোমানা নিশ্বাস নিতে ভুলে গেছে, তার হৃদয়ের গতি খানিকটা থমকে আছে। এই গল্প কি সত্যিই কোনো সাধারণ রাজকন্যার গল্প? নাকি তারই অতীতের অলঙ্ঘনীয় প্রতিচ্ছবি? আজ যেন হৃদয়ের গহিন কোনে জমে থাকা অনুভূতির দরজা খুলে গেছে। কিন্তু সে কিছুই বলল না।
আরিয়ান এবার গম্ভীর কণ্ঠে বলতে লাগল, “পরে রাজকন্যা রাজপ্রাসাদের অলস বিলাস ছেড়ে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে শিশুদের হাতে জ্ঞানের আলো তুলে দেওয়ার ব্রত নিল। কিন্তু সেই পবিত্র প্রয়াসও একদিন কলুষিত হতে বসলো। তারই এক ছাত্র, যে কিনা বয়সে কেবল নবম শ্রেণির, তার প্রতি লোভাতুর দৃষ্টি ফেলল। সে কুৎসিত ইঙ্গিতে টাকার অঙ্ক বাড়ানোর লোভ দেখিয়ে তার শরীর দাবি করল। যা শুনে রাজকন্যার শিরদাঁড়া বেয়ে তীব্র শীতল স্রোত বয়ে গেল, অথচ রক্তে তখন ধিকিধিকি আগুন জ্বলছিল। চোখমুখে এতটাই প্রবল রাগ বিরাজ করলো যে ছেলেটাকে পারলে ওখানেই সে খু*ন করে ফেলত। অন্যায় কখনোই তার কাছে আপোষযোগ্য ছিল না। তাই সে এক মুহূর্তও দেরি করল না। সোজাসুজি সেই ছেলের অভিভাবকদের কদর্যতার কথা জানিয়ে দিল। কিন্তু তারা শুনতে নারাজ, তাদের চোখে তাদের সন্তান নিষ্পাপ। রাজকন্যা বুঝতে পারল, এই নোংরামির শেকড় আরও গভীরে প্রোথিত। তাই সে ভিন্ন পরিকল্পনা করল।
পরদিন ঠিক আগের দিনের মতোই সেই ছেলেটিকে পড়াতে গেল। কিন্তু ছেলেটির চোখের দৃষ্টি আগের মতোই তীক্ষ্ণ ও বিষাক্ত ছিল। রাজকন্যা এবার চুপ থাকল না।
শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘কি চাও তুমি?’
ছেলেটি কুৎসিত হাসি দিয়ে বলল, ‘ইয়োর বডি, বেইবি।’
ব্যস! আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না রাজকন্যা। হাতে ধরা কলমটা নিমেষেই ছেলেটির চোখে বিদ্ধ করল। ঘরটা মুহূর্তেই চিৎকারে কেঁপে উঠল, ছেলেটির চোখ থেকে দরদর করে র*ক্ত ঝরতে থাকল। পলকেই চারপাশে ছুটোছুটি, শোরগোল বেধে গেল।
রাজকন্যাকে ছেলের পরিবার পাকড়াও করল। আইন ডাকা হলে, ক্ষণিকের মধ্যে পুলিশ চলে এলো।
কিন্তু রাজকন্যা নির্বিকার, তার চোখে ভয় নেই, নেই কোনো অনুশোচনা। পুলিশ যখন তাকে নিজের সাফাই গাওয়ার সুযোগ দিল, সে তখনও চুপ রইল। শুধু শান্তভাবে তার ফোন বের করে রেকর্ড চালু করল। ছেলেটার সেই কথোপকথন প্রতিধ্বনিত হতে থাকল।
তৎক্ষণাৎ ঘরের একদিকে ছেলেটার কান্নার রোল পরে গেল।
সে ক্ষমা চাইল, অনুরোধ করে বলল, ‘আ…আ’ম এক্সট্রিমলি সরি, ম্যাম। প্লিজ, ম্যাম। আমি আর কখনো করব না। আমি… আমি জেলে যেতে চাই না, ম্যাম৷ ম্যাম, সরি। ম্যাম, প্লিজ বাঁচান।’
রাজকন্যা এবার কেবল একটিই কথা বলল, ‘অন্যায়ের সামনে নত হওয়ার শিক্ষা আমার বাবা আমাকে দেননি।’
ছেলেটাকে জেলে নিয়ে যাওয়া হলো।
একদিন দুপুরবেলা শহরের লোকাল বাসে রাজকন্যা দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে একটা বই ধরা। সে মাথা নীচু করে বইটা পড়ছিল। বাসটা গাদাগাদিতে ঠাসা, তার জন্য হ্যান্ডেলে ঝুলে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তাও কোনোরকমে সে হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তবে তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা এক মধ্যবয়সী লোক আচমকা গায়ের সঙ্গে ঘষাঘষি করতে লাগল। প্রথমে সে ভেবেছিল দুর্ঘটনা, কিন্তু লোকটার হাত যখন দ্বিতীয়বার কোমরের কাছে ধরা পড়ল, তখন আর ভুল করল না রাজকন্যা।
সে চোখ তুলে লোকটার দিকে তাকাল, ঠান্ডা গলায় কটমট করে বলল, ‘এই, কী করছেন এসব আপনি?’
লোকটা ঠোঁটে নোংরা হাসি টেনে বলল, ‘ভিড় তো, হতেই পারে, ম্যাডাম। ভুল না বুঝে এদিকে একটু আগান না…’
রাজকন্যা তখন আর একটুও দেরি করল না। ঝট করে নিজের ভারসাম্য ঠিক রেখে লোকটার অ*ন্ড*কো*ষ বরাবর এমন এক লাথি দিল যে লোকটা আর্তনাদ করে বাসের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। বাসজুড়ে কথার রোল পড়ে গেল। কেউ কেউ তো রাজকন্যাকেই দোষারোপ করতে শুরু করল৷
কিন্তু রাজকন্যা তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টিতে বলল, ‘আমার নামে আর একটা বাজে কথা যে বলবে, দ্বিতীয় লাথিটা আমি তার অ*ন্ড*কো*ষ বরাবর মারব।’
এরপর কি আর কারোর সাহস হবে নাকি? আর ঠিক তেমনই, সবাই চুপ করে রইল। তারপর ভিড় ঠেলে বাস থেকে নেমে গেল সে।
কিছুদিন পর রাজকন্যা ইউনিভার্সিটির প্রাঙ্গণে পা রাখল। মুহূর্তেই তার আগমন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তার রূপের অমলিন আলো দেখে শিক্ষকদের মধ্যেও বিস্ময়ের চিহ্ন স্পষ্ট ছিল। সে যখন ক্লাসে বসত, তখন চেয়ার টেনে দেওয়া হতো, কলম না আনলে নিজের কলমও ছেলেরা তার হাতে তুলে দিত।
ছোটবেলা থেকেই রাজকন্যার রূপ নিয়ে প্রতিবেশী থেকে বন্ধুবান্ধব সবাই-ই আলোচনায় মগ্ন থাকত। তাই তার উপলব্ধি করতেও খুব বেশি সময় লাগেনি, যে তার রূপের কারণেই সমস্ত আয়োজন, এত আলাপ- আলোচনা। এসব নিয়ে রাজকন্যাও খুশিই হতো। প্রতিদিনই যুবকেরা তাকে বিভিন্ন উপায়ে, বিভিন্ন জায়গায় প্রস্তাব দিতে শুরু করল। প্রথমে এসব তাকে অভ্যস্ত করে তুলেছিল। কিন্তু চাহিদার চাপ বাড়তে থাকায় সে প্রস্তাবগুলির সাথে মোকাবিলা করতে শুরু করেছিল। যুবকেরা বারবার তার পরিবারের কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। তবে রাজকন্যা তখন পবিত্র আত্মবিশ্বাসে স্থির ছিল, তার মন তখন বিয়েতে আশ্রিত ছিল না। সে চেয়েছিল নিজ পায়ে দাঁড়াবে, তারপর বাবাকে একটু স্বস্তি দিবে। তার পিতাও তার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিল, এবং রাজকন্যাকে বিবাহিত জীবন থেকে দূরে থাকতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
একদিন কলেজ ক্যাম্পাসে দুপুরের আলোয় তার ক্লাসের বন্ধুরা আড্ডায় মেতে ছিল। রাজকন্যা আড়ালে এক কোণে বসে বইয়ের পাতায় ডুবে ছিল। কারণ তাকে তো বড় হতে হবে, ভালো ফল করতে হবে, এই ভাবনাগুলোই তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। আড্ডা-আলাপে সময় নষ্ট করার মতো অবসর কোথায় তার!
কিন্তু একটু পর হঠাৎই পিছন থেকে এক যুবক এগিয়ে এসে রাজকন্যার পাশে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে বিদ্রূপাত্মক হাসি হেসে বলল, ‘ডার্লিং, যদি দেখানোর হয়, পুরোটা খুলেই দেখাও। অর্ধেক খুলে রেখে সিডি’উস করছ কেন?’
অপ্রত্যাশিত ও অশালীন এই মন্তব্যে রাজকন্যা প্রথমে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। মুহূর্তেই চোখ তুলে তাকাল ছেলেটার দিকে। দেখল, তার চোখে দৃষ্টিকটু আগ্রাসী লালসা, যেন দৃষ্টির মাধ্যমেই গিলে ফেলবে তাকে। ছেলেটার ইঙ্গিত বুঝে রাজকন্যা ব্যাকুল হয়ে পিছনের ফিতের দিকে হাত বাড়াল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে আবিষ্কার করল, ফিতেটা আদৌ খোলা ছিল না।
অর্থাৎ সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে বিভ্রান্ত ও অপমান করার জন্যই এমন কথা বলেছে ছেলেটি। মুহূর্তের মধ্যেই সেই অনিকেত নামের ছেলেটা হাসিতে ফেটে পড়ল। আশেপাশের কিছু ছেলেও নিছক বিদ্রূপে মুখ ভাসিয়ে দিল। অথচ পাশে দাঁড়ানো দুই মেয়ে অপমানের প্রত্যক্ষদর্শী হয়েও শুধু মাথা নীচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল।
কিন্তু রাজকন্যা ধীরে ধীরে ছেলেটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। একটাও কথা না বলে আচমকা ছেলেটার গালে কষে কয়েকটা থাপ্পড় মারল। এরপর বলল, ‘আজকে তো শুধু থাপ্পড় মেরেছি, পরেরবার আমার সাথে তো দূরের কথা; অন্য কোনো মেয়ের সাথেও যদি এমন আচরণ করিস, ভবিষ্যতের ডাউনলোড করার সেই অপশনটাই আমি কেটে ফেলব।’
এরপর সে মাথা উঁচু করে সামনে হেঁটে চলে গেল। চারপাশের ছেলেগুলো চোখে চোখে বলল, ‘রূপের সঙ্গে তেজটা—কম্বিনেশনটা কিন্তু মারাত্মক, ইয়ার।’
ইউনিভার্সিটির তৃতীয় বর্ষ চলে। রাজকন্যার থিসিস জমা দেওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। গাইড হিসেবে যিনি ছিলেন, তিনি বারবার তার কাজের ভুল ধরছিলেন। একদিন ডেকে বললেন, ‘তোমার প্রজেক্টের মান ভালো না, তবে… যদি সময় বের করো, একসাথে কোথাও বসে একটু আলোচনা করে দেখব।’
তার চোখের অশোভন ইঙ্গিত, কথার ঘোলা ভাষা রাজকন্যা ঠিকই ধরতে পারল।
রাজকন্যা শান্ত গলায় হেসে বলল, ‘ঠিক আছে স্যার, দেখা হবে।’
পরদিন সোজা ডিপার্টমেন্ট হেডের অফিসে হাজির হয়ে নিজের মোবাইল থেকে আগের দিনের রেকর্ড চালিয়ে দিল।
রেকর্ড শুনে অফিস রুমে স্তব্ধতা বিরাজ করল। রাজকন্যা তখন সেই শিক্ষকের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি সবাইকে সারপ্রাইজড করতে পছন্দ করি, স্যার।’
লোকটা তার দিকে কটমট করে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু লাভ কিছুই করতে পারল না। সেদিন থেকেই সেই শিক্ষকের ক্লাস বাতিল হলো, এবং বাকি মেয়েদের চোখে রাজকন্যা একটা প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠলো। অর্থাৎ সে বরাবরই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে চলেছে। আর এতে সে সবসময়ই খুশি হতো। তার মতে এগুলো এক একটা মিশন, আর সে প্রতিটি মিশনে জয়ী হচ্ছে।
কিন্তু রাজকন্যার এই শীতল আনন্দ খুব বেশি দিন স্থায়ী হলো না। একদিন সে যখন ইউনিভার্সিটির প্রাঙ্গণে চলছিল, হঠাৎই তার সামনে সেই ক্যাম্পাসের সবথেকে সুদর্শন ছেলে দাঁড়িয়ে গেল। চোখে অদ্ভুত উজ্জ্বলতা আর ঠোঁটে হালকা হাসি নিয়ে সোজা প্রস্তাব দিল, ‘উড ইউ লেট ইয়োর হার্ট বি মাইন, প্রিন্সেস?’
রাজকন্যার মনে তখন অদৃশ্য ঝড় বয়ে গেল। গোপনে সেও ছেলেটার প্রতি আকৃষ্ট ছিল, কিন্তু সেই অনুভূতির স্বর কখনো শব্দে প্রকাশ হয়ে ওঠেনি। এটা তার অহংকার নয়, তবে তার আত্মসম্মান ছিল প্রবল। তাই ছেলেটা যখন তার ভালোবাসার কথা জানায়, রাজকন্যা তাকে প্রত্যাখ্যান করে।
কিন্তু ছেলেটা হাল ছাড়ার পাত্র নয়। দিনের পর দিন তার ভালোবাসা প্রকাশ করতে নানা চেষ্টা করত—ফুল দিয়ে, রাজপথে গাড়ি থামিয়ে তার প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকত। রাজকন্যা প্রতিবারই সেই চেষ্টাগুলোকে নীরবে উপেক্ষা করত। একদিন ছেলেটা রাজকন্যার জানালার নিচে দাঁড়িয়ে তার প্রিয় গান গেয়ে ওঠে। কিন্তু রাজকন্যা এমন ভাব দেখালো যেন তার এসব পছন্দ না, তাই সে জানালা আটকে দিয়ে ঘরে চলে গেল। অথচ ভিতরে সে কোথাও যেন সেই সুরের মাঝে ভেসে বেড়াচ্ছিল।
কয়েকটি দিন কেটে গেল। প্রতিদিনই উপহার, আকুতি, আর চোখের ভাষায় ছেলেটা তাকে বোঝাতে চাইল—সে সত্যিই তাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। কিন্তু রাজকন্যা সময় নিল। তবে হঠাৎ করেই একদিন ছেলেটা আর ইউনিভার্সিটিতে আসল না। তার কোনো খোঁজও মিলল না। এবার রাজকন্যার বুকের ভেতর শূন্যতা জন্ম নিল। সে আর তাকে ফিরিয়ে দিতে চায় না। তাই সে নিজেই তার খোঁজ নিয়ে সম্মতি দিল।
প্রথমদিকে তাদের সম্পর্ক ছিল নির্মল, নিঃস্বার্থ। রাজকন্যার আবেগের উচ্ছ্বাস, তার বিশ্বাসের বিশালতা, আর তার হৃদয়ের অমলিন টানে সব কিছুই তখন পূর্ণতা পেয়ে যাচ্ছিল।
যখনই সন্ধ্যার শান্ত আলোয় আকাশে নরম রং মিশত; নদীর ওপারে নীলচে কুয়াশা জমতো, তখন তারা নদীর ধারে হেঁটে হেঁটে নিজেদের কথার আবেশে হারিয়ে যেত। রাজকন্যা তখন কখনো রেগে বা কখনো হেসে হেসে তার ছোটবেলার গল্প বলত। আর ছেলেটা এক দৃষ্টিতে তার পানে তাকিয়ে থাকত। বোঝা যেত, সে প্রতিটা শব্দ মনের খাতায় ধরে রাখছে।
একদিন হঠাৎ বৃষ্টি নেমে এলো। আশপাশে কেউ নেই, শুধু ঝিরঝির জল আর নদীর কলকল শব্দ শোনা গেল। তারা দুজন একটা পুরোনো অশ্বত্থ গাছের নিচে আশ্রয় নিল। বাতাসে রাজকন্যার চুল উড়ছিল, চোখেমুখেও ঝিরিঝিরি জল জমেছিল।
ছেলেটা তার কপালের ভেজা চুলগুলো আলতো করে সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘তোমার হাসি এই বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ে, আর আমি সারাজীবন তার মাঝে ভিজে থাকতে চাই, প্রিন্সেস।’
রাজকন্যা চোখ নামিয়ে ফেলল, কিন্তু ঠোঁটের কোণে লুকোনো হাসিটা ঠিকই ধরা পড়ল। তার হৃদয়ের ভিতরটা সেদিন অজানা খুশিতে কেঁপে উঠছিল। সে প্রথমবার বুঝল, সে ভুল কাউকে ভালোবাসেনি।
আবার রাজকন্যার জন্মদিনে ছেলেটা চুপিচুপি তার প্রিয় ফুল দিয়ে বানানো একটি চুলের মালা উপহার দিল। ভোরবেলার স্নিগ্ধ আলোয় সে মালাটা হাতে পেয়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারণ মালাটা শুধু ফুলের না, সেখানে পরিশ্রম, মমতা আর ভালোবাসার গন্ধ লেগে ছিল। রাজকন্যা চুলে মালাটা পরল। এরপর আয়নায় নিজেকে দেখে একটু হেসে ফেলল। আবার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখও ভিজে উঠল। তার মনে হল, এই ভালোবাসা তো রাজ্য কিংবা মুকুটের চেয়েও অনেক দামি।
কিন্তু এত মুগ্ধতা আর কোমল মুহূর্তের মাঝেও, হঠাৎ করেই ছেলেটার আচরণ বদলে যেতে লাগল। ছেলেটি বারবার রাজকন্যার সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার জন্য অপ্রতিরোধ্য চেষ্টায় লিপ্ত হতো। তার এই প্রবল আহ্বান রাজকন্যার মনের গোপন কোণগুলোতে আঘাত করতো। রাজকন্যা বহুবার মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করছিল, কিন্তু প্রেমের অদৃশ্য শক্তি তাকে একসময় সেই ছেলেটির কাছে পৌঁছাতে বাধ্য করেছিল। অবশেষে একদিন রাজকন্যা চিরস্থায়ী সিদ্ধান্তে পৌঁছাল। সে তার পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ছেলেটিকে বিয়ে করার সংকল্প করল। সে জানতো, তার বাবা কোনদিনই এই ছেলেটিকে মেনে নেবে না। কারণ ছেলেটি চাকরি করে না। কিন্তু সেসব ব্যাপারগুলো রাজকন্যার মনে বিন্দুমাত্র আক্ষেপ জাগায়নি। যে গভীর ভালোবাসা তার হৃদয়ে সঞ্চিত ছিল, তাতে এই পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেলেও, সে সমস্ত কিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিল। তারপর এক সুরেলা সন্ধ্যায় রাজকন্যা তার পরিবারকে না জানিয়েই, তার ভালোবাসার ছেলেটিকে বিয়ে করে ফেলল।”
Tell me who I am 2 part 1
আরিয়ান হঠাৎ থেমে গিয়ে রোমানার চোখে চোখ রেখে এক দীর্ঘ, ভারী নিশ্বাস ফেলল। তার দৃষ্টি খানিকটা শূন্যতায় ছেয়ে গেল, কিন্তু আঁখিদ্বয় তীক্ষ্ণ রাখল। সে লক্ষ করল—রোমানার মুখশ্রী যেন নিঃশেষিত কোনো গ্রীষ্মকালের আম্রপিণ্ড; চোখ দু’টি বিস্মৃত কোনো অতীতের গভীর খাদে ডুবে আছে।
আরিয়ান সমস্তটা অনুভব করেও মুখে শুধুই রহস্যাবৃত হাসি টেনে নিল। অথচ তার বুকের গভীরে অদৃশ্য অস্থিরতা ধীরে ধীরে শিকড় গেড়ে বসেছিল।
তবু সে কিছুই বুঝতে দিল না। কণ্ঠে রহস্যের মেদুরতা মিশিয়ে বলল, “রাজকন্যা যাকে ভালোবেসেছিল, সেই ছেলেটির নাম কি জানো?”
