Home Tell me who I am 2 Tell me who I am 2 part 2 (2)

Tell me who I am 2 part 2 (2)

Tell me who I am 2 part 2 (2)
আয়সা ইসলাম মনি

রোমানা বিছানার একপাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। কিন্তু তার শরীরটা পুরোপুরি নিথর হয়ে গেছে। চোখে-মুখে কোন অনুভূতি নেই, শুধু শ্বাসই চলছে।
আরিয়ানের প্রশ্ন শুনে সে নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান তার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে বলল, “ফারজাদ।”

ফারজাদের নাম শুনে রোমানার চক্ষুদ্বয় ক্রোধে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। বুকটায় তীব্র ধকধকানি শুরু হতে থাকল, আর আরিয়ানের দিকে তাকানো সম্ভব হচ্ছিল না। সে চোখ নিচে নামিয়ে কয়েকবার গভীর শ্বাস নিল, যেন কষ্টগুলো কিছুটা প্রশমিত হয়। কিন্তু তখনই আরিয়ান উচ্চস্বরে হেসে উঠলো। রোমানা অবাক চোখে তার পানে তাকিয়ে রইল।
আরিয়ান রোমানার কোল থেকে উঠে তার গা ঘেঁষে বসে পড়ল। তারপর মাথা কাত করে রোমানার কাঁধে রাখল। ঠান্ডা, গভীর কণ্ঠে বলতে লাগল, “এরপর ফারজাদের সঙ্গে রাজকন্যার জীবন বেশ ভালোই কাটছিল। প্রথম প্রথম তারা বিলাসবহুল হোটেলে থাকতে শুরু করল—সেখানে মনের মতো ঘুরতে যাওয়া, দামি জিনিসপত্র ব্যবহার করতে কেউ বাধা দিত না। রাজকন্যা তো মুগ্ধ, কারণ এমন স্বপ্নময় জীবনই তো সে চেয়েছিল, তাও নিজের ভালোবাসার সঙ্গেই। এমন ভাগ্য কয়জনের হয়, বলো?

কিন্তু এই সুখ বেশিদিন স্থায়ী ছিল না। এত বুদ্ধি থাকার পরও সে ভালোবাসার কাছে প্রতারিত হলো।
বিয়ের এক মাস যেতে না যেতেই রাজকন্যা বুঝতে পারল, ফারজাদ যা দেখিয়েছিল, তার সবই ছিল অভিনয়। আসলে সে কখনোই ভালোবাসেনি। শুধু তার সৌন্দর্য আর তার সত্তাটাকেই চেয়েছিল। ফারজাদ ছিল এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা বখে যাওয়া ছেলে, যাকে তার পরিবার ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। সে মদ খায়, সিগারেট খায়, জুয়া খেলে, আর রাতে বারে গিয়ে অন্য মেয়েদের সঙ্গে সময় কাটায়।
প্রথম প্রথম রাজকন্যা তীব্রভাবে প্রতিবাদ করে, কাঁদে, চিৎকার করে, ফারজাদকে গালমন্দ করে। সে বারবার জানতে চায়—কেন এমন করছো? কেন এমন করলে?
একদিন রাজকন্যা এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি হল। ফারজাদ বাঁকা হেসে বলল, ‘অনিকেতকে মনে আছে? হুম? আমি ওর বন্ধু। যেদিন তুমি সবাইকে সামনে রেখে ওকে থাপ্পড় মেরেছিলে, সেদিনই ও আমাকে সব ঘটনা বলেছিল। আর আমি ওকে প্রমিস করেছিলাম—তোমার হৃদয় জয় করে, তোমার সৌন্দর্যের সমস্ত অহংকার মাটিতে মিশিয়ে দেব। আর দেখো, আমি পেরেছি।’

শব্দগুলো যেন বিষাক্ত তীর হয়ে এসে রাজকন্যার বুকে আঘাত করল, ভেতরে ভেতরে কোথাও এক পশলা রক্তপাত চলল। চোখে অন্ধকার নেমে এলো। রাজকন্যার চোখের কোণে জমে থাকা জলের বাঁধ এক নিমেষেই ভেঙে গেল। ঠোঁট কাঁপল, গলা শুকিয়ে এলো, কিন্তু কিছুই বলার ছিল না তার। কী বলবে? কাকে বলবে? সেই মানুষটিকে—যার চোখে একদিন পৃথিবীর সবটুকু বিশ্বাস দেখেছিল? যার জন্য আপনজনদের ছেড়ে নির্ভীক হয়ে এসেছিল, তাকে বলবে? সে কি আসলেই বুঝবে?
না, সে কিছুই বুঝবে না। বুঝালেও বুঝবে না।
সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। কাঁপতে কাঁপতে পাশের ঘরের দিকে পা বাড়াল। দরজা বন্ধ করে চুপচাপ বসে পড়ল মেঝেতে। হয়ত সে কাঁদবে কিংবা হয়ত কাঁদবে না। কিন্তু কেউ দেখতে পাবে না।
কারণ ভালোবাসার কাছে হার মানলেও, আত্মসম্মান নামের যে শেষ প্রদীপটি এখনও নিভে যায়নি, সেটুকু আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকাই এখন তার একমাত্র পথ।
রাজকন্যা তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল। মলিন মুখ, শুকিয়ে যাওয়া চোখ, স্বপ্নহীন চাহনি দেখে সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি কি সত্যিই একেই ভালোবেসেছিলাম? সত্যিই কি ও ছিল, আল্লাহ? বলো না! এই শয়তানকে তো আমি ভালোবাসতে পারি না। না, কখনোই না। নাকি আমি শুধু নিজের কল্পনার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম?’”

আরিয়ান একটু থেমে গেল। রোমানার দিকে তাকাল। কিন্তু তার চোখে কোনো প্রশ্ন নেই, নেই বিস্ময়; শুধু শূন্যতা খেলা করছে। তাই সে হালকা হেসে আবার বলতে শুরু করল, “এর মাঝে রাজকন্যার পরিবারও তার বিয়ের খবর জানতে পারল। এমন একজন বখাটে ছেলের সঙ্গে মেয়ের সংসার শুনে তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার মা একদিন ফোন করে বলেছিল, ‘তুই তো বলেছিলি সুখে আছিস, মা… তাহলে কাঁদছিস কেন?’
রাজকন্যা তখন কিছু বলেনি। গিলে নিয়েছিল কান্না। নিজের তৈরি দুর্ভাগ্যের দায়ভার সে একাই বইছিল। তাছাড়া বলাও উচিত না! কারণ দোষী তো সে-ই। তাই মা-বাবাকে বলে তাদেরও কষ্ট বাড়াতে চায়নি।”
এটুকু বলে আরিয়ান আবার স্থবির হলো; রোমানাকে সংবেদনশীল শব্দগুলো আত্মস্থ করার অবকাশ দিল। অথচ আরিয়ানের বাক্যসমূহ শ্রবণ করার পর রোমানার হৃদয়ের অন্তর্গত প্রাঙ্গণে যেন এক ভয়াবহ প্রলয় নেমে এলো। এতসব সূক্ষ্ম ও গোপন তথ্য আরিয়ান অবলীলায় জানল কীভাবে? এগুলো কি আদৌ সম্ভব? অথচ তার কণ্ঠের এমন নিখুঁত বর্ণনাভঙ্গি দেখে রোমানা যেন স্বয়ং সেই ঘটনাগুলোর জীবন্ত অবলোকন করছে। তার চেতনাজুড়ে অপার অস্বস্তির খচখচানি শুরু হলো।

এদিকে আরিয়ান গল্প চালিয়ে গেল, “এরপর শুরু হলো নতুন অধ্যায়। ফারজাদ তার গয়না বিক্রি করে, রাজকন্যার নাম করে লোন নিত। বাসায় মদ খেয়ে এসে মাঝরাতে দরজা ধাক্কাতো। কখনো গায়ে হাত তুলত, বা কখনো মানসিকভাবে তাকে ভেঙে ফেলত।
কিছুদিন পর ফারজাদের আসল রূপ বেরিয়ে এলো। রাজকন্যার গোপন ভিডিও ভাইরাল করার হুমকি দিয়ে তাকে ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করল। রাজকন্যার মাথায় যেন বাজ পড়ল। নিজের স্বামী কীভাবে এমন কথা বলতে পারল? প্রথমে সে ফারজাদকে বোঝানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ফারজাদ তাকে হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়ে দিল, ‘এখন থেকে তুমি যদি ইনকাম না করো, তবে সব কিছু বাইরে চলে যাবে, ডার্লিং।’
রাজকন্যা তখন আর কোনো উপায় না পেয়ে আবার টিউশনি শুরু করে দিল। তারা দুজন ছোট একটি ভাড়া বাড়িতে থাকতে লাগল, যেখানে রাজকন্যা দিনরাত খেটে টাকা আয় করত, আর ফারজাদ সেই টাকায় মদ, জুয়ায় বুঁদ হয়ে থাকত।

এক বছরের মাথায় রাজকন্যা জানতে পারল, ফারজাদ শুধু তার নয়, আরও অনেক নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে জড়িত। তার হৃদয়ে কষ্টের এক তীব্র ঢেউ আছড়ে পড়ল। তখনই সে সিদ্ধান্ত নিল—এই সম্পর্ক আর নয়। সে ডিভোর্স চাইবে। কিন্তু পরক্ষণেই ফারজাদ হাসতে হাসতে জানাল, ‘ওহ মেরি ভোলাভালা অবলা জান, তোমার সঙ্গে তো আমার বিয়েই হয়নি, সবই তো ছিল নাটক! ডিভোর্স আবার কীভাবে দিবে?’
মুহূর্তে রাজকন্যার পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। এতদিন যে সম্পর্ককে আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিল, সেটাই যদি না থাকে, তবে সে কার জন্য সহ্য করেছে এতকিছু?
তবুও সে মনোবল হারাল না। ঠিক করল, সব ছেড়ে দিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবে, সবকিছু নিজের মতো করে নতুন করে শুরু করবে। কিন্তু ঘর ছেড়ে বেরোনোর আগেই নতুন একটা দুঃসংবাদ তাকে থামিয়ে দিল। সে জানতে পারল, সে সন্তানসম্ভবা।

খবরটা শুনে সে প্রথমে ভেঙে পড়ল। মনে হয়েছিল, এবোরশনই একমাত্র পথ। কিন্তু গর্ভে যে নতুন প্রাণ বেড়ে উঠছে, তার জীবন কেড়ে নিতে মন সায় দিল না। মা তো! সায় দেওয়ার কথাও না। তাই ভেবেছিল সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকবে। যে কারণে সব জেনেও সে ফারজাদের কাছেই থেকে গেল।
কিন্তু ফারজাদের ব্যবহার পাল্টাল না। প্রতিদিন অকথ্য গালিগালাজ, হেনস্তা, মানসিক নিপীড়ন—সব চলতে থাকল। রাজকন্যার কান ধরে যেত। আবার মাঝে মাঝে বাচ্চাটার কথা মনে করে ফারজাদ নরম হতো, কিছুটা আদর করত, কিন্তু তাও যেন ছিল হিসাবি, স্বার্থপর ভালোবাসা।
একদিন হঠাৎ ফারজাদ বলল, ‘দেখো রমু, তোমার গর্ভে আমার সন্তান; তাই ঠিক করেছি, এবার তোমাকে বিয়ে করব। উইল ইউ ম্যারি মি, প্রিন্সেস?’

রাজকন্যার মুখে তখন এক উজ্জ্বল হাসি ফুটে উঠেছিল। বুকের গভীরে টালমাটাল খুশির অদৃশ্য ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। অনুভবের তাপে চোখের কোণে এক ফোঁটা অশ্রু জমে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল, সব বুঝি ঠিক হয়ে যাবে বা অন্তত ঠিক হওয়ার সম্ভাবনায় সে আবার বাঁচতে শিখবে। সে উপর নীচ মাথা ঝাঁকিয়ে বিয়েতে সম্মতি দিল।
সে আরো ভাবল, এবার বুঝি ফারজাদ তাকে ভালোবাসবে, সযত্নে আগলে রাখবে, তাকে সম্মান দেবে। এতদিনের ভুলে যাওয়া স্বপ্নেগুলো এবার সত্যি হবে। কিন্তু ভাগ্যও যেন তার সঙ্গে নির্মম খেলায় মেতে উঠেছিল।
তিন মাস পর রাজকন্যার জরায়ুতে ক্যান্সার ধরা পড়ল। প্রথমে সে বিশ্বাস করতে পারেনি। কারণ তার তো কোনো হরমোনাল সমস্যা ছিল না!

ডাক্তার জানালেন, ‘এটি এইচপিভি ভাইরাসের কারণে হয়েছে।’
সে অবাক হয়ে বলেছিল, ‘আমার তো এইচপিভি নেই!’
তখন ডাক্তার বললেন, ‘এটি যৌন সংস্পর্শেও ছড়াতে পারে।’
সেখানেই সন্দেহটা ফারজাদের দিকে ঘুরে গেল। অর্থাৎ ফারজাদের এইচপিভি ছিল।
রাজকন্যার ভেতরে ভয়াল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। সে যে মানুষের জন্য জীবনের এতটা ঝুঁকি নিয়েছিল, আজ সেই মানুষই তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। তবুও সে ভাবল, সন্তানের মুখ দেখেই সে সব ভুলে যাবে। কিন্তু না, তার ভাগ্য সেখানেও নির্মম। এত ভালোবাসার সন্তানটাও আর থাকল না। গর্ভেই তার মৃত্যু হলো।
ডাক্তারের চেম্বারে বসে সে শুনল, ‘আপনার জরায়ু কেটে ফেলতে হবে, না হলে আপনার মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে যাবে।’
রাজকন্যার কানে শব্দগুলো উত্তাল ঝড় হয়ে বাজল। সে কেবল ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। এরপর নিজের পেটে হাত রেখে আপনমনে বলল, ‘তুইও ধোঁকা দিলি, সোনা…’

সেই মুহূর্তে তার মনে পড়ল, প্রথমবার বাচ্চার নড়াচড়া টের পাওয়ার দিন। আবার সে টিউশনির টাকা জমিয়ে ছোট একটা হলুদ রঙের জামাও কিনে রেখেছিল। কিন্তু এখন… এখন তো সবই শেষ।
হাসপাতালের করিডোরে বসে সে মোবাইল বের করল। ফারজাদের নাম টাইপ করল। কল বাটনের উপর আঙুল রেখে থেমে নাম মুছে ফেলল। আবার মায়ের নাম্বার টাইপ করল। সেটাও মুছে ফেলল। আসলে কাকে বলবে? কে আছে তার? আদৌও কি কেউ তাকে বুঝবে?
জরায়ু অপারেশনের জন্য ৬৫ হাজার টাকা প্রয়োজন। অথচ তার হাতে মাত্র সাড়ে তিনশ টাকা। তার চোখের নিচে কালি স্পষ্ট দেখা যায়। বুকের ভেতরে শূন্যতা, আর গলায় গোপন কান্না চেপে ধরে সে হাঁটতে লাগল। সে আবারও একাকী হয়ে পড়ল।

তারপর একসময় রাজকন্যার এবোরশন করানো হলো, কিন্তু ফারজাদ তার উপর রাগ দেখালো। তার সন্তান হারানোর জন্য রাজকন্যাকেই দায়ী করল। আবার রাজকন্যার জরায়ুও কেটে ফেলতে হবে। রাজকন্যা তখন একেবারে ভেঙে পড়ল। তার কাছে অর্থও নেই, যাতে সে অপারেশন করাতে পারে। একদিকে তার পুরো জীবন ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, আর অন্যদিকে সে আর কখনও মা হতে পারবে না।”
আরিয়ান কথা থামিয়ে বসে রইল। রোমানা ততক্ষণে অনর্গল কাঁপছে। এটা তো নিছক কোনো কাহিনি নয়, এ এক নির্মম, নিকষ বাস্তবতার নির্মেদ দলিল। এতটা ঋজু, এতটা সজীব! না, এটি নিছক গল্প হতে পারে না। তবে কি এই গল্পের সেই নির্বাসিতা রাজকন্যা সে নিজেই?
তার ঠোঁট কাঁপলেও কোনো শব্দ নিঃসৃত হলো না। সমস্ত যন্ত্রণা, সংবরণকৃত আর্তনাদ গলায় জমাট বেঁধে রইল।
রোমানার চোখ বেয়ে অশ্রুর রেখা নেমে আসছিল। আরিয়ান তার দিকে দুটো টিস্যু এগিয়ে দিল। রোমানা চোখ মুছল, তবু তাতে তার দুঃখে কোনো প্রশমন এলো না। আরিয়ান থামল না। এগিয়ে এসে পুনরায় রোমানার কাঁধে মাথা রেখে গভীর নিশ্বাস ফেলল।

আরিয়ান আবার শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলতে লাগল, “এদিকে ফারজাদের রাজকন্যার উপর রাগ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। এখন তো সে আর কখনো মা হতে পারবে না। তার আর কী দরকার? তার থেকে আর কোনো সুবিধা নেই। তাই সে নতুন এক শয়তানি পরিকল্পনা আঁটলো।
সে একদিন বলল, ‘চলো, তোমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবো।’
রাজকন্যা থমকে গেল। তার শরীর ভেঙে পড়েছে, অপারেশনের আগে কোথাও যাওয়ার কথা সে ভাবতেও পারে না। কিন্তু ফারজাদ তাকে বিশ্বাস করাল, ‘তোমার চিকিৎসার জন্যই তো নিয়ে যাচ্ছি, প্রিন্সেস।’
রাজকন্যার বুকটা কেমন যেন হালকা হয়ে গেল। এতোদিনে বুঝি সে ভালোবাসা বুঝতে শিখেছে! অন্তত ফারজাদ তাকে নিয়ে ভাবছে, তাকে ভালোবাসছে; এটাই তো সে চেয়েছিল। আজ কত আনন্দ রাজকন্যার মনে! কিন্তু সেই আনন্দ অল্প সময়েই বিষে রূপ নিল।

ফারজাদ তাকে একটি অন্ধকার বার-এ নিয়ে গেল। সেখানে ঢুকেই ধাক্কা দিয়ে রাজকন্যাকে কিছু পুরুষের মাঝে ঠেলে ফেলে দিল। রাজকন্যা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। চোখের পানি যেন এক মুহূর্তে জমে বরফ হয়ে গেল। এতটা নিকৃষ্ট, এতটা হীন কেউ হতে পারে? তার মন হাজার প্রশ্নে বিভক্ত হয়ে গেল। কিন্তু সেই সময় তার সামনে আরও এক ভয়াবহ দৃশ্য খুলে গেল।
অপরিচিত সেই পুরুষগুলো ফারজাদের হাতে মোটা মোটা টাকার বান্ডিল তুলে দিচ্ছে। দৃশ্যটা যেন বিষের মতো গলায় এসে আটকে গেল তার, ভেতরটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে যেতে লাগল।
সব কিছু যেন ঘূর্ণিঝড়ের মতো মাথার ভেতর ঘুরতে থাকল। দুনিয়াটা কি এমনই? এতো নির্মম, এতো পাষাণ?
অল্প হলেও বুকের গভীরে যে ভালোবাসাটাকে এতদিন পুষে রেখেছিল, সেটা আচমকা ছাই হয়ে চোখের সামনেই উড়ে গেল।

ফারজাদ… তার সেই প্রিয় ফারজাদ… তার ভালোবাসা… যার ছায়াটুকু দেখলেও একসময় চোখ ভরে যেত ভালোবাসায়; সেই মানুষটাই কি তবে আজ তাকে বিক্রি করে দিচ্ছে? এটাও কি সম্ভব? আসলেই? না, এ সত্যি হতে পারে না। সে হয়ত ভুল দেখছে। কিন্তু চোখ তো ধোঁকা দেয় না। দৃশ্যটা তো স্পষ্ট—টাকার বিনিময়ে তার দেহটাকে অন্য কারোর কাছে করায়ত্ত করার আয়োজন চলছে।
তাহলে ফারজাদ কি কখনোই তার ছিল না?
এই প্রশ্নে তার ভিতরটা কেঁপে উঠল। হৃদয়ের গহীনে এক নিষ্ঠুর সত্য ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
ভালোবাসলে না হয় অসম্ভব হতো। কিন্তু যে সম্পর্কের শিকড় গোঁড়া থেকেই রূপ আর চাহিদায় গড়া, সেখানে ভালোবাসার আসনই বা কোথায়?
সে বোঝে, বিক্রি শুধু তার শরীরের হয়নি—বিক্রি হয়েছে বিশ্বাসের, বিক্রি হয়েছে আত্মার। সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল।

লাফিয়ে গিয়ে ফারজাদের পা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ফা-ফারজাদ, প্লিজ, আই বেগ ইউ। প্লিজ, এমনটা করো না। প্লিজ, প্লিজ, ফারজাদ! এরচেয়ে ভালো ছিল তুমি আমাকে মে*রে ফেলতে। ফার-ফারজাদ… প্লিজ…’
কিন্তু ফারজাদ তাকে এক লাথিতে ছিটকে ফেলে দিয়ে চলে গেল। সে নিঃস্ব হয়ে বারের মেঝেতে কাঁদতে লাগল, কিন্তু এখন যে তার কাঁদার সময়ও নেই। চারদিক থেকে পুরুষগুলো তাকে ঘিরে ধরল। তাদের চোখের লালসা, মুখের বিকৃত হাসি বোঝাচ্ছে, এখন শুধু তার সৌন্দর্য ভোগ করার অপেক্ষায় তারা। রাজকন্যা বুঝে গেল, আজকের রাতটা হয়ত তার জীবনের শেষ রাত। কিন্তু সে তো নত হওয়ার মেয়ে নয়!

তাই সাহস, বুদ্ধি আর প্রশিক্ষণ তার অস্ত্র হয়ে উঠল। মার্শাল আর্টের কৌশল প্রয়োগ করে ঝটপট আক্রমণ শুরু করল। হঠাৎ পাওয়া প্রতিরোধে পুরুষগুলো দিকভ্রান্ত হয়ে গেল। কিন্তু ব্যথায় তাদের রাগ আরও চড়ে গেল। রাজকন্যাও দমবার পাত্রী নয়। তাই বারের টেবিল থেকে মদের গ্লাস তুলে একের পর এক তাদের মাথায় ভাঙতে লাগল। সবার মাথা ফেটে র*ক্ত বেরিয়ে এলো। সাথে ছটফট করতে লাগল সবাই। আবার তাদের অ*ন্ডকোষ বরাবর লাথি মারল সে, মুহূর্তেই কয়েকজন ছিটকে পড়ল মেঝেতে। কিন্তু এতে পুরুষগুলো আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। ওরা উঠে দাঁড়িয়ে রাজকন্যাকে শিক্ষা দিতে তেড়ে আসতে লাগল। কিন্তু রাজকন্যা ঠিক তখনই খেয়াল করল—বারের দরজা খোলা। সে তাদের আঘাত করে কোনো রকমে বার থেকে বের হয়ে দৌড়াতে লাগল। কিন্তু ওরা আরো লোক নিয়ে তার পিছু নিল। রাজকন্যা শুধু কান্না আর প্রার্থনা করতে করতে দৌড়াতে লাগল।

আর সেদিন সেই প্রার্থনা হয়ত আল্লাহর কাছে পৌঁছালো। দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ এক শক্তপোক্ত শরীরে ধাক্কা খেল সে। চোখ তুলতেই সামনে এক ফরসা পুরুষের অবয়ব ভেসে উঠল। হঠাৎ ধাক্কায় থমকে গেল পুরুষটি। চোখ তুলে নিঃশেষিত এক মেয়েকে দেখতে পেল। কাঁপতে থাকা শরীর, এলোমেলো চুল, চোখে ভয় আর কান্না নিয়ে তার বুকের ভাঁজে এসে আটকে আছে মেয়েটা। অন্ধকারে সেই পুরুষকে দেখে রাজকন্যার ভয় দ্বিগুণ হয়ে গেল। তার গলা শুকিয়ে গেল। মনে হলো, পিছনে কুমির আবার সামনে বাঘের মুখে পড়েছে সে।

কিন্তু হঠাৎই কেন জানি রাজকন্যা সব দ্বিধা-সংকোচ ভেঙে তার বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে জড়িয়ে ধরল তাকে। পুরুষটি স্তব্ধ হয়ে গেল। কিছু সময়ের জন্য নিশ্বাস নিতে ভুলে গেল। মনে হলো, এক তীব্র শীতল ঝাপটা বুক চিরে ভেতরে ঢুকে পড়ল। এই প্রথম… হ্যাঁ, এই প্রথমবার কোনো নারী ভয়ডর উপেক্ষা করে তাকে এভাবে স্পর্শ করল। কোনো শব্দ করল না পুরুষটি, শুধু মেয়েটার কাঁপতে থাকা পিঠের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে রইল। রাজকন্যার উষ্ণ নিশ্বাস তার বুকের উপর নিঃশব্দ আঁচড় কাটছিল। হয়ত প্রতিটি শ্বাসে সে বলছিল, ‘আমাকে ঠেলে দিও না, আরেকবার আমি ভেঙে যাব। বাঁচাও আমাকে, দয়া করে বাঁচাও…’
পুরুষটির বুকের গভীরে অস্থির ঢেউ খেলে গেল, অব্যক্ত উত্তেজনায় ঢোক গিলল সে। সে জানত না এমন স্পর্শে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়। এই অনুভব, এই দুর্বলতা, তার চেনা জগতের বাইরে ছিল। সে রাজকন্যাকে দূরে ঠেলে দিতে চাইল।

আর তখুনি রাজকন্যা তার গায়ের কালো জ্যাকেট এক হাতে শক্ত করে খামচে ধরে, অন্য হাতে তাকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরে ভাঙা কণ্ঠে ফিসফিস করে উঠল, ‘আমাকে বাঁচান, ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। পি-প্লিজ, বাঁচান…’
পুরুষটি, অর্থাৎ রাজা হালকা হাসল। এই প্রথম কোনো মেয়ে তার বুকের উপর এভাবে কেঁদে আকুতি জানালো। এত কোমল, এত মিষ্টি আকুতি শুনে, রাজা মনপ্রাণ দিয়ে সেই আবেদন গ্রহণ করল। কিন্তু রাজকন্যা আর কিছুই বলতে পারল না। সে রাজার বুকেই অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়তে লাগল। তবে পড়ার আগেই রাজা তাকে ধরে ফেলল। চোখ বন্ধ করে সেও তাকে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ পর অনুভব করল, পেছন থেকে সেই হায়নাদের দল এগিয়ে আসছে। রাজা ধীরে ধীরে চোখ খুলল। দেখল, তাদের চোখে লালসা, মুখে হিংস্রতা স্পষ্ট দৃশ্যমান। তাই রাজা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে কিছু বলল, আর তখনই সেই মানুষরূপী হায়নাগুলো ছুটে পালাল।”
আর কেউ হলে এই জায়গায় হাজারটা প্রশ্ন ছুড়ে দিতো—রাজা কী বলেছিল, যে সেই পুরুষগুলো পালিয়ে গেল? কিন্তু রোমানা কোনো প্রশ্ন করলো না। সে শুধু শুনে যেতে লাগল। আজকের দিনটা তার শোনার দিন। এতদিন সে বলেছে, কিন্তু আজ তার শোনার পালা। আর আরিয়ানও বলেই চলেছে, “রাজা রাজকন্যাকে কোলে তুলে হাঁটতে লাগল। তার বুকের সাথে এক নিঃসাড় দেহ মিশে গেল।

পরের দিন একটা বিশাল ধবধবে সাদা কক্ষে রাজকন্যার জ্ঞান ফিরল। আলো পড়তেই চোখ কুঁচকে নিশ্বাস টেনে সে কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘এটা… কোথায়?’
চিৎকার করে উঠলো সে, ‘কোথায় নিয়ে আসা হয়েছে আমাকে? আর তোমরা কা–’
তৎক্ষনাৎ পাশেই রাজাকে দেখতে পেয়ে সে শান্ত হলো। রাজার পাশে কিছু কাজের লোকও ছিল, আর তার সেবা করতে নার্সও উপস্থিত ছিল। রাজা গম্ভীর কণ্ঠে বলল, ‘হাই…’
রাজার ভারী কণ্ঠ শুনে রাজকন্যা শুধু গভীর নিশ্বাস ফেলে চোখ নামিয়ে ফেলল। আবার একবার রাজার দিকে চোখ তুলে তাকাল।

এরপর কিছুদিন তাকে ঘিরে যত্নের অভাব ছিল না। কিন্তু রাজা কখনো কাছে এসে কিছু জিজ্ঞেস করেনি, বরং দূর থেকে দেখেছে। তারপর রাজকন্যা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলে, রাজাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সামনে যেতে শুরু করলো। কিন্তু রাজা কোনো শব্দ করলো না, শুধু রাজকন্যার চলে যাওয়া দেখল। সে চলে যেতেই রাজা সামান্য হাসল।
এদিকে রাজকন্যার জন্য আর কোনো পথ ছিল না। তাকে বাধ্য হয়ে নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে হলো। বাবার ঘরে পা রাখতেই তার দুই বোন তাকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসিক্ত হয়ে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে ছোটবোন বলল, ‘আপু, বাবা আর নেই…’
রাজকন্যা স্তব্ধ ছিল কিছুক্ষণ। এরপর হঠাৎ ঠান্ডা মেঝেতে ধপাস করে বসে পড়ল। তার চোখ থেকে অঝোরে পানি ঝরছিল, অথচ ঠোঁট কাঁপলেও কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না।
তার বাবা মারা যাওয়ার খবর ফারজাদের বাড়িতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু ফারজাদ সোজাসুজি বলে দিয়েছিল, ‘তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’

বাবার মরদেহ তখনো খাটে। সে গিয়ে তার বাবার পায়ের কাছে বসল। পা দুটো জড়িয়ে ধরে একটা চুম্বন করল। এরপর সেখানেই মাথা ঠেকিয়ে কাঁদতে লাগল।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ রাজকন্যা পাথরের মতো হয়ে গেল। এদিকে জমানো টাকায় কিছুদিন সংসার চললেও, পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হতে লাগল। বড় বোনের বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে গেল, ছোটবোনের পড়াশোনার খরচ থেমে গেল। তাই রাজকন্যা চাকরির জন্য অনেক জায়গায় ছুটলো, কিন্তু ফলাফল কিছুই হলো না। তার বাবা আর্মিতে সম্মানিত পদে কাজ করতেন, আর বাবার সম্মান রক্ষার্থে সে কোনো নীচু কাজও নিতে পারছিল না। কিন্তু সম্মান দিয়ে তো পেট চলে না। তাই একদিন নিজের অস্তিত্বকে দেখতে দেখতে দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে একটা পরিকল্পনা করল সে।
শেষে এক সন্ধ্যায়, রাজকন্যা আবার সেই রাজার প্রাসাদের ভারী লোহার গেটের সামনে দাঁড়াল।
প্রহরীরা তাকে চিনে ফেলে রাজাকে জানালো। রাজা সেই একই নির্লিপ্ত মুখে তার সামনে এসে দাঁড়াল। রাজকন্যা তখন মাথা উঁচু করেই বলল, ‘আপনি কি আমাকে বিয়ে করবেন?’
রাজা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল, তারপর প্রশান্ত হাসল।
তবে সে কোনো প্রশ্ন করল না। জানতে চাইল না, তার নাম কী? তার পরিবারে কে কে আছে? সেদিন সে কেন দৌঁড়াচ্ছিল? কারা তাকে তাড়া করেছিল? বা তার অতীত কি?
সে শুধু বলল, ‘পরের সপ্তাহেই আমাদের বিয়ে।’
অর্থাৎ সে শুধু জানত, এই মেয়েটি তার শূন্যতা পূরণ করতে এসেছে, আর আজ তার সামনে তার ভবিষ্যতের রানি দাঁড়িয়ে আছে।

তাদের বিয়েটি এক রাজকীয় আয়োজনে পরিণত হলো—স্বর্ণখচিত সাজসজ্জা, প্রাসাদজুড়ে আতশবাজি আর অভিজাত আমন্ত্রিতদের গুণকীর্তনে ভরে উঠল দিনটি। বিয়েতে রাজার বাবা তার ছোট ছেলেকেও বিদেশ থেকে ফিরিয়ে এনেছিলেন, যদিও ছোট রাজার মন এসব বিয়েবাড়ির পাকে ছিল না।
বিয়ের পর রাজকন্যার জীবনে এক নতুন মোড় আসল। রাজা তাকে ভালোবেসে আগলে রাখত। এতটা যত্ন করত যে রাজকন্যার মনে হত, সে অদৃশ্য যন্ত্রণাকে পেরিয়ে এক সুরক্ষিত কোলের মধ্যে এসে পড়েছে। দামি গয়না, বিলাসবহুল পোশাক, রাজকীয় খানাপিনা—তার জীবনে কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। তবে রাজকন্যা কখনো রাজাকে তার অতীতের কথা বলেনি।

তারপর একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে রাজকন্যা তার জরায়ু কেটে ফেললো। অনেক চিন্তা, দ্বিধা আর ভয়ের পরেও সে এটা করতে বাধ্য হয়েছিল। অপারেশনের পর সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে চমকে গেল। যেন এক অচেনা মানুষ তার দিকে তাকিয়ে আছে। কাঁপা কাঁপা হাতে মুখ ছুঁয়ে দেখল, এই কি সে? চোখ দুটো কেমন শূন্য, অথচ তার ভেতরে জ্বলছে নোনতা দুঃখের অগ্নিশিখা। তার ঠোঁটে এক ফোঁটা হাসি ফুটল, যদিও সে হাসি ছিল ব্যথায় বিদীর্ণ। আজ থেকে সে আর কখনো মা ডাক শুনবে না, আর কখনো নিজের রক্তে গড়া একটি প্রাণকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবে না। বুকের গভীরে হাহাকার ছড়িয়ে পড়ল, অথচ কাউকে সে কিছু বলতেও পারছিল না। রাজাকেও না। কীভাবে বলবে? কীভাবে বোঝাবে? এমন যন্ত্রণার ভাষা কি আছে?
তবুও কোথাও যেন এক আশ্চর্য প্রশান্তি তাকে ছুঁয়ে গেল। কারণ প্রতিনিয়ত ভিতরটাকে ক্ষয় করে দেওয়া রক্তমাখা সেই অভিশাপ থেকে আজ সে মুক্ত। এ মুক্তি ব্যথার, তবুও তো মুক্তি!

বিয়ের প্রথম এক বছর তারা সত্যিই সুখে কাটালো। কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন রাজা জানতে পারল, তার প্রিয় রানি কখনোই মা হতে পারবে না। রাজা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যদিও তার মুখে কোনো অভিযোগ ছিল না, কিন্তু তার অন্তরের কান্না তো কেউ দেখেনি। রানি তার কাছে সব লুকিয়েছে, এই বিশ্বাসভঙ্গ তাকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। তবুও রাজা রানীকে কখনো আঘাত করেনি। তার ভালোবাসায় অভিমান ছিল, কিন্তু বিদ্বেষ ছিল না।
কিছুদিন পর রাজার ছোট ভাই বিদেশ থেকে ফিরে এলো। তার উদ্দেশ্য ছিল, নিজের একটি বিশাল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা।
এদিকে রানি প্রতিদিনের সংসারের দায়িত্ব সযত্নে পালন করলেও তার মুখের হাসিটা আর আগের মতো প্রাণবন্ত ছিল না। থাকার কথাও না।
এই সময়ে ফারজাদ হঠাৎ করেই ফিরে আসল। সে জানতে পারল, তার পুরোনো শিকার এখন রাজপ্রাসাদের রানি। হিংসা আর লোভে অন্ধ হয়ে সে রানিকে ফোন করতে শুরু করল। রানি প্রথমে বুঝতে পারেনি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন কে দিচ্ছিল।

কিন্তু তখন ফারজাদ তার পরিচয় দিয়ে বলল, ‘তোর গোপন ভিডিও কিন্তু আমার কাছে এখনো আছে, সোনা। টাকা না দিলে ভাইরাল করে দিতে এক সেকেন্ডও ভাববো না। টাকাগুলো দিয়ে দাও, সারাজীবনের জন্য তোমাকে ভুলে যাব। চিনবোই না তুমি কে! কবে দিবে জানার অপেক্ষায় আছি।’
এসব কথা শুনে তখন রানীর শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে। তার শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছিল।
সে জানে, যদি এই কথা রাজার কানে যায়, তবে শুধুমাত্র তার সুখের নয়, রাজার হৃদয়েরও মৃ’ত্যু হবে। তাই সে কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে ফারজাদকে টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। ফারজাদকে টেক্সট করে জানালো, সে রাতে তার বাড়িতে গিয়ে টাকা দিয়ে আসবে। ফারজাদ খুশি হয়ে গেল।
রাত তখন দেড়টা। রাজা পাশে শুয়ে ছিল। রানি চোখ বন্ধ করে তার পাশেই শুয়ে ঘুমের ভান ধরে ছিল, আর মনে মনে ফারজাদের সঙ্গে দেখা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রাজা ঘুমিয়ে পড়েছে দেখে সে খুব আস্তে করে একদম নিঃশব্দ পায়ে উঠে চলতে শুরু করল। কিন্তু সে জানতো না, রাজা ঘুমিয়ে নেই।
রানীকে কক্ষের দরজা দিয়ে বের হতে দেখে, রাজার মনে সন্দেহ জাগলো। রাজা মনে মনে ভাবতে থাকল, ‘ওয়াশরুম তো ভিতরে, তাহলে এত রাতে ও যাচ্ছে কোথায়?’

সেও চুপচাপ রানীর পেছন পেছন হাঁটতে শুরু করল। রানি নীচে নেমে রান্নাঘরে ঢুকলো।
অন্যদিকে পাশের কক্ষে ছোট রাজা কোম্পানি নির্মাণের কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিল। হিসেবের চাপে তার মস্তিষ্ক গরম হয়ে উঠেছিল। হঠাৎই রান্নাঘর থেকে টুংটাং শব্দ ভেসে এসে ছোট রাজার ধ্যান ভাঙল। ওদিকে রানি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ির সদর দরজার দিকে এগিয়ে দরজা খুলে বাইরে চলে গেল। ছোট রাজা কক্ষ থেকে বেরিয়ে সদর দরজা খোলা দেখে, তার মনেও সন্দেহ জাগলো। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে প্রাসাদ থেকে বের হয়ে গিয়ে দেখল, রানি গাড়িতে উঠছে। এত রাতে সে কোথায় যাচ্ছে? এই ভাবনায় সেও গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রানিকে অনুসরণ করতে শুরু করল।

অন্যদিকে বড় রাজাও গাড়ি নিয়ে রানি এবং ছোট রাজার পেছনে চলতে শুরু করল।
ঘণ্টাখানেক পেরিয়ে রানির গাড়ি শহরতলির একটা পুরোনো, অন্ধকার, ভাঙা-চোরা একতলা বাড়ির সামনে থামল। তখন চারপাশে শুধুই নিস্তব্ধতা; আশেপাশে একটা ঘরও নেই। বাতাসেও কেমন সাঁসাঁ শব্দ শোনা যাচ্ছিল। হয়ত ফারজাদ ইচ্ছে করেই রানিকে এখানে আসতে বলেছিল, যেন কেউ টাকার বিষয়টা দেখতে না পায়। অথবা রানিই ফারজাদকে এমন জায়গায় টাকা দিবে বলেছিল। যাক, এরপর রানি গাড়ি থেকে নেমে ঘরের দরজায় ধাক্কা দিল।
ফারজাদ দরজা খুলে রানীকে দেখে প্রসারিত হাসি দিয়ে বলে উঠল, ‘ও এম জিইই! আমার রমু এত সুন্দর হয়ে গেল কবে থেকে? যদিও সে বরাবরই অমায়িক সুন্দর ছিল। যাক গে, টাকা আনছো তো?’
অন্যদিকে বড় রাজা এবং ছোট রাজা রানির পিছু পিছু এসে ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল। এসব কথা শুনে তাদের কপাল ভাঁজে পড়ল। হচ্ছে কী এসব? রানি এত রাতে এখানে কি করছে? এই ছেলেই বা কে? এর সাথে রানির সম্পর্ক কি?

তারা দুজনে কিছুই বুঝতে পারলো না। তবে বড় রাজা ছোট রাজাকে দেখলেও, ছোট রাজা বড় রাজাকে খেয়াল করেনি। সামনের দৃশ্য দেখে ছোট রাজা কিছু বলার জন্য মুখ খোলার চেষ্টা করতেই, তার চোখ মুহূর্তে বড় হয়ে গেল।
কারণ রানি কোনো কথা না বলে শাড়ির আঁচলের নীচ থেকে এক বিশাল ধারালো ছু*রি বের করে ফারজাদের বুকের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। প্রথম ছু*রিকাঘাতের পরেই পাঁজরের নীচ থেকে মাংস ছিঁড়ে হাড়ে আঘাত করার এক বীভৎস আওয়াজ বেরিয়ে আসল। দ্বিতীয়বার ছু*রি ঢোকানোর পর ফারজাদের শরীর কেঁপে উঠে থেমে গেল। বুকের মাঝ বরাবর কুৎসিত এক ফাঁক তৈরি হলো। আর সেখান থেকে র*ক্তের গাঢ় স্রোত বেরিয়ে এসে তার শার্ট ভিজিয়ে দিতে থাকল। এরপর বারংবার করা ছু*রির প্রতিটি আ*ঘাতে মাংসপেশী ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে আলগা হতে থাকল। ফারজাদের মুখ থেকে গোঙানির শব্দ বেরিয়ে এল। তার ঠোঁট কাঁপতে থাকল, চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল।
বড় রাজা অবাক হয়ে রানির দিকে তাকিয়ে রইলো। ছোট রাজাও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
এর মধ্যেই রানি তার মুখে একটি কাঁচের শিশি থেকে ঘন সবুজ বিষ ঢেলে দিল। ফারজাদ হাত দিয়ে গলা চেপে ধরল, বিষ যেন ভিতরে না পৌঁছাতে পারে। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। তার চোখ পিত্তকণ্ঠী হয়ে গেল, ঠোঁট থেকে গ্যাঁজলা বেরিয়ে পড়ল।

গোঙানির শব্দ করতে করতে ফারজাদ নিষ্প্রাণ হয়ে ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। অনবরত কাঁপতে থাকা দেহটার বুকের মাঝখান দিয়ে হু-হু করে র*ক্ত গড়িয়ে পড়ে মেঝে রঞ্জিত হতে থাকল। একসময় নিস্তব্ধ হয়ে গেল সে। ছোট রাজা আর বড় রাজা স্থির, তাদের চোখ চওড়া হয়ে গেল। দুজনেরই জিভ শুকিয়ে কখন কাঠ হয়ে গেছে।
অথচ রানি নির্বিকার। সে ধীর পায়ে ফারজাদের বুকের উপর উঠে বসল। একেবারে ঠান্ডা শীতল দৃষ্টিতে সে ছু*রিটা আবার তুলল। তারপর বারংবার ফারজাদের বুকের মধ্যে ঢোকাতে লাগল। হাড়ের ভেতর থেকে ছু*রির মুখে কলিজা আর পাঁজরের টুকরো ছিঁ*ড়ে আসল।
ফারজাদের দেহ থেকে ছিটকে আসা উষ্ণ র*ক্ত রানির মুখ ভিজিয়ে দিল। তার আঁচলে, তার চুলের গিঁটে লাল ছোপ ছোপ দাগ সৃষ্টি হতে লাগল।
প্রতিশোধ নিতে রানি ধীরে ধীরে আরও উন্মত্ত হয়ে উঠল।

একটুপর রানি সামান্য হাসল। কিন্তু তার হাত থামল না। মনে হয়, প্রতিটি কো*পে সে একেকটা অতীতের দুঃসহ স্মৃতি কেটে ফেলছে। বুক চি*রে, হাড়ের গহ্বর ভেদ করে ছু*রির ধারালো ফলক প্রবেশ করালো বারংবার। বু*কের মাঝখানটা দুভা*গ হয়ে অভ্যন্তরীণ ফুসফুস, র*ক্তনালি, হৃৎপিণ্ড সবকিছু দৃশ্যমান হলো।
তারপর হঠাৎ সে ফারজাদের গলাকেও টার্গেট করল। একবার, দুবার, তিনবার। এভাবে একই জায়গায় ঘন ঘন কো*পে গ*লার একপাশ থেঁতলে গিয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ল। ঘাড়ের হাড় চি*রে গিয়ে খটাস শব্দে ভেঙে গেল। গলার শিরা ছিঁড়ে র*ক্ত ফোয়ারা হয়ে দেয়াল পর্যন্ত ছিটকে পড়ল; রানির মুখে, গালে, গলায়ও লেগে গেল।
ফারজাদের গলা থেকে গড়িয়ে আসা অর্ধেক বিচ্ছি*ন্ন কণ্ঠনালি ছটফট করতে থাকল। কাটা স্থানে গলার হাড় ফাঁক হয়ে গেল, তার নিচে নরম মাংসের ছিন্ন কুচি আর ফেনিয়ে ওঠা র*ক্ত দেখা গেল। ফারজাদের মুখ থেকে তখন কেবল একটা ক্র্যাক শব্দ বেরোল। হয়ত তার শ্বাসনালির ভেতরে ছু*রি ঢুকে গেছে। চারপাশে শুধুই থপথপে র*ক্ত। রানির আঁচল র*ক্তে ভিজে টেনে নিচে পড়ে যাচ্ছিল, তার মাথার খোঁপা থেকে র*ক্তের বাজে গন্ধ ছড়ালো।

রান্নাঘরের সেই ছু*রি তখন মৃতদেহের গলায় আটকে ছিল, রানি উঠে দাঁড়িয়ে সেটা ঘুরিয়ে টেনে বের করল, আর একধাক্কায় ফারজাদের চোখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল—চোখের পাতা ফেঁটে গিয়ে কুঁচকানো জেলি মাটিতে ঝরে পড়ল।
ছোট রাজা পাশের ঝোপের আড়ালে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার মুখে কথা আসে না, শরীর জমে যায়। তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে, মুখ শুকিয়ে গেছে, চোখের পাতা কাঁপছে। বড় রাজাও স্তব্ধ, সে নিজের হৃদস্পন্দনও শুনতে পাচ্ছিল, তার ভেতরটা ফেটে যাচ্ছিল। রানির অতীত, তার রাগ, তার প্রতিশোধ, তার মুখের সেই উন্মাদনা সবকিছু দেখে তার মাথায় লাখোলাখো প্রশ্নের জট পাকিয়ে যাচ্ছিল। তবে বড় রাজা একটা ব্যাপার বুঝতে পারছিল, তাদের সামনে এমন এক নারী দাঁড়িয়ে, যার শুধু উপরের রূপটাই দেখেছে তারা।

রাতের বাতাসে তখন শুধু র*ক্তের গন্ধ ভাসছিল। সেই গন্ধে অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পাচ্ছিল রানি। ধীরে ধীরে সে উঠে দাঁড়ালো, শরীর থেকে র*ক্ত ঝরে পথে গড়িয়ে পড়ল। শাড়ির কোঁচা ছিঁড়ে গেছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। সে কেবল স্থির দৃষ্টিতে ফারজাদের নিথর লা*শ দেখতে থাকল। মৃ*তদেহের কাঁপুনি থেমে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু র*ক্তের ধারা থামছে না।
অথচ তবুও রানির উন্মাদনা কমল না। আবারো বসে মৃ*তদেহের উপরই পুনরায় আ*ঘাত হানতে লাগল। কখনো পেটে, কখনো হৃৎপিণ্ড বরাবর, আবার কখনো হাত-পায়ের শিরা ছিন্নভিন্ন করে দিল। ফারজাদের নাক-মুখ দিয়ে শুধু র*ক্তের ঢল নামতে থাকল। পেটের মাংস একদিকে ছিঁ*ড়ে গিয়ে কাঁচা মাংসের স্তর উন্মুক্ত হলো। কে*টে যাওয়া পেটের ফাঁক দিয়ে বিশ্রী গন্ধ বের হচ্ছিল। অতিরিক্ত ছু*রির আ*ঘাতের ফলে ফারজাদের পেট একদম থেঁতলে গেল। পেটের এক পাশে র*ক্তের বুদ্‌বুদী উঠে আসছিল। শাড়ির লালচে পাড় র*ক্তে আরও গাঢ় লাল হয়ে উঠল। মনে হলো, রানি যেন র*ক্তে গোসল করেছে।

সে থামল না, একবারের জন্যও থামল না। একজন নারীর শরীরে এত শক্তি তো থাকার কথা নয়, কিন্তু সেদিন রানির শরীর একবারের জন্যও ক্লান্ত হলো না। তার অস্তিত্বের সমস্ত রাগ, যন্ত্রণা ও অভিশাপ সেই ছু*রির প্রতিটি আ*ঘাতের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল। চোখ দুটো ক্রোধে টনটন করছিল। রানির পায়ের নিচে র*ক্ত জমে নিকষ কাদার মতো ভারী হয়ে গিয়েছিল। তার পায়ের গোড়ালি সেই স্রোতে ডুবে যাচ্ছিল। অথচ তবুও তার চোখে প্রশান্তি ছিল না, শুধু র*ক্তচাহিদা খেলছিল। অবশেষে সে তার সবটা শক্তি দিয়ে ফারজাদের অ*ণ্ড*কো*ষ* ফা*টিয়ে দিল। এক বিকট শব্দ হলো। ফারজাদের প্যান্ট র*ক্ত ও অ*ন্ড*কো*ষের তরলে ভিজে গড়িয়ে পড়ে মেঝেতে বিছিয়ে গেল। আ*ঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে মাং*সের দলা পাকিয়ে পাকিয়ে মেঝেতে ছিটকে পড়ল।
রানির কপাল থেকে র*ক্ত গড়িয়ে চোখের কোণে এসে জমে গেল, তবুও সে চোখ বন্ধ করল না। কণ্ঠনালি দিয়ে উঠে আসা হাহাকার গিলে ফেলল। তার শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হয়ে এলো, তবুও সে যেন আরও র*ক্ত চায়, আরও আ*ঘাত করতে চায়, আরো মা*রতে চায়। বড় রাজা সেই দৃশ্য দেখে শিউরে উঠল। তার গলা শুকিয়ে গিয়েছিল, নিশ্বাস আটকে এসেছিল।

তবে বড় রাজা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও ছোট রাজা আর সহ্য করতে পারল না। দৌড়ে গিয়ে রানির হাত শক্ত করে ধরে ফেলল। রানি তখন চোখ তুলে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। তার চোখের সাদা অংশটা লালাভ হয়ে উঠেছিল।
সে পাগলের মতো চিৎকার করে ছোট রাজাকে বলল, ‘এখান থেকে চলে যাও। আমাকে মা*রতে দাও, দয়া করে আমাকে মা*রতে দাও। সরে যাআআও…’
ছোট রাজা আরো শক্ত করে রানির হাত ধরে রেখেই বলল, ‘ও অলরেডি মরে গেছে, ভাবী।’
কিন্তু রানির কানে কথাটা ঢুকল না। সে হিংস্র পশুর মতো ছোট রাজাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল। তারপর আবার ফারজাদের দেহের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এসব দেখে ছোট রাজা ও বড় রাজা দুজনেই বুঝতে পারল, এই হ*ত্যার পেছনে নিশ্চয়ই এক গভীর কাহিনি লুকিয়ে আছে। এমন উন্মাদ প্রতিশোধ কেউ নেয় না, যদি না তার বুকে শতাব্দীর দাহ লুকিয়ে থাকে। অবশ্য ছোট রাজা রানিকে কোনো প্রশ্ন করল না।
সে শুধু ঠান্ডা কণ্ঠে বলল, ‘বাকি কাজটা আমাকে করতে দিন।’
রানি বুঝল, এবার লা*শ সরানোর পালা। সে থামল, ছু*রিটা হাতের মধ্যে চেপে ধরেই উঠে দাঁড়াল। তার হাতের ছু*রিতে মাং*স লেগে ঝুলে ছিল। তার শরীর ভারী, পায়ের আঙুলে র*ক্তের গ্লানি জমে ছিল। কিন্তু মুখে প্রশান্তি খেলা করছিল।

সেই নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে রানি বলল, ‘আরেকবার ফিরে আসতে চেষ্টা করো, ফারজাদ। আমি অপেক্ষা করব… দ্বিতীয় মৃ*ত্যু দিতে।’
তারপর নির্বিকার মুখে সামনে হাঁটতে শুরু করল। তবে একবারও পেছনে তাকাল না। কারণ সে এখন জয়ী, তার কাজ শেষ। সে গাড়িতে উঠে নিজের ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। বড় রাজা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে সব দেখে যাচ্ছিল।
সে যেতেই ছোট রাজা আড়মোড়া ভেঙে, কিছুক্ষণ চারপাশ নিরীক্ষণ করল, নিশ্চিত হলো কেউ নেই। এবার তার নৃ*শংসতা প্রকাশ পেল। সে ফারজাদের ঘর খুঁজে একটি কুঠার বের করল। নিখুঁত দক্ষতায় প্রথমে ফারজাদের মাথাটা আলাদা করল। ঘি*লু*গুলো চড়চড় শব্দে ছিটকে পড়ল; আশেপাশের দেয়ালে থকথকে র*ক্তের ছিটে ছড়িয়ে গেল। তার মুখেও বিন্দু বিন্দু র*ক্তের ফোটা ছিটে উঠেছিল। মাথাটার চুলে লেগে থাকা র*ক্ত মেঝেতে আঁকিবুঁকি কাটতে থাকল।

ছোট রাজা হঠাৎ করেই তার আঙুলগুলো মাথার খুলির ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। খোঁ*চাতে থাকলে তার নখের নিচে মগজের লিজলিজে অংশ আটকে গেল। এক সময় আঙুল দিয়েই চোখের পেছনের স্নায়ুগুলো ধরে টান মারল! চোখটা ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো। সাথে গোশতের সঙ্গে কিছু শিরা-উপশিরাও ছিঁ*ড়ে ছিঁ*ড়ে বেরিয়ে এলো।
সেখানে একটা গর্তের মতো তৈরি হলো। লা*শটার কোথাও কোথাও চামড়ার নীচ থেকে হলুদাভ চর্বি উঁকি দিল, আর তার ওপর র*ক্তের ফেনা জমে ছিল।
তারপর ধারালো এক কোপে তার পু*রু*ষা*ঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে দিল। সেটি ছিটকে দরজার বাইরে গিয়ে গড়াতে লাগল। সঙ্গে সেখান থেকে র*ক্ত ছিটে এসে ছোট রাজার ঠোঁট বেয়ে পড়তে থাকল। বড় রাজা দ্বিতীয়বার হতবাক হলো। অর্থাৎ সে শুধু রানিকে নয়, নিজের ছোট ভাইকেও এতদিন চিনতে পারেনি।
এদিকে ছোট রাজা ঠান্ডা মাথায় পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছাড়তে ছাড়তে নিথর দেহটার দিকে ঝুঁকে বলল, ‘Death can be beautiful, but only when one deserves it.’
তারপর একে একে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করল। ক্ষতস্থানগুলো থেকে গোটা ঘরজুড়ে ঘন, গাঢ় রঙের লাল বর্ণ ছড়িয়ে পড়ল। কাটা অংশগুলোর চারপাশের মাং*স ফুলে উঠেছিল—ছিঁ*ড়ে যাওয়া স্নায়ু আর হাড়ের ধার স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছিল। ফারজাদের শরীরটা তখন নিঃসাড় এক মাং*সপিণ্ড মাত্র।

এরপর ছোট রাজা পানি এনে র*ক্ত ধুয়ে জায়গাটা পরিষ্কার করল। পকেট থেকে কী যেন একটা স্প্রে করল, যাতে র*ক্তের গন্ধ কিংবা ফিঙ্গারপ্রিন্ট না থাকে। সম্ভবত ব্লিচিং এজেন্ট বা ক্লিনিং সলিউশন হবে। সমস্ত কাজ শেষ করে দেহাংশগুলো তুলে গাড়ির ডিকিতে রাখল। তারপর ছোট রাজা গাড়ির গতি বাড়িয়ে এগিয়ে চলল, আর বড় রাজা গাড়িতে উঠে দূর থেকে তার পিছু নিল। কিছুক্ষণ পর ছোট রাজা এক নির্জন, ঘন জঙ্গলের মাঝে গাড়ি থামাল। সেখানে একটা স্পিডবোর্ডে উঠে অজানা গন্তব্যের দিকে হারিয়ে গেল। বড় রাজা নির্বাক হয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। কোথায় গেল ছোট রাজা? সে আসলেই কে? তার ভাইয়ের জীবনেও কি তাহলে গোপন কিছু রয়েছে, যা সে বা তার পরিবার জানে না? কোনো প্রশ্নের উত্তর মিলল না। তাই বড় রাজা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গৃহপথে রওনা হলো।
পরদিন সকালে ছোট রাজা রানির হাতে একটি র*ক্তের ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এবার গোসল করে আসুন।’
কিন্তু সে রানিকে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। কারণ সে বুঝতে পারে, রানির অতীত ভয়ংকর; এতই ভয়ংকর যে তা দ্বিতীয়বার মনে করানো উচিত নয়। এই র*ক্তে সে সাফ হবে না, কিন্তু হয়ত একটু হালকা হবে। রানিও চুপচাপ হালকা হেসে সেই র*ক্তেই গোসল করল।

Tell me who I am 2 part 2

পরবর্তীতে ছোট রাজা ফারজাদের নকল ভিসা ও পাসপোর্ট তৈরি করল। এমনভাবে সব সাজালো, যেন সে বিদেশে পালিয়ে গেছে। তার এই দক্ষতা দেখে বড় রাজা হতবাক হয়ে গেল। কিন্তু সেও এবার বসে রইল না। রানির পরিবার, শৈশব, বন্ধুত্ব সবকিছু নিয়ে সে খোঁজ নিল। এমনকি রানি কোন দিন কোথায় গেছে, কার সাথে সময় কাটিয়েছে, তাও জানার চেষ্টা করল। কিন্তু সব জেনেও সে চুপ থাকল, আর অপেক্ষা করল, রানি নিজেই কবে সবকিছু বলবে। অথচ রানি কিছুই বলল না। অবশেষে হতাশ হয়ে বড় রাজা রানিকে তার নিঃসন্তান থাকা নিয়ে খোঁটা দিতে লাগল। তবে রানি তাতেও কিছু বলল না। রাজা বুঝল, সে রানির মন ভাঙতে পারবে না। কারণ সত্য যাই হোক না কেন, সে রানিকে সত্যিই ভালোবাসে। আর ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।”
তারপর আরিয়ান রোমানার কাঁধ থেকে মাথা তুলে তার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আর সেই রানি কে জানো?”
রোমানা শূন্য চোখে আরিয়ানের চোখে দৃষ্টি রেখে গভীর কণ্ঠে বলল, “সাওদা রোমানা।”

Tell me who I am 2 part 3