Home Tell me who I am 2 Tell me who I am 2 part 3

Tell me who I am 2 part 3

Tell me who I am 2 part 3
আয়সা ইসলাম মনি

এবার আরিয়ান কপট গাম্ভীর্যে হেসে বলল, “আর এখানে বড় রাজা হচ্ছে আরিয়ান চৌধুরি, আর ছোট রাজা কারান চৌধুরি। গল্পটা কেমন ছিল, প্রিয়দর্শিনী?”
রোমানা ঠোঁটে আলতো হাসির রেখা ফুটিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল, “অনেক সুন্দর।”
“তবে আর যাই বলো, আমার রোমানাকে ঝগড়াতেই ভালো লাগে। তোর সাথে ঝগড়া করা ছাড়ছি না, শালির ঘরের শালি।”
রোমানা সেই চিরচেনা দুষ্টামির ঘূর্ণিতে ডুবে গিয়ে এবার আরিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে তার বুকের ওপর উঠে বসল। ঝাঁঝালো হাসিতে বলল, “আমিও এ জনমে তোমাকে মারামারি থেকে ছাড় দিচ্ছি না, শালার ঘরের শালা।”
আরিয়ানের বুকের ওপর ওর ওজন পড়তেই সে অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করল। হাসিমুখে বলল, “রমু নামটা কিন্তু ভালো ছিল। কী বলো?”

রোমানার চোখে একরাশ কোমলতা, আর ঠোঁটে একটুখানি দুষ্টু হাসি খেলে গেল। সে মাথা নীচু করে আরিয়ানের ঠোঁটের কাছাকাছি চলে এলো। তারপর দু’আঙুল বন্দুকের ট্রিগারের মতো সাজিয়ে তার বুকের উপর সেই আঙুল দুটো চেপে রেখে, ঠোঁট কামড়ে বলল, “দিব নাকি বুকের মধ্যে গুলিটা ঢুকিয়ে?”
আরিয়ান নিঃশব্দে হেসে ফেলল। সে রোমানাকে একটানে ঘুরিয়ে দিয়ে বিছানায় ফেলে দিল, তারপর তার গাল ছুঁয়ে ধীরে ধীরে উপর দিকে উঠল। কিছুক্ষণ গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রোমানার কপালের উপরে থাকা চুলগুলো মমতার পরশে সরিয়ে দিল।
এই দৃষ্টির গভীরতা রোমানার ভেতর প্রশান্তির ঢেউ তুলল। মৃদু কণ্ঠে বলল, “একটা কথা বলো তো, বেকার জীবন রেখে আবার কবি হওয়ার ধান্দায় নামলে না তো?”
আরিয়ান সেই প্রশ্নের উত্তরে তার ঠোঁটে এক গভীর চুম্বন রেখে দিল। রোমানা হালকা হেসে আরিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরল।

আরিয়ান মৃদু হেসে বলল, “চেষ্টা করছি বউকে কিছু একটা উপহার দেওয়ার। হোক না, কবি হয়ে যাই।”
এই কথায় রোমানার মস্তিষ্কে ভালোবাসার ঢেউ আছড়ে পড়ল। আজ তার মনটা অনেক হালকা লাগছে, যেন দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা সব অপূর্ণতা, দমবন্ধ করা কষ্টগুলো সরে গেছে।
তবুও প্রেমের গভীরতায় ভেসে যাওয়ার চেয়েও দুষ্টুমিতে তার হৃদয় বেশি প্রশান্তি খোঁজে। তাই সে হাসিমুখে আচমকা আরিয়ানের পেটে ঘুসি মারল।
আরিয়ান চিৎকার করে উঠে পড়ল, “কু*ত্তার বাচ্চা রোমানা! এ জনমে তুই আর শুধরাবি না।”
রোমানা ঠোঁটে অট্টহাসি ফুটিয়ে বলল, “ওটা আর আমার দ্বারা হচ্ছেও না।”

প্রতিদিন মানুষের কোলাহল থাকলেও পার্কের জায়গাটা আজ নিস্তব্ধ। অবশ্য এর পিছনে কারণ রয়েছে। ঘণ্টাখানেক আগে বৃষ্টি হয়েছিল। তাই কাদার গন্ধ বাতাসে মিশে অপার্থিব সুবাস হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘাস নুয়ে পড়েছে, আর গাছের কানায়-কানায় জমে থাকা জল টুপটাপ করে ঝরে পড়ছে।
হালকা বাতাস কাব্যের শরীরে লাগতেই প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল। পার্কের এক কোণে, প্রায় জনমানবশূন্য বেঞ্চে অনেকক্ষণ ধরে নিঃশব্দে বসে রয়েছে সে। কিন্তু কোথাও ইলিজার খোঁজ নেই। ইলিজা ফোন ব্যবহার করে না, তাই যোগাযোগেরও উপায় নেই। একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, বেলা ৪টা ২৭ বাজে। অথচ ইলিজা তো বলেছিল, সাড়ে তিনটার মধ্যেই এসে পড়বে। সময়ের এই বিলম্বে তার প্রতিটি নিশ্বাসে ঘনীভূত হয় উদ্বেগ। মনটা বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সে অবচেতনেই পা নাড়াতে শুরু করল। হঠাৎ করেই এক গভীর আশঙ্কা তার হৃদয়ের কোণে থমকে দাঁড়াল।
বেঞ্চ থেকে উঠে পড়ল সে। কণ্ঠে ধরা পড়ল কম্পিত সুর, “আমার কি তবে ওকে আসতে বলা ঠিক হইলো না? যদি কিছু হইয়া যায়… হে আল্লাহ, আমার ইলিজাকে রক্ষা করো।”

হঠাৎ করেই কোথা থেকে যেন চোখের সামনে সেই ভয়াবহ দিনটির প্রতিটি দৃশ্য ধরা দিল। OWL-দের তাড়া করা, ইলিজার আতঙ্কে কাঁপতে থাকা শরীর, ঝোপের আড়ালে প্রাণপণে লুকিয়ে থাকা, আর সেই শেষ মুহূর্তের অলৌকিক রক্ষা—আল্লাহ যেন নিজ হাতে ওদের টেনে এনেছিলেন বিপদের কিনার থেকে।
এইসব স্মৃতির স্রোত মাথায় ঝাঁপিয়ে পড়তেই কাব্যের শরীর ঝিমিয়ে পড়ল। বুকের ভেতর ভয় চেপে বসল। আচমকা অস্ফুট স্বরে ফুঁসে উঠল সে, “মিস ইলির কিছু আবার… শিট শিট, আমি ম’রেই যাব! এমন কিছু যেন না হয়! ওর কিছু হইলে… ওর সাথে আমার প্রানটাও নিয়া নিও, আল্লাহ! না না, কি সব ভাবছি আমি!”
ঠোঁট চেপে ধরে দাঁত দিয়ে অধরে কামড় বসাল। ঠিক সেই মুহূর্তেই তার চোখ পড়ল সামনের দিক থেকে এগিয়ে আসা আবছা এক অবয়বে। দূর থেকে দেখে অন্য কেউ হলে হয়ত চিনতেই পারত না। কিন্তু কাব্য তো আর অন্য কেউ নয়। তার হৃদয়ের সমস্ত স্নায়ু চিৎকার করে বলে উঠল—ইলিজাআআআ!
ইলিজার পরনে আজ কালো গোল দীর্ঘ এক জামা, গলায় আলতোভাবে মেরুন ওড়না ঝুলে রয়েছে, আর হালকা বাতাসে চুলের বর্ণচ্ছটা দুলছে।

তাকে দেখা মাত্রই কাব্য আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। দৌড়ে গিয়ে ইলিজার সামনে পৌঁছে গেল। ইচ্ছে হলো ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে জড়িয়ে ধরে, বুকের গহিন থেকে উঠে আসা অস্থিরতা মুছে ফেলে প্রশান্তির আশ্রয়ে ঢেকে দেয় মুখটাকে। কিন্তু পারল না, কারণ সে জানত; এই অনুভব প্রকাশের অনুমতি এখনো তার হয়নি।
শেষমেশ হাঁপাতে হাঁপাতে ইলিজার হাত ধরল। ঝাঁকি দিয়ে বলল, “এই…”
তারপর আরও কিছু মুহূর্ত নিশ্বাস নিতে নিতে স্বর গভীর করল, “এই আপনি এত দেরি করলেন কেন, হ্যাঁ? কত চিন্তা হচ্ছিল বুঝতে পারেন?”
ইলিজা নির্বিকার। সে তো সুস্থ, স্বাভাবিক, প্রাণবন্তই আছে, তবে কাব্য এমন আতঙ্কিত কেন?
হালকা হেসে সে বলল, “আরে, আম্মু বৃষ্টি দেখে আসতে দেয় নাই। চলুন, গিয়ে বসি।”

ওরা পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। ইলিজা ঠিকই টের পায়, তার হাতটা একটানা কাব্যের তালাবদ্ধ আঙুলে জড়িয়ে আছে। কিন্তু সে সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে হেঁটে চলল। না, এই অনাহুত স্পর্শে সে বিরক্ত নয়; বরং ভিতরে কোথাও উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। এমন অনুভব তার জীবনে নতুন, একেবারেই নতুন। তবুও সে চুপ থাকল।
অবশেষে রাস্তার একপাশে ছায়াবৃত বেঞ্চে এসে দুজন বসে পড়ল। কিছুক্ষণ পর ইলিজা ধীরে কৌশলে তার হাতটা ছাড়িয়ে নিল কাব্যের হাত থেকে। কারণ সে চায় না কাব্য হঠাৎ অনুধাবন করুক, যে সে ভুল করে এমন কিছু করে ফেলেছে। তেমনটা হলে কাব্য সঙ্গে সঙ্গে গুছিয়ে ফেলবে দুঃখিত দুঃখিত বাক্যগুচ্ছ, সেসব বলেই সে সময়টাকে শুধু শুধু নষ্ট করবে। আর ইলিজার হাতে এখন সময়ের তাড়া; সন্ধ্যার আগেই তাকে ফিরতে হবে ঘরে।
কাব্য তখনো চুপচাপ। তার চোখ স্থির। সে বুঝতে পারল না, কী উচ্চারণ করে কথোপকথন শুরু করা যায়! অথচ ইলিজা এক নজরেই আজ কাব্যকে পড়ে ফেলেছে।

প্রতিদিনের ছেলেমানুষি বা এলোমেলো চেহারার ভীড়ে আজকের কাব্য যেন অন্যরকম। সাদা শার্ট আর কালো প্যান্টে তার উপস্থিতি আজ পরিপক্ব, পরিণত। আজ প্রথমবার সে তাকে এমন পরিপাটি রূপে দেখল।
তবে একটি বিষয় তার চোখে আলাদা করে ধরা দিল। সেটা হলো কাব্যের চোখে একজোড়া চশমা। না, সেটি কোনো আড়ম্বরপূর্ণ ফ্যাশন নয়, বরং প্রয়োজনীয়তার খাতিরে পড়েছে। আজকের শ্যামবর্ণ, একটুখানি ক্লান্ত, একটুখানি অস্বস্তিতে মোড়া কাব্যকে দেখতে ভালোই লাগছে। মনটা বলে—এই হাতটা ওর হাতে রেখে বহুক্ষণ বসে থাকতে, ওর চোখের দিকে একটানা চেয়ে থাকতে।

কিন্তু এমন কিছু প্রকাশ করলে কাব্য হয়ত আরও লজ্জায় পড়ে যাবে। কারণ আজ সে অদ্ভুত রকম সংকোচে ডুবে আছে। চোখ তুলে তাকাতেও পারছে না। কিন্তু তার কীসের এত সংকোচ, ইলিজা জানে না।
ইলিজার মন ভার হয়ে আসল। কখন থেকে বসে আছে তারা, কিন্তু কোনো কথা নেই। সে বুঝল, এই নীরবতা তাকেই ভাঙতে হবে। তাই অভ্যস্ত ভঙ্গিতে গলায় হালকা কাশির শব্দ করল।
এই সামান্য শব্দটিতেই কাব্যের ঘোর ভাঙল। সে চমকে তাকিয়ে বলে উঠল, “কি-কি হয়েছে? পানি খাবেন?”
ততক্ষণে ইলিজার ঠোঁটে নরম হাসি খেলে গেল, যার উষ্ণতায় কাব্যের বুকের ভেতর অজানা সাড়া জেগে উঠল। সে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল ইলিজার মুখপানে—এই মুখ তো বহুবার দেখেছে সে, অথচ প্রতিবারই প্রথমবার মনে হয়।
কাব্য গলাটাকে একটু পরিষ্কার করে নিতে নিতে চোখ নামিয়ে ফেলল। ইলিজা মুচকি হেসে বলল, “কি ব্যাপার বলুন তো? আজ হঠাৎ যেন নতুন মনে হচ্ছে আপনাকে।”
কাব্য এক ঝটকায় চোখ তুলে প্রশ্ন করল, “দেখতে কি ভালো লাগছে না?”
ইলিজা মাথা নেড়ে বলল, “খারাপ না, বরং একটু বেশিই ভালো লাগছে। এভাবে পরিপাটি থাকলেই তো পারেন। তা না, উল্লুকের মতো থাকবেন।”
কাব্য লাজুক হাসল। হঠাৎ ইলিজার চোখ সরু হয়ে এলো, কৌতূহলে ভরা কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “পেছনে কি লুকিয়ে রেখেছেন?”

সেই মুহূর্তে কাব্য ঘোর থেকে জাগল। তার হাতের পেছনে ছোট্ট একটা বুকে আঁকড়ে ধরেছিল, অথচ তার মনেই ছিল না। বুকেটা রঙিন কাগজে মোড়া, যেখানে কোনো দামি গোলাপ কিংবা অর্কিড ছিল না; ছিল রাস্তার ধারে জন্ম নেয়া কিছু সাধারণ ফুল, যাদের সৌন্দর্য চোখে পড়ে না অধিকাংশের। তবে সে জানত, ইলিজার চোখ সেই সাধারণতায় অসাধারণতা খুঁজে নিতে পারে।
কাব্য আস্তে করে বুকেটা ইলিজার দিকে এগিয়ে দিল। ইলিজার চোখ বিস্ফোরিত হল। শিশুর মতো হেসে তাড়াতাড়ি সেটা কাব্যের হাত থেকে টেনে নিল। ইলিজা তো প্রায় নাচতে শুরু করবে, এমন ভাব করল।
কাব্য মাথা নীচু করে বলল, “আপনাকে ওত টাকা দিয়ে দামি ফুল কিনে দেওয়ার সামর্থ্য আমার নেই। তাই নিজের মতো করে বানিয়ে…”
কিন্তু ইলিজা তাকে আর বলতে দিল না। বাধভাঙ্গা আনন্দের অনুভূতি নিয়ে বলল, “আল্লাহ! মনে হচ্ছে আজ আমি চাঁদ হাতে পেয়েছি। এত খুশি লাগছে! এত সুন্দর ফুলগুলো! জানেন, এগুলো আমার কত পছন্দের ফুল! ইশ, কত্তগুলা ফুল!”
এটা শুনে কাব্য তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, তার মুখ আজ বিকেলের শেষ আলোর চেয়েও বেশি উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। কাব্যের হৃদয়ে শুধু একটাই আশা—এই মেয়ে যেন এভাবেই সারাজীবন হাসতে থাকে।
কাব্য ঠোঁট ভিজিয়ে আলতো হেসে বলল, “হাঁটবেন?”

“চলুন।”
এরপর দুজন ধীরে ধীরে রাস্তায় হাঁটতে শুরু করল। ইলিজা খুশিতে এতটাই আত্মহারা হয়ে ছিল যে মাঝেমধ্যে পায়ের তাল কেটে যাচ্ছিল। কাব্য মাঝে মাঝে তার দিকে তাকাল, তার এই প্রাণবন্ত মুখ দেখে নিজের অজান্তেই মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তবে মুহূর্ত পরে লজ্জা বা দ্বিধায় আবার চোখ নামিয়ে নিল সে।
হঠাৎ করেই ইলিজা বলে উঠল, “আপনার সেই পাগ’লা সিঙ্গার বন্ধুর কি খবর?”
শব্দগুলো কাব্যের আনন্দের আবরণ ছিঁড়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে চোখমুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মনোজগতে নামল হতাশার স্তব্ধতা। সে তো এসেছিল ইলিজার সঙ্গে কয়েকটি নিরালা মুহূর্ত কাটাতে—যেখানে শুধু দু’জনার কথোপকথন থাকবে। খুব বেশি সময় তো নেই, একটু পরেই তো ইলিজাকে চলে যেতে হবে। এই স্বল্প সময়েও শুভ্রর প্রসঙ্গ না উঠালেই হতো না?
কাব্যের থমথমে মুখে একরাশ অপ্রকাশিত ক্ষোভ দেখা গেল। তার দিকে তাকিয়ে ইলিজা নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“কি হলো?”
কাব্য কিছু না বলে চুপ রইল। ইলিজা চোখ রাখল তার চেহারায়, কপালে একটু ভাঁজ ফেলে বলল, “আরে, কি হয়েছে বলবেন তো?”
কাব্য মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল, “আমার খবর তো জিজ্ঞেস করলেন না, আমি কেমন আছি, সেটা তো জানতে চাইলেন না। কিন্তু ওর খবর নিতে ঠিকই ভুললেন না আপনি।”
ইলিজা এবার খিলখিল করে হেসে উঠল।
“ওমা! আপনি আবার রাগও করেন নাকি?”
কাব্য একটু ধীর গলায় বলল, “রাগ না, অভিমান। আর একবার যদি আমার রাগ দেখাই… আপনি হয়ত আমার সামনে বেশিক্ষণ টিকতে পারবেন না।”
ইলিজা আবার ঠোঁটে হাসি টেনে বলল, “একটা প্রশ্ন করব?”
“কেন নয়?”
“আপনি হঠাৎ চশমা পড়া শুরু করলেন কবে থেকে?”
“বহুত কষ্টের ইতিহাস। সারারাত কোডিং করতে করতে চোখের বারোটা বেজেছে। ঝাপসা দেখি এখন সবকিছু।”
ইলিজা কিছু বলল না। কেবল চোখ নামিয়ে হেঁটে চলল। আপনমনে বলল, “তবে যাই বলেন, চশমাতেও আপনাকে ভালোই লাগছে।”

একটু চুপ থেকে কাব্য নিজেই বলল, “আপনার কি কোনো ছেলেকে ভালো লাগে, মিস ইলি?”
ইলিজা চোখ গোল করে বলল, “লাগে তো! কোরিয়ান ছেলেরা আমার সব পছন্দ।”
কাব্যের কণ্ঠ হঠাৎ গভীর হয়ে উঠল, “অলীক স্বপ্নের পেছনে ছুটে হৃদয় ক্ষয় করবেন না; ধরাছোঁয়ার বাইরের ফিকে কল্পনায় ডুবে থাকা শুধু ক্লান্তি ডেকে আনবে। হৃদয়ের মরীচিকায় নয়, কিংবা ক্ষণস্থায়ী বিভ্রমে নয়, বরং ভালোবাসা দিন তাকে—যে বাস্তব, যে নিশ্বাসের দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে আপন হয়ে ওঠার অপেক্ষায়।”
তার কথা শুনে ইলিজার মুখের হাসিটা ম্লান হয়ে গেল। সে চোখ নামিয়ে ফেলল; হয়ত বুঝতে পারল কাব্য কী বলতে চাইছে।
ঠিক তখনই পাশ দিয়ে এক আচারওয়ালা হেঁটে যাচ্ছিল। কাব্য হঠাৎ তাকে দেখে হাত তুলে চিৎকার করল, “ওই মামা! দাঁড়ান!”
ইলিজা ডাক শুনে চোখ তুলে তাকাল। ততক্ষণে কাব্য এগিয়ে গেছে। ইলিজা ডাকতে চেয়ে মুখ খুলেছিল, ‘না থাক, লাগবে না। আমি খাবো না।’
কিন্তু বলতে গিয়েও থেমে গেল, হাতটা সামান্য উঠিয়েও আবার নামিয়ে ফেলল।
কাব্যকে আটকাতে চেয়েছিল, কারণ জানত তার পকেট প্রায়শই ফাঁকা থাকে, চেয়েছিল ছেলেটির কষ্টকে আর না বাড়াতে। কিন্তু মুহূর্তকালেই এক অলক্ষ্যে সে ত্যাগ করল সেই চিন্তা। আপনমনে বলল, “থাক, প্রয়োজন নেই আটকানোর।”

তার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল। সব মুহূর্ত টাকায় মাপা যায় না। কিছু মুহূর্ত উপভোগ করা জরুরি, না-হলে জীবনের স্বাদটাই মাটি হয়ে যায়।
অল্প কিছুক্ষণ পর কাব্য হাতে আচার, চানাচুর, জলপাই আর তেঁতুলের ছোট প্যাকেট নিয়ে ফিরে আসল। হাসিমুখে ইলিজার হাতে সেগুলো ধরিয়ে দিল।
ইলিজা খেতে খেতে হাঁটতে থাকল। কাব্য এবার নরম গলায় বলল, “বাংলাদেশি কোনো ছেলেকে ভালো লাগে আপনার?”
ইলিজা আচার চিবোতে চিবোতে মৃদু হেসে বলল, “লাগে। তার চোখে একধরনের মায়া আছে, যেটা আমাকে খুব টানে।”
এ কথা শুনে কাব্য এক লাফে ইলিজার সামনে এসে দাঁড়াল। উৎকণ্ঠায় তার গলাটা কেঁপে উঠল, “কা-কাকে?”
ইলিজা কাব্যের উসখুসে মুখ দেখে চুপিচুপি হাসল। অন্যদিকে চোখ সরিয়ে বলল, “সে বুয়েটের স্টুডেন্ট। আপনারই ব্যাচমেট।”
শুনেই কাব্যের মুখ ভার হয়ে আসল। এক মুহূর্তেই তার পৃথিবীর সব রং ফিকে হয়ে গেল। মৃদু স্বরে প্রশ্ন করল, “শুভ্র?”

কাব্যের ভারী মুখ দেখে ইলিজা এবার আর হাসিটা আর লুকিয়ে রাখতে পারল না। বলল, “সে তো আমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।”
এক নিমিষেই কাব্যের ভিতর আনন্দের ঝড় বয়ে গেল। বহু কাঙ্ক্ষিত সেই মিস ইলির মনে আজ একটু জায়গা করে নিয়েছে সে। তবুও মুখে এসব উত্তেজনা ফুটাল না। শুধু ঠোঁটে হাসি চেপে ধরে রেখেছিল।
সে পাশে এসে হাঁটতে থাকল আবার। ইলিজা চানাচুরের প্যাকেটটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল। কাব্য এক মুঠো তুলে মুখে পুরে খেতে খেতে হাসল।
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটল।
এরপর কাব্য হঠাৎ বলল, “আপনাদের বাসার আশেপাশে কোনো ব্যাচেলর টু-লেট লাগাইছে নাকি?”
“জানা নেই। কেন?”
“মনে হচ্ছে রুমটা ছাড়তে হইবে। হা*রামজাদা বাড়িয়ালার চামচাটায় কখন কি কইরা বয়, ওরে আমার বিশ্বাস নেই।”

গালাগাল করেছে বলে একটু থেমে বলল, “সরি, কিছু মনে করবেন না আবার।”
ইলিজা কিছু একটা বলতে যাবে, এমন সময় হঠাৎ গলায় কাশি উঠে যায়। কাব্য আঁতকে উঠে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে পাশের দোকানের দিকে চলে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই হাতে একটি পানির বোতল নিয়ে ফিরে আসল। দ্রুত ঢাকনা খুলে ইলিজার সামনে ধরল। ইলিজা এক নিশ্বাসে পানি খেয়ে নিল। গলায় একটু আরাম লাগতেই বোতলটা ফেরত দিতে যাবে, এমন সময় তার চোখ পড়ল বোতলের গায়ে লেখা কিছু শব্দে। ‘মিস ইলি, সারাংহে।’ কোরিয়ান ভাষায় যার মানে, ‘মিস ইলি, আমি তোমাকে ভালোবাসি।’ যেহেতু ইলিজার কোরিয়ান পছন্দ, সেজন্যই কাব্য তেমন ভাবেই প্রস্তাব দিয়েছে।
ইলিজা স্তব্ধ হয়ে গেল। পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকল বোতলের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলে কাব্যের মুখের দিকে তাকাল। একটা অজানা আবেগ হালকা গুঞ্জন তুলে বুকের ভেতর দিয়ে ছড়িয়ে পড়ল সারা দেহে। কণ্ঠ শুকিয়ে আসল, হৃৎস্পন্দন এলোমেলো হয়ে উঠল। এমন সরাসরি অপ্রত্যাশিত প্রস্তাব পেতে পারে, ইলিজার কল্পনাতেও ছিল না।

কাব্য তার দিকে চেয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল, “আপনার উত্তর দেওয়ার কোনো তাড়াহুড়ো নেই, মিস ইলি। সময় নিন আপনি। একদিন, একমাস এমনকি গোটা জীবন যদি লাগে, তবুও আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না। কারণ আমি আপনাকে ছাড়া কোনো জগৎ কল্পনা করতে পারি না। আমার সমস্ত সত্তা, হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন কেবল আপনাকেই চায়। আপনাকে ছাড়া আমার কোনো সকাল নেই, নেই কোনো স্বপ্নের রং। আপনি আমার অস্তিত্বের এমন গভীরে গেঁথে আছেন, যেখান থেকে সরানো অসম্ভব। এই ভালোবাসা শব্দে ধরা পড়ে না, এটা কেবল অনুভবের বিষয়। যেমন আপনি শুধু অনুভব করার মতো।”

ইলিজার ঠোঁটের কোণ কাঁপল, নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠল; বুকের ভেতর গুমরে ওঠা আবেগ তাকে নিঃশব্দ করে রাখল। কাঁপা হাতে বোতলটা তুলে ধরে রাখল শুধু। সে কিছুটা সময় নিয়ে ভাবলো। মনে হচ্ছিল, এক ঝলক সাহস বুকের ভেতর থেকে উঠে আসছে। সে গভীর নিশ্বাস নিয়ে ঠোঁট খুলে কিছু বলতে চাইলো, কিন্তু ঠিক তখনই হঠাৎ বৃষ্টির ধারা নেমে এলো। কাব্য তৎক্ষণাৎ ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে ইলিজার মাথার ওপর ধরে দাঁড়ালো।
বৃষ্টির প্রথম শীতল ফোঁটাটা ইলিজার গায়ে পড়ায় তার শরীরটা কেঁপে উঠল। সে জামার হাতা গুটিয়ে নিয়ে নিজের কাঁধ জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকল।

কাব্য চুপচাপ তার পাশে এসে দাঁড়াল। ছাতাটা এমনভাবে এগিয়ে ধরল, যেন আর একটাও ফোঁটা না পড়ে ইলিজার গায়ে। ছাতার উপর টপটপ করে ঝরে পড়া বৃষ্টিধ্বনি ছন্দে ছন্দে দুই হৃদয়ে জন্ম নিল নিঃশব্দ আলোড়ন।
বৃষ্টিভেজা নরম রাস্তায় দুজন হাঁটতে থাকল। বৃষ্টির হালকা ছিটে গায়ে লাগছে বলে ইলিজা নিজেকে একটু গুটিয়ে নিল কাব্যের দিকে। আর ঠিক তখনই, দুই হাত ও কাঁধ অনিচ্ছায় একে অপরকে ছুঁয়ে গেল।
তাদের কাছে সে স্পর্শ যেন বিদ্যুতের মতো মনে হলো। শরীর থেকে মনের গহীনে একটা শিহরন ছড়িয়ে গেল। ইলিজার হাতটা ঠান্ডা, আর কাব্যের হাতটা উষ্ণ;
এই দুই বিপরীত তাপের সংস্পর্শে মুহূর্তের জন্য দমবন্ধ হয়ে আসল। হৃৎপিণ্ড ভুলে গেল তার স্বাভাবিক ছন্দ।
ইলিজা চমকে গিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। তার গালজুড়ে লজ্জার লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে।
কাব্য বিব্রতভাবে নিজ হাত সরিয়ে নিল। পরিস্থিতির ভারসাম্য ফেরাতে গলা খাকরিয়ে বলে উঠল, “উঁহুঁ… ঠিক আছেন তো আপনি?”

ইলিজা নীচু চোখে, কাঁপা কণ্ঠে জবাব দিল, “হ্যাঁ… মানে, ঠিক আছি।”
কাব্যের ঠোঁটে তখন একফালি হাসি খেলে গেল। তারপর আচমকা ছাতাটা ইলিজার হাতে তুলে দিয়ে নিজে এক ধাপ পিছিয়ে গিয়ে বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ইলিজা অবাক হয়ে তাকাল। কাব্যের এমন অপ্রত্যাশিত বেপরোয়া আচরণে চোখ বড় বড় করে বলল, “এই কাব্য, কী করছেন আপনি? ভিজে যাবেন তো!”
কাব্য হাসল। তার ভিজে চুল গাল বেয়ে নামছিল। চোখের পাতা থেকে বিন্দু বিন্দু বারিধারা পড়ছিল। কাব্যের শুভ্র পোষাকের কিছু অংশ ভিজিয়ে দিয়েছে, যার ফলে তার দেহের অন্তর্নিহিত গঠনের আবছা রেখাচিত্র স্পষ্ট হচ্ছিল। গঠন ততটা সুঠাম নয়—একজন সাধারণ যুবকের মতোই, তবে শীর্ণ কিংবা স্থূলও নয়। শ্যামবর্ণ চেহারাটা বৃষ্টিতে ভিজে আরো সুদর্শন, আরো আকর্ষণীয় লাগছিল। ইলিজা সবকিছু দেখেও অস্বস্তি বোধ হওয়ায় চোখ ফিরিয়ে নিল। এদিকে কাব্য পকেট থেকে ভাঙা স্ক্রিনের ফোনটা বের করে ক্যামেরা চালু করল।
“এই মুহূর্তটাকে ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করে রাখতে চাই, বুঝলেন ম্যাডাম?”
ইলিজা সামান্য কপাল কুঁচকে বলল, “বাহ রে! ছবি তোলার জন্য কেউ নিজেকে এভাবে ভিজায় নাকি? আপনি এদিকে আসুন তো।”

কাব্য তার চোখে চোখ রেখে মৃদু হেসে বলল, “এমন নিখুঁত একটা মুহূর্ত যদি ক্যামেরায় বন্দি না করি, তাহলে মনে হবে অপরাধ করছি। আপনি যে এত সুন্দর করে ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে আছেন—এই দৃশ্য না ধরে রাখলে আত্মাকে কেমন যেন পাপী মনে হবে, মিস ইলি।”
ইলিজা স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। কি মারাত্মক তার চাহনি!
ওদিকে কাব্য ক্যামেরাটা নিজের শুভ্র শার্টের কিনারা দিয়ে মুছে নিল। এরপর ইলিজার ছাতা ধরা ক’টা ছবি তুলে নিল। ইলিজা হালকা হাসল। তবে তার স্বভাবের সঙ্গে এমন হাসি বেমানান। হাসতে হাসতে কোমর দুলিয়ে, হাত ছুঁড়ে পোজ দেওয়ার সময় সে পার করে এসেছে। এখনকার ইলিজা জানে, সব দুষ্টুমি সব বয়সে মানায় না। অর্থাৎ সেই দুষ্টু ইলিজাটাও আজ অনেকটা বড় হয়ে গেছে।
কিছু সময় চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে, অবশেষে নরম কণ্ঠে বলল, “আপনার ছবি তোলা শেষ হলে এবার ছাতার নিচে আসুন। এত বৃষ্টিতে ভিজলে পরে ঠান্ডা লেগে যাবে তো।”

কাব্য ম্লান হাসি মুখে ইলিজার সম্মুখে স্থির হয়ে দাঁড়াল। চোখ নামিয়ে একবার ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে বলল, “দেখুন তো, কোন ছবিটা সবচেয়ে ভালো হয়েছে? যদিও ফোনটা পুরোনো, ছবি খুব একটা ঝকঝকে আসে না। কিন্তু আমার পরম সৌভাগ্য এই যে, দিনের আলোতেও চাঁদমুখ বন্দি করেছি আমি।”
ইলিজা হেসে চোখ নামিয়ে ছবি দেখতে দেখতে মৃদু কণ্ঠে বলল, “সবগুলোই সুন্দর।”
“না না। একটা সিলেক্ট করুন। ওয়ালপেপারে দিবো।”
ইলিজা চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল, “ওমা! কেন? কেউ দেখলে কি বলবে?”
কাব্য এক পা এগিয়ে এলো। গলায় আবেশ আর চোখে স্থিরতা নিয়ে শুধালো, “কে কী বলবে, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আপনি শুধু এটুকু জেনে রাখুন, আপনি শেখ আরভিন কাব্যের ভবিষ্যৎ সঙ্গিনী। একদিন যদি আপন মন খুলে সম্মতি দেন, হয়ত সোনার সিংহাসন দিতে পারবো না, কিন্তু আমার হৃদয়ের অমর সিংহাসনে আপনি হবেন চিরদিনের রাজরানি।”

এমন লজ্জাজনক পরিস্থিতিতে ইলিজার মনে হলো—এখানেই আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে মাটিতে ঢলে পড়া উচিত, নতুবা এক দৌড়ে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া উচিত। সপ্তদশীর অন্তঃপ্রকোষ্ঠে একে একে অনুরাগের রঙিন পল্লবিত প্রস্ফুটন ঘটতে থাকল। কাব্যের চোখে যে অনড় প্রত্যয় ছিল, তা দেখে ইলিজার বুকের গভীর গহ্বরে এক অস্ফুট কম্পন বয়ে গেল। লজ্জা আর অভিব্যক্তির উত্তেজনায় সে দৃষ্টি নামিয়ে নিল। জীবনে বহুবার প্রস্তাব পেয়েছে সে, কিন্তু এমন কাব্যময় আবেদন সে কখনো প্রত্যক্ষ করেনি। তার কিশোরী হৃদয় প্রথমবারের মতো শুনল পরিশীলিত, অকৃত্রিম ভালোবাসার সেই আবেশময় কণ্ঠস্বর; যা বারবার কানে বাজছিল।
তবে সেই অপূর্ব মুহূর্তেও ভাগ্য একটা খেলা খেলতে ভুলল না। সম্মুখ থেকে দ্রুতগতির একটি গাড়ি ছুটে এলো। কাদা ছিটকে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে কাব্য ইলিজাকে এক টানে নিজের বুকের সামনে নিয়ে এলো। ইলিজার শরীর এসে ঠেকল তার বুকে।

কাদাজল এসে ছিটকে পড়ল ইলিজার সৌন্দর্যে মাখা কালো কুর্তায়। ইলিজার এ অবস্থা অবলোকন করে কাব্যের ঠোঁটে সংবরণকৃত হাসি ফুটে উঠল। তবে হাসিটা চেপে রেখেছে সে।
ইলিজা স্তব্ধ হয়ে গেল। কটমট করে বলল, “আপনি এটা কেন করলেন? কেউ কি এমনভাবে অপরকে কাদায় মাখামাখি করিয়ে নিজেকে বাঁচায়?”
কাব্য মাথা নাড়িয়ে শান্ত স্বরে বলল, “আমি আসলে ছাতাটাই টানতে চেয়েছিলাম। ভুল করে আপনি সামনে এসে পড়েছেন। সত্যি বলছি, ইচ্ছাকৃত ছিল না। ভেবেছিলাম ছাতা খুলে আপনার সামনে ধরব, কিন্তু ভুল করে আপনাকে টেনে ফেলেছি।”
তবু ইলিজা ভ্রূকুঞ্চিত করে তাকিয়ে রইল। কাব্য আবার বলল, “আ’ম এক্সট্রিমলি সরি। বিশ্বাস করুন, ইচ্ছা করে করিনি।”

এবার ইলিজা হঠাৎ করেই হেসে ফেলল। কাব্য বিস্মিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকল। ইলিজা বলল, “হয়েছে, এত সরি বলতে হবে না। এমনিতেই আমাদের সম্পর্কটা অঘটনের মধ্যে দিয়েই শুরু। তাই দু-একটা অঘটন না হলে কি আর জমে?”
তারপর সে আবার হেসে উঠল। অথচ কাব্য অপলক তাকিয়ে রইল। কতটা নিখুঁত সেই হাসি, কতটা মায়াবী সেই চোখ— দেখে মনে হয়, একে জীবনভর একটানা দেখলেও তৃষ্ণা যাবে না।
কাব্য কিঞ্চিৎ হেসে বলল, “এদিকে আসুন।”
ইলিজা মাথা নাড়িয়ে তার পিছু নিল। একটু হাঁটার পর তারা এক লেকের ধারে এসে দাঁড়াল। কাব্য হেসে বলল, “আপনি উপরে দাঁড়ান। আমি একটু পানি নিয়ে আসি।”
“আচ্ছা।”

কাব্য গিয়ে সেই ফাঁকা বোতলে পানি ভরে আনল। তারপর মাটিতে বসে আলতো করে ইলিজার পায়ের উপর জল ঢেলে হাত দিয়ে কাদা পরিষ্কার করতে লাগল। প্রথমবার কোনো পুরুষ তার পায়ে হাত রাখছে, এই অনুভবে ইলিজা দু কদম পিছিয়ে গেল।
সে জানে, এই স্পর্শে কোনো লালসা নেই, কেবলই কোমল ভালোবাসা আছে। তবুও শরীরটা কেঁপে উঠল। ওদিকে কাব্য একটু থমকে গেল। মনে মনে বলল, “কিছু ভুল করে ফেললাম না তো?”
সংকোচে চোখ নামিয়ে বলল, “স-সরি। আপনি যা ভাবছেন, আমি সেরকম কিছু ভাবিনি। শুধু পা ধোবার জন্যই হাত দিয়েছি। আল্লাহর কসম, আমার মনে কোনো খারাপ ইচ্ছা ছিল না। আপনি যদি নিজেই ঝুঁকতেন, ভিজে যেতে পারতেন বা পা পিছলে পরে যেতেন, এই ভেবেই…স-সরি, মিস ইলি।”
কিন্তু ইলিজা চুপ করে মাথা নামিয়ে রাখল। তার নিশ্বাসের গতি বেড়েই চলেছে।
কাব্য আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বলল, “আপনি প্লিজ চুপ থাকবেন না। আপনি চুপ করে থাকলে আমার নিজেকে অনেক অপরা…”

এর মধ্যেই ইলিজা হেসে বলল, “এখনো তো ধোয়া শেষ করেননি। তাড়াতাড়ি শেষ করুন, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমাকে ফিরতে হবে তো।”
কাব্য এবার একটা প্রশস্ত, প্রশান্ত হাসি দিল। তারপর আবার মন দিয়ে খুবই যত্নে পায়ের কাদা ধুতে শুরু করল। সে পা যেন পা নয়, কোনো চকচকে সোনা। ইলিজা মুচকি হেসে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
পা ধুতে ধুতে কাব্য একবার চোখ তুলে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ঢোক গিলে বলল, “এই সময়টা যদি আরেকটু দীর্ঘ হতো!”
ইলিজা কিছু বলল না। কিন্তু তার অন্তরের ভেতরেও একই প্রার্থনা চলছে, “সত্যিই, এই সময়টা যদি একটু দীর্ঘ হতো!”
কিছুক্ষণ পর পা ধোয়া শেষ হলে কাব্য ইলিজার হাত ধরে লেকের সিঁড়ি বেয়ে তাকে উপরে নিয়ে এলো।
ইলিজা বলল, “তাহলে এবার আসি। মা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করছে।”
“হ্যাঁ, অবশ্যই। আপনার গাড়ি কোথায়?”
“ওই যে, পার্কের ওই পাশে।”
“আচ্ছা। আল্লাহ হাফেজ। সাবধানে যাবেন।”
“জি।”

ইলিজা হেসে সামনে পা বাড়াল। একটু ঘুরে একবার পেছনে তাকাল। দেখল, কাব্য এখনও তার দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টি সহ্য করা কঠিন। তাই সে আবার ঘুরে হাঁটতে লাগল। কিন্তু কিছুদূর যেতে না যেতেই পেছন থেকে ডাক এলো, “ও ইলিজা…”
সেই পরিচিত গম্ভীর, মিষ্টি, স্পর্শসঞ্জাত কণ্ঠস্বর—যেটা শুনলে ইলিজার ইচ্ছে করে, ছুটে গিয়ে কাব্যের বুকে আশ্রয় নেয়। কিন্তু সম্পর্কের বৈধতা নেই, বাস্তবতা আছে, লজ্জাও আছে। তাই চেয়েও এসব পারে না।
তবু ইলিজা আর দেরি করল না। সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
কাব্য হেসে বলল, “আপনার উত্তরের অপেক্ষায় থাকব।”
ইলিজা ঠোঁট চেপে হেসে আবার হাঁটতে লাগল।
গাড়িতে উঠে সে পিছনের কাচের ফাঁক দিয়ে আবারও একবার তাকাল কাব্যের দিকে। কাব্য এখনও তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
গাড়ি এগিয়ে চলল, কিন্তু ইলিজার বুকের ভেতর সেই অনুভূতির ঢেউ থামল না। সে অনুভূতির নাম নেই, গন্তব্যও জানা নয়, তবু এক অলৌকিক উচ্ছ্বাসে মন ভেসে যায়।

এই কয়েকদিনে মিরার পায়ের অবস্থা আগের তুলনায় অনেকটাই উন্নত হয়েছে। ব্যান্ডেজ খুলে ফেলা হয়েছে, সে এখন ধীরে ধীরে হাঁটাচলা করতে পারছে। তবুও যন্ত্রণার সম্পূর্ণ অবসান ঘটেনি।
নিস্তব্ধ টেক্সাসের বিকেলে সূর্যরশ্মির স্নিগ্ধতা ঘরের কোণে কোণে ছড়িয়ে পড়েছিল। পর্দার ফাঁক গলে আসা আলো মিরার গায়ে পড়ে অপার্থিব কোমলতা সৃষ্টি করেছিল। সে বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। দৃষ্টিকে প্রসারিত করে বোঝার চেষ্টা করল—টেক্সাসের বিকেল কেমন হয়?
চুলগুলো পেছনে কাঁকড়া ক্লিপে বাঁধা, কিন্তু কপালের কিনারে ছোট কেশরাশি বাতাসে ক্ষীণভাবে দুলে উঠছিল।
জানালার বাইরে চোখ মেললে যতদূর দৃষ্টি যায়, শুধু সবুজের বিস্তার আর ফাঁকা মাঠের সমারোহ। আশপাশে কোনো জনবসতির চিহ্ন নেই।

কারান সবসময় কেন এমন জনমানবশূন্য একাকী জায়গায় তার বাসস্থান নির্মাণ করে; মিরা জানে না, জানতেও চায় না। হয়ত এর পেছনে কোনো অতীত-নির্ভর ব্যাখ্যা আছে, কিংবা নিছক নিস্তব্ধতার প্রতি তার আকর্ষণ রয়েছে।
বাতাসের হালকা শীতলতায় মিরা একটু কেঁপে উঠল, ঠিক তখনই পায়ের ধ্বনি কানে আসতেই কারানের উপস্থিতি অনুভব করল। আজ সে কালচে নীল ট্রাউজার আর সাদা টি-শার্ট পরেছিল। সে পেছন থেকে এসে মিরার কাঁধে মাথা রাখল। সেই পরিচিত নিশ্বাস যখন গলার কাছ দিয়ে স্পর্শ করল, মিরার ঠোঁটে অজান্তেই এক চিলতে হাসি খেলে গেল। তবুও সে পিছনে ফিরে তাকাল না।
কারান ক্লান্তিকর কণ্ঠে বলল, “তুমি এখানে দাঁড়িয়ে, আর আমি ভাবছিলাম কোথায় গেলে!”
মিরা কিছু বলল না। কেবল জানালার বাইরের বিস্তীর্ণ নীরবতায় দৃষ্টি মেলে রাখল। তবে কারানের উপস্তিতিতে মনজগতে প্রশান্তি নেমে এসেছে।
কারান কিছুক্ষণ নির্বাক দাঁড়িয়ে থেকে মিরার এক পাশের মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকল। কয়েক মুহূর্ত পর সে ধীরকরণে তার চুলের কাঁকড়া ব্যান্ডটা খুলে নিয়ে, নিজের শার্টের বুকচৌকাঠে গেঁথে দিল। মিরার খোলা চুলের এলোমেলো প্রবাহ ঘাড় বেয়ে নিখুঁত বিশৃঙ্খলায় নেমে আসল।
মিরা ভ্রূ কুঁচকে পিছন ফিরে শীতল স্বরে বলল, “কি করছো?”
কারান ঠোঁটের কোণে অস্ফুট হাসি টেনে ঠান্ডা গলায় বলল, “কিছু করিনি এখনো, তবে করবো।”

“কি?”
কারান এবার তার হাত নিজের হাতের বাঁধনে নিয়ে এক পা এগিয়ে আসল।
“চলো, বিছানায় বসো।”
দুজনেই বিছানার দিকে এগিয়ে বসল। কারান মিরার পেছনে গিয়ে ধীরে ধীরে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল। আফসোস নিয়ে বলল, “দেখেছ, আমার প্রিয়তমার প্রিয় চুলগুলোর কী দশা করেছো তুমি!”
মিরা হালকা হাসল।
“কি করেছি?”
“এই ক’দিনে একবারও চুলের যত্ন নাওনি, সুইটহার্ট। জট পড়ে গেছে একেবারে। বসো, আমি তেল দিয়ে দিই।”
মিরা মাথা একটু নোয়াল। কারান পাশে রাখা ওলিভ-গ্রিন টেবিল থেকে কাচের তেলের বোতলটা তুলে, সেটা থেকে তেল নিয়ে মিরার চুলে আঙুল বোলাতে শুরু করল। চুলের প্রতিটি গোড়ায় আদরময় পরশে তেল দিয়ে দিল।
এরপর কারান ধীরে ধীরে চুলগুলো আঁচড়াতে থাকল। প্রতিটি আঁচড় যেন মিরাকে আচ্ছন্ন করে রাখল, এমনকি সে নিজেও টের পেল না—কখন ঠোঁটের কোণে সন্তুষ্ট হাসির রেখা ফুটে উঠেছে।
মিরা আস্তে করে বলল, “কারান…”

“বলো, বেগম।”
কণ্ঠে আবেশ মিশিয়ে মিরা বলল, “What food do you enjoy the most, honey?”
“আইদাহ আহসান মিরা।”
এই উত্তর শুনে মিরা ঘাড় ঘুরিয়ে চুমু দিতে গেল, কিন্তু কারান ঠোঁটের কোণে মৃদু টান দিয়ে বলল, “ঘুরো না। আমি এখনো শেষ করিনি।”
মিরা কারানের নির্দেশ অনুযায়ী ঘুরল না। তবু মিরার ভেতর অস্থির চঞ্চলতা দোলা দিতে থাকল।
কারান এবার হেসে জিজ্ঞেস করল, “What’s your favourite fruit, sweetheart?”
পরক্ষণেই মিরা ফিরে বসল। তার দুর্বোধ্য চোখদুটি নিয়ে একটু ঝুঁকে এলো কারানের দিকে। কারানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল, “Your Adam’s apple.”

কিছুক্ষণ চুপচাপ দুজনই একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকল। এদিকে মিরা অকস্মাৎ কারানের গলার কাছে ঝুঁকে তার অ্যাডাম’স অ্যাপলে এক গভীর, মাদক চুম্বন এঁকে দিল। কারান গলায় এক ঢোক গিলল, ফলে তার অ্যাডাম’স অ্যাপল কাঁপতে কাঁপতে একবার উপরে উঠে আবার নেমে গেল। তার শরীরের ভেতর বৈদ্যুতিক আবেশ ছড়িয়ে পড়ল। নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠল।
মিরার ঠোঁটে তখন গোপন হাসি খেলা করল। সে আঙুল তুলে সেই অ্যাডাম’স অ্যাপলে আলতো ছোঁয়া বুলিয়ে দিল। মিরার নিশ্বাস কারানের গলায় এসে ধাক্কা দিল।
কারান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। তার ঠোঁট মিরার ঠোঁটের এক ইঞ্চি দূরত্বে এনে ফিসফিসিয়ে বলল, “Please… don’t seduce me, sweetheart. I know your body hasn’t entirely healed yet.”
তাদের নিশ্বাস একে অপরের ত্বকে ছুঁয়ে গেল। মিরা এবার তার গালের গায়ে গাল মিশিয়ে উচ্চারণ করল, “I’m fine. And entirely yours.”

এটা শুনে হঠাৎ করেই কারান তার গালের কোমল চামড়ায় এক হালকা, শিহরন জাগানো কামড় বসিয়ে দিল। অস্ফুট আর্তিতে মিরা কেঁপে উঠল। তার শিরায় শিরায় আগুন ছড়িয়ে পড়ল। কণ্ঠে অভিমানসঞ্চারী ঝাঁজ নিয়ে তার বুকে এক ধাক্কা মেরে বলল, “এই ব্যাটা! সবসময় এমন করে কামড়াও কেন?”
কারান অলস ভঙ্গিতে হাই তুলল। বাঁকা হেসে বলল, “ভালো লাগে।”
“একদিন দাঁতগুলো গুঁড়িয়ে ফেলবো, তখন বুঝবে!”
কারান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “দাও না। তোমারই জিনিস।”
এবার মিরা মুগ্ধদৃষ্টিতে কারানের চোখে চোখ রেখে, কারানের চুলের মধ্যে আলতোভাবে আঙুল চালাতে থাকল। কারানও বিমোহিত হয়ে তার প্রিয়তমার দিকে তাকিয়ে থাকল। হঠাৎই মিরা তার দুটি হাতে কারানের গালদ্বয় আবদ্ধ করে কোমল সুরে বলে উঠল, “আমার সুন্দর স্বামী।”
কারান সামান্য হাসল। মিরা এবার গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “তোমার চোখদুটো আমার ভীষণ প্রিয়, জানো। অনেক বেশি পছন্দের। নীল চোখ, উফফ হ্যাভেন! যেন আকাশের অন্তরীক্ষ থেকে খসে পড়া দুটি নক্ষত্র।”
“ওকেএএ…”
মিরা ঠোঁটে দুষ্টু বক্ররেখা টেনে বলল, “কিন্তু আমার চোখদুটো আমার নিজের চেয়েও বেশি প্রিয়।”
“হাহ?”

মিরা হেসে বলল, “কারণ এই চোখ দুটো না থাকলে তো তোমাকে দেখতে পেতাম না।”
কারান অতিরিক্ত প্রশংসার ভার সইতে না পেরে ঠোঁট কামড়ে ধরে মিরার কপালে মৃদু একটা টোকা দিল।
মিরা কপাল ডলতে ডলতে বলল, “আহ! কিইই?”
কারান হেসে পরম মমতায় মিরার মাথা নিজের দুই হাতে আবদ্ধ করে নিল। ললাটের যেখানে টোকা দিয়েছিল, সেখানে আলতো চুম্বন দিয়ে, ফিসফিস করে বলল, “তুমি এখন আমার সঙ্গে থাকতে থাকতে ফ্লার্ট করাও শিখে গেছো।”
মিরার ঠোঁটে চাতুর্য খচিত প্রলোভনময় হাসি খেয়ে গেল।
কারান মোলায়েম স্বরে পুনরায় বলল, “ঘুরে বসো এখন।”
মিরা হেসে পিছন ফিরে বসে পড়ল। কারান চুলে আলতো আঙুল চালাতে চালাতে খুব যত্নে বেণি গাঁথতে শুরু করল।
এমন সময় মিরা বলে উঠল, “কারান, আমি পড়তে চাই।”
“ওকে।”
“আমি আমার গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করতে চাই।”
“গুড ডিসিশন। এটা তো আসলে আমারই বলা উচিত ছিল, তুমি আগেভাগেই বলে দিলে।”
“হ্যাঁ, কিন্তু আরও একটা কথা আছে।”

“বলো।”
“আমি জব করতে চাই।”
কারানের আঙুলের তাল শ্লথ হয়ে আসল। ঠান্ডা গলায় বলল, “আচ্ছা, তোমাকে কোম্পানির এমডি বানিয়ে দিচ্ছি।”
“আমি তোমার অধীনে কাজ করতে চাই না, কারান।”
“আমার অধীনে কেন করবে? তুমি তো সিইও থাকবে।”
“না, ধুর! আমি চাই, নিজের যোগ্যতায় কাজটা পেতে।”
কারান পাশ থেকে মাথা বাড়িয়ে গভীরভাবে তার দিকে তাকাল। চোখে স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে রাগের দহন।
“তাহলে পরপুরুষের আন্ডারে কাজ করতে আপত্তি নেই, কিন্তু স্বামী জব দিলে সমস্যা, তাই তো?”
মিরা ধীরে ঘুরে বসল। কারানের হিংসা অনুভব করে হেসে বলল, “সবসময় তোমার যত নেগেটিভ চিন্তা।”
কারান অবহেলার ভঙ্গিতে ভ্রূ কুঁচকে বলল, “কি জব করতে চান আপনি?
মিরা কণ্ঠে কোমলতা নিয়ে বলল, “টিচার হতে চাই। শিশুদের পড়াতে চাই।”
কারান ঠোঁটে চতুর হাসি টেনে বলল, “আমাকে পড়াও, আমিও তো বাচ্চা।”
“হুম, বুড়া বাচ্চা!”

“টিচার হতে পারো, তবে একটা শর্তে, ছেলে বাচ্চাদের পড়ানো যাবে না।”
মিরা চোখ বড় করে তাকাল। বিস্ময় ও তাচ্ছিল্য মেশানো হাসি নিয়ে বলল, “এখানেও জেলাসি?”
“একটুও জেলাস নই আমি।
“কিন্তু আমি তো ছেলে বাচ্চাদেরই পড়াবো।”
কথা শেষ হতে না হতেই কারান কঠোর হাতে মিরার ঘাড় চেপে ধরল। এক ঝটকায় দমবন্ধ হওয়া যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ল মিরার মেরুদণ্ড বেয়ে। আতঙ্কে তার দৃষ্টি প্রশস্ত হল, ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিসিয়ে বলল, “কা-কারান… ব্যথা পাচ্ছি!”
কারান দাঁতে দাঁত চেপে, কটমট করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “একদম খেয়ে ফেলবো তোমাকে। তারপর তোমার কলিজা টেনে ছিঁড়ে ফেলে, সেটা দিয়ে টেনিস বল বানাবো। এত সাহস কোথা থেকে আসল?”
এবার মিরা চট করে কনুই দিয়ে কারানের পেটে একটা খোঁচা মারল। কারান কুঁকড়ে উঠে মিরার ঘাড় থেকে হাত সরিয়ে নিল। মিরা ততক্ষণে বিজয়ের বিদ্রূপাত্মক হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “এই কারানের বাচ্চা, তুমি নাকি জেলাস না?”

কারান নাটুকে ভঙ্গিতে চুলে হাত বুলিয়ে বলল, “ওই বাচ্চার কথা ভুলে যাও। দিদাকে বলেছি, পাঁচ বছরের আগে কোনো বাচ্চা ডাউনলোড করছি না। সবে তো মাত্র ১ বছর ৬ মাস ৫ দিন ১৮ ঘণ্টা ২৪ মিনিট ২৫ সেকেন্ড হয়েছে।”
মিরা বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে কারানের দিকে চেয়ে রইল। মুখটা নিজের অজান্তেই খুলে গিয়েছিল।
কারান মৃদু হেসে মিরাকে নিজের বাহুডোরে টেনে বলল, “তোমার স্বামীটা এখন ভদ্র হয়ে গেছে, মিসেস চৌধুরি। আগে কত কি বলতাম, বলো?”
“তুমি… তুমি এতসব হিসেব রাখো?”
“রাখতে হয়, জান। তুমি যে আমার সময়ের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্ত।”

নিশুতি রাত। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু জানালার ফাঁক গলে চাঁদের রুপালি আলো এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে ঘরের দুজন মানুষ কারান ও মিরাকে। তারা একে অপরকে এক কম্বলের নিচে আগলে ধরে রেখেছে।
বহুক্ষণ ধরে তারা নির্বাক একে অপরকে আলিঙ্গন করে বাহিরের নিস্তব্ধতায় ডুবে রয়েছে। হালকা বাতাসে তাদের চুলগুলো অকারণে দুলে উঠছে, আর মুহূর্তটাকে আরও কোমল করে তুলছে। কারানের বাহুতে আশ্রয় নিয়ে মিরা একটুখানি হাসল, তারপর মাথা নামিয়ে দিল বুকের ওপর। কারানও পিছন থেকে মিরাকে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
মিরার খোলা চুলগুলো কখনো কখনো কারানের মুখ ছুঁয়ে গলায় এসে পড়ছিল। সেই চুলে মুখ ডুবিয়ে কারান চোখ বন্ধ করে তৃষ্ণার্ত পাখির মতো ঘ্রাণ নিল। মিরা টের পেল, তার ঘাড়ে কারানের নিশ্বাসের তীব্রতা বাড়ছে। কাঁপুনি লাগল তার শরীরে।

আলতো করে সে সরে বলল, “এই চুলে কি পেয়েছ বলো তো? কি সবসময় মুখ ডুবিয়ে ঘ্রাণ নাও?”
কারান ঠোঁটে হালকা হাসি রেখে, চোখ বন্ধ রেখেই বলল, “তুমি বুঝবে না, বেগম।”
তার এমন মুগ্ধতা দেখে মিরা এবার একটুখানি দুষ্টুমি করার সিদ্ধান্ত নিল। হঠাৎ করেই বলে বসল, “ভাবছি, চুলটা কেটে ফেলবো এবার। অনেক লম্বা হয়ে গেছে।”

Tell me who I am 2 part 2 (2)

এই কথাটুকু শুনেই কারানের চোয়ালে টান পড়ে গেল। তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠলো। ঠোঁট চেপে ধরে খুব নীচু স্বরে বলল, “যে তোমার চুলে হাত দেবে, তার সেই হাতই আমি কে*টে ফেলব।”
মিরা এবার মুখ টিপে হাসল। তারপর নিজেকে সংবরণ করে ঠাট্টার সুরেই বলল, “যদি আমি নিজেই কেটে ফেলি?”
কারান কোনো শব্দ না করে, বিছানা থেকে উঠে জানালার কাছে গিয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। অভিমানী স্বরে বলল, “আমাকে কষ্ট দিতে তোমার খুব ভালো লাগে, মিরা?”

Tell me who I am 2 part 3 (2)