Tell me who I am 2 part 4
আয়সা ইসলাম মনি
সেই মুহূর্তে কারান ছুটে গিয়ে রেলিংয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে মিরার কব্জি আঁকড়ে ধরল। মুহূর্তের ভেতর তার বুকের স্পন্দন বহুগুণে বেড়ে গেল। তাদের নিচে ভয়াল অতল। কংক্রিটের ধারায় কারানের শরীর ঘষে গিয়েছিল। সাদা শার্ট কিঞ্চিৎ ছিঁড়ে গিয়ে কাঁধের পাশে র*ক্তের দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবুও তার মুখে যন্ত্রণার কোনো ভাঁজ নেই; এই মুহূর্তে ব্যথার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিরাকে টেনে তোলা।
মিরা তখন ঝুলে ছিল। একটা হাত কাচের রেলিঙের চিকন ধাতুতে আঁকড়ে ধরা, আরেক হাতটা কারানের শক্ত মুঠোর ভেতরে। পুরো শরীরটা ভারসাম্যহীন অবস্থায় বাতাসে দুলছে। তার চোখের পাতা পর্যন্ত থরথর করে কাঁপছিল। সে বুঝে গেল, এত উঁচু বিল্ডিং থেকে একবার পড়ে গেলে, শুধু হাড়গোড় নয়, তার অস্তিত্বের চিহ্নও থাকবে না।
তার চোখ বড় হয়ে গেছে, ঠোঁট শুকিয়ে খসখসে হয়ে উঠেছে। ঘাড়ের পেছনে ভেজা চুল ঘামের কারণে ত্বকে সেঁটে গেছে। কিছু বলতে পারছে না, ঠিকঠাক শ্বাসও নিতে পারছে না। হাওয়ার তীব্র তোড়ে মিরার ওড়নাটা ছিঁড়ে তার শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে।
এদিকে মিরার হাতটাকে দু’হাতে ধরে রেখেছে কারান। তার কনুইয়ের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, পেশিগুলো কাঁপছে। হাতঘড়িটা খুলে কখন নিচে পড়ে গেছে, সে টেরও পায়নি। পেশিতে চাপ দিয়ে সে নিজেকে স্থির রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। একটুও সরলে বিপদ।
এদিকে মিরা নীচের দিকে তাকাতেই মনে হলো, তার ভেতরের সব র*ক্ত জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে। তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, মাথা ঘুরছে।
মিরার কণ্ঠ ভয় আর বিস্ময়ে রুদ্ধ হয়ে এসেছিল। ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিসিয়ে উচ্চারণ করল, “কা… কারান… কা… রান…”
তার চোখে জমে থাকা আতঙ্কের জল কেবল বলছিল, সে বাঁচতে চায়, এখনই হারাতে চায় না সবকিছু।
মিরা কান্নামিশ্রিত গলায় পুনরায় বলল, “কারান… আমার হাত… হাত ফসকে যাবে…”
তার কণ্ঠস্বরে জমে থাকা ভয়, অসহায়তা আর আকুতি কারানের বুক কাঁপিয়ে দিল। কিন্তু সে কিছুই বলল না। কেবল হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তাকে ছাড়ার ইচ্ছা তো নেই, সাহসও নেই। তার চোখে তখন এক অব্যক্ত প্রতিজ্ঞা; যা-ই হোক, এই হাত সে ছাড়বে না।
মিরার চোখ জলে ভরে উঠছে। সে যেন স্পষ্ট নিজের পতন দেখতে পাচ্ছে। তাই কণ্ঠে কাঁপন নিয়ে আবার বলল, “কারান… হাত ছেড়ো না। প্লিজ, ছেড়ো না…”
কারান ঠোঁট কামড়ে ধরে গলদঘর্ম হয়ে মিরাকে ধরে রেখেছে। তার নিশ্বাস তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে, ঘাড়ের রগে ঘাম জমে লবণের মতো জমাট বেধেছে। তবুও সে কিছু বলল না। বলতে গেলেই ভয় হয়; শব্দ হলে যদি হাত কেঁপে ওঠে!
মিরা কাঁপছে। ঘামে তার হাত পিচ্ছিল হয়ে এসেছে। সে দেখতে পাচ্ছে, নিজের আঙুল ফাঁক হয়ে আসছে। রেলিংয়ে ধরা হাতটা ফসকে যেতে চাইল। তার দেহের ভিতর ভয়াবহ ঠান্ডা শিহরন বয়ে যাচ্ছিল। কর্ণধারে শুধু নিজের ধুক ধুক হৃৎস্পন্দন শুনতে পাচ্ছিল। চোখ ঘোলা হয়ে আসছিল। তাই মিরা চোখ বন্ধ করে নিতে চাইল।
তখনই কারান হঠাৎ তার দিকে তাকিয়ে বলল, “না, প্লিজ। মিরা, তাকিয়ে থাকো আমার চোখে। চোখ বন্ধ করো না! মিরা…”
তার কণ্ঠস্বরও কাঁপছিল। কারান নিজেকে রেলিঙের বাঁধনে টেনে ধরে রেখেছিল। তার কাঁধে একটানা চাপ পড়ছিল। হাওয়ার তোড়ে তারও ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছিল, তবুও সে নড়ছিল না। তার বুক ধড়ফড় করছিল, ঠোঁট নীলচে রং ধারণ করেছে, কিন্তু হৃদয় চিৎকার করে আকুল প্রার্থনা করছে।
কারান চিৎকার করল, “সুইটহার্ট… আমার হাত শক্ত করে ধরো। আমি তোমাকে পড়তে দেব না, সোনা। কিছুতেই না।”
কারান তখন নিজেকে রেলিংয়ে হেলিয়ে, সমস্ত শক্তি দিয়ে মিরাকে উপরের দিকে টানার চেষ্টা করল। তার গলার রগ ফুলে উঠেছে। হাঁপাচ্ছে সে, তবুও ছাড়ছে না। একটুখানি ভুল মানে দুইটা প্রাণের অবসান।
মিরাও শক্ত করে কারানের হাত আঁকড়ে ধরল। কারান রেলিং ধরে নিজেকে সামলে মিরাকে একটু ওপরে তুলল। এরমধ্যেই অকস্মাৎ নীচের দিকে চোখ পড়ল। আর সেই দৃষ্টিতেই সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল। চোখের সামনে বিল্ডিংটা দুলে উঠল মনে হলো। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছিল। মাথায় অবর্ণনীয় ঘূর্ণি অনুভব করল সে। তার কনুইয়ের নীচ দিয়ে টপটপ করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছিল। তার বাহু কাঁপছে, শরীর নিস্তেজ হতে চাইছে, তবুও হাতের বন্ধন আলগা করল না।
মিরার হাত এখন একদম ঘামে ভিজে গেছে। কারানের আঙুলের ফাঁক গলে পিছলে যেতে চাইল সে। কিন্তু হঠাৎ সে নিজের সব ভয় একত্র করে শক্ত করে কারানের হাতটা আঁকড়ে ধরল।
এমন সময় মিরার আকুল আহ্বান কেঁপে কেঁপে ভেসে এলো, “কারান, আমার খুব ভয় করছে। হে আল্লাহ, আমি… আমি পড়ে যাব। কারান, তোলো আমাকে। উপরে তোলো, প্লিজ!”
কিন্তু কারান মিরার কোনো শব্দই স্পষ্ট করে আর শুনতে পাচ্ছিল না। মাথার ভেতরটা যেন এক নিঃশব্দ বিস্ফোরণে ঝাঁঝরা হয়ে উঠল, আর ধীরে ধীরে তার সমস্ত অনুভূতি গিলে নিচ্ছিল। তার চারপাশ কাঁপছিল, পায়ের নীচ থেকে মাটি যেন সরে যাচ্ছিল। না, এটা শুধু পরিস্থিতির কারণে না, এটা তার উচ্চতার ভয়ের কারণে।
নিচে তাকানো যাবে না। এই এক ভয় তাকে বহুদিন ধরে তাড়িয়ে বেড়ায়। সেই ছেলেবেলায় ছাদে উঠলেও পা থরথর করে কাঁপত, মাটির দিকে তাকালে বুক ধকধক করত, মাথা ঘুরত। কিন্তু আস্তে আস্তে ভয়টাকে শোষণ করে চলেছিল সে। আর আজ?
মিরা কারানের অবস্থা দেখে দুঃসহ আকুতি নিয়ে বলল, “আমার হাত… আর পারছি না… ছেড়ে দাও। ছেড়ে দাও, কারান। আমার হাত ছিঁড়ে যাচ্ছে…”
কারান গর্জে উঠল, “শাট আপ, মিরা!”
সে গোঁ ধরল। একটা হালকা টান দিল। মিরার শরীর একটু ওপরে উঠে আসল, আবার পিছলে পড়ে যেতে থাকল।
“আরেকটু… আরেকটু, মিরা। চোখ বন্ধ করো না… এই, মিরা। এখন না। আমার দিকে তাকাও, শুধু আমার দিকে তাকিয়ে থাকো!”
মিরার মুখ দিয়ে কান্নার সাথে প্রার্থনার শব্দ বেরোচ্ছিল। নিচে শুধুই অন্ধকার, যেখানে পড়া মানেই শেষ। কারানের ফুসফুস সংকুচিত হয়ে আসছিল, শরীর হিম হয়ে গেছে, আঙুলগুলো ঘামে ভিজে ঠান্ডা হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, বুকটা চেপে ধরেছে কেউ। সে শ্বাস নিতে পারছে না, কথাও বলতে পারছে না। মাথাটা অবিরত চরকির মতো ঘুরতে লাগল। ভূমি, আকাশ, খাদ সবকিছু ঘুলিয়ে উঠল।
তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে উঠল। চোখের সামনে অবয়বগুলো জোড়া জোড়া হয়ে ভেসে উঠল। মিরার মুখটাও বিভ্রান্তিকর ভঙ্গিতে দুলে উঠছে। তার ভিতরে শুধু ভয়, ব্যথা আর অস্তিত্বের লড়াই একসঙ্গে চলছে। মিরার হাতটা যেন ফসকে যাচ্ছে, তবুও সে বিক্ষিপ্তভাবে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করল। কিন্তু কাঁধ থেকে শুরু করে আঙুল পর্যন্ত হাড়ের ভেতরকার শক্তিটা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
সে মিরার হাত ধরে রেখেছে, কিন্তু আঙুল কাঁপছে। না, শুধু দুর্বলতা থেকে না, পেটে বুঁদ হয়ে বসে থাকা আতঙ্ক থেকে। বুকের ভেতর কেবল একটানা ঢিবঢিব শব্দ শুনতে পাচ্ছে। তবুও অন্তিম চেষ্টায় সে দুই হাতে মিরার হাত আঁকড়ে ধরল। কিন্তু সেই বন্ধনটা ক্রমেই আলগা হয়ে আসছিল।
কারান আপনমনে বলল, “আই মাস্ট ডু দিস। কারান, ডোন্ট গিভ আপ।”
ঠিক তখনই মিরার ভয়ার্ত আর্তনাদ কানে বাজল, “কা… কারান, হা-হাত ছুটে যাচ্ছে। কারান, আমি পড়ে যাচ্ছি!”
এদিকে কারানের চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো। সে বুঝতে পারল, আর এক মুহূর্ত দেরি মানেই চিরবিদায়। মাথাটা জোর করে কিছুটা চালনা করল, কিন্তু শরীর তার কথা শুনছিল না।
চোখ বন্ধ করে ফেলল কারান। এরপর বুক ভরে একটা শ্বাস নিল। বুকের গভীর কষ্ট নিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল, “হে আল্লাহ, প্লিজ… প্লিজ, আমার মিরাটাকে রক্ষা করো। আমি আর কিছু চাই না, শুধু ওকে বাঁচিয়ে দাও!”
কারান ফুস করে আরেকবার গভীর নিশ্বাস ছাড়লো। এই নিশ্বাসের মাধ্যমেই হয়ত বুকের গভীরে জমে থাকা আতঙ্কের বিষাক্ত ধোঁয়া হঠাৎ ছিটকে বেরিয়ে এলো। মুহূর্তেই তার সারা শরীর টালমাটাল হয়ে উঠল, পেশিগুলো বিদ্রোহী আগুনে জ্বলে উঠল। আর সেই আগুনই হয়ত তাকে সাহস জুগিয়েছে—সে সমস্ত শক্তি একত্রিত করে মিরার হাত আঁকড়ে ধরল।
তারপর কাঁপা হাতে রেলিঙের ফাঁক দিয়ে ধীরে ধীরে মিরার শরীরটা উপরের দিকে টানতে লাগল।
মিরা একবার নিচে তাকাল। মনে হচ্ছিল, মৃত্যু ফাঁদ পেতে বসে আছে।
তারপর আরেকবার কারানের দিকে তাকাল৷ তার মুখজুড়ে শুধুই ঘাম। ঘামের বিন্দুগুলো কারানের কাঁপা চোয়াল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
কারানের বুক ভীষণ ভারে ওঠানামা করছে। মিরার শরীর তখনও কাঁপছে।
কারানের হাতদুটো কাঁপছিল, আঙুলগুলো নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল, কিন্তু কারান থামেনি। সে জানে, নিচে তাকালে সব শেষ হয়ে যাবে, একটা ভুলচুক মানেই মৃত্যু।
তারপর প্রচণ্ড ঘাম আর হাতের ব্যথাকে উপেক্ষা করে, কারান রেলিঙের একপাশে নিজের পা গুঁজে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে গেল। পিঠ বাঁকিয়ে এক চূড়ান্ত প্রচেষ্টায় মিরাকে টেনে তুলতে শুরু করল। কারানের বাহুর পেশি যেন ফেটে যাচ্ছে, মাটিতে হাঁটু ছুঁয়ে গেছে। তারা দুজনেই পড়েই যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ একটা আকস্মিক শক্তির টানে সে মিরাকে রেলিঙের ওপর টেনে তুলল। মিরা তার গলায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। এই হঠাৎ ভারে কারান আর নিজেকে সামলাতে পারল না; মিরাকে নিয়েই ছাদের ওপর ধপ করে পড়ে গেল।
ধাক্কা খেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে দুজনই মাটিতে পড়ে থাকল। দুজনেরই শরীর কাঁপছে। মিরার কান্না গলায় আটকে আছে। একটা দীর্ঘ মুহূর্তের নীরবতা নামল। শুধু তাদের তীব্র শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
মিরা কারানের বুকের ওপর মাথা রেখে, জোরে জোরে নিশ্বাস নিতে থাকল। তার নিশ্বাসের উষ্ণতা কারানের ভেজা শার্টে বারংবার ধাক্কা খাচ্ছিল।
কারান শরীরের অসাড়তা নিয়েও হাত তুলে মিরার পিঠে রেখে জড়িয়ে ধরল, কিন্তু শক্তি নেই বলে সে জড়ানোটা সম্পূর্ণ করতে পারল না।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ খুলল, কিন্তু দৃষ্টি এখনও অস্পষ্ট। তবে সে বুঝতে পারল, মিরা তার বুকে নিশ্বাস নিচ্ছে।
মিরা কোনো শব্দ করেনি। শুধু কারানকে আরো বেশি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। কারান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর যখন একটু দৃষ্টি ফিরল, আস্তে করে ফিসফিসিয়ে বলল, “বউউ…”
মিরা তৎক্ষণাৎ মাথা তুলল। তার চোখ লাল। ঠোঁট কাঁপছে। কারানের চেহারার দিকে তাকিয়ে বুকটা কেঁপে উঠল তার। ভয়ে কারানের চোখ ডুবে গেছে, ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
কারান দুই হাত তুলে মিরার মুখকে তার তালুতে আবদ্ধ করল। ভেতরে আটকে থাকা আবেগে প্রায় ভেঙে পড়া কণ্ঠে বলল, “তু… তুমিহ ঠি-ঠিক আছো, বউ?”
মিরা হালকা হাসার চেষ্টা করল, কিন্তু চোখের কোনায় একফোঁটা জল জমে উঠল। তার গালে রাখা কারানের হাতের ওপর হাত রাখল। তারপর মাথা নাড়িয়ে বলল, “আমি ঠিক আছি।”
কারানের ভেজা কপালের চুল সরিয়ে সেখানে এক গভীর চুমু খেল। একটু পরে সে কারানের ঠোঁটের কাছে এসে ফিসফিসে স্বরে বলল, “আমি ঠিক আছি, হানি…”
কারান হালকা করে হাসার ব্যর্থ চেষ্টা করল। তবে তার চোখের গভীরে যেন হাজার বছরের উদ্বেগ জমাট বেঁধে আছে। তারপর পরম মমতায় নিজের কাঁপা ঠোঁটের মধ্যে মিরার ঠোঁটকে আবদ্ধ করল।
মিরাও প্রথমে সাড়া দিল, কিন্তু অল্পক্ষণ পরেই তাল রাখতে পারল না। কারানের চুমু ক্রমেই নিয়ন্ত্রণ ছাপিয়ে গেল। কারান যেন এক নিশ্বাসে সব ভয়, সব ভালোবাসা মিরার ঠোঁটে ঢেলে দিতে চাইল। কখনো ঠোঁটের কোণে, কখনো পুরো ঠোঁট জুড়ে গভীরতর উন্মাদনায় চুম্বন চালিয়ে গেল।
একটু পর চুম্বনরত অবস্থাতেই মিরাকে নিজের নিচে নিয়ে এলো কারান। তার হাতের আঙুলগুলো মিরার ঘাড়ের পেছনে গিয়ে আটকে গেল। নিশ্বাস ঘন হলো। অন্তরে তীব্র ভালোবাসার ঝড় বইতে লাগল। তার চুমু মিরার গালজুরে ছড়িয়ে পড়ল। মিরার চোখ তখন আধা বন্ধ—একটা অচেনা প্রশান্তির স্রোত ধীরে ধীরে তার শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছিল। এক হাতে কারানের পিঠের ভেজা শার্ট মুঠো করে ধরল সে, অন্য হাতে কারানের চুল শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। অর্থাৎ শুধু তার শরীর নয়, আত্মাও কারানের স্পর্শে লীন হচ্ছে। মিরা নিজের অনুচ্চার অনুমতির মধ্য দিয়ে কারানকে স্নেহস্পর্শের অবকাশ দিল। কারানও দমবন্ধ করা নিশ্বাসে মিরার কপালে, চোখের কোণে, গালের স্পর্শকাতর রেখায়, এবং থুতনির ধারে একের পর এক চুম্বন এঁকে দিল।
হঠাৎ মিরার আঙুলের অযাচিত তীব্রতায় কারানের শার্টের বুকের একটি বোতাম কিঞ্চিৎ শব্দে ছিঁড়ে ছাদের এক নির্জন কোণে ছিটকে পড়ল। ক্ষুদ্র সেই শব্দটিও যেন ছাদের নৈঃশব্দ্য ভেদ করে ধ্বনিত হলো। অথচ প্রচণ্ড অভ্যন্তরীণ প্রবাহে তারা কেউই তা শুনতে পেল না।
কারান ততক্ষণে তার কপালের রেখা বেয়ে কণ্ঠনালীতে নেমে এলো। একের পর এক চুম্বনে তার গলায় জ্বালাময় পরশ ছড়িয়ে দিল। সেই তাপ স্পষ্টতই কামনার নয়, সেই তাপ ভয় আর ভালোবাসার মিশ্রিত হাহাকার। মিরার সমগ্র সত্তা কারানের দগ্ধ নিশ্বাসে ও অস্থির ঠোঁটের স্পর্শে অনিয়ন্ত্রিত কাঁপনে কেঁপে উঠল। মিরার কণ্ঠদেশ রক্তাভ হয়ে উঠল। হঠাৎ থেমে গেল কারান। মিরার মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরল। তার ভেজা চুলে চুমু খেয়ে গভীরভাবে নিশ্বাস নিল। এরপর থুতনি মিরার মাথায় ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে কয়েকবার ঢোক গিলল।
কারান ধরা গলায় আওড়ালো, “সুইটহার্ট…”
মিরা গ্লানিমুক্ত হাসি হেসে তাকাল। কারান আবার উন্মূল আবেগে মিরার মুখে কয়েকটি চুমু খেল। মিরার শরীরে শিহরন খেলে গেল, কিন্তু এবার তা শুধুই ভালোবাসার আনন্দে। কারান তার ডান চোখের উপর অনেকক্ষণ ঠোঁট ছুঁয়ে রাখল।
তারপর সে মিরার মুখের উপর ফুঁ দিল। সেই হাওয়ায় কেবল বাতাস ছিল না, ছিল বেঁচে থাকার ওষুধ। মিরা মুহূর্তের মধ্যেই ঠান্ডা হয়ে গেল, নিমিষেই সব ভয় উবে গেল।
সবশেষে কারান কণ্ঠে করুণ বিষণ্নতা মিশিয়ে বলল, “আই লাভ ইউ, বউ। আই লাভ ইউহ। আই অলমোস্ট লস্ট ইউ। ইউ আর মাই লাইফ, মাই রিডেম্পশন। আই লাভ ইউ… আই লাভ ইউ সো মাচ, বউ।”
মিরা হেসে মাথাটা এগিয়ে কারানের ঠোঁটে একটি নরম চুমু রাখল। তারপর আশ্বস্ত কণ্ঠে বলল, “কিচ্ছু হয়নি আমার। দেখো, আমি একদম ঠিক আছি।”
কিন্তু সেই হাসি কারানের অস্থির বুকের ভেতর জমে থাকা দুর্যোগকে প্রশমিত করতে পারল না। তার চোখে তখনও রক্তাক্ত ভয়, আর শিরায় শিরায় অস্থিরতা খেলা করছে। মিরার শরীরের উপর তার হাত বুলিয়ে দিতে দিতে চোখ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল, কোথাও ব্যথা পেয়েছে কি না!
সে মিরার উদরের ওপরের জামার অংশটা তুলতে উদ্যত হল, কিন্তু মিরা সাথে সাথেই তার হাত শক্ত করে চেপে ধরল।
অনমনীয় নির্দেশের কঠোরতা নিয়ে কারান বলল, “দেখতে দাও।”
হঠাৎই তার মুখশ্রীর তীব্র পরিবর্তন দেখে মিরা বুঝে গেল, তার আর রক্ষা নেই। কারানের ভেতরে আগ্নেয়গিরির মতো ক্রোধ সঞ্চিত হয়েছে, যেকোনো মুহূর্তে তা উদ্গিরিত হতে পারে। তার চোয়াল শক্ত, চোখ রক্তাভ, নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। ঠোঁটের কোণ দুটো তীব্র রাগে টানটান হয়ে আছে।
মিরা কারানের হাতটা ছেড়ে চোখ নীচু করে ফেলল। তার বুকের মধ্যে একটা শীতল শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ল৷ আচমকাই কারান মিরার উদরের কাপড়টা ছিঁড়ে ফেলল। মিরা চোখে বিস্ময় নিয়ে কারানের দিকে তাকাল। সে ভাবতেও পারেনি, কারান এমনটা করতে পারে! কিন্তু কারানের থুতনি তখনো কাঁপছে।
এরপর আরেকটা টান দিয়ে মিরার কাঁধের কাপড়টা ছিঁড়ে ফেলল। মিরার ধৈর্য এবার চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। ক্ষোভে, লজ্জায়, আতঙ্কে সে চিৎকার করে উঠল, “কারান! করছটা কী তুমি?”
কারান ঠোঁটের উপর আঙুল রেখে আস্তে করে বলল, “একদম চুপ!”
ঘন ঘন নিশ্বাসে মিরার বক্ষস্থল উঠানামা করছিল, সেই ঢেউ কারানের চোখ এড়ায়নি। একঝলক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল সে। তারপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই মিরাকে বুকের কাছে তুলে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। মিরা চোখ নামিয়ে চুপচাপ রইল, কোনো কথা বলল না। কারানের আগুন দৃষ্টির সামনে নিজেকে আড়াল করতে চাইল।
কারান সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মিরাকে জড়িয়ে ধরে রাখল। মিরা মাথা নামিয়ে নিজের অস্তিত্বকে কারানের বুকের সাথে গুটিয়ে রাখল। কারণ সে জানে, যতই রাগ করুক, এই বুকই তার একমাত্র আশ্রয়।
নিচে পৌঁছে কারান কক্ষে গিয়ে অকস্মাৎ তাকে বিছানায় ছুড়ে ফেলল। মিরার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালে, মুখাবয়বে ছড়িয়ে পড়ল। মিরার চোখ বিস্ময়ে ছলছল করে উঠল। তার দৃষ্টি কারানের দিকে ঘুরে এলো। কণ্ঠ শুকিয়ে গেল।
কারান নিজের শার্টের বোতামগুলো একে একে ছিঁড়ে ফেলতে লাগল। তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে, চোখের তারা দপদপ করছে। মিরা জানে, এই মানুষটা এখন আর তার পরিচিত সেই কারান নয়। সে তৎক্ষণাৎ উঠে বসতে গেল, কিন্তু তখনই কারানের হাত তার পিঠে চলে এলো। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো মিরার জামার পেছনের গিঁটটা টেনে ছিঁড়ে ফেলল। মুহূর্তেই তার আবরণস্নিগ্ধ বসনখণ্ডটা মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল। মিরা স্থবির হয়ে এক মুহূর্ত নিজের শরীরের দিকে তাকাল। ভিতরে কিছু না থাকলে তার ঊর্ধ্বাংশ সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে যেত। তার বুকের ভেতর কাঁপুনি শুরু হলো, কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করল না। সে ধীরে চোখ তুলল।
কারানের শ্বেতাভ মুখশ্রী থরথরিয়ে কাঁপছে, নাকের পাখা ফুলে আছে।
মিরা কিছু বলতে চেষ্টা করল, “কারা…”
কিন্তু সেই মুহূর্তেই কারান ডান হাতে মিরার দুই হাত একত্রে জড়িয়ে ধরে বিছানায় চেপে ধরল। তার ঘাড়ের পেশিগুলো টানটান হলো, মুখ মিরার পানে ঝুঁকাল। বা হাতটা উপরে তুলে ধরে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, “এই হাতের একটা থাপ্পড় যদি তোমার ওই নরম গালে পড়ে, তোমার মুখের ছাপটাই বিকৃত হয়ে যাবে—গালের চামড়া ছিঁড়ে আমার হাতে উঠে আসবে।”
মিরার নিশ্বাস আটকে রইল। তার চোখ ছলছল করছে। কিন্তু তবুও কিছু বলল না। কারণ সে বুঝে গেছে, এই মুহূর্তে যা চলছে, তা ভালোবাসার উন্মত্ত প্রকাশ।
ক্রোধের ভারে কারানের বুক ওঠানামা করছিল। হঠাৎ এক গর্জনে চিৎকার করে উঠল সে, “বেয়াদব! বেয়াদব মেয়ে কোথাকার! আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে খুব ভালোবাসো, তাই না? প্রাণ নিয়ে খেলার শখ হয়েছে বুঝি? উফফ!”
সে তীব্র বিরক্তিতে বা হাতে কপাল ডলতে ডলতে বলল, “এই মেয়ে, কতবার বারণ করেছিলাম, তবুও শুনলে না কেন? হ্যাঁ? অসুস্থ না থাকলে, একদম রুমে আটকে দু’দিনের জন্য অজ্ঞান করে রাখার ওষুধ আমার কাছে ছিল। বেয়াদব বউ একটা!”
তার গলার প্রতিটি শব্দ ছিল ছুরি-কাটার মতো তীক্ষ্ণ আর গভীর; এইসব শুনে যে কারো পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেত। কিন্তু মিরা? সে মুখ চেপে মুচকি মুচকি হাসল। হাসিটা যেন আগুনে তেল ঢালল; কারানের ভেতরের জমাটবাঁধা ক্ষোভটা অবশেষে ফেটে গেল।
কারান মিরার হাত দুটো আরো জোরে বিছানায় চেপে ধরল। এমন জোরে ধরল যে মিরার হাড়ের গিঁটগুলো কেঁপে উঠল। ব্যথার শিরশিরানি হাত বেয়ে কাঁধ পর্যন্ত উঠে গেল। অভিমানে, ব্যথায়, ভয়ে মিরার চোখের কোনে টলটল করে পানি জমল। সে অসহায় দৃষ্টিতে কারানের চোখে তাকাল। কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ঠোঁট আটকে গেল। কারান হাতের চাপ আরেকটু বাড়াতেই মিরা ককিয়ে উঠল, “আহ!”
সঙ্গে সঙ্গেই কারান ওর হাতটা ছেড়ে দিল। হাত দুটো ডলতে ডলতে ব্যথায় চোখ বন্ধ করে ফেলল মিরা। তার হাতে কারানের আঙুলের ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। কিন্তু কারানের রাগ থামেনি। তাই মিরার মুখের দুই পাশ শক্তভাবে চেপে ধরল। অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “এই তুমি হাসছিলে কেন? আমি কি তোমার সঙ্গে মজা করছি? ইচ্ছে করছে আদর-আচরণ সব বাদ দিয়ে এক থাপ্পড়ে বাস্তবতা দেখিয়ে দিই। বুঝেছি, বেশি মাথায় তুলেছিলাম। এবারই শেষবার বলছি, মিরা; এরপর যদি আমার কথা অমান্য করো, তাহলে কারান কে, সেটা বোঝারও সময় পাবে না। চিতাবাঘের সঙ্গে খেলছ তুমি।”
কারান এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। অনুভব করল, মিরার গালে প্রবল ব্যথার ছাপ স্পষ্ট, সেই স্থানটি গভীর লালিমায় আচ্ছন্ন। তাই সে বিনম্রভাবে মিরার গাল থেকে হাত সরিয়ে নিল। মিরা বিষণ্ন মুখে, কাঁদার আভাস নিয়ে একবার নিকটবর্তী কারানের দিকে তাকাল। কিন্তু তার অতিশয় ক্রোধ সংকেত দেখে মাথা নীচু করে ভাঙা স্বরে বলল, “এভাবে তাকিও না। আমার ভয় করছে, সত্যি ভয় করছে।”
কারান ধীরে ধীরে মিরার ওপর থেকে উঠে বসল। তার বুকের ভেতরটা প্রচণ্ড তাপে ফুলে উঠছে। একবারে তিন চারবার গভীরভাবে নিশ্বাস টেনে বুকের ভেতরের জ্বালাগুলো নির্বাপণের চেষ্টা করল। কপাল ঘামছে, ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ।
পাশ থেকে মিরা নিঃশব্দে উঠে বসল। তারপর ধীরে ধীরে পেছন থেকে তার হাতদুটি কারানের পিঠে জড়াল। মাথাটা আস্তে করে কারানের কাঁধে রাখল।
কারান ঝট করে ঘুরে তাকাল। তার চোখজোড়া এখনো ধূমায়িত, কিন্তু সেই ধোঁয়ার মাঝে বিষণ্ন আলোড়ন দেখা যাচ্ছিল। তার কাঁপা আঙুল মিরার বক্ষবন্ধনের গ্রন্থি খুলে দিলো। সেটা স্খলিত হয়ে দেহ থেকে গড়িয়ে পড়ল। মিরার ভ্রূ কুঁচকে গেল। সে হাত দিয়ে পিছনের দীর্ঘ চুলগুলো সামনে আনল।
কিন্তু কারান আবারও চুলগুলো আলতো করে পিছনে সরিয়ে দিল। নেশার সুরে বলল, “এভাবে লজ্জা পাওয়ার কি আছে? আমি তো তোমার শরীরের প্রতিটি রেখা, প্রতিটি তিল আগেই দেখেছি।”
মিরা মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে, ঠোঁট কুঁচকে বলল, “গালি দিব কিন্তু…”
কারান আরেক ধাপ এগিয়ে এলো। তার নিশ্বাসের উত্তাপ মিরার ত্বকে গলে পড়তে লাগল। সে নীচু হয়ে মিরার উষ্ণ উন্মীলনের কাছাকাছি মুখ রেখে দিল। মাংসপিন্ডের বিভাজে তার ঠোঁট ছুঁইয়ে রেখে ফিসফিস করে বলল, “দাও।”
মিরার শ্বাসপ্রশ্বাস এলোমেলো হয়ে উঠল। বুকের ওঠানামা মুহূর্তেই ছন্দ হারিয়ে ফেলল। দেহের ভিতর অজানা ঢেউ আছড়ে পড়ল। কারানের মস্তকও মিরার বক্ষস্থলে ছন্দবদ্ধ নিশ্বাসের আবর্তে আবিষ্ট হয়ে উঠছিল ও নামছিল। মিরা যেন অনন্ত প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছে। তার চোখের কোনে বেয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
কারান মুখ তুলে, অগ্নিসদৃশ গলায় বলল, “ডোন্ট প্লে ইনোসেন্ট। ইউ ওয়ান্ট দিস। অ্যান্ড নাও আই’ম গোয়িং টু মেস ইউ আপ সো সুইটলি, ইউ’ল কাম ক্রলিং ব্যাক ফর মোর।”
এক হাতে মিরার কোমল পদযুগল আবিষ্ট করল। প্রলুব্ধ হেসে নেশাতুর বীণাসুরে বলল, “গিভ মি দ্যাট স্টানিং লেগ। আই’ল রুয়িন ইউ ইন দ্য বেস্ট ওয়ে; ওয়ান্স আই’ম ডান, ইউ ওন্ট ইভেন রিমেম্বার হাউ টু স্ট্যান্ড। এভরি ব্রেথ ইউ টেক উইল বিলং টু মি।”
মিরা চোখ ঘুরিয়ে কারানের দিকে তাকাল। অবলীলায় কারানের গালে হাত বুলিয়ে মৃদু হেসে বলল, “আমাকে এতটা সুখ দিও না, কারান। আমি তোমাকে ধ্বংসও করে দিতে পারি।”
কারান মিরার অবসন্ন চুলের মাঝে মুখ ডুবিয়ে বলল, “পারমিশন দাও, আমি কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলছি।”
মিরা দুই হাত দিয়ে কারানের মুখ সামনে টেনে নিয়ে বলল, “তুমি না বললে আমি অসুস্থ, তাহলে?”
“কি করব বলো? তুমি আমাকে প্রতিবার পাগল করে তোলো, চেয়েও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি না। এমন কেন হয়, মিরা?”
মিরা চোখ বুজে কারানের ঠোঁটে চুমু দিতে গেল, তৎক্ষণাৎ কারানের ভ্রূ কুঁচকে উঠল। চোখে বিভ্রান্তির গভীর ছাপ নিয়ে বলল, “মিরা!”
মিরা চোখ খুলে ফিসফিস করে বলল, “কিহ?”
কারান কপাল কুঁচকে বলল, “তুমি রুফটপ থেকে পড়লে কী করে?”
অতঃপর হঠাৎই কারণটা উপলব্ধি করে সে আবার মিরার দিকে বিষণ্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “ওয়েট, ওয়েট…”
এরপর ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলল, “অসভ্য মেয়ে! অর্থাৎ আমি যখন চোখ বন্ধ করে ভাবছিলাম, তখন তুই রেলিঙের ওপর ওঠার চেষ্টায় ছিলি?”
মিরা চোখ বড় করে কটূক্তিময় হাসি ছেড়ে জিভ কাটল। এখন তার আর কোনো পালানোর ঠাঁই নেই। কারান দাঁত চেপে ধরে কিড়মিড় করে হঠাৎ মিরার গলা আঁকড়ে ধরল। মিরার গলা টানটান হয়ে গেল, সে অজান্তেই ঢোক গিলল। তবুও সে কারানের চোখে চোখ রেখে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
কারান ক্রোধে ফুঁসতে ফুঁসতে মিরার গলায় চাপ বাড়িয়ে বলল, “এই গাধী, তুই রেলিঙের উপর ওঠার চেষ্টা করেছিলি? হুম?”
কারান দাঁত চেপে শব্দ করল। তার মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
কণ্ঠে বিষাদের ভার মিশিয়ে পুনরায় বলল, “আজ তোকে খু’ন করে ফেলব, মিরা। তোর ম’রার ইচ্ছে আমাকে বল! কেন করলি এমন? এই মিরা, কেন করলি?”
এরপর হঠাৎ এক প্রচণ্ড আঘাতে মিরার বক্ষদেশে ধাক্কা মেরে তাকে শয্যায় উপুড় করে দিল। মুহূর্তেই সে মিরার উদরের উপর অধিষ্ঠিত হয়ে, দু’হাতে শ্বাসনালির চারপাশ আরো শক্ত করে চেপে ধরল। চোখে অগ্নিগর্ভ ক্রোধ নিয়ে উচ্চারণ করল, “বল, মৃ’ত্যুর আকাঙ্ক্ষা কী করে এলো তোর মাঝে? হাউ ডেয়ার ইউ ইভেন থিংক অফ অ্যাব্যান্ডনিং মি লাইক দিস? আনসার মি। আনসার মি, মিরার বাচ্চা…”
মিরার চোখে অশ্রু জমে উঠল, সে কারানের দিকে নিঃস্বার্থ আবেগে ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কিছু বলতে চাইল, কিন্তু ভেতরকার অনুতাপে গলা বন্ধ হয়ে আসছিল।
মিরার জলভরা দৃষ্টি অবলোকন করে কারান তার কণ্ঠবন্ধন শিথিল করল। কিন্তু মুহূর্তের উদ্বেলতায় সে নিজের রাগের অভিপ্রায় খুঁজে না পেয়ে মিরার কোমল ও প্রণব ঠোঁটে তীব্র কামড় বসাল। ক্ষীণ এক রক্তরেখা ধীরে ধীরে ঠোঁট বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।
তবুও মিরা নিস্পন্দ। তার চোখে কোনও ভীতি বা প্রতিবাদ ছিল না। চোখের পলকও কাঁপল না। হঠাৎই কারান অধর ছেড়ে সরে এলো। সে নিজেরই পাগলামিতে মুহূর্তকাল হতবাক হয়ে গেল। এরপর কষ্টপীড়িত দৃষ্টিতে নিজের ঠোঁট থেকে র*ক্ত মুছে একপাশে রাখা মলম তুলে নিল। তার আঙুল কাঁপছিল, তবুও মিরার ক্ষতবিক্ষত ওষ্ঠে ধীরে ধীরে মলম বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “কেন করলে, সুইটহার্ট? হ্যাঁ?”
কারানের মুখটা অসহায়ভাবে কেঁপে উঠল। মিরা অনুভব করল, তার অনিচ্ছাকৃত সেই কাজে কারানের অন্তরটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। সে ধীরে ধীরে কারানের দিকে এগিয়ে এলো৷ অপরাধবোধে ভারাক্রান্ত মুখে বলল, “স-সরি! সরি, কারান!”
কারান একবার ডানে, একবার বায়ে মাথা ঝাঁকালো। অর্থাৎ সে শান্ত হতে পারছিল না। মুহূর্তের ব্যবধানে নিজের দেহ থেকে সমস্ত আবরণ উদ্গ্রহণ করল। মিরার দিকেও এগিয়ে এসে, তার নিম্নাঙ্গের অন্তিম পরিধেয়টুকু খুলে বস্ত্রখণ্ডটি শব্দহীন পতনে মেঝেতে ছুড়ে ফেলল।
মিরা স্তব্ধ হয়ে শুধু তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতর থরথর করে কাঁপছিল। ভেতরটা মোচড় দিচ্ছিলো অনুশোচনায়, তবু ঠোঁটে কোনো শব্দ এলো না।
কারান তার শরীরের উপর ঝুঁকে পড়ল। দুই বাহুর কঠিন বন্ধনে বন্দি করে রাখল তাকে। তার নিশ্বাস ক্রমে ভারী হয়ে উঠছিল। তারপর ফিসফিসিয়ে বলে উঠল, “তুমি জানো না, তোমাকে হারানোর আতঙ্ক আমার ভেতরটা কীভাবে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। সেই ভয়টা যেন আমার নিত্যসঙ্গী হয়ে গেছে; ছায়ার মতো প্রতিটি পদক্ষেপে অনুসরণ করে। প্রতিটি নিশ্বাসে, প্রতিটি মুহূর্তে আমি শুধু তোমাকে আগলে রাখতে চেষ্টা করেছি। সবসময় শুধু এটাই ভাবি, তুমি যেন একটুও ব্যথা না পাও, একটাও যেন আঁচড় না লাগে। আর তুমিই কিনা সেই ভয়টাকে সত্যি করতে গেলে? কেন করলে এমন, বউ?”
মিরা অক্ষিদ্বয় নামিয়ে রেখেই মৃদু কণ্ঠে বলল, “আর কখনো না। আর কখনো তোমার বলা কথা অমান্য করব না। তোমার বলা একেকটা শব্দই আমার পৃথিবীর দিশা হয়ে উঠুক, আমি তাতে চোখ বুজে পথ চলব। বিনা প্রশ্নে, বিনা প্রতিবাদে তুমি যা বলবে, তাই শুনব। শুধু এই একবার… একবার আমাকে ক্ষমা করে দাও। প্লিজ, ক্ষমা করো। প্লিজ…”
কারান মিরাকে আরও জোরালোভাবে আঁকড়ে ধরল। চোখ তুলে গভীর ভালবাসা আর নিরাশার মিশ্রণ নিয়ে বলল, “এভাবে আর খেলো না, সুইটহার্ট। তুমি জানো না, তোমার এই নিঃশব্দ নিষ্ঠুরতায় আমি একটু একটু করে মারা যাচ্ছি; নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আমার ভেতরের মানুষটা ভেঙে যাচ্ছে প্রতিটা মুহূর্তে। তুমি কি একটুও টের পাও না, কেমন অসহ্য যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছি আমি? ভয় পাই আমি—একা হয়ে যাওয়ার ভয়, তোমাকে হারানোর ভয়, তোমার উদাস চোখের ভয়। এই হৃদয়টা কেবল তোমার জন্যই ধুকপুক করে বাঁচে। তুমি এমন কেন, মিরা? আমি কখনও চাইনি তোমায় কষ্ট দিতে। প্রতিবার যখন রাগে কিছু করে ফেলি, বুকটা ছিঁড়ে যায় আমার। অথচ তুমি? তুমি যেন ইচ্ছে করেই চাইছো আমি আঘাত করি! বলো না, কেন এমনটা চাও?”
মিরার চোখ ভেজা, তারপরও হালকা ব্যথামিশ্রিত হাসল সে। তারপর নরম কণ্ঠে বলল, “তোমার আঘাত যেন প্রবল সমুদ্রের ঢেউ; প্রতিবার এসে ভেঙে দেয় আমাকে, আবার গড়ে তোলে বালুকাবেলায়। দহন হয়, তবু সেই দহনে আমি কেবল তোমাকেই খুঁজি। ফুল হয়ে ঝরে যাই, কিন্তু প্রতিটি পাপড়িতে থেকে যায় তোমার সুবাস। তুমি কোথায় আঘাত করো? ব্যথায় তো নিজেই ছারখার হয়ে যাও। তোমার আঘাতগুলোয় ভালোবাসাই লুকিয়ে থাকে; যা যন্ত্রণার রূপে আমার শরীর জুড়ে প্রবাহিত হয়। আর আমি সে যন্ত্রণা ভালোবাসি।”
মিরার কথাগুলো যে কারানের একটুও ভালো লাগেনি, সেটা তার থমথমে মুখেই স্পষ্ট হয়ে উঠল। সে মিরাকে কোনোভাবে আঘাত করতে চায় না, কিন্তু মিরা যেন জোর করেই তাকে সেই সীমার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আরও অবাক করার মতো ব্যাপার; মিরা চায়, সে তাকে আঘাত করুক।
এইসব বাক্যে কারানের ঘাড়ের পেশি খিঁচে উঠল, চোয়ালের হাড়গুলো শিরশির করতে লাগল।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তোমাকে দেওয়া আমার সবচেয়ে হৃদয়ছোঁয়া, বেস্ট গিফট কি হবে জানো?”
মিরা হেসে তার কণ্ঠনালি দু হাতে আবদ্ধ করে বলল, “কি?”
“আমার হাতে তোমার মৃ’ত্যু।”
কারানের অন্তর্সঞ্চিত ক্ষোভ মিরার দৃষ্টিতে নিখুঁত সূক্ষ্মতায় ধরা পড়ল। তার বক্তব্য যে কারানের কাছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, সেটাও তার উপলব্ধির সীমায় ধরা দিল। তাই আত্মসংবরণে স্নিগ্ধ হাসি ছুঁড়ে মিরা বলল, “আচ্ছা, তারপর?”
“তারপর আমি পাগলের মতো একাকী রাস্তায় হাঁটব, আর আকাশের নিচে একা একাই তোমার সাথে কথা বলব।”
মিরার হাসি আরও জোরালো হলো, “তারপর?”
“জানি না।”
“আচ্ছা, যদি তার উলটো হয়?”
কারান তৎক্ষণাৎ উঠে পাশের টেবিল থেকে একটি ফলের ছুরি তুলে মিরার হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর নিজের গলার কাছে মিরার ছুরি ধরা হাতটা চেপে ধরে বলল, “মে’রে ফেলো। এক্ষুনি আমার গলায় ছুরি বসিয়ে দাও।”
মিরা করুণ স্নিগ্ধতায় হাসল, ছুরিটি নীরবভাবে পাশের টেবিলে সরিয়ে রেখে আলতোভাবে কারানের গলায় আঙুল বুলিয়ে দিল। তারপর আকস্মিক এক টানে তাকে নিজের কাছে টেনে এনে গলার কাছে নামিয়ে আনল। কারান মোহাচ্ছন্নের মতো মিরার গলা জড়িয়ে তার বক্ষে শীতল প্রশান্তিতে শুয়ে রইল। মিরা হালকা অভিমান নিয়ে বলল, “তারপর আমার পরিণতিটা কি হবে, ভেবেছ?
“হুম।”
“কি ভাবলে?”
Tell me who I am 2 part 3 (2)
কারান গভীর, শীতল কণ্ঠে বলল, “আমাকে মেরে ফেলো, মিরা। বুকের নিচে ছুরি বসাও, ঠিক সেখানে যেখানে এখনো তোমার ঠোঁটের দগ্ধ স্পর্শ জ্বলজ্বল করছে। তারপর নিজের শরীরটাও আমার নিচে রেখে দিও। আমাদের কবর যেন পাশাপাশি না হয়ে একত্রে হয়। অর্থাৎ মৃত্যুও আমাদের আলাদা করতে পারবে না। আমাদের শরীর দুটো পচে গিয়ে এক হয়ে যাক, যেন মাটি পর্যন্ত বুঝতে না পারে, কে তুমি আর কে আমি। আমি ঘুমিয়ে থাকব তোমার বুকের ঠিক ওপরেই, নিশ্বাস ফুরিয়ে যাওয়ার পরও তোমার হৃদয়ের স্পন্দন শুনব। আর কোনো সমাজ থাকবে না, কোনো শাসন থাকবে না, পাপ-পুণ্যের ধূর্ত নজর থাকবে না; শুধু থাকবে তুমি, আমি আর সেই নিস্তব্ধতা— যে নিস্তব্ধতা মৃত্যুর চেয়েও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখবে আমাদের ভালোবাসাকে।”
