Home The Silent Manor The Silent Manor part 74

The Silent Manor part 74

The Silent Manor part 74
Dayna Imrose lucky

সকাল এসেছে, কিন্তু মনে হয় না দিন শুরু হয়েছে। চারপাশে আলো আছে, তবু অদ্ভুত এক শূন্যতা ভেসে বেড়াচ্ছে। ঘরের জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকছে, কিন্তু সেই আলো উষ্ণ নয়, বরং নীরব। পাখিরা ডাকছে, অথচ সেই ডাকে আনন্দ নেই, শুধু শব্দ আছে। যেন প্রকৃতি নিজের কাজ করে যাচ্ছে, তাঁর নিয়মে।

থমাস শন বসে আছেন বসার ঘরে।এই সকালটাতে মীর এর অনুপস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।যে মানুষটির কণ্ঠে সকালটা জেগে উঠত, সে নেই।চায়ের কাপটা টেবিলে রাখা,কিন্তু তাঁর খাওয়ার ইচ্ছাটুকু নেই।খবরের কাগজ খুলে ধরা, অথচ চোখের সামনে অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে যায়। সময় চলছে ঠিকই, কিন্তু মন যেন আটকে আছে কোথাও।
নিস্তব্ধ এই সকালে স্মৃতিরা বেশি হানা আনে। একসময় যে হাসি, যে উপস্থিতি সকালকে পূর্ণ করত, তা এখন শুধু মনে পড়ে। ঘড়ির কাঁটার শব্দ স্পষ্ট শোনা যায়, কারণ আর কোনো শব্দ নেই শূন্যতাকে ঢেকে দেওয়ার। এই নীরবতা ভারী, বুকের ভেতর জমে থাকা জঘন্য ব্যথা।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

বাইরে মানুষ চলাফেরা করছে, দিন শুরু করছে, কিন্তু নিজের ভেতরে কিছুই শুরু হয় না। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও একটা বড় ফাঁকা জায়গা রয়ে যায়। সেই শূন্যতা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু অনুভবে গভীরভাবে ধরা দেয়।
এই সকালটা দিনের শুরু নয়, এক ধরনের অভাবের অনুভূতি। যেখানে আলো আছে, কিন্তু উষ্ণতা নেই। শব্দ আছে, কিন্তু সঙ্গ নেই। প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতিতে সকালটা নিস্তব্ধ, ভারী। অসম্পূর্ণ।

আহির ব্যাগপত্র গোছাচ্ছে। রাফিদ বসে বসে সেসব দেখছে।চোখে জল জমে।অথচ পড়ে না। পড়তে দিচ্ছে না।আহির চলে যাবে,মীর তো চলে গেছেই, মোহিনী নেই।চারপাশটা যেন বিবর্ণ হয়ে উঠছে। ফাঁকা ফাঁকা লাগছে সবকিছু। রাফিদ আহির কে বাঁধা দিতে পারছে না।সে চাইছে আহির আরো কিছুদিন থাকুক। একসাথে সময় কাটাক।অবশ্য এতে উন্নতি আর হবে কোথায়।লোকে বলে যত বেশি কারো সাথে সময় কাটানো হয় তাঁর সাথে তত স্মৃতি যুক্ত হয়। এরপর মানুষটা দূরে চলে গেলে, সে-ই স্মৃতিগুলো হাতছানি দিবে।

রাফিদ এক আঙ্গুলের সাহায্য চোখ দুটো মুছে ফেলে।আহির ব্যাগ গুছিয়ে বসে নীরবে।আজ নিজেকে তাঁর ব্যর্থ মনে হচ্ছে। গোয়েন্দা নামক ট্যাগ নাম থেকে মুছে ফেলবে নিশ্চিত করেছে। যেখানে নিজের বন্ধুর হ’ত্যাকারীকে, নিজের প্রিয় মানুষটিকে খুঁজে পায়নি, সেখানে গোয়েন্দা বলে নিজেকে দাবী করা বোকামি মাত্র। লজ্জার।
আহির সিগারেট ধরাল। ফুঁকতে শুরু করল। মিনিট দুয়েক কেটে যাওয়ার পর মেরুদন্ড সোজা করে বসে।হাতের সিগারেট এশট্রেতে রেখে দেয়। নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল “আচ্ছা রাফিদ, যেদিন রাতে মোহিনীর খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম সেদিন ওঁর বাবার সাথে দেখা হয়েছিল।এম আই রাইট?

“হুম কেন?’
“ওদিন উনার সাথে একজন মৌলভী ছিল। উনাকে চিনিস!”
“হুম।এলাকার। চিনব না কেন!”
“চল!”
“কোথায়?!
“উনার কাছে‌।উনি নিশ্চয়ই জানবেন মোহিনীরা কোথায় গেছে!”
রাফিদ সজাগ হল হঠাৎ যেন।সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল।বলল “এটা তো মাথায় ছিল না।চল যাই।”
তারা দু’জন ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদ এর উদ্দেশ্য রওনা হয়। তাঁদের যেতে দেখলেন বৈঠকখানা থেকে আমজাদ,থমাস শন। শালুক দেখলেন বাড়ির ছাদ থেকে।উনার সাথে জয়ন্তন বেগম।শালুক হতাশ চোখমুখে পায়চারি করছেন। তাঁকে অস্থির দেখে জয়ন্তন বেগম বললেন “কি ভাবছো! এরকম ছটফট করতেছো ক্যান?”
শালুক স্থির হলেন। জয়ন্তন এর পাশে এসে বসেন।চোখ দুটো টলমল করছে। জয়ন্তন ফের বললেন “মীর এর লইগা মন কান্দে, বুঝি তো আমি।এটা হওয়োন এর কথা আছিল।”

“আম্মা!তবু যে মীর কে আমি নিজের সন্তানের মতন পেলে পুষে বড় করেছিলাম।সেদিন যা কিছু করা হয়েছিল সবটা রুম্পা কে খুশি করার জন্য।”
“অন্যর ধণ নিজের আপন বলে দাবি করাও যে পাপ বউমা।মীর জীবনে ওঁর আপন মা বাবা কে পাইল না।হয়ত তাঁগো প্রতিরূপ হিসেবে তোমাগো আদর কম আছিল না।তবু…!”
‘মীর তাঁর আপন মা বাবার আদর পায়নি।’ বাক্যটি হাওয়ায় ভেসে গেল মায়ার কানে।সে ছাদেই আসছিল। শালুক তখন ডেকে আসছিলেন।আসেনি।মায়ার হঠাৎ মাকে দরকার পড়ায় ছাদে আসে। শব্দটি তাঁকে থ’হয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়। শালুক জয়ন্তন এর কথার জবাব দেয়ার আগে নজর পড়ল মায়ার দিকে।মায়া প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। শালুক একবার জয়ন্তন এর দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।মায়ার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললেন ‘তুই এখানে কখন এলি!আয়,বস এখানে।রোদ পোহালে ভালো লাগবে।” মায়াকে নিয়ে জয়ন্তন এর সামনে বসালেন।মায়া ঘুরে ঘুরে দু’জন কে দেখে ইশারায় জিজ্ঞেস করল মীর কে নিয়ে তাঁরা কি বলছিল!মীর আপন মা বাবার সন্তান নয় মানে?”

জয়ন্তন মায়ার ইশারা বুঝে পান চিবানো বন্ধ করলেন। শক্ত মুখে দেখেন মায়াকে। সে-ই সাথে শালুক কে। শালুক থতমত খেয়ে বললেন “এসব তুই কি বলছিস,ভুল শুনেছিস, অন্যকিছু বলছিলাম।”
মায়া ক্রোধের আহভাস প্রকাশ করল।মীর চলে যাওয়ার পর রাগটা তাঁর কিছুটা বেড়ে গেছে।কারো ভালো কথাতেও কখনো কখনো রেগে যায়।মুখ খামচে বোঝাল সে ভুল শোনেনি। সত্যটা জানতে চায়।কি লুকানো হচ্ছে!”
শালুক এর মুখে অন্ধকার নেমে আসল। চোখমুখ এক করে ফেললেন। জয়ন্তন ও সে বারবার চোখাচোখি করলেন। মেয়েকে কি জবাব দিবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। সত্যটা বলবেন, না মিথ্যেটা!যেটা এত বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছে!উনি ভীষণ বিপাকে পড়লেন। জয়ন্তন দৃষ্টি নত করলেন।মায়া বসা থেকে উঠে রেগে আবার বোঝাল সে সত্যটা এখুনি জানতে চায়।এটা বোঝানোর পড়েও যখন শালুকের প্রতিক্রিয়া দেখল না,তখন নীরবে ইশারা করল ,মীর কে আবার তোমরাই মে’রে ফেলোনি তো!” ইশারাটা তীর এর মত বিধল শালুকের গায়ে।চোখ দুটো ফুটে উঠল। জয়ন্তন অবাক হলেন মায়ার এহেন কথায়। শালুক বললেন “ছিঃ!যে ছেলেকে নিজের সন্তানের মতন ভালোবেসেছি,ওকে আমরা মেরে ফেলব!এটা ভাবলি কি করে!”

শালুক রেগে নয় বরং আবেগী হয়ে বললেন কথাটা।জয়ন্তন বললেন “তোর মায়রে এইডা কইতে পারলি!তোর মা কত দুঃখ পাইতেছে মীর যাওয়ার পর থেইকা,আর তুই কি কইলি!”
মায়া আবার ইশারায় বলল “তাহলে সত্যটা বলো,মা কি লুকাচ্ছেন,মীর এর আপন মা বাবার আদর পায়নি মানে! তাঁর মা ছিল না বেঁচে।সেটা জানি। কিন্তু বাবা তো ছিলেন।আদর পাচ্ছিলেন।”
শালুক দৃষ্টি মেঝেতে নিবদ্ধ করে বললেন “মীর আমার বোনের গর্ভের সন্তান নয়।মীর হায়দার বংশের সন্তান!”

শালুক থামেন। তাঁদের মাথার উপর থেকে একটা কাক উড়ে গেল।মায়া পিছপা হয়ে ছিটকে সরে যায়।চোখ স্থির। শালুক চাপা স্বরে কাঁদলেন। জয়ন্তন বেগম ও মাথা নিচু করে বসে আছেন।যেন,মহৎ পাপ এর পর্দা উঠে যাচ্ছে।
মায়া ধীর পায়ে হেঁটে মায়ের কাছে আসল। হাঁটু ভাঁজ শালুকের পা জড়িয়ে ধরে বসে। ইশারায় বলল “এর মানে কি মা!আর কোন হায়দার বংশের ছেলে ছিল মীর!মা আসল সত্যটা বলো!” মায়ার কণ্ঠ থেকে স্বর না আসলেও ভেতর থেকে এক প্রকার চিৎকার এর আওয়াজ সৃষ্টি হয়ে সেটা মায়ার চোখের মাধ্যমে বেরিয়ে আসল।
শালুক সময় নিলেন। নিজেকে সামলে নিলেন। জয়ন্তন বললেন “সত্যটা লুকাইয়া আর কি হইবো বইলা দাও।সত্য আজ হোক বা কাল সামনে আসার ছিল।”

শালুক বললেন “আমার বোন রুম্পার সাথে থমাস এর বিয়ের ছয় বছর কেটে যাওয়ার পরও ওঁদের কোন সন্তান হচ্ছিল না। এরপর চিকিৎসা শুরু করা হয়।তাতেও উন্নতি হয়নি।এরকম আরো একটি বছর কেটে যাওয়ার পর একজন ডাক্তার এর হাতে রুম্পা পড়ে।আর উনি কিছু নিয়ম, ঔষধ দেন।বলেন এতে সন্তান নিশ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।আর সে-বার সত্যিই মিরাকেল ঘটে। রুম্পা অন্তঃসত্ত্বা হয়। ওকে গ্রামে নিয়ে আসেন থমাস। এভাবে নয়টি মাস কেটে যাওয়ার পর সময় আসে সন্তান প্রসবের দিন।সেদিন রুম্পা বারবার বলছিল ও বাঁচবে না। গুরুতর অবস্থা হয় ওর। হাসপাতালে নেয়ার মতোও তখন ব্যবস্থা ছিল না। একজন হাকিম কে ডাকা হয়।দাই। উনারা রুম্পার চিকিৎসা করে গোপনে আমাদের কাছে জানান রুম্পার পেটের সন্তান মা’রা গেছে।যারজন্য রুম্পা অনেক বেশি কাতরাতে ছিল ব্যথায়।আমি খুব কষ্ট পাই সেদিন। এবং থমাস।কি করব ভেবে পাচ্ছিলাম না অমন সময়।ঠিক সে-ই সময়ে আমার মাথায় নিকৃষ্ট চিন্তা আসে। বাচ্চা চু’রি করার।

আমাকে যদিও সেদিন আম্মা,থমাস বারণ করেছিলেন এমনটির জন্য। কিন্তু নিজের বোনকে খুশি করতে এটা যেন করতেই হয়েছে।আমি জলদি করে দাই কে ডেকে পাঠাই। তাঁকে জিজ্ঞেস করি সেদিন আরো কারো বাচ্চা জন্ম হয়েছে কিনা!সে ভেবে জানায় হায়দার বংশের জমজ দুটো ছেলে সন্তান হয়েছে।আমি ওকে সেখান থেকে একটা বাচ্চা চু’রি করে আনতে বলি। এবং তারজন্য ওকে বেশ টাকা পয়সা দেয়া হয়। রুম্পা সেদিন মৃত সন্তান জন্ম দেয়।মৃত সন্তান সরিয়ে সেখানে হায়দার বংশের সন্তান কে রাখা হয়।আর রুম্পা মৃত্যুর আগে অন্যর ছেলেকে নিজের বলে জেনে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে।” শালুক বিরতি রেখে বললেন “চাঁদের মত উজ্জল ছিল মীর।দেখেই মায়া লেগে গিয়েছিল সবার। এতটা সুন্দর শিশু আর আমরা দেখিনি। আমি সন্তানের লোভে পড়ি।তখন রাফিদ দুনিয়াতে আসেনি।আমিই মীর কে লালন পালন করে বড় করি। থমাসের ও ভীষণ মায়া হয় ওঁর জন্য। এরপর বড় হলে তিনি থাইল্যান্ডে নিয়ে যান পড়াশোনার জন্য।”

মায়া অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে আছে শালুকের দিকে।তাঁর দিকে তাকানোর রেশ কাটলে তাকায় জয়ন্তন এর দিকে। জয়ন্তন বললেন “হুঁ দাদু,তোর মা ঠিকই কইছে।মীর হায়দার বংশের সন্তান।”
মায়া কথা বলতে পারে না।আর এখন যেন ইশারা টুকু ভুলে গেছে। মেঝেতে লেপ্টে বসে। শালুক বললেন “ মীর ওঁর মা বাবার আদর পায়নি। শেষমেশ জীবনের আয়ুরেখাটাও দীর্ঘ হল না।”
মায়া ঢোক গিলে।দম ফেলে ইশারায় প্রশ্ন করল “কোন হায়দার বংশ?”
শালুক বললেন “দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির লেখক – সুফিয়ান হায়দার ওরফে সে-ই অমর ছদ্মবেশী রাখাল বাঁশিওয়ালার বংশধর।”
মায়া এবার পুরোপুরি আশ্চর্য হল।আশ্চর্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে সে পৌঁছে গেছে।কি শুনছে!অবাক হচ্ছে। চোখের পলক ফেলতে ভুলে যাচ্ছে।মায়া পুনরায় বোঝাল ‘তুমি দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি সম্পর্কে জানো!আর সুফিয়ান হায়দার এর তো স্ত্রী মানে ফারদিনা অন্তঃসত্ত্বা থাকাকালীন মা’রা গিয়েছিল। সুফিয়ান হায়দার নিজের হাতে হ’ত্যা করেছিলেন ।”

শালুক কেঁদে উঠলেন। তাঁকে এই দ্বিতীয়বার মায়া এভাবে কাঁদতে দেখছে। প্রথমবার মীর এর জন্য কেঁদেছে। চোখের জল তখন মুষলধারে বৃষ্টির মত পড়ছিল।আজও তেমন ভাবে পড়ছে। শালুক এর অভিব্যক্তি বলে দিচ্ছে,সে কষ্ট পাচ্ছে। তবে তাঁর কষ্টের ব্যখ্যা এখনো মায়া ধরতে পারছে না।মীর এর জন্য?নাকি সুফিয়ান হায়দার এর জন্য!কি হয়েছিল তাঁর সাথে!আহির তাঁকে যতটুকু বলেছিল তার থেকে বেশি কিছু কি শালুক জানেন!আর অতিরিক্ত জানাটা নিশ্চয়ই করুণ কিছু বলে মায়া নিশ্চিত করল।
মায়া মেঝে থেকে উঠে মায়ের মুখোমুখি হয়ে বসে।শালুক দৃষ্টি নত করেই রাখছেন।মায়া তাঁর মায়ের চোখের জল মুছে দিল।বোঝাল “সুফিয়ান হায়দার এর সন্তান মানে!দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি তুমি পড়েছিলে!তবে কখনো বলো নি কেন?”

শালুক বাধ্য হলেন এহেন প্রশ্নের জবাব দিতে।জবাব যে দিতেই হবে।চোখ মুখ শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছলেন।সতেজ হলেন।চোখ তুলে ছাদের এক কোণে গোলাপ গাছটির দিকে তাকালেন। বললেন “আমরা কেন আমাদের বংশের আসল পরিচয় দিতাম না সেটা নিশ্চয়ই জানতে পেরেছিস। সম্রাট নিষাদ এর বংশধরের জন্য। এইজন্য বরাবরই আমরা চুপ থাকতাম। কিন্তু আমরা জানি কে সুফিয়ান হায়দার,কে ফারদিনা!আর সুফিয়ান হায়দার মৃত্যুর আগে তাঁর বোন তাঁকে কি উপহার দিতে চেয়েছিল।” এতটুকু বলে থামেন তিনি।মায়া ভ্রুকুটি ভাঁজ করে চোখ দুটো ছোট করে ঠোঁট ফাঁক করে তাকিয়ে আছে।যতই শালুক গভীরে যাচ্ছে ততই মায়া স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে।কত মানুষ এখনো সুফিয়ান হায়দার এর সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছে,সে শেষবার কি বলতে চেয়েছিল! তাঁর বোন কি উপহার দিতে চেয়েছিল!কেউ জানে না তা!জানার আগ্রহ যে প্রতিটি মানুষের।

শালুক বসা থেকে উঠে দাঁড়ান। হেঁটে রেলিঙ ধরে দাঁড়ান।মায়া তাঁর মায়ের পিছু পিছু গেল।সে পারছে না শালুক এর ভেতর থেকে সত্য গুলো টেনে টেনে বের করতে।মায়া তাঁর মাকে তাড়া দিল। শালুক কণ্ঠ খাদে নামিয়ে শীতল কণ্ঠে বললেন “সেদিন বিন্তি কি উপহার দিতে চেয়েছিল জানিস!” বলে শালুক রহস্যময় এক হাঁসি দিলেন।মায়া মাথা হ্যাঁ সূচক আকার নাড়ায়। দ্রুত।ঠিক তখনই জয়ন্তন বেগম মায়ার বা পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন “সুফিয়ান যাকে হ’ত্যা করে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল সেই মানুষটিকেই উপহার দিতে চেয়েছিল বিন্তি।ফারদিনা বেঁচে ছিল।”
জয়ন্তন এর কণ্ঠ বজ্রপাতের মতন ধারাল হয়ে উঠল। তাঁর কথা বলার ধরণ ও বদলে যায়। তাঁর অভিব্যক্তি। পরিবেশ দিনের হলেও নিস্তব্ধতায় যেন ঘিরে গেছে চারপাশ।মায়া একবার শালুক কে , একবার জয়ন্তন কে দেখছে।ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দু’জন কে দেখছে। তাঁরা কি বলছে!মায়া যে বিশ্বাস করতে পারছে না।

শালুক বললেন “ভাবছিস ফারদিনা কিভাবে বেঁচে থাকতে পারে! উত্তর হচ্ছে আল্লাহ চাইলে সব পারে।ফারদিনা তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিল। অল্প আঘা’তেই কাবু হয়ে গিয়েছিল। ক্লান্তিতে, না খেয়ে থাকায়, ওঁর ভাইদের মার ধরে। সেদিন ফারদিনা পুরোপুরি সজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিল।নাড়ি অবধি খুঁজে পাওয়া যায়নি।যখন ফারদিনাকে গোসল করানোর ব্যবস্থা করা হয় তখন তাঁর চোখ মুখে জল পড়তেই নড়ে চড়ে উঠে।আর তাঁকে জীবিত বলে নিশ্চিত করেছিল মৌলভীর মেয়ে হেলেন।ফারদিনাকে সে সবার আড়ালে বাড়িতে নিয়ে যায়।মৌলভী চেয়েছিল সুফিয়ান কে সত্যটা বলতে কিন্তু আপাতত কাউকে কিছু বলার দরকার নেই বলে হেলেনা জানায়।হেলেনা ফারদিনাকে সুস্থ সবল করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। যতটা রক্তের বোনও করে না।ফারদিনা এক পর্যায়ে সুস্থ হয়। সুস্থ হওয়ার পর তাঁর প্রথম প্রশ্ন ছিল সুফিয়ান কোথায়!হেলেনা তখন সব ঘটনা খুলে বলে।

এরপর ফারদিনা সুফিয়ান এর ভালোবাসা পরিক্ষা করার জন্য হেলেনাকে সুফিয়ান এর গা ঘেঁষতে বলে। কিন্তু সুফিয়ান ফারদিনার অনুপস্থিতিতেও তাঁকেই ভালোবেসেছিল।হেলেনা বুদ্ধি করে সুফিয়ান এর বোন বিন্তি কে ফারদিনার সাথে দেখা করায়।সব সত্য বলে। বিন্তি খুব খুশি হয়। কিন্তু তাৎক্ষণিক সুফিয়ান কে কিছু বলেনি অবাক করার জন্য। সুফিয়ান এর জন্মদিনে চেয়েছিল সত্যটা বলবে। তাঁর ভালোবাসা কে উপহার দিবে। কিন্তু আর সেই সত্য সামনে আসেনি।সব শেষ হয়ে যায়।” শালুক থামেন। চোখে আবার জল জমে।ফের বললেন “সেদিন বোধহয় দেরি করে সুফিয়ান এর জন্মদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করাটা বোকামি ছিল। যদি সুফিয়ান কে সত্যটা আগেই বলে দিত তবে রশীদ তালুকদার মেয়ে পেয়ে আর সুফিয়ান কে খু’ন করতেন না। এইজন্যই বলা হয় – কারো জন্য কিছু করতে হলে, কাউকে উপহার দিতে হলে,তা তাৎক্ষণিক দিয়ে দাও। কেননা, তাজমহল সাড়া দুনিয়া দেখলেও মমতাজ কিন্তু দেখেনি।-”

মায়া চোখের জল ফেলছে। এতটা করুণ,এতটা নিষ্ঠুর কেন হয়েছিল সুফিয়ান হায়দার এর ভাগ্য! কেন!মায়ার সেসব ভেবেই কান্না পাচ্ছে। খুব করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। খোলা আকাশের নিচে বসে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে মন চাইছে।হয়ত এভাবে একটু কাঁদলে শান্তি পাওয়া যেত।
মায়া চোখ মুছে ফেল প্রশ্ন করল ইশারায় “তাহলে সেদিন জানাযা কার আর মাটি কাকে দেয়া হয়েছিল?”
শালুক বললেন “সেদিন একটা খবর খোঁড়া হয়েছিল ঠিকই। এবং কবরের কাঠামো করা হয়েছিল এমন ভাবে যেন সেখানে কাউকে মাটি দেয়া হয়েছে। আসলে কাউকে মাটি দেয়া হয়নি।সেদিন সুফিয়ান স্বচোক্ষে কিছুই দেখেনি।”

বাকি সত্য বললেন জয়ন্তন “এরপর ফারদিনা সিন্ধুতলিই ছিল। ক্রোধে আর তাঁর বাবার সাথেও দেখা করেনি। হায়দার বাড়িতেও আর ফিরেনি।যে বাড়িতে সুফিয়ান নেই সে বাড়িতে আর সে প্রবেশ করবে না নিশ্চিত ছিলেন। এভাবে দীর্ঘ ন’মাস কেটে যাওয়ার পর তাঁর কোল জুড়ে সন্তান আসে। সুফিয়ান হায়দার এর মতই সুন্দর ছিল।যেন আরেক সুফিয়ান। তাঁর সন্তান হওয়ার পর আজমাত নুরবেক দেশের মাটিতে আবার পা রেখেছিল।ফারদিনাকে আজমাত মন থেকেই পছন্দ করত,ভালোবাসত। কখনো মুখ ফুটে বলেনি। এরপর ফারদিনাকে প্রেম নিবেদন করলেও আর সে রাজি হয়নি।বাকি জীবনটা সুফিয়ান এর স্মৃতি ঘিরেই কাটিয়ে দেয়। তাঁর সন্তান বড় হয়, বিয়ে হয়, সেই ঘরে সন্তান আসে। এভাবে তাঁর বংশ বিস্তার করলেও এক সময় যেন সবাই সবকিছু ভুলে যায়। বিশেষ করে আমরা যখন মীর কে নিয়ে আসি তারপর থেকে সে-ই বংশের কারো খোঁজ পাওয়া যায়নি।”
মায়া আবার ইশারায় বলল “মীর এর জমজ ভাই?
শালুক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বললেন ‘জানি না ও কোথায়?হয়ত বেঁচে আছে। তবে জানতে পেরেছিলাম ওদের মা বাবা নেই।মারা গেছেন।”
“সুফিয়ান হায়দার সেদিন কি বলতে চেয়েছিল?”

রাফিদ ও আহির মসজিদ এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রায়ই ঘন্টাখানেক। যোহরের আজান পড়েছে। তাঁরা প্রথমবার মসজিদে এসে পায়নি মৌলভী কে। এরপর বাড়িতে গিয়েছিল। বাজারে। ছিল না সেদিকে। ঘুরেফিরে এখন মসজিদে আসলে আযানের ধ্বনি পায়। নিশ্চয়ই সে ভেতরে নামাজ পড়াচ্ছেন। নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

নামাজ শেষ হয়।একে একে সমস্ত মুরুব্বিরা মসজিদ থেকে বের হয়।সবাই চলে গেলেও মৌলভী কে দেখা গেল না।আহির ও রাফিদ একটু ভেতরে প্রবেশ করে উঁকি দিল মসজিদ এর ভেতরে।মৌলভী ভেতরে বসে কোরআন শরিফ পড়ছেন। রাফিদ তখন তাঁকে ডাকলেন। উনি প্রথম ডাকেই সাড়া পেয়ে আসেন।
আহির ভদ্রতার সাথে বলল “চাঁচা, সমস্যা না থাকলে একটু বাইরে আসুন। কোথাও বসি।চারটে কথা ছিল।”
মৌলভী প্রথমে আহির কে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখলেন। এরপর তাকান রাফিদ এর দিকে। রাফিদ কে তিনি চিনতে পারলেন। বললেন “কি বলবা তোমরা?”

“একটু সময় দরকার। চলুন ঘাটপাড়ে বসি।” বলল আহির। এরপর তাঁরা মসজিদ এর ঘাটপাড়ে বসে।
আহির পুকুরের জলের দিকে চেয়ে বলল “চাঁচা, মাস্টার বাড়ি তালাবদ্ধ কেন! উনারা কোথায় গেছেন?
মৌলভী অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়লেন যেন। কটমট করে তাকায় আহির এর দিকে।হাতে ছিল তসবিহ।খুব দ্রুত তাসবিহর দানা টানতে শুরু করলেন। বললেন “এসব আমি জানব কিভাবে?”
“আপনি সব জানেন। সেদিন রাতে আপনিই তাঁর সাথে ছিলেন। শেষ আপনিই দেখেছেন।” আহির বলল
মৌলভী ক’বার ঢোক গিললেন। বললেন “বাজারে বসে দেখা হয়।তাই কথা বলতে বলতে বাড়ির পথে ফিরছিলাম।”
“সত্যটা বলুন।নয় কিন্তু ঠাণ্ডা পুকুরে আপনাকে ডোবাবো। আপনি মুরুব্বি, সম্মান দিচ্ছি। বজায় রাখুন।”
মৌলভী এবার একটু শান্ত হলেন।হাত থামে।চোখ সরে অন্যদিকে। বললেন “কোথাও চলে গেছে”

The Silent Manor part 73

“কোথায়?
“জানি না।”
“মোহিনীও চলে গেছে?’
মৌলভী এবার একটু সময় নিয়ে বললেন “মোহিনী কে মে’রে ফেলেছে।’
আহির থ’হয়ে বলল ‘মেরে ফেলেছে মানে,কে মেরেছে?
‘ওর আপন মানুষ ই‌।” বলে কেঁদে উঠলেন মৌলভী সাহেব।

The Silent Manor part 75