অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪১+৪২
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
ঘড়িতে তখন ৮:০০ কী ৮:৩০,
টেবিলে বসে পড়ছে হীরা। আর অপেক্ষা করছে অনিলের। তার সাথে আজ বেশ রেগে আছে হীরা। আজকে পুরো রাস্তা মেয়েটা হেঁটে হেঁটে এসেছে। যার দরুণ মসৃণ পা জোড়াতে ঘাম আর ময়লার মিশ্রণে কিছু জায়গায় লাল বর্ণের জখম তৈরি হয়ে গেছে। এটা তার ছোট বেলার স্বভাব, বেশিক্ষণ জুতো পড়ে হাঁটলে তার পা ঘেমে জখম হয়ে যায়। পড়ার মাঝেই বরাবরের ন্যায় নিঃশব্দে রুমে প্রবেশ করলো অনিল। তার উপস্থিতি টের পেতেই টেবিল ছেড়ে উঠে পরলো হীরা। তবে সামনে এসে অনিলের লালিত আঁখি যুগল চোখে পড়তেই রাগটা উবে গেল। মনের মাঝে ভয় কাজ করতে লাগলো তার। উনাকে এমন অস্বাভািক লাগছে কেন! উনার কী শরীর খারাপ? হতে পারে, এজন্যই হয়তো তাকে নিতে আসতে পারে নি। ভেবেই অনিলের নিকট এগিয়ে এসে নরম স্বরে বললো,
“ আপনার কী শরীর খারাপ? ”
বলেই তাপমাত্রা চেক করার উদ্দেশ্যে হাত টা এগিয়ে নিচ্ছিলো সে। তবে তাকে অবাক করে দিয়ে তার হাত টা ছিটকে রে সরিয়ে দিলো অনিল। বললো,
“ তোর এই নোংরা হাত দিয়ে ছুঁবি না আমায়। হাত কেটে ফেলবো একদম! ”
অনিল তার হাত টা এতোটাই জোরে ছিটকে মেরেছে যে, হাত টা ঝিম মেরে গেছে হীরার। এতেও যেনো মেয়েটার কোনো পরোয়া নেই। সে শুধু আশ্চর্য নয়নে অপলক তাকিয়ে আছে অনিলের দিক। অনিল তাকে এভাবে কথা বলছে? নিজের কান কে নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না তার। সে অশ্রুসিক্ত নয়নে বললো,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“ মানে! আপনি কী বলছেন এইগুলো! ”
অনিলের রাগ যেনো এবার মাথায় চড়ে বসলো। তার সামনে অভিনয় করছে এই মেয়ে? কিছু বুঝতে পারছে না? রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললো সে। হীরাকে টান মারে দরজার সাথে চেপে ধরলো। কন্ঠে যতো বিতৃষ্ণা আছে সব ঢেলে দিয়ে বললো,
“ নাটক করছিস তুই আমার সাথে! এই, ভালোবাসা কী তোর কাছে নাটক মনে হয়? আমার ভালোবাসাকে কী তোর ভালোবাসার মতো সস্তা মনে হয়? তোর বুক কাঁপল না আমার ভালোবাসা নিয়ে মজা করতে? বল, কথা বল! ”
অশ্রুরা যেনো এবার বাঁধ ভেঙেছে হীরার। দু’চোখ দিয়ে অনর্গল বারি নির্গত হচ্ছে তার। মেয়েটা যেনো ভাষা হারিয়ে ফেলেছে। কী শুনছে, কেন শুনছে, কিছুই মাথায় ঢুকছেনা তার। শুধু এক একটা কথা তীরের মতো বিধছে তার অন্তরে। তাকে চুপ থাকতে দেখে অনিলের রাগ এইবার আকাশ চুম্বি হলো। সে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে দরজায় একটা লাথি মেরে বললো,
“ আর আমিই কী গর্দভ! যে মেয়ে স্বামী থাকা সত্বেও প্রাক্তনের হাত ধরে কথা বলে সে আর ভালোবাসার কী বুঝবে! ”
বলেই রূম ছেড়ে চলে গেলো সে।এইবার সম্পূর্ন ঘটনা বুঝতে পারলো হীরা। জলে টইটম্বুর চোখ নিয়ে অনিলের যাওয়ার পানে চেয়ে ছুট লাগালো। সামনে গিয়ে ভাঙা গলায় বললো,
“ আপনি প্লিজ আমার কথা টা… ”
তার কথা সম্পূর্ন হতে দিলো না অনিল। তার আগেই নিজের হাত টা উঁচিয়ে হীরার উপর তুলতে নিয়েও থেমে গেলো। বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ফেলে হীরাকে ধাক্কা দিয়ে সামনে থেকে সরিয়ে ধুপধাপ পায়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। হীরা একদম স্তব্ধ হয়ে গেলো
থমথমে পরিবেশ। সিঁড়ির মাঝে চুপচাপ বসে আছে হীরা। তার দুপাশে স্থির হয়ে বসে আছে আনিকা ও নাজিয়া বেগম। তখন অনিলের এমন চিল্লাচিল্লি শুনে বেরিয়ে এসেছিলো তারা। এসে দেখতে পেলো অনিল হীরাকে ধাক্কা দিয়ে নিজে ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। সাথে সাথেই হীরার কাছে ছুটে এসেছে দুজনে। আজকের আগে শেষ কবে এভাবে অনিলকে রাগতে দেখেছিলো তা বলতে পারবেন না নাজিয়া বেগম। অনিল সহজে রাগে না তবে যখন রেগে যায় তখন সে কী বলে, কী করে সে নিজেই জানে না। নিশ্চয় বড়ো কোনো ঘটনা ঘটেছে তাই অনিল এভাবে রেগেছে। হীরার পাশে বসে তার থেকে সব জানতে চাইলে। একটু থেমে সব খুলে বলে হীরা, তাদের বিয়ে কোন পরিস্থিতি তে হয়েছিলো সেটাও আজকে বলেছে। সব শুনে স্তব্ধ হয়ে গেছেন নাজিয়া বেগম। তবে আনিকার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ভিন্ন। সে আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিলো তার ভাই ও হীরার সম্পর্ক ভালোবেসে হয়নি। সে প্রথম থেকেই লক্ষ্য করেছে হীরা ও তার ভাইয়ের সম্পর্কের অস্বাভািকতা। প্রথম প্রথম তার ভাইয়ার সামনে হীরার দ্বিধা বোধও চোখ এড়ায়নি তার। তবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন করে হীরাকে অসস্তি তে ফেলতে চায়নি বলে কখনো জিজ্ঞেস করে নি।হীরার হাঁটুতে গুঁজে রাখা মাথায় হাত বুলালেন নাজিয়া বেগম। বললেন,
“ থাক মা কাঁদিস না, যা হবার তা হয়ে গেছে। অনিল আসলে আমি ওঁর সাথে কথা বলছি। ”
উত্তরে কিছু বললো না হীরা। নাজিয়া বেগম আনিকাকে ইশারা করলেন হীরাকে নিয়ে রুমে যেতে। মায়ের ইশারায় হীরাকে বসা থেকে তুলতে তুলতে আনিকা বললো,
“ হীরা রুমে চলো। ”
কথা বাড়ালো না হীরা। ভারী শরীরটাকে নিয়ে উঠে পরলো। হীরাকে নিজের রুমে বসিয়ে আনিকা নিচে গেলো কিছুক্ষনের জন্য। আনিকা যেতেই ডুকরে কেঁদে উঠলো হীরা। আর পারছে না সে। অনিলের এক একটা কথা এখনো কানে বাজছে তার। অনিল তাকে এতোটা খারাপ ভাবে? কথাগুলো ভাবতেই এক মুহুর্তও এখানে থাকতে ইচ্ছে করছে না তার। ভীষন অসহায় লাগছে নিজেকে। আজকে যদি মায়ের কথা শুনে বিয়ে করতো তাহলে হয়তো কোনো ব্যাপারে কষ্ট পেলেই মায়ের কাছে যেতে পারতো। নিজের সকল দুঃখ ভাসিয়ে দিতো মায়ের কোলে। অথচ এখন তার কেউ নেই, কোথাও যাওযার জায়গা নেই, কারো কাছে দুঃখ বলার অধিকার নেই। কারণ এই পথ তো সে নিজে বেছে নিয়েছিলো। কিশোরী বয়সের এই একটা ভূল সিদ্ধান্ত আজ তার জীবন টাকে কূল হীন বানিয়ে দিয়েছে।
“ ভালোবেসে মা- বাবাকে ছেড়ে এসেছিলো সুখের আশায়,
অথচ সে কি জানতো মা- বাবা হীন মানুষকে দুঃখ প্রতিনিয়ত তার জোয়ারেই ভাসায়…! ”
আজ তার কিশোরী বয়সের একটি মাত্র ভূল তাকে এই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। ছোটো বেলা থেকে পেলে পুষে বড়ো করা মেয়েটা যখন পরিবারকে ছেড়ে চলে আসে তখন সেটা নিয়ে তাকে একদিন হলেও আফসোস করতে হয়। জীবনে যত সুখই থাকুক না কেন দিনশেষে হঠাৎ করেই একদিন পরিবারের অনুপস্থিতি তাকে কাঁদাবে। এই যে, আজকে হীরার যদি পরিবারের সাথে সম্পর্ক থাকতো তাহলে হয়তো অভিমান করে মায়ের কাছে যেতে পারতো। নিজের কষ্টগুলো মায়ের নিকট তোলে ধরতো, পরে তার মা তাকে এটা সেটা বুঝিয়ে শান্ত করে দিতো। আর এখন তাকে অভিমান করেও কোথাও যেতে পারছে না। সে এখন কূল হীন।
তিমিরে ঘেরা রাস্তায় একটা বেঞ্চের নিচে বসে আছে অনিল। পাশে থাকা ফোনটা কখন থেকে অনবরত বেজে যাচ্ছে। একটু শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না তাকে। বিরক্তিতে মোবাইলটা ছুঁড়ে ফেলার ইচ্ছে হচ্ছে তার। এইবার আর না পেরে কলটা রিসিভ করলো অনিল। কল রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে নিলয় বললো,
“ কিরে ভাই, তুই কী সারাক্ষণ হসপিটালের চিপায় পইড়া থাকোস? আর তোর বউ দেহি মানুষরে গণধোলাই খাওয়ায়! ”
কপালে ভাঁজ পড়ল অনিলের। বললো,
“ মানে! ”
“ আরে আর বলিস না। রনি গতকাল হঠাৎ করেই কোথা থেকে যেন উদয় হলো। আমার সাথে দেখা হওয়ায় বলতেছে ওঁর বউয়ের নাকি বাচ্চা হয় না। কোনো রোগ নাই হুদাই নাকি বাচ্চা হয় না। তাই ওঁ সিদ্ধান্ত নিছে ওঁ যতগুলো মাইয়ারে কষ্ট দিছে সবগুলোর কাছে নাকি ক্ষমা চাইবো তাহলে যদি সৃষ্টিকর্তা ওঁরে সন্তানের মুখ দেখায়। আর ওঁ তো সবচেয়ে বড়ো অন্যায় হীরার সাথেই করছে। তাই আমি হীরার ব্যাপারে সব বলি। তারপর আজকে নাকি তোর বউ এর কাছে ক্ষমা চাইতে গেছে তোর বউ নাকি কোনো কথা না বইলাই চইলা যাইতে নিছিল তাই বেচারা নাকি তোর বউ এর হাত টা ভূল কইরা ধইরা ফেলছিলো। আর এতেই ওঁর অবস্থা বারোটা বাজিয়ে দিছে তোর ঐ পিচ্ছি বউ। হীরার করা সব কাণ্ড খুলে বললো নিলয়। শেষে অবাক হয়ে বললো ভাই তোর বউ রে তো একদম সরল সোজা ভাবছিলাম এতো দেখি পুরাই ডেঞ্জারাস! তবে যাই কছ আমি কিন্তু ব্যাপারটায় বেশ মজা পাইছি। ”
“ ইডিয়ট তুই এইগুলো আগে জানালি না কেন আমায়? ”
“ বাছা তুমি কল ধরো নি? তোমারে জানাইতাম। ”
“ শীট! ”
বলেই ফোনটা টেবিলের সাথে চেপে ধরলো অনিল। যার দরুণ সেটা বন্ধ হয়ে নিলয়ের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। এসবে কোনো খেয়াল নেই তার সে দ্রুত গতিতে গাড়িতে উঠে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। হীরার ক্রন্দনরত মুখ খানা চোখে ভাসতেই বুকটা মুচড়ে উঠলো তার। রাগের মাথায় কী জঘন্য ব্যাবহার টাই না করেছে সে তার অবুঝপাখি টার সাথে। আবার তার জন্য পুরো রাস্তা আজকে হেঁটে যেতে হয়েছে মেয়েটাকে। পা দুটো হয়তো ব্যাথা হয়ে গেছে, সাথে তার কথার আঘাত- ভাবলেই বুকটা অনুসুচনায় দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে তার, নিজেকেই নিজের আঘাত করতে ইচ্ছে হচ্ছে। অবশ্য শাস্তি সে এভাবেই পেয়েছে, এই যে হীরাকে এতো কথা শুনিয়ে নিজেরই কষ্ট হচ্ছিল তাই তো এখানে একা একা বসে নিজেকে শান্ত করতে ব্যাস্ত ছিলো সে। তার অবুঝপাখির চোখ থেকে ঝরা এক একটা অশ্রুকণা যে তার হৃদয়টাকে ক্ষত বিক্ষত করেছে অনবরত। তা দেখার সাধ্য তার হয়নি বলেই তো কোনো কিছু না শুনেই চলে এসছিলেন। একবার অন্তত শুনতো হীরার কথা। এসব ভাবতে ভাবতেই বাড়ি পৌঁছে গেলো সে। বাড়িতে ঢুকেই বড়ো বড়ো পায়ে নিজের রুমে ঢুকে পড়লো। তবে সেখানে হীরাকে না পেয়ে সাথে সাথেই আনিকার রুমের উদ্দেশ্যে গেলো। বাইরে থেকেই হাঁক ছাড়ল,
“ আনিকা। ”
সাথে সাথেই বেরিয়ে এলো আনিকা।
“ হীরা কোথায়? ”
“ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। ”
মুখের মাঝে একটুও ফাইজলামির ছিটেফোঁটা নেই তার। সম্পূর্ণ সিরিয়াস হয়ে উত্তর করলো সে। আনিকার চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে না ওঁ দুষ্টুমি করছে। আর আনিকা কখনো তার সাথে ফাইজলামি করার সাহস ও দেখায়নি। তার মানে কী সত্যিই.. ভাবতেই অনিলের বুকটা পুরো কেঁপে উঠলো।
“ তুই কী আমার সাথে মজা করছিস! এতো রাতে কোথায় যাবে ওঁ আর তুই, আম্মু কোথায় ছিলি? ”
বলেই মায়ের উদ্দেশ্যে হাঁক ছাড়ল সে,
“ আম্মু, আম্মু। ”
“ কী হয়েছে? ”
রুম থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে জবাব দিলেন নাজিয়া বেগম। সে আসতেই অনিল বিচলিত কন্ঠে বললো,
“ আনিকা কী বলছে এসব? হীরা কোথায় গেছে এতো রাতে? আর তোমরা কোথায় ছিলে? ”
ঘাড় বাঁকিয়ে মেয়ের দিক তাকালেন নাজিয়া বেগম। আনিকা ভাইয়ের পিছন থেকে এক দৌঁড়ে গিয়ে মায়ের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালো। বললো,
“ তখন তো কথা না শুনেই ধাক্কা দিয়ে চলে গিয়েছিলে এখন আবার খুঁজ করছো কেন? ”
“ তোকে বলতে হবে বেয়াদব, আমার বউ আমি ধাক্কা দেবো আমিই কোলে নিবো। তোকে পরে দেখে নিচ্ছি আগে বল ওঁ কোথায়? ”
অনিলের অগোচরে তাকে ভেঙচি কাটলো আনিকা। তারপর তার রুমের পাশের রুমটা দেখিয়ে বললো,
“ ঐ রুমে হীরা, আজকে নাকি ওঁ এই রুমে থাকবে। ”
এক সেকেন্ডও ব্যায় করলো না অনিল। রুমের দরজায় গিয়ে ধাক্কা দিতেই বুঝলো রুম ভিতর থেকে লক করা। সে নরম স্বরে ডাকলো,
“ হীরা, ”
“…… ”
“ হীরা প্লিজ দরজাটা খোলো। ”
“….. ”
“ আই অ্যাম স্যরি হীরা, জাস্ট দরজাটা খোলো একটু কথা বলবো তোমার সাথে। ”
“ ….. ”
“ না খোললে কিন্তু দরজা ভেঙে ভিতরে ঢুকবো। ”
এবারও কোন সাড়া এলো না ওপাশ থেকে। এর মাঝেই আনিকার ফোনে নোটিফিকেশন এল হীরার আইডি থেকে। হীরার মেসেজটা টা পড়ে অনিলকে ডাক দিলো সে। অনিল তাকাতেই নিজের ফোনটা অনিলের দিক এগিয়ে দিলো। ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠলো হীরার পাঠানো মেসেজ,
“ দোহাই লাগে উনাকে থামতে বলো, উনার উপস্থিতি পীড়া দিচ্ছে আমাকে, একটু শান্তিতে ঘুমাতে চাই আমি। আর নিতে পারছি না এসব, এখন একটু স্বস্তি চাই আমার। ”
মেসেজটা পড়তেই স্তব্ধ হয়ে গেলো অনিল। চোখ গুলো অত্যাধিক পরিমাণে জ্বলছে তার, এলোমেলো লাগছে নিজেকে। ছেলের অবস্থা দেখে নাজিয়া বেগম বললেন,
“ ওঁর এখন মন ভালো নেই। তুই ঘরে যা কালকে কথা বলে ঠিক করে নিস সব। ”
“ তোমরা ঘরে যাও, আমি যাচ্ছি। ”
অতন্ত স্বাভাবিক স্বরেই বললো সে। তার উপর দেখে বুঝার উপায় নেই তার ভিতরে কতটা ক্ষিপ্র গতিতে ঝড় বইছে। নাজিয়া বেগম ও আর কথা বাড়ালেন না আনিকা কে রুমে যেতে বলে নিজেও চলে গেলেন। বউ, ছেলের মাঝে ঝগড়া হয়েছে আবার তারাই ঠিক করে নিবে- এতে নিজের কথা বলার প্রয়োজন বোধ করলেন না তিনি।
রজনীর তিমিরতা কাটিয়ে আগমন ঘটলো একটি নতুন সকালের। অন্তরীক্ষে তখনো দিবাকরের উদয় হয়নি। আবছা আলোয় কলহ করে যাচ্ছে সহস্র নাম না জানা পাখি। এমন সময়েই ঘুম ভাঙলো হীরার। পিটপিট করে ভারী চোখের পাত গুলো মেলে তাকালো। ওমনিই জ্বলে উঠলো নেত্রযুগল। সারারাত ঘুমোতে পারেনি সে, ছটফট করেছে শুধু, এপাশ ওপাশ করে ঘণ্টা খানেক আগেই ঘুম ধরা দিয়েছিলো। তবে অভ্যাস মোতাবেক তা আবার ভেঙ্গেও গেছে। যার দরুণ চোখ গুলো জ্বলছে তার। ফোলা ফোলা চোখ নিয়েই আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছেড়ে নামলো সে। ছোটো ছোটো পায়ে দরজার কাছে গিয়ে লক খুলতেই পিলে চমকে গেলো তার। দরজার বাইরে দেলায়ের সাথে হেলান দিয়ে নিদ্রাচ্ছন্ন অনিলকে চোখে পড়তেই অনড় হয়ে পরলো সে। “ উনি কী সারারাত এখানেই ছিলেন? ” ভাবতেই বুকটা কেঁপে উঠলো তার। সাথে সাথেই অনিলকে ডাকতে নিয়েও গতকাল রাতের ঘটনা মনে পরতেই থেমে গেলো সে। ফোন হাতে নিয়ে আনিকাকে কল লাগালো। তিন বার রিং হওয়ার পর কল রিসিভ করলো আনিকা।
“ আপু একটু দরজাটা খোলো। ”
বলেই অনিলকে পাশ কাটিয়ে নিঃশব্দে আনিকার রুমের কাছে গেলো সে। ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুললো আনিকা। বললো,
“ কিছু হয়েছে হীরা? ”
আঙুল ইশারা করে অনিলকে দেখালো হীরা। বললো,
“ উনাকে ডেকে তোলো। ”
বলে সে আনিকার রুমে চলে গেল। আনিকা এগিয়ে গিয়ে অনিলকে হালকা করে ডাকলো,
“ ভাইয়া, ”
এক ডাকেই ঘুম ভেঙে গেলো তার। ভ্রু কুঁচকে বললো,
“ কী চাই? ”
“ রুমে গিয়ে ঘুমাও। ”
উঠে পরলো অনিল। হীরার খোলা রুমের দরজায় এক পলক তাকিয়ে নিজের রুমের উদ্দেশ্যে চলে গেল সে। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। আনিকার রুম থেকেই অনিলের স্থান ত্যাগ দেখলো হীরা।
আজকে কলেজ যাবে না হীরা। সাহেরা বেগম রা সবাই আজ আসবে তাই শাশুড়ির সাথে হাত লাগিয়ে কাজ করছে সে। কাজের এক ফাঁকেই নাজিয়া বেগম বললেন,
“ নিরবের সাথে আনিকা কে কেমন লাগে রে হীরা? ”
“ রীতি আপুর ভাই নিরব ভাইয়ার সাথে? ”
“ হুঁ। ”
“ ভালোই তবে আনিকা আপু তো নিরব ভাইয়াকে সহ্যই করতে পারে না। ”
“ বিয়ের পর এসব ঠিক হয়ে যাবে। ”
বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলো হীরা। বললো,
“ বিয়ে! ”
“ হুঁ বিয়ে। আজকে তোর খালামনি রা তো বিয়ের কথা বলতেই আসছে। নিরব আনিকাকে অনেক আগে থেকেই পছন্দ করে। ”
“ ওহ, আনিকা আপু জানে? ”
“ নাহ, এখনো জানেনা তবে আমি ওঁর সাথে কথা বলবো। আচ্ছা তুই তো ওঁর সব কথাই জানিস। ওঁর কাউকে পছন্দ আছে? জানিস? ”
দু’দিকে মাথা নাড়ালো হীরা যার মানে সে জানে না।
“ আমি ওঁকে আগে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম পছন্দ আছে কি না। তখন ওঁ নিষেধ করেছিলো। ”
“ এখন একবার জিজ্ঞেস করে দেখবেন আম্মু। ”
তাদের কথার মাঝেই অ্যাপ্রন হাতে নিচে নামলো অনিল। মায়ের উদ্দেশ্যে বললো,
“ আম্মু আমি হসপিটালে যাচ্ছি। ”
“ আজকে তো তোর খালামনি আসবে। না গেলে হয় না? ”
“ যেতে হবে। আর এমনি তেও আমার কিছু কাজ আছে। ”
বলেই বড়ো বড়ো পা ফেলে বেরিয়ে গেলো সে। এতক্ষন নিচের দিক তাকিয়েই তাদের কথোপকথন শুনছিল হীরা। অনিলের দিক একবার ঘুরে তাকানোর ইচ্ছে জাগলেও তা দমিয়ে রেখেছে সে। যে লোক তার কথা ভাবে না, তার রাগের কথা ভাবে না- সে লোকের দিক সে কখনোই তাকাবে না। সকালে ভেবেছিলো রুমে গিয়ে হীরাকে না পেলে হয়তো অনিল তাকে খুঁজতে আসবে, অথচ অনিল একবার তার নাম টা ও মুখে নেয়নি। আবার এখনো কোনো কথা ছাড়াই হসপিটালে চলে গেছে। ভাবতেই অভিমানীর অভিমানের পাল্লা টা আরও ভারী হলো। মনে মনে পণ করলো, আর কখনো অনিলের সাথে কথা তো দূর ফিরেও তাকাবে না।
রাতে,
গোল হয়ে ড্রয়িং রুমে বসে আছে আনিকা, হীরা , রীতি, ইতি, আশিক (রীতির জামাই) , নিরব আর রীতির আরও তিন জন চাচাতো বোন। বিকেলের দিকে এসে পৌঁছেছে তারা। তারা আসতেই বাড়ি পুরো গমগম হয়ে গেছে। হাসি, ঠাট্টা আর নিরবের আনিকা কে জ্বালানো এসব নিয়েই মেতে ছিলো পুরো এহসান ভিলা। এখন সবাই একটা খেলা খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কতগুলো কাগজে বিভিন্ন রকমের কাজের নাম লিখছো। যেমন: নাচ, গান, কবিতা, কৌতুক, অভিনয় ইত্যাদি ইত্যাদি। কাগজ গুলো সব একসাথে করে পর্যায় ক্রমে সবার কাছে দিবে। যার যে কাজ পরে সে ঐ কাজ করে দেখাবে। বড়রা সবাই উপরে আসিফ এহসান এর রুমে বসে কথা বলছেন। এর মাঝেই বাড়িতে আগমন হলো বাড়ির একমাত্র পুত্র অনিল এহসানের। তাকে দেখা মাত্রই তার সাথে সকলে কুশল বিনিময় করলো। অনিল সামনে এসে নিরব কে জিজ্ঞেস করলো,
“ কী করছিস তোরা? ”
“ খেলছি আই মিন খেলতে যাচ্ছি, এখন খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছি।”
“ ওহ কী খেলা এটা? ”
রীতি অনিলকে পুরো খেলার টপিক বুঝিয়ে বলা শুরু করলো। অনিল পুরোটা মনোযোগ দিয়ে শুনে উপরে যেতে যেতে বললো,
“ ওয়েট আমি আসতেছি। ”
সকলের যেনো চোয়াল ঝুলে গেল। এক এক জন শুধু অনিলের যাওযার পথে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। যাকে জোর জবরদস্তি করেও এসবে আগ্রহী করা যায় না সে আজ নিজেই বলছে খেলার কথা! এতক্ষনে যে একটা দেয়াল ভেঙে তাদের মাথায় পরে নি এটাই বেশি। অনিল যেতেই সবাই তাকে নিয়ে আলোচনায় মজে গেলো। শুধু চুপ রইল হীরা। সে নিচের দিক তাকিয়ে শুধু সবার কথা শুনে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পরেই ফ্রেস হয়ে নিচে নামলো অনিল। তাকে দৃষ্টিগোচর হতেই সবাই মুখে কুলুপ এঁটে দিলো। হীরার বরাবর নিরবের পাশে এসে বসলো অনিল। তারপর শুরু হলো খেলার পর্ব। খেলার শুরুটা হলো নিরবের থেকে। সে একটা কাগজ নিয়ে খুলতেই চোখে পরলো “অভিনয়” লেখাটি। সাথে সাথেই হকলের মাঝে হইহুল্লোড় পরে গেলো। নিরব অভিনয়ে একদম দক্ষ তাই সেও দেনামুনা না করে অভিনয় করলো। তারপর একে একে হীরার পালা এলো আর হীরার কাজ আসলো “ কবিতা”। তাও আবার নিজের বানিয়ে বলতে হবে। হীরার ছোটবেলা থেকেই একটা কবিতা পাড়ে সেটাই বলে উঠলো,
“ হীরা আমার নামটি,
ফুলের মতো মনটি,
একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী,
অ… ”
বলতে গিয়েও থেমে গেলো মেয়েটা। তার মুখের কথা টা নিয়ে আনিকা বলে উঠলো,
“ অনিল এহসানের পাত্রী। ”
সবাই হাত তালি দিয়ে উঠলো। নিরব হীরাকে বাহবা দিয়ে বললো,
“ বাহ, বাহ, ভাবী আপনি তো পুরাই কবি। ”
জোরপূর্বক হাসলো হীরা। তারপর আসলো আনিকার পালা আর তার কপালে জুটল কৌতুক। আনিকা গলা খাঁকারি দিয়ে হাতে থাকা কলম টাকে মাইকের স্টাইলে নিয়ে বলে উঠলো,
“ এক দেশে এক খালু ছিলো,
খালুর একটা পূত্র হলো,
পুত্রের নাম নিরব ছিলো,
তবে সে সরব হলো,
এতে খালুর মন ভাঙলো,
আর জাতির কপাল পুড়লো। ”
তার নাটকীয় ভাবে বলা দেখে সবাই হো হো করে হেসে উঠলো।
নিরব অভিনয়ে আনিকাকে নকল করে তার ইজ্জতের রফাদফা করেছিলো এখন সে এর প্রতিশোধ নিলো। তবে এটা আদৌ কৌতুক ছিলো কিনা তার নিজেরই জানা নেই, নিরবের মজা উড়াতে পেরেছে এতেই তার শান্তি। তারপর একেবারে শেষ পর্যায়ে এলো অনিলের পালা। তবে তাকে হাসির পাত্র বানিয়ে দিয়ে তার হাতে পরলো “ নাচ ” যা শুনতেই হাসির রোল পড়ে গেলো সকলের মাঝে। নিরব বললো,
“ বাছা ভনিতা না করে একটা নাগিন ড্যান্স দাও দেখি। ”
তার দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালো অনিল। এতে সবাই আবারও হেসে উঠলো। অনিল সবার উদ্দেশ্যে বললো,
“ এটা ইম্পসিবল অন্য অপশন দাও। ”
“ কিয়ের আবার অপশন? খাতিল ইজ নট ডো! ”
“ তাহলে কিছুই করবো না আমি। কী করতে পারবি তুই? ”
নিরব কিছু বলতে নিবে এর আগেই আনিকা বলে উঠলো,
“ আচ্ছা ভাইয়া তুমি তাহলে গান গাও। ”
কিছুক্ষন ভাবলো অনিল তারপর ঠোঁট নেড়ে বললো,
“ ওকে ফাইন। ভাইয়ার গিটার টা নিয়ে আয়। ”
তৎক্ষনাৎ নিজের রুমের দিক ছুটলো আনিকা। অনিলের গিটার টা তার রুমেই আছে অনেক বছর যাবৎ। অনিল কলেজ লাইফে শখের বশে কিনেছিল। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হলে বন্ধুদের সাথে গান গাইতো তবে একসময় পড়াশুনার চাপে পড়ে এসব আর মন দিতে পারে নি। আনিকা ছবি তোলার জন্যে একদিন সেটা নিয়ে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিলো। যেহেতু অনিল এটা ব্যবহার করে না তাই সেটার জন্য তেমন কিছু বলেও নি।
অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩৯+৪০
গিটার হাতে তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে এলো আনিকা। এসেই তা অনিলের হাতে ধরিয়ে দিলো। গিটারে হাত রেখে একবার গলা পরিষ্কার করে নিলো অনিল। পুরোটা সময় হীরা নিচের দিক চেয়ে থাকলেও এবার উত্তেজনা বসত অনিলের দিক তাকিয়ে ফেললো। সে তাকাতেই চোখা চোখি হলো দুজনের। অনিল গভীর নেত্রে হীরার চোখের দিক তাকিয়ে গিটারের সাথে তাল মিলিয়ে গেয়ে উঠলো দুটো লাইন ,
“ তুমি দূরে দূরে- আর থেকো না…
এই চোখে চেয়ে- দেখোনা ”
